পৃথিবীকে জেনে নিন আপনার ভাষায়….24 Hrs Online Newspaper

প্রলয় হলে দেবালয়ও রক্ষা পায় না

Student-u-e1432272361769ড, সরদার এম, আনিছুর রহমান
এইতো ক’দিন আগে বাঙালী জাতির কপালে লেপন হলো এক নতুন কলঙ্ক। বর্ষবরণের দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালযের টিএসসি চত্বরে বেশ কিছুসংখ্যক যুবক প্রকাশ্য দিবালোকে নারীর ‘শ্লীলতাহানি’ করলো। এতে টান দিয়ে কারও কারও শাড়ি খুলে নিলো, আবার কারও স্পর্শকাতর স্থানে হাত দিলো, কয়েকজনকে প্রায় বিবস্ত্রও করে অন্যায় আবদার পূরণের চেষ্টাও করলো। একই দিনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ছাত্রীকে বিবস্ত্র করা হলো এবং চাঁনখারপুলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে ছাত্রীদের উত্যক্ত-অপমান করা হলো। এতে রাষ্ট্র, সরকার ও সমাজ নির্বিকার!

ঘটে যাওয়া এসব ঘটনার পর আমরা কী দেখলাম। এক পক্ষ ঘটনার সাথে জড়িতদের যথাযথ শাস্তির দাবি জানালো, আরেক পক্ষ বিশেষ করে এই শাস্তি বাস্তবায়নের দায়িত্ব যাদের উপর তারা বরাবরের মতো নির্লিপ্ত থাকলো। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দাবি আদায়ের দাবিকে অতিরঞ্জন বলতেও দ্বিধা করা হলো না। এর সর্বশেষ সংযোজন জড়িতদের গ্রেপ্তার করতে না পারার প্রতিবাদে ঢাকা পুলিশ কমিশনারের কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচিতে পুলিশের হামলা। ছাত্র ইউনিয়নের একজন নারীকর্মীর উপর যে কায়দায় হামলা করা হয়েছে তার হয়তো আইনি ব্যাখ্যা আছে যেমনটা ব্যাখ্যা আমরা পেয়েছিলাম বর্ষবরণের ঘটনায় পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণে। তারা দাবি করেছে কিছুই হয়নি। পুলিশ প্রধান তো বলেই ফেললেন ‘এটা দু-চারটা ছেলের দুষ্টুমী ছাড়া আর কিছুই নয়।’

যখন কিছুই হয়নি তখন এ নিয়ে ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীদের অহেতুক ঝামেলা সৃষ্টিকে লাঠি থেরাপির মাধ্যমে দমন অবশ্যই ন্যায়সঙ্গত! সরকারও এ ব্যাপারে নিশ্চুপ থাকলো। এর দু’টি কারণ থাকতে পারে এক- অনেকে বলছে এর সাথে জড়িতরা ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত। দুই- সরকার যে কোনো প্রকার আন্দোলনের বিপক্ষে, কারণ এই আন্দোলনের সুযোগে সরকারবিরোধী আন্দোলন না আবার মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। তাই সরকারের লোকজন এ ব্যাপারে যতটা পারা যায় চুপ থাকাটাই শ্রেয় মনে করেছে। আসলে কী এ ব্যাপারে সরকার কিংবা রাষ্ট্রের এতটা নির্বিকার থাকার কথা!

যারা আন্দোলন করছে বা অতীতে যারা এই আন্দোলনে ছিল অথবা এই ঘটনার প্রতিবাদে মানববন্ধনে অংশ নিয়েছে কেউ কিন্তু ওইদিন যে আমার মা-বোনেরা হয়রানির শিকার হয়েছেন তাদের চেনে না। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের কোনো ঘটনা না ঘটে এজন্যই এই ধরনের কর্মকাণ্ডে তাদের অংশগ্রহণ। এখানে যেমন নিজে অথবা নিজের স্বজনদের এই ধরনের ঘটনার শিকারের ভয় আছে তেমনি ভবিষ্যতে নারীর জন্য সুন্দর এক বাংলাদেশের স্বপ্নও আছে। কিন্তু এই মানুষগুলোকে নির্মম বাক্যবাণে জর্জরিত হতে হচ্ছে অথবা নির্মম লাঠির আঘাত সহ্য করতে হচ্ছে। ব্যাপারটা এমন- আপনার তো কিছুই হয়নি। চুপ করে থাকেন। যাদের ক্ষতি হয়েছে তারা তো কোনো অভিযোগ দিচ্ছে না। তাহলে আপনারা এতো মাতামাতি-লাফালাফি করছেন কেনো?

শ্রদ্ধেয় আরেফিন স্যার, আপনি তো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তির সাথে আপনার ভাবমূর্তি জড়িত। এই ঘটনা প্রমাণিত হলে আপনার ব্যর্থতার তালিকা বড় হয়ে যাবে। তাই আপনি চান না এই ঘটনা নিয়ে বাড়াবাড়ি হোক কিংবা আরো বৃহৎ পরিসরে আলোচনায় আসুক। কিন্তু কোনদিন যে আপনার মেয়ে বা আপনার ভালোবাসার কেউ এই ধরনের ঘটনার শিকার হবে না এই গ্যারান্টি আপনাকে কে দেবে? হয়তো মনে মনে এই ভেবে সন্তুষ্ট হচ্ছেন আমার মেয়ে তো দেশের বাইরে থাকে। তবে অভিজিৎ দেশের বাইরে থাকলেও কয়েক দিনের জন্য দেশে এসে কিন্তু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। কেননা, অপরাধীরা ওঁৎ পেতে থাকে শিকারের অপেক্ষায়। তবে এতটা চুপ থাকার কি সুযোগ আছে?

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাহেব। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ত্রুটি জনসম্মুখে এলে আপনার সমালোচনা হবে। অনেকে আপনার পদত্যাগ দাবি করবে। তাই চাচ্ছেন থাক কি হয়েছে, যা হয়েছে বেমালুম অস্বীকার করে যাবো। আপনার স্বীকারোক্তি এবং যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা থেকে আপনার প্রতিষ্ঠানকে, আপনার সমাজকে, আপনার দেশকে রক্ষা করতে পারত। কিন্তু আপনার ইমেজ চলে যাবে তাই বিবেক কে দমিয়ে রেখেছেন। একদিন আপনি হয়তো বিবেকের দংশনের শিকার হবেন যখন আপনার কেউ যৌন হয়রানির শিকার হবে।

এইতো ক’দিন হলো অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট মুক্তমনা লেখক অনন্তকে হত্যা করা হলো। এর আগেও বিজ্ঞানমনস্ক মুক্তমনা লেখক অভিজিৎ রায়, ওয়াসিকুর, মুক্তচিন্তার বিশিষ্ট লেখক হুমায়ুন আজাদ, মুক্তমনা শফিউল ইসলাম লিলন, ব্লগার আশরাফুল ইসলাম, আরিফ রায়হান দ্বীপ, জাফর মুন্সি, মামুন হোসেন, জগৎ জ্যোতি তালুকদার, ব্লগার জিয়াউদ্দিন জাকারিয়া বাবু, ব্লগার রাজিবসহ আরো অনেককে এভাবেই জীবন দিতে হয়েছে অজ্ঞাত সন্ত্রাসীদের হাতে। প্রতিটি ঘটনার পরপরই ঢালাওভাবে সাম্প্রদায়িক শক্তিকে দায়ী করে কয়েকদিন হৈ চৈ করে থেমে যাই আমরা। এসব ঘটনায় সরকার সংশ্লিষ্টরা যতটা পেরেছেন নিশ্চুপ থাকা কিংবা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছেন।

যদিও রাজনৈতিক কিংবা অন্য কোনো বিষয়ে মন্ত্রী-এমপি, নেতানেত্রীকে এমনটি চুপ থাকতে দেখা যায়নি। যেমনটি বলা যায়- বিএনপি নেতা সালাহ উদ্দিন আহমেদের বিষয়ে কেউ কথা বলতে বাকী থাকেননি। এমন কী রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধান মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও কথা বলেছেন।

এদিকে ১০ জন বিশিষ্ট নাগরিককে হত্যার হুমকি দিয়ে চিঠি পাঠানোর ঘটনা বৃহস্পতিবার থেকে গণমাধ্যমে বেশগুরুত্ব দিয়েই প্রচারিত হচ্ছে। ‘ইসলাম বিরোধী’ আখ্যা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং রাজনীতিবিদসহ ১০ জনকে হত্যার হুমকি দিয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে। চিঠির নিচে প্রেরকের নাম দেয়া আছে ‘আল-কায়েদা আনসারউল্লাহ বাংলা ১৩’।

চিঠিতে দশজনের নাম উল্লেখ করা হয়, তাতে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুহাম্মদ জাফর ইকবাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক, একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতার অধ্যাপক কাবেরী গায়েন, জগন্নাথ হলের প্রভোস্ট অসীম সরকার, সংসদ সদস্য তারানা হালিম ও ইকবালুর রহিম ও গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার। এছাড়াও এ তালিকায় বিকাশ সাহা ও পল্টন সুতার নামের আরো দুইজন ব্যক্তি রয়েছেন।

গণমাধ্যমের কল্যাণে যতদূর জানা গেছে তাতে, ঢাকার জিপিও থেকে পোস্ট করা একই চিঠির কপি অনেকের ঠিকানায় পাঠানো হয়েছে। ইংরেজিতে লেখা সেই চিঠিতে বলা হয়– ‘তোমাদের অবশ্যই মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হতে হবে’।

ঢাবির জগন্নাথ হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক অসীম সরকার জানিয়েছেন তিনি যে চিঠি পেয়েছেন তাতে উল্লেখিত দশজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। প্রত্যেকের নামের পাশে নানা ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে। অধ্যাপক অসীম সরকারের নামের পাশে লেখা আছে হিন্দু মৌলবাদী। এইচটি ইমামের নামের পাশে তাকে বর্ণনা করা হয়েছে ‘ইসলাম বিরোধী উপদেষ্টা’ হিসেবে। এভাবে সবার নামের পাশেই একটি করে বর্ণনা দেয়া আছে।

এ ধরনের চিঠি পেয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সবাই। অধ্যাপক অসীম সরকার বলেছেন, ‘আমি অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাস করি। কখনো কারও ক্ষতি করি নাই। আমার শত্রু থাকতে পারে এটা আমার বিশ্বাস হয় না।’ নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন এই অধ্যাপক শাহবাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছেন।

এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়ায় ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, ‘নিজেকে নিয়ে আমি মোটেও ভীত নই, মুক্তমনা ব্লগারদের নিয়ে বিচলিত। হত্যার হুমকি আমার জন্য নতুন কিছু না, অসংখ্যবার হত্যার হুমকির চিঠি পেয়েছি। অনেকবার এ রকম হয়েছে, আমার স্ত্রীকেও বলিনি। তবে আশা করছি এ তালিকায় অনেক বড় মানুষ থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সক্রিয় হয়ে হুমকিদাতাদের খুঁজে বের করবে।’

‘এখানে যাদের নাম দিয়েছে তারা সবাই সমাজে প্রতিষ্ঠিত মানুষ। তাদের ঝুঁকি নাই। কারণ তারা পর্যাপ্ত নিরাপত্তা পায়। আমারও গত সাতদিন ধরে পুলিশ পাহারা রয়েছে। এরা রাস্তার মোড়ে চাপাতি দিয়ে মারতে পারবে- এই আশঙ্কা আমি দেখি না।’ নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কায় থাকা ব্লগারদের বিষয়ে নজর দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সম্প্রতি একের পর এক ব্লগার হত্যার প্রেক্ষাপটে এই ধরনের চিঠি অনেকের মাঝেই উদ্বেগ তৈরি করেছে। এরই মধ্যে বলা হচ্ছে যে ৮৪ জন ব্লগারকে ‘নাস্তিক বা ইসলাম বিরোধী’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে তাদের মধ্যে চারজন এরই মধ্যে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। ব্লগার অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডের জন্য পুলিশ আনসারউল্লাহ বাংলা টিম নামের একটি উগ্রপন্থি সংগঠনকে সন্দেহ করছে। এই একই গোষ্ঠী ১০ জনকে হত্যার হুমকি দিয়ে চিঠি দিয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে পুলিশ ধারণা করছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক বলেছেন, বুধবার সকালে তার অফিসের ঠিকানায় একই চিঠি এসেছে। এ ঘটনায় লক্ষ্য করা যাচ্ছে সরকার ও সংশ্লিষ্টরা বেশ নড়েচড়ে উঠেছে। সরকারের পক্ষ থেকেও সংশ্লিষ্টদের নিরাপত্তা জোরদারের কথা বলেছেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। সরকারপন্থি তথা মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের দাবিদার বুদ্ধিজীবীরাও উদ্বেগ করছেন।

কিন্তু ইতোপূর্বে ব্লগারদের হত্যার হুমকি দিয়ে চিঠি পাঠানোর ঘটনায় তাদের এমন উদ্বিগ্ন হতে দেখা যায়নি। এমন কী ধারাবাহিক ব্লগার হত্যার বিষয়েও তাদেরকে বেশ সতর্কতার সাথে উদ্বেগ প্রকাশ করতে দেখা গেছে।

এছাড়া বিশিষ্ট লেখক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালকে যখন একজন সাংসদ চাবুক মারার হুমকি দিলেন, তার বিরুদ্ধে মিছিল-সমাবেশে গালিগালাজ এবং তাকে সিআইএ’র গুপ্তচর সাব্যস্ত করা হলো, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. মিজান উদ্দিনকে যখন থাপ্পর মারা হলো তখন কিন্তু এই সব সরকারপন্থি তথা মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের দাবিদার বুদ্ধিজীবীদেরকে তেমন নড়াচড়া করতে দেখা যায়নি। সবাই খুবই সতর্কতার সাথে কথা বলেছেন যাতে সরকার রুষ্ট না হয়।

অন্যদিকে, এরআগে অভিজিৎ হত্যার পর আনসার বাংলা ৭ নামে এক জঙ্গি সংগঠন তাদের টুইটে একই দায় স্বীকার করেছিল। ব্লগার অনন্ত হত্যাকাণ্ডের কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই এর দায় স্বীকার করে জঙ্গি সংগঠন আল কায়েদা ভারতীয় শাখা ও আনসার বাংলা ৮। কিন্তু এসব ঘটনায় অপরাধী চিহ্নিত করতে পারেনি পুলিশ। শুধু সন্দেহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। এমন কী অভিজিৎ হত্যার তদন্তে বাংলাদেশ পুলিশের পাশাপাশি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই এগিয়ে এলেও এ পর্যন্ত কার্যত কোনো অগ্রগতি নেই।

স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জোর দিয়েই দাবি করেন- বাংলাদেশে আল-কায়দা কিংবা এ জাতীয় কোনো জঙ্গি সংগঠনের অস্তিত্ব নেই। তাদের এই দাবি যদি সত্য হয়ে থাকে তবে আজকে আল-কায়েদা নামে কিংবা আনসার বাংলা ৭, ৮, ৯, ১৩… নামে যেসব জঙ্গি সংগঠন একের পর এক হত্যা হুমকি এবং ধারাবাহিক হত্যার দায় স্বীকার করে চলেছে এগুলো কী একেবারেই ভুয়া? স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ভাষ্য অনুসারে ধরেই নিলাম আল-কায়েদা কিংবা আনসার বাংলা নামে কোনো জঙ্গি সংগঠনের অস্তিত্ব আমাদের দেশে নেই। তবে এই হত্যা আর হুমকি কে বা কারা ঘটিয়েছে এটা বের করার দায়িত্ব কার? অবশ্যই তা সরকার ও প্রশাসনের। ফলে নিগঢ়ে গিয়ে তা খতিয়ে দেখা উচিৎ।

সাথে মনে প্রশ্ন জাগে, প্রকাশ্যে দিবালোকে মানুষ খুন হয়, সমাজের বিশিষ্টজনদের হুমকি দেয়, এসময় আমাদের এতো দক্ষ পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা কোথায় থাকেন? আর এতো ক্ষমতাধর সরকারের রাষ্ট্রযন্ত্র বা কী করে!

আমরা কিছু মুষ্টিমেয় মানুষ অনেক আগে থেকেই উচ্চারণ করে আসছি, জাতির অশনি সংকেতের কথা, জাতির মধ্যে যে পচন রোগ দেখা দিয়েছে। এটা দ্রুতই সাড়াতে হবে। কেননা, এটা ছড়িয়ে পড়লে সবাইকে এর দুর্ভোগ পোহাতে হবে। কিন্তু আমাদের কথায় অনেকেই সাড়া দেননি সরকার অসন্তুষ্ট হবে বলে আমাদের এই দাবিকে বাঁকা চোখে দেখেছেন। কিন্তু আজ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-ভিসি থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাকে হুমকি দেয়া হয়েছে। ফলে এটা রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য কতটা হুমকি হয়ে দাঁড়িয়ে তা সহজেই অনুমেয়। তাই এবার সেই বহু পুরানো প্রবাদের ভাষায় বলতে হয়- প্রলয় হলে দেবালয়ও রক্ষা পায় না। অর্থাৎ অন্ধ হলে যেমন প্রলয় বন্ধ থাকে না; তেমনি প্রলয় হলে দেবালয়ও রক্ষা পায় না। সন্ত্রাস ও অস্ত্রকে অবলম্বন করে প্রলয় ও আগুনের লেলিহান শিখায় প্রলম্বিত করা হলে সেটাই তাদেকেও একদিন গ্রাস করবে। মানুষকে বিপদে ফেলে যারা নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে চায়, কোনপক্ষ রুষ্ট হবে বলে মুখবুজে অন্যায়কে নীরবে সহ্য করে, তারাই সবচেয়ে আগে বিপদের সম্মুখীন হবে। এটাই ইতিহাসের প্রমাণিত শিক্ষা।

লেখক: শিক্ষা ও সমাজবিষয়ক গবেষক।

Posted in নির্বাচিত কলাম | Comments Off on প্রলয় হলে দেবালয়ও রক্ষা পায় না

মানবপাচারকারী চক্রের প্রতারণায় হৃদয়বিদারক ঘটনা

m-dপাঁচার রোধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে
দৈনিক পত্রিকা থেকে জানা যায়, থাইল্যান্ডে মানব পাচারকারীদের একটি বন্দিশিবিরেই ৪০০ জন রয়েছে। তাদের বেশিরভাগই মায়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমান ও বাংলাদেশী। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের প্রতি ২০ জনের একজন এখন বিদেশে কর্মরত। অর্থাৎ বিদেশে প্রায় কোটিখানেক মানুষের কর্মসংস্থান দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধি করেছে। এ ব্যাপারে জনশক্তি রফতানীর সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর অবদান যেমন অনস্বীকার্য তেমন ‘মানবপাচারকারী’ নামের একশ্রেণির প্রতারকের প্রতারণাও অনেক হৃদয়বিদারক ঘটনার জন্ম দিচ্ছে। বিদেশে চাকরি দেয়ার নাম করে লাখ লাখ টাকা নিয়ে উধাও, বিদেশে নিয়ে চাকরি না দিয়ে প্রতারণা শুধু নয়, জীবন কেড়ে নেয়ার ঘটনাও অনেক ঘটেছে; ঘটছে। সাম্প্রতিক সময়ে জনশক্তি রফতানীর ক্ষেত্রে দুর্নীতি তুলনামূলকভাবে হ্রাস পেলেও সাগরপথে মানবপাচারের ঘটনা বেড়েই চলেছে। বিশেষতঃ মানবপাচারে সবচেয়ে বড় রুট হিসেবে বছরের পর বছর ধরে ব্যবহার হয়ে আসছে বঙ্গোপসাগর। এ পথে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওনা দেয় হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলমান ও বাংলাদেশীরা। যাত্রাপথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় অধিবাসীরা রওনা করে। বারবার দুর্ঘটনায় অবৈধ অভিবাসীদের মৃত্যুর খবর এলেও অবৈধভাবে বিদেশ যাত্রার হার প্রতিনিয়ত বাড়ছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ সমুদ্রপথে অবৈধভাবে যাত্রা করে। এরইমধ্যে বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সমুদ্রপথ পাড়ি দিতে গিয়ে নির্যাতন ও অনাহারে প্রাণ হারিয়েছে প্রায় ৫৪০ জন। অনেকে বঙ্গোপসাগর পেরিয়ে দুই দেশের সীমানা অতিক্রম করে দক্ষিণে ভারত সাগর ধরে আরো এগিয়ে যায়। পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, মানবপাচারের দিক দিয়ে বঙ্গোপসাগর একটি আন্তঃরাষ্ট্রীয় রুটে পরিণত হয়েছে। মূলত বাংলাদেশ ও মিয়ানমার থেকে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে মানবপাচার হচ্ছে। কক্সবাজারের উখিয়ার উপকূলীয় এলাকার ১৩টি পয়েন্ট দিয়ে মানবপাচারের একটি বড় সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে নীরবে সতর্কতার সাথে মানবপাচারের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার কারণে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার লোকজনও মাঝে-মধ্যে অভিযান চালিয়ে ব্যর্থ হচ্ছে। এমতাবস্থায়ও অনিশ্চিত সাগরপথে মালয়েশিয়া পাড়ি জমাতে গিয়ে থাইল্যান্ডের জঙ্গলে মানবপাচারকারী চক্রের তৈরি করা টর্চার সেল এখন মালয়েশিয়াগামীদের মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। গত ৩ বছরে সাগরপথে প্রায় ৫০ হাজার লোকজন মালয়েশিয়া পাচারের নামে উপকূল ছেড়েছে। এ পর্যন্ত নিখোঁজ রয়েছে প্রায় সাড়ে ৩ হাজারেরও অধিক মালয়েশিয়াগামী। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে,অনুসন্ধানে জানা গেছে- সাগরপথে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডে অবৈধভাবে মানুষ পাচার করা হচ্ছে গবাদি পশুর চালানের মতো করেই। মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডের উপকূলের মানবপাচারকারী সিন্ডিকেট সদস্যরা কক্সবাজার থেকে পাচার হওয়া লোকজনের চালান গ্রহণের পর সেই মেহেদী রংয়ের বিশেষ চিহ্নের সাহায্যেই পাচারকারীদের সাথে লেনদেন নির্ধারণ করে থাকে। এ সিন্ডিকেটের গডফাদারদের অধীনে কাজ করছে অজস্র দালাল। দেশজুড়ে এ দালালের সংখ্যা সহস্রাধিক বলে পুলিশের ধারণায় এসেছে। কিন্তু ধরা পড়েছে একেবারে নগণ্য। পাশাপাশি ধৃতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও দৃশ্যমান নয়। এ কারণে মানবপাচার দুর্দমনীয় অবস্থানে পৌঁছে গেছে। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার থেকে মানবপাচার প্রধান রুট বঙ্গোপসাগর। ছোট-বড় ইঞ্জিন বোট ও ট্রলার চালকদের একটি অংশ এ কাজে জড়িত হয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। এদেশ থেকে অল্প টাকায় মালয়েশিয়া যাওয়ার প্রলোভন দেখালেও থাইল্যান্ডে দালালদের আস্তানায় বন্দি করে রেখে এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে দেশে থাকা স্বজনদের কাছ থেকে দুই/আড়াই লক্ষাধিক টাকা করে আদায় করে পরবর্তীতে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন উপকূলে পৌঁছে দেয়। উল্লেখ্য, মানবপাচারে জড়িত ব্যক্তির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ-ের বিধান রয়েছে। এ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরিতে স্থানীয় প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদ থেকে গণবিজ্ঞপ্তি দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী।
প্রসঙ্গত আমরা মনে করি যে, শুধু আইনের বল প্রয়োগেই মানবপাচার রোধ করা যাবে না। কারণ মানুষের তৈরি আইনের গোলকধাঁধায় মানুষ সহজেই পার পেয়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে অত্যাবশ্যকীয় হলো- মানুষের সৃষ্টিকর্তা খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক ওঁর প্রতি অনুগত হওয়া ও অন্তরে ওঁর প্রতি ভয় লালন করা এবং এ সম্পর্কিত মূল্যবোধ ও চেতনা জাগ্রত করা।

Posted in নির্বাচিত কলাম | Comments Off on মানবপাচারকারী চক্রের প্রতারণায় হৃদয়বিদারক ঘটনা

অপরাধের প্রতিবাদে অপরাধ!

download (2)ফয়েজ-উন-নেছা
খবরটা প্রথম জানতে পারলাম এক বন্ধুর কাছ থেকে। বলল, আমাদের মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি গার্লস হাই স্কুল এন্ড কলেজের ক্লাস ফাইভের এক ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। পরে সহকর্মীদের কাছ থেকে জানলাম, স্কুলের কোন পরিষ্কারকর্মীর দ্বারা ইংরেজি মাধ্যমের ক্লাস ওয়ানের এক শিশু যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে।
আমাদের স্কুলে শিক্ষিকাদের স্থান কিন্তু বরাবরই খানিকটা উঁচু। প্রিন্সিপাল জাকেরা রহমানের যুগটায় স্কুলে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ আমার হয়েছে। মূলত তার সময়টাই এই শিক্ষিকাদের স্থানটা পোক্ত হয়ে উঠেছিল। স্কুল চেয়্যারম্যান মরহুম কাজী আজহার আলী স্যারের জোর সমর্থন আর আন্তরিকতার অভাব ছিল না। তখন বার তিনেক আমরা শ্রেষ্ঠ স্কুলের তকমাও পেয়েছি রাষ্টীয়ভাবে।
১৭ মে স্কুলে গেলাম। ইংরেজি মাধ্যমের বেশকিছু মেয়ের সঙ্গে কথা হলো। বলল, ক্লাস ফাইভের মেয়ে আপু ধষর্ণের শিকার হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালে রয়েছে। জিজ্ঞাসা করলাম কোন হাসপাতাল, এখন কেমন আছে, জানে কী না। কোন সদুত্তর পেলাম না। ভাইস প্রিন্সিপাল জিন্নাতুননেসা ম্যাডামের কথা উঠতেই যেন ওদের চোখে ক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠলো।
১৫ মে পত্রিকায়, টিভিতে তো দেখেছিই। মানববন্ধন, মায়েদের অভিযোগ, তীব্র আক্রোশ, ক্ষোভ। ছাত্রীদের না বলা কথা। এক সিনিয়র সাংবাদিক ভাইয়ের কাছে শুনলাম, ওনার ছেলেকে বয়েজ শাখায় ভর্তি করিয়েছিলেন। কিছু ব্যাপারে অভিযোগ থাকায় স্কুলে শিক্ষকদের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন। অনুমতি পাননি। পরে পেশাগত পরিচয় দিয়েও তেমন কোন সহযোগিতা পাননি তিনি। পরে অন্য স্কুলে ছেলেকে সরিয়ে নিয়ে গেছেন তিনি।
পরদিন আবার স্কুলে আসলাম। ১৬ মে কী ঘটেছিলো ব্যাপারটা শিক্ষকদের মুখে শোনা দরকার ছিলো। স্কুলে ডিবির দুই সদস্য জানালেন, তদন্তে কয়েকজন কর্মচারী অভিযুক্ত রয়েছেন। ক্লাস ওয়ানের একটি বাচ্চাকে যৌন হয়রানির চেষ্টা করা হয়েছিলো। যদিও ভিকটিমের পরিবার এখনও পর্যন্ত কোন অভিযোগ করেননি।
যৌন হয়রানির শিকার ক্লাস ওয়ানের সেই শিশুর বাবাকে সদস্য করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছিল। সম্ভাব্য অভিযুক্তদের সামনে নিয়ে শিশুটিকে ‘অপরাধীকে’ শনাক্ত করতে বলা হলে সাত/আট বছরের শিশুটি কিছু বলতে পারেনি। অস্ত্রের ভয়ে দেখিয়ে মুখ চেপে পাশের নির্মাণাধীন ভবনে নিয়ে যাওয়ার মতো দুঃসহ পরিস্থিতিতে এমনিতেই তো অতোটুকু মেয়েটি ভয়াতুর। কী বা শনাক্ত করবে সে। তবে ঘটনার পর থেকে গোপাল দাস নামের একজন পরিষ্কারকর্মী কাজে না ফিরলে সন্দেহের তীর তার দিকে যায়। কর্তব্যে অবহেলার কারণে তাকে অব্যাহতি দেয় কর্তৃপক্ষ। গত ১৬ মে অভিভাবকদের সঙ্গে অশোভন আচরণের অভিযোগে স্কুলের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ম তামিম দোষীদের শাস্তি, অভিভাবক বা শিক্ষার্থীদের হয়রানি, হুমকি-ধামকি না করার আশ্বাস ও প্রতিশ্র“তি দেন।
ফোনে সদ্য অব্যাহতিপ্রাপ্ত ভাইস প্রিন্সিপাল ম্যাডামের কাছে ১৬ মে কী ঘটেছিল জানতে চাইলাম। তিনি জানালেন, কিছু অভিভাবকের সূত্রে তিনি আগেই জানতে পেরেছিলেন, এমন কিছু হতে পারে। প্রশ্ন করলাম, তাহলে নিরাপত্তা বাড়ালেন না কেন বললেন, ৩৬ বছর ধরে যে প্রতিষ্ঠানে তোমাদের পড়িয়ে এসেছি। আমার সেই বাচ্চাদের মায়েরা, কিংবা আমার সেই বাচ্চারাই বড় হয়ে আমার উপরই চড়াও হবে এমনটা বিশ্বাস করতে মন চায়নি। পরের দিকটায় বুঝে উঠতে পারছিলাম না কী হচ্ছে, কী করা উচিত। এমন পরিস্থিতির সঙ্গে আমার পরিচয় ছিলো না। আর সেই অশোভন কথা আমি বলতে পারি না। এটা সম্ভব না। শাস্তি আমাকেই পেতে হলো। এটাই আমার প্রাপ্তি!
প্রিন্সিপাল বেলায়েত স্যার জানালেন, তাকে বাঁচাতে এসে স্কুলের ছোট ছোট মেয়েরা সেই আক্রমণের শিকার হয়েছে সেদিন। এখানে সেই মায়েদের, প্রাক্তন ছাত্রীদের কাছে আমার প্রশ্ন, না হয় বুঝলাম আমাদের গুরুদের অনেক অন্যায় ছিলো। কথায় কথায় হুমকি-ধামকি পেয়েছেন। ওই কোমলমতি শিশুদের অপরাধটা কোথায় নাকি আক্রোশ আর ক্ষোভের আগুন এতো বেশি যে ছোট্ট ছোট্ট শিশুদের শিশু মনে হয়নি
এটা স্পষ্ট হলো স্কুলটি বড় আকারে পৌঁছে যাওয়ায়, ট্রাস্টিদের দেখভালের নজর কমেছে। কিংবা বাড়তি আয়তনের সঙ্গে তাদের সচেতনতা বাড়েনি। প্রতিষ্ঠারটির শৃঙ্খলায় প্রতিনিয়ত অবনতি ঘটছে। চার দশকের পুরানো একটি আধুনিক স্কুলে যৌন হয়রানির পর সিসি ক্যামেরা কেন বসানো হবে, আগে কেন ছিলো না, এমন সব প্রশ্ন থেকেই যায়। এমনকি স্কুলে ২০০৯ সালে উচ্চ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ বিধিমালা প্রণয়ন এবং নিপীড়ন বিরোধী অভিযোগ সেল গঠনের হদিস পাওয়া যায়নি। থাকলে তদন্ত কমিটিতে তাদের কারও টিকিটি অন্তত মিলতো।
অন্যদিকে ভাইস প্রিন্সিপাল ম্যাডামের ব্যবহারেও অভিভাবকদের মধ্যে অসন্তোষ ভয়াবহ আকারে বেড়েছে। শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের প্রতি তার দুর্ব্যবহার, অবহেলায় ক্ষোভ বাড়ছে। এতে ক্রমান্বয়ে গোটা স্কুলের শিক্ষকদের সঙ্গে ছাত্র ও অভিভাবকদের দূরত্ব বাড়তে বাড়তে কোথায় নেমেছে ভাবতেই আজ ভয় হয়। নাহলে বহিরাগতদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কেউ নিজের সন্তানের স্কুল ভাঙ্গার মতো ঔদ্ধত্যও দেখায়! তার বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ অথবা মামলা অবধি পৌঁছলেও আফসোস হতো না। অন্যায় ঘটলে সুষ্ঠু বিচার তো জরুরি। কিন্তু তার প্রতিবাদে আমাদের শিক্ষকদের প্রতি শারীরিক নির্যাতন কোথাকার সভ্যতা
প্রকৃতির প্রতিশোধ বলে একটা ব্যাপার থেকেই যায়। স্কুল কমিটি প্রতিষ্ঠান বাঁচাতে অদূর ভবিষ্যতে হয়তো ওই অভিভাবকদের সঙ্গে সংঘাতেও যাবেন না। আমাদের জিন্নাত ম্যাডামও হয়তো আর প্রিয় স্কুলটিতে ফিরবেন না। কিন্তু আপনার যে সন্তানটি আপনাকে তারই শিক্ষকের উপরে চড়াও হতে দেখেছে সে কী ব্যাপারটিকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপনার অতি কঠোর হস্তে দমন বা প্রতিবাদ হিসাবে দেখবে না নাকি অন্যায়ের জন্মলগ্নের সঙ্গে নিজেকে পরিচয় করিয়ে দেবে, সেটাই বড় প্রশ্ন।
যৌন হয়রানির মতো যে পাশবিক ঘটনা ঘটেছে, এর সুষ্ঠু বিচার হতেই হবে। স্কুল প্রশাসনকে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, শিক্ষার মান, স্কুলের পরিবেশ নিশ্চিত করতেই হবে। কিন্তু যে স্থানটুকু গড়তে চার দশক লেগে গেলো। হাজারো মানুষের অক্লান্ত পরিশ্রম আর আন্তরিকতাকে ঘিরে আমরা যেভাবে গড়ে উঠেছি বা যারা গড়ে উঠছেন তাদের বিশ্বাসটুকু যেন হারিয়ে না যায়। এমন প্রত্যাশা নিয়ে স্যারের কক্ষ থেকে যখন বের হয়ে আসবো, ঠিক তখনই পুরানো শিক্ষিকারা ছুটে আসলেন দেখা করতে। তাদের একজন খুব শান্ত অথচ দৃঢ়ভাবে বললেন, আচ্ছা বলতো, তোমাদের কাছ থেকে কী আমাদের এই পাওনাটাই ছিলো? এটাই কী আমাদের প্রতি তোমাদের দণ্ড। আমরা কী এমন সভ্যতা তোমাদের শিখিয়েছি?
আমি নিজেকে লুকানোর জায়গা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কী বলি কিভাবে বলি
লেখক : সাংবাদিক ও মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি গার্লস হাই স্কুল এন্ড কলেজের প্রাক্তন ছাত্রী

Posted in নির্বাচিত কলাম | Comments Off on অপরাধের প্রতিবাদে অপরাধ!

থিয়েটার অব স্পনটিনিউটি

download (1)মোস্তফা কামাল
মহড়া ছাড়া ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও আবেগ কেন্দ্রীক তাৎক্ষনিক অভনয় শৈলীই থিয়েটার অব স্পনটিনিউটি যার মধ্য দিয়ে অভিনয়শিল্পী সৃজনশীল ও স্বত¯ফূর্ত ভাবে অভিনয় করে থাকেন। প্রকৃত পক্ষে আর্ট অব ইমপ্রোভাইজেশন এই ক্ষেত্রে রেভুলেশনারি ভূমিকায় অবতীর্ন হয়। এই ধারার থিয়েটার এর প্রবক্তার জ্যাকব লিভি মোরিনো।
১৯১২ খ্রিষ্টাব্দে মোরিনো যখন ইউনিভার্সিটি অব ভিয়েনা মেডিকেল স্কুলের শিক্ষার্থী ছিলেন; তখন সেখানে অধ্যাপনা করতেন সিগমুন্ড ফ্রয়েড। এ সময় ফ্রয়েড তাঁর সাইকোএনালাইসিস তত্ত্বের বিকাশ ঘটাতে খুঁজছিলেন কিছু বরপুত্র। যাদর মধ্যে অন্যতম ছিলেন মোরিনো। কিন্তু মোরিনো পরবর্তীকালে ফ্রয়েড এর অনুসারি না হয়ে; প্রতিনিবিপ্লবির মত ফ্রয়েডকে প্রত্যউত্তর দিয়েছিলেন এই বলেঃ ‘ড. ফ্রয়েড আপনার যেখানে সমাপ্তি আমার সেখানে শুরু। আপনি মানুষের স্বপ্ন বিশ্লেষন করেন; আর আমি তাদেরকে পুনরায় স্বপ্ন দেখাতে উৎসাহিত করি; শিখাই কিভাবে নিজেই নিজের স্রষ্টা হতে হয়। আপনি মানুষের সাথে মেশেন আপনার অফিসে একটি কৃত্রিম পরিবেশ। আর আমি মিশি তাদের বাড়িতে, রাস্তায় সর্বপরি প্রকৃতির সংস্রবে’।
সৃজনশীলতাবর্জিত ও স্বতস্ফূর্ততাহীন অভিনয় ধারা মূলত “হিমায়িত পন্য” সমতুল্য। যদি এমন হত পান্ডুলিপি নেই; চরিত্র নেই- কিন্তু নাট্যাভিনয় চলছে। অভিনয়শিল্পী স্বতস্ফূর্ত এবং সৃষ্টিশীল অভিনিবেশ সহকারে তার নিজস্ব চিন্তা ও সমস্যার রূপায়ন ঘটাচ্ছে। তবে অভ্যগত দর্শক কি ক্যাথারসিস মুক্ত থাকবে?
দর্শনের ছাত্র হিসাবে এরিস্টটলের পোয়েটিকস এর আলোকে ক্যাথারসিস অভিধাকে নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করতে গিয়ে মোরিনো আবিস্কার করেছিলেন যে, নাট্যাভিনয় উপভোগ করে দর্শক চরিত্রের প্রতি একাত্ব হয় এবং নবতর আত্ম উপলব্দি অর্জন করে। কিন্তু অভিনয়শিল্পী অভিনিত চরিত্রের সামগ্রিক প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ রূপে নিজেকে মুক্ত করতে সমর্থ হন না। প্রকারান্তরে অভিনয়শিল্পীর উপর বিভিন্ন সময়ে অভিনিত চরিত্রের অন্তরাত্মার প্রভাব ভগ্নাংশ তথা অখন্ডায়িতরূপে তাদের অভ্যন্তরে রয়ে যায়। যার প্রভাবে অভিনয়শিল্পীগণ প্রায়সই “হিসট্রিওনিক নিউরোসিস’ – এ ভোগেন। যা তাদের ব্যক্তিগত জীবনকে করে তোলে ভারসাম্যহীন।
জীবন নাট্য মঞ্চে প্রত্যেক মানুষই ইমপ্রোভাইজিং এ্যাক্টর। এই বিশ্বাসে বিশ্বাসী মোরিনো ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে ভিয়েনায় অভিনয়শিল্পীদের এই করুণ পরিণতি থেকে মুক্তি দিতে খুঁজছিলেন এমন একটি নতুন ও ভিন্ন কাঠামো; যার মধ্যে দিয়ে বিকাশ ঘটবে এমন এক থিয়েটার- এর যেখানে গুরুত্ব পাবে সৃজনশীলতা ও স্বতস্ফূর্ততা এবং তৈরী হবে মনের গভীরতম স্তরের সাথে নিবিড় যোগাযোগ এবং স্বাভাবিকের চেয়ে আরো বেশী জীবন্ত, সমৃদ্ধ ও সামর্থ অনুযায়ী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী ভোক্তা(অভিনয় শিল্পী) এবং উপভোক্তা(দর্শককুল) -এর জীবনকে সাবলীল করে তুলবে । অর্থাৎ বিকাশ ঘটাবে থিয়েটার অব স্পনটিনিউটি ঘরণার।
যে নাট্য ঘরণাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে মোরিনো ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে ভিয়েনায় গড়ে তোলেন থিয়েটার অব স্পনটিনিউটি। ১৯২২ থেকে ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত থিয়েটার অব স্পনটিনিউটি কর্তৃক পরিচালিত কার্যক্রমের মাধ্যমে মোরিনো যেমনি অভিনয়শিল্পীদের ‘হিস্ট্রায়নিক নিউরোসিস’ থেকে পরিত্রাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন; তেমনি থিয়েটারকে দিয়েছিলেন পান্ডুলিপির দাসত্ব থেকে মুক্তি। ইমপ্রোভাইজেশনাল থিয়েটার এসময় রূপান্তরিত হয় থিয়েটার অব থেরাপি রুপে। যার পরিণত রূপ হল ‘সাইকোড্রামা’।
সমসাময়িক বিখ্যাত অভিনেত্রী বারবারা একই চরিত্রে বার বার অভিনয় করার ফলে ‘হিস্ট্রায়নিক নিউরোসিস’ রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। বারবারা ইস্টারের ফ্যাশন প্লেতে পরিশুদ্ধ নারীত্বের মডেল রুপে মাদার ম্যারীর ছবি আঁকাতেন একনিষ্ট হয়ে। যা তার মধ্যে স্থায়ী অবয়ব নিয়ে বসবাস করতে করতে ‘হিস্ট্রায়নিক নিউরোসিস’ এ পরিণত হয় । মোরিনো এই পরিস্থিতি থেকে বারবারাকে মুক্তি দিতে লিভিং নিউজপেপার নাট্য ধারায় কাজ করতে গিয়ে তাকে একটি পতিতা চরিত্রে অভিনয় করান। কারণ মোরিনো মনে করতেন পতিতা হিসাবে বারবারা যখন নতুন নতুন খদ্দেরের মুখোমুখী হবে তখন তার মধ্যে জন্ম নেবে সৃষ্টিশীলতার অপার সম্ভাবনা। কার্যত ঘটেছেও তাই; বারবারা পতিতা চরিত্রটিতে স্বতস্ফূর্ততার সাথে সৃজনশীল অভিনয়শিল্পীর স্বাক্ষর রাখতে সমর্থ হয়েছিলেন এবং পর্যায়ক্রমে ‘হিষ্ট্রায়নিক নিউরোসিস’ রোগ থেকে অবমুক্ত করেছিলেন নিজেকে । মোরিনো এই নাট্য প্রচেষ্টার এক পর্যায়ে বারবারার স্বামী জর্জকেই অংশগ্রহণ করান জনৈক খদ্দের চরিত্রে। ফলে তারা সমর্থ হয়েছিল চমৎকার এক চিত্র দৃশ্যায়িত করতে; যা ছিল হৃদয়গ্রাহীও বটে। পরবর্তীতে মোরিনো এই অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণকে কাজে লাগিয়ে বিবাহিত দম্পত্তিদের উপর প্রয়োগ করে ‘ম্যারাইটাল থেরাপি’। সত্যিকার অর্থে থিয়েটার -এর সেই কাঠামো হয়ে উঠেছিল থেরাপির ফলপ্রসূ কৌশল হিসাবে; যা একই সাথে এনে দেয় অভিনয়শিল্পী ও দর্শকের উপর কার্যকরভাবে প্রয়োগ সাফল্য ।
মোরিনো মনোস্থির করেছিলেন থিয়েটার-এর এই প্রতিবিধানমূলক কাঠামেরার পরিচর্যাই হবে তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টা। যেখানে এই ধারার নাট্যক্রিয়া একই সাথে অভিনয়শিল্পী ও দর্শকের উপর সৃষ্টি করবে একটি থেরাপিউটিক অভিপ্সা। সমালোচকগণ ‘মোরিনোর ডীপ ইর্ন্টালেকচুয়াল ন্যাচারাল ক্যাথারসিস’ অভিধা হিসাবে এই পর্যায়টিকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন ।
১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দ মোরিনো ভিয়েনা ছেড়ে চলে যান আমেরিকায়। মূলত আমেরিকায়ই তিনি তাঁর নাট্য চিন্তাগুলোর চূড়ান্ত বিকাশ ঘটান। তাঁর নিজের মত হল ঃ ‘সাইকোড্রামা কনসিভ করেছিল ভিয়েনায় কিন্তু জন্মগ্রহণে করেছিল আমেরিকায়। ’
যুথবদ্ধ শিল্পের প্রকাশ পরিলক্ষিত হয় আলোচ্য থিয়েটার অব স্পনটিনিউনিটি তথা সাইকোড্রামার অনুশীলন প্রক্রিয়ায়। যেখানে দর্শক ও অভিনয়শিল্পীকে পৃথক না করে পারস্পরিক সহযোগীতার মধ্য দিয়ে ঘটে ভাবের বিমোক্ষণ বা ক্যাথারসিস।
যা প্রচলিত থিয়েটার চর্চায় সম্ভব নয়। কারণ নানাবিধ সীমাবদ্ধতার পরাকাষ্টায় শিল্পীর সৃজন শীলতার পূর্ণ বিকাশ এই থিয়েটারে ঘটে না, যদিও দর্শকের ক্যাথারসিস হয়। কিন্তু স্বয়ং শিল্পী তা কতটুকু উপলগ্ধী করতে পারে তা প্রশ্ন স্বাপেক্ষ। এই বৈপারিত্যের উর্ধে উঠে মোরিনো গবেষণায় ব্রতী হয়ে যে স্বতস্ফূর্ততার থিয়েটার- এর ভূবন সৃষ্টি করেন; তা বর্তমান বিশ্বে নানা রুপে ও সরে সমৃদ্ধ হয়ে- মনোবিশ্লেষক নাট্য বা ব্যাপক অর্থে থেরাপিউটিক নাট্যক্রিয়া হিসাবে সফলভাবে চর্চিত হচ্ছে।
প্রকৃতপক্ষে সাইকোড্রামা হচ্ছে সংকটের কার্যকারণ খুঁজতে স্বতঃস্ফুর্ততার মধ্যে দিয়ে চরিত্রাভিনয়ের বিশেষ এক প্রক্রিয়া। যে প্রক্রিয়া অংশগ্রহণকারীদের শরীর, মন ও অন্তরাতœাকে প্রসন্ন এবং প্রশান্ত করে পারস্পরিক আন্তঃসম্পর্ক বৃদ্ধির মাধ্যমে সম্মিলিতভাবে জীবন অন্বেষণের উপায় উপস্থাপনের পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনের অপরাপর চরিত্রের বা ব্যক্তির সাথে স্বতস্ফূর্ত ও যৌক্তিক জীবনাচারের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে দক্ষতা বৃদ্ধির সহায়তা করে। ব্যক্তিক ও সামষ্টিক স্বতস্ফূর্ততাকে জাগ্রত করে সক্রিয়তার মধ্য দিয়ে সৃজনশীলতার বিস্তার ঘটানোই হচ্ছে সাইকোড্রামার মূল উদ্দেশ্যে।
প্রথাগত থিয়েটারের নির্দেশকের মতই; তবে শাসক নয়, সহায়ক হিসাবে একজন সঞ্চালকের তত্ত্বাবধানে চলে সাইকোড্রামার প্রয়োগ প্রক্রিয়া। যে প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করেন- কেন্দ্রীয় চরিত্র বা প্রোটাগোনিষ্ট, সহযোগী চরিত্র বা ওগজিলিআরি ইগো এবং দর্শক। সুনির্দিষ্ট মঞ্চ ও দর্শকাসন এই প্রক্রিয়ায় অনিবার্য না হলেও; স্বাস্থ্যকর ভাবে অংশগ্রহণকারীদের সহঅবস্থান উপযোগী একটি কার্যক্ষেত্র অত্যাবশ্যক।
সৃজনশীল বিন্যাস ও বিনির্মাণের মধ্যে দিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট পথ পরিক্রমণের সুবিধার্থে কেন্দ্রীয় চরিত্র বা প্রোচাগোনিষ্ট (স্বতর্স্ফূত ভাবে যিনি ব্যক্তি জীবনের কোন বিশেষ মূহুর্ত বা ঘটনা উপস্থাপন করে থাকেন) নিজের নাট্য ক্রিয়াকে পরিপূর্ণতা দিতে বা জীবন সত্যকে চিত্রায়িত করতে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে থেকেই এক বা একাধিক সহযোগী চরিত্র ও ওগজিলিআরি ইগো -এর সহযোগীতা নিয়ে থাকে। কখনও কখনও ‘ইনার ভয়েস’ রুপে কেন্দ্রীয় চরিত্র বা প্রোটাগোনিষ্ট অনুভূতি গুলোকে প্রাণ দিতে তথা ক্রিয়া- প্রতিক্রিয়ায় অংশ নিতে, সমর্থনযোগাতে সহযোগী চরিত্র বা ওগজিলিআরি ইগোদের ব্যবহার করা থাকে। ওগজিলিআরি ইগো বা সহযোগী চরিত্র ‘ডাবল’ হিসাবে কেন্দ্রীয় চরিত্র বা প্রোটাগোনিষ্টের অন্তরাতœার বিভিন্ন সত্ত্বা হিসাবেও ভূমিকা গ্রহণ করে থাকে সাইকোড্রামায়।
তাৎক্ষণিক ও স্বতস্ফূর্ত এই নাট্যভিনয়র অন্তে দর্শক উপস্থাপিত নাট্যক্রিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট স্বীয় অভিজ্ঞতার ঐক্য-অনৈক্য, মিল-অমিল প্রশ্নোত্তর পর্বের মাধ্যমে শেয়ার করে থাকেন। এই পর্বে অংশগ্রহণকারী সকল পক্ষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আদান প্রদান করে সামষ্টিক মানসিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা হয়। যা একটি দলগত উপলগ্ধির জন্ম দেয়। তাই সাইকোড্রামা গ্রুপ সাইকোথেরাপি হিসাবে স্বীকৃত।
সঞ্চালক তথা নির্দেশক পুরো প্রয়োগ প্রক্রিয়াটি সম্পাদনে নেতৃত্ব দেন বটে; তবে শুধুমাত্র অনুঘটর রূপে পথ প্রদর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে । সূচনা থেকে সমাপ্তি পর্যন্ত একটি অনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে সাইকোড্রামার সেশন বা অধিবেশনটি সম্পন্ন হয়। যেখানে অংশগ্রহণকারীগণ শারিরীক বা দৈহিক অথবা উভয়ের সমন্বয়ে সম্পাদন করেন নানান নাট্যক্রিয়া। সত্যিকার অর্থে পরিচালিত পর্বসমূহের মধ্যে দিয়ে জাগ্রত করা হয় অংশগ্রহণকারীদের স্বতস্ফূর্ততা ও সৃজনশীলতা।
ওয়ার্ম আপ বা কর্ম প্রস্তুতি শীর্ষক এই কৃত্যমূলক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে সঞ্চালক অংশগ্রহণকারীদের সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়ম নীতির মধ্য দিয়ে প্রক্রিয়াটি সুসম্পন্ন করতে চুক্তিবদ্ধ করান। যার মধ্যে প্রধানতম প্রসঙ্গগুলো হলো-
ক) স্বেচ্ছায় স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণ বা ভলেন্টারী পার্টিসিপেশান ঃ যেহেতু ব্যক্তির স্বতস্ফূর্ততা ও সৃজনশীলতার উপর নির্ভরশীল করেই বিকশিত হয় সাইকোড্রামার প্রযোগ প্রক্রিয়া। তাই ব্যক্তির স্বাধীন মত প্রকাশ এবং ইচ্ছা ও অনিচ্ছা এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যাতে স্বেচ্ছায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণকারীগণ অংশগ্রহণ করে তা নিশ্চিত করা হয়। কেউ কাউকে এই বিষয়ে প্রণোদনা বা উৎসাহ দেওয়ার উদ্যোগ নিতে পারবে না। বিষয়টি একেবারেই একান্ত এবং স্বতন্ত্রভাবে ঘটবে এই নিশ্চয়তা বিধান করার জন্য সকলে একমত হওয়া এবং তা অনুসরণ করা।
খ) অন্যের মতামতের উপর মন্তব্য নিরপেক্ষ থাকা এবং নিরপত্তা বিধান করা অর্থাৎ ননজাজমেন্টাল রেসপেক্ট ও সেফটিঃ অংশগ্রহণকারীদের আচরণ ও মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে নিরপেক্ষ থেকে পরস্পর পরস্পরের উপস্থাপনা বা মতামতের প্রতি মনোযোগী হবে এবং মতামত ও অনুভূতির প্রতি নিরপেক্ষ মন্তব্যহীন অভিব্যক্তি প্রকাশ করবে। যাতে ব্যাক্তি নিজের আবেগ ও অনুভূতি সঠিক ও কার্যকরভাবে তুলে ধরতে সমর্থ হয়। সর্বপোরি বিশেষভাবে সজাগ ও সচেষ্ট থাকতে হবে যেন অন্যর নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। যাতে দলের কেউই নিরাপত্তাহীনতা অনুভব না করে। এই নিরাপত্তার প্রসঙ্গটি তিনটি স্তরে নিশ্চিত করা জরুরী।
১। সামাজিক নিরাপত্তা
২। মানসিক নিরাপত্তা
৩। শারীরিক নিরাপত্তা
গ) গোপনীয়তা বা কনফিডেনশিয়ালিটি ঃ সাইকোড্রামায় কেন্দ্রীয় চরিত্র বা প্রেটাগোনিষ্টের পাশাপাশি অপরাপর অংশগ্রহণকারীদের ব্যক্তিগত জীবনের অনেক অভিজ্ঞতা উঠে আসে। যা দলের বাইরে প্রকাশ পাবে না; এমন নিশ্চয়তা বিধানের নিমিত্তে সকল অংশগ্রহণকারী চুক্তিবদ্ধ হন। যাতে ব্যক্তি তার একাধিক ব্যক্তিসত্ত্বাকে এবং ব্যক্তিগত আনন্দ-বেদনা, কষ্ট দলের সামনে উপস্থাপনে স্বাচ্ছন্ধ অনুভব করেন । কার্যত এই ক্ষেত্রে ব্যক্তির অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়ে সামষ্টিক অস্থিত্বের আবহ ব্যক্তিকে একা তাড়িত না করে দলের মধ্যে প্রবাহিত হয়। গোপনীয়তার অঙ্গীকার ব্যক্তি বা সমষ্টিকে উজ্জিবিত করে, প্রণোদনা যোগায় তার বা তাদের অন্তরাতœাকে উন্মোচিত করতে।
উল্লেখিত কৌশলসমূহ সংযোগ ব্যক্তির সহযোগী মনোভাব বা সম্পূরক আচরণ বা ভূমিকাকে সামাজিক, শারীরিক ও অন্তর্নিহিত অভিপ্রায় -এর বিবেচনায় চিহ্নিত করে তাদের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া ঘটানোর সুযোগ সৃষ্টি করা হয়। যে সুযোগ ব্যক্তিকে তার মধ্যে অন্তর্গত রোল বা ভূমিকাকে বিশ্লেষণ করার অভিপ্রায় তৈরী করে। এই রোল বা ভূমিকা মূলতঃ তিন ধরণের হয়ে থাকে। যেমন-
অ) সোমাটিক রোল- ব্যক্তির জৈবিক প্রবৃত্তি থেকে সৃষ্ট ভূমিকা বা সত্ত্বাকেই সোমাটিক রোল বলা হয়।
আ) সোশ্যাল রোল- কাজের সম্পকর্, পেশাগত সম্পর্ক এবং সামাজিক সম্পর্কের বিবেচনায় ব্যক্তির মধ্যে যে- ভূমিকা বা অবস্থা ও অবস্থান সৃষ্টি হয়; তাই সোশ্যাল রোল।

Posted in নির্বাচিত কলাম | Comments Off on থিয়েটার অব স্পনটিনিউটি

সমস্যা জটিল, স্থায়ী সমাধান কাম্য

ddddddসৈয়দ আবুল মকসুদ

সাগরে ভাসমান মানুষদের বাঁচার করুণ আকুতিআমাদের অনেক প্রবীণ নেতার রাজনৈতিক জ্ঞান অসামান্য ও প্রজ্ঞা প্রচুর, দূরদর্শিতারও শেষ নেই। কিন্তু মালয়েশিয়া সম্পর্কে তাঁদের যে ধারণা, তা অগভীর। শুধু তাঁরাই নন, অনেক বাম তাত্ত্বিক ও অর্থনীতিবিদ পর্যন্ত মালয়েশিয়াকে উন্নয়নের রোল মডেল বা আদর্শ মনে করেন, তা তাঁদের রচিত উপসম্পাদকীয় রচনা থেকে জানা যায়। তত্ত্বগত ও বৈপ্লবিক বিদ্যায় তাঁরা প্লেখানভ বা ট্রটস্কির চেয়ে কিঞ্চিৎ কম হতে পারেন, কিন্তু মালয় দ্বীপপুঞ্জের মূল জায়গাটা সম্পর্কে তাঁদের ধারণা খুব স্পষ্ট, তা মনে হয় না।
কোনো দেশের আর্থসামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস সামগ্রিকভাবে পর্যালোচনা না করে সেই দেশের একটি মস্ত বড় উঁচু দালান দেখে তার তারিফ করা ও তাকে রোল মডেল বানানো স্রেফ বোকামি। আমাদের অনেক নেতা, বুদ্ধিজীবী ও উপসম্পাদকীয় রচনা লেখকেরা সারল্যবশত তা করছেন। যেমন, দুই দিন আগে এক মাননীয় মন্ত্রী দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা দিয়েছেন, গণতন্ত্র, আইনের শাসন, ন্যায়বিচার কোন ছাই, মাহাথির আমাদের আদর্শ, তাঁর পথই আমাদের পথ, তাঁর দেখিয়ে দেওয়া পথেই আমরা এগিয়ে যাব, আমাদের এই দুর্বার গতিতে যাত্রা কে রুধিবে দিয়ে বালির বাঁধ। তাঁর এই বার্তা টিভির পর্দা থেকে ধ্বনিত হওয়ার পর আমার মনে পড়ল একদা গুলিস্তান-তোপখানা রোড থেকেই ঘোষিত হতে শুনেছি: চেয়ারম্যান মাও আমাদের চেয়ারম্যান, চেয়ারম্যান মাওয়ের পথই আমাদের পথ। মাননীয় মন্ত্রী সেই সময় মালয় নেতা মাহাথিরের জয়ধ্বনি দিলেন, যখন মালয়েশিয়ামুখী বাঙালি ও মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা মালয় উপকূলে নৌকায় দানাপানি না পেয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছে। তাদের উপকূল থেকে তাড়িয়ে দিচ্ছে দূর দূর করে।
মাহাথিরীয় পথ বাঙালির একাত্তরে গৃহীত পথের সম্পূর্ণ বিপরীত পথ। একাত্তরে বাংলাদেশে গণহত্যা করতে গিয়ে ইয়াহিয়া-টিক্কা-ফরমান যে অর্থ ব্যয় করেছেন, আমরা মুক্তিযুদ্ধ না করলে ওই অর্থ দিয়ে বাংলাদেশে বড় বড় দালানকোঠা বানানো যেত। দালানকোঠা এক বস্তু আর গণতন্ত্র ও মানবাধিকার আর এক জিনিস। আমরা গণহত্যা চাইনি, গণতন্ত্র চেয়েছি। মাহাথিরের যে পথ, ওই পথে রাস্তাঘাট-দালানকোঠা হয়, সেখানে কোনো দিনও একজন বিশ্বমানের বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক, চল”িচত্র নির্মাতা বা সত্যসাধক হতে পারবেন না।
মালয়েশিয়ার আজকের যে আর্থসামাজিক উন্নতি, তার পেছনে বাঙালি অভিবাসী শ্রমিকদের অবদান যে কতটা, তা মালয়ের শাসকেরাই ভালো জানেন, বাংলাদেশের শাসকেরা নন। আজ বাঙালি ও রোহিঙ্গা শ্রমিকবোঝাই নৌকা তাঁরা তীরে ভিড়তে দিচ্ছেন না। অথচ আজকের তাঁদের ঐশ্বর্যের পেছনে লাখ লাখ বাঙালি শ্রমিকের ঘাম অপরিমেয়। এখনকার মতো অতীতেও বাংলাদেশিরা সেখানে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কাজ করতে গেছে, ভিক্ষা করতে যায়নি। ওরা সেখানে গিয়ে উঁচু উঁচু দালান বানিয়েছে, রাস্তায় বসে ইট ভেঙে খোয়া বানিয়েছে, রাস্তাঘাট বানিয়েছে, পামের বাগানে কাজ করেছে বলে অত পাম অয়েল তারা আমাদের দেশে রপ্তানি করতে পেরেছে, রাবার বাগানে কাজ করেছে বলে রাবার ও রাবারজাত দ্রব্য রপ্তানি করে বস্তা বস্তা রিংগিত রোজগার করতে পেরেছে, নারকেলের বাগান ও গভীর অরণ্যে কাজ করেছে বলে টিম্বার রপ্তানি করতে পারছে। হতভাগ্য বাংলাদেশি, মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ও ভারতীয় শ্রমিকেরা মালয়কে দিয়েছে অনেক সমৃদ্ধি।
পৃথিবীর অভিবাসনের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, বৈধ ও অবৈধ দুভাবেই অভিবাসন হয়ে থাকে। বরং অবৈধভাবেই বেশি অভিবাসন হয়। যে দেশে জনসংখ্যা বেশি এবং রয়েছে বেকারত্ব, সেখান থেকেই প্রধানত অদক্ষ যুবকেরা গিয়ে থাকে এমন কোনো দেশে, যেখানে শ্রমিকের চাহিদা রয়েছে অথবা যেখানকার অর্থনীতি অপেক্ষাকৃত ভালো। তা ছাড়া, কোনো দেশে কোনো জাতিসত্তার মানুষ অবিচারের শিকার হলে তাদের অনেকে অন্য দেশে পালিয়ে যায়। তুরস্ক থেকে যেমন কুর্দিরা গেছে জার্মানিতে। সেভাবেই রোহিঙ্গারা হয় বাংলাদেশে অথবা মালয়েশিয়ায় অবৈধভাবে যাতায়াত করে। তারা গিয়ে বসে থাকে না, শ্রম বিক্রি করে জীবিকার জন্য রোজগার করে অর্থ। তাদের শ্রম ওই সব দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখে।
আশির দশকের শুরুতে আমি যে অ্যাপার্টমেন্টে ভাড়া থাকতাম, সেখানে ছিল আটটি ফ্ল্যাট। তার পাঁচটিতে থাকতেন কয়েকজন মালয়েশীয় ছাত্রছাত্রী। তাঁরা ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে পড়তে এসেছিলেন। অনগ্রসর মালয়েশিয়ায় ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার প্রভৃতি ছিল না। তাই মালয় সরকার বাংলাদেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে বৃত্তি দিয়ে ছেলেমেয়েদের পাঠাত।
ওদের আমন্ত্রণে আমি কয়েক দিনের জন্য মালয়েশিয়ায় বেড়াতে গিয়েছিলাম। সেই মালয়েশিয়া আর আজকের মালয়েশিয়া এক নয়। কিছুদিন আগেই নির্বাচনের মাধ্যমে মাহাথির বিন মোহাম্মদের দল কোয়ালিশন করে ক্ষমতায় এসেছে। পাহাড় কেটে রাস্তাঘাট ও বড় মসজিদ নির্মাণের কাজ চলছে পুরোদমে। আমার থাকা অবস্থায় কোরবানির ঈদ আসে। আমার সুযোগ হয়েছিল মাহাথিরের সঙ্গে নির্মীয়মাণ মসজিদে নামাজ আদায় করার। তবে সারা দিন ঘুরেও কোরবানি দেওয়ার দৃশ্য আমি কুয়ালালামপুরের কোথাও দেখিনি।
প্রথম প্রধানমন্ত্রী টুংকু আবদুর রহমান মালয়েশিয়ার ভিত্তি স্থাপন করে যান। দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী টুংকু আবদুল রাজাক ভালো শাসক ছিলেন। তাঁর ছেলেই এখন প্রধানমন্ত্রী। তারপর কয়েক বছর ছিলেন দাতুক হোসেন ওন্। তাঁর উত্তরাধিকারী মাহাথির। তিনি মালয়েশিয়াকে একটি উ”চতায় নিয়ে যান। তাঁর অধ্যবসায়, নিষ্ঠা, দেশপ্রেম, সাহস ও সততা বিশ্ববাসীর প্রশংসা (ও নিন্দাও) অর্জন করে। তিনি তাঁর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী, তাঁরই উপপ্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে যে প্রতিহিংসামূলক আচরণ করেন, তা ঘৃণার্হ। শুধু বামপš’ীদের নয়, তাঁর বিরোধীদের নিশ্চিহ্ন করার ক্ষেত্রে তাঁর কর্মকা- খুবই অন্যায়।
তিনি কঠোর হাতে মাদক নিয়ন্ত্রণ করেছেন, সেটা প্রশংসনীয়। তাঁর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মানুষের ওপর যে নির্যাতন করেছে, তার সব খবর পৃথিবীর মানুষ কোনো দিনই জানবে না। বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের অনেকে তাঁর কারাগারে নির্মমতার শিকার হয়েছেন। তাঁর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ঠুরতা ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতার একটি দৃষ্টান্ত এখানে উল্লেখ অপ্রাসঙ্গিক হবে না।
আমার সহকর্মী ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু প্রয়াত অধ্যাপক মোহাম্মদ তৌহিদুল আনোয়ার চুক্তি ভিত্তিতে বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিতে তিনি মালয়েশিয়া সরকারের আমন্ত্রণে কুয়ালালামপুর যান। গভীর রাত। তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন তাঁর হোটেলের কক্ষে। হঠাৎ দুমদাম শব্দে তাঁর ঘুম যে শুধু ভাঙে তা-ই নয়, ভয়ে তিনি কাঁপতে থাকেন। টোকা দিলে দরজা তিনি নিজেই খুলে দিতেন। কিন্তু মালয়েশীয় নিরাপত্তাকর্মীরা হাতুড়ি-শাবল দিয়ে দরজা ভেঙে ফেলেন। ঘরে ঢুকে তারা তৌহিদ আনোয়ারকে লাথি মারাসহ নির্মমভাবে পিটিয়ে থানায় নিয়ে যায়। কিছুই বুঝতে পারেননি তিনি। কয়েক ঘণ্টা পরে তাঁকে জানানো হয় ভুল হয়ে গেছে, তারা অন্য এক অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করতে গিয়েছিল। তৌহিদ যখন হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন তখন কমনওয়েলথ প্রেস ইউনিয়নের চাপে মালয়েশীয় সরকার ক্ষমা চায়। নিউ স্ট্রেইট টাইমস-এ বিরাট খবর হয়েছিল ঘটনাটি। আমিও কড়া প্রতিবাদ করে লিখেছিলাম।
আমার মালয়েশীয় বন্ধুদের সঙ্গে আমি সেলাঙগোর, জোহর, পাহান, কেলাস্তান প্রভৃতি রাজ্য ঘুরেছি। পাহাড় ও বনভূমির আদিম সৌন্দর্য। বহু জায়গায় গিয়ে দেখেছি বাংলাদেশি শ্রমিকেরা পাম ও রাবার বাগানে কাজ করছেন। এক নারকেল বাগানে গিয়ে দেখি আমাদের দেশের কয়েকজন যুবক বুকে চামড়ার একটা বর্মের মতো সেঁটে তরতর করে নারকেলগাছে উঠে নারকেল পাড়ছে। নারকেলগাছগুলো যে খুব উঁচু তা নয়। কিন্তু নারকেল পাড়া খুবই কষ্টকর। তা দেখে কষ্ট পাই। যা হোক, অভিবাসী শ্রমিকেরাই আধুনিক মালয়েশিয়াকে গড়ে তুলেছেন, দেশের নেতৃত্ব দিয়েছেন মাহাথির। তাঁর অনেক নীতিই মানবতাবিরোধী।
অবৈধভাবে মানব পাচারের আমরা ঘোর বিরোধী এবং তার তীব্র নিন্দা জানাই। কিন্তু ওপেন সিক্রেট হলো, অবৈধ অভিবাসীদের অনেক দেশই পছন্দ করে। কারণ, তাদের কম বেতন দিয়ে দাস হিসেবে খাটানো যায় ইচ্ছামতো।
কিছু কিছু স্থায়ী সমস্যা হঠাৎ তীব্র আকার ধারণ করে। তখনই তা মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং আলোচ্য বিষয় হয়ে ওঠে। কোনোরকমে সমস্যাটির সাময়িক সমাধান দিলেও তা থেকেই যায়। সে জন্য দরকার বিচক্ষণতার সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের চেষ্টা করা। বাংলাদেশি ও মিয়ানমারের রোহিঙ্গা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সমস্যাটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। এর সমাধান তাৎক্ষণিকভাবে হবে না। এই মুহূর্তে জরুরি মাঝদরিয়ায় যারা রয়েছে এবং ক্ষুধা-তৃষ্ণায় মারা যাচ্ছে, তাদের বাঁচানোর ব্যবস্থা করা।
বাংলাদেশ থেকে মানব পাচার রোধে সরকারের পদক্ষেপ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমামসহ অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি আমাকে বলেছেন, কোস্টগার্ড ও বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সদস্যদের কড়া নজর রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে আমার ধারণা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা যদি এ ব্যাপারে শক্ত ভূমিকা না রাখেন, তাহলে মানব পাচার বন্ধ করা যাবে না।
থাইল্যান্ডের গহন অরণ্যে গণকবরের সন্ধান পাওয়ার পর সন্দেহভাজন মানব পাচারকারীদের ‘ক্রসফায়ারে’ দেওয়া হয়েছে। ক্রসফায়ার সমাধান নয়। এক প্রতিবেদনে জানা যায়, ‘সরকারদলীয় সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির আত্মীয়স্বজন, উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতা এবং পুলিশ সদস্যদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ম“ কাজে লাগিয়ে কক্সবাজার থেকে প্রায় প্রতি রাতেই মালয়েশিয়ায় পাচারের উদ্দেশ্যে ট্রলারে তোলা হচ্ছে বিপুলসংখ্যক মানুষ।ৃজলপথে মানব পাচার খাতে এ পর্যন্ত অন্তত ৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকার মুক্তিপণ লেনদেন হয়েছে।ৃতবে বরাবরই কক্সবাজার জেলা পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাদের কৌশলের কারণে আড়ালেই থাকছে গডফাদাররা। মানব পাচারের পেছনের মূল হোতা ও তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের নাম আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানলেও তা গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলোয় আসছে না।ৃপুলিশের অনুসন্ধান প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে ১৫ থেকে ২০ হাজার লোক অবৈধভাবে সমুদ্রপথে পাচার হয়েছে।’ [কালের কণ্ঠ, ১৭ মে]
অবৈধ মানব পাচার একটি অতি জটিল মানবিক সমস্যা। এটি আন্তরাষ্ট্রীয় সমস্যা। একসময় এই বিষয়টি কূটনৈতিক জটিলতার জন্ম দিতে পারে। সুতরাং অবিলম্বে স্থায়ীভাবে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়াই হবে সুবুদ্ধির কাজ।

Posted in নির্বাচিত কলাম | Comments Off on সমস্যা জটিল, স্থায়ী সমাধান কাম্য

প্রেস ক্লাবে আওয়ামী লীগ-জামায়াত ঐক্য!

20130427113539নঈম নিজাম: জাতীয় প্রেস ক্লাবের নির্বাচন ও কমিটি গঠন প্রসঙ্গে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকার সম্পাদক নঈম নিজাম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। এতে তিনি লিখেছেন, জাতীয় প্রেস ক্লাবের নির্বাচনের দায়িত্বে নিয়োজিত নির্বাচন কমিশনের সকল সদস্য পদত্যাগ করলেন। তাদেরকে বলা হয়েছিলো আওয়ামী লীগ, জামায়াত ও বিএনপির সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতারা বিনা ভোটে প্রেস ক্লাব দখল চান। ঐক্য হয়েছে আওয়ামী লীগ-জামায়াতের। আওয়ামী লীগ সভাপতি, জামায়াতে ইসলামী সাধারণ সম্পাদক এক প্যানেল। নির্বাচন কমিশন অন্যায় আব্দার মানতে নারাজ। তারা ভোট করাতে চেয়েছিলেন। তাই তাদেরকে বাধ্য করা হলো পদত্যাগে। বেশ বেশ! জাতির বিবেক সেজে টক শোতে অথবা সংবাদপত্রে আমরা গণতন্ত্রের ছবক দেবো, বড় বড় কথা বলবো,আর নিজেরা ভোটাধিকার ধ্বংস করবো। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার রক্ষক সেজে ঐক্য করবো জামায়াতের সঙ্গে। অসাধারণ!

Posted in নির্বাচিত কলাম | Comments Off on প্রেস ক্লাবে আওয়ামী লীগ-জামায়াত ঐক্য!

ভারতের দালালি বনাম বিদ্বেষ

masud-majumder1দ্বিতীয় স্থল সীমান্তচুক্তি হয়েছিল ১৯৭৪ সালে। ইন্দিরা-মুজিব চুক্তিখ্যাত সেই সমঝোতার বাস্তবায়ন বাংলাদেশ শুরু করে ৪১ বছর আগে। সংবিধানে তৃতীয় সংশোধনী এনে চুক্তির বাস্তবায়ন হিসাবে তাৎক্ষণিক বেরুবাড়ির মালিকানা ছেড়ে দিতে বাংলাদেশ কার্পণ্য করেনি। ভারত এর বিপরীতে তিনবিঘা করিডরের মালিকানা দেয়নি। সীমান্ত বিল রাজ্য ও লোকসভায় সর্বসম্মতিক্রমে পাস করে চুক্তি বাস্তবায়নের পথে সাংবিধানিক অন্তরায় দূর করল মাত্র। এটা কার কূটনৈতিক বিজয় হলো সেটা বিবেচনার চেয়েও ভারত তার দায় মুক্তির প্রক্রিয়া শুরু করল। এটা বাংলাদেশের প্রতি করুণা কিংবা দয়া নয়, ন্যায়সঙ্গত সঙ্কট সমাধানের প্রতি বিলম্বিত সম্মান প্রদর্শন।
ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি নামে পরিচিত ১৯৭৪ সালের স্থল সীমান্তচুক্তি বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ শুরু থেকেই একটা প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে। কংগ্রেস সরকার জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত করতে না পারার প্রেক্ষাপটে ২০১৪ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের অংশ হিসেবে ৬৮ বছর ধরে ঝুলে থাকা সমস্যাটি সমাধানের উদ্যোগ নেয়। শুরু থেকে আপত্তি করে আসা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতাও শেষ পর্যন্ত সম্মতি দেন।
ইতিহাস হচ্ছে, ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর থেকেই পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে স্থলসীমান্ত সমস্যার সমন্বিত সমাধানে পৌঁছার উদ্যোগ নেয়া হয়। ১৯৫৮ সালের নেহরু-নুন চুক্তি এবং ১৯৭৪ সালের স্থল সীমান্ত চুক্তির মাধ্যমে সীমানা জটিলতার সমাধান খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে। ১৯৭৪ সালের চুক্তি অনুযায়ী, এক দেশের ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে অন্য দেশের ছিটমহল থাকলে সেটির মালিকানা পরষ্পরকে হস্তান্তরের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হবে। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হবে বেরুবাড়ি এবং আঙ্গরপোতা দহগ্রাম ছিটমহল। সমঝোতা অনুযায়ী দক্ষিণ বেরুবাড়ির মালিকানা বাংলাদেশের হলেও সেটি ভারতকে হস্তান্তর করা হবে আর দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ভারতীয় ভূখণ্ডের দ্বারা ঘেরাও থাকলেও সেটি বাংলাদেশের মালিকানায় থাকবে। আর এই ভূখণ্ডে যাতায়াতের জন্য ভারতের মালিকানায় থাকা তিনবিঘা করিডরের মালিকানা বাংলাদেশকে হস্তান্তর করা হবে। এই চুক্তি অনুসারে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ছিটমহলে যাওয়ার জন্য ভারত বাংলাদেশকে তিনবিঘা করিডরের মালিকানা না দিয়ে কেবলমাত্র শর্তসাপেক্ষে ব্যবহার করতে দিতে রাজি হয়। প্রাথমিকভাবে দৈনিক ১২ ঘণ্টা করে ব্যবহারের সুযোগ পায় বাংলাদেশীরা। ২০১১ সালের স্বাক্ষরিত প্রটোকল অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোর কোনো বাসিন্দাকেই নিজ বসতবাড়ি ও জীবিকা ছেড়ে অন্যত্র যেতে দেয়া হয়নি। নিজ বসতবাড়িতে পরাধীন ছিটমহলবাসীর জন্য এবং দুই দেশের জন্য বিব্রতকর ও জটিল সমস্যার সমাধান হোক, এর ভেতর দালালি ও বিদ্বেষ না খোঁজাই উত্তম। তাই ভারত বিরোধিতার সস্তা ট্রামকার্ড খেলা ও বিদ্বেষের অবন্ধুসুলভ আচরণ বন্ধ করার উদ্যোগ ভারতকেই নিতে হবে।
ভারতে বিল পাসের সাথে বাংলাদেশে ভারতবিদ্বেষ, বিরোধিতা ও দালালির যে অভিযোগ উঠল, তার জবাব খুঁজে পাওয়া দরকার। জানা মতে, একটি দেশের প্রতি আরেকটি দেশের জনগণের কোনো বিদ্বেষ থাকে না। ব্যতিক্রম ইসরাইল। অবশ্য ভারত-ইসরাইল সম্পর্ক নিবিড়। অভিযোগ আছে মুসলিম বিশ্বের ব্যাপারে দেশ দু’টির অবস্থান অভিন্ন। ইসরাইল অনেক কারণে মুসলিম বিশ্ব ও সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের ঘৃণা কুড়ায়। অনেক রাষ্ট্রের সাথে দেশটির সম্পর্ক শত্রুরাষ্ট্রের মতো। এ ছাড়া পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রই অন্য কোনো রাষ্ট্রের স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নয়। এক রাষ্ট্রের সরকারের সাথে অপর রাষ্ট্রের সরকারের শত্রুতা-মিত্রতা থাকে, সেটা রাষ্ট্রের সাথে নয়। কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপড়েন থাকে তাও সরকারের কারণে। জনগণের সাথে সব সময় টানাপড়েন চলতে থাকার নজির কম। এই যুগে পিপলস টু পিপলস কন্টাক্টকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়, যা ভারত এড়িয়ে চলে এবং সরকারের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে চায়।
বিনা কারণে বাংলাদেশের মানুষ ভারতবিদ্বেষী হতে যাবে কোন দুঃখে। জনগণ বিদ্বেষীও নয়, দালালও নয়। দালালি করে এক সরকার আরেক সরকারের সাথে। কখনো দল ও গোষ্ঠী স্বার্থে, কখনো ক্ষমতার স্বার্থে। যেমন ভারতীয় কংগ্রেস ও আওয়ামী লীগের সাথে সম্পর্কটা জনগণের সাথে জনগণের সম্পর্কের ঊর্ধ্বে উঠে যায়। কংগ্রেস সরকারে থাকলে নেপালি কংগ্রেসের মতো আওয়ামী লীগ সম্পর্কটাকে অনুগত ও দালালি স্তরে উন্নীত করে। তাতে দেশের স্বার্থ সংরক্ষিত থাকে না। দল লাভবান হয়, রাষ্ট্র ও জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জনগণের সার্বভৌম ধারণা ও মর্যাদায় আঘাত আসে। এমন অসম ও একতরফা বন্ধুত্ব বাংলাদেশীরা সন্দেহের চোখে দেখে।
কোনো পড়শি দেশ অপর পড়শি দেশকে বৈরী অবস্থানে দেখতে চায় না। এটা বাংলাদেশের জনগণেরও স্বাভাবিক চাওয়া। দুর্ভাগ্য, ভারত এই চাওয়ার চেয়ে দল ও গোষ্ঠী বিশেষকে অনুগত রাখতে চায় বেশি। চার দিকের পড়শিদের নিজেদের বাজার ও স্যাটেলাইট কান্ট্রির মর্যাদায় নামিয়ে দাপুটে রাডারের আওতায় রাখতে চায়। তাই জনগণের মনে বিরূপ দাগ কাটে। সাধারণের মনটা বিষিয়ে ওঠে। একসময় জনগণ বিদ্বেষী হয়ে উঠতে পারে। ভারতের সব পড়শি রাষ্ট্রের জনগণ দাদাগিরি অপছন্দ করতে শুরু করে। নেপালে ভূমিকম্পবিধ্বস্ত জনপদের মানুষ ভারতের দেয়া দানকে উচ্ছিষ্ট ভাবতে যাওয়া একেবারে অর্থহীন বা বিদ্বেষের কারণে নয়। যথেষ্ট যুক্তিও রয়েছে। বাংলাদেশের ব্যাপারেও দেয়া অনেক প্রতিশ্র“তি ভারত পূরণ করেনি। চাল দেবে বলেও দেয়নি। নজিরগুলো বাংলাদেশীরা ভুলে যেতে চায় না।
ঐতিহাসিকভাবে ভারত বাংলাদেশের জনগণের কাছে একতরফা প্রভুভক্তি আশা করতে পারে না। সমমর্যাদার ভিত্তিতে বন্ধুত্ব আশা করাই প্রত্যাশিত। বাংলাদেশের মানুষ ভালো করে জানে পড়শি পাল্টানো যায় না। প্রয়োজনে নিজেরা পাল্টে যেতে পারে। যেমন বাংলাদেশের জনগণ ইচ্ছে করলে পুরো মানচিত্র নিয়ে আরব-পারস্য কিংবা ইউরোপ-আমেরিকা-আফ্রিকার সাথে নিয়ে বসিয়ে দিতে পারে না। ভারতও পারবে না সাগর পাড়ি দিয়ে মানচিত্রটা নিয়ে অন্যত্র নিয়ে যেতে। তাই সহ অবস্থান জরুরি। এই জরুরি কারণেই আমাদের পানির ন্যায্য হিস্যা, ১১১টি ছিটমহল, ৫ হাজার ৪৪ একর অপদখলীয় জমি আমাদের পেতে হবে। ভারত বিনিময়ে স্বাভাবিকভাবে পেয়ে যাবে ৫১টি ছিটমহল, ২ হাজার ৭৭৭ একর অপদখলীয় জমি। বেরুবাড়ি মগজে রেখে, তিনবিঘা বিরোধও নিষ্পত্তি হতে হবে। দালালি কিংবা বিদ্বেষ-বিরোধিতা ছাড়াই বাণিজ্যিক লেনদেনও ভারসাম্যমূলক করতে হবে। অভিন্ন নদীর পানি পেতে হবে আন্তর্জাতিক রীতি অনুযায়ী। এসব পারস্পরিক স্বার্থের বুঝাপড়া, দালালি বা বিদ্বেষের বিনিময়ে নয়।
তবে ক্ষমতায় থাকা, রাখা ও অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে কারো নাক গলানো কিংবা গলাতে দেয়া উচিত নয়। শ্রদ্ধা, সম্মান, সম্প্রীতি ও বন্ধুত্বের মর্যাদাটা দুই দেশের জন্য কল্যাণকর। সুজাতা সিং ও পঙ্কজ সরণেরা এ সীমা মানেননি বলেই ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ও বাংলাদেশের মানুষের গণতন্ত্রের আকাক্সা নিয়ে ভারত চোর-সাধু খেলেছে। এর জন্য সংশ্লিষ্টরা এ দেশের মানুষের কাছে এখনো অনুশোচনা দেখাননি।
ভারত নিজ দেশে গণতন্ত্রচর্চা করবে- নির্বাচনের প্রাতিষ্ঠানিকতা রক্ষা করবে, বিচার বিভাগকে স্বাধীন দেখতে চাইবে, ভারতীয়দের মধ্যে ঐক্য কামনা করে আমাদের বিভক্তির দিকে ঠেলে দিতে চাইবে কেন? আমাদের ভুল পথে যেতে ইন্ধন জোগাবে কেন? সীমান্তচুক্তি এ কারণেই ইতিহাসের রাখিবন্ধন নয়। ইতিহাসের রাখিবন্ধন আবেগের নাম- প্রকারান্তরে ধর্মাচার; যা আমাদের সাথে যায় না। বাংলাকে এক করে রাখতেই রাখিবন্ধনের প্রশ্ন উঠেছিল। এখন সেটা অবান্তর। তাই রাখিবন্ধনের কথা ভাঁড়ামিও বটে।
রাজ্য ও লোকসভাতে স্থল সীমান্ত বিল সর্বসম্মতিক্রমে পাস করে ভারত সঙ্কটের বিলম্বিত সমাধানের দায় পূরণের উদ্যোগ নিলোমাত্র। এ জন্য এ সরকারকে সাধুবাদ দিলেও বাড়তি মোসাহেবি বা চাটুকারিতা অর্থহীন। সেটা সরকার করুক আর বিরোধী দল করুক অর্থ একই দাঁড়ায়।
৪১ বছরের অমীমাংসিত ও জটিল স্থল সীমান্ত সমস্যার চূড়ান্ত সমাধানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারত পারস্পরিক স্বার্থের টানাপড়েনের একটা ইস্যু অন্তত কমাবে। প্রায় সাত দশক ধরে বঞ্চনা, কষ্ট আর ভোগান্তির অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার স্থল সীমান্তচুক্তি দুই দেশের জনগণকে নিঃসন্দেহে স্বস্তি দেবে। ১১৯তম সংবিধান সংশোধনী বিল-২০১৩ পাস করে ভারত ৪১ বছরের দূরত্ব ঘুচানোর কাজটি শুরু করল। সুষমা স্বরাজ আশা করেছেন, একইভাবে তিস্তা চুক্তির সমস্যারও সমাধান হবে। শুভেচ্ছার নিদর্শন হিসেবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি জুনে বাংলাদেশে আসবেন। এ সবই ইতিবাচক কূটনৈতিক কাজ। তাই বলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নাক গলিয়ে ভারত যে ক্ষত সৃষ্টি করেছে- সেটা শুকাবে না। তার জন্য আলাদা নির্মোহ ও উদার দৃষ্টিভঙ্গি জরুরি।
আশা ও ভরসার বিষয় হচ্ছে- ভারত বাংলাদেশের মানুষের আস্থাটা পুনরুদ্ধার করতে চায়। এ কারণেই ভারতের লোকসভায় উপস্থিত ৩৩১ সদস্যের সবাই বিলের পে ভোট দিয়েছেন। পার্লামেন্টের উভয় কে সর্বসম্মতিক্রমে বিল পাসের ঘটনা বিরল। এর মাধ্যমে ভারতীয়দের জাতীয় ঐকমত্যের আভাস মিলে। তাই পার্লামেন্টের উচ্চক রাজ্যসভায়ও একইভাবে সর্বসম্মতিক্রমে বিলটি পাস হয়েছে। এটা ঠিক, এর মাধ্যমে বাংলাদেশের কাছে একটা বার্তা এসেছে। সেটা হলো, ভারতের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে মতপার্থক্য থাকলেও জাতীয় ইস্যুতে তারা ঐক্যবদ্ধ। বাংলাদেশ এই ক্ষেত্রে শিক্ষা নিলে বিএনপি জোট ও আওয়ামী জোট পরস্পরকে নির্মূল করার আত্ম ও জাতিঘাতী অবস্থান থেকে সরে এসে পরিচ্ছন্ন ক্ষমতাচর্চার প্রেরণা পেতে পারে। সরকারকে বিরোধী মত ও দল নির্মূলে এতটা নিষ্ঠুর ও পৈশাচিক আচরণ করতে হয় না। প্রধানমন্ত্রী মোদি বিল পাসের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ছিলেন বলেই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি, আসামের গগৈ, ত্রিপুরার মানিক সরকার, মেঘালয়ের মুকুল শংমা এবং মিজোরামের লালথানহাওয়ালাকে ইতিবাচক পেয়েছেন। কংগ্রেস এই উদারতা দেখাতে পারেনি।
সুষমা স্বরাজ যা বললেন তা অবশ্যই নন্দিত বক্তব্য। তবে আমরা প্রমাণ চাই, ভারত প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে বিগ ব্রাদারের ভূমিকা পালন করে না, বড় দেশ হিসেবে সহোদর ভাইয়ের মতোই প্রতিবেশীসুলভ আচরণ করে- এটা বক্তব্য দিয়ে নয় কাজ দিয়ে প্রমাণ করতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি এটা ভারতীয় জনগণও চায়।
এটা ঠিক বাংলাদেশের সাথে ভারতের উল্লেখযোগ্য সীমান্তে বাংলাদেশী হত্যা, মাদক ও অস্ত্র পাচার ছাড়া সমস্যা নেই। সীমানা চিহ্নিত করা এবং অবিশ্বস্ততার প্রতীক তারকাঁটার বেড়া দেয়াই আছে। ফেলানীদের ঝুলে থাকার ফাঁদতো আছে। এই বিল চূড়ান্ত হওয়ার পর বাকি সীমান্তও চিহ্নিত হবে এবং কথিত অনুপ্রবেশ বন্ধ করা হবে। তিস্তা ও অভিন্ন সব নদীর পানি বণ্টন সমস্যার সমাধানও হতে হবে। আসাম বিজেপির পক্ষ থেকে স্থল সীমান্তচুক্তির বিরুদ্ধে তীব্র বিরোধিতার মুখে চুক্তি থেকে আসামের ছিটমহলগুলো বাদ দেয়ার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রথমে বিবেচনা করলেও যুক্তি ও তথ্যকে তিনি প্রাধান্য দিয়ে দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। এটা মেনে নিতে কারো কার্পণ্য করা উচিত নয়। বিরোধের মাঝেও ঐক্য ও সমঝোতার পথ খুঁজে পেতে হয়। এটাই রাজনৈতিক দূরদর্শিতা। আমাদের সরকার এর ধারেকাছেও নেই। তাই দালালির অভিযোগ পিছু তাড়া করেই যাচ্ছে। জনগণের আবেগ-আকাক্সা ও অনুভূতির মর্যাদা না দিলে এ অভিযোগ থেকে মুক্তি নেই। কারা দালাল কারা নয়- এটা জনগণকে শিখিয়ে পড়িয়ে দিতে হয় না। ঠাকুর ঘরের কলাখোররা নিজেরাই জানান দিয়ে দেয় কলা কে খায়।মাসুদ মজুমদার
ভারতের দালালি বনাম বিদ্বেষ
বাংলাদেশ নিউজ২৪ : বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০১৫
সধংঁফ-সধলঁসফবৎদ্বিতীয় স্থল সীমান্তচুক্তি হয়েছিল ১৯৭৪ সালে। ইন্দিরা-মুজিব চুক্তিখ্যাত সেই সমঝোতার বাস্তবায়ন বাংলাদেশ শুরু করে ৪১ বছর আগে। সংবিধানে তৃতীয় সংশোধনী এনে চুক্তির বাস্তবায়ন হিসাবে তাৎক্ষণিক বেরুবাড়ির মালিকানা ছেড়ে দিতে বাংলাদেশ কার্পণ্য করেনি। ভারত এর বিপরীতে তিনবিঘা করিডরের মালিকানা দেয়নি। সীমান্ত বিল রাজ্য ও লোকসভায় সর্বসম্মতিক্রমে পাস করে চুক্তি বাস্তবায়নের পথে সাংবিধানিক অন্তরায় দূর করল মাত্র। এটা কার কূটনৈতিক বিজয় হলো সেটা বিবেচনার চেয়েও ভারত তার দায় মুক্তির প্রক্রিয়া শুরু করল। এটা বাংলাদেশের প্রতি করুণা কিংবা দয়া নয়, ন্যায়সঙ্গত সঙ্কট সমাধানের প্রতি বিলম্বিত সম্মান প্রদর্শন।
ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি নামে পরিচিত ১৯৭৪ সালের স্থল সীমান্তচুক্তি বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ শুরু থেকেই একটা প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে। কংগ্রেস সরকার জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত করতে না পারার প্রেক্ষাপটে ২০১৪ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের অংশ হিসেবে ৬৮ বছর ধরে ঝুলে থাকা সমস্যাটি সমাধানের উদ্যোগ নেয়। শুরু থেকে আপত্তি করে আসা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতাও শেষ পর্যন্ত সম্মতি দেন।
ইতিহাস হচ্ছে, ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর থেকেই পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে স্থলসীমান্ত সমস্যার সমন্বিত সমাধানে পৌঁছার উদ্যোগ নেয়া হয়। ১৯৫৮ সালের নেহরু-নুন চুক্তি এবং ১৯৭৪ সালের স্থল সীমান্ত চুক্তির মাধ্যমে সীমানা জটিলতার সমাধান খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে। ১৯৭৪ সালের চুক্তি অনুযায়ী, এক দেশের ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে অন্য দেশের ছিটমহল থাকলে সেটির মালিকানা পরষ্পরকে হস্তান্তরের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হবে। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হবে বেরুবাড়ি এবং আঙ্গরপোতা দহগ্রাম ছিটমহল। সমঝোতা অনুযায়ী দক্ষিণ বেরুবাড়ির মালিকানা বাংলাদেশের হলেও সেটি ভারতকে হস্তান্তর করা হবে আর দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ভারতীয় ভূখণ্ডের দ্বারা ঘেরাও থাকলেও সেটি বাংলাদেশের মালিকানায় থাকবে। আর এই ভূখণ্ডে যাতায়াতের জন্য ভারতের মালিকানায় থাকা তিনবিঘা করিডরের মালিকানা বাংলাদেশকে হস্তান্তর করা হবে। এই চুক্তি অনুসারে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ছিটমহলে যাওয়ার জন্য ভারত বাংলাদেশকে তিনবিঘা করিডরের মালিকানা না দিয়ে কেবলমাত্র শর্তসাপেক্ষে ব্যবহার করতে দিতে রাজি হয়। প্রাথমিকভাবে দৈনিক ১২ ঘণ্টা করে ব্যবহারের সুযোগ পায় বাংলাদেশীরা। ২০১১ সালের স্বাক্ষরিত প্রটোকল অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোর কোনো বাসিন্দাকেই নিজ বসতবাড়ি ও জীবিকা ছেড়ে অন্যত্র যেতে দেয়া হয়নি। নিজ বসতবাড়িতে পরাধীন ছিটমহলবাসীর জন্য এবং দুই দেশের জন্য বিব্রতকর ও জটিল সমস্যার সমাধান হোক, এর ভেতর দালালি ও বিদ্বেষ না খোঁজাই উত্তম। তাই ভারত বিরোধিতার সস্তা ট্রামকার্ড খেলা ও বিদ্বেষের অবন্ধুসুলভ আচরণ বন্ধ করার উদ্যোগ ভারতকেই নিতে হবে।
ভারতে বিল পাসের সাথে বাংলাদেশে ভারতবিদ্বেষ, বিরোধিতা ও দালালির যে অভিযোগ উঠল, তার জবাব খুঁজে পাওয়া দরকার। জানা মতে, একটি দেশের প্রতি আরেকটি দেশের জনগণের কোনো বিদ্বেষ থাকে না। ব্যতিক্রম ইসরাইল। অবশ্য ভারত-ইসরাইল সম্পর্ক নিবিড়। অভিযোগ আছে মুসলিম বিশ্বের ব্যাপারে দেশ দু’টির অবস্থান অভিন্ন। ইসরাইল অনেক কারণে মুসলিম বিশ্ব ও সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের ঘৃণা কুড়ায়। অনেক রাষ্ট্রের সাথে দেশটির সম্পর্ক শত্রুরাষ্ট্রের মতো। এ ছাড়া পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রই অন্য কোনো রাষ্ট্রের স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নয়। এক রাষ্ট্রের সরকারের সাথে অপর রাষ্ট্রের সরকারের শত্রুতা-মিত্রতা থাকে, সেটা রাষ্ট্রের সাথে নয়। কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপড়েন থাকে তাও সরকারের কারণে। জনগণের সাথে সব সময় টানাপড়েন চলতে থাকার নজির কম। এই যুগে পিপলস টু পিপলস কন্টাক্টকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়, যা ভারত এড়িয়ে চলে এবং সরকারের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে চায়।
বিনা কারণে বাংলাদেশের মানুষ ভারতবিদ্বেষী হতে যাবে কোন দুঃখে। জনগণ বিদ্বেষীও নয়, দালালও নয়। দালালি করে এক সরকার আরেক সরকারের সাথে। কখনো দল ও গোষ্ঠী স্বার্থে, কখনো ক্ষমতার স্বার্থে। যেমন ভারতীয় কংগ্রেস ও আওয়ামী লীগের সাথে সম্পর্কটা জনগণের সাথে জনগণের সম্পর্কের ঊর্ধ্বে উঠে যায়। কংগ্রেস সরকারে থাকলে নেপালি কংগ্রেসের মতো আওয়ামী লীগ সম্পর্কটাকে অনুগত ও দালালি স্তরে উন্নীত করে। তাতে দেশের স্বার্থ সংরক্ষিত থাকে না। দল লাভবান হয়, রাষ্ট্র ও জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জনগণের সার্বভৌম ধারণা ও মর্যাদায় আঘাত আসে। এমন অসম ও একতরফা বন্ধুত্ব বাংলাদেশীরা সন্দেহের চোখে দেখে।
কোনো পড়শি দেশ অপর পড়শি দেশকে বৈরী অবস্থানে দেখতে চায় না। এটা বাংলাদেশের জনগণেরও স্বাভাবিক চাওয়া। দুর্ভাগ্য, ভারত এই চাওয়ার চেয়ে দল ও গোষ্ঠী বিশেষকে অনুগত রাখতে চায় বেশি। চার দিকের পড়শিদের নিজেদের বাজার ও স্যাটেলাইট কান্ট্রির মর্যাদায় নামিয়ে দাপুটে রাডারের আওতায় রাখতে চায়। তাই জনগণের মনে বিরূপ দাগ কাটে। সাধারণের মনটা বিষিয়ে ওঠে। একসময় জনগণ বিদ্বেষী হয়ে উঠতে পারে। ভারতের সব পড়শি রাষ্ট্রের জনগণ দাদাগিরি অপছন্দ করতে শুরু করে। নেপালে ভূমিকম্পবিধ্বস্ত জনপদের মানুষ ভারতের দেয়া দানকে উচ্ছিষ্ট ভাবতে যাওয়া একেবারে অর্থহীন বা বিদ্বেষের কারণে নয়। যথেষ্ট যুক্তিও রয়েছে। বাংলাদেশের ব্যাপারেও দেয়া অনেক প্রতিশ্র“তি ভারত পূরণ করেনি। চাল দেবে বলেও দেয়নি। নজিরগুলো বাংলাদেশীরা ভুলে যেতে চায় না।
ঐতিহাসিকভাবে ভারত বাংলাদেশের জনগণের কাছে একতরফা প্রভুভক্তি আশা করতে পারে না। সমমর্যাদার ভিত্তিতে বন্ধুত্ব আশা করাই প্রত্যাশিত। বাংলাদেশের মানুষ ভালো করে জানে পড়শি পাল্টানো যায় না। প্রয়োজনে নিজেরা পাল্টে যেতে পারে। যেমন বাংলাদেশের জনগণ ইচ্ছে করলে পুরো মানচিত্র নিয়ে আরব-পারস্য কিংবা ইউরোপ-আমেরিকা-আফ্রিকার সাথে নিয়ে বসিয়ে দিতে পারে না। ভারতও পারবে না সাগর পাড়ি দিয়ে মানচিত্রটা নিয়ে অন্যত্র নিয়ে যেতে। তাই সহ অবস্থান জরুরি। এই জরুরি কারণেই আমাদের পানির ন্যায্য হিস্যা, ১১১টি ছিটমহল, ৫ হাজার ৪৪ একর অপদখলীয় জমি আমাদের পেতে হবে। ভারত বিনিময়ে স্বাভাবিকভাবে পেয়ে যাবে ৫১টি ছিটমহল, ২ হাজার ৭৭৭ একর অপদখলীয় জমি। বেরুবাড়ি মগজে রেখে, তিনবিঘা বিরোধও নিষ্পত্তি হতে হবে। দালালি কিংবা বিদ্বেষ-বিরোধিতা ছাড়াই বাণিজ্যিক লেনদেনও ভারসাম্যমূলক করতে হবে। অভিন্ন নদীর পানি পেতে হবে আন্তর্জাতিক রীতি অনুযায়ী। এসব পারস্পরিক স্বার্থের বুঝাপড়া, দালালি বা বিদ্বেষের বিনিময়ে নয়।
তবে ক্ষমতায় থাকা, রাখা ও অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে কারো নাক গলানো কিংবা গলাতে দেয়া উচিত নয়। শ্রদ্ধা, সম্মান, সম্প্রীতি ও বন্ধুত্বের মর্যাদাটা দুই দেশের জন্য কল্যাণকর। সুজাতা সিং ও পঙ্কজ সরণেরা এ সীমা মানেননি বলেই ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ও বাংলাদেশের মানুষের গণতন্ত্রের আকাক্সা নিয়ে ভারত চোর-সাধু খেলেছে। এর জন্য সংশ্লিষ্টরা এ দেশের মানুষের কাছে এখনো অনুশোচনা দেখাননি।
ভারত নিজ দেশে গণতন্ত্রচর্চা করবে- নির্বাচনের প্রাতিষ্ঠানিকতা রক্ষা করবে, বিচার বিভাগকে স্বাধীন দেখতে চাইবে, ভারতীয়দের মধ্যে ঐক্য কামনা করে আমাদের বিভক্তির দিকে ঠেলে দিতে চাইবে কেন? আমাদের ভুল পথে যেতে ইন্ধন জোগাবে কেন? সীমান্তচুক্তি এ কারণেই ইতিহাসের রাখিবন্ধন নয়। ইতিহাসের রাখিবন্ধন আবেগের নাম- প্রকারান্তরে ধর্মাচার; যা আমাদের সাথে যায় না। বাংলাকে এক করে রাখতেই রাখিবন্ধনের প্রশ্ন উঠেছিল। এখন সেটা অবান্তর। তাই রাখিবন্ধনের কথা ভাঁড়ামিও বটে।
রাজ্য ও লোকসভাতে স্থল সীমান্ত বিল সর্বসম্মতিক্রমে পাস করে ভারত সঙ্কটের বিলম্বিত সমাধানের দায় পূরণের উদ্যোগ নিলোমাত্র। এ জন্য এ সরকারকে সাধুবাদ দিলেও বাড়তি মোসাহেবি বা চাটুকারিতা অর্থহীন। সেটা সরকার করুক আর বিরোধী দল করুক অর্থ একই দাঁড়ায়।
৪১ বছরের অমীমাংসিত ও জটিল স্থল সীমান্ত সমস্যার চূড়ান্ত সমাধানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারত পারস্পরিক স্বার্থের টানাপড়েনের একটা ইস্যু অন্তত কমাবে। প্রায় সাত দশক ধরে বঞ্চনা, কষ্ট আর ভোগান্তির অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার স্থল সীমান্তচুক্তি দুই দেশের জনগণকে নিঃসন্দেহে স্বস্তি দেবে। ১১৯তম সংবিধান সংশোধনী বিল-২০১৩ পাস করে ভারত ৪১ বছরের দূরত্ব ঘুচানোর কাজটি শুরু করল। সুষমা স্বরাজ আশা করেছেন, একইভাবে তিস্তা চুক্তির সমস্যারও সমাধান হবে। শুভেচ্ছার নিদর্শন হিসেবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি জুনে বাংলাদেশে আসবেন। এ সবই ইতিবাচক কূটনৈতিক কাজ। তাই বলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নাক গলিয়ে ভারত যে ক্ষত সৃষ্টি করেছে- সেটা শুকাবে না। তার জন্য আলাদা নির্মোহ ও উদার দৃষ্টিভঙ্গি জরুরি।
আশা ও ভরসার বিষয় হচ্ছে- ভারত বাংলাদেশের মানুষের আস্থাটা পুনরুদ্ধার করতে চায়। এ কারণেই ভারতের লোকসভায় উপস্থিত ৩৩১ সদস্যের সবাই বিলের পে ভোট দিয়েছেন। পার্লামেন্টের উভয় কে সর্বসম্মতিক্রমে বিল পাসের ঘটনা বিরল। এর মাধ্যমে ভারতীয়দের জাতীয় ঐকমত্যের আভাস মিলে। তাই পার্লামেন্টের উচ্চক রাজ্যসভায়ও একইভাবে সর্বসম্মতিক্রমে বিলটি পাস হয়েছে। এটা ঠিক, এর মাধ্যমে বাংলাদেশের কাছে একটা বার্তা এসেছে। সেটা হলো, ভারতের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে মতপার্থক্য থাকলেও জাতীয় ইস্যুতে তারা ঐক্যবদ্ধ। বাংলাদেশ এই ক্ষেত্রে শিক্ষা নিলে বিএনপি জোট ও আওয়ামী জোট পরস্পরকে নির্মূল করার আত্ম ও জাতিঘাতী অবস্থান থেকে সরে এসে পরিচ্ছন্ন ক্ষমতাচর্চার প্রেরণা পেতে পারে। সরকারকে বিরোধী মত ও দল নির্মূলে এতটা নিষ্ঠুর ও পৈশাচিক আচরণ করতে হয় না। প্রধানমন্ত্রী মোদি বিল পাসের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ছিলেন বলেই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি, আসামের গগৈ, ত্রিপুরার মানিক সরকার, মেঘালয়ের মুকুল শংমা এবং মিজোরামের লালথানহাওয়ালাকে ইতিবাচক পেয়েছেন। কংগ্রেস এই উদারতা দেখাতে পারেনি।
সুষমা স্বরাজ যা বললেন তা অবশ্যই নন্দিত বক্তব্য। তবে আমরা প্রমাণ চাই, ভারত প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে বিগ ব্রাদারের ভূমিকা পালন করে না, বড় দেশ হিসেবে সহোদর ভাইয়ের মতোই প্রতিবেশীসুলভ আচরণ করে- এটা বক্তব্য দিয়ে নয় কাজ দিয়ে প্রমাণ করতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি এটা ভারতীয় জনগণও চায়।
এটা ঠিক বাংলাদেশের সাথে ভারতের উল্লেখযোগ্য সীমান্তে বাংলাদেশী হত্যা, মাদক ও অস্ত্র পাচার ছাড়া সমস্যা নেই। সীমানা চিহ্নিত করা এবং অবিশ্বস্ততার প্রতীক তারকাঁটার বেড়া দেয়াই আছে। ফেলানীদের ঝুলে থাকার ফাঁদতো আছে। এই বিল চূড়ান্ত হওয়ার পর বাকি সীমান্তও চিহ্নিত হবে এবং কথিত অনুপ্রবেশ বন্ধ করা হবে। তিস্তা ও অভিন্ন সব নদীর পানি বণ্টন সমস্যার সমাধানও হতে হবে। আসাম বিজেপির পক্ষ থেকে স্থল সীমান্তচুক্তির বিরুদ্ধে তীব্র বিরোধিতার মুখে চুক্তি থেকে আসামের ছিটমহলগুলো বাদ দেয়ার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রথমে বিবেচনা করলেও যুক্তি ও তথ্যকে তিনি প্রাধান্য দিয়ে দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। এটা মেনে নিতে কারো কার্পণ্য করা উচিত নয়। বিরোধের মাঝেও ঐক্য ও সমঝোতার পথ খুঁজে পেতে হয়। এটাই রাজনৈতিক দূরদর্শিতা। আমাদের সরকার এর ধারেকাছেও নেই। তাই দালালির অভিযোগ পিছু তাড়া করেই যাচ্ছে। জনগণের আবেগ-আকাক্সা ও অনুভূতির মর্যাদা না দিলে এ অভিযোগ থেকে মুক্তি নেই। কারা দালাল কারা নয়- এটা জনগণকে শিখিয়ে পড়িয়ে দিতে হয় না। ঠাকুর ঘরের কলাখোররা নিজেরাই জানান দিয়ে দেয় কলা কে খায়।

Posted in নির্বাচিত কলাম | Comments Off on ভারতের দালালি বনাম বিদ্বেষ

প্রধানমন্ত্রীর কাছে তসলিমার খোলা চিঠি

নিউজ ডেস্ক: ত তিন মাসে বাংলাদেশে তিনজন ব্লগার খুর হয়েছেন। সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবার সিলেটে অনন্ত বিজয় দাসকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ব্লগার হত্যা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে খোলা চিঠি লিখেছেন ভারতে অবস্থানকারী বাংলাদেশের বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। তিনি বুধবার ফেসবুক পেজে একটি স্ট্যাটাস পোস্ট করেন। পোস্টটি হুবহু তুলে দেয়া হলো।
মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা,taslimanasre
দেশের প্রতিটি ব্লগার, ইসলামি সন্ত্রাসীরা যাদের মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছে, তাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করুন। তাছাড়াও অনেক লেখক ব্লগার ফেসবুকার যারা অত্যন্ত সাহসী, ধর্ম এবং কুসংস্কারের বিরুদ্ধে নিরলস লড়ে যাচ্ছেন, তাদেরও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করুন। তাদের সঙ্গে ২৪/৭ জন সশস্ত্র নিরাপত্তা রক্ষী থাকে। ঠিক আপনার যেমন থাকে। আপনার জীবনের যেমন মূল্য আছে, ওদের জীবনেরও মূল্য আছে। আপনার জীবনের চেয়ে ওদের জীবনের মূল্য আসলে অনেক বেশি। ওরা মানুষ হিসেবে আপনার চেয়ে অনেক উন্নত মানের। আপনার মতো ওরা ইসলামি মৌলবাদিদের সঙ্গে আপোস করছে না, ওরা দেশ জুড়ে মসজিদ মাদ্রাসা নামের সন্ত্রাসী তৈরির কারখানা নির্মাণ করছে না। দেশটার বারোটা বাজাচ্ছে না। বরং জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে অশিক্ষিতদের শিক্ষিত করতে চাইছে। বিজ্ঞান শিক্ষা, মানবতার শিক্ষা, বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার শিক্ষা– এগুলোই দেশকে বাঁচাবে, যদি আদৌ বাঁচায়।
আপনি যা করছেন তা ভোটের ঘৃণ্য রাজনীতি। ছলে বলে কৌশলে গদিতে বসার রাজনীতি। একটি বিবৃতি পর্যন্ত দেননি এই ব্লগারদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে। ইতিহাস লিখে রাখছে আপনার এই কীর্তকলাপ। সামান্য মনুষ্যত্ব বলে যদি কিছু থাকে আপনার, মুক্তচিন্তক ব্লগার আর ফেসবুকারদের বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করবেন না। এবং আজ থেকেই, হ্যাঁ আজ থেকেই, প্রত্যেকের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবেন। যে সন্ত্রাসীদের আজ বন্ধু বলে ভাবছেন, সেই সন্ত্রাসীরাই সুযোগ পেলে আপনাকে হয়তো একদিন কুপিয়ে হত্যা করবে, যেভাবে করছে ব্লগারদের। নিজে নিরাপত্তা নিয়ে একা একা বাঁচার চেষ্টা করবেন না। সবাইকে নিয়ে বাঁচুন।
গণতন্ত্রের চর্চা অন্তত জীবনে একবার হলেও করুন। আবারও বলছি, মনে রাখবেন, আপনার জীবনের চেয়েও মূল্যবান ওই ব্লগারদের জীবন, যারা আপনার চেয়েও বেশি শিক্ষিত, বেশি জ্ঞানী, বেশি মানববাদী, যারা গণতন্ত্রে, সমতায়, সমানাধিকারে, আপনার চেয়েও বেশি বিশ্বাস করে। সন্ত্রাসী খুনিদের গ্রেপ্তার করা আর বিচারের ব্যবস্থা করার ভার কিন্তু আপনার ওপর। গোটা জগত দেখছে আপনি কী করছেন। যা করা উচিত সেটা করুন। যা করলে ক্ষমতায় বসে অনন্তকাল আরাম করতে পারবেন, তা নয়। অনন্তকাল আপনি বাঁচবেন না। জীবন খুব ছোট। এই জীবনে এখনও সময় আছে, কিছু ভালো কাজ করে দেখান যে আপনি ভালো কাজ করতে জানেন, নিঃস্বার্থ হতে জানেন।
-তসলিমা

Posted in নির্বাচিত কলাম | Comments Off on প্রধানমন্ত্রীর কাছে তসলিমার খোলা চিঠি

সময় এখন নতুন বাংলাদেশের

জাহিদ আহসান রাসেল: আমরা রাজনীতি করি, রাজনীতির মানুষ আমরা। মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে থাকার অঙ্গীকার করি। চেষ্টা করি মানুষের পাশে থাকার। কখনো সেই অঙ্গীকার পালন করতে পারি, Tongi-MP-Photoআবার কখনো বা পারি না। এটি আমাদের সীমাবদ্ধতা। অন্তত আমার কথা বলতে পারিÑ আমি কখনো মানুষের সঙ্গে শঠতায় বিশ্বাস করি না। এ বিশ্বাস আমার মধ্যে নেই। আমি বিশ্বাস করি, আমরা বিশ্বাস করি একটি প্রাণবন্ত বাংলাদেশ। একটা প্রাণবন্ত সমাজ যেখানে মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়াবে। একটি প্রাণবন্ত গণতান্ত্রিক সমাজ। যে গণতান্ত্রিক সমাজের সূচনা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়। সবাই উদ্বুদ্ধ হয়ে লড়বে বাংলাদেশ গড়তেÑ অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অধিকার আদায়ে আমরা একসঙ্গে এগিয়ে যাব। এগিয়ে যাব জয় বাংলার চেতনায়। জয় বাংলার চেতনাই এগিয়ে নিয়ে যাবে বাংলাদেশকে। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে জয় বাংলার চেতনায়ই।
তারুণ্য, তরুণেরাই আমাদের সম্পদ। আমাদের আশার জায়গার প্রায় পুরোটা জুড়েই আছে তারা। সেই তরুণেরাই বিজয় ছিনিয়ে আনছে বারবার। আমরা গর্বিত হচ্ছি। আমরা অহংকার করছি। আমরা আনন্দিত হচ্ছি, পুলক অনুভব করছি। ক্রিকেট আমাদের সেই ভালোবাসার, গৌরবের জায়গার একটি। নিউজিল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া বিশ্বকাপে আমরা অংশগ্রহণ করেছি। কতটা ভালো করবে ক্রিকেট দল, আমরা কেউ জানতাম না। কারণ কয়েক বছর ধরে ক্রিকেট দল ভালো করে এলেও ধারাবাহিক ছিল না, ’১৪ সালের শেষে জিম্বাবুয়ের সঙ্গে আংশিক সফলতা ধরা দিলেও শ্রীলংকা, এশিয়া কাপ, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ আমরা ভালো খেলতে পারিনি। আমরা আফগানিস্তান ও হংকং দলের সঙ্গেও হেরেছিলাম ’১৪ সালে। আমাদের ক্রিকেট দলের সামর্থ্য নিয়ে কখনো সন্দেহ না থাকলেও প্রত্যাশিত ভালো না করায় তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ছিল বারবার। এসব প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসেবের খেরোখাতা নিয়ে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করি আমরা। বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়ে বাংলার দামাল ছেলেরা দেখিয়ে দিয়েছে যে, তারা আর ছোট নয়, বেড়ে উঠেছে, বড় হয়েছে, সামর্থ্যবান হয়েছে। হেলার দিন শেষ, সময় এখন বাংলাদেশের। বাংলাদেশ যুদ্ধ করা জাতি, হারতে হারতে জিতে যাওয়া জাতি। বিজয় তাদের গন্তব্য, বিজয় তাদের চাই। সেটিই হয়েছে বিশ্বকাপ ক্রিকেটে।
বিশ্বকাপে বাংলাদেশের কয়েকটি খেলা আমি দেখেছি। কাছ থেকে দেখেছি ছেলেদের মানসিকতা, দেশপ্রেম। দেশকে ভালোবেসে উজাড় করে দিয়ে তারা খেলেছে। আমরা প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছি। ভারতের সঙ্গে কোয়ার্টার ফাইনালের সেই ম্যাচ যদি আম্পায়ারদের নির্মোহ আচরণ থাকত, তাহলে কে জানে বাংলাদেশ কোথায় গিয়ে থামত। বাংলাদেশ দল এমন ছন্দে ছিল যে, এমনও হয়তো হতো, বাংলাদেশ ফাইনাল পর্যন্ত খেলতে পারত। ফাইনাল খেললে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নও হতে পারতÑ এমন ভাবনা বাড়াবাড়ি মনে হতে পারে। কিন্তু এমনটি কেবল আমার ভাবনা নয়, আমি দেখেছি মানুষের উচ্ছ্বাস। বিদেশিদের বাংলাদেশকে নিয়ে আগ্রহ। সেদিন হয়নি, সামনে নিশ্চয়ই বাংলাদেশ বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন দল হবে, এটি এখন বলাই যায়।
মাত্র কদিন আগে পাকিস্তানকে যেভাবে বাংলাদেশ হারিয়েছে, তা কিসের সঙ্গে আপনি তুলনা করবেন? যেভাবে বিধ্বস্ত করল পাকিস্তানকে বাংলার বাঘেরা, একটি বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন দল যেভাবে বাংলাওয়াশ হলোÑ যেভাবে পাকিস্তানকে নিয়ে ছেলেখেলা হলো, তা কি শুধু কয়েকটি শব্দ বা বাক্য দিয়ে বোঝানো যাবে? বিশ্লেষণ করা যাবে? আমি এমনিতেই ক্রীড়ামোদি মানুষ। ক্রিকেট আমার পছন্দের খেলা। এর বাইরে আমি বাংলাদেশ সরকারের ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটির সভাপতি। ক্রীড়া ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উন্নতির জন্য কাজ করা, তাদের উৎসাহ, প্রণোদনা দেওয়া আমার দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। দায়িত্ব এবং ভালোবাসা থেকেই ক্রিকেট মাঠে যাই। যাই অন্যান্য খেলাধুলা উন্নতির জন্য করণীয় ঠিক করতেও। তবে পাকিস্তানকে বাংলাওয়াশ, একমাত্র টি-টোয়েন্টি ম্যাচে হারিয়ে দেওয়ার দৃশ্য খুব কাছ থেকেই আমি দেখেছি। আমি খুব ভাগ্যবান যে, ক্রিকেটের এই গৌরবের সময় তাদের পাশে থাকতে পেরেছিলাম। গর্বিত যে, বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী খেলোয়াড়দের উৎসাহ দিতে মাঠে চলে এসেছিলেন। পুরস্কার বিতরণ করা, খেলোয়াড়দের সঙ্গে সেলফি তোলাÑ এক বিস্ময়ের ঘটনাই বটে। পৃথিবীর আর কোনো রাষ্ট্রনায়ক সংস্কৃতির প্রতি এত প্রীতি আছে কি না, আমার জানা নেই। ক্রীড়া-অন্তঃপ্রাণ জননেত্রী শেখ হাসিনা সেই উদাহরণ অনেক আগেই সৃষ্টি করেছেন। যখনি দেশের ছেলেরা দেশের জন্য খেলছে, তাদের পাশে থাকছেন। আমাদের ক্রিকেট এগিয়ে যাওয়ার পেছনে তার অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, প্রতিমুহূর্তে চমকে উঠছেÑ গোটা পৃথিবী। সামাজিক সূচক, অর্থনীতির সূচক, ক্রীড়াক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়া, সংস্কৃতি, তথ্যপ্রযুক্তিতে বিপ্লব সৃষ্টি হয়েছে। ২০০৮ সালের দেশের সাধারণ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কম্পিউটার বিজ্ঞানী সজীব ওয়াজেদ জয় ঘোষণা দিলেন ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার। মানুষের কাছে তখন শব্দটি অনেক অচেনা মনে হয়েছিল। ডিজিটাল বলতে আসলে কী বুঝিয়েছেন, তাও বুঝে উঠতে পারছিলেন না তারা। কিন্তু আজ ২০১৫ সালে এসে ডিজিটাল বাংলাদেশের স্লোগান জাতীয় স্লোগানে পরিণত হয়েছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন পৃথিবীর জন্য মডেল। তাদের অনেকেই ধার চায় ডিজিটাল বাংলাদেশের এই মডেল। তারা স্বীকার করে নিয়েছে, তারা আজ স্বপ্ন দেখে বাংলাদেশের মতো হওয়ার। সেটি সম্ভব হয়েছে জননেত্রীর সরকারের কারণেই। সজীব ওয়াজেদ জয়ের কারণেই।
তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধা নিয়ে যেখানে তরুণেরা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর, নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেÑ তখনি হরতাল-অবরোধ নামে এক অভিশাপ আমাদের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হলো। যেখানে মানুষের উন্নয়ন, দেশের উন্নয়নই দেশের মানুষের ব্রত, তরুণদের আকাশ ছোঁয়ার কল্প যেখানে সক্রিয়, সেখানে এমনভাবে আমাদের ওপর হরতাল-অবরোধ জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসল যে, মানুষের কষ্টের আর শেষ থাকল না। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিতে পারল না ঠিকমতো করে, ব্যবসায়ীদের ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি হলো, সামাজিক-আর্থিক ক্ষতি হলো। মানুষকে পুড়িয়ে মারা হলো। যেখানে মঙ্গলে যাওয়ার ভাবনা আমাদের, সেখানে হরতালের মতো অ্যানালগ পদ্ধতি বাতিল বলে গণ্য করল মানুষ। ন্যায্য অধিকার আদায়ে আন্দোলন হতেই পারে, তাই বলে মানুষকে পুড়িয়ে, মানুষের অধিকার হরণ করে? রাজনীতির ভাষা, গণতন্ত্রের ভাষা এমন নয়, তা বিএনপির নেত্রীকে বুঝতে হবে। মানুষকে বুঝতে হবে, তা না হলে রাজনীতি তার কাছ থেকে টা টা দেবে। তখন আর কিছুই করার থাকবে না।
জাতির জনক একদিন স্বপ্ন দেখেছিলেনÑ একদিন এদেশ স্বাধীন হবে। হয়েছে। স্বপ্ন দেখেছিলেন উন্নত বাংলাদেশেরÑ সেটি হওয়ার পথে। গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ হবে সবার জন্য উদাহরণÑ সেটিও হবে। শোষিত-বঞ্চিত মানুষের পাশে থাকার, তাদের অধিকার আদায়ে যে দৃঢ়তা ছিল, সেটি ধারণ করছেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। যোগ্য পিতার সুযোগ্য কন্যা তিনি। বঙ্গবন্ধুর মতো তিনিও দেশকে প্রচন্ড ভালোবাসেন। মানুষকে ভালোবাসেন। বারবার হত্যাচেষ্টায় ভয় না পেয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন সামনের দিকে। আমার বাবাও একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন, স্বপ্ন দেখেছিলেন বৈষম্যহীন সমাজের। একটি উদার গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের। মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন অবলীলায় মানুষকে ভালোবেসে, মানুষের জন্য কাজ করতে গিয়ে। আমার স্বপ্নও, আমার আশা মানুষের পাশে থাকার। মানুষের জন্য কাজ করার। দেশকে ভালোবেসে জীবন দিতেও প্রস্তুত। শুধু প্রত্যাশাÑ একটি উদার, গণতান্ত্রিক, মানুষের অধিকার আদায়ের এক বাংলাদেশ। এই ভূখন্ড সবার। সম্মান নিয়ে যেন সবাই এই ভূখন্ডে বসবাস করতে পারেÑ কোটি তরুণের মতো আমার প্রার্থনাও তাই। আমার বিশ্বাসের জয় হবে বলেই আশা করি। কারণ, সময় এখন নতুন বাংলাদেশের। নতুন বিশ্বাসের।
লেখক: জাহিদ আহসান রাসেল এমপি, ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটির সভাপতি।

Posted in নির্বাচিত কলাম | Comments Off on সময় এখন নতুন বাংলাদেশের

জিতেছে আসলে কে?

অধ্যাপক ড, মো, শরিফ উদ্দিন: রাজনীতিতে আপাত-স্থিতিশীলতার নিয়ামক হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল সিটি নির্বাচন। দীর্ঘ অচলাবস্থার পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছিল নির্বাচনকে ঘিরে। সিটি নির্বাচন নিয়ে রাজনীতির মাঠে ঘটে গেছে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য নানা খেলা। দুই পক্ষের মধ্যে ‘সমঝোতা’ হয়েছে বলেও ধারণা ছিল রাজনীতি-বিশ্লেষকদের। কিন্তু ভোটের মাঠের নৈরাজ্য সব জল্পনা-কল্পনাকে উড়িয়ে দিয়েছে। একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়তো অস্বাভাবিক পরিস্থিতিকেই দূরে ঠেলে দিত। তা আর হলো কই? দেশের সাধারণ মানুষের উৎকণ্ঠা, আবারো কি অস্থিতিশীলতায় পড়তে যাচ্ছে ১৬ কোটি মানুষ?photo-1430463390

গত মঙ্গলবার দেশের ইতিহাসে বিস্ময়কর এক নির্বাচন হয়ে গেল। দীর্ঘদিন পর ভোট। মানুষের উচ্ছ্বাস ছিল। ছিল উৎসবের একটি আবহও। কিন্তু ভোটগ্রহণের দিন সকাল থেকেই কেন্দ্রগুলোতে যে বিশৃঙ্খলার পরিবেশ তৈরি করা হলো, তা ছিল চরম বাড়াবাড়ি। এ ছিল ‘একতরফা’ একটি পরিবেশ। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, ঢাকার দুই সিটি আর চট্টগ্রাম—তিন সিটিতে একই পদ্ধতিতে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়। তবে এর ভীত কিন্তু রচিত হয়েছিল বেশ আগেই। নির্বাচনী প্রসঙ্গ শুরু হওয়ার পরই। কেবল বিএনপি-জামায়াত নয়, বিরোধী পক্ষকেই প্রার্থী হিসেবে সহ্য করতে পারেনি সরকারি দলের নেতাকর্মীরা। গ্রেফতার, মামলা-হামলা দিয়ে এসব প্রার্থীকে ব্যস্ত রাখা হয়েছে শেষ পর্যন্ত।

ব্যক্তি উদ্যোগে ভোটে দাঁড়ানো প্রার্থীরাও প্রচার চালাতে পারেননি। ভোটকেন্দ্রে প্রতিপক্ষ প্রার্থী, নেতাকর্মী, ভোটারদের উপস্থিতি প্রতিরোধে সর্বাত্মক বেপরোয়া কর্মকাণ্ড দেখা গেছে। কাজেই এ নির্বাচন সংকট আরো বাড়িয়ে দেবে—সন্দেহ নেই।

এই সিটি নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধার মোড়কে শেষ পেরেকটিও মারা হলো। বর্তমান নির্বাচন কমিশন বেশ আগে থেকেই বিতর্কিত। স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশন ও দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে আবারো জটিল সন্দেহ আর অবিশ্বাস তৈরি হলো। প্রচলিত এ ব্যবস্থার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হলো দেশের কোটি তরুণ সমাজ। জাতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির সোপান তৈরি করল নির্বাচন কমিশনের এমন আচরণ।

অবস্থাদৃষ্টে বিরাজমান পরিস্থিতিতে এটাই স্পষ্ট প্রতীয়মান, তিন সিটিতে তড়িঘড়ি করে নির্বাচন আয়োজনে সরকারের ত্বরিত কর্মকাণ্ডে নাগরিক স্বার্থ প্রাধান্য পায়নি। এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার বরং ক্ষমতার পাটাতন শক্ত করার প্রয়াস চালিয়েছে।

এই নির্বাচনে গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলার দৃশ্যও ছিল বিস্ময়কর। কেন্দ্রে ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়েছে। সাংবাদিকদের ক্যামেরা ছিনতাই করা হয়েছে। মারধর করা হয়েছে। ক্যামেরা থেকে ছবি ডিলিট করে দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনের পর কূটনীতিকদের তৎপরতাও বেশ চোখে পড়ার মতো। নির্বাচন-সংক্রান্ত বিএনপির অভিযোগ নিয়ে সুষ্ঠু তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। উদ্বেগ জানিয়েছেন মার্কিন ও ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতও।

সব মিলিয়ে গণতন্ত্রের জন্য খারাপ আরেকটি অধ্যায় সূচিত হলো। দেশের স্থিতিশীলতা বহুদূর—এ নির্বাচনের মাধ্যমে সেটাই আবারো প্রমাণিত হলো। বিতর্কিত এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জিতেছে আওয়ামী লীগ, হারেনি বিএনপি; হেরেছে গণতন্ত্র, হারল বাংলাদেশ।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Posted in নির্বাচিত কলাম | Comments Off on জিতেছে আসলে কে?

সর্বশেষ খবর

আজকের ছবি

www.facebook.com

Tag Cloud