April 16, 2026
ফয়েজ-উন-নেছা
খবরটা প্রথম জানতে পারলাম এক বন্ধুর কাছ থেকে। বলল, আমাদের মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি গার্লস হাই স্কুল এন্ড কলেজের ক্লাস ফাইভের এক ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। পরে সহকর্মীদের কাছ থেকে জানলাম, স্কুলের কোন পরিষ্কারকর্মীর দ্বারা ইংরেজি মাধ্যমের ক্লাস ওয়ানের এক শিশু যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে।
আমাদের স্কুলে শিক্ষিকাদের স্থান কিন্তু বরাবরই খানিকটা উঁচু। প্রিন্সিপাল জাকেরা রহমানের যুগটায় স্কুলে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ আমার হয়েছে। মূলত তার সময়টাই এই শিক্ষিকাদের স্থানটা পোক্ত হয়ে উঠেছিল। স্কুল চেয়্যারম্যান মরহুম কাজী আজহার আলী স্যারের জোর সমর্থন আর আন্তরিকতার অভাব ছিল না। তখন বার তিনেক আমরা শ্রেষ্ঠ স্কুলের তকমাও পেয়েছি রাষ্টীয়ভাবে।
১৭ মে স্কুলে গেলাম। ইংরেজি মাধ্যমের বেশকিছু মেয়ের সঙ্গে কথা হলো। বলল, ক্লাস ফাইভের মেয়ে আপু ধষর্ণের শিকার হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালে রয়েছে। জিজ্ঞাসা করলাম কোন হাসপাতাল, এখন কেমন আছে, জানে কী না। কোন সদুত্তর পেলাম না। ভাইস প্রিন্সিপাল জিন্নাতুননেসা ম্যাডামের কথা উঠতেই যেন ওদের চোখে ক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠলো।
১৫ মে পত্রিকায়, টিভিতে তো দেখেছিই। মানববন্ধন, মায়েদের অভিযোগ, তীব্র আক্রোশ, ক্ষোভ। ছাত্রীদের না বলা কথা। এক সিনিয়র সাংবাদিক ভাইয়ের কাছে শুনলাম, ওনার ছেলেকে বয়েজ শাখায় ভর্তি করিয়েছিলেন। কিছু ব্যাপারে অভিযোগ থাকায় স্কুলে শিক্ষকদের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন। অনুমতি পাননি। পরে পেশাগত পরিচয় দিয়েও তেমন কোন সহযোগিতা পাননি তিনি। পরে অন্য স্কুলে ছেলেকে সরিয়ে নিয়ে গেছেন তিনি।
পরদিন আবার স্কুলে আসলাম। ১৬ মে কী ঘটেছিলো ব্যাপারটা শিক্ষকদের মুখে শোনা দরকার ছিলো। স্কুলে ডিবির দুই সদস্য জানালেন, তদন্তে কয়েকজন কর্মচারী অভিযুক্ত রয়েছেন। ক্লাস ওয়ানের একটি বাচ্চাকে যৌন হয়রানির চেষ্টা করা হয়েছিলো। যদিও ভিকটিমের পরিবার এখনও পর্যন্ত কোন অভিযোগ করেননি।
যৌন হয়রানির শিকার ক্লাস ওয়ানের সেই শিশুর বাবাকে সদস্য করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছিল। সম্ভাব্য অভিযুক্তদের সামনে নিয়ে শিশুটিকে ‘অপরাধীকে’ শনাক্ত করতে বলা হলে সাত/আট বছরের শিশুটি কিছু বলতে পারেনি। অস্ত্রের ভয়ে দেখিয়ে মুখ চেপে পাশের নির্মাণাধীন ভবনে নিয়ে যাওয়ার মতো দুঃসহ পরিস্থিতিতে এমনিতেই তো অতোটুকু মেয়েটি ভয়াতুর। কী বা শনাক্ত করবে সে। তবে ঘটনার পর থেকে গোপাল দাস নামের একজন পরিষ্কারকর্মী কাজে না ফিরলে সন্দেহের তীর তার দিকে যায়। কর্তব্যে অবহেলার কারণে তাকে অব্যাহতি দেয় কর্তৃপক্ষ। গত ১৬ মে অভিভাবকদের সঙ্গে অশোভন আচরণের অভিযোগে স্কুলের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ম তামিম দোষীদের শাস্তি, অভিভাবক বা শিক্ষার্থীদের হয়রানি, হুমকি-ধামকি না করার আশ্বাস ও প্রতিশ্র“তি দেন।
ফোনে সদ্য অব্যাহতিপ্রাপ্ত ভাইস প্রিন্সিপাল ম্যাডামের কাছে ১৬ মে কী ঘটেছিল জানতে চাইলাম। তিনি জানালেন, কিছু অভিভাবকের সূত্রে তিনি আগেই জানতে পেরেছিলেন, এমন কিছু হতে পারে। প্রশ্ন করলাম, তাহলে নিরাপত্তা বাড়ালেন না কেন বললেন, ৩৬ বছর ধরে যে প্রতিষ্ঠানে তোমাদের পড়িয়ে এসেছি। আমার সেই বাচ্চাদের মায়েরা, কিংবা আমার সেই বাচ্চারাই বড় হয়ে আমার উপরই চড়াও হবে এমনটা বিশ্বাস করতে মন চায়নি। পরের দিকটায় বুঝে উঠতে পারছিলাম না কী হচ্ছে, কী করা উচিত। এমন পরিস্থিতির সঙ্গে আমার পরিচয় ছিলো না। আর সেই অশোভন কথা আমি বলতে পারি না। এটা সম্ভব না। শাস্তি আমাকেই পেতে হলো। এটাই আমার প্রাপ্তি!
প্রিন্সিপাল বেলায়েত স্যার জানালেন, তাকে বাঁচাতে এসে স্কুলের ছোট ছোট মেয়েরা সেই আক্রমণের শিকার হয়েছে সেদিন। এখানে সেই মায়েদের, প্রাক্তন ছাত্রীদের কাছে আমার প্রশ্ন, না হয় বুঝলাম আমাদের গুরুদের অনেক অন্যায় ছিলো। কথায় কথায় হুমকি-ধামকি পেয়েছেন। ওই কোমলমতি শিশুদের অপরাধটা কোথায় নাকি আক্রোশ আর ক্ষোভের আগুন এতো বেশি যে ছোট্ট ছোট্ট শিশুদের শিশু মনে হয়নি
এটা স্পষ্ট হলো স্কুলটি বড় আকারে পৌঁছে যাওয়ায়, ট্রাস্টিদের দেখভালের নজর কমেছে। কিংবা বাড়তি আয়তনের সঙ্গে তাদের সচেতনতা বাড়েনি। প্রতিষ্ঠারটির শৃঙ্খলায় প্রতিনিয়ত অবনতি ঘটছে। চার দশকের পুরানো একটি আধুনিক স্কুলে যৌন হয়রানির পর সিসি ক্যামেরা কেন বসানো হবে, আগে কেন ছিলো না, এমন সব প্রশ্ন থেকেই যায়। এমনকি স্কুলে ২০০৯ সালে উচ্চ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ বিধিমালা প্রণয়ন এবং নিপীড়ন বিরোধী অভিযোগ সেল গঠনের হদিস পাওয়া যায়নি। থাকলে তদন্ত কমিটিতে তাদের কারও টিকিটি অন্তত মিলতো।
অন্যদিকে ভাইস প্রিন্সিপাল ম্যাডামের ব্যবহারেও অভিভাবকদের মধ্যে অসন্তোষ ভয়াবহ আকারে বেড়েছে। শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের প্রতি তার দুর্ব্যবহার, অবহেলায় ক্ষোভ বাড়ছে। এতে ক্রমান্বয়ে গোটা স্কুলের শিক্ষকদের সঙ্গে ছাত্র ও অভিভাবকদের দূরত্ব বাড়তে বাড়তে কোথায় নেমেছে ভাবতেই আজ ভয় হয়। নাহলে বহিরাগতদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কেউ নিজের সন্তানের স্কুল ভাঙ্গার মতো ঔদ্ধত্যও দেখায়! তার বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ অথবা মামলা অবধি পৌঁছলেও আফসোস হতো না। অন্যায় ঘটলে সুষ্ঠু বিচার তো জরুরি। কিন্তু তার প্রতিবাদে আমাদের শিক্ষকদের প্রতি শারীরিক নির্যাতন কোথাকার সভ্যতা
প্রকৃতির প্রতিশোধ বলে একটা ব্যাপার থেকেই যায়। স্কুল কমিটি প্রতিষ্ঠান বাঁচাতে অদূর ভবিষ্যতে হয়তো ওই অভিভাবকদের সঙ্গে সংঘাতেও যাবেন না। আমাদের জিন্নাত ম্যাডামও হয়তো আর প্রিয় স্কুলটিতে ফিরবেন না। কিন্তু আপনার যে সন্তানটি আপনাকে তারই শিক্ষকের উপরে চড়াও হতে দেখেছে সে কী ব্যাপারটিকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপনার অতি কঠোর হস্তে দমন বা প্রতিবাদ হিসাবে দেখবে না নাকি অন্যায়ের জন্মলগ্নের সঙ্গে নিজেকে পরিচয় করিয়ে দেবে, সেটাই বড় প্রশ্ন।
যৌন হয়রানির মতো যে পাশবিক ঘটনা ঘটেছে, এর সুষ্ঠু বিচার হতেই হবে। স্কুল প্রশাসনকে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, শিক্ষার মান, স্কুলের পরিবেশ নিশ্চিত করতেই হবে। কিন্তু যে স্থানটুকু গড়তে চার দশক লেগে গেলো। হাজারো মানুষের অক্লান্ত পরিশ্রম আর আন্তরিকতাকে ঘিরে আমরা যেভাবে গড়ে উঠেছি বা যারা গড়ে উঠছেন তাদের বিশ্বাসটুকু যেন হারিয়ে না যায়। এমন প্রত্যাশা নিয়ে স্যারের কক্ষ থেকে যখন বের হয়ে আসবো, ঠিক তখনই পুরানো শিক্ষিকারা ছুটে আসলেন দেখা করতে। তাদের একজন খুব শান্ত অথচ দৃঢ়ভাবে বললেন, আচ্ছা বলতো, তোমাদের কাছ থেকে কী আমাদের এই পাওনাটাই ছিলো? এটাই কী আমাদের প্রতি তোমাদের দণ্ড। আমরা কী এমন সভ্যতা তোমাদের শিখিয়েছি?
আমি নিজেকে লুকানোর জায়গা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কী বলি কিভাবে বলি
লেখক : সাংবাদিক ও মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি গার্লস হাই স্কুল এন্ড কলেজের প্রাক্তন ছাত্রী