পৃথিবীকে জেনে নিন আপনার ভাষায়….24 Hrs Online Newspaper

‘সাইকো’ কাণ্ডে নয়া মোড়:পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক যৌন সম্পর্ক

38950-2psychoওয়েব ডেস্ক : কলকাতার রবীন সন ষ্ট্রীটের সাইকো কাণ্ডে চাঞ্চল্যকর মোড়। পার্থ দের চিরকুট, ডায়েরি থেকে বেরিয়ে এসেছে নুতন তথ্য। তদন্তকারি দল মনে করছে দে-র পরিবারের সদস্যরা পরস্পর পরস্পরের প্রতি যৌনতায় লিপ্ত ছিলেন। দিদির সঙ্গে যৌন সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল পার্থ দে। সেই সম্পর্কের আভাস পান তাদের মা। তারপরই টানাপোড়েন শুরু হয় পরিবারের। পার্থ দের হাতে লেখা ওই ডায়েরি এবং চিরকুটে যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তা পড়ে এমনটাই মনে করছে পুলিস।
ডায়েরিতে পার্থ দে লিখেছেন, ‘আমার দিদি আস্তে আস্তে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে, সে ধীরে ধীরে জোর খাটাচ্ছিল। মা একটা সময় দিদিকে হিংসা করতে শুরু করে। আমরা যখন দীঘা যাই, মা হোটেলের বাথরুমে দিদিকে বিবস্ত্র করেন’। ওই ডায়েরিতে পার্থ দে আরও লিখেছেন, ‘যা আমরা করেছি, তা আমাদের কাছে সঠিক। মা ভাবতেন আমি শারীরিকভাবে অক্ষম। মা ওই জন্যে আমার ঘরে একজন পরিচারিকাও রেখেছিলেন। যাতে তাঁর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করি। কিন্তু মায়ের ধারণা ভুল ছিল’।
পার্থ দের শারীরিক পরীক্ষার সময় এটা কিছুটা প্রমাণিত হয়েছে যে, তিনি বিকৃত মস্তিষ্কের। এই বিকৃতির পেছনে যৌনতা সংক্রান্ত বিষয়কেই দায়ী করছেন চিকিৎসকরা। শুক্রবার সরকারি হাসপাতালে পার্থ দের শারীরিক পরীক্ষার সময় মহিলা চিকিৎসককে কুপ্রস্তাব দেন তিনি। চিকিৎসককে বিবস্ত্র হওয়ার কথা বলেন তিনি। এরপরই মনোবিদদের কাছে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়ে যায়।

Posted in নির্বাচিত কলাম | Comments Off on ‘সাইকো’ কাণ্ডে নয়া মোড়:পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক যৌন সম্পর্ক

তিনি এলেন, দেখলেন, জয় করতে পারলেন কি?

tarek-samsur-rehman1নরেন্দ্র্র মোদি বাংলাদেশে এসেছিলেন বিশাল এক সম্ভাবনা জাগিয়ে। আবার চলেও গেলেন একরাশ প্রতিশ্র“তি দিয়ে। কিন্তু কতটুকু জয় করতে পারলেন বাংলাদেশের মানুষের মন? বলার অপেক্ষা রাখে না, রোববার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র্রে তিনি যখন বাংলাদেশের সালমা, সাকিব, নিশাত আর ওয়াসফিয়াদের প্রশংসা করছিলেন, তখন আমার মনে হয়েছিল, ভিন্ন এক ভারতীয় নেতাকে আমরা দেখছি। তিনি সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসা চান। তিনি সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশকে সঙ্গে নিয়ে চলতে চান। তার সেই মনোমুগ্ধকর ভাষণ আমাকে স্মরণ করিয়ে দিল ১৯৬৩ সালের ২৮ আগস্ট ওয়াশিংটনে কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার আদায়ের অন্যতম নেতা মার্টিন লুথার কিংয়ের সেই বিখ্যাত উক্তি উই হ্যাভ এ ড্রিম। আমি তুলনা করতে চাই না। কিন্তু নরেন্দ্র মোদি যখন বলেন, সূর্য এখানে আগে ওঠে, এরপর আলো আমাদের (ভারত) এখানে যায়। এখানে যত আলোই হোক, আলো আমাদের ওখানেও যায়। একজন কবি, একজন রাজনীতিক নরেন্দ্র মোদি ঢাকায় মানুষকে কাছে টেনেছেন, এটা অস্বীকার করা যাবে না। সেই ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭২ সালের মার্চে ঢাকায় এসে এরকম এক উষ্ণ আতিথেয়তা পেয়েছিলেন। তারপর ভারতের কত প্রধানমন্ত্রী এলেন, গেলেন। সম্পর্কের কোনো উন্নতি হয়নি। মনমোহন সিংও এসেছিলেন। কিন্তু কেউই সেই প্রত্যাশা জাগাতে পারেননি। এবার ঢাকায় এসে মোদি যে প্রত্যাশার ঢেউ জাগিয়ে গেলেন, ভারত কি এটা ধরে রাখতে পারবে? আমলাতন্ত্রের ম্যারপ্যাঁচে এই সম্ভাবনার কি মৃত্যু ঘটবে? আগামী দিনগুলোই বলবে মোদি কতটুকু আন্তরিক। তবে আমার ধারণা, বাংলাদেশের মানুষ তার ওপর আস্থা রেখেছে।
এটা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, কিছু আশ্বাস-প্রতিশ্র“তি দিয়ে নরেন্দ্র মোদি তার ঢাকা সফর শেষ করেছেন। তার এ সফরে ইতিবাচক দিক যেমন আছে, তেমনি আছে নেতিবাচক দিকও। তবে তুলনামূলক বিচারে নেতিবাচক দিকই বেশি। টিপাইমুখ বাঁধ হবে না- এটা যৌথ ঘোষণায় স্থান পেয়েছে। এর পেছনে বাংলাদেশের পরিবেশবাদী আন্দোলনকারীদের পাশাপাশি ভারতীয় পরিবেশবাদীদেরও কৃতিত্ব দিতে হবে। তারাই সেখানে জনমত সৃষ্টি করেছিলেন। তবে এ ব্যাপারে ভারতে যে চুক্তিটি হয়েছিল, তার ভবিষ্যৎ কী, সেটা একটা প্রশ্ন বটে। আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে না- এমন স্বীকারোক্তি নেই। তবে বলা হয়েছে, ভারত এমন কিছু করবে না যাতে বাংলাদেশের ক্ষতি হয়। এটা একটা কূটনৈতিক ভাষা। ভারতের উচ্চ আদালতের একটি রায় আছে এ ব্যাপারে। রায়ে আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছিল। ভারত এখন সেই রায়টি কীভাবে বাস্তবায়ন করে, সেটাই দেখার বিষয়।
মোদির সঙ্গে খালেদা জিয়া দেখা করেছেন। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের আপত্তিকে মোদি বিবেচনায় নেননি। এটাই হচ্ছে তার রাজনীতির বৈশিষ্ট্য। ঢাকায় এসে তিনি বলেছিলেন, ভারতে সব দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে স্থলসীমানা চুক্তি তিনি সংসদের উভয় কক্ষে পাস করিয়ে নিয়েছিলেন। সব দলের সঙ্গে পরামর্শ করার এই যে মানসিকতা, সেই মানসিকতারই প্রতিফলন ঘটল বাংলাদেশে। এটা বাংলাদেশের নেতাদের জন্যও একটি মেসেজ হতে পারে। সব দলের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই জাতীয় ঐক্য নিশ্চিত করা সম্ভব। মোদি পেরেছেন ভারতে। রাজ্যসভায় তার দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলেও সেখানে তিনি সবার সমর্থন নিশ্চিত করতে পেরেছিলেন। কিন্তু আমরা পারিনি।
নরেন্দ্র মোদির এই সফর ও যৌথ ঘোষণাপত্র সব ধরনের বিতর্কের ঊর্ধ্বে তা বলা যাবে না। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বেশকিছু বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না হওয়ায় তা এক ধরনের হতাশার জন্ম দেবে- এটা অস্বীকার করা যাবে না। প্রথমত, তিস্তার পানিবণ্টনের ব্যাপারে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকায় আমাদের তা হতাশ করেছে। মমতা ব্যানার্জি ঢাকায় এসেছিলেন আবারও। কিন্তু তা বাংলাদেশের স্বার্থে নয়, পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থেও নয়। তিনি এসেছিলেন মোদির অনুরোধে এবং মোদির স্বার্থে। এবারও আমরা তার কাছ থেকে কোনো কমিটমেন্ট পেলাম না। বরং তিনি বাংলাদেশ আত্রাই নদীতে বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহার করে নিয়েছে- কলকাতায় এ অভিযোগ তুলে তিস্তার পানিবণ্টনের বিষয়টি থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরানোর একটি অপচেষ্টা চালালেন। দীর্ঘ প্রায় ৪৩ বছরের যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকের ইতিহাসে ভারতের পক্ষ থেকে কখনও এ ধরনের অভিযোগ উত্থাপিত হয়নি। এবার হল। উদ্দেশ্য পরিষ্কার- মমতা সম্ভাব্য তিস্তা চুক্তির পেছনে ছুরিকাঘাত করতে চান।
দ্বিতীয়ত, ৬৫ দফা যৌথ ঘোষণাপত্রে অঙ্গীকার করা হয়েছে যে, ২০২১ সালে বাংলাদেশ যে ২৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করার পরিকল্পনা করছে, সেখানে ভারত অংশীদার হতে চায়। অংশীদার হওয়া এক বিষয়, আর বিদ্যুতের নিয়ন্ত্রণ ভারতের হাতে চলে যাওয়া অন্য বিষয়। এখন পরিস্থিতি কী সেদিকেই যাচ্ছে না? দুটি ভারতীয় কোম্পানির (রিল্যায়েন্স ও আদানি) সঙ্গে ৪ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যাপারে চুক্তি হয়েছে। এতে কি বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষিত হয়েছে? হলে কতটুকু হয়েছে? রিল্যায়েন্স করবে এলএনজি প্ল্যান্ট। তরলকৃত গ্যাস দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। কিন্তু অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ লাইন টেনে নেয়ার দায়িত্বটি বাংলাদেশের। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম কিংবা চুক্তির বিস্তারিত আমরা জানি না। বিদ্যুৎ বিভাগের ওয়েবসাইটেও তা প্রকাশ করা হয়নি। আর আদানি গ্রুপ ভারতীয় কয়লায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। এটা সবাই জানে, ভারতীয় কয়লা নিকৃষ্টমানের। অথচ আমাদের ৫টি কয়লা খনিতে যে কয়লা পাওয়া যায়, তা উন্নতমানের, বিটুমিনাস কয়লা। প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের কয়লা দিয়ে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র করা হল না কেন? উপরন্তু আমাদের দেশে এখন অনেক উদ্যোক্তা রয়েছেন, যারা বিদ্যুৎ সেক্টরে বড় বিনিয়োগ করতে পারেন। তাদের কেন এ সুযোগটি দেয়া হল না? উন্মুক্ত টেন্ডারেও দুটি ভারতীয় কোম্পানিকে এ কাজ দেয়া হয়নি। সরকারের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগের কারণে এবং মোদির ব্যক্তিগত আগ্রহেই এ কাজ ভারতীয় কোম্পানি পেয়েছে। এটা এখন অনেকেই জানেন, আদানি গ্রুপ গুজরাটের ব্যবসায়ী গ্রুপ। তাদের সঙ্গে মোদির ব্যক্তিগত সখ্য রয়েছে। মোদির নির্বাচনী প্রচারণায় এই শিল্পগোষ্ঠীর অবদান ছিল অনেক। এখন তারা বাংলাদেশে একটি কাজ পেল। হয়তো অনেকেই জানেন না, আদানি গ্রুপ বাংলাদেশে গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণেও আগ্রহ দেখিয়েছিল। অথচ এ কাজে এদের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। রিল্যায়েন্স গ্রুপের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
তৃতীয়ত, ভারত যে ২০০ কোটি ডলার ঋণের প্রতিশ্র“তি দিয়েছে, তাতে বাংলাদেশ কতটুকু লাভবান হবে? এ ঋণ নেয়া হবে সাপ্লায়ার্স ক্রেডিটের আওতায়। আমরা অনেক আগে থেকেই বলে আসছি সাপ্লায়ার্স ক্রেডিটে নেয়া ঋণ ভালো ঋণ নয়। এতে করে ঋণ দেয়া দেশের কাছে দায়বদ্ধতা বরং ভারতীয় স্বার্থই রক্ষা করবে বেশি। সম্প্রতি ভারতের পত্রিকা টাইমস অব ইন্ডিয়াও একই ধরনের মন্তব্য করেছে। তারা বলেছে, ঋণের অর্থ যেসব প্রকল্প ব্যয় করা হবে, তার কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও সেবা ভারত থেকে কিনতে হবে। অর্থাৎ ঋণের দায় বাংলাদেশের, আর সুদাসল ছাড়াও রফতানি ব্যবসা হবে ভারতের। এ ঋণের টাকায় যেসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে, তাতে ভারতের ৫০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে। দেখা যাবে, এসব প্রকল্পে যে জনবল ও পণ্য দরকার হবে (ঠিকাদার, ইস্পাত, সিমেন্ট, ইট, যন্ত্রপাতি, ইঞ্জিনিয়ার), তা সরবরাহ করবেন ভারতীয় ব্যবসায়ীরা। এমনকি অদক্ষ জনশক্তিও আসতে পারে। অথচ এসব পণ্য বাংলাদেশ উৎপাদন করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা বিদেশেও রফতানি হয়। আমাদের দক্ষ জনশক্তি (ইঞ্জিনিয়ার, আর্কিটেক্ট) আছে। কিন্তু আমরা তাদের এ ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারব না। তাই আমরা কখনও বলি না সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট একটি ভালো ঋণ। একসময় সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো এ ধরনের ঋণ দিত (তারা অবশ্য বার্টার ট্রেড করত; আমাদের পণ্য নিত বিনিময়ে)। ভারত কিন্তু তা করবে না। বার্টার ট্রেডে ভারতের সঙ্গে আমাদের ব্যবসা হয় না।
মোদির সফরের প্রাক্কালে আমাদের প্রত্যাশা ছিল অনেক। যেমন বলা যেতে পারে তিস্তাসহ সব নদীর পানিবণ্টন, বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, আঞ্চলিক যোগাযোগ বা কানেকটিভিটি, ভারতের স্থলবন্দরগুলোতে ওয়্যার হাউস নির্মাণ, এলসি ওপেন করার ব্যাপারে ভারতের সাতবোন রাজ্যে অবস্থিত ব্যাংকগুলোতে সুযোগ দান, কান্ট্রি অব অরিজিনের ঝামেলা দূর করা, ওষুধের ক্ষেত্রে ভারতের নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা, সীমান্ত হত্যা বন্ধ করা, ভিসা সহজীকরণ এবং শুল্ক-অশুল্ক বাঁধা দূর করা। এতে কোনো একটি ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট অগ্রগতি হয়েছে, তা বলা যাবে না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আশাবাদ ও প্রতিশ্র“তি দেয়া হয়েছে। এতে করে আমাদের স্বার্থ রক্ষিত হবে কম।
আরও একটি কথা- যৌথ ঘোষণাপত্রে একটি উপ-আঞ্চলিক জোট বিবি আইএন (বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, নেপাল) গঠনের কথা বলা হয়েছে। পাঠকদের একটু স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, এ ধরনের একটি উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রস্তাব ভারত অনেক আগেই দিয়েছিল। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেবগৌড়ার বাংলাদেশ সফরের সময় (জানুয়ারি ১৯৯৭) ভারত এই ৪টি দেশ নিয়ে (ভারতের সাতবোন রাজ্য) একটি উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছিল। পরবর্তীকালে এই উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার নতুন নাম হয় দক্ষিণ এশীয় উন্নয়ন চতুর্ভুজ (এসএজিকিউ)। ১৯৯৭ সালের এপ্রিলে কাঠমান্ডুতে চার দেশের পররাষ্ট্র সচিবদের যে বৈঠক হয়েছিল, তাতে এসএজিকিউ গঠনের সিদ্ধান্তও হয়েছিল। সার্ক সম্মেলনেও এসএজিকিউ গঠনে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এখন এসএজিকিউর পরিবর্তে আমরা পেলাম বিবি আইএন। এটা অনেকেই জানেন, শুধু ভারতের কারণেই সার্ক বিকশিত হতে পারছে না। সার্কের একটি সম্ভাবনা থাকলেও তা বিকশিত হয়নি। এখন বিবি আইএন বাস্তবায়িত হলেও সেখানে ভারতের কর্তৃত্ব ও প্রভাব বাড়বে। ভারত তার সাতবোন রাজ্যের উন্নয়নে এই উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতাকে ব্যবহার করবে। আর এতে ধীরে ধীরে সার্ক একটি অকার্যকর সংগঠনে পরিণত হবে। উল্লেখ্য, ১৯৯৭ সালের ১২-১৪ মে মালেতে স্বাক্ষরিত সাফটার (সাউথ এশিয়ান ফ্রি-ট্রেড অ্যারেঞ্জমেন্ট) ভবিষ্যৎও এখন অনিশ্চিত। সাফটা অনুযায়ী ২০০১ সালের মধ্যেই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে কোনো ধরনের ট্যারিফ, প্যারা-ট্যারিফ থাকার কথা নয়। সাফটায় বাংলাদেশকে কম উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল। এতে করে বাংলাদেশী পণ্য ভারতে প্রবেশের ব্যাপারে বিশেষ সুবিধা পাওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশ তা পাচ্ছে না। আসলে বাংলাদেশে ভারতীয় পণ্যের একটি বড় বাজার সৃষ্টি হয়েছে। এখন কানেকটিভিটি চুক্তিটি দ্বিপক্ষীয়ভাবে বাস্তবায়িত হওয়ায় সাতবোন রাজ্যে বাংলাদেশী পণ্যের যে বিশাল বাজার রয়েছে, তা হুমকির মুখে পড়বে। দ্বিপাক্ষিকতা কোনো ভালো অ্যাপ্রোচ হতে পারে না। বহুপক্ষীয়ভাবেই সমস্যার সমাধান ও উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদ প্রাপ্তিকে আমরা সমর্থন করেছি এবং যৌথ ঘোষণাপত্রেও তা আছে। কিন্তু এতে করে অনেক প্রশ্নের জন্ম হতে পারে এখন। এক. জাপান এতে অখুশি হতে পারে। কারণ জাপানও স্থায়ী সদস্যপদ পেতে চায়। আমাদের জাপানকেও সমর্থন করা উচিত। জাপানের সঙ্গে সম্পর্ক আমাদের অর্থনৈতিক কূটনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। জাপানের সঙ্গে আমাদের স্বার্থ অনেক বেশি। দুই. ভারতের স্থায়ী সদস্যপদে চীনের আপত্তি রয়েছে। এখন ভারতকে বাংলাদেশের সমর্থন চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে একটি ঝুঁকির মাঝে ঠেলে দিল। চীন অসন্তুষ্ট হয় এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া আমাদের ঠিক নয়। চীনের সঙ্গে আমাদের স্বার্থ বেশি। চীন সফর করে প্রধানমন্ত্রী একটি ভারসাম্যমূলক পররাষ্ট্র নীতি পরিচালনা করে আসছিলেন, যা সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছিল। কিন্তু এখন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতিতে একটু টিল্ট পলিসি, অর্থাৎ ভারতের দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা লক্ষণীয়। সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ কাজ চীনকে না দেয়া (এ পরিকল্পনা ভারতের আপত্তির কারণে বাতিল হয়েছে), কিংবা বিসিআইএম জোটকে (বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার) গুরুত্ব না দিয়ে বিবি আইএনকে গুরুত্ব দেয়ায় চীনের সঙ্গে সম্পর্ক শীতল হতে বাধ্য। বিসিআইএম জোট বিকশিত না হলে (যা এখন কাগজে-কলমে থেকে যেতে পারে) আশিয়ানভুক্ত দেশে সঙ্গে আমাদের স্বার্থ বিঘিœত হবে। আমাদের পণ্যের বাজার সম্প্রসারিত হবে না।
নরেন্দ্র মোদির বক্তব্য আর প্রতিশ্র“তির রেশ যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আরও কিছুদিনের জন্য থেকে যাবে, তা অস্বীকার করা যাবে না। নরেন্দ্র মোদি যখন বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে তার বক্তৃতায় আমাদের দেশের সাকিব-নিশাতদের কৃতিত্বকে স্বীকৃতি দেন, তখন একটা ধারণা জন্ম হয় যে, তিনি বাংলাদেশকে সমমর্যাদার দৃষ্টিতে দেখতে চান। আমরা এমনটাই চাই। ভারতের ২,৩০৮ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি থেকে আমরাও উপকৃত হতে চাই। দেখতে চাই নিজেদের উন্নত দেশ হিসেবে। কিন্তু ভারতের আমলাতন্ত্রের মানসিকতায় আদৌ পরিবর্তন আসবে কি-না, সেটাই বড় প্রশ্ন এখন। নরেন্দ্র মোদির দেয়া প্রতিশ্র“তি যদি বাস্তবায়িত না হয়, তাহলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে আরও উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যাবে না। ভারত যদি শুধু নিজেদের স্বার্থ দেখে, বাংলাদেশের স্বার্থ না দেখে, তাহলে দিল্লির প্রতি অবিশ্বাস আরও বাড়বে। ব্যবসাবান্ধব প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আগামীতে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটুকু দেখবেন, সেটাই বড় প্রশ্ন এখন।
ড. তারেক শামসুর রেহমান : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Posted in নির্বাচিত কলাম | Comments Off on তিনি এলেন, দেখলেন, জয় করতে পারলেন কি?

মোদীর ঐতহিাসকি সফর

1433779037হাসনাত আবদুল হাই
ভারতরে প্রধানমন্ত্রী নযিুক্ত হয়ে নরন্দ্রে দামোদর মোদী তার শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে যখন র্সাক জোটভুক্ত দশেগুলোর সরকার প্রধানকে আমন্ত্রণ জানান তখনই বোঝা গয়িছেলি য,ে তনিি তার পররাষ্ট্রনীততিে প্রতবিশেীদরে সঙ্গে সুসর্ম্পক স্থাপনরে ওপর বশিষে গুরুত্ব দবেনে। কন্তিু এরপর তনিি ভুটান, নপোল ও শ্রীলঙ্কা সফরে গলেওে বাংলাদশেে আসনেন,ি কবে আসবনে তাও জানানন।ি এতে করে মনে হয়ছেে তনিি বুঝি বাংলাদশেরে প্রতি বরিূপ এবং বাংলাদশেরে সঙ্গে সুসর্ম্পক স্থাপনে তার তমেন আগ্রহ নইে।
নউিইর্য়কে জাতসিংঘরে সাধারণ অধবিশেনে যোগদানরে সময় বাংলাদশেরে প্রধানমন্ত্রী শখে হাসনিার সঙ্গে তার অনানুষ্ঠানকি সাক্ষাত্ হয়ছেলি। প্রধানমন্ত্রী শখে হাসনিা মোদীকে দু’দশেরে মধ্যে বদ্যিমান সমস্যাগুলো সমাধানরে জন্য অনুরোধ জানালে তনিি উত্তরে বলনে, ‘আমার ওপর বশ্বিাস রাখুন’।
তখন এই উক্তকিে কূটনতৈকি চাল মনে হয়ছেলি। তাকে এবং তার দলকে অবশ্বিাস করার কারণ হসিবেে কাজ করছেে কংগ্রসে সরকাররে সময় স্থলচুক্তি সম্পাদনে বরিোধতিা। মনে হয়ছেে সইে বরিোধতিার জরে এখনো চলছ।ে কন্তিু এই ধারণা যে ভ্রান্ত, শগিগির তার প্রমাণ পাওয়া গলে। মোদীর দল ১৯৭৪ সালরে যে স্থলচুক্তি ২০১১ সালে বরিোধতিা করছেলি ২০১৫ সালে সইে চুক্তি সম্পাদনে তত্পর হয়ে উঠলো। এ সর্ম্পকে রাজ্যসভায় যে বলিটি ঝুলে ছলি সটেি পাস করার উদ্যোগ নয়োর পর অন্যান্য রাজনতৈকি দলে এমন কি বজিপেরি ভতের যে আপত্তি ছলি তা জয় করতে যা যা করা প্রয়োজন মোদী তাই করলনে। ফলে সকল দলরে মধ্যে ঐকমত্য প্রতষ্ঠিতি হলো এবং রাজ্য সভায় স্থলচুক্তি সংক্রান্ত বলিটি পাস হলো। মোদী সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদশেরে প্রধানমন্ত্রীকে সুসংবাদটি দলিনে এবং জানালনে চুক্তটিি চূড়ান্ত করার জন্য তনিি বাংলাদশে সফরে আসবনে। তখন বোঝা গলে তনিি কনে বাংলাদশেে ভারতরে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরপরই আসনেন।ি বাংলাদশেকে সন্তুষ্ট করবার মত কছিু না নয়িে তনিি এখানে আসতে চান না।
ভারতরে প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদশে সফররে প্রথম দনি ৬ জুন তারখিইে স্থলচুক্তরি প্রটোকল বনিমিয় হলো। এর ফলে ১৯৭৪ সালে ইন্দরিা-মুজবি স্থলচুক্তি চূড়ান্তভাবে সম্পাদতি হলো। প্রায় ১৬২টি ছটিমলরে অধবিাসীরা বহুদনিরে প্রত্যাশতি আইনি অধকিার পলে। বআেইনভিাবে অধকিৃত ভূমওি দুটি দশেরে মধ্যে বনিমিয় হওয়ার জন্য চুক্তি হলো। মোদীর বাংলাদশে সফরে স্থলচুক্তি সম্পাদনই ছলি সবচয়েে গুরুত্বর্পূণ। যে সমস্যাটি ৪১ বছর অমীমাংসতি ছলি তার চূড়ান্ত সমাধান হয়ে গলে।
স্থলচুক্তি ছাড়াও আরো ২১টি চুক্তি এবং প্রটোকল সম্পাদতি হয়ছে।ে এদরে মধ্যে রয়ছেে কলকাতা থকেে ঢাকা হয়ে আগরতলা এবং ঢাকা থকেে শলিং ও গৌহাটি বাস যাত্রার সূচনা। দুই প্রধানমন্ত্রী সরজেমনিে উপস্থতি থকেে উভয় রুটে বাস যাত্রার উদ্বোধন করলনে। এর ফলে কানকেটভিটিতিে নতুন মাত্রা যোগ হলো। দু’দশেরে মধ্যে বাস যাত্রা ছাড়াও স্থল ও নৌযাত্রায় ভারত থকেে উত্তর র্পূবাঞ্চলে মালামাল পরবিহনরে চুক্তওি সম্পাদতি হয়ছে।ে স্থলপথরে ওপর চাপ কমাবার জন্য উপকূলীয় অঞ্চলে নৌ-পরবিহন সর্ম্পকে চুক্তি হয়ছে।ে স্থলচুক্তরি পরই কানকেটভিটিরি জন্য দুই দশেরে মধ্যে সম্পাদতি চুক্তগিুলো গুরুত্বর্পূণ। ভারত বহুদনি থকেইে এই সুযোগ চয়েে আসছলি। বাংলাদশে প্রায় র্শতহীনভাবে ভারতকে এই সুযোগ দয়িে তার সদচ্ছিার প্রমাণ রাখলো।
মোদীর বাংলাদশে সফররে সময় ভারত সরকার যে ২০০ কোটি ডলার ঋণ দবেে সটেওি উল্লখেযোগ্য। ঋণরে র্অথ দয়িে কানকেটভিটিি শক্তশিালী করার উদ্দশ্যেে স্থল ও রলেপথরে সংস্কার করা হব।ে আশুগঞ্জ স্থলবন্দররেও উন্নয়ন করা হব।ে ঋণরে র্অথ দয়িে যা কনোকাটা করা হবে তার ৭৫ শতাংশ আসবে ভারত থকে।ে এই ঋণ দয়ো হবে সহজ র্শত।ে তবে দখেতে হবে ক্রয়কৃত পণ্যগুলো যনে নম্নিমানরে না হয়। সুদরে হার হবে শতকরা ১ ভাগ যা খুবই সন্তোষজনক। পরশিোধরে জন্য নর্দিষ্টি করা হয়ছেে ২০ বছর—এর সঙ্গে যুক্ত হবে আরো ৫ বছর। এর আগে ভারত যে ১০০ কোটি ডলার ঋণ দয়িছেলি তার ব্যবহার খুব সন্তোষজনক ছলি না। বাংলাদশে যমেন প্রকল্প তরৈতিে দরেি করছেে ভারতও প্রকল্পরে অনুমোদন দতিে র্দীঘ সময় নয়িছে।ে ভবষ্যিতে এমন হবে না বলে আশা করা যায়।
মোদীর সফররে সময় ক্রস র্বডার টরেরজিম নয়িে আলোচনা হয়ছে।ে ভারতকে আশ্বস্ত করা হয়ছেে য,ে ভারতকে সন্ত্রাসে আক্রান্ত হতে দবেে না বাংলাদশে। ভারতরে পক্ষ থকেে ভারতে গমনচ্ছেু বাংলাদশেদিরে ভসিা প্রদান আরো সহজ ও ঝামলোমুক্ত করার জন্য পদক্ষপে নয়ো হবে বলে জানানো হয়ছে।ে র্বডারে বএিসএফরে গুলতিে বাংলাদশেদিরে নহিত হওয়ার বষিয়টওি আলোচনায় এসছে।
র্অথনতৈকি সহযোগতিা বৃদ্ধরি জন্য সুস্পষ্ট পদক্ষপে নয়ো হয়ছে।ে ব-েসরকারি সংস্থা এডনি গ্রুপ ও রলিায়ন্সে গ্রুপ বাংলাদশেে প্রায় ৫০০০ (পাঁচ হাজার) মগোওয়াট বদ্যিুত্ উত্পাদনরে জন্য পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপন করব।ে বাংলাদশে ভারতরে শল্পি ও ব্যবসায়ীদরে—জন্য বশিষে র্অথনতৈকি এলাকা নর্দিষ্টি করে দবে।ে
এত কছিু ইতবিাচক ফলাফলরে মধ্যে হতাশাব্যাঞ্জক ছলি তস্তিা নদীর পানি বন্টন নয়িে কোনো চুক্তি না হওয়া। প্রথমে বলা হলওে পরে ভারতরে পক্ষ থকেে জানানো হয় য,ে মোদীর সফররে সময় তস্তিা চুক্তি হবে না। এর প্রধান কারণ পশ্চমিবঙ্গরে মুখ্যমন্ত্রীর বরিোধতিা। প্রকৃতপক্ষে মোদীর সফররে সবচয়েে রহস্যময় ঘটনা ছলি মমতার কৌশলী অবস্থান। তনিি মোদীর সফরসঙ্গী হনন,ি আগরে দনি চলে এসছেলিনে। মোদী-হাসনিার সব আলোচনায় অংশ ননেনি কবেল স্থলচুক্তরি সময় উপস্থতি ছলিনে আর দু’দশেরে মধ্যে বাস যাত্রা উদ্বোধনে অংশ নয়িছেনে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আলাদাভাবে এসছেলিনে এবং ফরিওে গছেনে আলাদাভাব।ে নরন্দ্রে মোদীর সফরসঙ্গী হসিাবে তাকে উল্লখে করা হউক—এমনটা হয়তো তনিি চানন।ি এই সবরে মধ্য দয়িে তনিি তস্তিা নদীর পানি বন্টন নয়িে তার কৌশলগত অবস্থানরে কথা জানয়িে দয়িছেনে। স্মরণযোগ্য কয়কেমাস আগে তনিি যখন অভনিতো, অভনিত্রেী, তারকাদরে নয়িে ঢাকা সফরে আসনে তখন স্পষ্ট ভাষায় বলছেলিনে যে তার ওপর তস্তিা নদীর পানি বণ্টন বষিয়ে বাংলাদশেরে আস্থা রাখা উচতি। তার এবাররে সফরে সইে আস্থা কছিুটা র্দুবল হয়ে গলে। চুক্তি না হলওে বষিয়টি নয়িে আলোচনা হতে পারতো এবং একটা সময়সীমা বঁেধে দয়ো যতে।
নরন্দ্রে মোদী অবশ্য বলছেনে ভারত ও বাংলাদশেরে মধ্যে যে ৫৪টি অভন্নি নদী রয়ছেে সবগুলো নয়িইে সমাধানরে পথ বরে করতে হব।ে তনিি বশিষে করে বলছেনে, তস্তিা ও ফনেী নদীর পানি বণ্টন নয়িওে সুন্দর সমাধান হব।ে
নরন্দ্রে মোদী বাংলাদশেকে অনকে উপহার দয়িছেনে, পয়েছেনেও অনকে। দু’দশেরে মধ্যে সুসর্ম্পক স্থাপনে এখন প্রধান প্রতবিন্ধক হয়ে রইলো তস্তিা নদীর পানি বণ্টন। মোদী তার রাজনতৈকি প্রজ্ঞা ও কৌশল ব্যবহার করে অচরিইে এই সমস্যা সমাধান করবনে বলে বাংলাদশে আশা কর।ে
হ লখেক :কথাশল্পিী ও সাবকে সচবি

Posted in নির্বাচিত কলাম | Comments Off on মোদীর ঐতহিাসকি সফর

তৃষ্ণা যে রয়েই গেল

Tushar-Abdullah-400x407যতুষার আবদুল্লাহ : মোদি যখন উড়াল দিলেন তখন ঢাকার তাপমাত্রা ছিল ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তিনি যখন ঢাকায় পা রেখেছিলেন তখন ঢাকার তাপমাত্রা ছিল ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অর্থাৎ উষ্ণতার মাঝেই আগমন ও বিদায়। প্রশ্ন হচ্ছে এই উষ্ণতার কতটুকু আর্দ্রতা বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে রয়ে গেল।
নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর থেকেই তার সফরের ক্ষণগণনা করতে শুরু করেছিল বাংলাদেশ। মোদি বাংলাদেশকে তৃষ্ণায় রেখেই ১৮টি দেশ ঘুরে এলেন। যাইহোক অবশেষে এলেন তো। কীভাবে এলেন? তিনি আসার আগে জানা গিয়েছিল চার রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সঙ্গী হবেন তার। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও ছিলেন সেই দলে। মমতা আসবেন কি আসবেন না এনিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছিল। জল্পনার অবসান ঘটিয়ে তিনি এলেন একদিন আগেই। অন্য তিন মুখ্যমন্ত্রী এলেন না। কেন এলেন না, স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই।
মমতা উঠলেন পৃথক হোটেলে। চলেও গেলেই মোদিকে ঢাকায় রেখে। মাঝখানে মোদির সঙ্গে একান্ত বৈঠকে বসলেন। একে কি নিরপেক্ষ ভেন্যুতে ‘শীতলতা’ অবসানের বৈঠক বলা যায়? পর্যবেক্ষকরা বিষয়টিকে সেভাবেই দেখছেন। কেউ কেউ বলছেন, মোদি ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যাওয়ার আগে, শেষমুহূর্ত পর্যন্ত হয়তো মমতাকে বশে আনার চেষ্টা করেছেন। মমতা বশ মানেননি। মোদিকে শুধু তিনি আনুষ্ঠানিক সঙ্গ দিয়ে গেছেন। টিভি ক্যামেরায় যতবার তাকে দেখা গেছে, তার কাষ্ঠ হাসিটিই দেখা গেছে কেবল। ফেব্র“য়ারিতে যখন এসেছিলেন, তখন তার যে প্রাণখোলা হাসি উপহার পেয়েছে বাংলাদেশ, তা ছিল অনুপস্থিত।
দুই দেশের মধ্যে ২২টি দ্বি-পক্ষীয় দলিল বিনিময় হয়েছে। এই বিনিময়ের প্রতিপাদ্য ছিল সংযোগ। এই সংযোগটি কার পক্ষে গেল সেটিই বিবেচনার বিষয়।
এবারের বিষণ্নতার কারণ একটাই- ‘তিস্তা’। মোদির দিক থেকে চাপ ছিল তিস্তা চুক্তির বিষয়ে ইতিবাচক হওয়ার। কিন্তু তিনি অটল থাকলেন তার অবস্থানে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভূমিধস বিজয়ী হয়ে আসা মোদি মমতাকে জয় করতে পারলেন না। মমতা বাহ্যিকভাবে মোদিকে চটাতে চাননি বলেই এই সফরে এসেছিলেন। এতে কেন্দ্রের সঙ্গে তার বহিঃসম্পর্কটি হয়তো ফাটলহীন থাকবে। কিন্তু দরকষাকষিতে মমতা জয়ী হওয়ায়, নরেদ্র মোদির সফরটি হয়ে গেল তার খাদ্যাভ্যাসের মতোই নিরামিষ।কেবল স্থল সীমান্ত চুক্তির প্রটোকল বিনিময়ের জন্য তো বাংলাদেশ তৃষ্ণার্ত ছিল না। তারা অপেক্ষায় ছিল তিস্তার জলের। শেষ ভরসা হিসেবে বাংলাদেশের জনগণ ভেবেছিল হয়তো নিজ নের্তৃত্বের কারিশমায় মোদি তার আস্তিন থেকে তিস্তার জল উপহার দেবেন। কিন্তু মোদি তার বক্তব্যে কেবল বললেন- ফেনী ও তিস্তা নদীর পানির অমীমাংসিত বিষয়টি মানবিক। এই বিষয়ে আলোচনার আশ্বাস রাখলেন। ব্যস এইটুকুই। আর কোনও কথা নয়। এর মধ্যে দিয়ে মোদি তার দেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চা, রাজ্য সরকারের ওপর কেন্দ্রীয় সরকারে সশ্রদ্ধ নির্ভরশীলতা ও পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে জাতীয় ঐক্যের নিদর্শন রাখলেন। হয়তো বাংলাদেশের নরেন্দ্র মোদির কাছ থেকে সর্বোচ্চ এই শিক্ষাটুকুই প্রাপ্ত হলো। প্রাপ্তি যোগের একটি তালিকাও তৈরি হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে ২২টি দ্বি-পক্ষীয় দলিল বিনিময় হয়েছে। এই বিনিময়ের প্রতিপাদ্য ছিল সংযোগ। এই সংযোগটি কার পক্ষে গেল সেটিই বিবেচনার বিষয়। চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের সুযোগ, মংলা ও ভেড়ামারায় বিশেষ অর্থনৈতিক জোন তৈরির অনুমোদন, দুই দেশের মধ্যে উপকূলীয় নৌ চলাচল বিষয়ক চুক্তি, ঢাকা-শিলং-গৌহাটি, কলকাতা-ঢাকা-আগরতলা বাস চলাচল চুক্তি এবং দুই বিলিয়ন ডলারের সমাঝোতা চুক্তি। বাকি সমাঝোতার বিষয়গুলো উল্লেখযোগ্য নয়। কেবল গাণিতিক সংখ্যা বাড়ানো বলা যায়।
যে কয়টির উল্লেখ করলাম তাতে প্রাপ্তি যোগ কার? অবশ্যই ভারতের। অর্থনৈতিক জোনে স্থাপিত হবে ভারতের শিল্প। সুন্দরবন ঘেঁষে তৈরি হবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যু কেন্দ্র। বাস চলাচলের সংযোগে উপকৃত হবে ভারতের দুই অঞ্চলের বিচ্ছিন্ন মানুষ। দুই বিলিয়ন ডলার খরচে যে সড়ক তৈরি হবে, তা দিয়ে ভারতের মালবাহী পরিবহন চলবে। ওই সড়ক তৈরির উপকরণও আনা হবে ভারত থেকে।
নরেদ্র মোদি বিদায় নেওয়ার আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্যে বলেছেন, উনি বিস্তারবাদ নয় বিকাশবাদে বিশ্বাসী। তার প্রমাণ এই সফরেই রেখেছেন তিনি। চুক্তি ও সমঝোতা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সঙ্গে না এনে তিনি আদানি ও রিলায়েন্সকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। এই দুই গোষ্ঠীর বিনিয়োগের বিকাশ তিনি ঘটাতে চান বাংলাদেশে। গভীর সমুদ্র বন্দরসহ বড় বড় প্রকল্পে হয়তো এই দুই গ্র“পকে দেওয়ার নির্দেশনা থাকবে মোদির।
মোদির সফরে ৪ হাজার ৬শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের চুক্তি হয়েছে। এই প্রকল্প তো বাংলাদেশের স্থানীয় উদ্যোক্তারাও করতে পারতেন। এককভাবে পারতেন, সিন্ডিকেট করেও পারতেন। উল্টো এখন ক্ষুদ্র বিদ্যুৎকেন্দ্র যে স্থানীয় বিনিয়োগ হয়েছে সেটিও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে গেল। মোদিকে নিয়ে আমোদ তৈরি হয়েছিল ঢাকা বা বাংলাদেশে সেটি তার সুভাষণ কিছুটা অক্ষুণ্ন রাখল বটে। অর্থনৈতিক জোনে স্থাপিত হবে ভারতের শিল্প। সুন্দরবন ঘেঁষে তৈরি হবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। বাস চলাচলের সংযোগে উপকৃত হবে ভারতের দুই অঞ্চলের বিচ্ছিন্ন মানুষ। দুই বিলিয়ন ডলার খরচে যে সড়ক তৈরি হবে, তা দিয়ে ভারতের মালবাহী পরিবহণ চলবে। ওই সড়ক তৈরির উপকরণও আনা হবে ভারত থেকে।
তবে আমোদে আবার কালি লেপন করে দিয়েছে বিএনপি। তারা মোদির দেখা পাওয়ার সুযোগ পেল, সুযোগ পেয়েই নালিশ নিয়ে গেল তার কাছে। ঘরের সমস্যা নিয়ে কেন মোদির কাছে? গণতন্ত্র অনুপস্থিত সেই বিষয়ে আলোচনা ঘরোয়াভাবে হবে। আওয়ামী লীগকে যেকোনও উপায়ে আলোচনায় নিয়ে আসতে হবে নিজেদের সাংগঠনিক দক্ষতা দিয়ে। এই কাজে ব্যর্থ হয়ে কেন মোদির মুখাপেক্ষী হওয়া?
নরেন্দ্র মোদি বিদায় ভাষণের শেষ পর্বে বলেছেন, আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়ি নদীটির তীরে।
তিনি আবার আসুন, এটা বাংলাদেশের মানুষ প্রত্যাশাই করতে পারেন। কিন্তু সেবার তার করতলে তিস্তার জল থাকবে তো? তৃষ্ণা যে রয়েই গেল। বাংলাট্রিবিউন
লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টেলিভিশন

Posted in নির্বাচিত কলাম | Comments Off on তৃষ্ণা যে রয়েই গেল

একটি ব্যর্থ রেসের ঘোড়ার আত্মহত্যার গল্প

faruk-wasifযুদ্ধক্ষেত্র থেকে ঘোড়াটি ফিরে এসেছে। পিঠে পরাজিত সৈন্যের লাশ। রাজা ভাবছে প্রাণহানির কথা নয়, পরাজয়ের কথা। আরাফাত শাওন নামের ফেনীর যে ছেলেটি জিপিএ-৫ না পেয়ে আত্মহত্যা করেছে, দেশের রাজরাজড়ারা এ ঘটনার মধ্যে শিক্ষাব্যবস্থার সংকটটি দেখুন, শোক আমাদেরই থাক। অকালে ঝরে যাওয়া প্রাণের বেদনা জীবিতদের অসন্তুষ্ট করবেই। আরাফাত শাওনের আত্মহত্যা দুঃসংবাদ। তার পরিবারের জন্য, শিক্ষাব্যবস্থার জন্য, তারুণ্যের জন্য এবং ভবিষ্যতের জন্য। প্রবাদ প্রচলিত, ‘দুঃসংবাদ দানকারীকে হত্যা করো না’। অথচ ছেলেটি নিজেকেই হত্যা করে দুঃসংবাদটি রটিয়ে দিয়েছে। সে এই টার্গেটমুখী শিক্ষাব্যবস্থা, কর্তৃত্বকারী পারিবারিক সংস্কৃতি, গণবিরোধী রাজনীতি; সবাইকে একসঙ্গে দাঁড় করিয়েছে অভিযোগের কাঠগড়ায়। ছোট্ট একটি চিঠিও সে লিখে গেছে।
শাওনের চিঠি সাক্ষ্য দেয়, প্রেরণার বদলে চারপাশ থেকে হতাশাই পেয়েছে সে‘..
.আমি আদৌ জানি না যে আমি কী? এই পরিবারের বা আমার মা-বাবার সন্তান, তা না হলে সব সময় এ রকম শাসন আর কড়া শাসনের ওপর আমাকে রাখা হয়েছে। কোনো বাবা-মা তাঁর সন্তানকে পড়ালেখার খরচে খোঁটা দেয় না। কিন্তু আমার মা-বাবা সব সময় আমাকে বলে তোর জন্য মাসে মাসে হাজার হাজার টাকা খরচ করছি। এভাবেই প্রতিনিয়ত বকাঝকা করা হয়। সব সময় বাবার থেকে শুধু খারাপ ভাষার গালি আর গালি শুনতে হয়, যা আমার একটু ভালো লাগত না। কিন্তু আমি এত দিন সহ্য করে ছিলাম। কারণ, কোনো কিছু করার কথা ভাবলে মনে হতো এ দুনিয়ায় তো বাবা-মায়ের আদর-ভালোবাসা পেলাম নাৃতাই এখন আমার আর এসব কিছু সহ্য হচ্ছে না।ৃআমাদের ছাত্রদের কী দোষ বলুন, আমরা তো আমাদের মতো চেষ্টা করে যাই। তবে আমাদের দেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডগুলোর কারণে আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থার এমন হাল। এর আগের বছর সরকার তার নিজের স্বার্থের জন্য শিক্ষার হার বাড়িয়ে দিয়েছে। আর এবার হরতাল-অবরোধ দেওয়ার ফলে বর্তমান সরকার বিরোধীদলীয় সরকারকে গালি দেওয়ার জন্য পাসের হার কমিয়ে দিয়েছে, যাতে দেশে ফেলের হার বেড়েছে। বলুন, আমরা আর কীভাবে ভালো রেজাল্ট করতে পারি!!!???’
মরার আগেই মরে গিয়েছিল সে। তার সাক্ষী এই কথাটি: ‘আমি জানি না আদৌ আমি কী?’। তার মানে পরিবার, রাষ্ট্র, সমাজ, সংস্কৃতি এবং প্রচলিত শিক্ষা নামক তিক্ত ওষুধ; কিছুই তার সহায় হয়নি। জানাতে পারেনি যে সে কে? কী তার জীবন? কী তার লক্ষ্য? প্রথম তারুণ্যেই সে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে। সে ভয়ংকর একা হয়ে গিয়েছিল। সবার ভেতর থেকেই একজন বুঝতে পারে যে সে কে। এগুলো যেন পিচ্ছিল পাহাড়ের ঢালে গাঁথা আংটার মতো, পড়ে যেতে গেলে যা ধরে বাঁচা যায়। কিন্তু তার শেষ চিঠি সাক্ষী, বাঁচার প্রেরণার বদলে এসব কিছু বরং তাকে আত্মধ্বংসের তাড়নাই দিয়ে গেছে।
সে অভিযোগ করেছে রাজনীতিকে, সরকারকে, বিরোধী দলকে, শিক্ষাব্যবস্থাকে এবং খুবই মর্মান্তিক হলেও সত্য, বাবা-মাকে। সাধারণ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের আবহসংগীত সন্তানদের নিয়ে ভয়ানক উদ্বেগ। সন্তান যেন ভবিষ্যতের বিনিয়োগ। টাকা ঢালা হবে, সময় ব্যয় করা হবে, বিনিময়ে তারা চাঁদ পেড়ে আনবে আকাশ থেকে! তারা জীবনে কী চায়, কী তাদের সত্যিকার ক্ষমতা ও প্রতিভা, কিসে তাদের সুখ-দুঃখ, তার খোঁজ কজন রাখে? বাবা-মাই বা কীভাবে জানবেন? তাঁরাও তো জীবনসংগ্রামে ক্লান্ত পদাতিক।
ছেলেটি যাঁদের দায়ী করে গেছে, তাঁরা কি সেই দায় অস্বীকার করতে পারবেন? আমাদের পরীক্ষাগুলো শিক্ষণমুখী না, ফলমুখী। সনদ বাজারে বিকায়। ঈর্ষাকাতর প্রতিযোগিতার মধ্যে থাকতে থাকতে অনেকেই হিংসুক অথবা হীনম্মন্য হয়ে যায়। তারা যেন বাজির ঘোড়া, না জিতলে ‘চাকরি নট’!
অনেক ঘোড়াই শেষ দাগ পার হয়, কিন্তু আরাফাত শাওনের মতো কেউ কেউ পড়ে যায়। কবি জয় গোস্বামী লিখেছেন: ‘তোমরা আমাকে নামিয়ে দিয়েছিলে খনির গহ্বরে আর আমি মুখে রতœকোষ ভরে উঠে আসতে পারিনি বলে, আমার শরীর থেকে খুলে নিয়েছিলে রঙিন সোনার পাত।’
কবি আমাদের অব্যক্তকে ভাষা দেন। তাঁরই টিওটোরিয়াল কবিতায় পর্যুদস্ত অভিভাবকের আহাজারি বাজে: তোমাকে পেতেই হবে শতকরা অন্তত নব্বই (বা নব্বইয়ের বেশি)। তোমাকে হতেই হবে একদম প্রথম। তার বদলে মাত্র পঁচাশি! পাঁচটা নম্বর কম কেন? কেন কম? এই জন্য আমি রোজ মুখে রক্ত তুলে খেটে আস্তি এই জন্যে তোমার মা কাকভোরে উঠে সব কাজকর্ম সেরে ছোটবেলা থেকে যেত তোমাকে ইস্কুলে পৌঁছে দিতে? তারপরে আঁচলে মুখ মুছে ঢুলত গিয়ে ভাপসা রান্নাঘরে? এই জন্যে?’ জ্বালাটা এখানেই শেষ নয়, আরও আছে। জয়ের কবিতার সেই বাবা তারপর বলছে, ‘এখনো যে টিউটোরিয়ালে পাঠিয়েছি, জানিস না, কী রকম খরচাপাতি তার? ওখানে একবার ঢুকলে সবাই প্রথম হয়। প্রথম, প্রথম! কারও অধিকার নেই দ্বিতীয় হওয়ার। রোজ যে যাস, দেখিস না কত সব বড় বড় বাড়ি ও পাড়ায় কত সব গাড়ি আসে, কত বড় আড়ি করে বাবা-মায়েরা ছেলেমেয়েদের নিতে যায়? আর ঐ গাড়ির পাশে, পাশে না পিছনে—ঐ অন্ধকারটায় রোজ দাঁড়াতে দেখিস না নিজের বাবাকে?’
পাঠক, বিশ্লেষণ, প্রতিকার, আচার-বিচার দরকার আছে। তার আগে দুঃখটা, হতাশাটা কেউ বুঝুক। অন্তত ভুক্তভোগীরা জানুক তারা একা নয়। এ রকম লাখ লাখ ভারবাহী অভিভাবক আর তাদের বাজির ঘোড়ারা এভাবে ধুঁকছে। দুঃখের মধ্যেই তো আমরা এক হই।
বাবা চান ছেলে তাঁর মুখ উজ্জ্বল করুক, মা চান দুঃখের দিন শেষ হোক একদিন। সবাই তাদের চিনুক। ছেলে বা মেয়েটির নাম পত্রিকার পাতায় উঠুক। সুখবরের পাশাপাশি কখনো তারা দুঃসংবাদও হয়ে যায়। অনেকেই এ চাপ সহ্য করে, কিন্তু কেউ কেউ পারে না। মাত্র কয়েকটি নম্বর কম পাওয়ার হতাশায় জীবনের চরম ভুলটি করে বসে। অথচ, জগতে কত কম নম্বর পাওয়া ছেলেমেয়ে বিরাট বিরাট কীর্তি করেছে। কত সামান্য মানুষ চুপচাপ অসাধারণ জীবন যাপন করছে। কেবল ঈর্ষা, কেবল প্রতিষ্ঠার উদগ্র লোভ কমালেই হয়। কিন্তু যে সমাজ-অর্থনীতি, যে বাজারি মনোভাব এবং যে হৃদয়-বুদ্ধি ধ্বংসকারী আবহে আমরা বাস করি, তার তেজস্ক্রিয়তা আরও বেশি। এটা নিজেই এখন কৈশোর-তারুণ্যের প্রাণশক্তি শোষণকারী যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। দোষ ব্যবস্থার, দায় সমষ্টির কিন্তু ভুগতে হয় ব্যক্তি মানুষকে, এ কেমন কথা?
পরিহাস, এত এত জিপিএ–৫, কিন্তু শিক্ষার মানের কী নিদারুণ অবনতি। ২০১১-১৪ পর্যন্ত তিন বছরে জিপিএ–৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের ৮১ শতাংশই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় ন্যূনতম পাস নম্বর পর্যন্ত তুলতে ব্যর্থ হয়েছে (ইত্তেফাক, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৪)। পরিসংখ্যানের শুভংকরের ফাঁকিটা সবাই যখন দেখতে পাচ্ছে, তখন শিক্ষাধ্বংসী ব্যবস্থাটা না বদলিয়ে শিক্ষা বা জীবনের জন্য মায়াকান্না করা অর্থহীন।
শাওন আরও লিখেছে, ‘অ+ কি গাছে ধরে যে আমি পেড়ে আনব?’। এর উত্তর বর্তমান শিক্ষাপদ্ধতির প্রবর্তকদেরই দেওয়া উচিত। আমি শুধু আফ্রিকার এক সুখী জনগোষ্ঠীর গল্প শোনাব। তাদের কেউ যদি কোনো ভুল করে, তাহলে তাকে নিয়ে আসা হয় গ্রামের একদম মাঝখানে। তারপর একে একে সবাই মিলে বলতে থাকে তার অতীতের সব সুকীর্তির কথা। দুদিন ধরে প্রতিবেশী-স্বজনদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে লোকটা সব লজ্জা আর দম্ভ ভুলে উঠে দাঁড়ায়, হয়ে ওঠে আগের চেয়েও সুখী ও সুন্দর এক মানুষ। তারা বিশ্বাস করে, কেউ ভুল করা মানে সে খুব বিপদে পড়েছে। তার এখন সবার সাহায্য দরকার। সবাই তখন তাকে দুষতে আসে না, বরং সেই ভুলের মধ্যে শুনতে পায় ‘আমাকে বাঁচাও’ আর্তনাদ। শাওনের আত্মহত্যার মধ্যে আমাদের সময়ের তরুণদের আকুল আর্তনাদ ধ্বনিত হচ্ছে, শুনতে কি পাও?
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।

Posted in নির্বাচিত কলাম | Comments Off on একটি ব্যর্থ রেসের ঘোড়ার আত্মহত্যার গল্প

ভাসতে ভাসতে ভাটি বাংলায়

kader-siddiqi1বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
অবস্থানের ১৩০তম দিনে কিভাবে যে কাকতালীয়ভাবে ভাসতে ভাসতে ভাটি বাংলার প্রাণকেন্দ্র ইটনায় গিয়ে পড়েছিলাম- সে এক বিস্ময়কর ব্যাপার। ব্রিটিশ ভারতে ধ্যান-জ্ঞান-সাধনার প্রাণকেন্দ্র ছিল বৃহত্তর ময়মনসিংহ। ভাইসরয়ের পিভি কাউন্সিলের সাত সদস্যের পাঁচজনই একসময় ছিলেন ময়মনসিংহের। জগদ্বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়, রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রবাদপুরুষ জর্জ বিশ্বাস, কমিউনিস্ট নেতা মণি সিং, তৈলক্ষ নাথ মহারাজ, নগেন সরকার, আনন্দমোহন বোস, গুরু দয়াল সরকার কেউ কিশোরগঞ্জের, কেউ নেত্রকোনার, টাঙ্গাইল, শেরপুর, জামালপুর, কারো বাড়ি ময়মনসিংহ সদর। স্বাধীনতাযুদ্ধের অন্যতম পুরোধা, স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের যশোধর। জয় সিদ্ধির স্যার আনন্দ মোহন বোস, ধলপুরের গুরু দয়াল সরকার, ঠিক তেমনি ইটনার একসময়ের প্রজাহিতৈষী জমিদার মহেষ গুপ্তের ছেলে কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রবাদপুরুষ ভূপেশ গুপ্ত। আরো কতজন যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন ভাবা যায় না। মসনদওয়ালা ঈশা খাঁর জঙ্গলবাড়ি, ১১ সিন্ধুর বীরত্বগাথা আজো অনেকের স্মৃতিতে অম্লান। চামটাঘাট থেকে রওনার সময় ভেবেছিলাম, রাস্তায় কোথাও জুমার নামাজ আদায় করব। গত ৩-৪ বছর ২-১ বার ওয়াক্তের নামাজ ছুট গেলেও জুমার নামাজ বাদ পড়েনি। চলতে চলতে বেলা পৌনে ১টায় ট্রলারচালককে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আর কত সময় লাগবে?’ ছেলেটি বলেছিল, ‘১৫ মিনিট।’ কিন্তু ইটনা পৌঁছতে ৪০ মিনিট লেগে যায়। তাই মনটা বেশ খারাপ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ছুটে গিয়ে এক রাকাত ফরজ নামাজ ইমামের পেছনে আদায় করি, আরেক রাকাত একাই পড়েছি। নামাজে দাঁড়াবার আগে যে বেদনাবোধ করছিলাম, নামাজ পেয়ে তা অনেকটাই কেটে যায়। দু’টা বেজে গিয়েছিল তাই বেশ ক্ষুধা অনুভব করছিলাম। করিমগঞ্জের বহু পুরনো কর্মী আদম আলী ট্রলারে খাবার দিয়ে দিয়েছিল। প্রথম উঠেছিলাম মুক্তিযোদ্ধা ছাত্রাবাসে। একেবারে পরিত্যক্ত অপরিষ্কার। তবু সেখানেই খেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কয়েক পা এগিয়েই উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রবাদপুরুষ ভারতের রাজ্যসভার আজীবন সদস্য ভূপেশ চন্দ্র গুপ্তের বাড়ি। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের কিছু দিন আগে ভূপেশ চন্দ্র গুপ্তের আত্মীয়স্বজন এক বিয়েতে অংশ নিতে কলকাতা গিয়েছিল। ঠিক সেই সময় দুই দেশের যুদ্ধ বাধে। তারপর তাদের আর ইটনায় ফেরা হয়নি। হালের গরু, বাড়ির উঠোনে শত শত মণ ধান অনেক দিন পড়ে থাকে। সেই বাড়িটি ভূমি অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ছেলেবেলায় শুনেছিলাম, ‘মাগনা পেলে কেউ কেউ জুতোর কালি খেতেও দ্বিধা করে না।’ বিনা পরিশ্রমে কোনো কিছু পেলে আমরা যে তা রেখে খেতে পারি না- ভূপেশ চন্দ্র গুপ্তের এই বাড়ি তারই প্রমাণ। ৬০-৬৫ বছর ধরে বাড়িটি সরকারের হেফাজতে। রক্ষণাবেক্ষণ করলে সেটি এখনো ঝকঝকে তকতকে থাকত। ৪০ ইঞ্চি মোটা সীমানাপ্রাচীর ধসে পড়ত না, ৩০ ইঞ্চির ভবনের দেয়ালগুলো খসে যেত না। সোনারগাঁ পানাম নগরীর যে দশা দেখেছি, এখানেও সেই একই অবস্থা।
শ্রী ভূপেশ চন্দ্র গুপ্ত ভারত উপমহাদেশে কমিউনিস্ট আন্দোলনের এক পথিকৃৎ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে বিলেতে লেখাপড়া করতেন। দু’জনের মধ্যে দারুণ সম্পর্ক ছিল। এখন মুক্তিযুদ্ধের কত ইতিহাস রচিত হয়, ডিপি. ধর, পি.এন. হাক্সার ছিলেন সরকারি কর্মচারী। প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত দূত হিসেবে সারা দুনিয়া চষে বেড়িয়েছিলেন ভারতের দ্বিতীয় গান্ধী সর্বোদয় নেতা জয় প্রকাশ নারায়ণ। কত নাম নিয়ে আলোচনা হয় কিন্তু ভূপেশ চন্দ্র গুপ্তের নাম আসে না, আসে না যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর শান্তিময় রায়ের নাম।
ইটনার ভূপেশ চন্দ্র গুপ্ত এবং সরিষাবাড়ীর শান্তিময় রায়কে স্বাধীনতার পরপরই চিনতাম। ‘৭২-এর জানুয়ারিতে শান্তিময় রায় টাঙ্গাইলে আমার কাছে এসেছিলেন তার গ্রামের বাড়ি সরিষাবাড়ী যেতে। তাকে লোকজন দিয়ে গাড়ি করে তার গ্রামের বাড়ি পাঠিয়েছিলাম। এরপর শান্তিময় রায় যখন যেভাবে পেরেছেন আমাকে সহায়তা করেছেন। বঙ্গবন্ধু নিহত হলে আমার যখন কোনো ঠিকানা ছিল না, মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল না, তখন তিনি তার যাদবপুরের বাড়িতে আমাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। ঠিক তেমনি ভূপেশ গুপ্তও একজন মহান মানুষ। ইন্দিরা গান্ধী সরকারের পতনের পর আমার যখন চরম দুর্দিন, চার দিকে নিদারুণ অন্ধকার, অথৈ পানিতে যেন ভাসছিলাম, কোনো কূল-কিনারা পাচ্ছিলাম না, তখন নেতাজী সুভাষ বোসের ছায়াসঙ্গী ফরওয়ার্ড বøকের নেতা সমর গুহ এমপি এবং ইটনার জমিদারপুত্র এই ভূপেশ গুপ্ত লোকসভা ও রাজ্যসভায় একের পর এক প্রশ্নবাণে মোরারজি দেশাইয়ের জনতা পার্টির সরকারকে নাস্তানাবুদ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিরোধ সংগ্রামীদের যাতে জিয়াউর রহমানের হাতে তুলে দেয়া না হয় তার জন্য লোকসভা এবং রাজ্যসভায় একের পর এক প্রস্তাব তুলেছিলেন। আমার বর্ধমানের বাড়িতে একদিন ভূপেশ দা ছুটে এসেছিলেন। তাই তার ইটনার জরাজীর্ণ বাড়ির দক্ষিণে তাঁবু ফেলে রাত কাটানো এবং সেখানে বসে দু’কথা লিখতে গিয়ে সত্যিই পরোপকারী ভূপেশ দার কথা বার বার মনে পড়ছে। এই অঞ্চলে স্কুল-কলেজ-খেলার মাঠ যেখানে যা প্রয়োজন তার পূর্ব পুরুষরা করেছেন। ইটনার তার পৈতৃক বাড়ি সরকারি হেফাজতে থাকত, তাতে কোনো দোষ ছিল না। কিন্তু যদি যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ হতো, উপজেলা তহসিল অফিস বানিয়ে ধ্বংস করা না হতো- সেটা হতো সম্মানের। মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদের একসময়ের নির্বাচনী এলাকা ইটনা। এমপি হিসেবে কিছু করতে পারেননি সেটা মেনে নেয়া গেলেও রাষ্ট্রপতি হিসেবে কিছুই করতে পারবেন না সেটা কিন্তু মেনে নেয়া যাবে না। অপেক্ষায় রইলাম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অসাধারণ ভূমিকা রাখা প্রাতঃস্মরণীয় এই মানুষটির পৈতৃক নিবাস আরো কিছুকাল সগৌরবে দাঁড়িয়ে থাকবে, নাকি মহাকালের করাল গ্রাসে ধ্বংস হয়ে যাবে।
ইটনা আসার আগে ছিলাম করিমগঞ্জের বৌলাই। সে এক মর্মান্তিক হৃদয়বিদারক ঘটনা। আজ থেকে ১৫ বছর আগে ১৪ জুলাই করিমগঞ্জে এক জনসভার আহ্বান করা হয়েছিল। নতুন দল সবার মধ্যে নতুন উদ্দীপনা। অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান ভাটি বাংলার এক অবিসংবাদিত নেতা, মিঠামইনের অ্যাডভোকেট ফরিদ, কিশোরগঞ্জের হান্নান মোল্লা, ফারুক আহমেদ, অ্যাডভোকেট আজিজ আরো কতজন নতুন সম্ভাবনার স্বপ্ন নিয়ে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের গামছা ধরেছিল। কিশোরগঞ্জের শহীদী মসজিদে নামাজ পড়ে অ্যাডভোকেট আজিজের বাড়িতে খাবার খেয়ে করিমগঞ্জের পথে রওনা হয়েছিলাম। তখনকার দাপুটে নেতা করিমগঞ্জের হর্তাকর্তা বিধাতা অধ্যাপক মিজানুর রহমানের লোকজন বৌলাতে আমাদের বাধা দেয়। তারা স্লোগান তোলে, ‘করিমগঞ্জের মাটি, মিজান স্যারের ঘাঁটি।’ শুধু মিজান স্যারই করিমগঞ্জে থাকবেন, আর কেউ নয়। আসর, মাগরিব, এশার নামাজ আদায় করে সেখান থেকে ফিরেছিলাম। করিমগঞ্জের ওসি, ইউএনও, কিশোরগঞ্জের এডিসি আরো অনেক পুলিশ কর্মকর্তা তামাশা দেখতে গিয়েছিল। রাস্তায় বাধা দেয়ার জন্য থানায় ডায়েরি করলেও তার কোনো প্রতিকার হয়নি। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলাম, থানার ডায়েরিতে কাজ না হলেও আল্লাহর ডায়েরিতে কাজ হয়েছে। করিমগঞ্জ এখন আর মিজান স্যারের ঘাঁটি নেই, মিজান স্যারও নেই। দয়াময় আল্লাহ সেদিন যেমন দয়া করেছিলেন, আজো একইরকম করছেন।
এবার শবেবরাতের জন্য ১, ২, ৩ তারিখ একনাগাড়ে ভাটগাঁওয়ে জিয়াউদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজের পাশে ঈদগাহ মাঠে ছিলাম। গাছপালা না থাকায় রোদে পুড়লেও বাতাস ছিল নির্মল। তিনটা দিন তিনটা রাত এলাকার মানুষ বড় আপন করে নিয়েছিল। তাঁবুর পাশের আরমান ক্লাস ফাইভের ছোট্ট একটি ছেলে হৃদয় কেড়ে নিয়েছে। তা ছাড়া সাবেক সৈনিক নুরুদ্দীন, তার ভাই এবং বিএনপি সমর্থক স্কুলের নৈশপ্রহরী এলাকার সম্মানী ব্যক্তি আব্দুস সাত্তারকে খুবই ভালো লেগেছে। চলে আসার সময় নুরুদ্দীনের মায়ের সাথে দেখা। সে এক অভাবনীয় ব্যাপার। শবেবরাতের আগে কটিয়াদী মধ্যপাড়া স্কুলের পাশে শ্মশানঘাটে ছিলাম আর ভাটগাঁওয়ে ছিলাম কবরস্থানের পাশে। ‘৭৫-এ বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর আমরা প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়ে না তুললে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের হাতে আওয়ামী লীগের মুসলমান নেতাদের জায়গা হতো কবরে, হিন্দুদের শ্মশানে। কী করা যাবে, মুক্তিযুদ্ধ শেষে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যেমন প্রতারণা করা হয়েছে, তেমনি বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিরোধ সংগ্রামীদের সাথে একইরকম করা হয়েছে। যাদের জন্য বঙ্গবন্ধু নিহত হয়েছেন, তারা আজ জননেত্রীর কল্যাণে ক্ষমতায় আর যারা হত্যার প্রতিবাদ, প্রতিরোধ করেছে তারা শত্রু। সবই আল্লাহর ইচ্ছা, সবই আল্লাহর কুদরত। তিনি ফকিরকে বাদশা, বাদশাকে ফকির করেন।
বছরটা মনে নেই, বৌলাই অবরোধের পর করিমগঞ্জ গিয়েছিলাম। কলেজ মাঠে মিটিং ছিল। সোহেল নামে ছোট এক শিশু আকুল হয়ে ক্াঁদছিল। ‘কী হয়েছে?’ জিজ্ঞেস করতেই সে বলেছিল, ভৈরব রেলস্টেশনে মোবাইল কোর্ট তার বাবাকে ধরে জেলে পাঠিয়েছে। তখনই গাজীপুরের সভাপতি ইকবাল সিদ্দিকীকে বলেছিলাম, জেলে গিয়ে জরিমানা দিয়ে সোহেলের বাবাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিতে। রেল বিভাগের কাগজ জেলগেটে ছিল না। তাই সে রাতে সে বেরুতে পারেনি। কমলাপুর স্টেশনের লোকজন খুব সাহায্য করেছিল। পরদিন সকালে তারা স্পেশাল ম্যাসেঞ্জার দিয়ে কাগজপত্র গাজীপুর পাঠিয়েছিল। যে কারণে সে সকালেই জেল থেকে ছাড়া পেয়ে বাড়ি ফিরেছিল। এখন সোহেল বাপের সাথে চায়ের দোকান করে। অপূর্ব সুন্দর সুস্বাস্থ্যের অধিকারী এক যুবক। কিন্তু সেদিন তার দু’চোখের পানিতে বুক ভাসছিল। অনেক বছর পর বাপ-বেটাকে একসাথে দেখে কী যে ভালো লাগল লিখে বুঝাতে পারব না। লিখলে অনেকেই কেমন ভাববেন জানি না, কিন্তু তবু ব্যাপারটি সত্য। ‘৭১-এর ১৮ ডিসেম্বর পল্টনে সভা করতে যাওয়ার পথে যখন তাদের বাড়ি গিয়েছিলাম, তখন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাও বাবার জন্য আকুল হয়ে কেঁদেছিলেন। কখন কে কাঁদে আর কে হাসে সবই সময়ের ব্যাপার। বীর উত্তম জিয়াউর রহমানের বাড়ি যখন যেতাম ভাবী খালেদা জিয়াও কত যতœ করতেন। তিনিও প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। এখন তো তারাই দেশের নেতা। কত কিছু দেখলাম, আল্লাহ কত কিছু দেখালেন। ভাটি বাংলার প্রাণকেন্দ্র ইটনায় ভূপেশ গুপ্তের বাড়ির আঙ্গিনায় তাঁবুতে বসে লিখতে গিয়ে কত কথা মনে পড়ছে। বিকেলে একটি অনির্ধারিত মতবিনিময় সভায় তিল ধরার জায়গা ছিল না। এর আগে যতবার এসেছি, ফজলুর রহমানের সাথে এসেছি। এবারই প্রথম আল্লাহর ভরসায় তাকে ছাড়া অল্প বয়সী কিছু কর্মীর সাথে এসেছি। শুনতে এসেছিলাম, জানতে এসেছিলাম হাওরে-বাঁওড়ে যে শত শত গামছায় উড়ত তারা কি সবাই ফজলুর রহমানের সাথে চলে গেছে, নাকি মানুষের গামছায় এখনো মানুষ আছে। বড় খুশি হয়েছি, ফজলুর রহমান গামছা ছেড়ে গেলেও ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রামের মানুষ তাদের গামছা ছাড়েনি। ব্যাপারটা দেখে হৃদয় মন আনন্দে নেচে উঠেছে।
গতকালকের দিনটা আমাদের খুব একটা ভালো যায়নি। ইটনার নেতা আবুল খায়ের ভালো ট্রলারচালক দিতে পারেনি, একেবারেই রাস্তা চেনে না। পাঁচ মাসের কর্মসূচিতে গতকালই আমাদের খুব বেশি এলোমেলো হয়েছে। ঘাগরা বাজারে কিছু সময় থেমেছিলাম। সেখান থেকে ঘুরতে ঘুরতেই প্রায় ৩-৪ ঘণ্টা চলে যায়। আব্দুল্লাহপুর বাজারে পথপ্রদর্শক বাচ্চু মিয়াকে না পেলে কী যে বিশ্রী অবস্থা হতো ভাবাই যায় না। আব্দুল্লাহপুর, আদমপুর পুরে পুরে মিল থাকলেও দূরত্ব অনেক। আমাদের রিফাতুল ইসলাম দীপ সব গুলিয়ে ফেলতে গিয়েছিল। তবু ভাগ্যিস, সন্ধ্যায় সন্ধ্যায় অষ্টগ্রাম নদীর ঘাটে তাঁবু ফেলতে পেরেছিলাম। বাঙ্গালপাড়ার নবাবকে প্রথম যেবার ছোট্ট শিশুটি পেয়েছিলাম, এখন তার দুটি শিশু থাকলেও আগের মতোই অচল অটল আছে। এর আগে প্রতিবার অষ্টগ্রামে এলে ফজলুর রহমান, মনসুরুল কাদের সাথে থাকত। এবার কিশোরগঞ্জের সভাপতি আমিনুল ইসলাম তারেক ও অন্যান্য কর্মীরা রয়েছে। আল্লাহকে ভরসা করে এসেছি। অষ্টগ্রামেও দেখলাম মনসুরুল কাদের এবং ফজলুর রহমান এদিক ওদিক গেলেও যারা সত্যিকার গামছায় ছিলেন তারা তেমনি আছেন। ত্রুটি তাদের নয়, যোগাযোগ না রাখার ত্রুটি আমাদের। সাড়া পেয়ে মনটা ভরে গেছে।
প্রতিবেশী মহান ভারতের মহান নেতা শ্রী নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদি রক্তের দামে কেনা আমাদের বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। আমরা দু’হাত প্রসারিত করে তাকে বুকে জড়িয়ে নিতে চাই। তিনি সমগ্র বাংলার প্রসারিত উষ্ণ বুকে জায়গা খুঁজছেন, নাকি কোনো ব্যক্তিগোষ্ঠীর উত্তাপ বুকে লালন করবেন- সেটা তার ওপরই নির্ভর করে। তবে আমার বিশ্বাস, বাবার সাথে চায়ের দোকানে হাত লাগাতে লাগাতে যিনি এত দূর এসেছেন, তার দৃষ্টি ঝাপসা হবে না। তিনি বাংলা এবং বাঙালির হৃদয় জয় করতে তার এই সফরকে কাজে লাগাতে সক্ষম হবেন- এটাই আমাদের কায়মনে প্রার্থনা।

Posted in নির্বাচিত কলাম | Comments Off on ভাসতে ভাসতে ভাটি বাংলায়

ইন্দিরা থেকে মোদি: ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক কি নতুন মোড় নেবে

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঢাকায় এসেছেন। এটা তাঁর প্রথম বাংলাদেশ সফর। তবে ভারতের প্রধানমন্ত্রীদের জন্য এটা প্রথম সফর নয়। মোদির আগে ইন্দিরা গান্ধী থেকে মনমোহন সিং পর্যন্ত অনেকেই এসেছেন। এর মধ্যে সবচাইতে স্মরণীয় ইন্দিরা গান্ধীর ঢাকা সফর। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি ঢাকায় এসেছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিশাল ইন্দিরা মঞ্চ তৈরি করে তাঁকে সম্বর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের বিশাল অবদান এবং ইন্দিরা গান্ধীর বিশেষ ভূমিকার জন্য তাঁকে এই সম্বর্ধনা জানানো হয়েছিল।
এই সফরে ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের স্বাধীনতা, স্বার্থ ও অধিকার রক্ষার ব্যাপারে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি করেন। মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি দুই দেশের মৈত্রী ও সহযোগিতায় আরও দৃঢ় ভিত্তি দান করে।
এরপর ভারতের আরও অনেক প্রধানমন্ত্রী ঢাকা সফরে এসেছেন। তাঁরাও দুই দেশের সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার চেষ্টা করেছেন। নানা কারণে দুই দেশের মধ্যে উদ্ভূত নানা সমস্যার সমাধান তাঁরা করতে পারেননি। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা ছিল, স্থলসীমান্ত চিহ্নিতকরণ, ছিটমহল ও সমুদ্রসীমানা সমস্যা; অসম বাণিজ্য; সীমান্ত সংঘর্ষ; চোরাচালান ও অবৈধ যাতায়াত ইত্যাদি। বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে বাংলাদেশে যে সামরিক শাসন ও বিএনপির শাসন চলে, তাদের ভারতবিরোধী নীতি এবং ভারতের কোনো কোনো বাংলাদেশবিরোধী মহলের তৎপরতায় দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে সমস্যাগুলোর সুমীমাংসা হয়নি। সমস্যাগুলো বহুদিন ঝুলে থাকায় দুই দেশের মানুষেরই বিড়ম্বনা বাড়ছিল।
হাসিনা সরকার প্রথম দফা ক্ষমতায় এসেই বাংলাদেশের জীবনমরণ সমস্যা, গঙ্গার পানিবণ্টনের বিরোধ মীমাংসার জন্য একটি চুক্তি সম্পাদনে সক্ষম হন এবং দুদেশের সম্পর্ক উন্নয়নে দৃঢ় পদক্ষেপ নেন। ভারতের প্রথম বিজেপি সরকারের আমলে নানা টানাপড়েনের মধ্যেও সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা অব্যাহত রাখেন শেখ হাসিনা। ভারতের গত সোনিয়া-মনমোহন সরকারের আমলে ভারত দুদেশের সম্পর্কের উন্নয়নে যথার্থ আগ্রহী হয়ে ওঠে। তারা তিস্তাসহ বিভিন্ন নদীর পানিবণ্টন এবং টিপাইমুখ বাঁধসংক্রান্ত বিরোধ মিটাতেও উদ্যোগ নেন। পার্লামেন্টে কংগ্রেসের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় এবং পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতায় উদ্যোগটি সফল হয়নি।
দিল্লিতে কংগ্রেস শাসনের অবসান এবং মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর আশংকা করা হয়েছিল দুদেশের সম্পর্ক হয়তো উন্নতির পথে এগুবে না। বিজেপি সরকার বাংলাদেশে সেকুলার আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি অনুকূল মনোভাব দেখাবেন না এবং সহযোগিতার হাত বাড়াতে চাইবেন না। আশংকাটি সঠিক প্রমাণিত হয়নি। নরেন্দ্র মোদি দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রীর পদে বসে প্রমাণ করতে চাইছেন যে, তিনি গুজরাটের সাবেক মূখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আর নন। তিনি দেশপরিচালনায় ভারতের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য অনুসরণ করছেন এবং প্রতিবেশি দেশগুলোর দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। বাংলাদেশের হাসিনা সরকারের সঙ্গে তিনি চমৎকার সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন এবং ইতোমধ্যেই স্থলসীমান্ত চুক্তিসহ একাধিক সমস্যার সমাধান ঘটিয়েছেন। বাংলাদেশে তাই ভারত-বিরোধিতার জোয়ার কমেছে এবং বাংলাদেশের মানুষ তাঁকে সাদর অভ্যর্থনা জানাতে আগ্রহ দেখাচ্ছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইন্দিরা গান্ধী দুদেশের সম্পর্কের যে ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন নরেন্দ্র মোদি তাকে আরও শক্তপোক্ত করার ব্যাপারে এগুতে সক্ষম হয়েছেন বলে মনে হয়। এই ব্যাপারে তাঁর সদিচ্ছা রয়েছে এবং এই সদিচ্ছা পূরণের ব্যাপারে পার্লামেন্টেও তাঁর একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। এ জন্যই বলা চলে, ইন্দিরা গান্ধী দুদেশের মধ্যে দৃঢ় সম্পর্ক স্থাপনের ব্যাপারে যে শুভ উদ্বোধন ঘটিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদির হাতেই হয়তো তার নবরূপায়ণ ঘটবে।
হাসিনা সরকারের সঙ্গে তিনি চমৎকার সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন এবং ইতোমধ্যেই স্থলসীমান্ত চুক্তিসহ একাধিক সমস্যার সমাধান ঘটিয়েছেন হাসিনা সরকারের সঙ্গে তিনি চমৎকার সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন এবং ইতোমধ্যেই স্থলসীমান্ত চুক্তিসহ একাধিক সমস্যার সমাধান ঘটিয়েছেন
তেতাল্লিশ বছর আগে ইন্দিরা গান্ধী ঢাকা সফরে এসেছিলেন এবং এবার এলেন নরেন্দ্র মোদি। এই চার দশকে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক নানা টানাপড়েনের ভেতর দিয়ে গেছে। কখনও কখনও মনে হয়েছে ভারত বড় প্রতিবেশির ঔদ্ধত্য নিয়ে সকল সমস্যা মীমাংসার ব্যাপারে বাংলাদেশকে নতজানু করতে চায়। আবার কখনও কখনও অভিযোগ উঠেছে পাকিস্তানের ভারতবিরোধী নীতির লেজুড়বৃত্তি করে বাংলাদেশ অহেতুক নিজেকে ভারতের শত্রু করে তুলছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতেও এতকাল কোনো ভারসাম্য ছিল না। ভারত-চীন বিরোধে একটি ক্ষুদ্র প্রতিবেশি হিসেবে বাংলাদেশের যে ভারসাম্য রক্ষা করে চলা উচিত ছিল তা সামরিক সরকার ও বিএনপি সরকারের আমলেও করা হয়নি। কখনও মার্কিন ধমকের কাছে নতজানু হওয়া এবং কখনও অতিরিক্ত চীনপ্রীতি দেখিয়ে ভারতকে বিরূপ করে তোলা ঢাকার সামরিক সরকার ও বিএনপি আমলের বিদেশনীতির বিশেষ প্রবণতা ছিল। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে এই প্রবণতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করেন এবং অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছেন। তিনি সকল ব্যাপারে আমেরিকা এমনকি বিশ্ব ব্যাংকের ধমকের কাছেও নতজানু হননি এবং ভারত ও চীনের সঙ্গে সম্পর্করক্ষায় একটা ইতিবাচক ভারসাম্য রাখতে সক্ষম হয়েছেন। ফলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সাহায্যদানে চীন যেমন এগিয়ে এসেছে, তেমনি ভারতও এগিয়ে আসতে দ্বিধা করছে না। শেখ হাসিনা তাই দাবি করতে পারেন বাংলাদেশ এখন আর তলাবিহীন ঝুড়ি নয়। অর্থনৈতিক উন্নতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সাফল্য দেখিয়েছে এবং গণতান্ত্রিক বিধিবিধান কিছুটা এড়িয়ে হলেও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনে অগ্রগতি ঘটাচ্ছে। বাংলাদেশ-ভারত স্থায়ী মৈত্রী এই স্থিতিশীলতা স্থায়ী করবে বলে অনেকে আশা করেন।
মোদি দুদেশের শান্তিকামী মানুষের মনে অনেক প্রত্যাশা সৃষ্টি করে ঢাকায় এসেছেন। অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের ধারণা, তিনি বাংলাদেশের মানুষের মনে যে প্রত্যাশা সৃষ্টি করেছেন তার অনেকটাই পূরণ করতে পারবেন। এবারের সফরে তিস্তা ও টিপাইমুখ বাঁধ সমস্যার যয়তো পুরো সুরাহা না হতে পারে, তবে তার মীমাংসার পথ আরও সহজ হবে। তা যদি হয়, বাংলাদেশ-ভারত সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়, তা দুই দেশেই জঙ্গিবাদ দমনে এবং দুই দেশকে উন্নয়নমুখী করে তুলতে সাহায্য যোগাবে।
২৯ মে শেখ হাসিনা ঢাকায় জাতীয় নাগরিক কমিটির দেওয়া সংবর্ধনা সভায় বলেছেন, “এটা এখন প্রমাণিত যে, ১৯৭১ সাল থেকে প্রতিবেশি ভারত আমাদের বন্ধু। তারা আমাদের মুক্তিসংগ্রামে অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে এবং আমাদের শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে বিরাট সাহায্য যুগিয়েছে।’’
এবারের সফরে তিস্তা ও টিপাইমুখ বাঁধ সমস্যার যয়তো পুরো সুরাহা না হতে পারে, তবে তার মীমাংসার পথ আরও সহজ হবে এবারের সফরে তিস্তা ও টিপাইমুখ বাঁধ সমস্যার যয়তো পুরো সুরাহা না হতে পারে, তবে তার মীমাংসার পথ আরও সহজ হবে
প্রধানমন্ত্রীর এ কথা সঠিক, কিন্তু সেই সঙ্গে এ কথাও সত্য যে, ভারতের শাসক মহলের কোনো কোনো অংশ এবং আমলাতন্ত্র ছোট প্রতিবেশির সঙ্গে কখনও কখনও সমমর্যাদার মনোভাব দেখায়নি এবং সঠিক আচরণও করেনি। বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক এবং প্রতিক্রিয়াশীল মহলও তার সুযোগ নিয়ে ভারত-বিরোধিতার আবরণে দেশটিতে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের শক্তি যুগিয়েছে। এই দুটি সমস্যা এখন দুটি দেশেই ক্রমশ মাথা তুলেছে। বাংলাদেশে যেমন জামায়াত, হিজবুত তাহরির ও এই ধরনের মৌলবাদী জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর উৎপাত বাড়ছে, তেমনি ভারতেও হিন্দুত্ববাদী আরএসএস, শিবসেনার মতো উগ্র জঙ্গিগোষ্ঠীর প্রতাপ বাড়ছে। অনেকের ধারণা, নরেন্দ্র মোদি বিদেশনীতিতে সাফল্য অর্জন করলেও দেশের অভ্যন্তরীন সংকট কাটিয়ে উঠতে এই হিন্দুত্ববাদীদের প্রভাবের ফলে তেমন সফল হতে পারছেন না। তিনি যদি বিজেপির সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ির মতো সাহসের সঙ্গে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারেন এবং প্রতিবেশি দেশগুলার সঙ্গে সমঅধিকার ও সমমর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেন তাহলে এশিয়ায় শান্তি ও সমৃদ্ধির এক নব যুগের হাওয়া তিনি বহাতে পারবেন। আর এই ব্যাপারে ব্যর্থতা হবে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের জন্য একটি বড় ব্যর্থতা। ঢাকা সফর ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির জন্য একটি ‘টেস্ট কেস’। তিনি আমেরিকা, চীন, জাপানসহ বহু বড় বড় দেশ ঘুরেছেন, কিন্ত আমার মতে তাঁর বাংলাদেশ সফরের উপরেই তাঁর নেতৃত্বের সাফল্য পরীক্ষিত হবে। ইন্দিরা গান্ধীর যে অসফল স্বপ্ন– ‘ভারত মহাসাগরীয় এলাকাকে শান্তির এলাকা করে তোলা’– সেই স্বপ্ন তিনি যদি সফল করতে পারেন তাহলে ভারতের ইতিহাসে তিনি নবরূপকার হিসেবে স্থান পাবেন।
তাঁর এবারের বাংলাদেশ সফরেই বোঝা যাবে তিনি ইতিহাসে কোন স্থানটি গ্রহণ করতে যাচ্ছেন।

Posted in নির্বাচিত কলাম | Comments Off on ইন্দিরা থেকে মোদি: ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক কি নতুন মোড় নেবে

মুক্তিযোদ্ধা কোটা বনাম মেধা বিতর্ক

MY PHOTO॥ সাজ্জাদ হোসেন ॥
ইদানিং সরকারি চাকুরিতে কোটা নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম, প্রচার মাধ্যম বিশেষ করে ফেইসবুকসহ নানা সামাজিক মাধ্যমে লেখালেখি ও প্রচারণা বেশ জোরেসুরে চলছে। আর সবারই আঁড়চোখা দৃষ্টি একটা বিষয়ের দিকেই, সেটা হলো ‘মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের কোটা’। এ ব্যাপারে তাদের খুঁড়া যুক্তি হলো-‘এটা বাতিল করতে হবে, না হয় মেধাবীরা পেছনে পড়ে যাচ্ছে, গোবর-গবেটরা চাকুরিতে নিয়োগ পাচ্ছে, প্রশাসন মেধাশুন্য হয়ে পড়ছে’। ইনিয়ে-বিনিয়ে এসব কথা বলতেই যেন তারা ব্যতিব্যস্ত। কিংবা এমনও হতে পারে মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে বিতর্কিত কথা বলতে পারলে হয়তো তথাকথিত বুদ্ধিজীবীর তালিকায় নাম লেখানো সহজ হবে, তাই তারা কোটা প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে প্রথমে মুক্তিযোদ্ধা কোটার উপর সওয়ার হচ্ছেন। আবার অনেক ‘চেতনা ব্যবসায়ী’ তথাকথিত মুক্তিযোদ্ধাকেও ইদানিং এই কোটার বিরুদ্ধে বলে প্রতিপক্ষের কাছে উদারতা দেখিয়ে ওই পক্ষের বাহবা কুঁড়ানোর প্রতিযোগিতায় নামতে দেখছি। সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেখানে মুক্তিযোদ্ধা কোটার ব্যাপারে অত্যন্ত সংবেদনশীল। সেখানে সরকার দলীয় কতেক সংসদ সদস্যদের ইদানিং সংসদে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতেই কোটার বিরুদ্ধে বক্তৃতা করতে দেখছি। তারা আবার মুক্তিযোদ্ধা বান্ধব বর্তমান সরকারকে বুঝানোর চেষ্টা করছেন – কোটা নয়, মেধাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’, মেধার বিকল্প কখনো কোটা হতে পারে না’। এ প্রসঙ্গে কিছু জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় শিক্ষক বিভিন্ন অনলাইনে বেশ লেখালেখি করছেন। তাদের লেখা ও প্রতিবেদন দেখে আমি বিষ্মিত হয়েছি। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক যখন এসব কথা লেখেন, তখন হতাশ হওয়া ছাড়া কিইবা করার আছে। আমার কথা হচ্ছে-তিনি বা তারা কি মেধা-কোটা-মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিষয়গুলো সম্পর্কে জানেন না? না, আমি অন্তত এটা বিশ্বাস করতে চাইনা। তাদের জ্ঞানের শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। আমার মতো ছাপোষা মানুষের চেয়ে অন্তত: অনেক বেশি জ্ঞান রাখেন তারা। তাহলে কি বলবো-তারা জেনে বুঝে মানুষের মগজ ধোলাইয়ের কাজে নেমেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে হলে বিসিএস-এর মুখোমুখি হতে হয় না। কিন্তু সম্মানিত শিক্ষক মন্ডলীতো এটা নিশ্চয়ই জানেন যে, বিসিএস’র কোন পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধা কোটা কার্যকর হয়। আমি যতদুর জানি সাধারণ অন্যান্যের সাথে প্রথমে প্রিলিমিনারী পরীক্ষায় পাশ করে তারপর লিখিত পরীক্ষায় অন্যান্য মেধাবীদের সাথে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার পর মৌখিক পরীক্ষার সময় মুক্তিযোদ্ধা কোটা বিবেচনায় নেয়া হয়। এরপরও কি সম্মানিতরা বলবেন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা মেধাবী নয়, এরা সবাই ‘গোবর-গবেট’, নিশ্চয়ই না।
সম্প্রতি ফেইসবুকের বদৌলতে দেখলাম জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের একজন সম্মানিত শিক্ষক একটি অনলাইনের মতামত পাতায় লিখেছেন-‘মুক্তিযুদ্ধের নামেও কোটা পদ্ধতিকে জায়েজ করা হয়। তবে ইতোমধ্যে বহু ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা কোটা পদ্ধতির সুযোগ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধকেই কলঙ্কিত করায় তার যৌক্তিকতা হারিয়েছে। তাই মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবাবের স্বচ্ছলতার জন্য তাদের ভাতা বৃদ্ধিসহ নানা ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণে সরকার উদ্যোগী হতে পারে। কিন্তু কোটার নামে অযোগ্য, কম মেধাসম্পন্নদের সরকারি চাকরিতে অধিক সুযোগ বৃদ্ধি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আর এই ধরনের পদক্ষেপ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিত্তিতে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার পথে অন্তরায়ও বটে।’
ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক তার কথাটি আমার খুব মনে ধরেছে। বিগত সময়ে কিছু সংখ্যক মানুষ এই ভূয়া মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট নিয়ে কোটায় চাকুরি নিয়েছেন। এরমধ্যে বেশির ভাগই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী। এই সংখ্যাটি খুব বেশি নয়, এদের চিহ্নিত করা উচিত। এ জন্য ১৯৯৬ সালের পর থেকে এ যাবৎকালে যাদের মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকুরি হয়েছে তাদের প্রত্যেকের সার্টিফিকেট পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা প্রয়োজন। তাই বলে গুটি কয়েক ভূয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধ কলঙ্কিত হতে পারে না। মশারীর ফাঁক-ফোকর দিয়ে দু’একটি মশা ঢোকে গেলে পুরো মশারী পুড়িয়ে ফেলার পরামর্শ আমি অন্তত: শ্রদ্ধেয় শিক্ষক, কোটা বিরোধী তথাকথিত মুক্তিযোদ্ধা বা মাননীয় সাংসদের কাছে আশা করতে পারি না। আর কম-বেশি মেধার বিষয়টি নিয়ে আমি আগেই আলোচনা করেছি। কারা মেধাবী? যারা মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকুরি পাচ্ছে তারা, নাকি বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রতিবেদনের ভাষায় ‘চাকুরি চাও টাকা দাও’-এই নীতির ভিত্তিতে চাকুরি নিচ্ছেন তারা। কোন কোটাই মেধার বিরুদ্ধে নয়, বরং ঘুষ দিয়ে চাকুরি নেয়ার প্রথাই মেধার প্রধান এবং অন্যতম অন্তরায়। এটির বিরুদ্ধেই আমাদের সকলের সচেতন হওয়া উচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক আরো লিখেছেন- সরকারের পক্ষ থেকে নাকি মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের চিন্তা করা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়া অনেকদুর এগিয়েছে। সংসদীয় কমিটিতেও এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সবাই মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের পক্ষে। তার এই কথা যদি সত্যি হয় তাহলে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগ ও দুঃশ্চিন্তার বিষয়। যেখানে সয়ং প্রধানমন্ত্রী কোটর পক্ষে, সেখানে সরকার বা সংসদীয় কমিটির বেশির ভাগের কারা সরকার প্রধানের বিপক্ষে গিয়ে কোটা বাতিলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এদের ব্যাপারে সরকারের উচিত খোঁজ-খবর নেয়া। এ ছাড়া আমি যতদুর জানি এ প্রসঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা কোটার পক্ষে উচ্চ আদালতেরও একটি নির্দেশনা রয়েছে।
মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের বঞ্চনার ইতিহাস দীর্ঘদিনের। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদাত বরণের মধ্যদিয়ে সে বঞ্চনার শুরু। স্বাধীনতার পর জাতির পিতা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সরকারি চাকরিতে ৩০ শতাংশ কোটা সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন। কিন্তু মাত্র সাড়ে ৩ বছরের মাথায় জাতির পিতার হত্যান্ডের পর মুক্তিযোদ্ধাদের কলা দেখিয়ে মূলা খাওয়ানো হয়েছে। চাকরির বয়স পেরিয়ে ৫০ বছরের বয়োবৃদ্ধ হলেও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এই কোটা দীর্ঘ ২১ বছর পর্যন্ত ছিল। ওই সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের নামে অমুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতা বিরোধীদের এই কোটায় চাকরি হয়েছে। এই সময়ে পদে পদে মুক্তিযোদ্ধারা লাঞ্চনা আর বঞ্চনার শিকার হয়েছেন।
১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা তাদের সন্তানদের জন্য বরাদ্দ করেন এবং প্রজ্ঞাপন জারি করেন যে, এই কোটায় মুক্তিযোদ্ধার সন্তান না পাওয়া গেলে পদ খালি রাখতে হবে। তৎকালীন সরকার এবং মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে বেশ কিছু মুক্তিযোদ্ধার সন্তানের ওই সময় চাকুরি হয়। দেশপ্রেমিক বীরমুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের সন্তানদের দাবির প্রেক্ষিতে তৎকালীন সরকারের শেষ সময়ে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য একটি স্পেশাল বিসিএস ঘোষণা করে। প্রিলিমিনারী এবং লিখিত পরীক্ষা গ্রহণ করতে পারলেও চূড়ান্ত নিয়োগের ব্যবস্থা করার আগেই ২০০১ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতাহীন হয়। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে পরবর্তী সরকার এই স্পেশাল বিসিএস নিয়ে টালবাহানা শুরু করে। তখন পরীক্ষার্থীরা হাইকোর্টে রিট দায়ের করলে মৌখিক ও মনস্তাত্বিক পরীক্ষা সম্পন্ন করলেও পরবর্তীতে ফলাফল স্থগিত করে দেয়। আমি যতদুর জানি মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের কয়েকজন সরকারের এই সিদ্ধান্তে সংক্ষুব্দ হয়ে আবারো হাইকোর্টে রিট দায়ের করে। এই রিটের রায়ের প্রেক্ষিতে ওয়ান ইলেভেন পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকার এই বিসিএস’র ফলাফল ঘোষণার উদ্যোগ নেয়। পিএসসি’র তৎকালীন চেয়ারম্যান ড. শাহাদাৎ হোসেনের তত্ত্বাবধানে ওই সময় পিএসসি একটি গুজামিলের ফলাফল ঘোষণা করে অতি অল্প সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে শুধুমাত্র টেকনিক্যাল ক্যাডারে নিয়োগ দেয়া হয়। এতে শতশত মুক্তিযোদ্ধার সন্তান চাকুরি বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি এই বিসিএস’র আশায় থেকে চাকুরির বয়সও হারিয়েছে। অথচ পিএসসি’র চেয়ারম্যানকে বলতে শুনেছি- চাকুরির বিজ্ঞপ্তি দিলে নাকি মুক্তিযোদ্ধার সন্তান পাওয়া যায় না! যেখানে লাখ লাখ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বেকার সেখানে এ ধরনের কথাবার্তা মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের সন্তানদের জন্য নিতান্তই পরিহাসের বিষয় বলে আমি মনে করি। আর প্রিলিমিনারী ও লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ন হওয়ার পর পদ শূণ্য রেখে মৌখিক পরীক্ষায় একজন প্রার্থীকে বাদ দেয়া ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নয়। কারণ এটা পাগলেও জানে মৌখিক পরীক্ষা কোনভাবেই মেধা যাচাইয়ের একমাত্র মানদন্ড হতে পারে না।
বিগত চার দলীয় জোট সরকারের আমলে ৩০ শতাংশ কোটা সামান্যই মানা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের। উপরন্ত প্রজ্ঞাপন বাতিল করে এই কোটায় অমুক্তিযোদ্ধা ও কোন কোন ক্ষেত্রে স্বাধীনতা বিরোধীদের সন্তানদের চাকরি দেয়া হয়েছে বলেও তাদের অভিযোগ। ওই আমলে অনুষ্ঠিত ২৪তম, ২৫তম, ২৬তম এবং বিতর্কিত তত্ত্বাবধায়ক আমলের ২৭তম বিসিএস এ মৌখিক পরীক্ষায় বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের অনেক সদস্য মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের সনদ ছুঁড়ে ফেলে দেয়াসহ অনেক কটুক্তি করেছে এবং মৌখিক পরীক্ষায় ইচ্ছাকৃত ফেল করিয়ে তাদের চাকুরি বঞ্চিত করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি বর্তমানেও পিএসসি’র বিশেষ বিশেষ সদস্যের বিরুদ্ধেও এরূপ মন্তব্য করার অভিযোগ শোনা যায়। অতি সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিসিএস’গুলোতেও শত শত মুক্তিযোদ্ধার সন্তান চাকুরি বঞ্চিত হয়েছে। অপরদিকে পিএসসির ভাষ্য, মুক্তিযোদ্ধার কোটায় সিট ফাঁকা রয়ে গেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে তাহলে মৌখিক পরীক্ষা দেয়া মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা চাকুরি পায় না কেন? এই পরীক্ষার পর তাদের আর কি যোগ্যতার প্রমান দিতে হবে।
মুক্তিযোদ্ধা কোটার ব্যাপারে সরকার আন্তরিক থাকলেও পিএসসি’র কতিপয় চেয়ারম্যান ও সদস্যের কোটা বিরোধী অবস্থান, শঠতা ও ষড়যন্ত্রে এই কয়েক বছরে ৩০ শতাংশ কোটায় সামান্য সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরাই চাকুরি পেয়েছে বলে দাবি সয়ং মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের। পাশাপাশি কয়েক লাখ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বেকারত্বের অভিশাপ নিয়ে ভবঘুরের মতো জীবন-যাপন করছে। এই মুহুর্তে বিসিএস ঘোষণা করা হলেও শুধুমাত্র বয়সের কারণে কয়েক হাজার মুক্তিযোদ্ধার সন্তান আবেদনই করতে পারবে না। মুক্তিযোদ্ধাদের দাবি-পিএসসি’র মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা কোটা বিরোধী এই চক্রটি চাচ্ছে প্রশাসনের মূল যে চালিকা শক্তি অর্থাৎ ‘সাধারণ ক্যাডারের (পররাষ্ট্র, প্রশাসন, পুলিশ, কাষ্টমস্, কর, নিরীক্ষা ইত্যাদি)’ পরিবর্তে শুধুমাত্র ‘টেকনিক্যাল ক্যাডারে (ডাক্তার, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, শিক্ষক ইত্যাদি)’ মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের নিয়োগ দিতে, যাতে মূল প্রশাসন কখনই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গঠিত হতে না পারে। তাদের এই ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য শুধু টেকনিক্যাল ক্যাডারে ঘোষিত ৩২তম স্পেশাল বিসিএস। পিএসসি’র এই সিদ্ধান্ত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য চরম অপমান ও অবমাননাকর ও মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের আরেকবার কলা ঝুঁলিয়ে মূলা খাওয়ানোর চক্রান্ত হয়েছে। ফলে যে উদ্দেশ্যে সরকার ওই বিসিএস ঘোষণা করে সে উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হয়নি। এ ধরনের হোমিওপ্যাথিক মার্কা টেকনিক্যাল ক্যাডার দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধরে রাখা সম্ভব নয়। এমতাবস্থায় যুগ যুগ ধরে নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখতে বয়সসীমা ৩৫ বছর করে শুধু মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ স্পেশাল বিসিএস ঘোষণা করা উচিত।
মুক্তিযোদ্ধা কোটা কারো দয়ার বিষয় নয় বরং এটি মুক্তিযোদ্ধাদের সাংবিধানিক অধিকার। মুক্তিযোদ্ধা বা তাদের সন্তানরা কখনোই মেধার বিপক্ষে নয়। এ ক্ষেত্রে জেলা কোটাসহ অন্যান্য কিছু কোটা বাতিল বা সমন্বয় করে কোটা সংস্কার করা যায়। আমার জানামতে কোন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানই আজীবন এই কোটা চান না। দীর্ঘদিন কোটা নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সন্তানদের সাথে কুটচালাকি হয়েছে। তাই তারা এই মুহুর্তে এই কোটায় হাত দেয়ার সম্পূর্ণ বিপক্ষে। তবে সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমেই এই কোটা পর্যায়ক্রমে সংস্কারে তাদেরও কোন বিরোধীতা থাকার কথা নয়। বিসিএস বা অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ভাইভার টেবিল থেকে বিদায় করে দিয়ে, উপযুক্ত মুক্তিযোদ্ধার সন্তান পাওয়া যায়না বলে পদ শুন্য রাখলে দিনদিন এই জটিলতা বাড়বে বরং কমবে না।

Posted in নির্বাচিত কলাম | Comments Off on মুক্তিযোদ্ধা কোটা বনাম মেধা বিতর্ক

পর্যালোচনায় যাচ্ছে টিআইবি রিপোর্ট

Sampadokio-Quill-pen-e1417348285546নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত ইতিবাচক
রাষ্ট্র সম্পর্কিত দেশি বা আন্তর্জাতিক কোনো সংগঠন কিংবা কোনো দেশের প্রতিবেদন ওই রাষ্ট্রের জন্য নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। এতে রাষ্ট্র পরিচালকরা একদিকে যেমন রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে নিজেদের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করতে সমর্থ হন, তেমনি কোনো কোন খাতে কী পরিমাণ ঘাটতি বা সমস্যা বিদ্যমান রয়েছে সেগুলোও বুঝতে পারেন। প্রতিবেদনগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের মাধ্যমেই যা জানা সম্ভব। অথচ লক্ষণীয় যে, আমাদের দেশের বিভিন্ন খাত কিংবা সরকারের নানান কর্মকা- নিয়ে যখন দেশীয় কিংবা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংগঠন তাদের প্রতিবেদন উপস্থাপন করে তখন তা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে শুরু হয় নানা গুঞ্জন। প্রতিবেদনের ইতিবাচক দিকগুলো লুফে নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনাকারী রাজনীতিক দলগুলো বক্তব্য-বিবৃতিতে নিজেদের ঢোল পেটান, অন্যদিকে নেতিবাচক দিকগুলো নিয়ে বিরোধী দল সোচ্চার হয় রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের ব্যর্থতা সাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে। এই বিপরীতমুখী প্রচার প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে প্রকৃত বিষয়টি চাপা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তাই অস্বাভাবিক নয়। যা রাষ্ট্রের জন্য শুভ হতে পারে না বলেই প্রতীয়মান হয়। সঙ্গত কারণে রাষ্ট্র সম্পর্কিত যেকোনো ধরনের প্রতিবেদন যৌক্তিক পর্যালোচনার দাবি রাখে। আশার কথা যে, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত তিন সিটি নির্বাচন সম্পর্কে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) দেওয়া রিপোর্ট পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ইসির এ উদ্যোগ ইতিবাচক বলে বিবেচনা করা যেতে পারে।
জাতিয় একটি দৈনিকের প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানা যায়, প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজি রকিবউদ্দীন আহমদ এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সিটি নির্বাচন নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) যে রিপোর্ট দিয়েছে, তা পর্যালোচনা করা হবে বলে জানান। কেননা, ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপ ও টিআইবি দাবি করেছে, সিটি নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। সিইসির ভাষ্যে, ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপ নিজেরা কোনো পর্যবেক্ষণ করে না। তাদের সঙ্গে অনেক নিবন্ধিত সংস্থা রয়েছে। সব সংস্থাকেই পর্যবেক্ষণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলেও জানা যায়। তথ্য মতে, নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে দুটি সংস্থার রিপোর্ট ইসি পেয়েছে। এই দুটি সংস্থা দাবি করেছে, দু’একটি বিছিন্ন ঘটনা ছাড়া নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে।
এটা বেশ স্পষ্ট যে, নির্বাচন কমিশন স্বাধীন হলেও অনেক সময় তাদের ওপর রাজনীতিক প্রভাবের বিষয়টি আলোচনায় আসে। আবার এটাও ঠিক যে, রাজনীতিক দলগুলোর সহযোগিতা ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন করা ইসির পক্ষে সম্ভব নয়। সত্য যে, আমাদের দেশের নির্বাচন এখনো সমালোচনার ঊধর্্েব উঠতে পারেনি। রাজনীতিক দলগুলোও ততটা উদার নয়, যতটা একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সমর্থন করে। তবে ইসি আগের তুলনায় অনেকাংশেই স্বাধীন, অন্তত বিগত কয়েকটি নির্বাচন থেকেই তা স্পষ্ট। ফলে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি, পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এবং টিআইবি এরকম ঢালাও অভিযোগ করলে তা কতটুকু যুক্তিযুক্ত তা কেবল তাদের রিপোর্ট পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনার মাধ্যমেই বেরিয়ে আসতে পারে বলে ধারণা জন্মে।
সংবাদ সম্মেলনে সিইসি বলেছেন, টিআইবি নির্বাচনি ব্যয় নিয়ে যে তথ্য প্রকাশ করেছে সে বিষয়ে তিনি সংবাদপত্রে দেখেছেন। এবং তাদের কাছে থেকে একটি রিপোর্ট বুধবার সন্ধ্যায় পেয়েছেন। এতে নির্বাচনে প্রার্থীদের ব্যয়সীমা অতিক্রম, সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিষয়ে ইসির ভূমিকা ইত্যাদি নির্বাচনশ্লিষ্ট বিষয়ে টিআইবি অভিযোগ উত্থাপন করেছে। এর জবাবে সিইসি বলেছেন, সেনা মোতায়েনের বিষয়ে ইসি দোদুল্যমান ছিল না। শুধু করণিক ভুল ছিল। সেটা শুদ্ধ করেছেন, বাকি সব ঠিক ছিল। নির্বাচনে সেনা ডাকার প্রয়োজন পড়েনি। রিপোর্ট দেখেই পর্যালোচনা করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সার্বিক বিবেচনায় আমরা মনে করি, দেশের মঙ্গলের স্বার্থেই রিপোর্টগুলো পর্যালোচনা করা সঙ্গত। আমরা মনে করি, ইসির এই সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় দেশের অন্যান্য খাতের রিপোর্টগুলোও যদি যৌক্তিক পর্যালোচনার আওতায় আনা যায় তা হলে তা দেশ ও জাতির কল্যাণ নিশ্চিত করতে পারে। পাশাপাশি রিপোর্ট প্রদানকারীরাও এতে আরো নিরঙ্কুশভাবে তাদের প্রতিবেদন প্রকাশে উৎসাহী হবে; যা রাষ্ট্র পরিচালনাকারী, রিপোর্ট প্রস্তুতকারী সংস্থা সর্বোপরি দেশের মানুষের কল্যাণই বয়ে আনবে।

Posted in নির্বাচিত কলাম | Comments Off on পর্যালোচনায় যাচ্ছে টিআইবি রিপোর্ট

বিচারহীনতার সংস্কৃতি

imagesমাহমুদুল বাসার
আজকের (২০/০৫/০১৫) একটি জাতীয় পত্রিকায় খবর এসেছে, ঔষুধ চোরাচালান, ভেজাল ঔষুধ উৎপাদন ও অপারেশনে ব্যবহৃত মানহীন সামগ্রী ব্যবহার রোধে প্রশাসনের নিষ্ক্রীয়তাকে কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। স্বাস্থ্য সচিব, ঔষুধ প্রশাসন বিভাগের মহাপরিচালক, পরিচালককে এ রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। প্রশাসনের বাঁকে বাঁকে ২/৪টা সাফল্যের পাশাপাশি ব্যর্থতার দৃষ্টান্ত প্রলম্বিত হচ্ছে। বাংলাদেশের যে কোন সরকারকে মোকাবেলা করতে হয় তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে এবং একই সঙ্গে প্রশাসনের অবৈধ নিষ্ক্রীয়তাকে। তবে প্রশাসনের অন্যান্য সিভিল স্তরে যে দুর্নীতি, অনিয়ম, অন্যায়-অবিচার চলে তার ক্ষতি ধীরে ধীরে হতে থাকে। কিন্তু রাষ্ট্রের আত্মায় প্রচন্ড অভিঘাত লাগে পুলিশ প্রশাসনের নিষ্ক্রীয়তা ও বিচারহীনতা। পয়লা বৈশাখে টিএসসিতে যে নারী লাঞ্চনার ঘটনা ঘটেছে, তখন ঘটনাস্থলেই ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীরা অন্তত দু’জন ধর্ষককে পুলিশের হাতে সোপর্দ করেছিলো। পুলিশ তাদের ছেড়ে দিয়েছে। আমার ব্যক্তিগত অনুমান, ধর্ষকরা পুলিশকে উৎকোচ দিয়েছে।
পুলিশের এহেন দায়িত্বহীনতার খবর পড়ে আমি মানষিকভাকে বিপন্ন হয়ে পড়ি। ইচ্ছে করছিলো নিজের চুল নিজেই ছিড়ে ফেলি। অনেক অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্রাইমজোনে পুলিশের নিষ্ক্রীয়তা রাষ্ট্রের ভিতে আঘাত করে, সরকারের ইমেজের মুখেও কালি লেপন করে। পয়লা বৈশাখের নারী লাঞ্চনার ঘটনায় প্রথম প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে ছাত্র ইউনিয়ন এবং গণজাগরণ মঞ্চ। তারা মারমুখো ভাষায় পুলিশের দায়িত্বহীনতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। তারা নারী লাঞ্চনার প্রতিকার চেয়ে ঢাকায় ডিএমপি অফিস ঘেরাও করতে গেলে পুলিশ তাদের সঙ্গে নির্দয় আচরণ করেছে। এজন্য সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন, ‘ পুলিশ শিষ্টের দমন আর দুষ্টের পালন করে যাচ্ছে।’ এ ক্ষেত্রেও হাইকোর্ট স্বত:প্রণোদিত হয়ে জানতে চেয়েছে প্রশাসনের ব্যর্থতার কথা, নিষ্ক্রীয়তা আর উদাসীনতার কথা। রুল জারি করে মহামান্য আদালত জানতে চেয়েছেন কেন দায়িত্ব প্রাপ্তদের শাস্তি দেয়া হবে না।
তিনমাসের মধ্যে পরপর পাঁচজন ব্লগার হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা। এর দায় স্বীকার করেছে জঙ্গী সংগঠনগুলো। গণজাগরণ মঞ্চের নেতা ইমরান এইচ সরকার প্রকাশ্য দিবালোকে সরকারের প্রশাসনকে দায়ী করে বক্তব্য দিয়েছে সিলেটে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের আয়তন খুব ছোট। এদিক থেকে খুনী-সন্ত্রাসী-ধর্ষকদের পাকড়াও করার সুবিধা অনেক। অথচ পুলিশ পাঁচজন ব্লগার হত্যাকারীদের ধরতেই পারলো না। এটাতো চরম ব্যর্থতা। কারা ব্লগারদের হত্যা করেছে এ নিয়েতো কোনো জল্পনা-কল্পনার অবকাশ নেই। সন্ত্রাসী-জঙ্গীদের সংগঠন এর দায় স্বীকার করেছে সগৌরবে। তাহলে সে সব সংগঠনের হোতাদের গ্রেফতার করা হয় না কেন? ব্লগার হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশ প্রশাসনের সিরিয়াসনেস নেই কেন? আস্তিক-নাস্তিক যেই হোক আইন হাতে তুলে নিয়ে কাউকে মনগড়া ফতোয়ার উত্তাপে হত্যা করা যায় না। আস্তিক যদি নাস্তিক হত্যা করে তাহলে নাস্তিকও তো আস্তিক হত্যায় উদ্বুদ্ধ হবে। এখনো নাস্তিকরা পাল্টা হত্যায় নেমে পড়েনি, এ জন্য যে তারা শিক্ষিত, মার্জিত, যুক্তিবাদী, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী। তারা মন্দের বিপরীতে মন্দ কাজ করতে চায় না, তারা আইন হাতে তুলে নিতে চায় না। তাদের মানস গঠিত হয়েছে প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন, রোঁমারোঁলা ও রবীন্দ্রনাথের চিরায়ত দর্শন দ্বারা। এক্ষেত্রে পুলিশ প্রশাসনের কঠোর কর্তব্য হচ্ছে খুনীদের ধরা, শাস্তির আওতায় আনা।
সে কাজটি হচ্ছে কোথায়? ওয়াশিকুর রহমান বাবুর দুজুন খুনিকে পাকড়াও করেছে হিজড়ারা। আহারে, হিজড়াদের মনেও দয়া আছে, দায়িত্ববোধ আছে, পুলিশের তাও নেই। সব ট্রাফিকের সিগন্যাল যেমন একই রকম, সব সরকারের পুলিশ একই রকম দায়িত্বহীন। এর মধ্যে আবার পত্রিকায় দেখেছি বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারাকাতকে সপরিবারে হত্যার হুমকি দিয়েছে চিহ্নিত মৌলবাদীরা। অবাক হচ্ছি, এ ব্যাপারে প্রশাসনের কোন মাথা ব্যাথা নেই। ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশকে নির্মম হত্যার ব্যাপারে পুলিশ প্রশাসনের নিষ্ক্রীয়তাকে দায়ি করেছেন ইমরান এইচ সরকার এবং ড. জাফর ইকবাল। সরকারের একজন খচ্চর এম.পি. ড. জাফর ইকবালকে কটুক্তি করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কলাম লিখেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য, কর্নেল তাহেরের ভ্রাতা ড. মোঃ আনোয়ার হোসেন (জনকন্ঠ- ১৯/০৫/০১৫)। আজকেও জনপ্রিয় কলাম লেখক আবদুল গফ্ফার চৌধুরী দৈনিক জনকন্ঠে ড. জাফর ইকবালের পক্ষে কলাম লিখেছেন। ২/১ জন খচ্চর এম.পি. প্রধানমন্ত্রীর কষ্টার্জিত ক্রেডিবিলিটি ধূলায় লুন্ঠিত করতে যথেষ্ট। তাদের লাগাম টেনে ধরতে হবে সরকারের নিজের স্বার্থে। ব্লগার ড. অভিজিত হত্যার সময়ও পুলিশ দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে। এ ব্যাপারে তার স্ত্রী রাফিদা আহমদ বন্যা ক্রুর ভাষায় অভিযোগ করেছেন। অভিযোগগুলো একের পর এক অরণ্যে রোদন করেই যাচ্ছে। এর পরিণতি পুলিশের জন্য খারাপ হবে না, খারাপ হবে সরকারের জন্য। পুলিশতো যে পাত্রে যাবে সেই পাত্রের রং ধরবে। পুলিশ কীভাবে মতিয়া চৌধুরী আর মোহাম্মদ নাসিমকে রাস্তায় পিটিয়েছে আমাদের তা মনে আছে। পুলিশ শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ও মহিয়সী কবি সুফিয়া কামালকেও ছাড়েনি। স্বাধীনতা পরবর্তী ৪০ বছরে বিচার হীনতার সংস্কৃতি একই রকম আছে, পুলিশের স্বভাবও একই রকম আছে। বলা হয় বাঘে ছুঁলে এক ঘা আর পুলিশের ১৮ ঘা। এ কথা সিভিল, নিরীহ নাগরিকের বেলায় ১৬ আনা প্রযোজ্য। এ কথা যদি ব্লগার হত্যাকারীদের বেলায় প্রযোজ্য হোত, আমরা নিরাপত্তা খুঁজে পেতাম। পুলিশ কে একচেটিয়া দোষারোপ করতে চাই না, তারা কোন কোন ক্ষেত্রে ভালো ভূমিকা নিয়েছে। জঙ্গী দমনে নিশ্চয়ই পুলিশের ভূমিকা ইতিবাচক। আমাদের দাবি হচ্ছে, প্রজাতন্ত্রের পুলিশও মানবিক চেতনার দ্বারা চালিত হবে। রাজীব হায়দারের মত মেধাবী ব্লগারকে করুণভাবে হত্যার পরই বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনী অধিকতর সচেতন হতে পারতো।
বর্তমান সরকারের সদিচ্ছাকে আমরা কটাক্ষ করতে চাইনা। কিন্তু সদিচ্ছাই সব কিছু নয়। সরকারের সদিচ্ছার ফাঁক গলিয়ে বিচারহীনতার দৃষ্টান্ত প্রলম্বিত হচ্ছে। খুন ও ধর্ষণের পরিমান বেড়েই যাচ্ছে। শাস্তি প্রদানকারী আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শৈথিল্য এখানে ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করছে। নদীর পানি যদি বিষাক্ত হয়, কোন জীব তা থেকে রেহাই পাবে না। বাংলাদেশে বিচারহীনতা যদি বেড়েই যায় তাহলে একটা পর্যায়ে সন্ত্রাসীরা সরকার পক্ষের লোকজনদের ধরে ধরে হত্যা করবে, পুলিশ তামাশা দেখবে। আজই পত্রিকায় দেখলাম (২০/৫/০১৫), ‘লক্ষীপুরে মামুনুর রশীদ খান নামে এক ছাত্রলীগ কর্মীকে গুলি করে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা। সোমবার রাতে সদর উপজেলার চন্দ্রগঞ্জ আমানী লক্ষীপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।’ সামনে এমন ঘটনা আরো ঘটলে বিস্ময়ের কিছু থাকবে না। ইংরেজ ঔপনিবেশিক আমলে বিচারহীনতাই স্বাভাবিক ছিলো বলে রবীন্দ্রনাথ তিরস্কারের সুরে বলেছিলেন, ‘বিচারের বানী নিভৃতে কাঁদে।’
রবীন্দ্রনাথের ওপর একটি গবেষণা মূলক বইয়ে ইংরেজ সেনাপতি ডায়ারের একটি সাক্ষাৎকারের অনুবাদ ছেপেছেন লেখক। ডায়ার পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালা বাগে ১৯১৯ সালে ঠান্ডা মাথায় শত শত ভারতবাসীকে হত্যা করেছিলো। সাক্ষাৎকারে ডায়ার বুক ফুলিয়ে সে হত্যার দায় স্বীকার করেছে। ডায়ারের কোন বিচার হয়নি। আমরা ইংরেজ তাড়ালাম, পাকিস্কানি খান সেনা তাড়ালাম ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করার জন্য, বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার জন্য নয়। অতএব সাধু সাবধান। মাহমুদুল বাসার কলাম লেখক ও গবেষক।

Posted in নির্বাচিত কলাম | Comments Off on বিচারহীনতার সংস্কৃতি

সর্বশেষ খবর

আজকের ছবি

www.facebook.com

Tag Cloud