May 6, 2026
ঢাকা: ভারত ও বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত অভিন্ন নদী তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে তিস্তা মার্চ‘ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) এবং বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)।রাজধানী থেকে শুরু হয়ে তিস্তা নদী অভিমুখে এ মার্চ অনুষ্ঠিত হবে ১৭ থেকে ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত। তিস্তাসহ ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে শনিবার বেলা সাড়ে ১১টায় রাজধানীর মুক্তি ভবনের মৈত্রী মিলনায়তনে বাসদ ও সিপিবি আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলন থেকে এ কর্মসূচির ঘোষণা দেন আয়োজকরা।ভারতের তিস্তা নদীর পানি একতরফাভাবে প্রত্যাহার, ফারাক্কা ও টিপাইমুখ প্রকল্প এবং ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প, আন্তর্জাতিক নদী সংক্রান্ত বিধি-বিধানের পরিপন্থী ও মানবতাবিরোধী বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান।
সংবাদ সম্মেলনে খালেকুজ্জামান আরো বলেন,জ্বালানি নিয়ে যুদ্ধের পরে এখন পানি নিয়ে যুদ্ধের তোড়জোর চলছে। কৃষি, শিল্প, যাতায়াত, গৃহস্থালী- সবকিছুর উৎস্য ছিল পানি। বাংলাদেশ ছিল পানির আধার। কিন্তু শাসক শ্রেণীর অর্থলিপ্সা আর গণবিরোধী নীতির কারণে পানি-সংকটে বাংলাদেশ এখন বিপন্ন।ভারতের শাসকগোষ্ঠী তাদের দেশীয় ভোটের রাজনীতির সংকীর্ণ স্বার্থে পানি সমস্যাকে কাজে লাগিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারা কখনো পানির বিনিময়ে নানা সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করেছে। একইভাবে আমাদের সরকারগুলোও কখনো নতজানু নীতি অনুসরণ করে জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়েছে।
লিখিত বক্তব্যে বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ বলেন, ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ-ভারত মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে যে সমঝোতা হয়, তা ভারতের অনাগ্রহের কারণে কার্যকর হয়নি। ২০১০ সালে ড. মনমোহন সিং-এর বাংলাদেশ সফরের সময় তিস্তা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে আলোচনার কথা থাকলেও, ভারত শেষ মুহূর্তে মমতা ব্যানার্জীর আপত্তির অজুহাত করে আলোচ্যসূচি থেকে তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়টি প্রত্যাহার করে নেয়। বর্তমান সরকার চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর এবং আশুগঞ্জ নৌ-বন্দর ভারতকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। রামপালে সুন্দরবন ধ্বংস করে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ চুক্তি ও সাগরের দুটো গ্যাস ব্লক ভারতের হাতে তুলে দিয়েছে। অথচ পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে পারেনি।সংবাদ সম্মেলন থেকে আগামী ৭ এপ্রিল দেশব্যাপী দাবি দিবস এবং ১৭-১৯ এপ্রিল ঢাকা থেকে তিস্তা অভিমুখে তিস্তা মার্চ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। ১৭ এপ্রিল বিকেল ৩টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সমাবেশের মাধ্যমে তিস্তা মার্চ-এর যাত্রা শুরু হবে এবং টঙ্গী, গাজীপুর হয়ে সিরাজগঞ্জে পৌঁছাবে। ১৮ এপ্রিল তিস্তা মার্চ সিরাজগঞ্জ থেকে বগুড়া হয়ে রংপুরে পৌঁছাবে।
১৯ এপ্রিল রংপুর থেকে ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা ব্যারেজে পৌঁছাবে। এরপর লালমনিরহাটের হাতিবান্ধার দোয়ানী বাজারে সমাপনী জনসভা অনুষ্ঠিত হবে। তিস্তা মার্চ পথে পথে জনসভা, পথসভা, সমাবেশে মিলিত হবে এবং গণসংযোগ করবে। সমাপনী জনসভায় কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, গাইবান্ধাসহ ক্ষতিগ্রস্থ এলাকার জনগণ অংশগ্রহণ করবেন।এসব কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করার জন্য দেশের অন্যান্য বামপন্থী-প্রগতিশীল-উদারনৈতিক শক্তি, পরিবেশ আন্দোলনসহ বিভিন্ন নাগরিক আন্দোলনের প্রতিনিধি ও দেশপ্রেমিক ব্যক্তিবর্গের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। পদ্মা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদীর পরেই বাংলাদেশের উপর দিয়ে প্রবাহিত চতুর্থ বৃহত্তম আন্তর্জাতিক নদী তিস্তা।
৩১৫ কি.মি.দীর্ঘ তিস্তা নদীর ১১৫ কি.মি. এবং ক্যাচমেন্ট এরিয়ার ১৭ শতাংশ পড়েছে বাংলাদেশে।তিস্তার পানি ব্যবহার করে বাংলাদেশে বৃহত্তর রংপুর, দিনাজপুর ও বগুড়া জেলার ৭ লক্ষ ৫০হাজার হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা দেয়ার লক্ষে তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়।বক্তারা বলেন, ১৯৯৩ সালে লালমনিরহাটের হাতিবান্ধার ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্প চালু হয়। এর আওতায় সেচ সুবিধা পায় ১ লক্ষ ১১ হাজার হেক্টর জমি।
কিন্তু উজানের দেশ হিসেবে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকায় ভারত পানি সরিয়ে নেয়ায় শুষ্ক মৌসুমে অনেকাংশেই অকার্যকর হয়ে পড়ে তিস্তা ব্যারেজ। প্রমত্তা ও খরস্রোতা তিস্তা পরিণত হয় ধু ধু বালির প্রান্তরে।আবার, বর্ষা মৌসুমে ভারতের অতিরিক্ত পানি ছাড়ার ফলে বাংলাদেশ অংশে দেখা দেয় বন্যা ও নদী ভাঙ্গনের প্রকোপ।
বক্তারা আরো বলেন, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসেবে, ঐতিহাসিকভাবে শীত মৌসুমে তিস্তা নদীতে ১৪ হাজার কিউসেক পানি প্রবাহিত হতো। কিন্তু সীমান্তের ৬৫ কিলোমিটার উজানে গজলডোবা ব্যারেজে ভারতের পানি প্রত্যাহারের পর বাংলাদেশ অংশে পানি প্রবাহ কমে দাঁড়ায় ৪ হাজার কিউসেকে। খরা পরিস্থিতিতে এ প্রবাহ আরো কমে বর্তমানে সর্বনিম্ন ৫শ কিউসেকে দাঁড়িয়েছে। ফলে তিস্তা অববাহিকার ১২ উপজেলার ৬৫ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধানের চারা জমিতে শুকিয়ে যাচ্ছে।
তিস্তা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে স্বাধীনতার পর থেকে অনেক আলোচনা হলেও, কোন সরকারই পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে পারেনি বলে উল্লেখ করেন বক্তারা।১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ-ভারত মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে একটি সমঝোতা হয়। এই সমঝোতায় ভারত ৩৯ শতাংশ ও বাংলাদেশ ৩৬ শতাংশ পানি পাবে। বাকি ২৫ শতাংশ পানি বাংলাদেশে ব্রহ্মপুত্র পর্যন্ত তিস্তার গতিপথ বাঁচিয়ে রাখার জন্য কতটুকু প্রয়োজন এবং এটা কিভাবে ভাগাভাগি হবে সে বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভারতের অনাগ্রহের কারণে ওই সমঝোতা আর কার্যকর হয়নি।