April 16, 2026
মাহমুদুল বাসার
আজকের (২০/০৫/০১৫) একটি জাতীয় পত্রিকায় খবর এসেছে, ঔষুধ চোরাচালান, ভেজাল ঔষুধ উৎপাদন ও অপারেশনে ব্যবহৃত মানহীন সামগ্রী ব্যবহার রোধে প্রশাসনের নিষ্ক্রীয়তাকে কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। স্বাস্থ্য সচিব, ঔষুধ প্রশাসন বিভাগের মহাপরিচালক, পরিচালককে এ রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। প্রশাসনের বাঁকে বাঁকে ২/৪টা সাফল্যের পাশাপাশি ব্যর্থতার দৃষ্টান্ত প্রলম্বিত হচ্ছে। বাংলাদেশের যে কোন সরকারকে মোকাবেলা করতে হয় তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে এবং একই সঙ্গে প্রশাসনের অবৈধ নিষ্ক্রীয়তাকে। তবে প্রশাসনের অন্যান্য সিভিল স্তরে যে দুর্নীতি, অনিয়ম, অন্যায়-অবিচার চলে তার ক্ষতি ধীরে ধীরে হতে থাকে। কিন্তু রাষ্ট্রের আত্মায় প্রচন্ড অভিঘাত লাগে পুলিশ প্রশাসনের নিষ্ক্রীয়তা ও বিচারহীনতা। পয়লা বৈশাখে টিএসসিতে যে নারী লাঞ্চনার ঘটনা ঘটেছে, তখন ঘটনাস্থলেই ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীরা অন্তত দু’জন ধর্ষককে পুলিশের হাতে সোপর্দ করেছিলো। পুলিশ তাদের ছেড়ে দিয়েছে। আমার ব্যক্তিগত অনুমান, ধর্ষকরা পুলিশকে উৎকোচ দিয়েছে।
পুলিশের এহেন দায়িত্বহীনতার খবর পড়ে আমি মানষিকভাকে বিপন্ন হয়ে পড়ি। ইচ্ছে করছিলো নিজের চুল নিজেই ছিড়ে ফেলি। অনেক অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্রাইমজোনে পুলিশের নিষ্ক্রীয়তা রাষ্ট্রের ভিতে আঘাত করে, সরকারের ইমেজের মুখেও কালি লেপন করে। পয়লা বৈশাখের নারী লাঞ্চনার ঘটনায় প্রথম প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে ছাত্র ইউনিয়ন এবং গণজাগরণ মঞ্চ। তারা মারমুখো ভাষায় পুলিশের দায়িত্বহীনতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। তারা নারী লাঞ্চনার প্রতিকার চেয়ে ঢাকায় ডিএমপি অফিস ঘেরাও করতে গেলে পুলিশ তাদের সঙ্গে নির্দয় আচরণ করেছে। এজন্য সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন, ‘ পুলিশ শিষ্টের দমন আর দুষ্টের পালন করে যাচ্ছে।’ এ ক্ষেত্রেও হাইকোর্ট স্বত:প্রণোদিত হয়ে জানতে চেয়েছে প্রশাসনের ব্যর্থতার কথা, নিষ্ক্রীয়তা আর উদাসীনতার কথা। রুল জারি করে মহামান্য আদালত জানতে চেয়েছেন কেন দায়িত্ব প্রাপ্তদের শাস্তি দেয়া হবে না।
তিনমাসের মধ্যে পরপর পাঁচজন ব্লগার হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা। এর দায় স্বীকার করেছে জঙ্গী সংগঠনগুলো। গণজাগরণ মঞ্চের নেতা ইমরান এইচ সরকার প্রকাশ্য দিবালোকে সরকারের প্রশাসনকে দায়ী করে বক্তব্য দিয়েছে সিলেটে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের আয়তন খুব ছোট। এদিক থেকে খুনী-সন্ত্রাসী-ধর্ষকদের পাকড়াও করার সুবিধা অনেক। অথচ পুলিশ পাঁচজন ব্লগার হত্যাকারীদের ধরতেই পারলো না। এটাতো চরম ব্যর্থতা। কারা ব্লগারদের হত্যা করেছে এ নিয়েতো কোনো জল্পনা-কল্পনার অবকাশ নেই। সন্ত্রাসী-জঙ্গীদের সংগঠন এর দায় স্বীকার করেছে সগৌরবে। তাহলে সে সব সংগঠনের হোতাদের গ্রেফতার করা হয় না কেন? ব্লগার হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশ প্রশাসনের সিরিয়াসনেস নেই কেন? আস্তিক-নাস্তিক যেই হোক আইন হাতে তুলে নিয়ে কাউকে মনগড়া ফতোয়ার উত্তাপে হত্যা করা যায় না। আস্তিক যদি নাস্তিক হত্যা করে তাহলে নাস্তিকও তো আস্তিক হত্যায় উদ্বুদ্ধ হবে। এখনো নাস্তিকরা পাল্টা হত্যায় নেমে পড়েনি, এ জন্য যে তারা শিক্ষিত, মার্জিত, যুক্তিবাদী, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী। তারা মন্দের বিপরীতে মন্দ কাজ করতে চায় না, তারা আইন হাতে তুলে নিতে চায় না। তাদের মানস গঠিত হয়েছে প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন, রোঁমারোঁলা ও রবীন্দ্রনাথের চিরায়ত দর্শন দ্বারা। এক্ষেত্রে পুলিশ প্রশাসনের কঠোর কর্তব্য হচ্ছে খুনীদের ধরা, শাস্তির আওতায় আনা।
সে কাজটি হচ্ছে কোথায়? ওয়াশিকুর রহমান বাবুর দুজুন খুনিকে পাকড়াও করেছে হিজড়ারা। আহারে, হিজড়াদের মনেও দয়া আছে, দায়িত্ববোধ আছে, পুলিশের তাও নেই। সব ট্রাফিকের সিগন্যাল যেমন একই রকম, সব সরকারের পুলিশ একই রকম দায়িত্বহীন। এর মধ্যে আবার পত্রিকায় দেখেছি বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারাকাতকে সপরিবারে হত্যার হুমকি দিয়েছে চিহ্নিত মৌলবাদীরা। অবাক হচ্ছি, এ ব্যাপারে প্রশাসনের কোন মাথা ব্যাথা নেই। ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশকে নির্মম হত্যার ব্যাপারে পুলিশ প্রশাসনের নিষ্ক্রীয়তাকে দায়ি করেছেন ইমরান এইচ সরকার এবং ড. জাফর ইকবাল। সরকারের একজন খচ্চর এম.পি. ড. জাফর ইকবালকে কটুক্তি করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কলাম লিখেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য, কর্নেল তাহেরের ভ্রাতা ড. মোঃ আনোয়ার হোসেন (জনকন্ঠ- ১৯/০৫/০১৫)। আজকেও জনপ্রিয় কলাম লেখক আবদুল গফ্ফার চৌধুরী দৈনিক জনকন্ঠে ড. জাফর ইকবালের পক্ষে কলাম লিখেছেন। ২/১ জন খচ্চর এম.পি. প্রধানমন্ত্রীর কষ্টার্জিত ক্রেডিবিলিটি ধূলায় লুন্ঠিত করতে যথেষ্ট। তাদের লাগাম টেনে ধরতে হবে সরকারের নিজের স্বার্থে। ব্লগার ড. অভিজিত হত্যার সময়ও পুলিশ দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে। এ ব্যাপারে তার স্ত্রী রাফিদা আহমদ বন্যা ক্রুর ভাষায় অভিযোগ করেছেন। অভিযোগগুলো একের পর এক অরণ্যে রোদন করেই যাচ্ছে। এর পরিণতি পুলিশের জন্য খারাপ হবে না, খারাপ হবে সরকারের জন্য। পুলিশতো যে পাত্রে যাবে সেই পাত্রের রং ধরবে। পুলিশ কীভাবে মতিয়া চৌধুরী আর মোহাম্মদ নাসিমকে রাস্তায় পিটিয়েছে আমাদের তা মনে আছে। পুলিশ শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ও মহিয়সী কবি সুফিয়া কামালকেও ছাড়েনি। স্বাধীনতা পরবর্তী ৪০ বছরে বিচার হীনতার সংস্কৃতি একই রকম আছে, পুলিশের স্বভাবও একই রকম আছে। বলা হয় বাঘে ছুঁলে এক ঘা আর পুলিশের ১৮ ঘা। এ কথা সিভিল, নিরীহ নাগরিকের বেলায় ১৬ আনা প্রযোজ্য। এ কথা যদি ব্লগার হত্যাকারীদের বেলায় প্রযোজ্য হোত, আমরা নিরাপত্তা খুঁজে পেতাম। পুলিশ কে একচেটিয়া দোষারোপ করতে চাই না, তারা কোন কোন ক্ষেত্রে ভালো ভূমিকা নিয়েছে। জঙ্গী দমনে নিশ্চয়ই পুলিশের ভূমিকা ইতিবাচক। আমাদের দাবি হচ্ছে, প্রজাতন্ত্রের পুলিশও মানবিক চেতনার দ্বারা চালিত হবে। রাজীব হায়দারের মত মেধাবী ব্লগারকে করুণভাবে হত্যার পরই বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনী অধিকতর সচেতন হতে পারতো।
বর্তমান সরকারের সদিচ্ছাকে আমরা কটাক্ষ করতে চাইনা। কিন্তু সদিচ্ছাই সব কিছু নয়। সরকারের সদিচ্ছার ফাঁক গলিয়ে বিচারহীনতার দৃষ্টান্ত প্রলম্বিত হচ্ছে। খুন ও ধর্ষণের পরিমান বেড়েই যাচ্ছে। শাস্তি প্রদানকারী আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শৈথিল্য এখানে ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করছে। নদীর পানি যদি বিষাক্ত হয়, কোন জীব তা থেকে রেহাই পাবে না। বাংলাদেশে বিচারহীনতা যদি বেড়েই যায় তাহলে একটা পর্যায়ে সন্ত্রাসীরা সরকার পক্ষের লোকজনদের ধরে ধরে হত্যা করবে, পুলিশ তামাশা দেখবে। আজই পত্রিকায় দেখলাম (২০/৫/০১৫), ‘লক্ষীপুরে মামুনুর রশীদ খান নামে এক ছাত্রলীগ কর্মীকে গুলি করে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা। সোমবার রাতে সদর উপজেলার চন্দ্রগঞ্জ আমানী লক্ষীপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।’ সামনে এমন ঘটনা আরো ঘটলে বিস্ময়ের কিছু থাকবে না। ইংরেজ ঔপনিবেশিক আমলে বিচারহীনতাই স্বাভাবিক ছিলো বলে রবীন্দ্রনাথ তিরস্কারের সুরে বলেছিলেন, ‘বিচারের বানী নিভৃতে কাঁদে।’
রবীন্দ্রনাথের ওপর একটি গবেষণা মূলক বইয়ে ইংরেজ সেনাপতি ডায়ারের একটি সাক্ষাৎকারের অনুবাদ ছেপেছেন লেখক। ডায়ার পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালা বাগে ১৯১৯ সালে ঠান্ডা মাথায় শত শত ভারতবাসীকে হত্যা করেছিলো। সাক্ষাৎকারে ডায়ার বুক ফুলিয়ে সে হত্যার দায় স্বীকার করেছে। ডায়ারের কোন বিচার হয়নি। আমরা ইংরেজ তাড়ালাম, পাকিস্কানি খান সেনা তাড়ালাম ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করার জন্য, বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার জন্য নয়। অতএব সাধু সাবধান। মাহমুদুল বাসার কলাম লেখক ও গবেষক।