May 9, 2026
নিউজ ডেস্ক: বিএনপির নির্বাচনে অংশ না নেওয়াটা ছিল একটি রাজনৈতিক ভুল সিদ্ধান্ত ছিল বলে বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাদের এই রাজনৈতিক ভুলের খেসারত কেন জনগণকে দিতে হবে বলে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
আজ সোমবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে এ প্রশ্ন তোলেন প্রধানমন্ত্রী। নাশকতা, মানুষ হত্যা, বোমা-গ্রেনেড হামলা, অগ্নিসংযোগ, জানমালের ক্ষতি করা বন্ধ করতে বিএনপি নেত্রীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশ যখন উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন আবারও অস্থিতিশীলতা ও নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধাপরাধী, গণহত্যাকারী, রাজাকার-আলবদরদের বিচারের কাজ এগিয়ে চলছে। রায় কার্যকর করা হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘এই বিচার বানচাল করতে, যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা করতে অন্ধকারের অপশক্তি যারা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না, জনগণের মঙ্গল চায় না তারা আবারও ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তরের চেষ্টা করছে।’
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘আপনার ভুল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে আজ আপনি ও আপনার দল সংসদে নেই। আপনি কাকে দোষ দেবেন? আপনার নিজেকেই দোষ দিতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘নাশকতার পথ পরিহার করে শান্তির পথে আসুন। দেশের মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য কী কী করতে চান তা মানুষকে জানান। নিজের দলকে গড়ে তুলুন। তাহলেই হয়ত ভবিষ্যতে সম্ভাবনা থাকবে। যে পথে আপনি চলছেন তা জনগণের কল্যাণ বয়ে আনবে না। বরং মানুষের বিশ্বাস ও আস্থা আরও হারাবেন।’
· প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে গত এক বছরে সরকারের সাফল্য তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের পূর্ণ বিবরণ পড়ুন নিচে
প্রিয় দেশবাসী,
আসসালামু আলাইকুম।
· সবাইকে ইংরেজি নববর্ষের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।
· আজ ৫ জানুয়ারি। গত বছরের এই দিনে আপনারা একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে এদেশের জনগণের দল, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে টানা দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য সরকার গঠনের ম্যান্ডেট দিয়েছিলেন।
· আজকের এই দিনে বাংলাদেশের সকল গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষকে জানাচ্ছি আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা।
· আমি গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।
· স্মরণ করছি ৩ নভেম্বর জেলখানায় নিহত জাতীয় চারনেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এএইচএম কামরুজ্জামানকে।
· শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি মহান মুক্তিযুদ্ধের সকল শহীদকে। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, স্বজন হারানো পরিবার ও একাত্তরের নির্যাতিত মা-বোনদের প্রতি জানাচ্ছি আন্তরিক সমবেদনা।
· গভীর বেদনার সঙ্গে স্মরণ করছি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ডের শিকার আমার মা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, আমার তিন ভাই ক্যাপ্টেন শেখ কামাল, লেফটেন্যান্ট শেখ জামাল ও দশ বছরের শেখ রাসেল, শেখ কামাল ও জামালের নবপরিণীতা স্ত্রী সুলতানা ও রোজী, বঙ্গবন্ধুর একমাত্র সহোদর শেখ নাসের, কর্নেল জামিলসহ সেই রাতের সকল শহীদকে।
· স্মরণ করছি, ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় নিহত আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভী রহমানসহ শহীদ ২২ নেতা-কর্মীকে।
· স্মরণ করছি বিএনপি-জামাত জোট সরকারের সময় নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী এসএএমএস কিবরিয়া, আওয়ামী লীগ নেতা আহসানউল্লাহ মাস্টার, মঞ্জুরুল ইমাম, মমতাজউদ্দিনসহ ২১ হাজার নেতাকর্মীকে।
· দশম সংসদের যে সকল সংসদ সদস্য¯ইন্তেকাল করেছেন তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।
· বিএনপি-জামাত জোটের সন্ত্রাস, অগ্নিসংযোগ ও বোমাবাজির শিকার হয়ে নিরীহ বাসড্রাইভার, বাস-টেম্পো-সিএনজি যাত্রী, প্রিজাইডিং অফিসার, পুলিশ-বিজিবি-আনসার, সেনাবাহিনীর সদস্য, এমনকি স্কুলের শিশুও নিহত হয়েছে। আহত হয়ে অনেকেই মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
· আমি জামাত-বিএনপি জোটের নির্মমতার শিকার হয়ে যাঁরা জীবন দিয়েছেন তাঁদেরকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। তাঁদের পরিবারের সদস্যদের জানাচ্ছি গভীর সমবেদনা। আহতদের জন্য আমার আন্তরিক সহানুভূতি।
প্রিয় দেশবাসী,
· ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন বানচাল ও যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা করতে বিএনপি-জামাত জোট সারাদেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল।
· তারা শত শত গাড়িতে আগুন দিয়েছে এবং ভাংচুর করেছে হাজার হাজার গাড়ি। মহাসড়কসহ গ্রামের রাস্তার দু’পাশের হাজার হাজার গাছ কেটে ফেলেছে। পুলিশ-বিজিবি-আনসার-সেনাবাহিনীসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ২০ জন সদস্যকে হত্যা করেছে।
· তাদের সহিংস হামলা, পেট্রোল বোমা, অগ্নিসংযোগ ও বোমা হামলায় নিহত হয়েছে শত শত নিরীহ মানুষ।
· সরকারি অফিস, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ফুটপাতের দোকান এমনকি নিরীহ পশুও তাদের জিঘাংসার হাত থেকে রেহাই পায়নি।
· রেহাই পায়নি মসজিদ, মন্দির, প্যাগোডা। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম-এর সামনে হাজার হাজার পবিত্র কোরান শরীফ পুড়িয়ে দিয়েছে।
· ট্রেনের লাইন উপড়ে ফেলে এবং ফিসপ্লেট খুলে শতশত বগি এবং রেলইঞ্জিন ধ্বংস করেছে।
· নির্বাচনের দিন ৫৮২টি স্কুলে আগুন দিয়েছে। প্রিসাইডিং অফিসারসহ ২৬ জনকে হত্যা করেছে। নির্বাচনের পর সংখ্যালঘু এবং আওয়ামী লীগ সর্মথকদের বাড়িঘরে হামলা চালিয়েছে, আগুন দিয়েছে।
· সন্ত্রাস, বোমাবাজি ও অগ্নিসংযোগকে উপেক্ষা করে আপনারা ভোটকেন্দ্রে গিয়েছেন। ভোট দিয়েছেন। গণতন্ত্রের ধারাকে অব্যাহত রেখেছেন।
· নির্বাচনের আগে আমরা সংলাপে বসার জন্য অনেক চেষ্টা করেছি। সংবিধানের আওতায় নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য আমরা সব ধরনের ছাড় দিতে চেয়েছিলাম। নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় মন্ত্রিসভা গঠনের জন্য আমরা প্রস্তুত ছিলাম।
· বাংলাদেশের সংবিধানে অনির্বাচিত সরকারের কোনো ব্যবস্থা নেই। আমাদের শুধু একটাই দাবি ছিল, সংবিধানের মধ্য থেকে আমরা নির্বাচন করতে চাই। সেখানে যত ধরনের ছাড় দেওয়া সম্ভব, তা দিতে আমরা প্রস্তুত ছিলাম।
· বিএনপি-জামাত জোট চেয়েছিল দেশে একটা অরাজক এবং অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে। অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে পিছনের দরজা দিয়ে তারা ক্ষমতায় যেতে চেয়েছিল।
· কিন্তু দেশের মানুষ তাদের সেই ষড়যন্ত্রের পাতানো ফাঁদে পা দেননি।
প্রিয় দেশবাসী,
· আমি আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
· আপনাদের সহযোগিতার ফলে উন্নয়নের যে কাজগুলি আমরা শুরু করেছিলাম, তা সমাপ্ত করতে পারছি। পাশাপাশি নতুন নতুন উন্নয়ন কর্মসূচী গ্রহণ করে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছি।
· আগামী দিনেও যে কোন ধরণের নাশকতা এবং জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ড সম্মিলিতভাবে প্রতিহত করে গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখবেন, আপনাদের কাছে আমি সেই অনুরোধ করছি।
· ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়লাভের পর ২০০৯ সালে সরকার গঠন করে পাঁচ বছর দেশ পরিচালনা করেছি। এমন এক অবস্থায় আমরা সরকার গঠন করেছিলাম যখন সমগ্র বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা এবং চরম খাদ্যাভাব চলছে।
· ২০০১ থেকে ২০০৬ বিএনপি-জামাতের দুঃশাসন. দুর্নীতি, জঙ্গিবাদী কার্যক্রম এবং দুই বছরের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দমননীতির ফলে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা চরম বিপর্যস্ত ও বিশৃঙ্খলাপূর্ণ ছিল।
· এই পরিস্থিতিতে আমরা দায়িত্বভার গ্রহণ করে সমাজের সকলস্তরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনি। মানুষের মাঝে আস্থা ও বিশ্বাস সঞ্চার করি। নব উদ্যমে দেশ গড়ার কাজে মানুষকে সম্পৃক্ত করি।
· সার্বিক উন্নয়নের লক্ষে ৬ষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়ন শুরু করি। দীর্ঘ মেয়াদী প্রেক্ষিত পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন শুরু করি।
· আজ দেশের মানুষ ভাল আছে। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে।
· সামগ্রিক উন্নয়ন, সংবিধান ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত রাখার ক্ষেত্রে ২০১৪ সাল বাঙালি জাতির ইতিহাসে একটি গৌরবোজ্জ্বল বছর।
· অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গত বছর ছিল বাংলাদেশের জন্য সাফল্যের বছর।
· আমাদের গৃহীত উন্নয়ন পরিকল্পনার সফল বাসত্মবায়নের ফলে গত মেয়াদের পাঁচ বছর এবং এই মেয়াদের প্রথম বছরে বাংলাদেশ আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে বিশ্বের সামনে রোল মডেল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
· বর্তমানে বিশ্বের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়া পাঁচটি দেশের একটি- বাংলাদেশ।
· আমরা ৬.২ শতাংশ গড় প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছি।
· ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল ৬১ হাজার ৫৭ কোটি টাকা। চলতি ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে বাজেটের আকার ২ লাখ ৫০ হাজার ৫০৬ কোটি টাকায় বৃদ্ধি করেছি।
· বিএনপি-জামাত জোট আমলের শেষ বছরে মাথাপিছু আয় ছিল ৫৪৩ মার্কিন ডলার যা আজ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,১৯০ মার্কিন ডলারে।
· ৫ কোটি মানুষ নিম্ন আয়ের স্তর থেকে মধ্য আয়ের স্তরে উন্নীত হয়েছে। বিএনপি-জামাতের শেষ বছরে দারিদ্রের হার ছিল ৪১.৫ শতাংশ। আমরা তা কমিয়ে ২৪ শতাংশে নামিয়ে এনেছি।
· ২০০৬ সালে অতিদারিদ্রের হার ছিল ২৪.২ শতাংশ। তা এখন কমে ১১ শতাংশে নেমে এসেছে।
· মানুষের আয় বেড়েছে। কর্মসংস্থান বেড়েছে। সরকারি ও বেসরকারি খাত মিলিয়ে আমরা এককোটি মানুষের কর্মসংস্থান করেছি। ২৫ লাখ মানুষের বিদেশে কর্মসংস্থান হয়েছে।
· ২০০৬ সালে রেমিট্যান্স আয় ছিল মাত্র ৪.৮০ বিলিয়ন ডলার। ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরে তা তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১৪.২৩ বিলিয়ন ডলারে।
· ২০০৫-২০০৬ অর্থবছরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩.৪৮ বিলিয়ন ডলার। তা আজ ছয়গুণ বেড়ে ২২.৩৯ বিলিয়ন ডলার।
· ২০০৬ সাল পর্যন্ত দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ ছিল মাত্র ০.৭৯ বিলিয়ন ডলার যা ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে ৬.৮৩ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।
· ২০০৫-০৬ অর্থবছরে রপ্তানি আয় ছিল ১০.৫৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার যা তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এসে দাঁড়িয়েছে ৩০.১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
· ২০০১ সালে আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদন রেখে এসেছিলাম ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। বিএনপি-জামাতের সময়ে তা কমে দাঁড়ায় ৩ হাজার ২০০ মেগাওয়াটে।
· এখন আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১৩ হাজার ২৮৩ মেগাওয়াট।
· ২০০৬ সালে গ্যাসের দৈনিক উৎপাদন ছিল মাত্র ১৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে গ্যাস উৎপাদন গড়ে দৈনিক ২ হাজার ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত হয়েছে।
· যোগাযোগ খাতে আমরা ব্যাপক উন্নয়ন করেছি। ঢাকায় হাতিরঝিল প্রকল্প, কুড়িল-বিশ্বরোড বহুমুখী উড়াল সেতু, মিরপুর-বিমানবন্দর জিল্লুর রহমান উড়াল সেতু, বনানী ওভারপাস, মেয়র হানিফ উড়াল সেতু, টঙ্গীতে আহসানউল্লাহ মাস্টার উড়াল সেতু এবং চট্টগ্রামে বহদ্দারহাট উড়াল সেতু উদ্বোধন করা হয়েছে।
· মগবাজার-মালিবাগ উড়ালসেতুর নির্মাণ কাজ চলছে।