May 7, 2026
ফারজানা রিংকী : লুটপাট, দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতির কারণে ডুবতে বসেছে বেসিক ব্যাংক। শত শত কোটি টাকার ঋণের যেমন কোনো হদিস নেই তেমনি বাংলাদেশ ব্যাংকের আপত্তিও আমলে নেয়নি ব্যাংকটি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তদšত্ম বলছে মি. জুয়েল নামের এক ব্যক্তি একাই ৫ ভুয়া কোম্পানির নামে হাতিয়ে নিয়েছেন ৩৩৮ কোটি টাকা যা উদ্ধারের সম্ভাবনা খুবই কম বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এছাড়াও অনিশ্চিত সাধারণ আমানতকারীদের পুঁজি।
বিশ্বনন্দিত জাদুশিল্পীদের জাদুকেও হার মানিয়েছে বাংলাদেশের ব্যাংক পাড়ার এক চতুর জাদুকর যার স্পর্শে ডুবতে বসেছে বেসিক ব্যাংক। নানা কৌশলে আর ব্যাংকটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সহায়তায় ৫টি ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে মি. জুয়েল নামের এই ব্যক্তি ব্যাংকটির গুলশান শাখা থেকে ৩৩৮ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। সর্বশেষ ৬৪ কোটি ৫ লাখ টাকা নিয়েছে সুরমা স্টিল এন্ড স্টিল ট্রেডিংয়ের নামে।
জুয়েলের বেসিক ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে ঋণ নেয়ার ঘটনা নতুন কিছু নয়। ২০১৩ সালের জুন মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ তদšত্ম টিম দেখতে পায় ৪টি ভুয়া প্রতিষ্ঠান এসএফজি শিপিং লাইন্স, সুহী শিপিং লাইন্স, শিফান শিপিং লাইন্স এবং এস রিসোর্স শিপিং লাইন্সের নামে ২৭৪ কোটি ২ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে শোধ করেনি একটি টাকাও। তখন বাংলাদেশ ব্যাংক এই ঋণগুলোকে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করে শাখা ব্যবস্থাপক ও প্রধান কার্যালয়ের ট্যারিফ কমিটির সকল সদস্যের বিরুদ্ধে শা¯িত্মমূলক ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়। বেসিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী ফখরুল ইসলাম বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দিয়ে জানান এসব ঋণকে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিদর্শনে বেরিয়ে আসে আসল ঘটনা। দেখা যায় জুয়েলের প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ আদায় তো দূরের কথা উল্টো তার নামে আরও একটি বেনামী প্রতিষ্ঠান সুরমা স্টিল এন্ড স্টিল ট্রেডিং নামে নতুন করে আরও ৬৪ কোটি ৫ লাখ টাকা ঋণ দিয়েছে বেসিক ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। কেন দেয়া হয়েছে এর উত্তর জানাতে পারেনি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। তারা বলেন, এই বিষয়ে উত্তর হেড অফিস দিতে পারবে। আমরা এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে পারি না।
ব্যাংকটির শাখা কিছু জানাতে অক্ষম হলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে জানা যায় সুরমা স্টিলের মালিক জুয়েল ২০১২ সালের ২৭ আগস্ট এসএফজি শিপিং লিমিটেডের নামে ৬৩ কোটি টাকা ঋণের জন্য আবেদন করলে শাখা তার মূল্যায়নে বলেছিল গ্রাহক সম্পর্কে শাখার কাছে যেমন কোনো তথ্য নেই তেমনি গ্রাহকের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সাথে সামঞ্জস্য নেই বিপুল অঙ্কের ঋণেরও।
শুধু তাই নয় কোনো এক অজ্ঞাত কারণে ব্যাংকটির গুলশান শাখা জুয়েলের ঋণের বিপরীতে জামানতের সত্যতা যাচাই করতে নিজের অপারগতার কথা তুলে ধরে। এখানেই শেষ নয়, গ্রাহকের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করতে না পারায় সিআইবি রিপোর্ট, প্র¯ত্মাবিত ঋণের জন্য আইনজ্ঞের মতামত, ভ্যাটিং, সার্চিং, স্টক রিপোর্ট এবং গ্রাহকের প্র¯ত্মাবিত ব্যবসায়ে কোনো অভিজ্ঞতা নেই বলে জানিয়েছে শাখাটি।
এরপরও শেষ রক্ষা হয়নি। পরে সব ধরনের মšত্মব্য ছেঁটে ফেলে পেছনে তারিখ দিয়ে আবার নতুন প্র¯ত্মাব পাঠাতে বাধ্য হয় শাখাটি। আর এসব ঘটনায় প্রধান কার্যালয়ের সরাসরি সম্পৃক্ততা পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ বলেন, এটা রীতিমত পুকুর চুরি যা নাকি ব্যাংকিংয়ের সংজ্ঞায় পরে না। এর জন্য একটি মাত্র ব্যক্তি দায়ী তিনি হলেন ঐ ব্যাংকের চেয়ারম্যান। তার জন্য দায়ী এই সরকার। কারণ সরকার ঐ চেয়ারম্যানকে এই দায়িত্ব দেয়ার পরে এটা শুরু হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এটি সরকারের নজরে এনেছেন কিন্তু এটিকে কর্ণপাত করেননি এবং এখনও করছেন না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্ণর ড. ফরাস উদ্দিন বলেন, এর বিচার হওয়া উচিৎ ফৌজদারি আইনে। তাকে একটা দৃষ্টাšত্মমূলক শা¯িত্ম দেয়া উচিৎ যেন শুধু এই ব্যাংক নয় ব্যাংকিং সিস্টেমে খবর হওয়া দরকার যে এ ধরনের অপরাধে পার পাওয়া সম্ভব নয়। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সরাসরি কিছু না বললেও তিনি জানিয়েছেন সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকের এসব লুটপাটের সবকিছুই জানানো হয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়কে। তবে এখনও কোনো নির্দেশনা পাননি তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে প্রমাণ দেয় বেসিক ব্যাংকে ঋণের নামে চলছে লুটপাটের মহোৎসব। আর যা ঘটছে ব্যাংকটির উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায়।বিষয়টি ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু ব্যবস্থা নিতে পারছে না কেউই। বিশ্লেষকদের প্রশ্ন অর্থ মন্ত্রণালয় আর বাংলাদেশ ব্যাংক উভয়ই যদি ব্যবস্থা নিতে অপারগ হয় তবে ব্যাংকটিতে গচ্ছিত আমানতের নিরাপত্তা দেবে কে? চ্যানেল ২৪