পৃথিবীকে জেনে নিন আপনার ভাষায়….24 Hrs Online Newspaper

ইলিশ খাবেন না বৈশাখে, প্লিজ!

জব্বার হোসেন: অমনও শুনেছি, স্বামী বেচারা এ সময় অগ্নিমূল্যে ইলিশ কিনতে রাজি না হওয়াতে দাম্পত্য সম্পর্কটি শেষাবধি বিচ্ছেদে গড়িয়েছে। বৈশাখে ইলিশ চাই-ই। ইলিশ ছাড়া বৈশাখ উদযাপন অসার যুক্তি ভূতের বাড়ি। বাজার ও মিডিয়ার কী ভয়ঙ্কর প্রতাপ। ইলিশ বৈশাখের, বাণিজ্যিক কারণে বাণিজ্যিক মিডিয়া- এমন ধারণা চারদিক উৎসবের আমেজে প্রচার করছে।jobbar20160411040730

বন্ধুপ্রতিম, মেধাবী মুখ খালেক মুহিউদ্দিনই প্রথম ব্যক্তি যিনি সাংবাদিক হয়ে, সাংবাদিকতার শিক্ষক হয়ে, মিডিয়ার মানুষ হয়ে- মিডিয়ার এই অপপ্রচারের বিরুদ্ধে বলেছেন। বলছেন এখনও। মনে আছে, ইন্ডিপেডেন্ট টেলিভিশনের আগে তিনি যখন সাপ্তাহিক কাগজ সম্পাদক ছিলেন, জনপ্রিয় দৈনিক আমাদের সময়-এ একটি কলাম লিখেছিলেন। তথ্য দিয়ে, যুক্তি দিয়ে বোঝাতে চেয়েছিলেন, ইলিশ বৈশাখের নয়।
কার কথা শোনে কে?

মানুষের মধ্যে যুক্তিহীনতা, বিজ্ঞানহীনতা, প্রকৃতিবিরোধিতা, ধর্মান্ধতা ভয়ঙ্করভাবে কাজ করে। শিক্ষিত হলেই লোকের মধ্যে যুক্তিপ্রবণতা কাজ করে তা নয়, বরং লেখাপড়া জানা অনেকের মধ্যে কখনও কখনও যুক্তিহীনতার মাত্রা ভয়াবহভাবে কাজ করে। প্রচলিত শিক্ষা তাকে একটা ছকের মধ্যে থাকতে, ভাবতে, শিখতে সাহায্য করে। এই ছক থেকে সে সহজে বেরুতে পারে না। ফলে ছকের বাইরে বা বৃত্তের বাইরে দাঁড়িয়ে কেউ তাকে কোনো বিষয়ে বললে, সে তখন প্রস্তুত থাকে না, তার কথা শুনতে। তখন স্বাভাবিকভাবেই বৃত্তের বাইরের মানুষটিকে শক্র বলে ভাবে। অথচ বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এলেই, বাইরে এসে দাঁড়ালেই বরং মোহভঙ্গ ঘটে, নির্মোহভাবে দেখা যায়, ভাবা যায়, বোঝা যায় ভেতরে কি ঘটছে। ভেতরে থাকলে অনেক সময় বোঝা যায় না, বাইরে আসতে হয়।

মুখে আমরা সবাই প্রগতিশীল। বিজ্ঞানমনস্ক। প্রকৃতিপ্রেমী। প্রকৃতি ভালোবাসি, ভী-ষ-ণ ভালোবাসি বলে ফেনা তুলি মুখে। অথচ প্রকৃতি যে কী তাই বা কজনে বুঝি? কখনও কখনও চারপাশ দেখে মনে হয়, আমরা বড্ড হুজুগে, সবাই করছে তাই আমাকেও তা করতে হবে, সবাই যাচ্ছে তাই আমাকেও যেতে হবে, সবাই খাচ্ছে তাই আমাকেও খেতে হবে। কেন, কি কারণে, কি করব বা করব না- তা একটিবারের জন্যও ভাবি না, ভাববার চেষ্টাও করি না।

বৈশাখ। বর্ষবরণ। ঋতুচক্রের খেলা। এতো প্রকৃতিরই উৎসব। প্রকৃতিকে বরণ করে নেওয়ার, প্রকৃতির সঙ্গে মিলবার, নিজেকে মেলাবার উৎসব। একজন বাঙালি হিসেবে পহেলা বৈশাখকেই সবচেয়ে বড় উৎসব বলে মনে করি। এমন সার্বজনীন, অসাম্প্রদায়িক উৎসব বাঙালির জীবনে আর কোথায়? কিন্তু কী ভয়ঙ্কর! প্রকৃতির এই উৎসবে, এমন দিনে, এমন প্রকৃতি বিরোধিতা!

হ্যাঁ, আমি প্রকৃতি বিরোধিতাই বলব, পহেলা বৈশাখের নামে ইলিশ নিধন, প্রকৃতি বিরোধিতা ভিন্ন কিছু নয়। ইলিশ বৈশাখের নয়। বৈশাখের সঙ্গে, ইলিশের আদৌ কোনো সম্পর্ক নেই। বৈশাখের সঙ্গে ইলিশকে যুক্ত করে যে ইলিশ নিধন তা নেহায়েত পুঁজি, বাণিজ্য ও মুনাফা সর্বস্বতা। একটু লক্ষ্য করলেই দেখবেন, বুঝবেন- এই ইলিশ বাণিজ্য ও বাণ্যিজিক মিডিয়ার। যদি প্রকৃতি সম্পর্কে, প্রকৃতি বিজ্ঞান সম্পর্কে ন্যূনতমও কোনো জ্ঞান থাকে তাহলেই বোঝা যায়, ইলিশের সঙ্গে বৈশাখের কোনো সম্পর্ক নেই। প্রকৃতিই নির্ধারণ করে দিয়েছে কোন সময় কোন ফুল ফুটবে, কোন ফল ধরবে, কোন মাছ পাওয়া যাবে কখন। এইসময় ইলিশের প্রজননের। এখন ইলিশমিথুন কাল। ইলিশ এখন সঙ্গম করবে, যৌনসুখে সুখ সাগরে ভাসবে, সাত আসমান ঘুরে আসবে। এমন সময় ইলিশ নিধন নিতান্ত প্রকৃতি বিরুদ্ধ। এখন ইলিশ খেলে ইলিশের বংশ বিস্তার হবে কিভাবে? আইনগতভাবেও এই সময় ইলিশ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবে কী আইনও ভঙ্গ করছি না আমরা? তাজা ইলিশ, টাটকা ইলিশ বলে ‘সুপারশপে’ অগ্নিমূল্যে যে ইলিশ বিক্রি হচ্ছে তা কেন খাচ্ছি? এই ইলিশ তো স্বাদহীন, গন্ধহীন, বাসি। আবহাওয়া, প্রকৃতি, বিজ্ঞান- কোনো বিচারেই ইলিশ খাওয়ার সময় বৈশাখ নয়, বর্ষা।

সুযোগ হয়েছিল খ্যাতিমান পুষ্টিবিদ সিদ্দিকা কবীরের সঙ্গে কাজ করার। তিনি ছিলেন খাদ্য ও পুষ্টি বিষয়ে দেশে-বিদেশে সম্মানিত পরিচিত নাম। তার কাছে একদিন জানতেও চেয়েছিলাম, বৈশাখ বরণের খাদ্য তালিকা। বলেছিলেন, বৈশাখে ইলিশ খাওয়া নিতান্ত মূর্খতা, বিজ্ঞানহীনতা। আবহমান কাল থেকে গ্রাম বাংলায়, বৈশাখের দিনে পান্তাভাত, যেকোনো বড় মাছের ভাজা টুকরো, ছোট মাছের ঝোল, ডাল-সবজি চচ্চরি, নানা প্রকারের ভর্তা, মুড়ি-মুরকি, খই, চিড়া, দই- এ সবই বর্ষবরণে খাবার রীতি।

পুঁজি ও বাণিজ্য তার মুনাফার জন্য কত কিছুই না করে! কত কিছুই না ধ্বংস করে আবার সৃষ্টি করে তারই স্বার্থে। ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ধর্ম কোনো কিছুই বাদ যায় না তার হাত থেকে। বর্ণবাদী পুঁজিবাদ কালো মানুষকে ফর্সা হতে বলে। স্লিম ফিগারের প্রচারণায় ‘বুলেমিয়া’র মতো রোগ ছড়িয়ে দেয়। আধুনিকতার নামে কাপড় খুলে উদোম করে মেয়েদের। লোম তুলতে ‘ব্লিচ ক্রিম’ বিক্রির হিড়িক পড়ে যায়। পুরুষদেরও ছাড়ে না পুঁজি, বাধ্য করে ‘মেন্স অ্যাকটিভ’ কিনতে। যৌনতা, যৌনাঙ্গেও হাত দেয় পুঁজি। রেহাই পায় না নারী-পুরুষ কেউই!
পুঁজির এই বাণিজ্যিক প্রচারণায় মিডিয়াও যুক্ত হয়, নিজেকে যুক্ত করে মুনাফার লাভে-লোভে। কারণ মিডিয়া, সেও তো পুঁজিরই!

লেখক : উপসম্পাদক, দৈনিক আমাদের অর্থনীতি। ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, সাপ্তাহিক কাগজ ও মিডিয়াওয়াচ। পরিচালক, বাংলাদেশ সেন্টার ফর ডেভলপমেন্ট জার্নালিজম অ্যান্ড কমিউনিকেশন। সদস্য, ফেমিনিস্ট ডটকম, যুক্তরাষ্ট্র

Posted in নির্বাচিত কলাম | Comments Off on ইলিশ খাবেন না বৈশাখে, প্লিজ!

এ যেন ধর্ষকের সমর্থনে ধর্ষিতার আনন্দধ্বনি!

ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচে বাংলাদেশী দর্শকদের ভূমিকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। খেলায় যেসব বাংলাদেশী পাকিস্তানের সমর্থনে পতাকা ওড়ান, তাদের প্রতি প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, তাদের কি হাত কাঁপে না?

শনিবার রাতে ফেসবুকে দেয়া তসলিমা নাসরিনের স্ট্যাটাসটি তুলে দেয়া হলো-
ভালো খেলার জন্য হাততালি দাও ঠিক আছে। আমি তো ভালো খেললে, সে যে দলই খেলুক, সাপোর্ট করি। বাংলাদেশের স্টেডিয়ামে এখন যে ভারত-পাকিস্তানের খেলায় পাকিস্তানের সমর্থনে বাংলাদেশি দর্শকরা আনন্দে চিৎকার করছে, কেন করছে? পাকিস্তান ভালো খেলছে বলে? নাকি ভালো খেলুক বা না খেলুক, দলটি পাকিস্তান বলে? দলটি পাকিস্তান বলে যারা সমর্থন করছে, আমার খুব জানতে ইচ্ছে, তারা কি একাত্তরের মিত্র-দেশকে না করে জেনে বুঝে শত্রু-দেশকে সমর্থন করছে?Taslima_Nasrin_par_Claude_Truong-Ngoc_novembre_2013

খেলার সঙ্গে রাজনীতি মেশানোর কোনও ইচ্ছে আমার নেই। কিন্তু দেশকে সমর্থন করতে গেলে প্রশ্ন ওঠে দেশটির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ঠিক কী রকম। নতুন প্রজন্ম না হয় একাত্তরের যুদ্ধ দেখেনি, কিন্তু শুনেছে বা পড়েছে তো যুদ্ধ সম্পর্কে। এখনও তো অর্ধ শতাব্দিও পার হয়নি তিরিশ লক্ষ মানুষকে খুন করে গেছে ওরা, দু’ লক্ষ মেয়েকে ধর্ষণ করে গেছে। জানি পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ বা ক্রিকেটাররা খুন বা ধর্ষণ করেনি, করেছে পাকিস্তানি সেনার দল। কিন্তু সাধারণ মানুষ বা ক্রিকেটাররা কি একাত্তরে তাদের দেশের ভূমিকার জন্য লজ্জিত, দুঃখিত, ক্ষমাপ্রার্থী? মনে হয় না।

আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে,পাকিস্তানকে সমর্থন করতে গেলে, ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বলতে গেলে, বা পাকিস্তানের পতাকা ওড়াতে গেলে বাংলাদেশের মানুষদের একটুও কি বুক কাঁপে না, কণ্ঠ কাঁপে না, হাত কাঁপে না?

আনন্দ ধ্বনি শুনে আমার মনে হচ্ছিল এক ধর্ষিতা নারী আনন্দ ধ্বনি করছে তার ধর্ষকের সমর্থনে।

Posted in নির্বাচিত কলাম | Comments Off on এ যেন ধর্ষকের সমর্থনে ধর্ষিতার আনন্দধ্বনি!

চেনা পথের পথিক বিএনপি

1426926729সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা: বুধরাজনীতির চেনা ছকেই পা ফেলেছেন খালেদা জিয়া আর তার দল বিএনপি। এখন দলটির একমাত্র রাজনীতি একাত্তরের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধকে কটাক্ষ করা। আর কোনও রাজনীতি নেই দলটির। দলের চেয়ারপারসন প্রথমে বলেছেন, তারপর এখন নেতা পাতিনেতারাও বলছেন। এটাই প্রমাণ করতে উঠেপড়ে লেগেছেন যে, মুখে যতই মুক্তিযুদ্ধের কথা বলুক, দলটির আসল রাজনীতি স্বাধীনতাবিরোধীদের পক্ষে অবস্থান নেওয়া। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরুর পর দলের জন্য এই পথটি আরও স্বচ্ছ হয়েছে।
রাজনীতির চেনা পথের পথিক এই দল। এর নেতা নজরুল ইসলাম খান বলেছেন তারা নিজেরাই জরিপ করে দেখবেন কত শহীদ হয়েছেন একাত্তরের যুদ্ধে। বিএনপির জন্য অবশ্যই এটি প্রকল্প। কারণ আর কোনও কাজ নেইতো এখন। সংসদে নেই, মানুষকে পেট্রোলবোমায় পোড়ানোর রাজনীতি ব্যর্থ হওয়ার পর এখন আন্দোলেনেও নেই। তাই এখন এই প্রকল্প। জ্বালানি তেলের দাম সরকার কমায় না, বিএনপি নীরব, গ্যাস সংকট হয়, বিএনপি নীরব, দুর্নীতি কমে না বলে টিআইবি রিপোর্ট দেয়, বিএনপি নীরব। সরব শুধু স্বাধীনতা যুদ্ধের মীমাংসিত এই সত্যকে কলুষিত করায়। আশা করছি, এমন আকর্ষণীয় প্রকল্পে বিনিয়োগেরও অভাব হবে না। দেশের মানবতাবিরোধী অপরাধীরা আছেন, তাদের অর্থ আছে, আর্থিক প্রতিষ্ঠান আছে, কিন্তু তার চেয়ে বেশি আছে আরেকটি দেশ, পাকিস্তান। এমন প্রকল্পে পাকিস্তান নিশ্চয়ই অর্থ বিনিয়োগ করবে, কারণ তারাই সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিতর্কিত হলে। বিতর্কিত, তাও আবার এমন এক দলের মাধ্যমে, যে দলটির প্রতিষ্ঠাতা নাকি আবার স্বাধীনতার ঘোষক!
রাজনীতির স্রোতে বিএনপি নিজেই নিজেকে এমন এক জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে যে, তারা খেলছেন পুরোনো ছকে। খালেদা জিয়া এবং তার ছেলে তারেক রহমান রাজনীতি করতেই এসেছেন। কাজেই খেলার নিয়মটি দ্রুত রপ্ত করে নেওয়ার আবশ্যিকতা তারা জানেন। তাই এই খেলায় তাদের কৌশল, স্বাধীনতাবিরোধী সব জোটের একক মালিক হওয়া, যেমনটি শুরু করেছিলেন জিয়াউর রহমান নিজে যুদ্ধাপরাধীদের জেলে থেকে ছেড়ে দিয়ে, গোলাম আযমকে দেশে এনে, স্বাধীনতার সেøাগান বদলে দিয়ে, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করে, স্বাধীনতাবিরোধীদের মন্ত্রিত্ব দিয়ে।
দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া প্রথমে বলেছেন এবং তার সঙ্গে আরও কদর্যভাবে গলা মিলিয়েছেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। এবং আশ্চর্যজনকভাবে দুজনেই বলেছেন বিজয়ের মাসে, দুজন মানবতারোধী অপরাধীর ফাঁসি কার্যকরের পর পাকিস্তানের তীর্যক বাংলাদেশবিরোধী, বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী বক্তব্যের পর পর। মুক্তিযুদ্ধকে অপমান করার এমন প্রেক্ষাপট কেবল বিএনপিই পেয়ে থাকে।
বাংলাদেশে সুশীল সমাজের একটি বড় অংশ বিএনপির প্রতি দুর্বল। শেখ হাসিনার সামান্য কথায় তারা যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখান, এবার তারা নিশ্চুপ। তবে কি তারা এই বক্তব্যে বিভ্রান্ত হননি, নাকি বিভ্রান্ত হয়ে শোকে পাথর হয়েছেন?
বিএনপি, জামাতসহ স্বাধীনতাবিরোধীদের কাছে শহীদের সংখ্যা কেবল একটি সংখ্যা। কিন্তু এর সঙ্গে সমগ্র জাতির স্পর্ধা ও ভালোবাসা জড়িত। এর সঙ্গে দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন দেওয়া লাখ লাখ শহীদের স্বজনদের আবেগ ও বেদনা জড়িত। এর সঙ্গে মহান মুক্তিযুদ্ধের অহঙ্কার জড়িত।
বিএনপি নেত্রী, তার ছেলে এবং দলের কোনও কোনও নেতা প্রায়ই আবার বলে থাকেন বঙ্গবন্ধু (তারা বঙ্গবন্ধু বলেন না, যেমন বলে না জামাতে ইসলামী) শেখ মুজিব স্বাধীনতা চাননি। প্রশ্ন হলো, যদি তিনি না চেয়ে থাকেন, স্বাধীনতাটা এলো কিভাবে? একাত্তরের ১ থেকে ২৫ মার্চ বাংলাদেশ কার নির্দেশে চলেছে? শেখ মুজিব না পাকিস্তান বাহিনীর? জিয়াউর রহমান কার নামে ২৭ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেছিলেন? কার নামে মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করেছেন? একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় যে সরকারটি গঠিত হয়েছিল, সেটিই বা কার নেতৃত্বে? বংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে হয়েছে, আকস্মিকভাবে কোনও মেজরের ডাকে নিশ্চয়ই নয়। তাহলে তো সব ইতিহাসই মিথ্য।
প্রথমে অনেকেই ভেবেছিলেন, খালেদা জিয়া যা বলেছেন, তার রাজনৈতিক প্রভাব বুঝতে পেরে দলের নেতারা এ নিয়ে আর উ”চবাচ্য করবেন না। কিন্তু প্রতিদিন বিএনপি নেতারা যেভাবে মুক্তিযুদ্ধ, শহীদ পরিবার, শহীদ বুদ্ধিজীবীদের অপমান করে বক্তব্য রাখছেন, তাতে একথা জলের মতো পরিষ্কার যে, তারা রাজনীতি করছেন স্বাধীনতাবিরোধীদের খুশি করার জন্যই।
তিনবার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, ৩২ বছর ধরে বিএনপির নেতৃত্ব দিচ্ছেন খালেদা জিয়া। কখনও শহীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি। আজ তুলছেন? কারণ দেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলছে, যা এই দলটির আদর্শের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায়, অস্বস্তির বিষয়। বিএনপি নেতারা বলেন, তারাও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চান, তবে সেটি আন্তর্জাতিক মানের হতে হবে। কিন্তু ক্ষমতায় থাকতে তারা সেই বিচার তারা করেননি। এদেশে মানুষ জানে জামায়াতের নেতা গোলাম আযমের বিচারের দাবিতে শহীদজননী জাহানারা ইমামসহ যে ২৪ জন বিশিষ্ট নাগরিক গণ-আদালত গঠন করেছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদোহ মামলা দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া।
সম্প্রতি মানবতাবিরোধী দায়ে বাংলাদেশে দুই রাজনীতিকের মৃত্যুদ- কার্যকর হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানের সরকার ও রাজনৈতিক মহল যেসব মন্তব্য করেছে, তা ছিল খুবই উস্কানিমূলক। এর মাধ্যমে একাত্তরের পরাজিত পাকিস্তান নিজেদের অপরাধই শুধু আড়াল করছে না, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধটাকেও তারা অস্বীকার করছে। দুঃখজনকভাবে পাকিস্তানের এই অবস্থানকে সমর্থন করে যাচ্ছেন বিএনপি নেত্রী, তার সাহাবিরা।
পাকিস্তান যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর থেকেই পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকার আলবদরদের হাতে নিহত ব্যক্তিদের সংখ্যা কমিয়ে দেখাতে তৎপর ছিল, এখনও আছে। পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই ভাড়াটে লেখকদের দিয়ে ভূয়া ইতিহাসও মাঝে মধ্যে লিখিয়েছে। কিন্তু এবার সম্ভবত সবচেয়ে খুশি পাকিস্তান, কারণ বাংলাদেশের একজন নেত্রী, সাবেক প্রদানমন্ত্রী, যেকোনওভাবেই হোক একজন মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী, তাদের মতো করে বাংলাদেশের ইতিহাস বলছে। রাজনীতি করতে গিয়ে, সরকার বিরোধিতা করতে গিয়ে, পাকিস্তানের পক্ষে এমন স্পষ্ট অবস্থান নিকট অতীতে দেখা যায়নি।
স্বাধীনতার ৪৫ বছরে আমরা। এখনও কত ঘটনা, কত কাহিনি অনুদ্ঘাটিত। কত মানুষ এখনও স্বজনের অপেক্ষায়। সেই স্বজনহারা মানুষদের শুধু অন্তরে আঘাত নয়, খালেদা জিয়া আর দল পাকিস্তান ও দালালদের স্বার্থ হাসিলের জন্য নতুন করে লড়াই শুরু করেছেন। কিন্তু যে নীতি দেশের মৌলিক চেতনার সঙ্গে যায় না, তার পুনর্বিবেচনা জরুরি। বোঝা দরকার ক্ষমতা এখনও অলীক দূরত্বে। বাংলাট্রিবিউন
লেখক: পরিচালক বার্তা, একাত্তর টেলিভিশন

Posted in নির্বাচিত কলাম | Comments Off on চেনা পথের পথিক বিএনপি

পুলিশের বিরুদ্ধে যৌন অযৌন হয়রানির অভিযোগ এবং মিডিয়ার মূর্খতা

জব্বার হোসেন: কাল সকালে আমার বিরুদ্ধে যদি শ্লীলতাহানির, যৌন হয়রানির কোনো অমূলক অভিযোগ ওঠে, তাতে মোটেও বিস্মিত হবো না আমি। কেননা, বিস্মিত হতে যে সময়টুকু লাগে, তারচেয়েও অধিক কম সময়ে অভিযুক্তকে হয়রানি করা সহজ এক্ষেত্রে। অভিযোগ করলেই হলো। সত্যাসত্য প্রমাণ, সেতো অনেক সময় বাকি। ততক্ষণে অভিযুক্তের ১২টা, ২৪টা, ৩৬টা, ৪৮টা- যা বাজার তারচেয়েও অনেক বেশি বেজে যায়। প্রচলিত আইনের ধারা, উপধারার ফাঁকফোকরের কারণে, কে কোথায় কিভাবে সুবিধে নিচ্ছে, অসুবিধেয় পড়ছে কে, ভুগছে কে ভোগাচ্ছে কাকে, কে রাখে সে খবর! আর নারী হলে তো কথাই নেই। আমি নির্যাতিত, আমি ভিক্টিম, আমি শ্লীলতাহানির, যৌন হয়রানির শিকার এমনটি বলতেই যা সময় লাগে, ভোগাতে সময় লাগে তারচেয়ে আরও অনেক কম।1422641308_Jabber-Hossain
যৌন অভিযোগ দুর্দান্ত এক অস্ত্র। নারীর জন্য, পুরুষের জন্যও। যে কোনো মারণাস্ত্রের চেয়েও তা কম ভয়ঙ্কর নয়, কোনো অংশে। যে কোনো মেয়েকে দুঃশ্চরিত্র বলার চেয়ে সহজ কাজ জগতে দ্বিতীয়টি নেই। পুরুষের ক্ষেত্রেও তাই। যে কোনো পুরুষকে লম্পট, দুঃশ্চরিত্র বলে ফেললেই হলো, আর শ্লীলতাহানি বা যৌন হয়রানির চেষ্টার অভিযোগ সেতো আরও ভয়ঙ্কর। এতে শ্লীলতাহানি বা যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটাতে হয় না। কেননা ঘটেনি বা ঘটবার আগপর্যন্ত তো ‘সবটাই চেষ্টা’ বলে চালিয়ে দেওয়া সহজ। চেষ্টা বড়ই বায়বীয় একটি শব্দ। আর আইনি ভাষায় ‘এমন চেষ্টা’ আরও ভয়াবহ। যৌন অভিযোগের এ হাতিয়ার নতুন নয়, পুরনো। এর কোনো পূর্ব-পশ্চিম নেই। ধর্ম-অধর্ম নেই। রাজনীতি-অরাজনীতি নেই। জাতপাত নেই- করলেই হলো। ইতালির বারলুসকুনি, আইএমএফের প্রেসিডেন্ট ট্রসকান থেকে শুরু করে কে নয়, যৌন হয়রানির অভিযোগের শিকার?
২.
আমাদের একটি দার্শনিক দারিদ্র্য আছে। কোনো ঘটনাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে চাই না আমরা। আতশকাঁচের তলে ফেলি না। বাইরে থেকে যা দেখা যায়, যা শোনা যায়, যা বলা হয়, তাই বুঝতে চাই- এর বাইরে কিছু নয়। এটিই আমাদের দর্শনগত ত্রুটি ও দুর্বলতা। আমাদের মিডিয়ার অবস্থাও তথৈবচ। বাণিজ্যিক মিডিয়া শ্রোতের অনুকূলেই সাঁতার কাটে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা তো বিলুপ্তপ্রায়। বরং কি জাতীয় শব্দে, সংবাদ পরিবেশনে দ্রুত পাঠক, দর্শক ধরা যাবে, অনলাইনে হিট বাড়বে, তাতেই ব্যস্ত সবাই। কখনও কখনও সাংবাদিকতার ন্যূনতম নৈতিকতার সীমাটিও মানতে চাই না।
গত কদিন আগে পুলিশের এসআই রতন হালদারের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকে শ্লীলতাহানির খবরটিতে দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়। প্রথমে দুএকটি, পড়ে বেশ কয়েকটি খবরের কাগজ, অনলাইন পড়ে আমার মধ্যে বেশ কিছু প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। যুবদল নেতা সজীব আহমেদ রানার স্ত্রী ফারহানার বর্ণনায় ঘটনাটি ঘটেছে আদাবর থানা এলাকায়। অথচ তিনি অভিযোগ করতে গিয়েছেন মোহাম্মদপুর থানায়। থানার পুলিশ তার মামলাটি নিতে চাননি বলে অভিযোগ করেছেন। আদালতে গিয়ে মামলা করেছেন। কিন্তু থানায় ডিউটিরত প্রত্যেক পুলিশের নাম-পরিচয় জানা যায়, অথচ মামলাটি কোন পুলিশ নিতে চায়নি তা তিনি কেন জানাননি? তিনি তো চ্যালেঞ্জ করতে পারতেন, কেননা ঢাকার প্রতিটি থানা এখন সিসি টিভির আওতাভুক্ত। সিসি টিভির ফুটেজেই তো অস্বীকৃতি জানানো পুলিশকে শনাক্ত করা যেতো। ফারহানা জানিয়েছেন, তাকে রাস্তায় গতিরোধ করে এসআই রতন এবং দুই পুলিশ সদস্য। ইয়াবা আছে এই সন্দেহের কথা বলে পাশের একটি দোকানে নিয়ে যায়। অথচ যমুনাসহ আরও কয়েকটি টেলিভিশনের খবরে দেখেছি প্রত্যক্ষদর্শী দোকানিরা তা অস্বীকার করেছেন।
তবে পুলিশের বিরুদ্ধে পুলিশ বিভাগের আচরণটি রীতিমতো বিস্মিত করার মতো। ঘটনার সত্যতা বা অভিযোগ প্রমাণের অনেক আগেই রতন হালদারকে বরখাস্ত করেন তেজগাঁও জোনের ডিসি বিপ্লব কুমার সরকার। জানা যায়, বিস্ফোরক আইনে চার্জশিট দেওয়া মামলার আসামির স্ত্রীকে রাস্তায় আটকে কথা বলতে কেন গেলেন এমন যুক্তিতেই তিনি বরখাস্ত করেছেন রতন হালদারকে। অভিযুক্ত রতনের যুক্তি, তিনি পলাতক আসামি যুবদলের সন্ত্রাসী রানা, যিনি ইয়াবা রানা হিসেবেও পরিচিত, তার হদিস জানতে চেয়েছেন তার স্ত্রী ফারহানার কাছে। পাশাপাশি ফারহানা নিজেও ইয়াবা নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত, সোর্স মারফত এমন তথ্য পেয়েই ফারহানার গতিরোধ করেন তিনি। থানায় যেতে বলেন, কিন্তু কোনো নারী পুলিশ সদস্য না থাকায় ফারহানাকে আর থানায় নেওয়া সম্ভব হয়নি। ফারহানা এসআই রতন হালদারকে ‘দেখে নেব কিভাবে চাকরি করিস’ বলে শাসান। রতন হালদার তা তার ঊর্ধ্বতনকে জানান এবং থানায় এসে হুমকির জিডি করেন।
৩.
একজন ডিসি বিপ্লব কুমার সরকার অভিযোগ প্রমাণের আগেই শাস্তি দিয়েছেন রতন হালদারকে। অপরাধ প্রমাণের আগেই অপরাধী বানিয়ে দিয়েছেন তাকে। কোনো কোনো মিডিয়ার আচরণও তাই। প্রায় বেশির ভাগ অর্ধ শিক্ষিত মিডিয়ার ‘এবার এসআইএর যৌন হয়রানি’, ‘বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে পুলিশের শ্লীলতাহানী’, ‘এসআই রতন শ্লীলতাহানী করলেন এক ছাত্রীর’ এমন সব শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করেছে। ‘অভিযুক্ত’ শব্দটি ব্যবহারের প্রয়োজনও মনে করেনি এসব অর্ধশিক্ষিত প্রতিবেদকেরা। নাকি শ্লীলতাহানীর, যৌন হয়রানির একটি দৃশ্যকল্প ভেবে পুলক পেতে ও পাঠকদের পুলকিত করতে চেয়েছিলেন তারা, সেটিও বিবেচ্য।
আবার অনেকেই লিখেছেন ‘ভুক্তভোগী’ ফারহানা আক্তার। ফারহানা অভিযোগকারী, অভিযোগ প্রমাণের আগে তিনি ভুক্তভোগী কি অভুক্তভোগী সেই সিদ্ধান্ত কী করে নেই আমরা। কখনও কখনও মিডিয়া কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণের আগেই তাকে শাস্তির মঞ্চে দাঁড় করায়। অশিক্ষা, অর্ধশিক্ষা, ‘বিশেষ শিক্ষা’র কারণে এমনটি মিডিয়াতে হরহামেশাই ঘটে থাকে। এমন ঘটনা এর আগেও দেখা গেছে।
আমি বলছি না, অভিযুক্তদের কেউ স্বর্গ থেকে আসা আশ্চর্য দেবদূত। মানুষের পক্ষে তা হওয়া সম্ভব নয়, প্রয়োজনও নেই। কিন্তু যে অভিযোগগুলো ঢালাওভাবে, একতরফাভাবে করা হয়েছে, এখানে কোথায় যেন যুক্তির ফাঁক, কোথায় যেন মিথ্যের প্রলেপ আছে মনে হয়।
মানবিক বিশ্বে কেউ-ই যেন হয়রানির শিকার না হয়, দুর্ভোগ না পোহায়, যৌন অযৌন কোনো মিথ্যে অস্ত্রের শিকার কেউ হোক চাই না। সততার সঙ্গে, শ্রম ও মেধার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে এসে, হয়রানির বিরুদ্ধে লড়তে এসে কেউ যেন নিজেই হয়রানির শিকার না হয়, হলে এর চেয়ে দুর্ভাগ্যের আর কিছুই নেই।
লেখক: উপ-সম্পাদক, দৈনিক আমাদের অর্থনীতি, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, মিডিয়াওয়াচ, পরিচালক, বাংলাদেশ সেন্টার ফর, ডেভেলপমেন্ট জার্নালিজম এন্ড কমিউনিকেশন, সদস্য, ফেমিনিস্ট ডটকম যুক্তরাষ্ট্র

Posted in নির্বাচিত কলাম | Comments Off on পুলিশের বিরুদ্ধে যৌন অযৌন হয়রানির অভিযোগ এবং মিডিয়ার মূর্খতা

তারা পারেন, অথচ অন্যরা করেন না

Golam Maula Ronyদিন কয়েক আগে পত্রিকায় একটি অদ্ভুত খবর পড়লাম। অদ্ভুত বললাম এ কারণে যে, সচরাচর পত্রিকাগুলো এমন খবর ছাপে না। আর ছাপবেই বা কেমনে কারণ এমন খবর তো সৃষ্টিই হয় না। খবরটি ছিল জনৈক সরকারি কর্মকর্তাকে তার সততা, কর্মদক্ষতা এবং কর্মে অসাধারণ সফলতার জন্য পুরস্কৃত করা হয়েছে। অবাক করা তথ্য হলো কোনো ভুঁইফোড় সংগঠন কর্তৃক সম্মাননা জানানো হয়নি অথবা কর্মকর্তার নিজস্ব অর্থে হল ভাড়া করে এবং ভাড়া করা বক্তা এনে কোনো ক্রেস্ট বিতরণ করা হয়নি। কর্মকর্তার নিয়োগকর্তা অর্থাৎ রাষ্ট্রই অনুষ্ঠানটির আয়োজক ছিল। অন্যদিকে রাষ্ট্রের প্রধান প্রাণপুরুষ রাষ্ট্রপতি জনাব আবদুল হামিদ স্বয়ং উপস্থিত থেকে নিজ হাতে প্রজাতন্ত্রের সেই সৎ এবং সাহসী কর্মকর্তাকে পুরস্কৃত করেছেন।
খবরে প্রকাশ মুনির চৌধুরী নামক কর্মকর্তা বর্তমানে বিদ্যুৎ, খনিজ ও জ্বালানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি নামক সরকারি প্রতিষ্ঠানে কোম্পানি সচিব হিসেবে কর্মরত আছেন। প্রতিষ্ঠাটির পুঞ্জীভূত অনিয়ম, দুর্নীতি এবং অরাজকতা দূর করার জন্য সরকার একটি টাস্কফোর্স গঠন করে এবং যুগ্ম সচিব পদমর্যাদায় কর্মকর্তা মুনির চৌধুরীকে সেই টাস্কফোর্সের প্রধান করা হয়। টাস্কফোর্স অতি অল্পসময়ের মধ্যে দুর্নীতি এবং অনিয়ম রোধ, বকেয়া রাজস্ব আদায় এবং রাজস্ব বৃদ্ধিতে এমন সব পদক্ষেপ গ্রহণ করে— যার ফলশ্রুতিতে সরকারি প্রতিষ্ঠানটির আয় ৫০০ কোটি টাকা বেড়ে যায়। একটি সংস্থার এমন সফলতার পেছনে মানুষটিকে সম্মান জানানোর জন্য রাষ্ট্র যখন সম্মাননা প্রদানের ব্যবস্থা করল ঠিক তখনই প্রসঙ্গটি আমার নজরে এলো অন্য একটি কারণে। এ ব্যাপারে বিস্তারিত বলার আগে জনাব মুনির চৌধুরী সম্পর্কে কিছু বলে নিই।
মুনির চৌধুরীর সঙ্গে আমার সরাসরি কোনো পরিচয় নেই। ২০১২ সালের শেষ দিকে একবার তার সঙ্গে টেলিফোনে কথা হয়েছিল তাও আবার ২-৩ মিনিটের জন্য। কিন্তু তার নাম আমি জানতাম বহুদিন আগে থেকেই। তিনি এক সময় চট্টগ্রাম বন্দরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। নিয়োগ লাভের পরই তিনি বন্দরের বেদখল হওয়া ভূমি উদ্ধারের জন্য তৎপরতা শুরু করেন। তৎকালীন সময়ে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা মূল্যের বেদখল হওয়া সরকারি ভূ-সম্পত্তি উদ্ধার করে তিনি চট্টগ্রাম তো বটেই পুরো দেশেই হৈচৈ ফেলে দিয়েছিলেন। শিপিং ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বিধায় আমি খুব ভালো করেই জানতাম, চট্টগ্রাম বন্দরের ভূমি দখলকারী কারা এবং তাদের ক্ষমতার ভিত্তি কতটা মজবুত! ফলে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট যখন এত বড় একটি চক্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জয়ী হলেন তখন সারা দেশের আরও অনেক মানুষের মতো আমিও তাকে ম্যাজিস্ট্রেট মুনির চৌধুরী নামেই হূদয়ের মণিকোঠায় শ্রদ্ধার আসনে বসিয়ে রাখলাম।
এখানে বলে রাখা ভালো, খুব অল্পসংখ্যক সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সততা, নিষ্ঠা এবং ব্যতিক্রমী কর্মের কথা দেশবাসী জানতে পারে। ভেজাল খাদ্যের বিরুদ্ধে ম্যাজিস্ট্রেট রোকনোদৌলার অভিযান কিংবা গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মাণ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সড়ক যোগাযোগ ও ভৌতিক কাঠামোর উন্নয়নে এলজিইডির প্রতিষ্ঠাতা প্রধান প্রকৌশলী জনাব কামরুল ইসলাম সিদ্দিকীর অবদান অনেকের মতো আমিও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। নিজের মনের অবদমিত আকাক্সক্ষা, শিক্ষা-দীক্ষা এবং ধর্ম বোধের কারণে আমি সেই ছোটবেলা থেকেই সৎ এবং ভালো মানুষের ভালো ভালো কর্মগুলোর সন্ধান করে আসছি এবং নিজের অবস্থান থেকে যথাসম্ভব সাহায্য সহযোগিতার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি। আমার সেই অনুসন্ধিৎসু মনের কারণেই হয়তোবা মুনির চৌধুরীর বিভিন্ন সময়ের নানান তৎপরতার কথা আমার কাছে চলে এসেছে। তিনি যখন মিল্কভিটা অথবা পরিবেশ অধিদফতরে কর্মরত ছিলেন তখনও যথেষ্ট দক্ষতা এবং সাহস শক্তি নিয়ে তার দায়িত্ব পালন করেছেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি কতটা আপসহীন এবং আইন বাস্তবায়নে কতটা কঠোর ছিলেন তা নিম্নের ঘটনা থেকেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম।
আমি তখন ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য। ২০১২ সালের মাঝামাঝি সময়ে আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু জনৈক বিদেশি শিল্পপতিকে আমার অফিসে নিয়ে এলো। ঢাকার নিকটবর্তী কালিয়াকৈরে বিদেশি শিল্পপতির রয়েছে সুবিশাল কম্পোজিট টেক্সাইল কারখানা। তিনি অভিযোগ করলেন, মাসখানেক আগে তার ফ্যাক্টরির গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। পরিবেশ অধিদফতরের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা এমন কাজ করতেই পারে এবং সচরাচর করেও থাকে। ফলে আমি কোনো প্রশ্ন না করেই শিল্পপতির প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে পড়লাম। ড. হাসান মাহমুদ তখন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী অন্যদিকে তৎকালীন সচিব মহোদয়ের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতার কথা হয়তো কেউ কেউ জানতেন। আমি প্রথমেই মন্ত্রীকে ফোন করার জন্য উদ্যত হলাম। ব্যবসায়ী বললেন, মন্ত্রীকে ফোন করে লাভ হবে না। আমরা অন্য একটি চ্যানেলে মন্ত্রীর অফিস গিয়ে তাকে দিয়ে বেশ কয়েকবার ফোন করিয়েছি— কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। আমরা আপনার কাছে এসেছি সচিব সাহেবকে দিয়ে তদবির করানোর জন্য।
ভদ্রলোকের কথা শুনে আমি বেশ নড়েচড়ে বসলাম এবং খানিকটা আশ্চর্য হয়ে গেলাম। উৎসুক দৃষ্টি দিয়ে তার দিকে তাকালাম এবং বললাম মন্ত্রী কাকে ফোন করেছিলেন? তিনি জবাব দিলেন মুনির চৌধুরীকে! আমি পাল্টা প্রশ্ন করলাম, তিনি কি ম্যাজিস্ট্রেট মুনির চৌধুরী! তার উত্তর হ্যাঁ। আমি সঙ্গে সঙ্গে ঘটনার গভীরতা আন্দাজ করতে পারলাম এবং ব্যবসায়ীকে বললাম, ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব অত্যন্ত সৎ, দক্ষ এবং সাহসী। আমি নিশ্চিত, আপনার ফ্যাক্টরিতে মারাত্মক ত্রুটি রয়েছে। তা না হলে উনি হয়তো এত বড় ফ্যাক্টরি যা কিনা শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা বন্ধ করতেন না। আমি তাকে আসল ঘটনা বলতে বললাম এবং সবকিছু শোনার পর আমি ব্যবসায়ীটিকে বললাম, আমি নিশ্চিত, মন্ত্রণালয়ের সচিব সুপারিশ করলেও কাজ হবে না। আমার কথা শুনে তারা মন খারাপ করে গোমড়ামুখে তাকিয়ে রইলেন।
মুনির চৌধুরীর সঙ্গে আমার তখন পর্যন্ত কোনো পরিচয় ছিল না। এমনকি ভদ্রলোককে আমি কোনো দিন দেখিনি। কিন্তু তারপরও কেন জানি মনে হলো তিনি হয়তো আমাকে চেনেন এবং আমার সম্পর্কে ভালো ধারণা পোষণ করেন। আমি ব্যবসায়ী ভদ্রলোককে আরেক দফা জেরা করে প্রকৃত ঘটনা অবহিত হওয়ার চেষ্টা করলাম এবং মনে মনে ধারণা নিতে চেষ্টা করলাম, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আমি যদি ম্যাজিস্ট্রেট মুনিরের চেয়ারে বসতাম তাহলে কি করতাম। এরপর আমি জনাব মুনির চৌধুরীকে ফোন করলাম এবং আমার পূর্ব ধারণা অনুযায়ীই তার কাছ থেকে যথাযথ সম্ভাষণ এবং আন্তরিকতাপূর্ণ ব্যবহার পেলাম। টেলিফোনের উদ্দেশ্য প্রকাশ করতেই তিনি ফটাফট বলে ফেললেন আলোচ্য ব্যবসায়ী কীভাবে পরিবেশের সর্বনাশ করছেন। কীভাবে আশপাশের দরিদ্র জমির মালিকদের টাকা ও ক্ষমতার জোর দেখিয়ে তাদের জমিতে নির্বিচারে ফ্যাক্টরির বর্জ্য ফেলছেন এবং তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কারণে এযাবৎ মন্ত্রীসহ কতজনকে দিয়ে ফোন করিয়েছেন। আমার যেহেতু মানসিক প্রস্তুতি ছিল সে কারণে তাকে প্রশ্ন করলাম, আপনি কি ফ্যাক্টরিটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিতে চান নাকি শর্ত সাপেক্ষে চালু করতে রাজি আছেন। তিনি আরেক দফা ব্যবসায়ীর স্বেচ্ছাচারিতা এবং আইনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখানোর নানা ফিরিস্তি দিলেন এবং বললেন, সে তো আমাদের কোনো কথাই মানছে না। এই পর্যায়ে আমি তাকে আশ্বস্ত করে বললাম যে, এবার অবশ্যই মানবেন। তবে সবকিছু তো একসঙ্গে সম্ভব হবে না, সময় দিতে হবে। আগামী ৭-৮ দিনের মধ্যে করা সম্ভব এমন একটি শর্তের কথা বলুন যা বাস্তবায়িত হলে আপনি ব্যবসায়ীর সদিচ্ছা সম্পর্কে বিশ্বাস স্থাপন করবেন এবং গ্যাসলাইন চালু করে দেবেন। তিনি একটি ড্রেন তৈরির শর্ত দিলেন। ব্যবসায়ী রাজি হয়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ড্রেন নির্মাণ করে দিলেন এবং জনাব মুনির চৌধুরীও যথারীতি তার কথা রাখলেন।
উপরোক্ত ঘটনার পর আমার সঙ্গে আর কোনো দিন মুনির চৌধুরীর কথা বা দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি। গত কয়েক দিন আগে পত্রিকায় যখন দেখলাম তিনি সরকার কর্তৃক সম্মানিত হয়েছেন এবং কাজের স্বীকৃতি পেয়েছেন তখন মনে হলো শিরোনাম প্রসঙ্গে কিছু লেখা উচিত। কারণ বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমরা যদি ভালো কাজের প্রশংসা করতে না পারি এবং ভালো মানুষের প্রতি যথাসময়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে না পারি তাহলে এই জমিনে ভালো মানুষ পয়দা হবে না। অন্যদিকে ঘুষখোর, অলস, অকর্মা এবং দুর্জন প্রকৃতির লোকদের যদি সমাজ ঘৃণাসহকারে প্রত্যাখ্যান এবং প্রতিরোধ না করে তবে ওদের বংশ বৃদ্ধি হবে মশা-মাছি প্রভৃতি নিকৃষ্ট পতঙ্গের চেয়েও বেশি সংখ্যায়।
আমাকে যদি আপনি প্রশ্ন করেন, কেন কিছু লোক শত প্রতিকূলতা, অভাব এবং অভিযোগের মধ্যে থেকেও দেশ ও সমাজ-সংসারের জন্য কাজ করে যেতে পারে? আমার ধারণা, মানুষ তার অন্তর্নিহিত সাহস, শক্তি, সততা, দক্ষতা, কৌশল, দেশের প্রতি ভালোবাসা এবং স্রষ্টার প্রতি অসীম নির্ভরতার কারণে প্রবহমান স্রোতের বিরুদ্ধে গিয়ে ভালো ভালো কাজ করতে পারে। কিছু মানুষ ঘুষ, দুর্নীতি, ব্যক্তিগত স্বার্থ কিংবা ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কোনো প্রভাব প্রতিপত্তি ছাড়াই ভালো কাজ করে। এটাই সর্বোত্তম পš’া। দ্বিতীয় পš’া হলো নিজের জীবনের অতীত অভিজ্ঞতা অথবা আত্মীয়স্বজনের প্রভাব অথবা কারও দ্বারা অত্যাচারিত বা অপমানিত হওয়ার কারণে কারও কারও জিদ চেপে যায় দৃষ্টান্তমূলক ভালো কাজ করার জন্য। অনেকে আবার সার্বিক পরিস্থিতি অনুকূলে পেয়ে অথবা পরিস্থিতির চাপে পড়ে ভালো ভালো কাজ করে ফেলেন। তৃতীয় পš’ায় কিছু মানুষ ভালো কাজ করেন মূলত দুটি কারণে। প্রথমটি হলো নিজের ব্যক্তিগত সুনাম, সমৃদ্ধি, প্রচার, প্রপাগান্ডা এবং লাভের চিন্তা। মানুষ যখন মনে করে, মন্দ কাজ করার চেয়ে ভালো কাজ করলে তার লাভ বেশি হবে এবং বোনাস হিসেবে সুনাম-সমৃদ্ধি, পদ-পদবি পাওয়ার সুযোগ হবে তখন সে দুর্বার গতিতে ছুটতে আরম্ভ করে। দ্বিতীয়টি হলো— কিছু লোক ঘুষ খেয়ে ভালো কাজ করে। নিজের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা এবং মন্দ লোকদের শাস্তি দেওয়ার মধ্যে এক ধরনের তৃপ্তি লাভের আকাক্সক্ষা থেকেও মানুষ ভালো কাজ করে থাকে।
আমি মনে করি, ভালো কাজ যেভাবেই হোক না কেন তা সর্বাবস্থায় প্রশংসার দাবি রাখে। কারণ ভালো কাজ যারা করেন তারা প্রথমত বুদ্ধিমান এবং পরিশ্রমী, তারা মানুষ হিসেবেও উত্তম এবং যে কোনো দেশ, জাতি এবং সমাজের জন্য মূল্যবান সম্পত্তি। তাদের সংখ্যা সব সময়ই কম থাকে। তাদের মনমানসিকতা সর্বদা স্পর্শকাতর হয়ে থাকে। তারা লাজুক এবং অভিমানী। অন্যের দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হলে তারা প্রায়ই নিজেদের ওপর জুলুম করে নিজেই নিজেকে শেষ করে দেয়। তারা বঞ্চিত হলে অভিযোগ করে না, অত্যাচারিত হলে নালিশ করে না এবং বিপদে পড়লে কোনো প্রভাবশালীর দরজায় না গিয়ে দুর্ভোগকে মাথা পেতে নেওয়ার জন্য চুপ করে বসে থাকে। এ কারণে সভ্য দেশের সভ্য সমাজ সব সময় তাদের ভালো মানুষদের বেড়ে ওঠা এবং সংরক্ষণ ও শ্রীবৃদ্ধির জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে। পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনায়ক, সমরনায়ক কিংবা সম্রাট ও শাহেনশাহবৃন্দ সফল হয়েছিলেন ভালো মানুষদের সঙ্গে চলাফেরা, তাদের পরামর্শ গ্রহণ, তাদের সম্মান জানানো এবং ভালো মানুষের জন্য অভয়ারণ্য তৈরি করার কৃতিত্বের কারণে।
এবার শিরোনামের দ্বিতীয় অংশ সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করে আজকের প্রসঙ্গের ইতি টানব। অন্যরা কেন ভালো কাজ করেন না অথবা কেন তারা মন্দ কাজ করেন? আসলে মন্দ কাজ করার জন্য বাহানার অভাব হয় না, মানুষের লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ, ভয়-ভীতি, অলসতা এবং ভোগের ইচ্ছে যখন ন্যায়নীতি, শিক্ষা-দীক্ষা, ধর্ম-কর্ম, পিতা-মাতা এবং সন্তান-সন্ততি-পরিজনের ওপর প্রাধান্য পায় তখনই মানুষ মন্দ পথে পা বাড়ায়। কেউ কেউ মন্দ কাজ করেন তার ভেতরকার অন্তর্নিহিত অপরাধ প্রবণতার জন্য। অনেকের পরিবার, সমাজ এবং কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ তাকে অন্যায়-অনিয়ম ও দুর্নীতি করার জন্য বাধ্য করে থাকে। কেউ কেউ আবার ব্যক্তিগত স্বার্থ ছাড়াই কেবল অন্যের ক্রীড়নক বা হুকুমের দাস হিসেবে মালিকের ইচ্ছায় দুর্নীতি করে থাকেন।
দুর্নীতিবাজরা সব সময় হূদয়হীন, পাষাণ এবং নিষ্ঠুর প্রকৃতির হয়ে থাকে; তাদের শরীর, মন, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এবং পঞ্চইন্দ্রিয় যেন অপরাধের বিরাট এক কারখানা। সেখানে নতুন নতুন অপরাধ সংগঠনের জন্য রীতিমতো গবেষণা এবং পূজা-অর্চনা হয়ে থাকে। তারা কাউকে ভালোবাসেন না, এমনকি নিজেকেও নয়। তারা এতটাই ভয়ঙ্কর যে, তাদের নিষ্ঠুরতার প্রথম শিকার হয়ে থাকেন তাদের আপন পিতা-মাতা, ভাইবোন এবং স্ত্রী-পুত্র-কন্যা। এরপর তারা নিজের ওপর জুলুম শুরু করেন অতিরিক্ত ভোগ, দখল, পানাহার এবং নৃত্য-সংগীত-ফুর্তি দ্বারা। অনেকে আবার সীমাহীন কৃপণতা, অবিশ্বাস, সন্দেহ এবং অহেতুক ভয় দ্বারা নিজের সর্বনাশ ঘটিয়ে ফেলেন। মন্দ কাজ, বদরাগ, অশ্লীলতা, পাগলাটে ভাব এবং চরিত্রহীনতার বাহারি অলঙ্কারে সজ্জিত হয়ে মন্দ লোকেরা পরিবার, সমাজ, সংসার এবং রাষ্ট্রকে জ্বালাতে থাকেন অমৃত্যু।
সবচেয়ে আজব করা তথ্য হলো, ভালো মানুষ জীবনের যে কোনো সময়ে মন্দ হয়ে যেতে পারেন। অন্যদিকে দীর্ঘদিন দুর্নীতি, অপরাধ এবং অন্যায় করার পর কেউ আর ভালো হতে পারেন না। এ কারণেই ভালোদের সংরক্ষণ এবং পরিচর্যা অত্যাবশ্যক। যা সমাজ, রাষ্ট্র সবারই কর্তব্য হওয়া উচিত।
লেখক : কলামিস্ট।

Posted in নির্বাচিত কলাম | Comments Off on তারা পারেন, অথচ অন্যরা করেন না

টাইগারদের নিয়ে ষড়যন্ত্রে মেতেছে বিশেষ মহল!

রামিন তালুকদার: এই মুহূর্তে কথা ছিল মাঠে অস্ট্রেলিয়ানদের অনুশীলন দেখার। ফটোগ্রাফারদের মুহুর্মুহু ক্লিকের শব্দে মুখরিত হতো মিরপুরের আকাশ। একজন ক্রীড়া প্রতিবেদক হিসেবে মাঠের কোণে অবস্থান নিতাম অস্ট্রেলিয়ান কোন খেলোয়াড়ের একটু কথা বা মাঠের খেলার তথ্য সংগ্রহ করার জন্য। কিন্তু হঠাৎই পরিবেশ বদলে গেল। অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশে আসছে বলে ঈদের ছুটি ভালোভাবে না কাটিয়ে যান্ত্রিক নগরী ঢাকায় প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে শুনতে হয়, আসছে না অস্ট্রেলিয়া। তাও কিনা পর্যাপ্ত নিরাপত্তার অজুহাতে?Ramin-Writter20150930151720

শুনে তখন এক গাল হেসেছিলাম। বাংলাদেশকে বাঘের মতই ভয় পেলো বুঝি অসিরা! এখন নিরাপত্তার অজুহাতে পাড় পেতে চায়। উপমহাদেশের দুই পরাশক্তি পাকিস্তান ও ভারত যেখানে বাংলাদেশে এসে নাকানি চুবানি খেয়ে গেল তাতে ভয় পাওয়াটাই স্বাভাবিক। তার উপর দক্ষিণ আফ্রিকাকেও নাস্তানুবাদ করেছে টাইগাররা। আর তাই অ্যাসেজ হেরে অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের হারিয়ে বাংলাদেশে আসতে হলে বুকের পাটা বড় হওয়াই চাই। তার উপর আবার অসি দলের সেরা তারাকারা মড়কের মত ইনজুরিতে পড়ছে।

কিন্তু এই ভবনাটা মিলিয়ে গেল ইতালিয়ান নাগরিক তাবেলা সিজারকে হত্যা করার পর। আর তাও ঘটলো যখন অস্ট্রেলিয়া তাদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। যখন শন ক্যাননের নেতৃত্বে অস্ট্রেলিয়ান নিরাপত্তা প্রতিনিধি দল ঢাকায় অবস্থান করছে। এটা কিসের আভাস? এটা কোন ষড়যন্ত্র নয়তো?

অস্ট্রেলিয়ান নিরাপত্তা প্রতিনিধি দলকে ‘ভিভিআইপি’ নিরাপত্তা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। চার স্তরের নিরাপত্তা প্রদানের আশ্বাসের পরেও মন গলছে না ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনও জানিয়েছেন, এতকিছুর পরেও তাদের মন যদি না গলে তাহলে ধরে নেবো অন্য কোন কারণ আছে। সম্ভাব্য কোন আন্তর্জাতিক কূটচাল থাকার ইঙ্গিত দিয়েছেন বিসিবি সভাপতি। বলেছেন, এতো নিরাপত্তা দেওয়ার পরেও যদি অস্ট্রেলিয়া না আসে আমি অন্তত বিশ্বাস করব না যে ওরা নিরাপত্তার কারণেই আসছে না। ধরে নেব অন্য কোনো কারণ আছে।

অন্য কি কারন হতে পারে? বাংলাদেশ ক্রিকেটারদের ভয় অথবা আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। বাংলাদেশ যত ভালোই খেলুক টাইগারদের ভয় পাওয়া অস্বাভাবিকই পেশাদার অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটারদের জন্য। সরাসরি না বললেও বিসিবি সভাপতি আন্তর্জাতিক যে কূটচালের ইঙ্গিত দিয়েছেন তা কোন ভাবেই উড়িয়ে দেয়া যায় না। আর তা হলে বাংলাদেশের জন্য তা বিরাট অশনি সংকেত।

ক্রিকেট বাংলাদেশিদের কাছে কতটা পবিত্র কতটা আবেগের তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। টেস্ট ক্রিকেটে ঢোকার পর থেকে ধুঁকতে থাকা বাংলাদেশকে নীবিরভাবে সমর্থন জুগিয়ে এসেছেন দেশের হাজারো ক্রিকেটভক্তরা। একের পর পর লজ্জাজনক হারের পরও মুখ ফেরাননি তারা। একটা আশা নিয়েই মাঠে আসতেন একদিন এই টাইগাররাই ক্রিকেট বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। দাপটের সঙ্গে সব প্রতিপক্ষকে উড়িয়ে দিবে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার সমর্থকরা সেই নীবির ভালবাসার প্রতিদান পাচ্ছিলেন।

টানা তিনটি ওয়ানডে সিরিজ দাপটের সঙ্গেই জিতে নেয়। পাকিস্তান, ভারত এবং দক্ষিণ আফ্রিকার মত দল গুলোর বিপক্ষে জয় তুলে বুঝিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ আগামী দিনে ক্রিকেট পরাশক্তি হতে যাচ্ছে। এর আগে জিম্বাবুয়েকে সব সংস্করণে ধবলধোলাই করে টাইগাররা জানিয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ হিসেবে এখন অস্ট্রেলিয়া-আফ্রিকাকেই মানায়। শুধু দেশের মাটিতেই নয়, ২০১৫ বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের মাঠে দাপটের সঙ্গেই লড়াই করেছে টাইগাররা। ইংল্যান্ডকে হারানোর পাশাপাশি স্বাগতিক নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সমান তালে লড়েছে মাশরাফিরা। ভারতের বিপক্ষের আম্পায়ারদের একাধিক ভুল সিদ্ধান্তের শিকার হয়ে স্বপ্ন ভঙ্গ না হলে হয়তো আরও লম্বা হতে পারতো টাইগারদের বিশ্বকাপ মিশন।

সারা বিশ্বই যখন এক বাক্যে স্বীকার করে নিয়েছে বাংলাদেশ আর আগের বাংলাদেশ নেই। এরা আগামীদিনের পরাশক্তি তখনই এক অশুভ ছায়া গ্রাস করতে চাইছে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে। বাংলাদেশ ক্রিকেটকে থামাতে নতুন চালে নেমেছে বিশেষ এক কুচক্রী মহল। এর আগেও বাংলাদেশের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে সুযোগ পাওয়ায় ঈর্ষান্বিত হয়ে নানা নাটক করেছে কিছু মহল। সে যাত্রা বাংলাদেশ পাড় করলেও এবার পড়েছে আরও বড় সংকটে। দেশ থেকে ক্রিকেটকে বিদায় করার স্বার্থে নেমেছে তারা। পার্শ্ববর্তী দেশ পাকিস্তানকে দেখলেই বুঝা যায় একটি দেশে ক্রিকেট না থাকলে তার কি অবস্থা হয়। অসহায়ের মত ডেকে ডেকেও তাদের দেশে যেতে রাজি করাতে পারছে না কোনো দেশকে। বাংলাদেশের ক্রিকেটকে অনেকটা এক ঘরে হয়ে পড়া পাকিস্তানের ক্রিকেটের মত করতে চাচ্ছে ষড়যন্ত্রকারীরা।

অথচ বাংলাদেশ এর আগে ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মত বড় আসর সাফল্যের সাথে আয়োজন করেছে। পাশাপাশি এশিয়া কাপের আয়োজন করেও প্রশংসিত হয়েছে তারা। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা তো দূরের কথা ন্যূনতম অভিযোগও আসেনি। কিন্তু হঠাৎ করেই শুরু হয়ে গেল জঙ্গি তৎপরতা, ইতালিয়ান নাগরিক হত্যা। যদিও দেশে এখন জঙ্গি তৎপরতা নেই বলে জানিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। আর তা হলে সিজার হত্যার পিছনে লুকিয়ে রয়েছে কোন বড় হাত। পাকিস্তানের মত জঙ্গি ইস্যুকে পুঁজি করে ষড়যন্ত্রকারীরা চাইছে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে চিরতরে নিভিয়ে দিতে।

ভিত্তিহীন এই অভিযোগ থেকে যদি দ্রুত বেরিয়ে না আসতে পারে বাংলাদেশ তাহলে আগামী দিনে এ দেশের ক্রিকেটের জন্য আরো বড় দুর্যোগ অপেক্ষা করছে। কারন জঙ্গি ইস্যু ভাইরাসের মতই ছড়ায়। ক্রিকেট ছাড়িয়ে ইতোমধ্যেই অস্ট্রেলিয়ান ফুটবলে চলে গেছে এই ভাইরাস। খুব শীগগিরই হয়তো অন্য কোনো দেশ থেকে একই অভিযোগ তোলা হবে। বাংলাদেশ সফর নিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে সতর্ক করার পাশাপাশি বাংলাদেশে তাদের নাগরিকদেরও সতর্ক করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। তাই এই এক রকম অসহায় হয়ে পড়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট কারণ ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসির হাতে নেই, রয়েছে কথিত তিন মোড়লের হাতে বন্দি। বাংলাদেশে যখন অস্ট্রেলিয়া দল আসবে ঠিক তখনই বাংলাদেশের মেয়েরা সফর করতে দেশ ছাড়ে বিশ্ব ক্রিকেট থেকে এক প্রকার নির্বাসিত পাকিস্তানে। মোড়লদের কেউ কেউ বাংলাদেশের এই সফরকে ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। তাই মেয়েদের দল পাকিস্তানে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশে না আশাকে ভাবিয়ে তুলেছে বাংলাদেশের হাজারো সমর্থকদের। সামাজিক মাধ্যমগুলোতে এই নিয়ে চলছে নানা জল্পনা কল্পনা।

Posted in নির্বাচিত কলাম | Comments Off on টাইগারদের নিয়ে ষড়যন্ত্রে মেতেছে বিশেষ মহল!

ঈদের নামাজ নিষিদ্ধ!

1386148454আইসিসের কাণ্ড। তারা ঈদের নামাজ নিষিদ্ধ করেছে ইরাকের মসুলে। বলেছে, ‘ঈদের নামাজের সঙ্গে ইসলামের কোনও সম্পর্ক নেই। উপবাসের পর খাওয়া-দাওয়ার আর দল বেঁধে প্রার্থনার উৎসব এক কাফেররাই করতো। পুরোনো কালের মুসলিমরা ঈদের নামাজ পড়তো না।’ মসুলের কারও অধিকার নেই ঈদের নামাজ পড়ার। কেউ যদি নামাজ পড়তে যায়, তাদের নাকি মেরে ফেলা হবে। এই ইরাকে বসে-বসে কী কাণ্ডই না করেছে আইসিসের সশস্ত্র লোকগুলো! বুলডোজার দিয়ে, ডিনামাইট দিয়ে, কুড়োল দিয়ে, শাবল দিয়ে ভেঙেছে মুসলমানের মাজারগুলো, শিয়াদের মসজিদগুলো, হাজার বছরের পুরোনো শিল্পকর্ম, মিউজিয়াম।

আইসিস কি একসময় নামাজ জিনিসটাকেই নিষিদ্ধ করবে? কারণ নামাজটা তো ইসলাম আসার আগে বিধর্মীরা পড়তো! ইহুদিদের আর কপ্টিক ক্রিশ্চানদের প্রার্থনা রুকু সেজদাসহ নামাজের মতোই। আইসিস তো মাজার, এমনকি কাবা শরিফ, রওজা শরিফ সব ভেঙে ফেলার কথাও বলছে। এগুলোও নাকি একধরণের মূর্তি পুজো। অনেকে মনে করে, ১৪০০ বছর আগের খাঁটি ইসলাম ধর্মকেই আইসিস অবিকৃত অবস্থায় পালন করছে। আইসিস সেনারা, অনেককে বলতে শুনেছি, পয়গম্বরের যোগ্য উত্তরসুরি।

আইসিস তৈরি হওয়া সহজ, আইসিসের বিপরীত আদর্শে মানুষকে দিক্ষিত করা সহজ নয়। আইসিসের আদর্শে খুন ধর্ষণ লুটতরাজ আর ভায়োলেন্স। আইসিসের বিপরীত আদর্শে আছে শান্তি। শান্তি প্রতিষ্ঠা করা কোনওকালেই কোনও গোষ্ঠীতেই সহজ ছিল না, সহজ নয়।

1433362117বিধর্মীদের সংস্কৃতি যদি আইসিস ইসলাম থেকে বাদ দিতে শুরু করে, তাহলে শেষ অবধি কী থাকবে অবশিষ্ট ইসলামে? আইসিস তো এও বলতে পারে, এখন থেকে শুয়োর খাওয়া হালাল, কারণ আরবদেশে শুয়োর খাওয়া হারাম ছিল বিধর্মীদের মধ্যে। এখন থেকে খৎনা করা হারাম, কারণ বিধর্মীরা অর্থাৎ ইহুদিরা খৎনা করতো। কাফেরদের, বিধর্মীদের, অমুসলিমদের, অবিশ্বাসীদের গল্প আদম হাওয়ার গল্প। ইসলাম শুরু হওয়ার হাজার বছর আগেই এই গল্প লেখা হয়েছে। তাহলে এই গল্পটিকেও আনৈসলামিক বলে বাদ দেওয়া যায়? এভাবে নুহ নবীর গল্প, আবিল কাবিলের গল্প, এবং আরও অনেক গল্পকে ইসলামের গল্প নয় বলে সরিয়ে রাখতে হয়। ওসব গল্প ইসলামের অনেক আগের, তাহলে ওসবও ডিলিট করে দিতে হয়। বাহাত্তর জন হুরি এবং হাতে গোনা কিছু গল্প ছাড়া সবই তো প্রায় হয় পেগানদের, নয় ইহুদি নাছারাদের গল্প। ইসলাম শুধু অন্য সংস্কৃতি থেকে নয়, ধর্মও গ্রহণ করেছে অন্য ধর্ম থেকে। সব ধারগুলো আজ ফেরত দিলে কি ইসলাম আর ইসলাম থাকবে? আইসিস যদি এভাবে চলতে থাকে যেভাবে চলছে, তাহলে খুব শীঘ্র ইসলাম বলে সম্ভবত কিছুরই আর অস্তিত্ব থাকবে না।

একবিংশ শতাব্দীতে সপ্তম শতাব্দীর সংস্কৃতি আনতে চাওয়া কি বুদ্ধির কথা! মানুষ পেছনে যাবে নাকি সামনে এগোবে! বাংলাদেশ অর্থনীতিতে এগোচ্ছে হয়তো সামনে, কিন্তু সংস্কৃতিতে পেছোচ্ছে। আরবের ধর্মীয় সংস্কৃতি গ্রাস করে নিচ্ছে বাংলার বাঙালি সংস্কৃতি। মানুষ আর কতটা পেছোবে! পিছু হঠতে হঠতে দেয়ালে ঢুকে গেছে পিঠ। যখন নারীর স্বাধীনতা পাওয়ার কথা, মানবাধিকার লঙ্ঘন না হওয়ার কথা, দারিদ্র ঘুচে যাওয়ার কথা, যখন সবারই বিজ্ঞান শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার কথা, যখন মানুষের আরও মানবিক হওয়ার কথা, আলোকিত হওয়ার কথা, তখন লোক ধর্ম ধর্ম করে মাতম করছে, ফিরতে চাইছে অন্ধকার যুগে। আইসিস ছাড়াও অন্ধকারের উপাসনা করার লোক আরও আছে।

taslimaতসলিমাভাবছি মসুলের মানুষের কথা। ঈদের নামাজ পড়তে গেলে তাদের আজ খুন হয়ে যেতে হবে। ধর্মকর্ম করার অধিকারও মানবাধিকারের অংশ। আমি নিজে ধর্মে বিশ্বাস করি না, কিন্তু মানুষের ধর্মে বিশ্বাস করার অধিকারের জন্য আমি লড়ি। মসুলের মানুষ যদি ঈদের নামাজ পড়তে চায়, তবে সেই অধিকার তাদের থাকা উচিত। একই রকম কারও কারও যদি ধর্মে বিশ্বাস না করতে ইচ্ছে হয়, ধর্মের সমালোচনা করতে ইচ্ছে হয়, সেই অধিকারও তাদের থাকা উচিত। কিন্তু জোর করে ধর্মকর্ম করতে বাধা দেওয়া আর ধর্মের সমালোচনা করতে বাধা দেওয়া—দুটোরই বিরুদ্ধে আমি। স্বাধীনতায় বিশ্বাস করলে বাক স্বাধীনতা আর ধর্ম বিশ্বাসের স্বাধীনতা দুটোতেই বিশ্বাস করতে হয়। স্বাধীনতায় আমি গভীরভাবে এবং বড় অকপটভাবে বিশ্বাস করি। স্বাধীনতাহীন জীবন বড় দুঃসহ।

মাঝে মাঝে ভাবি পৃথিবীর এত সহস্র কোটি মুসলিম আইসিসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা কেন করে না? কেন অনেকে সব জেনেশুনে আইসিসে যোগ দেয়? আইসিসের আদর্শে তবে কি তারা সত্যিই বিশ্বাস করে নাকি মানুষের মাথা লক্ষ্য করে গুলি করার আর ধারলো ছোরা দিয়ে মানুষের মুণ্ডু কাটার আনন্দ তারা উপভোগ করতে চায়, নাকি অল্প বয়সী মেয়েদের অবাধে ধর্ষণ করার আর অগুনতি যৌন দাসীকে ভোগ করার মজা পেতে চায়? এছাড়া যে আইসিস নামাজ নিষিদ্ধ করে, যে আইসিস মসজিদ গুঁড়ো করে, ইউনুস নবীর কবর ভাঙে, কাবা ভেঙে ফেলার স্বপ্ন দেখে, ইসলামের এতকালের পবিত্র সৌধ যারা উড়িয়ে দিচ্ছে, তাদের প্রতি মুসলিম যুব সমাজের এত কেন আকর্ষণ?

আইসিসকে দমানোর চেষ্টা চলছে। মধ্যপ্রাচ্যের বড় শক্তি সৌদী আরব নিজেকে বাঁচানোর স্বার্থেই আইসিসকে নিশ্চিহ্ন করবে। আবার সৌদি আরবের ভেতরের অনেক খাঁটি ইসলামপন্থীদের টাকায় আইসিস শক্তশালী হতে থাকবে। আর আমরা দূর থেকে দেখতে থাকবো খেলা। নিরীহ মানুষ বলি হতে থাকবে আর আমরা দীর্ঘশ্বাস ফেলতে থাকবো আর অপেক্ষা করতে থাকবো মানুষের শুভবুদ্ধির। শুভবুদ্ধি সবার উদয় হয় না, হবেও না। কিন্তু আমাদের অপেক্ষা ফুরোবে না।

অপেক্ষা ছাড়া নিরীহ মানুষের আছেই বা কী।

tasleemaতবে এই কথা জোর দিয়ে বলতে পারি, এক আইসিস গেলে আরও আইসিস আসবে। আইসিস তাদের নৃশংসতা দেখিয়েছে পৃথিবীকে। এই নৃশংসার চর্চা আরও বহুকাল চলবে, যতদিন না মানুষ ধর্মকে গৌণ করতে পারে আর মানবতাকে মূখ্য করতে পারে। মানবতাকে মূখ্য করার শিক্ষাটা ধর্মশিক্ষার বাইরের শিক্ষা, সভ্যতার, সমতার, সমানাধিকারের শিক্ষা। আইসিস তৈরি হওয়া সহজ, আইসিসের বিপরীত আদর্শে মানুষকে দিক্ষিত করা সহজ নয়। আইসিসের আদর্শে খুন ধর্ষণ লুটতরাজ আর ভায়োলেন্স। আইসিসের বিপরীত আদর্শে আছে শান্তি। শান্তি প্রতিষ্ঠা করা কোনওকালেই কোনও
গোষ্ঠীতেই সহজ ছিল না, সহজ নয়।
এই কঠিন কাজটিই আমাদের করতে হবে।
সূত্র: বাংলা টিভিউন

Posted in নির্বাচিত কলাম | Comments Off on ঈদের নামাজ নিষিদ্ধ!

বেসরকারিভাবে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক নিয়োগ

images (4)বাংলাদেশ হইতে শেষপর্যন্ত বেসরকারিভাবে বৎসরে ৫ লক্ষ শ্রমিক নেওয়ার আশ্বাস দিল মালয়েশিয়া। বাংলাদেশের প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন বর্তমানে মালয়েশিয়া সফরে রহিয়াছেন। ইতোমধ্যে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তাহার দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হইয়াছে। এই বৈঠক সূত্রেই মালয়েশিয়ার এই আগ্রহের কথা জানা গিয়াছে। ইহাতে মালয়েশিয়ার তিনটি অঞ্চলে আগামী তিন বৎসরে প্রায় ১৫ লক্ষ শ্রমিক যাইতে পারিবে। তাহাদের তিন বৎসরের ভিসা দেওয়া হইবে এবং পরবর্তীতে এক বৎসর ভিসা নবায়ন করা যাইবে। এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত হইলে তাহা মালয়েশিয়ায় শ্রমশক্তি রপ্তানির অগ্রগতিতে হইবে এক মাইলফলক। বিদেশ গমনেচ্ছুকদের মধ্যে বর্তমানে যে অস্থিরতা বিরাজ করিতেছে তাহাও বহুলাংশে দূর হইবে। এই বিষয়ে ঈদের পর সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হইবে বলিয়া জানা যায়।
উল্লেখ্য যে, এই ধরনের আশ্বাসের মাধ্যমে আসলে জিটুজি বা গভর্ণমেন্ট টু গভর্ণমেন্ট কর্মী পাঠাইবার উদ্যোগ মাঠে মারা গেল। ২০০৯ সালে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের গুরুত্বপূর্ণ দেশ মালয়েশিয়ায় নানা অভিযোগে বাংলাদেশি কর্মী নেওয়া বন্ধ হইয়া যায়। দীর্ঘ কূটনৈতিক তৎপরতার পর ২০১২ সালের ২৬ নভেম্বর দুই দেশের মধ্যে এই জিটুজি বা সরকারিভাবে কর্মী নেওয়ার চুক্তি করা হয়। ইহার পর মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য বাংলাদেশের ১৪ লক্ষ ৫০ হাজার লোক নিবন্ধন করেন। কিন্তু দুঃখজনক হইলেও সত্য যে, গত তিন বৎসরে মাত্র সাড়ে সাত হাজার কর্মী নেয় দেশটি। অথচ একই সময়ে ছাত্র ও পর্যটক হিসাবে সেখানে গিয়াছেন অন্তত এক লক্ষ লোক। আর বঙ্গোপসাগর দিয়া সাগরপথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন দেড় লক্ষ লোক। সমপ্রতি থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি নাগরিকদের গণকবর আবিষ্কার হইয়াছে এবং এই নিয়া আন্তর্জাতিক মিডিয়ায়ও কম হইচই হয় নাই। প্রকৃতপক্ষে জিটুজি পদ্ধতিতে মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগে ব্যর্থতার কারণেই এই উদভূত ও অমানবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হইয়াছে বলিয়া বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন। ইহার পরই বাংলাদেশ সরকার আবার বেসরকারিভাবে লোক নেওয়ার জন্য তৎপরতা শুরু করে। এই প্রক্রিয়া আসলে বিজনেস টু বিজনেস বা বিটুবি নামে পরিচিত।
সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের পর বাংলাদেশের জনশক্তির সবচাইতে বড় বাজার হইল মালয়েশিয়া। কিন্তু অভিবাসন ব্যয় কমানো ও নানা রকম প্রতারণা বন্ধ করিতেই জিটুজি বা সরকারিভাবে জনশক্তি রপ্তানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তখন হইতেই বেসরকারি উদ্যোক্তা ও এজেন্সিগুলি প্রমাদ গুনিতে থাকে। কেননা ইহাতে তাহাদের চাকুরী ও কর্মসংস্থানের ওপর আঘাত আসে। তাহাদের অস্তিত্বই পড়ে হুমকির মুখে। অন্যদিকে সরকারিভাবে লোক পাঠানোয় কালক্ষেপণ ও পর্যাপ্ত লোক পাঠানো সম্ভব না হওয়ায় সরকারিভাবে নিবন্ধিত অনেক কর্মীও শেষপর্যন্ত হতাশ হইয়া পড়ে। তাহারা অবৈধভাবে ও জীবনের ঝুঁকি নিয়া বিমান ও সমুদ্র পথে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার চেষ্টা চালায়। কিন্তু তাহাদের অনেকের চেষ্টাই শেষপর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় এবং দুঃখজনকভাবে অনেকেই পতিত হয় মৃত্যুমুখে। এখন বেসরকারিভাবে আবার এই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হইলে মালয়েশিয়ায় শ্রমশক্তি রপ্তানি গতিশীল হইবে। সেই আশায় অনেকে নূতন করিয়া স্বপ্ন দেখিতে শুরু করিয়াছেন। তবে আগের অভিযোগগুলি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করিয়া প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারিলে এবং নিয়োগকর্তা বিমানভাড়াসহ অন্যান্য খরচ বহন করিবার ফলে সার্বিক খরচ কমিয়া গেলে বেসরকারি খাতে শ্রমশক্তি রপ্তানিই লাভ ও সুবিধাজনক হইবে। ইহা অস্বীকার করিলে চলিবে না যে, শ্রমশক্তি রপ্তানিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বেসরকারি উদ্যোগই আমাদের প্রধান ভরসা। এক্ষেত্রে তাহাদের অবদান অপরিসীম। কিন্তু কতিপয় অসাধু এজেন্সির জন্য সকলকে শাস্তি প্রদান কাম্য নহে। যাই হউক, বিটুবি বা বেসরকারিভাবে মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের এই চিন্তাভাবনাকে আমরা স্বাগত জানাই।

Posted in নির্বাচিত কলাম | Comments Off on বেসরকারিভাবে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক নিয়োগ

আমরা ওপরে উঠছি, না নিচে নামছি?

898900a287882928a211bac2bd129148-3হাজারো বৈপরীত্য ও স্ববিরোধিতায় আকীর্ণ বাংলাদেশ। একই বাংলাদেশে দুই বিপরীতধর্মী পাচার আমাদের ভয়াবহ অর্থনৈতিক বৈষম্যের কথাই মনে করিয়ে দেয়। এবং এই কাÐটি তখনই ঘটছে, যখন ‘শোষণমুক্ত বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠায় অবিচল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। বিএনপি বা জাতীয় পার্টির আমলে এমনটি হলে আমরা তাদের শোষকশ্রেণির প্রতিভূ ও স্বাধীনতার চেতনাবিরোধী বলে আচ্ছা করে গাল দিতাম। এখন কী বলব?
মাস খানেক আগে সমুদ্রপথে হাজার হাজার বাংলাদেশি নাগরিকের পাচার হওয়ার ঘটনা নিয়ে কেবল দেশের ভেতরে নয়, বহির্বিশ্বেও চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছিল। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে প্রথমে অধিকাংশ পাচার হওয়া মানুষ রোহিঙ্গা বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা চলছিল। পরবর্তী সময়ে সরকার কিছুটা নড়েচড়ে বসলেও পাচার হয়ে যাওয়া সবাইকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। অনেকে ফিরে এসেছেন, অনেকে ফিরে আসার অপেক্ষায় রয়েছেন। অনেকে হারিয়ে গেছেন চিরতরে।
মালয়েশিয়া থেকে সদ্য ফিরে আসা সিরাজগঞ্জের আল আমিন সরকার নামের একজন যে অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন, তা মর্মস্পর্শী। তিনি বলেছেন, ট্রলারে ওঠার পর থেকে থাইল্যান্ডে পৌঁছানো পর্যন্ত দুই মাসে অসুস্থ হওয়ার কারণে সাগরে ফেলে দেওয়া হয় ৭০ জনকে। শুধু পানি খেতে চাওয়ার অপরাধে একজনকে চোখের নিমেষে গলা কেটে সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। মাসে ৩০ হাজার টাকা বেতনের লোভ দেখিয়ে তাঁকে স্থানীয় দুই দালাল নিয়ে গিয়েছিল। টেকনাফ থেকে ৪৭০ জনকে নিয়ে ট্রলার যাত্রা শুরু করলেও কতজন ফিরেছেন, জানা যায়নি।
এই যে দালালদের খপ্পরে পড়ে হাজার হাজার তরুণ বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন; তাঁরা কি জানেন না সেখানে জীবন কতটা অনিশ্চিত ও যন্ত্রণাকাতর? জানেন। কিন্তু তাঁরা নিরুপায়। বিদেশে গিয়ে তাঁরা অমানুষিক পরিশ্রমের পাশাপাশি প্রতিনিয়ত অপমান ও লাঞ্ছনা সহ্য করেন। তারপরও তাঁরা দুর্গম মরু কিংবা তরঙ্গসংকুল সমুদ্রপথে পাড়ি জমান। দেশে কর্মসংস্থান নেই। সামাজিক ব্যবসায় নাম লেখাবেন, সেই পুঁজি বা শিক্ষাও নেই।
ইদানীং বাংলাদেশে আরেক ধরনের পাচার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। অর্থ বা সম্পদ পাচার। ইংরেজিতে বলে ক্যাপিটাল ফ্লাইট। মানুষ এক দেশ থেকে আরেক দেশে পাচার হয় কাজ না পেয়ে, জীবন ধারণের সংস্থান করতে না পেরে। আর অর্থ পাচার হয় আরও উন্নত, আরও নিশ্চিত, আরও সুখী জীবনের আশায়। সেটি তাঁরাই পারেন, যাঁরা বৈধ-অবৈধ পথে কোটি কোটি টাকার সম্পদ অর্জন করেছেন। কিন্তু সেই সম্পদ কেন তাঁরা দেশে না রেখে বিদেশে রাখছেন? দেশে বিনিয়োগ না করে বিদেশে বিনিয়োগ করছেন? একজন ব্যাংকার কাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ শিক্ষককে প্রশ্নটি করেছিলাম। জবাবে তিনি বললেন, পুঁজির পাচার বিশ্বব্যাপী প্রবণতা হলেও সেই সব দেশে গিয়ে তা পুঞ্জীভূত হয়, যেসব দেশে রাজনৈতিক স্থিতি আছে, সামাজিক সহনশীলতা আছে, যেসব দেশে আইনের শাসন সবার জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। আইন যেখানে আওয়ামী লগি-বিএনপি বিচার করে না। এক সম্প্রদায় আরেক সম্প্রদায়ের ওপর চড়াও হয় না। সেই সব দেশে রাজনৈতিক কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যের বারোটা বাজানো হয় না। আর সেই সব দেশ থেকেই পুঁজি পাচার হয়, যেখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা লেগে থাকে, যেখানে বিনিয়োগ করতে নানা রকম আইনি বাধার পাশাপাশি ঘুষ-দুর্নীতি-মাস্তানি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সেই সব দেশ থেকে অধিক পুঁজি পাচার হয়, যেখানে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ভঙ্গুর। এর সব কটি উপসর্গই বাংলাদেশে বিদ্যমান। তদুপরি আছে অবকাঠামোগত সমস্যা, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জমির সমস্যা। আছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা।
পৃথিবীর দুই শ্রেণির মানুষের প্রকৃত অর্থে কোনো দেশ নেই। প্রথম শ্রেণি হলো অতি ধনবান; তাঁদের জন্য সব দেশের দরজা খোলা। নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করলে একজন ব্যবসায়ী বা বিনিয়োগকারী চাইলে পৃথিবীর যেকোনো দেশের পারমানেন্ট রেসিডেন্ট বা নাগরিক হতে পারবেন। হচ্ছেনও অনেকে।
রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পরস্পরবিরোধী অবস্থানে। দুই দলের শীর্ষ নেত্রীর মধ্যে কথাবার্তাও হয় না (১৯১৩ সালের অক্টোবরে তাঁদের মধ্যকার শেষ টেলিফোন সংলাপটির কথা স্মরণ করুন)। কিন্তু বিদেশে বিনিয়োগ কিংবা অর্থ পাচারে দুই দলের মধ্যে অদ্ভুত মিল রয়েছে। ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার-এ প্রকাশিত তিন পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী নেতা কানাডায় বাড়ি (ম্যানশন) কিনেছেন। আরেক নেতা, যিনি বর্তমানে সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রী, লন্ডন ও মালয়েশিয়ায় বিনিয়োগ করেছেন। আওয়ামী লীগের আরও অনেকে তো বিদেশে বিনিয়োগ করছেন।ৃ বিএনপি সরকারের একজন সাবেক মন্ত্রী সিঙ্গাপুরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। তাঁর ছেলে শ্রীলঙ্কায় বেসরকারি বন্দর নির্মাণেও বিনিয়োগ করেছেন। বিএনপি আমলের আরেক মন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রে মোটা অঙ্কের বিনিয়োগ করেছেন। (ডেইলি স্টার, ২২ জুন ২০১৫)। আর এই যে বিদেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ হচ্ছে, তার সব হিসাব বাংলাদেশ ব্যাংকে নেই। কেননা, বেশির ভাগ অর্থই যাচ্ছে অবৈধ উপায়ে, হুন্ডির মাধ্যমে।
সরকারের নীতিনির্ধারকেরা বিদেশিদের প্রতি বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানাবেন, আর সরকারের ও দলের কেউ কেউ বিদেশে বিনিয়োগ করবেন, বাড়ি কিনবেন—এটি আত্মপ্রতারণা ছাড়া কিছু নয়। বিদেশে অর্থ পাচার ও বিনিয়োগকারীর তালিকায় আরও আছেন ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা। আছেন সাবেক আমলারা।
আমাদের অর্থনৈতিক নীতির লক্ষ্যই হলো কতিপয়ের হাতে পুঁজি ও সম্পদ পুঞ্জীভূত করা। লাখ লাখ মানুষকে ন্যূনতম মৌলিক অধিকার তথা খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার অধিকার থেকে বঞ্চিত রেখে ধনীকে আরও ধনী করার সুযোগ দেওয়া। ধনবানদের দল বিএনপি-জাতীয় পার্টি তো এই নীতি নেবেই। কিন্তু ‘গরিবের দল’ আওয়ামী লীগও ব্যতিক্রম কিছু করেনি। সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া যেসব কল্যাণমুখী কর্মসূচি নিয়েছিলেন, গরিব মানুষের জন্য নিরাপত্তার জাল তৈরি করেছিলেন, তা এখন দলীয় নেতা-কর্মীদের আখের গোছানো কিংবা বাড়তি আয়ের উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। মনে হচ্ছে, ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশটির ওপর গরিষ্ঠসংখ্যক দরিদ্র মানুষের কোনো হক নেই।
সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে সুইজারল্যান্ডে ৪ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা পাচার হয়ে গেছে; ২০১৩ সালে যার পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ১৪৯ কোটি টাকা, ২০১২ সালে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৯৯১ কোটি টাকা।
গেøাবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি জানাচ্ছে, ২০০৩ থেকে ২০১২ সাল—এই ১০ বছর বাংলাদেশ থেকে মোট পাচার হয়েছে ১ লাখ ২ হাজার ৬৪৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে সর্বোচ্চ পাচার হয়েছে ২০০৬ সালে ২০ হাজার ৮০২ কোটি টাকা, এরপর ২০০৭ সালে ১৯ হাজার কোটি টাকা, ২০১০ সালে পাচারের পরিমাণ কমে ৫ হাজার ২২৫ কোটি টাকা হলেও ২০১২ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ হাজার ৮৮৪ কোটি টাকা। গত বছর সুইস ব্যাংকে অর্থ পাচারের পরিমাণ যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে অন্যান্য দেশেও। এই ধারা চলতে থাকলে অর্থ পাচারেও আওয়ামী লীগ বিএপির আমলকে ছাড়িয়ে যাবে।
গেøাবাল ফিন্যান্স ইন্টেগ্রিটি যে পরিসংখ্যান দিচ্ছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, যখন দেশে মোটামুটি রাজনৈতিক স্থিতি থাকে, তখন বিদেশে অর্থ পাচার কমে যায়। আবার যখন অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা দেখা দেয়, তখন পাচার হয়ে যাওয়া অর্থের পরিমাণ বাড়ে। একই সঙ্গে কমে যায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগও।
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলনবিষয়ক আঙ্কটাডের বিশ্ব বিনিয়োগ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৫ সালে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ৫ শতাংশ। আগের বছর ছিল ১৬০ কোটি, চলতি বছর ১৫৩ কোটি ডলার। প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী বলেছেন, আঙ্কটাডের এ তথ্য ঠিক নয়। তাঁর দাবি, বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ২০০ কোটি ডলার। তাঁর কথা যদি সত্যও ধরে নিই, ১৬ কোটি মানুষের কিংবা বছরে ৩ লাখ কোটি টাকা বাজেটের দেশে ২০০ কোটি ডলার বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে কি আত্মপ্রসাদ লাভের সুযোগ আছে? প্রতিবেশী মিয়ানমারে যদি ৮০০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ হয়ে থাকে, নেপালে ও পাকিস্তানেও যদি বিনিয়োগ বেড়ে থাকে, বাংলাদেশে কমার কারণ কী? নিশ্চয়ই আমাদের নীতি, পরিকল্পনা ও উদ্যোগে ঘটাতি আছে। বর্তমান বিনিয়োগ বোর্ড দায়িত্ব নেওয়ার পর লন্ডন, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে যে লাখ লাখ টাকা খরচ করে রোড শো করল, তাতে কী লাভ হলো? বিনিয়োগ বোর্ডের এই অবিমৃশ্যকারী কর্মকাÐের সমালোচনা কেবল বিরোধী দলই করছে না, ক্ষমতাসীন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফও একহাত নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, প্রতিষ্ঠানটি বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হয়েছে। পেশাদার, দক্ষ, পরিশ্রমী ও দেশপ্রেমিক ব্যক্তিদের নিয়ে বিনিয়োগ বোর্ড ঢেলে সাজাতে হবে।
তাইরে-নাইরে করে যাঁরা সাড়ে ছয় বছর পার করেছেন, তাঁরা কবে ঢেলে সাজাবেন? আর এই অব্যবস্থা ও অদক্ষতা কেবল বিনিয়োগ বোর্ডে নয়, ব্যাংক-বিমাসহ প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে। দুর্নীতি ও অদক্ষতার কারণে অনেক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও কারখানা মুখ থুবড়ে পড়েছে। কেবল প্রবাসী শ্রমিকদের উচ্চ রেমিট্যান্স কিংবা তৈরি পোশাক রপ্তানির নগদ টাকা কোনো দেশের অর্থনীতিকে শক্ত ভিত দিতে পারে না। আমাদের নেতা-নেত্রীরা যতই উন্নয়নের গল্প শোনান না কেন, সত্যিকার উন্নয়ন থেকে আমরা অনেক দূরে আছি।
বিনিয়োগে স্থবিরতা, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের লুটপাট কিংবা দেশের অর্থ ও সম্পদ বিদেশে পাচার হওয়ার ঘটনায় আমাদের মনে এই প্রশ্নটি বড় করে দেখা দেয় যে দেশের অর্থনীতি কি সত্যি সত্যি এগোচ্ছে? আমরা কি ওপরে উঠছি, না নিচে নামছি? বিশ্বায়নের এই যুগে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে যে সক্ষমতা ও সুশাসন প্রয়োজন, তা কি আমরা অর্জন করতে পেরেছি।

Posted in নির্বাচিত কলাম | Comments Off on আমরা ওপরে উঠছি, না নিচে নামছি?

ক্রিকেট ইতিহাসের নতুন মহাকাব্য

আবদুল মান্নান
22রবিবার রাতে ঢাকার মিরপুর শেরেবাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে লেখা হলো ক্রিকেট ইতিহাসের এক নতুন মহাকাব্য, যার রচয়িতা কিনা সুদূর সাতক্ষীরা থেকে উঠে আসা এক ১৯ বছরের তরুণ মুস্তাফিজুর রহমান। মুস্তাফিজের এই অমর কীর্তির কথা ইতিমধ্যে জেনে গেছে উপমহাদেশের সব ক্রিকেটপ্রেমিক আর সারা বিশ্বে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ক্রিকেটপ্রেমী কোটি মানুষ। মুস্তাফিজের এই কাব্য রচনায় সহায়তা করেছেন পদ্মাপারের আর ১০ বাঙালি, মাশরাফি বিন মর্তুজার নেতৃত্বে। সেই রাতে মুস্তাফিজের বিধ্বংসী বোলিংয়ের কাছে সম্পূর্ণ পরাস্ত হয় সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ভারতের ক্রিকেট সুপারস্টার মহেন্দ্র সিং ধোনির নেতৃত্বাধীন টিম ইন্ডিয়া। একটা সময় ছিল, যখন ভারত-পাকিস্তানের ম্যাচ হলেই তা হয়ে উঠত হাই ভোল্টেজ ম্যাচ। এখন তেমনটি আর হয় না; কারণ পাকিস্তানের ক্রিকেটের এখন পড়ন্ত বেলা। জঙ্গি আক্রমণের ভয়ে সেই দেশে এখন আর অন্য কোনো দেশ খেলতে যায় না। বহু বছর পর গত মাসে খেলতে গিয়েছিল জিম্বাবুয়ে। লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে খেলা চলাকালে জঙ্গিরা আক্রমণ করলে বেশ কজন দর্শক ও জঙ্গি হতাহত হয়। জিম্বাবুয়েকে খেলতে হয়, কারণ দেশটির অর্থ প্রয়োজন। ভারতের কথা আলাদা। ভারতে ক্রিকেটকে ঘিরে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা প্রতিনিয়ত হাতবদল হয়। ভারত যখন কোথাও খেলে, তখনই বাজিকরদের রমরমা অবস্থা। তার ওপর এখন যোগ হয়েছে আইপিএল। ক্রিকেট বা কোনো খেলা যে বাজারি পণ্য হতে পারে, তা বিশ্বাস করা যেত না, যদি না আইপিএলের প্রচলন হতো। তার ওপর আছে আইসিসিতে ভারতের দাদাগিরি। এই দাদাগিরিতে সঙ্গে আছে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া। তাদের বিবেচনায় অন্য টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলো এখানে ফালতু। তো সেই প্রতিবেশী দেশ ভারতের ক্রিকেট টিম বাংলাদেশে একটি টেস্ট ও তিনটি এক দিনের ম্যাচ খেলতে এলো। ভারতকে বাংলাদেশে খেলতে আনাটা তেমন একটা সহজ নয়, কারণ বাংলাদেশে এলে তাদের আয়-রোজগার তেমন একটা হয় না। টিভিতে বিজ্ঞাপনদাতারা বিজ্ঞাপন দিতে তেমন একটা উৎসাহ বোধ করে না। ভারতে ক্রিকেট খেলাকে ঘিরে বিজ্ঞাপন ব্যবসাটা মিলিয়ন ডলারের। ভারতের কাছে ক্রিকেট দল হিসেবে বাংলাদেশ গোনা-গুনতির বাইরে। তাদের অনেক ভাষ্যকার আর সিনেমা তারকা বলেন, বাংলাদেশ নিজেদের টাইগার দাবি করলেও বাস্তবে তারা বিড়াল বৈ আর কিছু নয়। সেই বিড়ালরা রবিবার ভারতকে উড়িয়ে দিয়ে সেই পুরনো বাক্যটাকে আরেকবার মনে করিয়ে দিল- প্রতিপক্ষকে কখনো দুর্বল ভাবতে নেই, হোক না সেটি বাংলাদেশ। এর আগে একমাত্র টেস্টটি বৃষ্টির কারণে ভণ্ডুল হয়ে যায়। রবিবারের খেলা টিভিতে দেখতে দেখতে মনে পড়ে ১৯৮৩ সালে ভারত-ওয়েস্ট ইন্ডিজ টেস্টের কথা। সেটি ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের সোনলি যুগ। আজকের প্রজন্মের ক্রিকেটবোদ্ধাদের বোঝানো যাবে না কেমন ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের ম্যালকম মার্শাল, মাইকেল হোল্ডিং বা এন্ডি রবার্টসের ভয়ংকর বোলিং। ব্যাটিংয়ে ছিলেন গর্ডন গ্রিনিজ (পরবর্তীকালে বাংলাদেশের কোচ), ডেসমন্ড হেইন্স, ক্লাইভ লয়েড ও ভিভ রিচার্ডস। ভারতও কম যায় কিস্তে সুনীল গাভাস্কার ও অংশুমান গায়কোয়াড় ওপেনিং করছেন। দলে ছিলেন দিলীপ ভেংসরকার, মহিন্দর অমরনাথ ও রবি শাস্ত্রী। কপিল দেব ও রজার বিনি বোলিংয়ের নিয়মিত সূচনা করেন। মহিন্দ্র সিং, শিবরাম যাদব ও রবি শাস্ত্রী ভালো স্পিন করেন। টিম ওয়েস্ট ইন্ডিজ স্পিন খেলতে অভ্যস্ত নয়। বলের গতি দেড় শ মাইল না হলে তাদের খেলা জমে না। ভারতের উইকেটরক্ষক তখন বিশ্বসেরা সৈয়দ কিরমানি। ব্যাটও করতেন ভালো। কলকাতার ইডেন গার্ডেনে ডিসেম্বরের ১০ তারিখ থেকে পাঁচ দিনের পঞ্চম টেস্ট শুরু হলো। দুনিয়ার সেরা ক্রিকেট স্টেডিয়ামের অন্যতম ইডেন গার্ডেনস। গ্যালারিতে বসে খেলা দেখলে বোঝা যায়, ইডেনে খেলা দেখাটা কত আনন্দের হতে পারে। প্রথম ইনিংসে মার্শাল, রবার্টস আর হোল্ডিংয়ের ইডেন কাঁপানো বোলিংয়ে কোনো রকমে কাতরাতে কাতরাতে ভারত ২৪১ রান করল। ক্রিকেট ইতিহাসের নতুন মহাকাব্য তিন ওয়েস্ট ইন্ডিজ বোলারের তিনটি করে উইকেট। বাকিটা নিয়েছিলেন উইন্সটন ডেভিস। গাভাস্কার খেলেছিলেন এক বল। প্রথম বলে শূন্য রানে যখন ড্রেসিংরুমে ফিরে গেলেন, তখনো ধারাভাষ্যকাররা খেলার ধারাবর্ণনা শুরুই করতে পারেননি। উত্তরে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৩৭৭। ভদ্রলোক ক্রিকেটার বলে সবার কাছে পরিচিত ক্লাইভ লয়েড ১৬১ রান করে নট আউট। এন্ডি রবার্টস শেষে এসে ৬৮ রান। কপিল দেব ৩৫ ওভারে ৪ উইকেট তুলে নিয়ে আবারও জানিয়ে দিয়েছিলেন তিনি কেন বিশ্বসেরাদের কাতারে। ভারতের দ্বিতীয় ইনিংস তো দিলীপ কুমার-নার্গিসের ট্র্যাজেডিনির্ভর সিনেমাকেও হার মানায়। ম্যালকম মার্শাল একাই একজন গ্ল্যাডিয়েটরের মতো ক্রিকেট বলকে তলোয়ার বানিয়ে ১৫ ওভার বল করে ৩৭ রান দিয়ে ৬ উইকেট নিয়ে চতুর্থ দিনের বেশ খানিকটা বাকি থাকতেই দর্শকদের ইডেনের খানিক দূরে মেট্রো সিনেমায় ইভনিং শোর টিকিটের লাইন ধরতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। মাইকেল হোল্ডিং ৯ ওভারে ২৯ রান দিয়ে ৩ উইকেট। বাকিটা এন্ডি রবার্টসের। ৯০ রানে ভারত অল আউট। তখনো সীমিত ওভারের ক্রিকেট খেলা চালু হয়নি। ভারত কোনোমতে ৩০ ওভার খেলতে পেরেছিল। কলকাতা থেকে প্রকাশিত স্পোর্টস ওয়ার্ল্ড পরের সপ্তাহে প্রচ্ছদ কাহিনী করেছিল গধৎংযধষষ ঞযব ঐধহমসধহ শিরোনামে। মার্শালকে একজন নির্দয় জল্লাদের সঙ্গে তুলনা করেছিল স্পোর্টস ওয়ার্ল্ড। না, আমরা ১৯ বছর বয়সী এই বাংলার এক অখ্যাত গ্রাম তেঁতুলিয়া থেকে উঠে আসা তরুণ মুস্তাফিজকে কোনো জল্লাদের সঙ্গে তুলনা করতে চাই না। তবে রবিবার মুস্তাফিজের ভূমিকা ১৯৮৩ সালের কলকাতার ইডেনের মার্শালের ভূমিকার চেয়ে কম কিস্তে এই তো তিন দিন আগে ভারতের সঙ্গেই প্রথম এক দিনের ম্যাচে মুস্তাফিজ একাই তাঁর প্রথম আন্তর্জাতিক ওয়ানডেতে পাঁচ উইকেট নিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। সেই ম্যাচে ভারত হেরেছিল ৭৯ রানে। কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা ওই খেলার প্রতিবেদনে লিখেছিল, ‘মিরপুর শেরেবাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে পদ্মাপারের ১১ জন সবাই এদিন শেরেবাংলা, বাংলার বাঘ। বাঘ এখন শিকার করতে শিখেছে।’ মুস্তাফিজ প্রথম দুটি এক দিনের ম্যাচে মোট ১১ উইকেট নিয়ে এখন বিশ্বরেকর্ডের অধিকারী। এই রেকর্ড থাকবে অনেক দিন মনে হয়।
স্রেফ বাজে আম্পায়ারিং আর ভারতের অখেলোয়াড়োচিত আচরণের কারণে অস্ট্রেলিয়ায় চার মাস আগে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ভারত-বাংলাদেশ খেলার ঘটনাপ্রবাহ ক্রিকেট ইতিহাসে একটি কালো দাগ হয়ে থাকবে বহুদিন। সেই বর্ণনা বহুবার লেখা হয়েছে। আইসিসির নিয়ম ভেঙে সংস্থার প্রেসিডেন্ট মোস্তফা কামালকে ট্রফি প্রদান অনুষ্ঠানে না ডাকা ছিল ক্রিকেট ইতিহাসের আরেকটি ন্যক্কারজনক ঘটনা। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই পত্রিকায় একটি কলাম লিখেছিলাম ‘ক্রিকেট একসময় ভদ্রলোকের খেলা ছিল’ শিরোনামে। কিন্তু যখন থেকে এই ভদ্রলোকের খেলায় করপোরেট অর্থ প্রবেশ করতে শুরু করেছে, তখন থেকে আর খেলাটি ভদ্রলোকের থাকেনি। টিম ইন্ডিয়ার বেলায় তা একটু বেশি সত্য। প্রথম ওয়ানডেতে ভারত অধিনায়ক ধোনি ক্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা লিকলিকে শরীরের মুস্তাফিজকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলে চোট পেয়ে মুস্তাফিজ কিছু সময়ের জন্য সাজঘরে ফিরে গিয়েছিলেন। ম্যাচ রেফারি আর আম্পায়াররা ঘটনার প্রতিবেদনে উল্লেখ করলেন, ঘটনার জন্য দায়ী ধোনি। তাঁকে দণ্ড দিতে হবে। ভারতের টিম ম্যানেজমেন্ট ও ধোনি মানতে নারাজ। বলল, মুস্তাফিজকেও যদি দণ্ডিত করা না হয় তাহলে তারা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইসিসিতে আপিল করবে। আর আইসিসি তো ভারতের আজ্ঞাবহ সংস্থায় পরিণত হয়েছে অনেক আগেই। এসব সংবাদ ভারতের পত্রপত্রিকার। বাংলাদেশ মুস্তাফিজের দণ্ড মেনে নিল। এটি বাঙালির ঔদার্যের পরিচয়। রবিবারের খেলা শেষে বাংলাদেশের দলনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা মুস্তাফিজকে নিয়ে ভারতের ড্রেসিংরুমে গিয়েছিলেন। ধোনির কাছে চাইলেন মুস্তাফিজের জন্য তাঁর একটা ব্যাট। ধোনি ব্যাট দিয়েছেন কি না জানা যায়নি। আসলে মাশরাফি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে গিয়েছিলেন। ক্রিকেট তো আসলেই একটি ভদ্রলোকের খেলা। রবিবারের বড় পাওয়া, বাংলাদেশ এখন ২০১৭ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে খেলার নিশ্চয়তা পেল। রবিবারের ক্রিকেট মহাকাব্য রচনার নেতৃত্বে ছিলেন মাশরাফি বিন মর্তুজা। দুই হাঁটুতে সাতবার অপারেশন। আবার কোনো প্রকারের বড় আঘাত লাগলে পঙ্গু হওয়ার আশঙ্কা। খেলার আগে জানিয়ে দিলেন, ‘আগে তো খেলে নিই, তারপর ওটা নিয়ে ভাবা যাবে।’ বিশ্বকাপের আগে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মাশরাফি জানালেন, একাত্তরে যদি যুদ্ধের ময়দানে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা আহত হয়ে যুদ্ধ করতে পারেন, তাহলে হাঁটুতে আঘাত নিয়ে কেন তিনি খেলতে পারবেন না? বাবা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন যে! সাতক্ষীরা থেকে উঠে আসা মুস্তাফিজ এখনো নাগরিক জীবনের সঙ্গে সম্পূর্ণ পরিচিত হয়ে উঠতে পারেননি, যা তাঁর বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখলেই বোঝা যায়। বাংলা বলেন গ্রামের সাদাসিধে একজন তরুণের মতো। প্রমিত বাংলা ভাষার পুঁজি এখনো তেমন সমৃদ্ধ নয়। খেলা শেষে টিভি ক্যামেরার সামনে শামীম চৌধুরী তাঁকে প্রশ্ন করলেন, ‘সাতক্ষীরার দূর গ্রাম থেকে ঢাকা এসে এমন একটা খেলা উপহার দেওয়ায় তাঁর অনুভূতি কী?’ মুস্তাফিজ একটু সলজ্জ হাসি দিয়ে বললেন, তাঁর সেজ ভাই তাঁকে সাহায্য করেছেন। কজনের এমন বড় ভাই আছে? খেলার রেশ না ফুরাতেই শুরু হয়ে গেছে খেলার বাইরের একটি কথিত ঘটনা নিয়ে তোলপাড়। সুধীর গৌতম ভারত থেকে এসেছেন বাংলাদেশে খেলা দেখতে। কলকাতার এবিপি টিভি চ্যানেলকে নাকি তিনি জানিয়েছেন, খেলা শেষে স্টেডিয়ামের বাইরে বের হলে তাঁকে কারা নাজেহাল করে। পরে জানা গেল, এমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি। বিষয়টা স্রেফ বানোয়াট, না হয় অতিরঞ্জিত। ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে কিছু মানুষ সদা উদ্গ্রীব থাকে। তবে ঘটনা যদি সত্য হয়ে থাকে, তা অত্যন্ত গর্হিত, দুঃখজনক ও নিন্দনীয়। ক্রিকেট আবার ভদ্রলোকের খেলা হয়ে উঠুক। রবিবার রচিত মহাকাব্য ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে থাকুক। সব শেষে বড় প্রশ্ন, ভারত কবে বাংলাদেশকে তাদের মাটিতে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট খেলতে আমন্ত্রণ জানাবে?
লেখক : গবেষক ও বিশ্লেষক

Posted in নির্বাচিত কলাম | Comments Off on ক্রিকেট ইতিহাসের নতুন মহাকাব্য

সর্বশেষ খবর

আজকের ছবি

www.facebook.com

Tag Cloud