পৃথিবীকে জেনে নিন আপনার ভাষায়….24 Hrs Online Newspaper

বর্ধমান বিস্ফোরণের মূল পরিকল্পনাকারী ইউসুফ আটক

Posted on October 28, 2014 | in আন্তর্জাতিক | by

bordhoman yusuf_0 (1)আন্তর্জাতিক ডেস্ক: অবশেষে ধরা পড়লেন বর্ধমান বিস্ফোরণের মূল পরিকল্পনাকারী ইউসুফ। আজ মঙ্গলবার, ঘটনার ২৫ দিনের মাথায় তাকে শিলিগুড়ির নেপাল সীমান্ত থেকে গ্রেফতার করে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বিভাগ (এসআইএ)। ইউসুফকে ধরতে রাজ্য পুলিশও সাহায্য করে এনআইএকে। এনআইএ’র কাছে খবর ছিল, উত্তরবঙ্গের নেপাল সীমান্ত ঘেঁষে ইউসুফের অপর একটি গোপন আস্তানার খবর পেয়েছে এনআইএ। এর আগে কলকাতার বর্তমান পত্রিকা তাদের এক প্রতিবেদনে জানায়, শুধু আস্তানাই নয়, ইউসুফের আশ্রয়দাতারও খোঁজ পেয়েছে এনআইএ। সর্বশেষ গত বুধবার এনআইএ জানতে পারে, শিলিগুড়ির একটি বাড়িতে লুকিয়ে আছে ইউসুফ। সেখানে হানাও দেয় তারা। কিন্তু অল্পের জন্য ফঁসকে যায় ইউসুফ। তবে অপর একটি অসমর্থিত সূত্রের বরাত দিয়ে পত্রিকাটি জানায়, নেপাল পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে ইউসুফ। তবে এনআইএ এখবরের সত্যতা স্বীকার করেনি। এদিকে বর্তমান জানায়, ভারতে যে ১৮০ জন বাংলাদেশি জঙ্গি গা-ঢাকা দিয়ে আছে, তাদের তালিকা পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুলিশকে দেবে এনআইএন। ইউসুফ সম্পর্কে এনআইএ সেময় জানায়, বর্ধমানের মঙ্গলকোটস্থ শিমুলিয়ার কৃষ্ণবাটি গ্রামের ইউসুফ অষ্টম শ্রেণিতে অকৃতকার্য হয়ে উত্তরপ্রদেশের আজমগড় যায় ধর্মীয় শিক্ষা নিতে। সেখানে অবস্থানকালেই সে ইন্ডিয়ান মুজাহিদিন (আইএম)-এ যোগদান করে সে। ২০০৭ সালে ইউসুফ শিমুলিয়া ফিরে আসে। তখন থেকেই তার সাথে আইএম, সিমি, এবং বাংলাদেশি জঙ্গি সংগঠনগুলোর সখ্যতা গড়ে ওঠে। এসব জঙ্গি সংগঠনগুলোর পরামর্শেই সে সেখানে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে। পুরুষ জঙ্গিদের প্রশিক্ষণের দায়িত্ব নিজে নিয়ে সে মহিলা জঙ্গিদের প্রশিক্ষণের দায়িত্ব দেয় নিজ স্ত্রীর ওপর। এর পরপরই পশ্চিমবঙ্গ এবং আসামে আরো কিছু জঙ্গি আস্তানা গড়ে তোলার দায়িত্ব পায় ইউসুফ। শুধু তাই নয়, শেষদিকে বাংলাদেশে নাশকতার দায়িত্বও তার ওপর বর্তায়।

এনআইএ’র বরাত দিয়ে বর্তমান জানায়, শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয়, বাংলাদেশ এবং নেপালেও জঙ্গি নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করতে লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে জমি কেনে ইউসুফ। উত্তরবঙ্গের কিছু ব্যবসায়ী জঙ্গি কার্যকলাপ পরিচালনা করতে ইউসুফকে অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছে বলে জেনেছে গোয়েন্দারা। এদিকে বাংলাদেশ এবং নেপাল যাতায়াতের সময় উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ি এবং জলপাইগুড়িকে ট্রানজিট ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহার করতো জঙ্গিরা। অপরদিকে নেপালের এক ডাক্তারও মাঝে মাঝে ইউসুফের আস্তানায় এসে তার সহযোগীদের চিকিৎসা দিয়ে যেতো বলে খবর মিলেছে। সেই নেপালি ডাক্তারের পরিচয় না মিললেও অর্থ যোগানদাতা ব্যবসায়ীদের ঠিকই হদিস পেয়ে গেছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। এছাড়া জঙ্গিদের ব্যবহারে যেসকল ট্রাভেল এজেন্সি গাড়ির যোগান দিতো, তাদেরকেও নজরদারির মাঝে রাখা হয়েছে।

এনআইএ সূত্রে জানা যায়, গত ২ অক্টোবর খাগড়াগড় বিস্ফোরণের পর তিনদিন পর্যন্ত ইউসুফ তার স্ত্রী ও তিন সন্তান দিয়ে বধমানেই ছিল। সন্ধ্যায় সে যায় বিরভূমের কার্ণীহারে। সেখান থেকে এক সহযোগীর সহায়তায় গাড়ি ভাড়া করে যায় মুর্শিদাবাদ। তার মোবাইল ফোনের ট্র্যাক থেকে জানা যায়, মুর্শিদাবাদের বড়ঞাঁতে আশ্রয় নিয়েছে সে। এখান থেকে বাসে চেপে শিলিগুড়ি পৌঁছায় ইউসুফ। এখানে এক জঙ্গি আস্তানায় আশ্রয় নেওয়ার পর থেকেই মোবাইল বন্ধ করে দেয় ইউসুফ।

এদিকে বর্ধমান বিস্ফোরণের ঘটনায় বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুজাহেদিনের (জেএমবি) সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পেয়েছে ভারতের ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনআইএ)।

গত ২৫ অক্টোবর বিবিসি বাংলা জানায়, বর্ধমানে তৈরী হওয়া বোমাগুলি বাংলাদেশে পাঠানোর জন্যই তৈরী করা হচ্ছিল বলেও দাবি করেছে এনআইএ। গোয়েন্দা সংস্থাটি জানিয়েছে, তারা বর্ধমানের খাগড়াগড়ে ২ অক্টোবরের বিস্ফোরণের প্রাথমিক তদন্ত শেষ করেছে- দুই মহিলা সহ তিনজনকে তারা গ্রেপ্তার করতে পেরেছে আর চতুর্থ ব্যক্তি বিস্ফোরণে আহত হয়ে এখনও হাসপাতালে।

শাকিল আহমেদ এবং শোবহান মন্ডল নামে যে দুই ব্যক্তি ঘটনাস্থলেই মারা গিয়েছিলেন– তাঁরাও বাংলাদেশের নাগরিক বলেই মোটামুটি নিশ্চিত এনআইএ। আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে ও বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ সহ বিভিণ্ন জেলায় তল্লাশী চালিয়ে উদ্ধার হওয়া নথিপত্র, ফোন রেকর্ড প্রভৃতি ঘেঁটে এনআইএ এখন নিশ্চিত যে, জামায়েতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশের সদস্য এই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বাংলাদেশে পাঠানোর জন্যই নিষিদ্ধ ওই সংগঠনটির সদস্যরা অত্যাধুনিক বোমাগুলি তৈরী করছিলেন।

গোয়েন্দা সূত্রগুলি জানিয়েছে, এই বিস্ফোরণের মাধ্যমে যে সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের হদিশ পাওয়া যাচ্ছে– যেটা বাংলাদেশ, আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খন্ড বা তেলেঙ্গানা পর্যন্ত বিস্তৃত– তা একরকম নতুন এবং অজানাই ছিল গোয়েন্দাদের কাছে।

এখন জামায়েতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশের এই নেটওয়ার্ক যেমন খুঁজে বার করতে চাইছে এনআইএ, তেমনই জেএমবি-র এই নেটওয়ার্কের ফান্ডিং কীভাবে হত– অর্থাৎ কারা টাকা পয়সা যোগাত এই সন্ত্রাসীদের– সেটাও খুঁজের বার করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে তদন্তকারী সংস্থাটি। আর তথ্য পাওয়ার জন্য আর্থিক পুরস্কারও ঘোষণা করা হবে বলে জানা গেছে।

তবে গত ১৮ অক্টোবর এই ঘটনার সাথে শ্রীলঙ্কার বিলুপ্ত তামিল টাইগারদের নাম উঠে আসে। ভারতের ন্যাশনাল সিকিউরিটি গার্ড (এনএসজি) জানায়, এলটিটিই (লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলম)-এর ব্যবহার করা বিস্ফোরকের সাথে বর্ধমানের বিস্ফোরকের মিল রয়েছে।

এলটিটিই-র পতন ঘটলেও কেন এই সংস্থাটির নাম উঠে আসছে- এমন প্রশ্নের জবাবে সেসময় এনএসজি-র প্রাক্তন কর্তা এবং বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ দীপাঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, ভুলে যাবেন না, সম্প্রতি ছত্তীসগড়ে মাওবাদীদের বিস্ফোরণের ঘটনাতেও এলটিটিই-র ছাপ পেয়েছে স্বরাষ্ট্র দফতর। সংগঠন হিসেবে এলটিটিই-র এখন আর অস্তিত্ব না থাকলেও যে পাকা মাথার যুবকেরা এলটিটিই-র জন্য বিস্ফোরক বানাতো, তারা রয়েই গিয়েছে।

এদিকে গত ১৬ অক্টোবর আনন্দবাজার পত্রিকা তাদের এক প্রতিবেদনে জানায়, ভারত এবং বাংলাদেশ উভয় দেশেই নাশকতার পরিকল্পনা ছিল নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুজাহেদিনের (জেএমবি)। ভারতের জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ) সেসময় জানায়, তারা পশ্চিমবঙ্গের চারটি জেলা নদিয়া, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম ও বর্ধমানের বিভিন্ন গোপন গুদামে অসংখ্য আইইডি (ইম্প্রোভাইজ্ড এক্লপ্লোসিভ ডিভাইস) মজুত করা আছে বলে জেনেছে।

খাগড়াগড় বিস্ফোরণে আহত আব্দুল হাকিম ওরফে হাসানকে (২৩) জিজ্ঞাসবাদের পর এসব তথ্য জেনেছে বলে জানিয়েছে এনআইএ।

ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা জানায়, ভারতে যে ৩৬টি নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের তালিকা এনআইএ তৈরি করেছে, তার ২৭ নম্বরে রয়েছে জামায়াতুল মুজাহেদিন।

এনআইএ জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে হাকিম জানিয়েছে- নদিয়া, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম ও বর্ধমান এই চার জেলায় শত শত আইইডি মজুত করে রাখা আছে বিভিন্ন গোপন গুদামে। প্রতি জেলায় ওই রকম একাধিক গুদাম রয়েছে বলে হাকিমের বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত পেয়েছেন গোয়েন্দারা। আর সেগুলিতে তল্লাশি চালাতে গিয়ে যাতে কোনও দুর্ঘটনা না ঘটে, এ জন্যই এই ব্যাপারে সিদ্ধহস্ত এনএসজি (ন্যাশনাল সিকিওরিটি গার্ড)-র সহায়তা চেয়েছে এনআইএ।

এদিকে গোয়েন্দাদের বক্তব্য, বিস্ফোরণে নিহত শাকিল ও সুবহান বাংলাদেশেরই জঙ্গি সংগঠন জামাতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)-এর সদস্য। এনআইএ-র ধারণা, জেএমবি বাংলাদেশে যে রকম জেহাদি কার্যকলাপ করে, তেমনই নাশকতা হাকিম ও তার দলবল ভারতেও ঘটানোর চেষ্টা করছিল।

এদিকে গত ১০ অক্টোবর দৈনিক জনকণ্ঠ তাদের এক প্রতিবেদনে জানায়, জেএমবির জঙ্গীদের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই থেকে বাংলাদেশ ঘুরে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে টাকার যোগান গেছে বলে খোঁজ পেয়েছে ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা। দুবাইয়ের মাদক ও চোরাকারবারি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা পেয়েছে বাংলাদেশের জামায়াতপন্থী ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশের জামায়াতপন্থী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সেই টাকা গেছে বর্ধমানের জঙ্গীদের হাতে। পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ, জামায়াতী ব্যবসায়ী, সারদা গ্রুপ জঙ্গী কেলেঙ্কারীর অর্থায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার যোগসূত্র পাওয়া গেছে।

প্রসঙ্গত, গত ২ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে খগড়াগড়ে একটি বাড়িতে বোমা বানাতে গিয়ে দুই জন নিহত হন। তারা নিষিদ্ধ সংগঠন জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশের (জেএমবি) একটি শাখার সদস্য বলে সেসময়ই সন্দেহ করে ভারতীয় গোয়েন্দারা।

তথ্যসূত্র: বর্তমান পত্রিকা, বিবিসি বাংলা, আনন্দবাজার পত্রিকা

সর্বশেষ খবর

আজকের ছবি

www.facebook.com

Tag Cloud