May 6, 2026
ঢাকা: ১৪ ফেব্র“য়ারি ঐতিহত্যবাহী কোনো দিবস না হলেও ভালোবাসা দিবস আমাদের জন্য কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। লাখো তরুণ তরুণীরা হয়তো অপক্ষোয় থাকেন এমন একটি দিনের জন্য। এ দিনে প্রিয়জনের সঙ্গে আনন্দঘন মুহূর্তগুলো ভালোবাসাকে তীব্র থেকে তীব্রতর করতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে রবীন্দ্র সরোবর পর্যন্ত রাজধানী ঢাকার আনাচে কানাচে এমনকি সারাদেশের পার্ক ও বিনোদন কেন্দ্রগুলো সরব হবে প্রেমিক-প্রেমিকাদের পদচারণায়। হয়তো কবির ভাষায় একে অন্যকে বলবে- ‘তোমাকে আমি ভালেবাসি। ভালোবেসে সখী নিভৃত যতনে আমার নামটি লিখো তোমার মনের মন্দিরে।’
বসন্ত বাতাসে হৃদয়ের মিথস্ক্রিয়ায় সারা বিশ্বে প্রেমপিয়াসী যুগল বছরের এই দিনটিকেই বেছে নিয়েছে মনের গহীনের কলি ফোঁটাতে। চ-ি দাসের অনাদিকালের সেই সুরথ ‘দুহঁ করে দুহঁ কাঁদে বিচ্ছেদ ভাবিয়া/ আধতিল না দেখিলে যায় যে মরিয়া/ সখী কেমনে বাঁধিব হিয়াৃ।’ এই আবেদনও আজ বাজবে কারও কারও হৃদয়ে। ভালোবাসা বোঝাবুঝির চিরন্তন বোধ হয়ত একটু বেশিই অনুভূত হবে গোলাপ বিনিময় ও শরীরী ভাষায়।
বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও আজ পালিত হবে দিবসটি। ডিজিটাল যুগে তরুণ-তরুণীরাই বেশি আগ্রহী হয়ে উঠবে দিনটি পালনে। প্রযুক্তির কল্যাণে মুঠোফোনের ক্ষুদ্র বার্তা, ই-মেইল অথবা ফেসবুকে মনের কথাগুলো হয়তো প্রকাশ করবে অনেকে।
পশ্চিমা দুনিয়ায় এই ভ্যালেন্টাইন ডে বা প্রেম উৎসব তারুণ্যের মাঝে এক অদেখা ভুবনের উত্তেজনা ছড়ায়। এই দিনে চকোলেট, পার্ফিউম, গ্রিটিংস কার্ড, ই-মেইল, মোবাইলের এসএমএসে প্রেমবার্তা, হিরার আংটি, প্রিয় পোশাক, খেলনা মার্জার, বইয়ের ভেতরে রাখা গোলাপের ইশারা বিনিময়, আর আলিঙ্গন হয়ে উঠবে তরুণ-তরুণীর প্রথম অনুষঙ্গ।
হয়ত আরো থাকবে নীল খামে হাল্কা লিপস্টিকের দাগ, একটি গোলাপ ফুল, ছোট্ট কোনো উপহার, আর ছোট্ট একটি চিরকুট। তাতে দু’ছত্র গদ্য বা পদ্যে প্রেমের ঊর্মি-’ইউ স্টেপ ইনটু মাই হার্ট, টার্নিং ইট ফ্রম স্টোনৃ’ অথবা ‘তুমি আমার সবটুকু গান/ ঝড়ের পরে একটু চুমু/ তাতে আছে সবটুকু প্রাণৃ।’
আমাদের দেশে ১৯৯৪ সাল থেকে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। এদিন শুধু প্রেম বিনিময় নয়, প্রেমিক-প্রেমিকাদের মধ্যে গোপনে ও সরবে বিয়ের হিড়িকও পড়ে। রাজধানীর উদ্যান, বইমেলা, কফিশপ, ফাস্টফুড শপ, লং ড্রাইভ, অথবা নির্জন গৃহকোণে একান্ত নিভৃতে কাটান প্রেমকাতর তরুণ-তরুণীরা।
এই দিনটি যে শুধু তরুণ-তরুণীদের তা নয়, পিতামাতা-সন্তানদের ভালোবাসাও বড়মাত্রায় উদ্ভাসিত করে। যারা একটু বিজ্ঞ তারা বলেন, প্রেমের কোনো দিন থাকে না, ভালোবাসলেই ভ্যালেন্টাইন, সেলিব্রেট করলেই ভ্যালেন্টাইন ডে।
ভালোবাসার এই দিনটির ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে অনেক ধরনের কাহিনীর কথা জানা গেছে। প্রধান যে কাহিনী প্রচলিত আছে তা এক রোমান ক্যাথলিক পাদ্রী বা সনত্মের কাহিনী। তার নাম সেন্ট ভ্যালেন্টাইন। তিনি ছিলেন একজন চিকিৎসক ও পাদ্রী। তখন রোমানদের দেবদেবীর পুজোর বিষয়টি ছিল মুখ্য। তারা বিশ্বাসী ছিলেন না খ্রীস্টান ধর্মে। কিন্তু খ্রীস্টান ধর্ম প্রচারের অপরাধে ২০৭ খ্রিস্টাব্দে সাধু ভ্যালেন্টাইনের মৃত্-ু কার্যকর করা হয় রোমের সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াসের আদেশে। তবে তিনি যখন জেলে বন্দী, তখন ছোট ছোট ছেলেমেয়ে ভালোবাসার কথা জানিয়ে জেলের জানালা দিয়ে তাকে ছুড়ে দিত চিরকুট। বন্দী অবস্থাতেই তিনি চিকিৎসার মাধ্যমে জেলারের অন্ধ মেয়েকে ফিরিয়ে দেন দৃষ্টিশক্তি। অনুমান করা হয় মেয়েটির সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। মৃত্রু আগে মেয়েটিকে একটি চিঠি লেখেন, সেখানে তিনি উল্ল্লেখ করেন ফ্রম ইওর ভ্যালেন্টাইন বলে। অনেকের মতে এই সাধু ভ্যালেন্টাইনের নামানুসারে পোপ প্রথম জুলিয়াস ৪৯৬ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্র“য়ারিকে ভ্যালেন্টাইন ডে হিসেবে ঘোষণা করেন।
আরো একটি ভ্যলেন্টাইনের নাম পাওয়া যায় ইতিহাসে। যুদ্ধের জন্য সৈন্য সংগ্রহে ছেলেদের বিয়ে করতে নিষিদ্ধ করেন রোমান সম্রাট ক্লডিয়াস। কিন্তু যুবক ভ্যালেন্টাইন সেই নিষেধ অমান্য করে বিয়ে করেন। ফলে তাকে মৃত্য্দুন্ড দেয়া হয়। তার নামানুসারেও এই দিনটি চালু হতে পারে-এমনও ধারণা রয়েছে।
এদিকে ৪ ফেব্র“য়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবস উৎসবের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে আমাদের সংগ্রাম ও অর্জনের ইতিহাস। ১৯৮৩ সালে এরশাদের শিক্ষামন্ত্রী মজিদ খানের বৈষম্যমূলক শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ছাত্র জনতা মহানগরে এক ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলে।
১৪ ফেব্র“য়ারি সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচিতে পুলিশের নির্বিচার গুলিতে শুধু মহানগর ব্যাপী ১০ জন শহীদ হন ও শতাধিক আহত হন। মজিদ খানের শিক্ষানীতি বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার পঞ্চাশ ভাগ ব্যয় শিক্ষার্থীর পরিবারকে বহন করতে হতো। ফলে শিক্ষা একটি শ্রেণী হাতে আরো কুক্ষিগত হতো, শিক্ষার অধিকার হতে বঞ্চিত হতো অনেক মানুষ।
শিক্ষা অর্জনের জন্য মাতৃভাষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। কিন্তু এ নীতি অনুযায়ী শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকেই বাংলার সঙ্গে আরবি ও ইংরেজি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয় যা ছিল আমাদের ভাষা আন্দোলনের চেতনার পরিপন্থি।
বুকের রক্ত ঢেলে জীবন দিয়ে সেদিন ছাত্র-জনতা শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের বিরুদ্ধে ভাষা সংস্কৃতি রক্ষার্থে রুখে দাঁড়িয়েছিল এবং স্বৈরাচারী সরকার ও প্রশাসনকে বাধ্য করেছিল এ বৈষম্যমূলক শিক্ষানীতি স্থগিত করতে।
এরপর গোটা আশির দশকজুড়ে প্রতি বছর এদিনটি স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালিত হয় এবং এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের প্রেরণা হিসেবে কাজ করে। তখন আওয়ামী লীগ, বিএনপি, ছাত্রদল, ছাত্রলীগ, বাম প্রগতিশীল ছাত্র ও রাজনৈতিক দলগুলো যার যার অবস্থান থেকে কর্মসূচি দিয়ে দিবসটি পালন করে এবং সংবাদ মাধ্যমগুলোও এর পক্ষে প্রচার চালায়। কিন্তু কালক্রমে দিবসটিকে প্রায় সবাই ভুলে গেছে।