April 16, 2026
আশরাফুল আলম : সদ্য সমাপ্ত সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ভোট প্রাপ্তির প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন সাবেক সাংসদ গোলাম মাওলা রনি।
বৃহস্পতিবার সকালে তার নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে এই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ফেইসবুকের মাধ্যমে জানলামÑ আমি নাকি ১৮৬১টি ভোট পেয়েছি। আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আমাকে উত্তম শিক্ষা প্রদানের জন্য- আর ঢাকাবাসীকে ধন্যবাদ আমাকে উচিত জবাব দেবার জন্য।
আমার মনে হচ্ছেÑ যেসব বিষয় নিয়ে আমি এক ধরনের সন্তুষ্টি কিংবা আত্মতৃপ্তিতে ভুগছিলাম সেই সব বিষয়ে আমার অন্তর্দৃষ্টি খুলে গিয়েছে। আগামীতে আমি আরো সতর্ক হবো এবং আরো বিনয়ী হয়ে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করবো।
সাবেক এই সাংসদ আক্ষেপ করে বলেনÑ আমার ফেইসবুকে, বন্ধু, অনুসরণকারী এবং সমর্থকের সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ। যাদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক প্রায় ২/৩ বছরের। সারা দেশে আমার পাঠকের সংখ্যা প্রায় এক কোটি। অন্যদিকে টকশোর দর্শকের সংখ্যা কয়েক কোটি। রাস্তাঘাটে চলতে ফিরতে গিয়ে কতো মানুষের আবেগ উচ্ছাসের বাড়াবাড়ি দেখে আমার মনে হতো- আমি হয়তো কিছু একটা হয়ে গেছি। ১৮৬১টি ভোট প্রাপ্তির পর মনে হচ্ছে- আমি হয়তো যাত্রা দলের নটরাজ বা নটিরানী।
শেয়ার মার্কেটের পুঁজি হারানো দশ লাখ পরিবারের জন্য আমার অশ্রু বিসর্জন, নিজ দলের লোকদের সঙ্গে শত্রুতা, জেল খাটা এবং তারপর অভিমান করে দল এবং দলীয় মনোনয়ন থেকে নিজেকে দুরে রাখার উত্তম প্রতিদান এবং সমুচিত জবাবও আমি পেয়ে গেছি।
বিভিন্ন সময়ে মজলুম ব্যক্তি বা পরিবারের পক্ষে সাহস নিয়ে দাঁড়ানো, তাদের পক্ষে কথা বলা- কলম ধরার মূল্যও আমি পেয়েছি। আমার মঞ্চটি ব্যবহার করে হেফাজতে ইসলাম, তাবলীগ জামাত, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত, জামায়াত ইসলামীসহ অন্যান্য ধর্মাশ্রয়ী রাজনৈতিক দলের পক্ষে যে সত্য কথা নির্ভয়ে উচ্চারন করেছি তার মূল্যায়নও আমি পেয়েছি। বিএনপির দুর্দিনে বেগম জিয়া, তারেক রহমানও কোকো সম্পর্কে যে সত্য কথা বলেছি এবং লিখেছি তার জবাব ঢাকাবাসী জিয়ার সৈনিকগণ আমাকে দিয়েছেন। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা এবং শেখ কামাল সম্পর্কে ইতিহাসের অজানা অথচ মূল্যবান তথ্য উপাত্ত উপস্থাপন করে তাদেরকে মর্যাদার আসনে বসানোর প্রচেষ্টার ফলাফলও এই ভোটের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে।
আমার মনে হয় সিটি নির্বাচনে আল্লাহ উত্তম ফয়সালা দিয়েছেন। নেতা আল্লাহ কর্তৃক মনোনীত হয়। জনগণের স্বভাব চরিত্র, ইচ্ছা-অনিচ্ছা, অভ্যাস এবং আশা-আকাঙ্খার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই আল্লাহ কোনো সম্প্রদায়কে নেতা উপহার দেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী আমাদের কর্মের ফল। আর আমাদের খালেদা জিয়া আমাদের দুহাতের কামাই। তাদের বিরুদ্ধে টু শব্দ উচ্চারন করার নৈতিক শক্তি এদেশের কারও নেই। দেশের সকল বিশৃঙ্খলা, হত্যা, গুম, জেল, জুলুম হুলিয়া -সবই আমাদের দুই হাতের কামাই।
আল্লাহর কোনো দোষ নেই। আল্লাহ যদি তার ঐশী ক্ষমতায় সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করতেন এবং জনগণকে স্বাধীনভাবে ভোট দেবার সুযোগ দিতেন তবে কারা নির্বাচিত হতেন? তারা কি বর্তমানের জোর জবরদস্তিতে হয়ে যাওয়া আদম সন্তানদের তুলনায় উত্তম হতেন নাকি অধম? অতীতকে খোঁজ করুন, সব পেয়ে যাবেন। কাজেই এবারের ভোট জালিয়াতিকে আমি বলবো বেদাতে হাসানা।
এবার নিজের কথা কিছু বলিÑ ৫টি বছর এমপি ছিলাম। উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে দেশ জাতির জন্য কাজ করেছি। আমার এলাকায় স্থাপন করেছি এশিয়ার বৃহত্তম বীজ বর্ধন খামার। যার কারণে আগামী ২০ বছরে দেশের খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুন হয়ে যাবে। এটি আমার ব্রেইন চাইল্ড। আজকে দেশের নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু হচ্ছে এটিও এই অধম বান্দার মস্তিস্কের ফসল। সারা জীবন ভালো ছাত্র ছিলাম। জীবনের বহুক্ষেত্রে হাজারো সফলতা, সুনাম এবং কৃতিত্বের কারণে আমার মাঝে মধ্যে ভয় হতো যে কিয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে কি জবাব দিবো। যদি আল্লাহ জিজ্ঞাসা করেন তোমাকে তো নেতৃত্বের গুনাবলী দিয়েছিলাম- সেই গুনাবলী নিয়ে কেনো জনতার মাঝে যাওনি। সিটি নির্বাচনের পর আমার অন্তর থেকে সেই দায় চলে গেছে। এখন আমি আল্লাহকে বলতে পারবো-
ইয়া আল্লাহ! আমি তোমার বান্দাদের নিকট গিয়েছিলাম। ১৮ লাখ ৭০ হাজার বান্দা-বান্দীর মধ্যে ১৮৬১ জন আমায় সমর্থন দিয়েছেন। আমার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। তোমার মসজিদে গমনকারী নামাজী এবং দাড়ি টুপি ধারীরা আমায় যোগ্য মনে করেনি। তোমার তরুণ-তরুণী বান্দা-বান্দীরা সাড়া দেয়নি। তুমি যাদেরকে কলমের মাধ্যমে শিক্ষিত করেছো তারা তাদের চেয়ে কম শিক্ষিত জনকে তাদের অভিভাবক মনোনীত করেছে। হে আল্লাহ তুমি আমায় ক্ষমা কর এবং একজন সাধারণ বান্দা হিসেবে সাধারণ কর্ম করে তোমার সন্তুষ্টি অর্জনের তওফিক দাও।
আসিফ নজরুল: কারওয়ান বাজারে খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলাপ্রথমে কিছুটা রাখঢাক ছিল। এখন তাও নেই। খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে তৃতীয় দফা হামলাকালে সরাসরি অংশ নিয়েছে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা। তৃতীয় দফা হামলা হয় সরাসরি খালেদা জিয়ার গাড়ির ওপরই। গাড়িতে তাঁর ঠিক পেছনের সারির পাশের জানালা ভেঙে যায়। এলোপাতাড়ি লাঠি, ঢিল আর কোমরে অস্ত্র নিয়ে এ রকম হামলা অব্যাহত থাকলে খালেদা জিয়া নিজেও আহত হতে পারেন।
খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে তিন দফা হামলায় তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীরা বেধড়ক মারের শিকার হয়েছেন, কেউ কেউ রক্তাক্ত হয়েছেন। হামলাকারীরা কখনো জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে, কখনো ছাত্রলীগের ঘাঁটির ঘোষণা দিয়ে আক্রমণ করেছে। হামলাকারীদের ছবিতে স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা গেছে, বুধবারের হামলায় অংশ নেওয়া ছাত্রলীগের নেতাদের নাম-পরিচয় পর্যন্ত পত্রিকায় এসেছে। এ ধরনের হামলা দেশের ফৌজদারি আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ এবং দেশের নির্বাচনী আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। যেকোনো সভ্য দেশে এ জন্য হামলাকারীদের পুলিশ গ্রেপ্তার করত, নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থতার জন্য পুলিশের কাছে জবাবদিহি দাবি করা হতো। এ দেশে তা হয়নি, হবেও না। বরং হামলাকারীরা নিজেরাই মামলা দিয়েছেন হামলার শিকার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে, এই সুযোগে এখন পুলিশকে দিয়ে গ্রেপ্তার ও হয়রানিও করা যাবে বিএনপির নেতা-কর্মীদের।
খালেদা জিয়া বাংলাদেশের তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, একাধিকবার ছিলেন সংসদে বিরোধী দলের নেতা। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রচারণার পরও বহু মানুষ বিশ্বাস করে তিনি এখনো বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দুজন নেতার একজন। তাঁর বা অন্য নেত্রী শেখ হাসিনার ওপর যেকোনো হামলাকে বহু দলনিরপেক্ষ মানুষও নেতিবাচকভাবে গ্রহণ করে। তাঁর ওপর এ ধরনের অব্যাহত হামলা শুধু অপরাধমূলক বা চরম শিষ্টাচারবহির্ভূত কাজ নয়, এটি নির্বাচনী কৌশলের দিক দিয়েও আওয়ামী লীগের জন্য বুমেরাং হতে পারে। এই হামলায় জনমত প্রভাবিত হতে পারে, দেশে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পেতে পারে এবং সরকারের ইমেজ আরও ক্ষুণœ হতে পারে।
সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সুস্থ রাজনীতির পুনঃপ্রবাহের যে সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল, তা এসব হামলার ঘটনায় ইতিমধ্যে কিছুটা হোঁচট খেয়েছে। বিএনপির কর্মীরা এখন পোলিং এজেন্ট হতে বা কেন্দ্রে ঠিকমতো দায়িত্ব পালনে ভীতসন্ত্রস্ত হতে পারেন। নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা এতে মারাত্মকভাবে ক্ষুণœ হতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, তারপরও একের পর এক হামলা কেন চালানো হচ্ছে?
খালেদা জিয়ার ওপর অব্যাহত হামলার সম্ভাব্য কারণ হতে পারে দুটো। এক. তাঁকে নির্বাচনী প্রচারাভিযান থেকে বিরত রাখা। দুই. বিএনপিকে নির্বাচন বর্জন করতে প্ররোচিত করা। খালেদা জিয়া সরকার বা সংসদে বিরোধী দলের কেউ না বলে নির্বাচনী প্রচারাভিযানের সুযোগ পাচ্ছেন, যা প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রীরা পাচ্ছেন না। প্রচারাভিযানে খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত উপস্থিতি বহু ভোটারকে প্রভাবিত করতে পারে, এই আশঙ্কা সরকারের মধ্যে থাকতে পারে। এ জন্য তাঁর ওপর হামলা করে তাঁকে বিরত রাখার চিন্তাও তাঁদের মধ্যে থাকতে পারে। যদি সে ধরনের মানসিকতা থেকে হামলাগুলো হয়ে থাকে, তাহলে তা অসুস্থ, অন্যায় ও অশুভ। শক্তি প্রয়োগ করে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ঢাল ব্যবহার করে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বীকে স্তব্ধ করার চেষ্টা চরমভাবে অগণতান্ত্রিক।
২.
খালেদা জিয়ার ওপর হামলার আগে প্রধানমন্ত্রী নিজে বলেছিলেন, খালেদা নির্বাচনী অভিযানে বের হলে জিজ্ঞেস করবেন, তিনি কেন মানুষ পোড়ানোর আদেশ দিয়েছিলেন। এ ধরনের প্রশ্ন করার অধিকার যেকোনো মানুষের আছে, এ ধরনের আহ্বানও প্রধানমন্ত্রী করতে পারেন। কিন্তু এটি অর্থবহ করতে হলে আগে মানুষকে বিশ্বাস করাতে হবে যে খালেদা জিয়া নিজে পেট্রলবোমা মারার নির্দেশ দিয়েছেন। গণমাধ্যমে প্রচারিত খালেদা জিয়ার কোনো বক্তৃতা-বিবৃতিতে এ ধরনের নির্দেশ দিতে দেখা যায়নি। তিনি ৫ জানুয়ারি-পরবর্তী সময়ে পুলিশ প্রহরায় অবরুদ্ধ ছিলেন বলে বাইরের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তাঁর সরাসরি কথা বলার কোনো সুযোগও ছিল না। তিনি কি তাহলে ফোনে বা ইন্টারনেটে এ ধরনের কোনো নির্দেশ দিয়েছিলেন? তিনি যদি তা করে থাকেন, সরকারের কাছে অবশ্যই তার রেকর্ড থাকার কথা। যদি সরকারের কাছে এমন রেকর্ড থাকে, তাহলে গণমাধ্যমে তা প্রচার হওয়ার কথা। আমরা এমন কোনো তথ্য-প্রমাণ সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন কোনো গণমাধ্যমেও পাইনি, আইন-আদালতে দাখিল করার কথাও শুনিনি।
গণমাধ্যমে সরকারি দলের নেতারা ও কিছু আলোচক বলে থাকেন যে বিরোধী দলের কর্মসূচিকালে পেট্রলবোমার প্রয়োগ হয়েছে বলে এই দায়দায়িত্ব তাদের বা আরও সুনির্দিষ্ট করলে খালেদা জিয়ার। তাঁদের এই বক্তব্য সঠিক হতে পারে। কিন্তু তাহলে আওয়ামী লীগের কর্মসূচি চলাকালে বা তারা বিরোধী দলে থাকাকালে লগি-বইঠা, গানপাউডার আর বোমার আঘাতে যেসব প্রাণহানি ঘটেছে, তার দায়দায়িত্ব আওয়ামী লীগের নেত্রীর ওপর বর্তাবে। বর্তমান সরকারের সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে যেসব গুম ও ‘ক্রসফায়ারের’ ঘটনা ঘটেছে, তার দায়দায়িত্বও সরকারপ্রধানের ওপর বর্তাবে। আগের আমলের ক্রসফায়ারের জন্য একইভাবে দায়ী হবেন বিএনপির নেত্রী।
১৯৯০ সালের পর বহু প্রাণহানির ঘটনার জন্য তাহলে জনগণের অধিকার থাকবে দুই নেত্রীর কাছে জবাব চাওয়ার। আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থায় এ ধরনের জবাবদিহির একটি মাত্র সুযোগই আমরা সৃষ্টি করেছি। তা হচ্ছে নির্বাচন। গত চার মাসে সরকার অক্লান্তভাবে নাশকতা ও পেট্রলবোমার জন্য খালেদা ও বিএনপিকে দায়ী করেছে। এখনো নাহয় তা অব্যাহত থাকুক! কিন্তু বিচারের দায়িত্ব জনগণের নির্বাচনী সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দেওয়া হোক, ছাত্রলীগ-যুবলীগের পিস্তল-লাঠি আর পেশিশক্তির ওপর না। প্রয়োজনে স্পেশাল ট্রাইব্যুনালে পেট্রলবোমার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচার করে সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক। কিন্তু সেটি যেন হয় ন্যায়বিচার, আরোপিত বিচার নয়।
যিনি বাংলাদেশের তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তাঁর বিচার রাস্তাঘাটে হতে পারে না। অশ্লীল গালাগালি করে লাঠি হাতে তাঁর দিকে মারমুখী হয়ে ছুটে যেতে পারে না ছাত্রলীগ কিংবা যুবলীগ। এসব ঘটনা আর ছবি মানুষকে শুধু আওয়ামী লীগ না, গোটা রাজনীতির ওপরই বিদ্বিষ্ট করে তুলতে পারে।
৩.
রাজনীতি সব সময় পরিচ্ছন্ন কোনো প্রতিযোগিতা নয়। গণতন্ত্র সব সময় শালীন নয়। বহু বছর আগে স্যামুয়েল হান্টিংটন যৌথভাবে ক্রাইসিস অব ডেমোক্রেসি নামক রিপোর্টে আমেরিকা ও ইউরোপের উন্নত গণতন্ত্রের অনেক সংকটকে চিহ্নিত করেছিলেন। আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও এশিয়ার অনেক অঞ্চলে এই সংকট দিনে দিনে আরও তীব্র হয়েছে। গত কয়েক বছরে এসব অঞ্চলে ইন্দোনেশিয়া ও তিউনিসিয়ার মতো কয়েকটি দেশ বাদে অন্য সব অঞ্চলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়েছে, নির্বাচন বা গণতান্ত্রিক রূপান্তর প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, বিরোধী দলের প্রতি সহনশীলতা হ্রাস পেয়েছে।
আমাদের এই অঞ্চলে ভারতে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিক শিষ্টাচারের অবনতি ঘটেছে, শ্রীলঙ্কায় ২০১৫ সালের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত বিরোধী দলের ওপর চরম নিপীড়ন হয়েছে, মালদ্বীপে একটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের পর ভিন্নমতের ওপর রাষ্ট্রীয় খক্ষ নেমে এসেছে। বাংলাদেশ যে বহু প্রতিবন্ধকতার পরও ১৯৯০ সালের পর অব্যাহতভাবে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে গেছে, তার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল এ দেশে একটি মোটামুটিভাবে গ্রহণযোগ্য গণতান্ত্রিক কাঠামো ও সংস্কৃতি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি বিতর্কিত ও একতরফা নির্বাচনের পর আমাদের গণতন্ত্র মারাত্মক হোঁচট খেয়েছে। তার প্রতিফলন শুধু দেশের অর্থনীতি নয়, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মূল্যবোধের ওপর পড়েছে।
এ দেশে এখন নারকীয় পেট্রলবোমা প্রতিবাদের ভাষা হয়েছে, বিরোধী দলের নেতার গুম হওয়া সহনীয় বিষয়ে পরিণত হয়েছে, জবাবদিহির জন্য প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো উল্টো ক্ষমতাসীনদের নিপীড়ন-নির্যাতনের সহযোগী হয়েছে, মিথ্যাচার রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নামতে নামতে আমরা যদি এমন এক জায়গায় চলে যাই যে রাস্তাঘাটে সরকারি দলের পান্ডারা একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে অনবরত আক্রমণ করতে পারবে, তাহলে এ দেশে গণতন্ত্র পুরোপুরিই বিপন্ন হয়ে যাবে একসময়। সামাজিক সম্প্রীতি ও শিষ্টাচারবোধও হবে বিপর্যস্ত।
বাংলাদেশের যেকোনো গণতান্ত্রিক শক্তির উচিত খালেদা জিয়ার ওপর অব্যাহত হামলার তীব্র প্রতিবাদ করা। বিরোধী দলের আন্দোলনকালে নাশকতার জন্য যাঁরা তাঁর সুষ্ঠু বিচার বাঞ্ছনীয় বলে মনে করেন, তাঁরা অবশ্যই তা মনে করতে পারেন। কিন্তু তাঁদেরও উচিত তাঁর বিরুদ্ধে রাজপথে বর্বরতার নিন্দা জানানো। রাজপথে কোনো মানুষের ওপরই প্রকাশ্যে হামলা করার অধিকার কারও নেই।
আশার কথা হচ্ছে, আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতা খালেদা জিয়ার ওপর হামলায় তাঁদের অস্বস্তির কথা জানিয়েছেন। কিন্তু তাঁদের মনে রাখতে হবে, এই হামলা শুধু বন্ধ করা না, এর বিচার করার দায়িত্বও তাঁদের।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
আশিক রহমান : মো, জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি। জোনায়েদ সাকি আসন্ন ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অন্যতম মেয়র প্রার্থী। সৎ ও মেধাবীÑ টক শোর পরিচিত মুখ জোনায়েদ সাকি পরিবর্তিত ঢাকার স্বপ্ন দেখেন। পরিবর্তনের পক্ষে জনগণকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন। নির্বাচনী প্রচারণা, কেন নির্বাচন করছেন, অন্য প্রার্থীকে বাদ দিয়ে কেন আপনাকে মানুষ ভোট দেবে, ঢাকার সমস্যা সমাধানে, আপনার ভূমিকা কী হবে? এসব জনজিজ্ঞাসার জবাব দিয়েছেন আমাদেরসময়.কম-এর সঙ্গে আলাপচারিতায়।
আমাদেরসময়.কম: ‘পরিবর্তন সম্ভব, আমরা পরিবর্তন চাই’Ñ এই পরিবর্তন কীভাবে সম্ভব বলে মনে করেন?
জোনায়েদ সাকি: হ্যাঁ, পরিবর্তন সম্ভব, পরিবর্তন চাইÑ এই স্লোগান আমরা তুলেছি। পরিবর্তন নিয়ে যদি তাৎক্ষণিকভাবে বলি, বর্তমানে যে সময়ের মধ্যে আমরা আছি, মানুষের জীবন ও সম্পদÑ সবকিছু একটা সংকট এবং দুর্যোগের মধ্যে রয়েছে সারা দেশে। ঢাকা শহরের মানুষের সম্পদ, প্রকৃতি-পরিবেশ বিপর্যয়ের মধ্যে আছে। এই অবস্থা থেকে মানুষই আসলে পরিবর্তন চাচ্ছে। মানুষ দেখছেÑ একদিকে গুম, খুন, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস অন্যদিকে বিরোধী ২০ জোটের আন্দোলনে পেট্রলবোমা সন্ত্রাস। এই পরিস্থিতির মধ্যে আমাদের রাজনীতি, গণতন্ত্র জিম্মি হয়ে আছে। এর ফলে মানুষ পরিবর্তন চান। পরিবর্তন চান তাদের জীবনের মৌলিক উন্নতির জায়গা থেকে। অর্থাৎ তাদের জীবনকে গতিশীল করা, আরও একটু নিরাপদ করা, কীভাবে বাংলাদেশের সামষ্টিক উন্নতি হতে পারেÑ সেই পরিবর্তন তারা চান। বিদ্যমান দুই বড় জোটের রাজনীতি তার ব্যর্থতা প্রমাণ করেছেÑ আমাদের রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে, আমাদের ঢাকার ক্ষেত্রেও। কেননা, বিগত আড়াই-তিন দশক ধরে দেখছি যে, নির্বাচিত মেয়র ও সিটি করপোরেশন রয়েছে। তাদের উপস্থিতি ও কর্মকান্ড সত্ত্বেও ঢাকা শহর এখন বসবাসের অনুপযোগী শহরের তালিকায় দ্বিতীয় স্থান দখল করেছে। মানুষ বৃহৎ দুটি দল ও প্রার্থীদের কাছ থেকে নতুন কিছু আশা করেন না। ফলে তারা ঢাকার পরিবর্তনের জন্য, বিশেষ করে এই পরিবর্তনের জন্য যে নতুন কল্পনা ও নতুন রাজনীতি দরকার, তার পক্ষেই অবস্থান নিতে চান। নির্বাচনী প্রচারণায় মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহ আমরা দেখেছি। আমরা মনে করি যে, পরিবর্তন সম্ভব যদি মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়। মানুষ ঐক্যবদ্ধ হলেই আমরা একটা নতুন রাজনীতির সূচনা ঘটনাতে পারব। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের আকাক্সক্ষার একটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারব।
আমাদেরসময়.কম: এক সিটি করপোরেশন দুভাগে বিভক্ত। মানুষ সেবা পেতে, মানুষকে সেবা দিতে এটা সমস্যা, না সুবিধা?
জোনায়েদ সাকি: ঢাকাকে যে দুভাগ করা হলোÑ এটি কি জনগণের সম্মতির ভিত্তিতে করা হয়েছে? আমি মনে করি না। ঢাকার কী হবে সেটি তো ঢাকার জনগণের মতামতের একটা প্রতিফলন থাকার উচিত ছিল। বলা হয়েছিল যে, এ দুভাগ বিকেন্দ্রীকরণের জন্যই করা হয়েছে। আমার কাছে মনে হয়েছে, সেবা প্রদানের ইউনিট হিসেবে ঢাকার ওয়ার্ডগুলো যদি বিকেন্দ্রীকরণ করতে পারতাম, সিটি করপোরেশন একটাই থাকত, তাহলে ঢাকার সার্বিক উন্নতির জন্য সুবিধাজনক হতো। এখন ভৌগোলিক দিক দিয়ে অখন্ড একটা নগরীতে যদি দুটো পৃথক প্রশাসন থাকে, পরিকল্পনা ও উন্নয়নকাজে অসামঞ্জস্য থাকে, কীভাবে সেখানে সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়া যাবে? এক এলাকার মশা শুধু আরেক এলাকায় উড়ে যাবে না, আবর্জনা আটকে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হবে না, এর ফলে নগর পরিবহন এবং অন্যান্য উন্নয়ন পরিকল্পনাও বাধাগ্রস্ত হবে।
ঢাকা কি বিভক্ত থাকবে, নাকি অবিভক্ত থাকবে, ঢাকা তা জনগণের সম্মতির ওপরই ভবিষ্যতে ছেড়ে দিতে হবে। এবং আমরা বিশ্বাস করি, জনগণ একটা ঐক্যবদ্ধ ঢাকা নগরীই দেখতে চান।
আমাদেরসময়.কম: নির্বাচনী ইশতেহার, প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি কতটা বাস্তবসম্মত, বাস্তবায়নযোগ্য কি?
জোনায়েদ সাকি: বাস্তবায়নযোগ্য নয় এমন কোনো প্রতিশ্রুতি আমরা দিইনি। নগরের মানুষের অনেক সমস্যা রয়েছে। তার মধ্যে নগরের পানি সমস্যা, বিদ্যুৎ সমস্যা, বাসস্থান সমস্যা বলেনÑ এসবকে আমরা চেষ্টা করেছি যে, সিটি করপোরেশনের বিদ্যমান ক্ষমতার মধ্যে যা আছে, সেই বিষয়ে কিছু করণীয় নির্ধারণ করা। এমন কোনো প্রতিশ্রুতি আমরা দিতে চাইনি, যা আসলে সিটি করপোরেশন উদ্যোগ নিয়ে কখনো তা বাস্তবায়ন করতে পারবে না।
কিন্তু যদি আমরা সত্যি সত্যিই মানুষের সমস্যার সমাধান করতে চাই, তাহলে সেই রকম এখতিয়ার আনতে হবে। সে কারণে আমরা বলছি, নগর সরকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটা আমাদের সামনে জরুরি। এবং এই মেয়র নির্বাচনে নির্বাচিত হলে নগর সরকারের পক্ষে জনমতামত তুলে ধরব। সেই মতামতের ভিত্তিতে আইনসভায় যেন আইন পাস হয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় আন্দোলন বা যেভাবে চাপ সৃষ্টি করা যায়, তা আমরা করার চেষ্টা করব। প্রয়োজনে সাংবিধানিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আদালতের আশ্রয়ও নেওয়া সম্ভব। স্থানীয় সরকারকে সংবিধান কর আদায় করার অধিকার দিয়েছে, আমরা সংবিধান প্রদত্ত সেই অধিকার বাস্তবায়ন করে এখানে যেকোনো উন্নয়ন কর্মকান্ডকে সম্ভব করে তুলতে সক্ষম।
আমাদেরসময়.কম: সিটি করপোরেশন মেয়রের ক্ষমতা নিয়ে আপনি সন্তুষ্ট?
জোনায়েদ সাকি: সিটি করপোরেশনের ক্ষমতা কতটুকু? আমাদের সাংবিধানিক অঙ্গীকার হলোÑ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠা করা। স্থানীয় সরকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অত্যন্ত অপরিহার্য একটা অঙ্গ ও শর্ত হিসেবে এখানে আমরা চিন্তা করেছি। বাস্তবে দেখা যায়, স্থানীয় সরকার ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে আছে। নামমাত্র স্থানীয় সরকারের ক্ষমতা নানানভাবে সংকুচিত করা হয়েছে। তার আয়ের প্রায় ৬০ ভাগ আসে সরকারি বরাদ্দ থেকে। অন্যদিকে তাদের করের উৎসগুলোও সরকার নিজের দখলে নিয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের আমলাতান্ত্রিকতা তার ওপর চেপে আছে। সিটি করপোরেশন মানেই তো নগরের উন্নতি কী হবে, স্বল্প-দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কীভাবে হবে, নগরবাসীর যাবতীয় সমস্যার সমাধান নগর সরকার করবে।
আমাদের নগর সরকার বাস্তবায়ন করার জায়গাটায় আজ এমপিতন্ত্র কায়েম হয়ে আছে। ঢাকাবাসীর সকল সমস্যা যদি আমরা সমাধান করতে চাই, তাহলে অবশ্যই আমাদেরকে নগর সরকারব্যবস্থায় যেতে হবে। যদি তা করতে না দেওয়া হয়, তাহলে নগরের অনেক সমস্যার সমাধানই আমরা করতে পারব না। কারণ এটি সিটি করপোরেশনের এখতিয়ারের মধ্যেই নেই। এখানে আট-নয়টি মন্ত্রণালয় কাজ করে, আটান্নটি অধিদপ্তর কাজ করে। তাদের কাজকর্ম সমন্বয় করার এখতিয়ার বা ক্ষমতা যদি সিটি করপোরেশনের না থাকে, তাহলে সিটি করপোরেশন বাস্তব কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারবে না। কে মেয়র হবেন, কে ওয়ার্ড কমিশনার হবেন, তা এই নির্বাচনে নির্বাচিত হবে। এটি জনগণের রায়ে চূড়ান্ত হবে। তবে একই সঙ্গে নগর সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য জনমতেরও একটা নির্বাচন। আমরা বিশ্বাস করি যে, জনগণ নগর সরকার প্রতিষ্ঠার পক্ষেই তাদের রায় প্রকাশ করবেন।
আমাদেরসময়.কম: ক্ষমতাহীন মেয়র পদ, তবু নির্বাচন করছেন। কেন?
জোনায়েদ সাকি: মেয়র নির্বাচন করছি, মানুষের পরিবর্তনের যে আকাঙ্খা তা বাস্তব রূপ দেওয়ার জন্য তা আমরা সম্মিলিতভাবে করতে চাই। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে, মুক্তিযুদ্ধের আকাক্সক্ষা একটি অসাম্প্রদায়িক সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেÑ এ নির্বাচনেই তার একটা উদ্বোধন ঘটবে বলে আমরা মনে করি।
মেয়রের পদটি ক্ষমতাহীন। কারণ অতীতের কোনো মেয়র কার্যকরভাবে নগরবাসীকে প্রতিনিধিত্ব করতে চাননি, তারা দলের হুকুম পালন করেছেন। ফলে মেয়রের ক্ষমতা বৃদ্ধির কোনো চেষ্টা তারা কার্যকরভাবে করতে সক্ষম হননি। বাংলাদেশে একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সূচনা হবে স্থানীয় সরকার পর্যায়ে জনগণের রাজনৈতিক স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে এমন ব্যক্তিদের নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে। কেননা তারা বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্র যেভাবে অপচয় আর দুর্নীতির বেড়াজালে জনগণকে আটকে রাখছে, গণপ্রতিনিধিত্বশীল স্থানীয় সরকারই কেবল তার অবসান ঘটাতে পারে।
আমাদেরসময়.কম: নির্বাচনী ব্যয় নির্বাহ করছেন কীভাবে?
জোনায়েদ সাকি: আমাদের নির্বাচনী ব্যয় অতি সামান্য। আমাদের যেখানে যত সমর্থক রয়েছেন, বন্ধু-শুভাকাঙ্খী রয়েছেন, তাদের সহযোগিতা পাচ্ছি। আর বাকি পুরো অংশটাই হচ্ছেÑ জনগণের কাছ থেকে। জনগণের ওপর ভর করেই আমরা নির্বাচনটা করতে চাই। নির্বাচনী ব্যয় নির্বাহের পুরো বিষয়টিই আসলে যেহেতু অ্যাকাউন্ট খুলতে হয় নির্বাচনী আচরণবিধি ও নিয়ম মেনেÑ আমরা সেগুলো যথাযথভাবে পালনও করছি। আমরা জনগণের কাছে বিভিন্ন মাধ্যমে আহ্বানও জানিয়েছি, আশাব্যঞ্জক সাড়াও তারা দিচ্ছেন। আহ্বান জানিয়েছি সেখানে সহযোগিতা করার জন্য। সেখান থেকে যে অর্থ উত্তোলিত হবে, সেখান থেকেই আমরা নির্বাচনে খরচ করব।
আমাদেরসময়.কম: সরকারি কোনো এক সংস্থা আপনাকে নির্বাচনে দাঁড় করিয়েছে। নির্বাচনের খরচও তারাই জোগান দিচ্ছেÑ এমন কথাও মানুষের মধ্যে আলোচিত হচ্ছে।
জোনায়েদ সাকি: এ ধরনের মিথ্যা প্রচারণা করা এ দেশের রাজনীতির সংস্কৃতি। নতুন যেকোনো শক্তির উত্থান দেখলে কায়েমি শক্তিগুলো এই প্রচার চালিয়ে তাদের খেলো করার চেষ্টা করে। তাদের নিজেদের হারাবার মতো কোনো সম্মান নেই, সেই কারণেই অন্যদেরও তারা অসম্মানিত করার চেষ্টা করে। মনে রাখবেন, ইতিহাসে যতবার কোনো সংস্থা বা শক্তি কাউকে ‘দাঁড়’ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে, তারা নিজেদের পরিচয় কখনোই লুকোতে পারেনি। কারণ যারা দাঁড় করায়, নাটাইটাও তারা নিজেদের হাতেই রেখে দেয়। আমাদের কোনো গোপন শক্তি নেই, জনগণই একমাত্র ভরসা। আন্দোলন করে, গ্রেপ্তার হয়ে, মিছিলে মার খেয়ে, দাবি আদায় করে জনগণের যেটুকু ভালোবাসা আর সমর্থন আমরা পেয়েছি, সেইটুকুর ওপর ভর করেই আমরা রাজনীতি করি। পঁচিশ বছর ধরে আমি রাজনীতিতে সক্রিয় আছি, সেই সক্রিয়ার কারণেই মানুষ আমাকে চেনে। আমাকে যারা সমর্থন করছেন, সেই নাগরিকেরা, সাংস্কৃতিক কর্মীরা, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকেরা, শ্রমিক সংগঠকেরা মাঠে নেমে আমাদের প্রচারপত্র বিলি করছেন। ফলে আমাদের পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তির কোনো সুযোগ বা অবকাশ নেই।
আমাদেরসময়.কম: মেয়র নির্বাচন করছেন, উৎসাহদাতা কে? কারা আপনাকে মেয়র নির্বাচন করতে উৎসাহিত করেছে?
জোনায়েদ সাকি: জনগণের বিভিন্ন অংশের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই আমার নির্বাচনে আসা। অংশ নেওয়া। বাংলাদেশের রাজনীতিতে যদি একটা পরিবর্তনের সূচনা ঘটাতে হয়, তাতে জনগণের সম্মতি কতটা রয়েছে তা বিবেচনা গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের সম্মতির প্রকাশ তো দরকার হয়। নির্বাচন সেই সম্মতি ও সমর্থন প্রকাশের একটা গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আমরা ঢাকা শহরকে পরিবর্তনের যে কর্মসূচি যেমন দিয়েছি, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটানোর, উদ্বোধন ঘটানোর কর্মসূিিচ দিয়েছি। তার ভিত্তিতেই জনগণ বিবেচনা করবেন।
আমাদেরসময়.কম: জনগণের এই মত কীভাবে পেলেন?
জোনায়েদ সাকি: আমাদের সাংগঠনিক শক্তি দিয়ে যতটুকু জনগণের কাছে পৌঁছুতে পারি, সমর্থক, শুভাকাঙ্খী, যাদের মাঝে আমরা নিয়মিত কাজ করিÑ সেই শ্রমজীবী, মধ্যবিত্ত, শিক্ষার্থী, নারী সমাজ তাদের সকলের মতই আমরা যাচাই করেছি। জনগণের বিভিন্ন অংশ নিয়ে কিছু জরিপ আমরা করেছি। তার ভিত্তিতে আমরা সিদ্ধান্তে এসেছি যে, হ্যাঁ, নির্বাচনে আমরা অংশগ্রহণ করতে পারি।
আমাদেরসময়.কম: কত পার্সেন্ট ভোট পাবেন, কী মনে হয় আপনার?
জোনায়েদ সাকি: আমরা মনে করি, নির্বাচনে আমরা জয়লাভ করব। কারণ জনগণ পরিবর্তনের পক্ষে, জনগণ পরিবর্তনের পক্ষের প্রার্থীকেই খুঁজে নেবে। আগামীর ঢাকা বাস্তবায়নের, নাগরিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার যে রূপরেখা আমরা হাজির করেছি, জনগণ তাকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমাদের পক্ষে মাঠে নেমেছেন।
সৌজন্য….আমাদেরসময়.কম
জব্বার হোসেন॥ শ্লীলতাহানির ঘটনা এই প্রথম নয়, এমন ঘটনা আগেও ঘটেছে। এ ধরনের ঘটনার পর আমরা কী আশা করি, আশা করি যে, এমন ঘটনা আর ঘটবে না। কিন্তু আমাদের এই আশা, আশাই থেকে যায়, স্বপ্নই থেকে যায়, বাস্তবে রূপ নেয় না। কারণ আমরা বাস্তবে রূপ দিই না এবং রূপ দিতে চাই না বলেই, এমন ঘটনা বারবার ঘটতে থাকে। যখন আমাদের জীবনে কোনও কিছু প্রাত্যহিক হয়ে যায়, নিত্যদিনের হয়ে যায়, তখন সেটা আমাদের সংস্কৃতির অংশ বলেই আমরা মনে করি। শ্লীলতাহানি, যৌন হয়রানি, যৌন নিপীড়ন এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এটা আমাদের সংস্কৃতি হয়ে গেছে।
সংস্কৃতির নানান দিক থাকে। কোনও কোনও সংস্কৃতিকে আমরা টিকিয়ে রাখতে চাই, কোনও কোনও সংস্কৃতিতে আমরা টিকিয়ে রাখতে চাই না। আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে। সেগুলো হারিয়ে গেছে চর্চা নেই বলেই। যে সংস্কৃতিগুলো টিকে আছে, সেগুলোর চর্চা রয়েছে বলেই টিকে আছে। শ্লীলতাহানি আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের একটা অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন যখন-তখন, যত্রতত্র আমরা শ্লীলতাহানির ঘটনার কথা শুনি। এই শ্লীলতাহানি কখনও শিক্ষক করে, কখনও অফিস কর্মকর্তা করে, কখনও সাংবাদিক করে, কখনও পুলিশ করে, কখনও আমলা করে, কখনও রাজনীতিবিদেরা করে, কখনও মুখোশধারী বুদ্ধিজীবীরাও করে। শ্লীলতাহানির কিছু ঘটনা প্রকাশ হয় বলে আমরা জানি। কিছু জানি না, প্রকাশিত হয় না বলেই।
আইন তৈরিই হয়েছে যেন মানুষ একটা শৃঙ্খলার মধ্যে থাকে, যেন মানুষ অন্যের ক্ষতিকর কিছু না করতে পারে। কিন্তু সেই আইন যখন শুধু বইয়ের পাতায় পড়ে থাকে বইয়ের সূত্র হয়ে, সে আইনের যখন কোনও কার্যকারিতা থাকে না, মানুষ তখন সেই আইনকে মানেও না।
জানি যেগুলো, সেগুলোর মাত্রাই এত ভয়াবহ। আর জানি না যেগুলো, যেসব প্রকাশিত হয় না, সব এক জায়গায় মিলালে সেগুলোর সংখ্যা অসংখ্য, অগণিত। শ্লীলতাহানি বন্ধ হয় না, কারণ এই শ্লীলতাহানি আমরা বন্ধ করি না। হত্যা বন্ধ হবে না, যদি না হত্যা বন্ধ করি। অপহরণ বন্ধ হবে না, যদি না অপহরণ বন্ধ করি। ধর্ষণ বন্ধ হবে না, যদি না ধর্ষণ বন্ধ করি। অ্যাসিড নিক্ষেপ বন্ধ হবে না, যদি না অ্যাসিড নিক্ষেপ বন্ধ করি। যৌন হয়রানি বন্ধ হবে না, যদি না যৌন হয়রানি বন্ধ করি। যেকোনও অন্যায়ই বন্ধ হবে না কখনোই, যদি আমরা তা বন্ধ না করি।
মানুষের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা খুব অস্বাভাবিক নয়। একধরনের অপরাধপ্রবণতা মানুষের মধ্যে থাকেই। শিক্ষা, সংস্কৃতি, রুচিবোধ, মানবিকতা তাকে অপরাধ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি জিনিস, যা মানুষকে অপরাধ থেকে দূরে সরায়, তা হচ্ছে আইন। আইন তৈরিই হয়েছে যেন মানুষ একটা শৃঙ্খলার মধ্যে থাকে, যেন মানুষ অন্যের ক্ষতিকর কিছু না করতে পারে। কিন্তু সেই আইন যখন শুধু বইয়ের পাতায় পড়ে থাকে বইয়ের সূত্র হয়ে, সে আইনের যখন কোনও কার্যকারিতা থাকে না, মানুষ তখন সেই আইনকে মানেও না। তখন অপরাধ করার একটা প্রবণতা দেখা যায় মানুষের মধ্যে।
শ্লীলতাহানি একটি বল প্রয়োগের বিষয়। একটি জবরদস্তির বিষয়। একটি জোরাজুরির বিষয়। জোরাজুরির সঙ্গে একধরনের শক্তি ও ক্ষমতার বিষয়ও জড়িত। শ্লীলতাহানি কখনও সবলকে দুর্বল করে না, দুর্বলের শ্লীলতাহানি ‘সবল’ করে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া যৌন হয়রানি, নিপীড়ন, শ্লীলতাহানির ঘটনায় সামনে এসেছে ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগের সঙ্গে ক্ষমতার একটি সম্পর্ক রয়েছে। আধিপত্যবাদের একটি সম্পর্ক আছে। ছাত্রলীগ এমন একটি সংগঠন, যাদের দল এখন ক্ষমতায়। ক্ষমতা কখনও-কখনও অন্যের ক্ষমতা ও অধিকারকে নষ্ট করে। এবং ক্ষমতার কুৎসিত যে রূপ, তার একটি বিকৃতিও থাকে। আর এই বিকৃতিটাই ধারণ করেছে ছাত্রলীগ। কারণ ছাত্রলীগ দেখেছে- তাকে বারণ করার কেউ নেই, নিষেধ করার কেউ নেই, যে কারণে একধরনের স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠেছে ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগের যৌন হয়রানি, যৌন নিপীড়ন, শ্লীলতাহানি, ধর্ষণ- এসব কোনওটাই নতুন নয়। ছাত্রলীগ অন্য সময় অত না, যত না তার সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন যৌন নিপীড়ন, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ করে। এসব ঘটনা জসিম উদ্দিন মানিকের জন্য যেমন সত্য, সেই যুবলীগ নেতা যিনি এক নারীর শ্লীলতাহানি করে তার ভিডিও বাজারে ছেড়েছিলেন, তার ক্ষেত্রেও সত্য।
ছাত্রলীগ এমন একটি সংগঠন, যাদের দল এখন ক্ষমতায়। ক্ষমতা কখনও-কখনও অন্যের ক্ষমতা ও অধিকারকে নষ্ট করে। এবং ক্ষমতার কুৎসিত যে রূপ, তার একটি বিকৃতিও থাকে। আর এই বিকৃতিটাই ধারণ করেছে ছাত্রলীগ।
আইন সবার জন্য সমান বলা হলেও শেষ পর্যন্ত তা ক্ষমতাবানদের জন্য। তাই যদি না হয়, তাহলে অনেক ছিঁচকে ঘটনায় জেল-জরিমানা, অথচ বড় ঘটনায় কিভাবে পার পেয়ে যায় লোকে। মানিকের ঘটনায়ও সেদিন সারা দেশ তোলপাড় হয়েছিল। শুধু দেশ নয়, দেশের বাইরের মিডিয়ায়ও ঝড় উঠেছিল তার শততম ধর্ষণের খবরে। রেহনুমা আহমেদের মতো মেধাবী নৃবিজ্ঞানী শিক্ষক চাকরি ছেড়েছিলেন ঘৃণায়, প্রতিবাদে। অথচ মানিকদের কিছুই হয়নি। মানিকের মতো সোনা মানিকদের রাষ্ট্র পৃষ্ঠপোষকতা করেছে ছাড়া পেতে। শুধু তা-ই নয়, সহযোগিতা করেছে বিদেশ পাড়ি দিতে। তিরস্কারের ঘটনায় যদি পুরস্কার পাওয়া যায়, তাহলে লোকে কেন যৌন হয়রানি, ধর্ষণ করবে না? কেন বিমান টিকিট নেবে না, কেন বিদেশের নিশ্চিত জীবনকে অগ্রাহ্য করবে? মানিকের ঘটনা একটি। এরপর এসব ঘটনা আরও ঘটেছে। ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, যৌন হয়রানি- যৌন নির্যাতন অনেক করেছে। যখনই যাদের সরকার ক্ষমতায় ছিল, রক্ষা করেছে, পৃষ্ঠপোষকতা করেছে তারা তাদের সোনা মানিকদের।
বহিষ্কার কোনও বিচার নয়, আইওয়াশ মাত্র। ‘বহিষ্কার’, ‘সাময়িক বহিষ্কার’ কিছুদিন দল থেকে সরে থাকা, পরে এসে দলে ভেড়া। অনেকটা পুলিশের ক্লোজড, সাসপেন্ডের মতো। কিছুদিন সরে থাকো, বেতন রেশন সব নাও, পরে এসে যোগ দাও। ততদিনে পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে, শান্ত। ঘটনার পর কয়েকদিন পার হয়ে গেলেও জড়িতদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে পারেনি পুলিশ। পুলিশের দায়িত্বে অবহেলার বিষয়েও কোনও পদক্ষেপ নেয়নি সরকার। বিশ্ববিদ্যালয়ের আচরণও তথৈবচ। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আমজাদ হোসেন বলেন এক কথা, উপাচার্য বলেন অন্য কথা। ১৬ এপ্রিল প্রক্টরের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তদন্ত কমিটি গঠন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এখনও নাম ঘোষণা করা হয়নি। উপাচার্য বলেন, আমাদের কমিটি ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। বুঝি না কার কথা, কোনটি সত্য?
আমরা এক অদ্ভুত সংস্কৃতি চালু করেছি, দায়িত্বহীনতার সংস্কৃতি, দায় এড়াবার সংস্কৃতি, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, ক্ষমতাবানদের ছাড় দেওয়ার সংস্কৃতি। সেই সংস্কৃতিরই অংশ শ্লীলতাহানির সংস্কৃতি।
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর পদ ও বক্তব্য সব সময় একই। সব সময়ই ‘দেখছি, দেখব’, ‘কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়’, ‘দোষীদের বিচার করব’। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের ইতোমধ্যেই এসব বক্তব্য দেওয়াও হয়ে গেছে। তিনি তার বক্তব্য দেওয়ার মহান দায়িত্বটি পালন করেছেন। আমরা এক অদ্ভুত সংস্কৃতি চালু করেছি, দায়িত্বহীনতার সংস্কৃতি, দায় এড়াবার সংস্কৃতি, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, ক্ষমতাবানদের ছাড় দেওয়ার সংস্কৃতি। সেই সংস্কৃতিরই অংশ শ্লীলতাহানির সংস্কৃতি। এই অপসংস্কৃতি, অসভ্যতা থেকে বের হতে না পারলে, জাতি হিসেবে লজ্জার শেষ থাকবে না। এমনটা চলতে থাকলে, হয়তো আমরা বর্বর হিসেবে চিত্রিত হব, চিহ্নিত হব। যাদের আমরা বর্বর, অসভ্য বলি, তারাই হয়তো একদিন আমাদের দিকে আঙুল তুলবে। গালি দেবে ‘অসভ্য’ বলে।
যদিও তাতে আমাদের কোনও কিছুই যায়-আসে না।
লেখক: সদস্য, ফেমিনিস্ট ডটকম, যুক্তরাষ্ট্র
পরিচালক, বাংলাদেশ সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট জার্নালিজম অ্যান্ড কমিউনিকেশন
সম্পাদক, সাপ্তাহিক কাগজ ও মিডিয়াওয়াচ
আলী যাকের : রাজনীতি নিয়ে চিন্তাভাবনা করা, বন্ধুদের সঙ্গে তর্কাতর্কি করা অথবা রাজনীতি নিয়ে নিজ ধ্যান-ধারণা সম্বন্ধে কথা বলাও নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার আমার জন্য। কেননা সেই বয়ঃসন্ধিকাল থেকে রাজনীতির সঙ্গেই তো আমাদের বসবাস! আমরা বড় হয়েছি এক কণ্ঠরোধকারী পাকিস্তানি অপশাসনের আমলে। প্রয়াত পটুয়া কামরুল হাসানকে যখন জিজ্ঞেস করতাম, ‘কেমন আছেন কামরুল ভাই’ তিনি স্বভাবসুলভ মিষ্টিহাসি মুখ করে বলতেন, ‘ভালো আছি। কারণ ভালো থাকার অর্ডার আছে।’ এমন পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করতে হয়েছিল আমাদের।
ওপরের কথাগুলো বললাম বটে কিন্তু এটিও সত্য, রাজনীতি নিয়ে খুব বেশি লেখালেখি করা হয়নি। কেননা রাজনৈতিক সচেতনতা সত্ত্বেও আমার ভুবন হলো সংস্কৃতি। তবুও বুকে হাত দিয়ে কি বলতে পারি, আমাদের মতো সমাজে সংস্কৃতি রাজনীতিবিবর্জিত বস্তুতপক্ষে অনেকেই মনে করেন, আমি তো বটেই, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ আসলেই ছিল সংস্কৃতির জন্য যুদ্ধ। অনেক রাজনীতিবিদ এমন কথা শুনে আঁতকে উঠবেন। আঁতকে ওঠাই স্বাভাবিক। তবে কি সংস্কৃতিজনরা রাজনীতিবিদদের পেশায় ভাগ বসাবেন ভয় নেই ভাইসব। এখানে যে সংস্কৃতির কথা আমি উল্লেখ করলাম, তা হচ্ছে আমাদের জাতিগত জীবনধারা। অর্থাৎ আমাদের শিক্ষা, সামাজিক আচার, খাদ্য, পরিচ্ছদ ইত্যাদি। এমনকি ধর্মও সংস্কৃতির অন্তর্গত একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় নিয়ামক। তবে এই ধর্মের চর্চা একটি জনগোষ্ঠীর চর্চিত নিজস্ব ধর্ম হতে হবে। অর্থাৎ আমাদের বাংলাদেশের মুসলমান যেসব ধর্মীয় আচার মেনে চলেন, এর সঙ্গে আরব দেশের মুসলমানদের ধর্মীয় আচারে বিস্তর ফারাক রয়েছে। হিন্দুধর্মের সম্বন্ধেও একই কথা বলা যায়। বাঙালি হিন্দু আর তামিলনাড়–র হিন্দু কি একইভাবে ধর্মচর্চা করেন যাই হোক, একটি জাতির সামগ্রিক পরিচয় হলো তার সাংস্কৃতিক পরিচয়। সেই অর্থে আমরা কোনোভাবেই পাকিস্তানের অংশ ছিলাম না, হতেও পারতাম না। তাই যদি সংস্কৃতিজনের রাজনৈতিক আলোচনা বৈধ বলে গ্রহণযোগ্য হয়, তাহলে আমার কিছু বলার আছে।
আমরা সবাই সম্ভবত বিশ্বাস করি, একটা বীভৎস হত্যাকা-ের প্রতিবাদস্বরূপ বাঙালি জাতি অস্ত্র ধারণ করে বাংলাদেশকে ১৯৭১ সালে স্বাধীন করেছিল। এই স্বাধীনতাযুদ্ধ কতগুলো প্রায় আপসহীন মূল্যবোধের বাস্তবায়ন বলে আমরা ধরে নিতে পারি। কিন্তু লক্ষ করা সম্ভব হবে, আমাদের স্বাধীনতার পর থেকে একের পর এক ষড়যন্ত্র করা হয়েছে আমাদের মূল্যবোধ এবং আদর্শগুলোকে ধ্বংস করে সেখানে একটি পাকিস্তানি চেহারাসদৃশ সরকার অথবা ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করার। এর শিকার এ দেশের পিতৃপুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তার পরিবারবর্গ, জেলখানায় নিহত ৪ জাতীয় নেতাÑ যারা মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং পরে একটির পর একটি গোপন অথবা প্রকাশ্য হত্যাকা-, যার মাধ্যমে আমরা হারিয়েছি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের শীর্ষস্থানীয় অনেক সহযোদ্ধাকে।
সবচেয়ে বড় কথা এই, যে অরাজকতা চলেছে এত বছর ধরে, এর মাধ্যমে আমাদের আদর্শ, আমাদের মূল্যবোধ, আমাদের সংস্কৃতি, বস্তুতপক্ষে আমাদের জাতিগত পরিচয় নিশ্চিহ্ন করার একটা প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। এসবের পেছনে একাত্তর-পূর্ববর্তী পাকিস্তানি মানসিকতাসম্পন্ন কিছু মানুষ সক্রিয় ছিল। তারা মাঝে মধ্যে থমকে দাঁড়িয়েছেÑ যখন গণমানুষ তাদের দুঃশাসন, দুর্নীতি ও দুশ্চরিত্রের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে অথবা নিজেদের অধিকার প্রয়োগ করেছে। আমরা অদূর অতীতে দেখেছি গণমানুষের জন্মগত অধিকার ভোটের মাধ্যমে নিজের পছন্দমতো নেতৃত্বের নির্বাচন বিষয়টিও প্রায় দুঃসাধ্য করে ফেলা হয়েছিল। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমাদের গণমানুষ ভোটকেন্দ্রের কাছাকাছি যেতে পারেনি। কোটির অধিক ভুয়া ভোটার, মাস্তান নিয়োগ অথবা আদেশ-নির্দেশের মাধ্যমে ভোটকেন্দ্রে সেনাসদস্যদের অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপ আমাদের দেশের গণতন্ত্রের পথকে অমসৃণ করেছে। কিন্তু যখনই আমাদের সাধারণ মানুষ নির্বিবাদে তাদের ভোটের অধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছে, তখনই বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসমৃদ্ধ প্রতিনিধিরা জাতীয় পরিষদে ব্যাপক হারে নির্বাচিত হয়েছেন। এখানে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ শব্দটির একটু ব্যাখ্যা প্রয়োজন আছে বলে আমার বিশ্বাস। কেননা আমরা প্রায়ই বক্তৃতা-বিবৃতিতে এই চেতনা সম্বন্ধে বলি বটে কিন্তু এর অর্থ যেমন শ্রোতার কাছে অবোধ্য ঠেকে, তেমনি আমরা নিজেরাও বোধহয় এর দ্যোতনা সম্পর্কে সচেতন থাকি না। এ কারণে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ শব্দ দুটির রাজনৈতিক ব্যবহার যত ব্যাপক, সামাজিক বা ব্যক্তিসচেতনতা বৃদ্ধিতে এই শব্দের প্রয়োগ ততই সীমাবদ্ধ। একটু চিন্তা করলেই বোঝা যাবে, যে কোনো সুকৃতিই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-উদ্ভূত।
আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম একটি দুষ্কৃতিকে হঠাতে। অতএব দুষ্কৃতিকে কেবল সুকৃতি দ্বারাই বিতাড়িত করা সম্ভব। প্রসঙ্গত বলা যায়, ফুটপাতের ওপর পড়ে থাকা একটা কলার খোসাকে তুলে নিকটবর্তী ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়াও সুকৃতি ও নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য একটি মিথ্যা বাক্যের প্রয়োগও দুষ্কৃতি। দুষ্কৃতির এই সংজ্ঞার প্রেক্ষাপটে আমরা অবলীলায় ফুটপাতের ওপর কলার খোসা ছুড়ে ফেলছি এবং মিথ্যার ফুলঝুরি দিয়ে জীবন সাজাচ্ছি। অথচ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলতে বলতে আমাদের প্রায় কণ্ঠরোধ হয়ে আসছে। এ আপাত সাধারণ বিষয় থেকেই আমাদের জাতীয় জীবনের ওপরে স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের করাল গ্রাস নেমে আসে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অন্তর্গত যে বিশেষ আদর্শগুলো আছে, সেগুলোর প্রতি চরম অবজ্ঞা দেখাবে বাংলাদেশের জন্মবিরোধী শক্তিÑ এটা তো স্বাভাবিক। কিন্তু যখন আপাতদৃষ্টিতে ‘স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি’ এই ধরনের আচরণে প্রবৃত্ত হয়, তখন তা চরম দুঃখজনক হয়ে ওঠে বৈকি। এ কারণেই কতিপয় দুষ্কৃতকারীÑ যারা নিজেদের স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি হিসেবে জাহির করে, তাদের কৃতঅপকর্মের দ্বারা সত্যিকারের স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিরা চরম বিপদের সম্মুখীন হয়। যারা বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত, তাদের চেনা যায় সহজেই। কিন্তু ঘরের শত্রু যখন বিভীষণ হয়, তখন দেখা দেয় সবচেয়ে বড় বিপদ। বাংলাদেশ একটি ক্ষুদ্র দেশ হতে পারে। কিন্তু জনসংখ্যায় এটি অনেক বৃহদাকারের দেশকেও ছাড়িয়ে যায়। এ জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেশিরভাগই অতি সাধারণ মানুষÑ যারা মোটা কাপড়, মোটা ভাতে সন্তুষ্ট থাকে এবং নীরবে নিজস্ব কাজ করে যায়। তবে হাতেগোনা কয়েক দুষ্কৃতকারীর অপকর্মে যখন তাদের জীবন বিপন্ন হয়, তখন তাদের গতি হয় রবীন্দ্রনাথের ভাষায়Ñ ‘নাহি জানে কার দ্বারে/দাঁড়াইবে বিচারের আশে/দরিদ্রের ভগবানে বারেক ডাকিয়া দীর্ঘশ্বাসে/মরে সে নীরবে।’
আমার শঙ্কা হয়, জনগণ দ্বারা নির্বাচিত গণমানুষের সরকার যদি আবারও ষড়যন্ত্রের শিকার হয়, তাহলে নীরবে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা ভিন্ন আমাদের আর কোনো পথ থাকবে না। প্রসঙ্গত, একটু পেছনের দিকে তাকাতে চাই। পাকিস্তানি কারাগার থেকে সদ্যমুক্ত বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ব্রিটিশ এয়ারফোর্সের কমেট উড়োজাহাজখানি যখন ‘৭১-এর ১০ জানুয়ারি ঢাকায় ফিরছিল, তখন ঢাকা বিমানবন্দরে লাখ লাখ মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ ছিল। প্লেনের ভেতর থেকে বঙ্গবন্ধুর এক সহযোগী, পরে আমাদের পররাষ্ট্র সচিব ফারুক চৌধুরী উড়োজাহাজের জানালা দিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে ওই জনসমুদ্র দেখে উদ্বেলিত হয়ে বঙ্গবন্ধুকে সেই দৃশ্য দেখতে অনুরোধ করেন। বঙ্গবন্ধু সেই দৃশ্য দেখে কিছুক্ষণ স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। তারপর নীরবে অশ্রুপাত করতে শুরু করলেন। ফারুক চৌধুরী ভাবলেন, এ হয়তো আনন্দাশ্রু। তিনি বঙ্গবন্ধুকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে বঙ্গবন্ধু কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘আমার দেশ তো ধ্বংস হয়ে গেছে। আমি এদের খাওয়াব কীভাবে’ বঙ্গবন্ধু হত্যার অনেক দিন পর আমি এ ঘটনাটি ফারুক ভাইয়ের কাছে শুনেছি। কত বড়মাপের মানুষ হলে পরে সবকিছুর আগে দেশবাসীর কথা মনে আসে একজন নেতার তারই তো কন্যা আজ ক্ষমতায় আসীন। দেশবাসীর মঙ্গলের কথা তাকে যে ভাবতেই হবে এবং এ ভাবনাই ইঙ্গিত দেবে তার প্রথম করণীয় কী তার প্রতি। তার সর্বপ্রথম দায়িত্ব দেশের আপামর জনসাধারণের প্রতি। কতিপয় অবস্থাপন্ন তথাকথিত বিশেষ ব্যক্তি বা পরিবারের প্রতি নয়।
তার উচিত হবে কঠোরভাবে আদেশ-নির্দেশ দেওয়া যেন এ দেশ থেকে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে সবার ক্ষেত্রে অতি কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। সত্যিকার অর্থে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত যে সরকার, তাকে অনেক সচেতন ও সাবধানী হতে হয়। কেননা জনগণ সম্পূর্ণ আস্থা আছে বলেই তাদের নির্বাচিত করে। এ আস্থার পূর্ণ মর্যাদা সরকারকে দিতেই হবে। এ কথা অনস্বীকার্য, দুরভিসন্ধি ও ক্রমাগত ষড়যন্ত্রে অভ্যস্ত যে মহল, তারা একটার পর একটা বাধা সৃষ্টি করবেই। জনসাধারণ বোকা নয়। তারা জানে ও বোঝে সবকিছুই। এই ধরনের ষড়যন্ত্রে তারা বিভ্রান্ত হয় না। কিন্তু জনগণ নিরাপত্তা ও শান্তির প্রত্যাশী। এ কারণে আমাদের প্রশাসনকে আরও উদ্যোগী ও সংবেদনশীল হতে হবে। দলের নাম করেÑ তা সে যে দলেরই হোক, দুর্নীতিগ্রস্ত ও সন্ত্রাসী, যারা সর্বত্র সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে, তাদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। প্রয়োজনে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করতে হবে। তবে সর্বপ্রথম যেটি প্রয়োজন, সেটি হলো জনগণের সঙ্গে সরকারের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন। এটি সম্ভব কেবল জনপ্রতিনিধিদের দ্বারাই। অতএব যে দল আজ ক্ষমতায় রয়েছে বা ভবিষ্যতে ক্ষমতায় আসবে, তাদের জনপ্রতিনিধিদের কাছে আমার নিবেদন এই যে, আপনারা প্রতিনিয়ত নিজ নিজ এলাকায় সফর করুন এবং সেখানকার গণমানুষের যে দাবি-দাওয়া, ধ্যান-ধারণা অথবা ভাবনা-চিন্তা তার সঙ্গে নিয়মিত সংস্পর্শে থাকুন। কোনো কিছুই চিরায়ত বলে ধরে নেবেন না দয়া করে। আজকের বিপুল জনসমর্থন সহজেই কাল শূন্যতায় পর্যবসিত হতে পারে। আমার মনে হয়, প্রত্যেক জনপ্রতিনিধির উচিত প্রতিটি ইস্যুতে গণমানুষের ধ্যান-ধারণাকে পর্যবেক্ষণ করা। এর কোনো বিকল্প নেই। সূত্র : আমাদের সময়
পীর হাবিবুর রহমান: রাজনীতিতে এখন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার বড়ই সুসময়। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক
ইতিহাসে এমন সুসময় অতীতে আর কখনো আসেনি। চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানের গুলিবর্ষণ, মুফতি হান্নানের পুঁতে রাখা বোমা, একুশের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলাসহ কুড়ি বারের বেশি মৃত্যুফাঁদ থেকে ফিরে আসা শেখ হাসিনা এই সময়ে দলের অভ্যন্তরে একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দুর্বল করে তার সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন মাথাচাড়া দিতে না দেয়া, স্বাধীনতাউত্তরকালে বঙ্গবন্ধু সরকার থেকে আওয়ামী লীগের কট্টর সমালোচকদের তার আনুগত্যে নিয়ে আসা, ১৫ আগস্টের খুনিদের বিচার ও ফাঁসির রায় কার্যকর করা, বিশ্ব মোড়লদের চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করে ‘৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম এগিয়ে নেয়া, গ্রামীণ ব্যাংক ঘিরে নোবেল বিজয়ী ইউনূস ইস্যুকে নির্বাসনে পাঠিয়ে, সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ দমনের পথে বিশ্বায়নের রাজনীতিতে বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন করা, পূর্বের চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক উষ্ণতায় ভারসাম্য থাকা, বিশ্বব্যাংককে আমলে না নিয়ে পদ্মা সেতু স্ক্যান্ডালকে ভাসিয়ে দিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে সেতুর কাজ শুরু করা, আন্তর্জাতিক আদালত থেকে সমুদ্র বিজয়ই নয়, বিরোধী দলের প্রতিরোধকে পরাস্ত করে ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় ফের ফিরে এসে প্রশাসনসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর তার নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ রাখার মাধ্যমে এই সুসময় তৈরি করেছেন।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির তুরুপের তাস নিয়ে শেখ হাসিনা নিজের তেজস্বিতায় ও ক্যারিশমায় এই অর্জন ঘটিয়েছেন। পর্যবেক্ষক মহলের মতে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শক্তির ছকে বাঁধা ওয়ান ইলেভেনকে চ্যালেঞ্জ করেই শেখ হাসিনা প্রমাণ করতে সমর্থ হয়েছিলেন তৎকালীন বিএনপি-জামায়াতের শাসনামলে ব্যর্থতার বুক চিড়ে তিনিই সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছেন। সেই সময়ে যারা তার নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে মাইনাস করতে চেয়েছিলেন তাদেরকে পরাস্ত করে তিনি প্রমাণ করেছিলেন আওয়ামী লীগ নামের দলটি ও অসাম্প্রদায়িক শক্তি কার্যত তার আঁচলে বাঁধা। সেখান থেকে ওয়ান ইলেভেন সরকারের বাধার মুখে দেশে ফেরা, ওই সরকারের কঠোর সমালোচনাসহ নির্বাচনের দাবিতে অনড় থেকে কারাবরণ এবং তার পথ ধরে মুক্তিলাভ ও ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা।
পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, ব্যাংকিং খাতসহ নানামুখী দুর্নীতি, গুম-খুন ও বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে দমন-পীড়ন নীতি সরকারের জনপ্রিয়তায় ভাটা আনার কারণে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনগুলোতে বিএনপির বিস্ময়কর একচেটিয়া বিজয় ঘটে। তিনি যেভাবে গণমাধ্যমসহ সিভিল সোসাইটিকে তার নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন অতীতে কোনো সরকারই এমনটি পারেনি। আর সেটি পুরোমাত্রায় তিনি পেয়েছেন বিরোধী দল বিএনপির সংসদ বর্জন, ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে হঠকারী প্রতিরোধের ডাক দিয়ে ব্যর্থ হওয়া এবং পরবর্তীসময়ে রাজনীতিতে ঘুরে দাঁড়াতে না পারায়। পর্যবেক্ষকদের ভাষায় ৫ জানুয়ারি নির্বাচন নিয়ে শেখ হাসিনার চারদিকের সবাই উদ্বিগ্ন থাকলেও তিনি ছিলেন নিরুদ্বেগ।
তার ক্যারিশমায় এই সংকট উত্তরণ করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। রাজনৈতিক কূটকৌশলে প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে স্থানীয় সরকারের অংশীদারিত্ব দিয়েছেন উদারভাবে। সিটি কর্পোরেশনসহ সব স্থানীয় নির্বাচন দিয়েছেন অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠুভাবে হতে। বিএনপি সেখানে জয়লাভ করে তৃপ্তির ঢেকুর তুললেও ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে অংশ না নিয়ে আত্মঘাতী গোল করেছে নিজেদের পোস্টে। সেই নির্বাচন সামনে রেখে জাতিসংঘ ও মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের মনোভাব আমলে না নিয়ে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে গণভবনে নৈশভোজ আলোচনার আমন্ত্রণ জানিয়ে ফোন করেন। সেই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিলেন দলের তারকা রাজনীতিবিদও। কিন্তু খালেদা জিয়া অন্তর্র্বতী সরকারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব গ্রহণ যেমন করেননি, আলোচনায়ও যাননি। তার এই ভুলের কারণে সাংবিধানিক দোহাই দিয়ে শেখ হাসিনা নজিরবিহীন ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে ফিরে আসেন ক্ষমতায়। পর্যবেক্ষকদের ভাষায়, কার্যত আওয়ামী লীগের ক্ষমতা শেখ হাসিনানির্ভর। একেকটি ইস্যু সামনে দাঁড়িয়েছে জাতীয়-আন্তর্জাতিকভাবে যা ঘিরে শেখ হাসিনার বৃহস্পতি হয়েছে উজ্জ্বল। হেফাজতের শাপলা চত্বর অভিযান রাতের মধ্যেই ব্যর্থ করে দিয়ে খালেদা জিয়াকেই ফাঁদে ফেলেননি সমর্থনকারী গণমাধ্যমকেও বন্ধ করার সুযোগ পেয়েছেন। গণকণ্ঠ ও হককথার মিথ্যাচারে উদার গণতান্ত্রিক রাজনীতিবিদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেখানে ছিলেন অসহায়, একুশ শতকের মিডিয়ার যুগে শেখ হাসিনা সেখানে অনেক সাহসী ভূমিকা নিয়ে সফল হয়েছেন।
পর্যবেক্ষকরা আরো মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি ও ব্যাংকিং খাতসহ নানা জায়গার দুর্নীতির কঠোর হস্তে দমন করে সুশাসনের দুয়ার আরো উš§ুক্ত করতে পারতেন তাহলে তার ইমেজ আরো উজ্জ্বল হতো।
অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যবসাবান্ধব উদার নীতি গ্রহণ, ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যে সহযোগিতা, গার্মেন্টস খাত, আবাসন খাতকে উদার করা, শেয়ারবাজার চাঙ্গা, বিরোধী দলের সভা-সমাবেশের অধিকার, রাজনৈতিক নেতাদের মুক্তি দিয়ে পরিবেশ স্বাভাবিক করেন তাহলে মানুষ খুশি হতো। এ দেশে গণতন্ত্রের সুসময় কখনো আসেনি। গণতন্ত্রের সংগ্রামে জাতিকে আওয়ামী লীগই উদ্বুদ্ধ করেছে। গণতন্ত্রের বিকাশে আওয়ামী লীগ তাই দায় এড়াতে পারে না। সর্বশেষ বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার ডাকে তিন মাসের লাগাতার হরতাল-অবরোধে পেট্রলবোমায় যে প্রাণহানি ও জনগণের সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি ঘটেছে তাতে আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার কারণে দায় বিএনপির কাঁধেই ঠেলে দেননি, বিরোধী রাজনৈতিক জোটের সহিংস কর্মসূচিকে আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় সন্ত্রাসবাদী রাজনীতির পাল্লায় তুলে দিতে সফল হয়েছেন। এমনকি দলের অনেকে নানা বিতর্কের জš§ দিলেও পরিবারের সদস্যদের ক্ষমতার দৃশ্যপট থেকে দূরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। তার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় উত্তরাধিকার সূত্রে আগামী দিনের রাজনীতিতে অভিষিক্ত হচ্ছেন এই বার্তাটি দল ও মানুষের মধ্যে সুকৌশলে দিয়েছেন যে তাকে দলের কাঠামোতে ঠাঁইও দিতে হয়নি।
অন্যদিকে আইটি বিশেষজ্ঞপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়কে নতুন প্রজšে§র সামনে প্রযুক্তি খাত বিকাশে নেতৃত্বদানে উপযোগী সৃজনশীল ও মেধাবী তরুণ হিসেবে উপস্থাপন করতে সফল হয়েছেন। তার তথ্য-প্রযুক্তি উপদেষ্টা করলেও ক্ষমতার দৃশ্যপটে পায়চারী করতে দেননি। তাকে নিয়ে যারা বারবার বিতর্কের ঝড় তোলার চেষ্টা করেছেন তারা ব্যর্থ হয়েছেন। কারণ তাকে ঘিরে কোনো লুটপাট সিন্ডিকেট দৃশ্যমান হয়নি। একইসঙ্গে তার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল কাজ করছেন বিশ্বব্যাপী অটিজম শিশুদের নিয়ে। একটি মানবিক জায়গায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন কন্যাকে। শেখ রেহানার পুত্র রেদওয়ান সিদ্দিকী ববিকে ঘিরেও দেশে কোনো বিতর্ক হতে দেননি বা বিতর্কিত লোকদের আশপাশে ঘুরতে দেখা যায়নি। মেধাবী এই সন্তানেরও একটি সাক্ষাৎকার আল জাজিরায় নিয়েছিলেন সাংবাদিকতার কিংবদন্তি ডেভিড ফ্রস্ট। ববির বোন টিউলিপ ব্রিটেনের মূলধারার রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়েছেন। এবার ব্রিটিশ পার্লামেন্ট নির্বাচনে বৈরী আসন থেকে লেবার পার্টির হয়ে আশার আলো জ্বালিয়ে তুলেছেন। বোন শেখ রেহানা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ালেও ক্ষমতার রাজনীতিতে কখনো দৃশ্যমান হননি। আওয়ামী লীগের যেসব নেতা একসময় তারকার মুকুট নিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করতে চেয়েছিলেন তারাও এখন নিঃশর্ত আনুগত্যই নয়, তার দয়ার ওপর রাজনীতি করছেন। শুধু তাই নয়, আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুর কট্টর সমালোচকদের দিয়ে শেখ হাসিনা তার ও সরকারের এবং পিতার বন্দনা করাতে সফল হয়েছেন। তবে পর্যবেক্ষক মহল মনে করে, বিএনপির রাজনৈতিক ব্যর্থতার কারণে শেখ হাসিনার ভিশন-২০২১ এখন ২০৪১ উঁকি দিচ্ছে।
একুশের গ্রেনেড হামলাসহ বিএনপি-জামায়াত শাসনামলে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ওপর যে হত্যা-নির্যাতন চলেছে সেই লাশ টানার এবং হওয়ার বিরোধী দলের রাজনীতিতে থাকার শেষ সুযোগ ফুরিয়ে দিয়েছে শেখ হাসিনার। আওয়ামী লীগে প্রচলিত কথা হচ্ছে বিরোধী দলে গেলে গ্রেনেডে মরতে হবে। তার চেয়ে ক্ষমতায় থেকে বুলেটে মরাই ভালো। কারণ গোটা দেশ জানে জঙ্গিবাদী ও প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের বুলেট সবসময় শেখ হাসিনাকে তাড়া করছে। তাহাজ্জতের নামাজ ও কোরান তেলাওয়াত দিয়ে দিন শুরু করা শেখ হাসিনাও জানেন মৃত্যু যেদিন আসবে সেদিন আল্লাহ ছাড়া কেউ রক্ষা করতে পারবে না। তিনি নিজেও প্রকাশ্যে অনেকবার এই কথার সঙ্গে জনগণের শক্তি তুলে ধরেছেন। একদিনের ঘটনায় বোঝা যায় শেখ হাসিনার এখন বৃহস্পতি কতটা তুঙ্গে। একদিকে বিশ্বকাপে টাইগারদের বীরত্বে দেয়া হয়েছে সংবর্ধনা, মাওনায় উদ্বোধন করেছেন ফ্লাইওভার। রাতে কার্যকর হয়েছে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত যুদ্ধাপরাধী কামারুজ্জামানের ফাঁসি।
আনিসুল হক। নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনে উপস্থাপনা করে পরিচিতি ও সুনাম অর্জন করেন। বর্তমানে মোহাম্মদী গ্রুপের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২২টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতা আছে। দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) ও সার্ক চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি ২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠেয় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদপ্রার্থী। এ নিয়ে কিছু প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন তিনি। সাক্ষাৎকারটি হুবহু তুলে ধরা হলো :
প্রশ্ন : কোন প্রেক্ষাপট থেকে নির্বাচনে আসার পরিকল্পনা?
আনিসুল হক : মেয়র পদে নির্বাচন করব—এটা আমার পরিকল্পনায় ছিল না। আমি ব্যবসায়ী। অর্থনীতি, ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের কল্যাণে কাজ করেছি। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান এফবিসিসিআই ও সার্ক চেম্বারের নেতৃত্বে ছিলাম। এসব সংগঠনে কিছু ভালো কাজ করতে পেরেছি, যা করতে গিয়ে দল-মত নির্বিশেষে সবার সমর্থন পেয়েছি। যেখানে, যখনই দায়িত্বে ছিলাম, সততার সঙ্গে কাজ করেছি। এটাই আমার প্রধান সক্ষমতা। আমার মনে হয়, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী হয়তো ভেবেছেন, ঢাকা উত্তরের নাগরিকদের জন্য আমি ভালো কাজ করতে পারব। তাই আমাকে সমর্থন দিয়েছেন। অন্যদিকে পরিবারের সদস্যরাও বিশ্বাস করে, জনগণ নির্বাচিত করলে আমি সত্যিই জনগণের কল্যাণে কিছু করতে পারব। ফলে তারাও আমাকে নির্বাচনে অংশ নিতে উৎসাহিত করেছে।
এটি আমার জন্য বিশাল একটি সুযোগ, ঢাকাবাসীর জন্যও। আমি বিশ্বাস করি, প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন পরিচালনায় আমার উদ্যম, সততা ও সাফল্যের অভিজ্ঞতা দিয়ে আমি ঢাকা উত্তরকে নতুন চেহারা দিতে পারব।
প্রশ্ন : নির্বাচনে প্রার্থীরা কমবেশি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। আপনাকে আওয়ামী লীগ সমর্থন দিয়েছে। তবে আপনি দলটির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সেভাবে কখনো মাঠে ছিলেন না। নেতাকর্মীদের সঙ্গেও সেভাবে যোগাযোগ ছিল না। সেখানে একজন ব্যবসায়ী হিসেবে কীভাবে মোকাবিলা করবেন?
আনিসুল হক : হ্যাঁ, সত্য। আমি দলীয় রাজনীতির সঙ্গে ছিলাম না। কিন্তু বরাবরই আমি রাজনীতিসচেতন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষ। নিজে বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে সমর্থন দিচ্ছেন, তাঁর দল আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন এরই মধ্যে আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। তাঁরাই আমার নির্বাচনী প্রচার এগিয়ে নেবেন। সবাই আমাকে ভালোভাবে গ্রহণ করেছেন। পাশে থাকার, ভোট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, সমর্থন দিচ্ছেন, উৎসাহ জোগাচ্ছেন। ফলে আমি তো কোনো ধরনের বিচ্ছিন্নতা অনুভব করছি না।
প্রশ্ন : কোন শ্রেণির ভোটার মূল ব্যবধান গড়বে বলে ধারণা?
আনিসুল হক : ভোটারের শ্রেণিবিভাজনে আমি বিশ্বাস করি না। গরিব-ধনী সবারই এক ভোট। নগরীর সব ভোটারই সমান গুরুত্বপূর্ণ। নাগরিক সেবায় সবার সমান অধিকার। তার পরও যেটি বিবেচ্য তা হলো, এই শহরের অর্ধেকের বেশি মানুষ স্বল্প ও নিম্ন আয়ের। সংখ্যার বিচারে তারাই শহরে সংখ্যাগরিষ্ঠ। অন্যদিকে ঢাকা উত্তরে বিশাল একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণি আছে। এবার ৩২ শতাংশ তরুণ জীবনে প্রথমবারের মতো ভোট দেবে। তরুণ ও নারীরা মোট সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি। ফলে আমি সব শ্রেণির ভোটারের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছি। টেবিল ঘড়ি মার্কায় ভোট দিতে অনুরোধ জানাচ্ছি। আশা করি, নাগরিকরা শেষ পর্যন্ত আমাকেই বিজয়ী করবে।
প্রশ্ন : জয়ের ব্যাপারে কতটা আশাবাদী?
আনিসুল হক : ইনশাআল্লাহ, জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। না হলে তো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাই করতাম না। দেখেন, এই শহরের মানুষ আমাকে জানে, চেনে। তাঁরা আমাকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমর্থন দিচ্ছেন। দল-মত নির্বিশেষে পাশে এসে দাঁড়াচ্ছেন। জনগণ বিশ্বাস করে, আমি কথায় নয়, কাজে বিশ্বাসী। তারা চায়, আমি তাদের সঙ্গে থেকে ঢাকার উন্নয়নে কাজ করি। মানুষের এই প্রত্যাশার জয় হবেই হবে।
প্রশ্ন : ঢাকাকে উন্নয়নের যে প্রস্তাব দিয়েছেন, তা কতটা বাস্তবায়ন করা যাবে কিংবা কতটা যুক্তিযুক্ত?
আনিসুল হক : বাস্তবায়নযোগ্য জেনেই উন্নয়ন প্রস্তাব দিয়েছি। আমরা ঢাকার সমস্যা জানতে প্রায় সব স্তরের নাগরিক, নগর বিশেষজ্ঞ, পরিকল্পনাবিদদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছি। তফসিল ঘোষণার বেশ আগেই প্রায় ৭৫ হাজার নাগরিকের ওপর জরিপ চালিয়েছি। ফলে এখন আমি নির্দিষ্ট করে নাগরিকদের চাহিদা কী, তা জানি এবং তার সমাধানে পরিকল্পনাও করেছি। আমরা এমন কোনো প্রস্তাব করছি না, যা বাস্তবায়নযোগ্য নয়। আইনের মধ্যে থেকে মেয়র এসব কাজ তাঁর ক্ষমতা, দক্ষতা ও নেতৃত্ব দিয়ে খুব ভালোভাবেই বাস্তবায়ন করতে পারবে বলে আমি বিশ্বাস করি। আমি আকাশকুসুম স্বপ্ন দেখতে পছন্দ করি না। ফলে নাগরিকদের অবাস্তব কোনো স্বপ্নও দেখাচ্ছি না।
পাশাপাশি, সিটি করপোরেশনের অপেক্ষায় না থেকে সরকারও শহরের জন্য বহু উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এসব প্রকল্প যখন নেওয়া হয়, তখন কি কেউ ভেবেছিল, এগুলো বাস্তবায়িত হবে? বাস্তবতা হচ্ছে, মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার হয়েছে, বনানী ফ্লাইওভার হয়েছে, হাতিরঝিল হয়েছে, মেট্রোরেলের কাজ চলছে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে হচ্ছে, রাস্তাঘাট প্রসারিত হচ্ছে, ভূগর্ভস্থ স্যুয়ারেজ লাইন উন্নয়নের কাজ চলছে; বহু কাজ হচ্ছে। এসব কাজ শেষ হলে শহরের চেহারা কেমন হবে—একবার ভেবে দেখুন তো।
প্রশ্ন : শৌচাগার ব্যবস্থাপনা নিয়ে পরিকল্পনা?
আনিসুল হক : গত এক মাস আমরা এ বিষয়ে অনেক কাজ করেছি। আমার সহকর্মীরা এ বিষয়ে রীতিমতো গবেষণা করেছে। আমাদের পুরো শহরের গণশৌচাগারের অবস্থা সত্যিই করুণ। দুই সিটি করপোরেশন মিলিয়ে শৌচাগার আছে মাত্র ৬৯টি, যার ৩৭টিই উত্তরে। এগুলোর অবস্থা এতই নাজুক যে সেখানে যেতে নাগরিকরা উৎসাহ বোধ করেন না। এ কারণে আমরা মেনিফেস্টোতে (ইশতেহার) বলেছি, জয়ী হলে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য করপোরেশনের পাঁচটি জোনে যথাসম্ভব বেশি বেশি করে গণশৌচাগার নির্মাণ করব। বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করব। শৌচাগার ব্যবস্থাকেই ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেব।
প্রশ্ন : রাজধানীর বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে কি চিন্তাভাবনা আছে?
আনিসুল হক : নিরাপদ বাজার আমাদের স্লোগান। আমরা নিরাপদ বাজারব্যবস্থা চাই। নিরাপদ বাজার ব্যবস্থাপনা চাই। ভেজালমুক্ত খাবার চাই। পরিচ্ছন্ন বাজার চাই। ক্রেতাবান্ধব পরিচ্ছন্ন বাজার চাই। যদি নির্বাচিত হই, অবশ্যই বাজার ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক ও নাগরিকের স্বাস্থ্যবান্ধব করে তুলব। সমস্যা বাজারের নয়, ব্যবস্থাপনার। আমাদের পরিকল্পনা হচ্ছে বাজার ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন।
প্রশ্ন : একটি আধুনিক, পরিকল্পিত ঢাকার কাঠামো উন্নয়নে পাঁচ বছর সময়কে কি ট্রায়াল মেয়াদ বলে মনে করেন?
আনিসুল হক : আমি তো মনে করি, পাঁচ বছর অনেক সময়। সততা ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করলে এ সময়ের মধ্যেই জনগণকে অনেক ভালো সেবা দেওয়া সম্ভব। কাজের ধারাবাহিকতা থাকলে, ভালো কাজ পাঁচ বছরের জন্য নয়, বরং সব সময়ই চলতে পারে।
প্রশ্ন : ছেলেমেয়েরা কি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত?
আনিসুল হক : ছেলে নাভিদুল হক মোহাম্মদী গ্রুপের পরিচালক। ছোট মেয়ে পড়াশোনা শেষ করে মাত্র গ্রুপে কাজ শুরু করেছে। আর আমাদের বড় মেয়ে ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশনের (আইএলও) হেডকোয়ার্টার (সদর দপ্তর) সুইজারল্যান্ডে চাকরি করে।
প্রশ্ন : নির্বাচিত হলে প্রথম কোন কাজে হাত দেবেন বলে ভাবছেন?
আনিসুল হক : পরিচ্ছন্ন-সবুজ-মানবিক-আলোকিত ঢাকা আমার অগ্রাধিকার। তবে সবার আগে যেটা করতে হবে, তা হলো মশার উপদ্রব থেকে নাগরিকদের রক্ষা করতে হবে। পর্যায়ক্রমে যানজট দূরীকরণসহ অন্যান্য বড় কাজে হাত দেব।
প্রশ্ন : রাজধানীর গণপরিবহন, যানজট নিয়ে বিশেষ কোনো ভাবনা আছে কি?
আনিসুল হক : অবশ্যই গণপরিবহন আমাদের অগ্রাধিকার। গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে ইশতেহারে আমরা বিস্তারিত বলেছি। আমাদের স্লোগান হচ্ছে সচল ঢাকা। যানজট নিরসনের কাজ মূলত ডিএমপির। কিন্তু আমরা তাদের সহযোগিতা করতে পারি। কমিউনিটি পুলিশ বাড়াতে পারি। নাগরিকদের একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসতে পারি। সবাই মিলে উদ্যোগী হলে অবশ্যই সুফল মিলবে। আমি নগরবাসীকে অনুরোধ জানাই, আপনারা টেবিল ঘড়ি মার্কায় ভোট দিন। আমরা সবাই মিলে যে ঢাকার স্বপ্ন দেখি তাকে জয়যুক্ত করুন।
প্রশ্ন : নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে আগে আপনার বাবাকে নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা কর্মকর্তার বক্তব্য নিয়ে কিছু কথাবার্তা হয়েছে। পরে দুঃখ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। সে বিষয়ে কি কিছু বলার আছে?
আনিসুল হক : আমার বাবা মো. শরীফুল হক একজন মুক্তিযোদ্ধা। মুজিবনগর সরকারের অধীনে তিনি মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তার পুরস্কারস্বরূপ বঙ্গবন্ধু সরকার তাঁকে দুই বছরের সিনিয়রিটি দিয়েছিল। আমাকে হেয় করতেই কোনো কোনো গণমাধ্যম এমন ভুল খবর প্রকাশ করে বলে আমার ধারণা।
এমন দুঃসময় অতীতে আর কখনো আসেনি বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার। পর্যবেক্ষক মহল বলছে, ত্রিশঙ্কু অবস্থার মুখোমুখি খালেদা জিয়া। একদিকে নিজের ও পরিবার-পরিজনদের মামলায়-নির্বাসনে বিপর্যস্ত জীবন অন্যদিকে দলের নেতাকর্মীরা জেল মামলা ও পলাতক জীবনের কঠিন পরিস্থিতির মুখে। বিএনপির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত। সব মিলিয়েই এমন দুঃসময় আর আসেনি তার। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও বিএনপি পরিবারের অভিভাবক প্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমদ মানবকণ্ঠকে বলেছেন, এ ধরনের খারাপ সময় মাঝেমধ্যে রাজনীতিতে আসে। অতীতেও অনেকের জীবনে এসেছে। বেগম খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা রয়েছে এবং ব্যাপক জনসমর্থনও আছে। এই জনসমর্থনকে অবলম্বন করে তিনি তার আদর্শিক বিশ্বাসের জায়গা থেকে আত্মবিশ্বাস নিয়ে পরিস্থিতি উত্তরণ করতে পারবেন।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বিএনপি নেত্রীর জীবনে প্রথম দুঃসময় আছে ৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়। সেই যুদ্ধে তার স্বামী তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান রণাঙ্গন থেকে বীরউত্তম উপাধি নিয়ে বিজয়ীর বেশে ফিরে আসার মধ্য দিয়ে শ্বাসরুদ্ধকর বন্দিত্বের অবসান ঘটে। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবার-পরিজনসহ রাতের অন্ধকারে নৃশংসভাবে হত্যার মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনীতে ক্যু পাল্টা ক্যুর ঘটনাপ্রবাহে জিয়াউর রহমান ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের নায়ক জেনারেল খালেদ মোশাররফ বীরউত্তমের লোকজন দ্বারা বন্দি হন। সেই ৩-৪ দিনের শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থার অবসান ঘটেছিল ৭ নভেম্বরের মধ্য দিয়ে তার স্বামীর হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ফিরে আসার মাধ্যমে। সেনা শাসক থেকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে বিএনপির জš§ এবং তার পক্ষে জনগণের একটি অংশ সংগঠিত হলেও ৮১ সালে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউজে কতিপয় বিপথগামী সেনা সদস্যের হাতে নিহত হলে খালেদা জিয়াকে অকাল বৈধ্যব্যের ভাগ্যবরণ করতে হয়।
৮২ সালে সেনাশাসক এরশাদের মার্শাল ল’ জারির মধ্য দিয়ে কোন্দলে জর্জরিত বিএনপি সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। ৮৩ সালে বেগম খালেদা জিয়াকে বিএনপির হাল ধরতে হয়। গৃহবধূ থেকে রাজপথে নামেন তিনি। কিন্তু বিএনপির রথিমহারথীরা দলকে ভেঙে সেনাশাসক এরশাদের হেরেমে চলে যান। সেই সময়ে বিএনপিকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু বয়স, সময় এবং সাহসিকতার কারণে রাজপথের সংগ্রামে তারুণ্যনির্ভর শক্তিশালী হয়ে ওঠা ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল খালেদা জিয়াকে সামনের দিকে নিয়ে যায়। নয় বছরের আন্দোলন-সংগ্রাম শেষে ‘৯০-এর সেনাশাসনের অবসান ঘটলে ‘৯১ সালের অবাধ নির্বাচনে সবাইকে চমকে দিয়ে গণরায়ে বিএনপিকে নিয়ে ক্ষমতায় অভিষিক্ত হন খালেদা জিয়া। এরশাদের জাতীয় পার্টির ওপর স্টিম রোলার চালানোর অংশ ছাড়া গণতন্ত্রের সেই নবযাত্রায় তার শাসনামলকে প্রশংসার চোখে দেখেছেন সবাই। রাষ্ট্র পরিচালনায় অনভিজ্ঞ খালেদা সফল হওয়ার কারণে গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিলেও ৯৬ সালের নির্বাচনে ১১৬ আসন নিয়ে সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হন।
পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, ইতিহাসের সত্য হচ্ছে সেই সময়ই সংসদে স্বাধীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিরোধী দল ছিল। ২০০১ সালের নির্বাচনে চারদলীয় জোট নিয়ে দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এলেও শাসনামল আগের বেলার মতো আর হয়নি। মধ্যপন্থি বিএনপি চরিত্র হারায় উগ্রডানপন্থি জামায়াতীদের সঙ্গে নিয়ে। একইসঙ্গে দলে একদল মন্ত্রী, নেতা, এমপির সীমাহীন দুর্নীতি ও উন্নাসিকতা অন্যদিকে তার নির্বাচনকালীন অফিস হাওয়া ভবন ঘিরে পুত্র তারেক রহমানকে সামনে রেখে ক্ষমতার প্যারালাল সুপার পাওয়ার দাঁড়িয়ে যাওয়ায় একের পর এক ভুলের পথে হাঁটে সরকার। একদিকে বিরোধী দল দমন অন্যদিকে সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ ও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বিএনপিকে জনবিচ্ছিন্ন করতে থাকে।
এই শাসনামলে সবচেয়ে নির্মম বিভক্তি ও অবিশ্বাসের ক্ষত তৈরি হয় ২০০৪ সালের একুশ আগস্টের গ্রেনেড হামলা ঘিরে। বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে শান্তি মিছিল পূর্ব সমাবেশে আজকের প্রধানমন্ত্রী ও তৎকালীন সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাসহ তার রাজনৈতিক সহকর্মীদের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর গ্রেনেড হামলায় উড়িয়ে দেয়ার কাপুরুষোচিত নৃশংসতা ঘটানো হয়। সেই ঘটনায় রক্তের বন্যায় ভাসে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ। অলৌকিকভাবে বেঁচে যান শেখ হাসিনা। আইভি রহমানসহ ২২ জন নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ প্রাণ হারায়। শত শত মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করে। গোটা দেশ স্তম্ভিত হয়ে যায়। বিশ্বনেতারা নিন্দার ঝড় তোলেন। সেই শাসনামলে আওয়ামী লীগের কর্মীদের বিভিন্ন এলাকায় ঘরছাড়া করা হয়।
২০০৬ সালের জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ২৮ অক্টোবর তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের আগেই গণরোষের মুখে পড়ে বিএনপি। সারাদেশে প্রতিশোধের আগুনে জ্বলে ওঠে আওয়ামী লীগ। সেই শাসনামলে আরেকটি বড় ধরনের ঘটনা ঘটেছিল ১০ ট্রাক অস্ত্র আটক আর একইদিনে সারাদেশে বোমা বিস্ফোরণ ছাড়াও জেএমবির বাংলাভাইদের উত্থান। এই দায়বদ্ধতা থেকে, মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন থেকে বিএনপি সরকার ও তার প্রভাবশালী লোকজন নিজের সরাতে পারেনি। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ হাইকমান্ড নিশ্চিত হয়ে যায় শেখ হাসিনার বিরোধী দলের রাজনীতি করার পথও রুদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপির ক্ষমতায় যাওয়ার পথ আগলে দাঁড়ায় ওয়ান ইলেভেন। ওয়ান ইলেভেনের ঘটনাপ্রবাহ শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও তার নেত্রী শেখ হাসিনার অনুকূলে চলে গেলেও বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া, তার পরিবার ও নেতাদের জন্য অভিশাপের ইতিহাস রচনা করে যায়। এইখান থেকেই নিজে ও সন্তানসহ নেতারা মামলায়ই আটকাননি পুত্রদের নির্বাসিত জীবনে যেতে হয়েছে।
২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগজোট ক্ষমতায় এসে বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের বিচারসহ যুদ্ধাপরাধের বিচার সামনে নিয়ে আসে। অন্যদিকে বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে যেমন সম্পর্ক ছিন্ন করে জনগণনির্ভর মধ্যপন্থি নীতি নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। তেমনি সরকারও তাকে দম ফেলার ফুরসত দেয়নি। সেই সরকারের মেয়াদ শেষে শেয়ার কেলেঙ্কারি, ব্যাংক স্ক্যান্ডাল, গুম, খুন, পদ্মাসেতুসহ নানা দুর্নীতি অভিযোগে মানুষের ভেতরে চরম অসন্তোষ দানা বাঁধে। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনগুলোতে বিএনপির প্রার্থীদের জয়জয়কার জানান দেয় মানুষ বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে। কিন্তু ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সঙ্গে ঢাকায় শিবিরের হরতালের জন্য বেগম খালেদা জিয়া দেখা করতে না যাওয়া, দক্ষিণপন্থিদের সঙ্গে নিবিড়তা আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক দুনিয়ায় দলটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সর্বশেষ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি জনসমর্থন থাকার পরও বিএনপির নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করা আওয়ামী লীগকে ওয়াকওভার দিয়ে দেয়। নির্বাচন প্রতিরোধের নামে সহিংস রাজনীতি দেশের অর্থনীতির ওপর আঘাত হানে। বিএনপিকে ফলাফল না নিয়েই সমালোচনার ঝড়ের মুখে রাজপথ থেকে সরে যেতে হয়। তারপর এক বছরের বিরতি দিয়ে দেশব্যাপী খালেদা জিয়ার জনসভাগুলোতে লোকসমাগম উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছিল। কিন্তু দলের শীর্ষ নেতৃত্ব বা মাঠকর্মীদের মতামত না নিয়ে আকস্মিক গত ৫ জানুয়ারি থেকে লাগাতার তিন মাসের হরতাল-অবরোধ আন্দোলন সংগ্রামের রাজনীতিতে বিএনপিকে ব্যর্থতার তিলকই পরায়নি, হটকারী পেট্রলবোমার সহিংস কর্মসূচি দেশ-বিদেশে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ইস্যুতে তিন মাস পর বেগম খালেদা জিয়া আদালতে জামিন নিয়ে ঘরে ফিরে গেলেও মাঝখানে হারিয়েছেন ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে (নির্বাসিত অবস্থায় মালয়েশিয়ায় হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুবরণ করেন), মানসিকভাবে বিপর্যস্ত খালেদা জিয়াকে দেখতে হয়েছে দলের অনেক নেতাদের নিরাপদ আশ্রয় নিতে বিদেশ চলে যেতে। কাউকে গৃহশোভা হয়ে বসে থাকতে। অথবা কারাগার বা ফেরারি জীবন নিতে। একইসঙ্গে সারাদেশে বিএনপি এখন মামলার জালে আটকা। ইতিমধ্যে দলের যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদের এক মাস ধরে খবরই মিলছে না। তিনি জীবিত না মৃত তাও কেউ বলতে পারছেন না।
এমন বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে শারীরিক অসুস্থতার সঙ্গে মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে প্রার্থী দিতে হয়েছে। অন্য সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনগুলোতে বিএনপির প্রার্থী ও সমর্থকরা যেভাবে মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট লড়াইয়ে নেমেছিলেন তেমনি বিজয়ের বরমাল্যও পরেছিলেন। এই বার তিন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপি নেত্রী না পেরেছেন মনের মতো প্রার্থী দিতে না পারছেন প্রার্থী ও নেতাকর্মীরা ভোটে নামতে।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ভোটের ফলাফল কি হয় তা এখন নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে প্রচারণা সুবিধায় শাসক দল বিএনপির বিপর্যয়ের কারণে অ্যারাবিয়ান ব্ল্যাক হর্সের মতো দৌড়াচ্ছেন। অনেকের মতে বিএনপিতে অনেক প্রাজ্ঞ অভিজ্ঞ এবং সমাজে প্রভাব বিস্তারকারী ব্যক্তিবর্গের নাম রয়েছে নেতৃত্বের তালিকায়। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা তাদের হাতে নেই। তাদের মতামতের চেয়ে অদৃশ্য শক্তির গায়েবি নির্দেশিই বিএনপির নেত্রীকে কবুল করতে হচ্ছে। আর এখানে সরকারের দমন নীতির পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বিএনপি উঠে দাঁড়াতে পারছে না। সমর্থন থাকলেও রাজনীতির ময়দানে বিএনপির নেত্রীকে দেখতে হচ্ছে তার দল আন্দোলনে ব্যর্থই হচ্ছে না, নেতাকর্মীরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। পর্যবেক্ষকের ভাষায় বিএনপির থিংক ট্যাংকাররা মনে করেন একদিকে মামলা মোকাবিলা অন্যদিকে দলকে সংগঠিত রেখে জনগণনির্ভর শক্তি সঞ্চয়ের জন্য সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে অবলম্বন করেই বিএনপি নেত্রীকে আবারো মানুষের কাছেই যেতে হবে। বিএনপি যত না আন্দোলনের দল তার চেয়ে বেশি নির্বাচন উপযোগী দল। তাকে যেমন আইনি লড়াইয়ে অবিচল থাকতে হবে তেমনি নেতাকর্মীদের আইনি প্রক্রিয়ায় কারামুক্তকরণের উদ্যোগ নিতে হবে। বিএনপির একজন উপদেষ্টার ভাষায়, আত্মবিশ্বাসী খালেদা জিয়াকেই জনসমর্থনের ওপর আস্থা রেখে সবার মতামতে এই ক্রান্তিকাল থেকে বেরুবার পথটি নিতে হবে। তারাও মনে করেন একুশের গ্রেনেড হামলা আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপির চির বৈরিতার ক্ষত সৃষ্টি করেছে। ৭৫-এর বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা কি ছিল এই প্রশ্নে যত না দুই দলের তিক্ততা তার চেয়ে বেশি হয়েছে ১৫ আগস্ট জাতীয় শোকদিবসে খালেদা জিয়ার জš§দিনের কেক কাটা বেশি করেছে। একুশের গ্রেনেড হামলা তা স্থায়ী দগদগে ঘায়ে পরিণত করেছে।
বর্তমান সরকারে যাদের মন্ত্রী করা হয়েছে, তাদের বেশির ভাগই কাজের চেয়ে কথায় পটু। কেউ সভা-সমিতিতে ঘুমিয়ে পড়েন। কেউ মঞ্চে বসেই গান গেয়ে শোনান। খিস্তিখেউড় মার্কা কথা কারো কারো মুখের ভাষা। এ রকম একদল মন্ত্রী নিয়ে কিভাবে স্বস্তি পান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা? আর এদের প্রিয় স্বভাব ২০ দলীয় জোটনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে শ্লীল-অশ্লীলের সীমানা ডিঙিয়ে গালিগালাজ করা। প্রধানমন্ত্রী যদি হালুম করেন, তাহলে এসব মন্ত্রী ঘাড় মটকে যেন খতম করতে চান। প্রথম দিকে সবকিছুই খুব জলবৎতরলং মনে হচ্ছিল। কিন্তু বিষয়গুলো যে পানির মতো পরিষ্কার নয়, সেটা বুঝতে সরকারের সময় লাগল বৈকি।
এ সরকারের শুরুর দিকে সরকারের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা এমন এক ভাব শুরু করলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলো, জাতিসঙ্ঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি সবকিছুই একেবারে তাদের পদতলে লুটোপুটি খাবে। তাদের ভাষাও ছিল তেমনই। আর ঘোরের মধ্যে থাকা দলের সাধারণ সম্পাদক ও ভারতের জামাই সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম তো মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে তার বাসার কাজের বুয়া মর্জিনার সাথেই তুলনা করে বসলেন। মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেসাইকে ‘চার আনাও নয়, দুই আনার মন্ত্রী’ বলে টিটকারি করলেন। এর পরিণতি কী মারাত্মক হতে পারে, এ বিষয়ে সৈয়দ আশরাফের কোনো ধারণা আছে বলে মনে হয় না। তার এই বক্তব্য কাণ্ডজ্ঞানহীন, শিষ্টাচারবহির্ভূত, অভব্য এবং বাংলাদেশের আতিথেয়তার সংস্কৃতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
ভারত কংগ্রেসের মনমোহন সিং সরকার তাদের এক নারী কূটনীতিকের দেহ তল্লাশি নিয়ে একেবারে তুলকালাম কাণ্ড বাধিয়ে দিয়েছিল। তারা নয়াদিল্লিতে মার্কিন দূতাবাসের নিরাপত্তা বেষ্টনী বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন। প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন কূটনীতিকদের নিরাপত্তাও। এ জন্য কংগ্রেস ও মনমোহন সিংকে চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। অথচ বলা হয়ে থাকে, বিশ্বব্যাংকের সাবেক এই কর্মকর্তা মনমোহন সিং মার্কিন আশীর্বাদেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন এবং বহাল ছিলেন। গত বছরের নির্বাচনে বিজেপির নরেন্দ্র মোদি সরকারের ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পেছনে সে ফ্যাক্টরও কাজ করেছে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন।
এই পটভূমিতে ইয়েমেনে সৌদি ও মার্কিন হামলার বিষয়টি বাংলাদেশকে মনে রাখতে হবে। বাংলাদেশের সরকার অদূরদর্শিতাবশত এটা ভাবতে পারে যে, কোথায় ইয়েমেন আর কোথায় বাংলাদেশ। ইয়েমেনে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোটের বিমানবাহিনী বোমাবর্ষণ করছে। তাতে শত শত নিরীহ সাধারণ মানুষও নিহত হচ্ছে। ইয়েমেনে এই সামরিক হামলার পক্ষে বাংলাদেশ সরকার তাড়াতাড়ি সমর্থন দিয়ে বসেছে। তারা হয়তো দেশের মানুষের জন্য কী বড় বিপদ ডেকে আনছে। সেটি উপলব্ধি করার ক্ষমতা বর্তমান সরকারের নেই।
২০১১ সালে আবর-বসন্তের সময় মার্কিন সহায়তায় ক্ষমতায় আসেন মনসুর হাদি। তার আগে প্রেসিডেন্ট ছিলেন আবদুল্লাহ সালেহ। সাম্প্রতিক বিদ্রোহে মনসুর হাদি উৎখাত হয়ে সৌদি আরবে আশ্রয় নিয়েছেন। ইয়েমেনে এমনিতেই দীর্ঘ দিন সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। এর মধ্যে যদি বাইরের সামরিক হস্তক্ষেপ অধিক মাত্রায় ঘটে তাহলে ইয়েমেনকে কেন্দ্র করে এক বৈশ্বিক বিপর্যয় সৃষ্টির আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। ইয়েমেনের বাব এল-মানদেবের সরু সমুদ্রপথ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে রফতানি হয়ে থাকে। এ দিকে প্রথম সৌদি বিমান হামলার পর ব্যারেলপ্রতি জ্বালানি তেলের দাম ছয় শতাংশ বেড়েছে।
লিবিয়া, ইরাক কিংবা সিরিয়ার সঙ্ঘাত এবং সেখানে বিদেশী হস্তক্ষেপের প্রকৃতি আর ইয়েমেনের পরিস্থিতি এক নয়। ইয়েমেনে হাউছি বিদ্রোহীদের সমর্থন দিচ্ছে ইয়েমেনি সেনাবাহিনীর এক বিরাট অংশ। তারা ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ সালেহর অনুগত। সালেহ প্রায় ৩০ বছর ধরে ইয়েমেন শাসন করছিলেন। তিনি যে ভালো শাসক ছিলেন, এমন নয়। এ দিকে জানা গেছে, আল কায়েদা এবং ইসলামিক স্টেটস (আইএস) হাউছিদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। কারণ তাদের মতে, এই যুদ্ধ সাম্র্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে।
ইয়েমেনের দুই কোটি ৪০ লাখ লোকের মধ্যে ৪৫ শতাংশ শিয়া। কয়েক মাস আগে মনসুর হাদিকে বিদ্রোহীরা ক্ষমতাচ্যুত করলে তিনি রাজধানী সানা ছেড়ে সৌদি আরবে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন। তার আগে মনসুর হাদি ইয়েমেনের বন্দরনগরী এডেন থেকে যুদ্ধ পরিচালনার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু বিদ্রোহীদের আক্রমণের মুখে গত ২৫ মার্চ তিনি সৌদি আরব পালিয়ে গেলেন। দেশটির উত্তরে সৌদি আরবসংলগ্ন সুন্নি প্রধান এলাকাও হাউছি বিদ্রোহীরা তাদের দখলে নিয়ে নিয়েছে। গত সপ্তাহে তারা ইয়েমেনের তৃতীয় বৃহত্তম শহর তায়েজও দখল করে নেয় এবং প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা দখলে নিচ্ছে। এর ফলে আরো মারাত্মক ঘটনার আবির্ভাব হয়। তারা অপর একটি শহর লাজ থেকে হাদির প্রতিরক্ষামন্ত্রী মেজর জেনারেল মাহমুদ আল সুবাইহিকে আটক করে। পরিস্থিতি এতটাই বিপজ্জনক যে, নিকটবর্তী আন্নাদ বিমান ঘাঁটি মার্কিন সেনা কর্মকর্তারা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়।
এই সঙ্ঘাতে য্ক্তুরাষ্ট্র ছাড়াও সব আঞ্চলিক শক্তি ক্রমেই জড়িয়ে পড়ছে। মিসর, জর্ডান, সুদান, মরক্কো, কুয়েত, সংযুক্ত আবর আমিরাত, কাতার ও বাহরাইনও ইয়েমেনের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে। পাকিস্তান সৌদি আরবের দীর্ঘকালের মিত্র হলেও এখন পর্যন্ত তারা এ যুদ্ধে অংশ নেয়ার কোনো ঘোষণা দেয়নি। বরং নিরপেক্ষতার ঘোষণা দিয়ে বলেছে, আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই এ সমস্যার সমাধান হওয়া উচিত। একজন মিসরীয় সেনা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিমান হামলার পর স্থল হামলা শুরু করা হবে। তবে ইরান বলেছে, ইয়েমেনে সৌদি আরবের বিমান হামলার সিদ্ধান্ত একটি বিপজ্জনক পদক্ষেপ।
এর আগে প্রেসিডেন্ট হাদি অভিযোগ করেন, লেবাননের হিজবুল্লাহ বাহিনী হাউছিদের সহায়তা করছে। ইরানও ওদের সহায়তা করছে বলে পশ্চিমা শক্তিগুলো যে অভিযোগ করে আসছে ইরান বারবার তা অস্বীকার করছে। সৌদি প্রবাসী হাদি সরকার অভিযোগ করছে, আল কায়েদা এবং আইএস হাউছিদের সমর্থন দিচ্ছে। এ দিকে ২০০৭ সাল থেকে আরব উপদ্বীপে আল কায়েদা হামলা প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি ড্রোন যুদ্ধের অংশ হিসেবে ইয়েমেনে ৫০ কোটি ডলার মূল্যের সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। লিবিয়া ও সিরিয়ায় বৈদেশিক সামরিক হস্তক্ষেপের পর সেখানে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। সেই তালিকায় যুক্ত হতে যাচ্ছে ইয়েমেন।
বিমান হামলায় সৌদি আরব নিয়োজিত করেছে ১০০ যুদ্ধ বিমান। এ ছাড়া স্থল ও নৌবাহিনীর দেড় লাখ সৈন্য নিয়োগ করা হয়েছে। এর ফলে ইয়েমেন শুধু নয়, সৌদি আরবেও সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কা বেড়ে গেছে। সর্বশেষ, গত ২০ মার্চ সানার একটি মসজিদে আত্মঘাতী বোমা হামলায় ১০০ জন নিহত হয়েছেন, আহত হন ২৫০ জন। আইএস চরমপন্থীরা এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। ২০০০ সালেও আল কায়েদার গেরিলারা একটি মার্কিন সামরিক যুদ্ধ জাহাজে আত্মঘাতী বোমা হামলা চালালে ১৭ জন মার্কিন সৈন্য নিহত হয়। ২০০২ সালে আল কায়েদা বাহিনী এডেন উপসাগরে একটি ফরাসি ট্যাংকারের ওপর হামলা চালায়।
এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ওই এলাকায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর রণপ্রস্তুতির আশঙ্কা বেড়ে গেছে। বিদ্রোহীদের প্রতি ইরানের সমর্থন রয়েছে। ফলে ইয়েমেনের সীমান্তবর্তী সৌদি আরব উদ্বিগ্ন। তাই তারা বিদ্রোহীদের ওপর সামরিক হামলা চালাচ্ছে। সন্দেহ নেই, যুক্তরাষ্ট্র এই সঙ্ঘাতে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হয়েছে এডেন বন্দর ঘেঁষে সরু নৌপথটি নিরাপদ রাখতে। এটি ইউরোপ থেকে এশিয়ার পথে লোহিত সাগরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। শুধু জ্বালানি তেলই নয়, অন্য সব মূল্যবান পণ্য ও সুয়েজ খাল হয়ে এই পথেই এশিয়ার বাজারগুলোতে আনা-নেয়া হয়।
যা হোক, সৌদি আরবের সাথে ইয়েমেনের সম্পর্ক দীর্ঘকালের, গত শতাব্দীর সত্তরের দশক থেকে। অতীতে বছরের পর বছর গৃহযুদ্ধের পর সৌদি আরব ও মিসরের উদ্যোগে উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেন একটি ইয়েমেন রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট সালেহ দেশটিকে ঐক্যবদ্ধ করেন। কিন্তু ২০১১ সালে আরব বসন্তে সালেহর অপসারণের পর ইয়েমেনে আবার প্রচণ্ড গোলযোগ শুরু হয়। তখন থেকেই হাউছি বিদ্রোহীরা হাদি সমর্থক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে অধিকতর রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের জন্য। তারা বলতে শুরু করে যে, ইয়েমেনের জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে এবং হাউছি বা জায়েদি গোত্রের স্বার্থ না দেখেই সরকার সৌদি আরবের সাথে গাঁটছড়া বেঁধেছে।
মার্কিন থিংকট্যাংক আটলান্টিক কাউন্সিলের জে পিটারফার্ম সম্প্রতি বলেছেন, ‘ইয়েমেনের পতন আসন্ন। আর বিদ্রোহীদের কারণে বাব এল-মানদেবের উভয় পাশেই এবং লোহিত সাগরে ইরানের প্রভাব বাড়বে। ইতোমধ্যেই ইরানি নৌবাহিনীর জাহাজ নিয়মিত এই এলাকায় চলাফেরা করতে শুরু করেছে।’ তিনি বলেন, ‘এখন ইরান যদি এ ক্ষেত্রে সফল হয় এবং হাউছি বিদ্রোহীদের দখলকৃত কোনো ঘাঁটি ব্যবহার করতে পারে, তাহলে এই উপ-আঞ্চলিক এলাকায় শক্তির ভারসাম্যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে। এডেন এবং লোহিত সাগরজুড়ে ১৯০০ কিলোমিটারের তীরভূমি আছে। এই এলাকার নৌপথ নিরাপদ রাখতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ওই পথে নিয়মিত টহল দিয়ে থাকে।’
ওই অঞ্চলের মার্কিন সেনাদলের প্রধান গত ২৬ মার্চ বলেছেন, বাব এল-মানদেব চ্যানেল খোলা রাখার জন্য তারা উপসাগর ও ইউরোপীয় অংশীদারদের সাথে একযোগে কাজ করে যাবেন। এখানে সঙ্ঘাতের ফলে এই চ্যানেল বন্ধ হয়ে গেলে নৌপথটি হয়ে যাবে ‘অশ্র“র প্রবেশপথ’। তাতে বন্ধ হবে সুয়েজ খাল। বন্ধ হবে দক্ষিণ ইউরোপে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল সরবরাহ। আর এই পথে পণ্যবাহী জাহাজ চলতে না পারলে তাকে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ আফ্রিকার নিচ দিয়ে ঘুরে যেতে হবে। এতে একটি জাহাজের গন্তব্যে পৌঁছতে কমপক্ষে ৪০ দিন বেশি সময় লাগবে।
এ রকম একটি পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের নিরপেক্ষ থাকাই অধিকতর যৌক্তিক ছিল। কিন্তু ভিন্ন অবস্থান নেয়ায় বাংলাদেশ এখন বিরাট হুমকির মুখে পড়তে পারে।
সাংবাদিক ও সাহিত্যিক
বিষয়টি নিয়ে লিখে কোনো লাভ নেই। কারণ এর কোনো প্রতিকার বর্তমান শাসক শ্রেণী ও তাদের সরকারের আমলে হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কিš‘ তবু লিখতে হয়, কারণ এই মানববিরোধী, সমাজবিরোধী কারবারের সমালোচনা ও প্রতিবাদ দরকার। অপরাধ প্রতিবাদহীন হলে তার দ্বারা অপরাধ বৃদ্ধির শর্তই তৈরি হয়।
বাংলাদেশে এখন কতভাবে যে নিরীহ মানুষের নির্মম মৃত্যু হ”েছ তার হিসাব নেই। এ দেশ এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে অস্বাভাবিক মৃত্যুর এক আরণ্যক প্রদেশ। এখানে নিয়মকানুন আছে কাগজপত্রে; কিš‘ এসব নিয়মের কোনো মান্যতা নেই। কারণ নিয়ম মান্যতার তদারকি করা যাদের দায়িত্ব, যাদের জনগণ নিজের অর্থে এ কাজ করার জন্য প্রতিপালন করেন, তারা নিজেরাই এ আইন অমান্যতার পুরোভাগে! এদেরকে তাদের অপরাধের জন্য ধরাছোঁয়ার উপায় নেই। শুধু তাই নয়, তাদের অপরাধ যাতে আইনের আওতার বাইরে থাকে তার জন্য তারা সরকার ও আদালতের কাছে দাবি জানায়! পুলিশ হেফাজতে নির্যাতন এবং মৃত্যু থেকে দায়মুক্ত হওয়ার জন্য পুলিশের দাবির থেকে এ ক্ষেত্রে লোমহর্ষক ব্যাপার আর কী হতে পারে? কিš‘ লক্ষ্য করার বিষয় যে, এ নিয়ে সমাজে, সংবাদপত্রে, রাজনৈতিক মহলে, এমনকি ‘প্রগতিশীল’ বুদ্ধিজীবী মহলেও কোনো প্রয়োজনীয় আলোচনা, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ নেই! সবকিছুই এখানে গা-সহা হয়ে গেছে। একটা জাতির জন্য এর থেকে বিপজ্জনক ও ট্র্যাজিক ব্যাপার আর কী হতে পারে?
পুলিশ, র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ধর্মান্ধ ক্রিমিনাল জঙ্গি বাহিনী এবং ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি লাভ করা সাধারণ অপরাধীদের হাতে মর্মান্তিক মৃত্যু এখন বাংলাদেশে পরিণত হয়েছে এক নিয়মিত ব্যাপারে। এর মধ্যে ধর্মান্ধদের হাতে নিহতদের নিয়ে কিছু হইচই হলেও তার কোনো প্রতিকার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। এ ক্ষেত্রেও পুলিশ ও সরকারি প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা তাদের অনেক মৌখিক বাগাড়ম্বর সত্ত্বেও এক বাস্তব ব্যাপার।
এ পরি¯ি’তিতে অন্য যেসব মৃত্যুর ঘটনা প্রত্যেক দিনই ঘটছে তার অন্যতম হল সড়ক দুর্ঘটনা। এর রিপোর্ট প্রত্যেক দিনই প্রকাশিত হয় এবং তা সংবাদপত্রের পাতা ‘আলোকিত’ করে। কিš‘ সংবাদপত্রগুলোও এ নিয়ে কোনো হইচই ও প্রতিকার দাবি করে না। অব¯’া দেখে মনে হয়, বাংলাদেশে যাতায়াত ব্যব¯’ার এটা এক অবশ্যম্ভাবী দিক! মাত্র কয়েকদিন আগে এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে, আহতদের সংখ্যা অনেক। কোনো বুদ্ধিজীবীর অস্বাভাবিক মৃত্যু হলে সঙ্গত কারণেই একটা হইচই হয়। কিš‘ নিরপরাধী ও নিরীহ যাত্রীদের মৃত্যুর রিপোর্ট সংবাদপত্রে ও রেডিও-টেলিভিশনে প্রকাশিত হওয়ার বাইরে আর কিছুই হয় না। এর দ্বারা বাংলাদেশে কারও বিবেক ধাক্কা খায় না, এর প্রতিকারের তুল্য দাবি ও আওয়াজ উঠতে দেখা যায় না! ২৫ জনের মৃত্যুর ঘটনা যেভাবে ঘটেছে তার রিপোর্ট থেকে দেখা যায়, গাড়ির চালক অন্য একটি বাসের আগে যাওয়ার জন্য রেষারেষি করে বেপরোয়া গাড়ি চালানোর ফলেই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। যারা বাসে বা মিনিবাসে যাতায়াত করেন, বিশেষত দূরপাল্লায়, তারা জানেন কীভাবে এসব গাড়ির ড্রাইভাররা প্রায় ব্যতিক্রমহীনভাবে এ কাজ করে। এরা অবশ্যই অপরাধী এবং গাড়ি চালানোর ব্যাপারে এদের কোনো প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নেই। এদের অনেকেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ঘুষ দিয়ে এবং তাদের ওপর প্রভাব খাটিয়ে নিজেদের ড্রাইভিং লাইসেন্স পেয়ে থাকে। এ ব্যাপারে গাড়ির মালিকরাও এদের সহযোগী। অনেক ক্ষেত্রে গাড়ির হেলপারদের এভাবে লাইসেন্স পাইয়ে দিয়ে গাড়ি চালানোর কাজে নিযুক্ত করা হয় অল্প মজুরিতে। দুর্ঘটনা হলে মালিকদের কিছু যায় আসে না। কারণ তাদের গাড়ির ইন্স্যুরেন্স করা থাকে। দুর্ঘটনা হলে তারা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি থেকে ক্ষতিপূরণ পেয়ে যায়!
কিš‘ যেসব যাত্রী দুর্ঘটনায় নিহত হন, তাদের কী হয়? পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও এ ধরনের দুর্ঘটনাসহ অন্যান্য দুর্ঘটনার জন্য ক্ষতিপূরণের ব্যব¯’া আছে। কিš‘ বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো যানে দুর্ঘটনার জন্য নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার কোনো ব্যব¯’া নেই। ব্যব¯’া তো নেই-ই, এমনকি তার চিন্তা পর্যন্ত নেই!! অথচ এভাবে যারা নিহত হন, তাদের অধিকাংশই খুব গরিব। এমন নিন্মবিত্ত ও মধ্যবিত্তের সংখ্যাও কম নয় যাদের পরিবারও আর্থিক দিক দিয়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব পরিবার চরমভাবে বিপর্যস্ত হয়। অথচ এদের দিকে তাকানোর কেউ নেই। শুধু সড়ক দুর্ঘটনাই নয়, জলপথে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা কম নয়। লঞ্চডুবির ঘটনাও প্রায়ই ঘটে। অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই এর প্রধান কারণ। কিš‘ নৌপরিবহনমন্ত্রীর এতে কিছু যায় আসে না। অশ্লীল ও বাগাড়ম্বরপূর্ণ কথাবার্তায় ‘অভ্যস্ত’ মন্ত্রী এ পর্যন্ত দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন এমন কোনো উদাহরণ নেই। কাজেই জলপথে দুর্ঘটনা রোধ এবং নিহত-আহতদের ক্ষতিপূরণের বিষয়ে তার কোনো আগ্রহ থাকার কথা নয়। তারা তথাকথিত জনপ্রতিনিধি হওয়া সত্ত্বেও জনগণের প্রতি তাদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। সড়ক পরিবহনমন্ত্রী এক মস্ত নীতিবাক্য বিস্তারকারী। কিš‘ তারও একই অব¯’া। তিনি ঘন ঘন বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করে কাজ দেখান; কিš‘ তার কাজের কোনো সুফল দেখা যায় না। প্রকৃতপক্ষে বাগাড়ম্বর এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে এসব মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্যসহ সরকারি ঘরানার বুদ্ধিজীবীদের সংস্কৃতির এক অবি”েছদ্য অংশ।
ক্ষতিপূরণের কথায় ফিরে গিয়ে বলা দরকার যে, এর কোনো ব্যব¯’া না থাকায় সরকার ও পরিবহন মালিকরা আরও বেপরোয়া থাকে। এরশাদের শাসন আমলে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের জন্য ক্ষতিপূরণের কথা বলা হয়। সরকারিভাবে তার নিয়মকানুনও ঘোষণা করা হয়। কিš‘ তা সত্ত্বেও সে সময় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত একজনের পরিবারও কোনো ক্ষতিপূরণ পায়নি। ১৯৯১ সালে নির্বাচিত সরকারের আমলেও এ অব¯’া অপরিবর্তিত থাকে। ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক কবীর কাসেম বরিশাল থেকে পাবনা যাওয়ার পথে এক বাস দুর্ঘটনায় মার্ত্মাকভাবে আহত হন। কয়েকদিন পর বরিশাল মেডিকেল হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। এর ফলে তার পরিবার পথে বসে। তিনি বরিশালে জনপ্রিয় ছিলেন। তার পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য সেখানে আন্দোলন হয়। সড়ক অবরোধ হয়। মালিকপক্ষ তাদের অফিসে তালা ঝুলিয়ে পালিয়ে যায়। কিš‘ ক্ষতিপূরণের ব্যাপারে সরকার কোনো পদক্ষেপই নেয় না! হইচই কমে যাওয়ার পর মালিকপক্ষ অফিসের তালা খুলে আবার তাদের বাস চালু করে!! এদিক দিয়ে পরি¯ি’তি আজ পর্যন্ত অপরিবর্তিত আছে।
বাংলাদেশে এখন ¯’লপথ ও জলপথে যাতায়াতকালীন দুর্ঘটনায় বছরে অন্তত পাঁচ হাজার লোকের মৃত্যু হয় এবং হাজার হাজার গরিব মানুষ পঙ্গু হয়ে রোজগারবিহীন হন। কিš‘ এ বিষয়কে অগুর“ত্বপূর্ণ ও সামান্য মনে করে সরকার নিষ্ক্রিয় থাকে। অথচ সহজেই এসব দুর্ঘটনা একেবারে বন্ধ করা সম্ভব না হলেও বড় আকারে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ পথ চলাচলে অযোগ্য বাস ও লঞ্চ সড়ক ও জলপথে নামানো একেবারে বন্ধ করা সম্ভব নিয়মিত ও সতর্ক তদারকির দ্বারা। কিš‘ দেখা যাবে যে, এ কাজ করা হয় না। কারণ লঞ্চ ও বাস মালিকরা সবাই সরকারি ক্ষমতায় থাকা লোকজন অথবা নানা সূত্রে তাদের সঙ্গে সম্পর্কিত। এমনকি খোদ মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্যরাও এসবের মালিক। অপরাধের শর্ত এই মহলেই তৈরি হয়। কাজেই এ অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা যাদের দায়িত্ব, তাদের দ্বারা এ দায়িত্ব পালিত হয় না। কিš‘ এর বির“দ্ধে কোনো উল্লেখযোগ্য ও কার্যকর প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ হয় না। সবাই এ ক্ষেত্রে অবলোকনকারী মাত্র! এ পরি¯ি’তিতে বছরে হাজার হাজার নিরীহ পথযাত্রীর মর্মান্তিক মৃত্যু ও তাদের পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া নিবারণ করার সম্ভাবনা কোথায়? বাংলাদেশে রাজনীতির ক্ষেত্রে যে নৈরাজ্য ও গণস্বার্থবিরোধিতা সমগ্র শাসক শ্রেণী ও সরকারের মধ্যে দেখা যায়, তার সঙ্গে এ পরি¯ি’তির সম্পর্ক অবি”েছদ্য। কাজেই রাজনীতির ক্ষেত্রে এর পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত জনগণের হাজারো সমস্যার সঙ্গে সড়ক ও জলপথে বেপরোয়া দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ, এর জন্য দায়ী অপরাধীদের শাস্তির কোনো সম্ভাবনাই যে নেই তা বলাই বাহুল্য।