April 5, 2026
ঢাকা: মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর ৩৮তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। এ উপলক্ষে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এক বাণী দিয়েছেন।
বাণীতে তিনি জলেন, ‘মওলানা ভাসানী আমাদের জাতীয় ইতিহাসে এক প্রাতঃস্মরনীয় নাম। সাম্রাজ্যবাদ, ঔপনিবেশবাদ ও আধিপত্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের প্রবাদ পুরুষ মওলানা ভাসানী ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে উপ-মহাদেশের নিপীড়িত-নির্যাতিত মানুষের পক্ষে তিনি আপোষহীন নেতৃত্ব দিয়েছেন। ’৫০ এর দশকেই মওলানা ভাসানী বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রথম বাণী শুনিয়েছিলেন এদেশের জনগণকে। তিনি আমাদের জাতীয় স্বাধীনতার প্রথম স্বাপ্নিক, দেশমাতৃকার মুক্তির পথ প্রদর্শক।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং কৃষক শ্রমিক মেহনতি জনতার ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী ছিলেন প্রদীপ্ত এক আলোকবর্তিকা। তার অবস্থান ছিল শোষণের বিরুদ্ধে শোষিতের পক্ষে। অধিকার আদায়ে তিনি এদেশের মানুষকে সাহস যুগিয়েছেন তার নির্ভিক ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের মাধ্যমে। তার হুংকারে কেঁপে উঠত অত্যাচারী শাসক শোষকগোষ্ঠীর মসনদ।’
খালেদা বলেন, ‘অসহায় মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়, গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব সুরক্ষায় মওলানা ভাসানী আমাদের প্রেরণার উৎস। তার নিখাদ দেশপ্রেম, দেশ ও জাতির স্বার্থ রক্ষা এবং গণতন্ত্র ও মানবতার শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে যুগ যুগ ধরে আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করবে। তার আদর্শকে সঠিকভাবে অনুসরণ করতে পারলেই আমরা আমাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হবো।’
বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, ‘এদেশে আবারও গণবিরোধী শক্তি গায়ের জোরে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে গণতন্ত্রে স্বীকৃত মানুষের সকল স্বাধীনতাকে হরণ করে নিয়েছে। জনগণের মতামতকে অগ্রাহ্য করে একের পর এক গোপন চুক্তির মাধ্যমে বর্তমানে দেশকে যেদিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে তাতে জাতীয় স্বাধীনতা বিপন্ন হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশ প্রতিদিনই কোনো না কোনোভাবে আগ্রাসী শক্তির দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে। আমাদের মাটি, মানুষ সংস্কৃতির ওপর চলছে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নিরবচ্ছিন্ন আগ্রাসন। তাই এই মুহূর্তে আধিপত্যবাদী শক্তি এবং তাদের এদেশীয় প্রতিভূদের রুখতে মওলানা ভাসানী প্রদর্শিত পথই আমাদের পাথেয়। আমরা সেই পথেই অপশক্তির অশুভ ইচ্ছাকে পরাস্ত করতে সক্ষম হবো।’
এদিকে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর ৩৮তম মৃত্যুবার্ষিকীতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও বাণী দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘মওলানা ভাসানী ছিলেন আফ্রো-এশিয়া, ল্যাটিন আমেরিকার নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর। তার কণ্ঠে উচ্চারিত হতো বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ের দাবি। তিনি ছিলেন মজলুমের বন্ধু, সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে, অত্যাচারী শাসক ও শোষকগোষ্ঠীর ত্রাস এক উচ্চারিত কণ্ঠ।’
মওলানা ভাসানী এক প্রাতঃস্মরণীয় নামউল্লেখ্য, বিংশশতকী ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম তৃণমূল রাজনীতিবিদ ও গণআন্দোলনের নায়ক মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। তার জন্ম ১৮৮০ সালের ১২ ডিসেম্বর। ১৯৪৭ সালে সৃষ্ট পাকিস্তান ও ১৯৭১-এ প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। দেশের মানুষের কাছে ‘মজলুম জননেতা’ হিসেবেই সবচেয়ে বেশি পরিচিত। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট গঠনকারী প্রধান নেতাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। মওলানা ভাসানী রাজনৈতিক জীবনের বেশিরভাগ সময় মাওপন্থি কমিউনিস্ট তথা বামধারা রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তার অনুসারী অনেকেই তাকে ‘লাল মওলানা’ নামেও ডাকতেন।
তিনি ১৯৫৭ সালের কাগমারী সম্মেলনে পাকিস্তানের পশ্চিমা শাসকদের ‘ওয়ালাকুমুসসালাম’ বলে সর্বপ্রথম পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতার ঐতিহাসিক ঘণ্টা বাজিয়েছিলেন। ১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর মজলুম এ নেতা পৃথিবী ছেড়ে চলে যান।
দিলরুবা সরমিন
বেশ কয়েকদিন যাবৎ একের পর এক মেয়েদের হত্যা বা আত্মহত্যার সংবাদ সহানুভূতির সাথে পাঠ করে যাচ্ছি। আমরা কেবল এদের জন্য সহমর্মিতাই জানাতে পারি। এছাড়া আমাদের আর কী-ই বা করার আছে? কারণ আমরা তো সাধারণ জনগণ।
সম্প্রতি ঘটেছে ডা. শামারুখ মাহজাবিন কনার হত্যাকা-। ধানমন্ডিতে দিন দুপুরে তার শ্বশুরের বাসায় মেয়েটি মারা গেল। যেখানে তার শ্বশুর এডভোকেট খান টিপু সুলতান ( সাবেক সংসদ সদস্য, যশোর, মনিরামপুর আসন), শাশুড়ী ডা. জেসমিন আরা বেগম ( হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের গাইনি চিকিৎসক) এবং মাহজাবিন তার স্বামীর সাথে বাস করত।
ডা. মাহজাবিনকে আমি চিনি না। কখনো দেখিও নাই। কিন্তু একটি মেধাবী ও সম্ভাবনাময়ী মেয়ের জীবন প্রস্ফুটিত হওয়ার আগেই ঝরে যাবে এটি কোন অবস্থাতেই মেনে নেওয়ার নয়। সেটি যেই ঘটিয়ে থাকুক , যেভাবেই ঘটে থাকুক না কেন।
বরং আমি চিনি এডভোকেট খান টিপু সুলতানকে। একজন আইনজীবী হিসাবে তো বটেই পাশাপাশি আমার এলাকার কাছাকাছি এলাকা থেকে বেশ কয়েকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার জন্য। তার স্ত্রী ডা. জেসমিন আরা বেগমকেও চিনি। চিকিৎসক হিসাবেও চিনি এবং খান টিপু সুলতানের স্ত্রী হিসাবেও। তাদের দুই ছেলেকেও চিনতাম ছেলেবেলাতেই। সেই দুই ছেলের এক ছেলে হুমায়ূনের বিয়ে হল আর তার স্ত্রী খুনও হয়ে গেল?
আমি এখানে খান টিপু সুলতানের বা তার পরিবারের রোজ নামচা খুলতে বসিনি। বসেছি একটি সম্ভাবনাময়ী মেয়ের জীবন অকালেই শেষ হয়ে গেল কেন সেটা জানতে? কেন বার বার মেয়েদের ওপরই নানা ভাবে নানা দিক থেকে আঘাত আসে? কেন?
মাহজাবিন তার মৃত্যুর আগে তার বাবার সাথে ফোনে ৩২ মিনিট কথা বলেছিলেন। বাবাকে বলেছেন, শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে পড়াশুনা করতে দিচ্ছে না, ৩৫ তম বিসিএস পরীক্ষার ফরম পূরণ করতে দেয়নি, এফসিপিএস পরীক্ষাও দিতে দেবে না, তার স্বামী তাকে মেরে ফেলবে- তার এসব কথা শুনে প্রকৌশলী বাবা নূরুল ইসলাম কেবল সান্ত¦না দিয়েছে এবং বলেছে ২/১ দিনের মধ্যই তিনি ঢাকায় এসে মাহজাবিনের শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে কথা বলবেন। ব্যস! এই পর্যন্তই একজন বাবার দায়িত্ব ?
মেয়ের এই আকুতির পরও কেন তার বাবা ছুটে এলেন না? কেন? মেয়েদেরকে কেবল “বোঝানো” “সান্ত¦না” দেওয়ার এই মানসিকতা বাবাদের কবে শেষ হবে? মেয়েকে কেবল বিয়ে দিয়ে পার করে দেওয়ার মানসিকতা এখনো আমরা পরিবর্তন করতে পারলাম না?
খান টিপু সুলতান ও তার স্ত্রী ডা. জেসমিন আরা বেগম দুজনেই শিক্ষিত ও স্ব – স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। তাদের সন্তান (হুমায়ূন সুলতান) যত খারাপই হোক তাকে কেন তারা সুশিক্ষা দিতে পারলেন না? স্ত্রীর মর্যাদা বিষয়ে বোঝাতে পারলেন না? মাহজাবিনকে তার ক্যারিয়ার প্রতিষ্ঠিত করতে দিলেন না? আসলে এ সবই “পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার” সুস্পষ্ট প্রমাণ।
শুনেছি হুমায়ূনের নাকি ব্যারিস্টারি ডিগ্রিটিও সঠিক নয়। এছাড়া ধনী পরিবারের সদস্য হলে চেহারা ছবিতে একটু চকচকে ভাব থাকলে, দামি পোশাক পরলে, দামি গাড়ি থাকলে বা অভিজাত এলাকার বাসিন্দা হলে তো কোন কথাই নাই। শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে কেউ কোন প্রশ্নই তুলবে না বা সাহসই পাবে না।
স্বামী হুমায়ূন সুলতান টেলিভিশন সাংবাদিকদেরকে যেভাবে ধীরস্থির ও শান্তভাবে জানালেন, সামান্য কথা কাটাকটিতে অভিমান করে মাহজাবিন নিজেই আত্মহত্যা করেছে। তবে সেটি কতটুকু বিশ্বাসযোগ্য? যদি হুমায়ূনের কথাই সত্য হয় তবে সে কেন এতটা ধীরস্থির ছিল? কীভাবে সম্ভব? কেন একটি সম্ভাবনাময়ী মেয়ে দিন দুপুরে নিজের বাসায় আত্মহত্যা করবে? তার দু:খের- কষ্টের মাত্রাটা কোন যন্ত্র দিয়ে আমরা পরিমাপ করবো?
আর যদি সেটিও সত্য হয় এর পেছনের কারণ তো খুবই স্পষ্ট। মেয়েটি নিজেকে গড়তে চেয়েছিল সেটি তার স্বামী চায়নি এবং শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে সহযোগিতা করেনি। এখানে কাজ করেছে একটি নি¤œমানের মন মানসিকতা। কেন একজন নারী ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ শিখরে উঠবে?
আমরা সব সময় একটি মেয়েকে কেবল চার দেয়ালের মাঝেই দেখতে অভ্যস্ত। ভুল বললাম, নিজের মেয়েকে নয় ছেলের বউকে। নিজের মেয়েকে আজকাল অনেক বাবা মা লেখা পড়া শেখাচ্ছে। বিয়ের বাজারে আজকাল ছেলেরা শিক্ষিত বউ চায় বলে। তারপর বিয়েটা হয়ে গেলে মেয়েটি তার লেখাপড়া সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারছে কিনা সেই বিষয়ে বাবা- মায়ের অতটা মাথা ব্যাথা থাকে না। আর শ্বশুরবাড়ির লোকজন ছেলের জন্য শিক্ষিত মেয়ে পছন্দ করে। কারণ সমাজে তাকে তো পরিচয় দিতে হবে আমার ছেলের বউ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, লইয়ার, প্রফেসর। আমাদের সমাজ কাঠামোয় ঠিক এই পর্যন্তই মেয়েদের আইডেনটিটি। এর বাইরে আমরা আজো যেতে পারিনি বা চাই না।
তাই একদিকে যেমন সম্ভাবনাময়ী মেয়েগুলোর অকালে জীবনাবসান ঘটছে ঠিক তেমনি যারা বেঁচে থাকছে তারা অনেকেই নামমাত্রই বেঁচে আছেন । কারণ মানসিকতা আমাদের এখনো রান্না ঘরের বাইরে চাতালেও আসেনি। তাই আমরা একটি মেয়ের সাইকেল চালানো, মোটরসাইকেল চালানো, গাড়ি চালানো, প্লেন চালানো স্তম্ভিত হয়ে দেখি! আমরা মেয়েটিকে কোন প্রতিষ্ঠানের প্রধান, সালিশের প্রধান হিসাবে মেনে নিতে পারি না।
তাই অকালেই, অসময়ে, অবেলায় ঝরে যাচ্ছে অসংখ্য মাহজাবিন।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে যে কোন মূল্যে অন্তত এ সব ক্ষেত্রে পক্ষপাতহীন থাকতেই হবে। নইলে আজ যে মাহজাবিনের জীবন গেল কাল যে তার নিজের ঘরে যাবে না এই নিশ্চয়তা কে দেবে ?
একজন বিজ্ঞ আইনজীবী এবং সাবেক আইন প্রণেতা হিসাবে খান টিপু সুলতানও নিশ্চয়ই সেটিই চাইবেন যেমনটি একজন চিকিৎস হিসাবে ডা. জেসমিন আরা বেগমও চাইবেন- আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা পাক। অর্থ বা ক্ষমতার চাইতেও যে আইন সবার উর্ধ্বে” সেটি আবারো প্রমাণিত হোক।
লেখক: দিলরুবা সরমিন, আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী
আপিল বিভাগে একাত্তরে আলবদর নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের ফাঁসির রায়ের প্রতিবাদে গত বুধবার ডাকা প্রথম দিনের হরতালের সকাল বেলা। নয়টার দিকে রাজধানীর বড় মগবাজার এলাকায় জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের আশপাশের বইয়ের দোকানগুলো তখনো বন্ধ। দোকানগুলো এখনো বন্ধ কেন? একজন মুদি দোকানির (যিনি নিজেও জামায়াত সমর্থক) জবাব এলো, ‘কোথা থেকে এসেছেন কে জানে, আপনি জানেন না কারা হরতাল ডেকেছে?’
-‘হ্যাঁ, জানি তো, জামায়াত।’
-‘হরতালে কি দোকানপাট খোলা থাকে?’
-আপনি যে রেখেছেন?
-‘আমার তো খাদ্য বিভাগ। তাই বাধ্য হয়ে রাখতে হয়েছে।’
মিনিট পাঁচেক পর আবারও দেখা সেই দোকানির সঙ্গে। দ্বিতীয়বার দেখে বললেন, ‘আচ্ছা ভাই, আপনার কী লাগবে?’
-‘জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্র’।
জবাব শুনে সেই দোকানি বললেন, ‘শোনেন, গঠনতন্ত্রের পক্ষের লোক, বিপক্ষের লোক সবাই বিপদে আছে। নিরাপদে চলে যান।’
-‘চলে যাব কেন?’
-‘আশপাশে পুলিশ, গোয়েন্দার লোকজন। ওরা সব নজর রাখছে।’
-‘তা রাখুক। কিন্তু গঠনতন্ত্র আমার চাই, একটা ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন?’
শুরুতে অসম্মতি জানালেন। কিন্তু বারবার অনুরোধ করার একপর্যায়ে ওই ব্যক্তি নিজের দোকানে ঢুকলেন। অনেক খোঁজাখুঁজি করে একটি গঠনতন্ত্র বের করে কাগজে মোড়ালেন। সুতো দিয়ে বেঁধে হাতে তুলে দিতে দিতে বললেন, ‘সোজা চলে যান। কোথাও দাঁড়াবেন না। সময় খারাপ।’
২২ টাকা দাম মিটিয়ে ফিরে আসতে আসতে পেছন ফিরে দেখা গেল, ওই ব্যক্তি তখনো তাকিয়ে আছেন ফেরার পথে।
জামায়াতের সমর্থক এক দোকানির এমন আচরণ যেন জামায়াতের সামগ্রিক চিত্রের প্রকাশ।
শুধু ঢাকা বলে নয়, প্রায় সারা দেশেই নিষিদ্ধ সংগঠনের মতো আচরণ করছে জামায়াতে ইসলামী। কোথাও প্রকাশ্য কোনো কর্মসূচি দিতে পারছে না দলটি। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে কেন্দ্রীয় নেতা আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর হয়েছে এরই মধ্যে, আরেক নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের দন্ড কার্যকর এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। দলটির গুরু হিসেবে পরিচিত গোলাম আযমের মৃত্যু হয়েছে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে কারাবন্দি অবস্থায়।
দলের আমির মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, অর্থদাতা হিসেবে পরিচিত নির্বাহী কমিটির সদস্য মীর কাসেম আলীর ফাঁসির দন্ড হয়েছে ট্রাইব্যুনালে। নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে আজীবন থাকতে হবে কারাগারে। আরেক নায়েবে আমির আব্দুস সুবহান, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম আজহারুল ইসলামের বিচারও চলছে ট্রাইব্যুনালে।
কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকরের আগে জামায়াতের কর্মী-সমর্থকরা বিশ্বাসও করতে পারেনি সরকার এই দন্ড কার্যকর করতে পারবে। তাদের জোর বিশ্বাস ছিল, দেশে সহিংসতা এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সরকারের পক্ষে জামায়াত নেতাদের অন্তত ফাঁসি দেওয়া সম্ভব হবে না। কিন্তু এখন ভেঙে পড়েছে তাদের সেই বিশ্বাসের দেয়াল।
৫ জানুয়ারির নির্বাচন সহিংসতা করে ঠেকাতে পারলে আওয়ামী লীগ বেকায়দায় পড়বে বলেই ধারণা ছিল জামায়াতের। কিন্তু তা না হওয়ায় জামায়াতের বিপদ এখন বেড়েছে। সরকার এখনো জামায়াতকে নিষিদ্ধ না করলেও নিষিদ্ধ দলের মতোই কাজ চালাতে হচ্ছে দলটিকে। অবশ্য উচ্চ আদালতের নির্দেশে নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধনটিও স্থগিত করেছে। সব মিলিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে একাত্তরে পাকিস্তানের পক্ষে অস্ত্র ধরা দলটি। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক যে, বলতে গেলে নেতৃত্বে সংকটে হাবুডুবু খাচ্ছে দলটি।
মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষে অস্ত্র ধরে গণহত্যা চালানোর দায়ে মুক্তিযুদ্ধের পর পর নিষিদ্ধ করা হয় জামায়াতকে। দলের সব নেতা তখন যান আত্মগোপনে। ধরা পড়েন কেউ কেউ, সাজাও হয় কারো কারো। তবে গোপনে বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে মিশে গিয়ে জামায়াতকর্মীরা নানা নাশকতা চালাতে থাকেন। তবে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগে প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেন জামায়াত নেতারা। আর জিয়াউর রহমানের বদান্যতায় দেশে ফেরেন গোলাম আযম। ১৯৭৮ সালে ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ-আইডিএল নামে সক্রিয় হয় ধর্মভিত্তিক দলগুলো। জামায়াত সেখানে রাখে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। পরে নিজ নামেই রাজনীতি শুরু করে জামায়াত।
জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনের সুযোগে দেশজুড়ে নিষিদ্ধ হওয়ার আগের মতোই কাজ শুরু করে জামায়াত। আর্থিক শক্তি আর ধর্মীয় অনুভূতি ব্যবহার করে ধীরে ধীরে প্রভাব বাড়তে থাকে স্বাধীনতাবিরোধী দলটির। অবশ্য দলের নেতাদের বিচারের দাবিও ওঠে বরাবর। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর গোলাম আযমকে আমির ঘোষণার পর দেশজুড়ে স্বাধীনতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতাদের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠে জোরালো আন্দোলন। ১৯৯৪ সালে বেশ কয়েকজন জামায়াত নেতার অপরাধ মৃত্যুদন্ড পাওয়ার তুল্য বলে ঘোষণা করে গণ-আদালত। এর পর থেকেই ক্রমে চাপ বাড়তে থাকে জামায়াতের ওপর। তরে ২০০১ সালে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার পর ক্ষমতার স্বাদ নেয় দলটি। ১৯৭১ সালে যে দেশের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরে জামায়াত, সেই দেশের মন্ত্রিত্ব নেন দুই নেতা।
আলবদর বাহিনীর দুই শীর্ষ নেতা মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের গাড়িতে ৩০ লাখ শহীদের রক্তে ভেজা লাল-সবুজের পতাকা ক্ষুব্ধ করে তোলে দেশবাসীকে। জোট সরকারের পতনের পর ২০০৭ সালে জামায়াত নেতাদের বিচারের দাবিতে সক্রিয় হয় মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডারদের সংগঠন সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম। সাড়া দেয় দেশবাসী। নির্বাচনী অঙ্গীকার হিসেবে যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়টি ইশতেহারে যোগ করে আওয়ামী লীগ। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের পেছনে এই অঙ্গীকার গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে কাজ করে বলেই মনে করা হয়। নির্বাচনে জিতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরও নানা ঘটনায় বিচারে বিলম্ব আর জটিলতার কারণে তৈরি হয় সংশয়। এমনকি বিচার চলাকালেও ছড়ায় নানা গুজব। আর নানা গুজব ছড়িয়ে চাপ কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় জামায়াত। নেতাদের মূল্যায়ন হচ্ছে, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে প্রকাশ্যে আসার পর এতটা বিপাকে কখনো পড়েনি জামায়াত।
জামায়াতের অস্তিত্ব আদৗ থাকবে কি না, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে শঙ্কা। কারণ দলটির নেতাদের গড়ে তোলা শত শত প্রতিষ্ঠান পরিচালনা আগের মতো নতুনদের পক্ষে করা সম্ভব কি না, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে সংশয়। যদিও নেতারা কর্মীদের কাছে কিছুই স্বীকার করতে চান না।
দলটির সহকারী প্রচার সম্পাদক ও কর্মপরিষদ সদস্য মতিউর রহমান আকন্দ বলেন, ‘জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের মুক্ত করতে আইনি চেষ্টা চলছে। তাদের মুক্ত করতে ব্যর্থ হলেও নেতৃত্বের সংকট হবে না। কারণ সংগঠনে তরুণ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে চিন্তা চলছে।’
তবে মতিউর রহমান আকন্দ যাই বলুক না কেন, ধীরে ধীরে নিষিদ্ধ দলের মতো আচরণ করছে জামায়াত। ধর্মের অপব্যাখ্যা ও আর্থিক সুবিধা দিয়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের গরিব মানুষদের দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করলেও তা তেমন সুফল মিলছে না। কারণ ধর্মভিত্তিক অন্য দলগুলোর সঙ্গে জামায়াতের আকিদাগত বিরোধ দলটির বিপাকের আরেক কারণ। জামায়াতকে ইসলামের পক্ষের শক্তি হিসেবেই বিবেচনা করেননি দেশ বরেণ্য আলেমরা। দেশের হাজার হাজার কওমি মাদ্রাসায় জামায়াতের আধ্যাত্মিক গুরু আবুল আলা মওদুদীর মতবাদের বিরুদ্ধে বই পড়ানো হয়। ‘জামায়াত কেন ইসলামের শত্রু’ সে ব্যাখ্যা দিয়ে শত শত বই লিখেছেন ইসলামী চিন্তাবিদরা।
বিচার আর নিষিদ্ধের মুখোমুখি জামায়াত
দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছিল ধীর গতিতেই। কিন্তু এক সপ্তাহের মধ্যে পর পর তিনটি রায়ের পর বেশ গতি পেয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। এখন ঘুরে-ফিরে সামনে আসছে সংগঠন হিসেবে জামায়াতের বিচার কবে? এ প্রশ্নের উত্তর নেই ট্রাইব্যুনালের রাষ্ট্রীয় আইনজীবীদের কাছেও। কারণ আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলছেন, বিদ্যমান ট্রাইব্যুনাল আইনে কোনো সংগঠনের বিচার ও শাস্তির বিধান নেই। তাই ট্রাইব্যুনালের অধীনে জামায়াতের বিচার করতে হলে আইনে সংশোধনী আনতে হবে।
ট্রাইব্যুনালের তদন্তদল তাদের প্রতিবেদনে জামায়াতকে যুদ্ধপরাধীদের সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করে। গত ২৫ মার্চ ওই প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। ওই প্রতিবেদনের পর প্রসিকিউশন ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ জমা দেবে এবং জামায়াতের বিচার শুরু হবে, এমনটা আশা করা হয়েছিল। কিন্তু তা হয়নি।
জানতে চাইলে প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম জানান, তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপুর নেতৃত্বে একটি কমিটি করা হয়েছিল। তাদের কাজ ছিল প্রতিবেদন পর্যালোচনার পাশাপাশি অভিযোগ জমা দেওয়া। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। কারণ আইনমন্ত্রী বলেছেন, আইন পরিবর্তন ছাড়া ট্রাইব্যুনালে জামায়াতের বিচার করা সম্ভব নয়। সরকারের বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, আইন সংশোধন করে জামায়াতের বিচারের উদ্যোগও নিতে যাচ্ছে সরকার।
আইনের মারপ্যাঁচে জামায়াতের বিচার পেছানোর বিষয়টি ভিন্ন চোখে দেখছে জামায়াতের বিচারের দাবিতে সরব গোষ্ঠী। তারা বলছে, সরকার চায় না জামায়াতের বিচার করতে। তাই এ ধরনের টালবাহানা করা হচ্ছে। সরকার জামায়াতকে জিইয়ে রেখে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে চায়।
সরকার চাইলে নির্বাহী আদেশেই যুদ্ধাপরাধী সংগঠন হিসেবে জামায়াতের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে বলে মনে করেন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নির্বাহী সভাপতি শাহরিয়ার কবির। তিনি বলেন, ‘ট্রাইব্যুনালের একাধিক রায়ের পর্যবেক্ষণে জামায়াতকে যুদ্ধাপরাধীদের দল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জামায়াত দলীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে যুদ্ধাপরাধ করেছে। এখানে ‘চেইন অব কমান্ডের’ দায়ও পরিষ্কার।
শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘আইনটি সংশোধনের জন্য কেন ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, সেটা একমাত্র আইনমন্ত্রীই ভালো বলতে পারবেন। কিন্তু এ কারণে মানুষের হতাশা বাড়ছে এবং সবাই ক্ষুব্ধ হয়ে পড়ছে। আর কত দিন অপেক্ষার প্রহর গুনতে হবে কে জানে।’
জামায়াতের বিচার করতে সরকার এরই মধ্যে ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধনে খসড়া তৈরি করেছে। তবে এখনো তা অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। খসড়া অনুমোদন হলে ট্রাইব্যুনাল আইনের ২০ (২) ধারায় সংগঠনের শাস্তির বিধান যোগ হবে। তাতে ট্রাইব্যুনাল দোষী সংগঠনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করবে এবং এই নামে বা অন্য কোনো নামে সংগঠনটির ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারবে। ট্রাইব্যুনাল চাইলে সংগঠনটির সদস্যদের সাজাও দিতে পারবেন। এ ছাড়া আইনের ৪ নম্বর ধারা সংশোধনের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, কোনো সংগঠনের কার্যনির্বাহী কমিটি অথবা কেন্দ্রীয়, আঞ্চলিক বা স্থানীয় কমিটির সদস্য যদি অপরাধ করেন, তা হলে ওই অপরাধের জন্য সদস্যের পাশাপাশি সংগঠনও দায়ী হবে।
তবে ট্রাইব্যুনালের রাষ্ট্রপক্ষের আরেক আইনজীবী রানা দাসগুপ্ত অবশ্য মনে করেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য ট্রাইব্যুনালের আইনে ব্যক্তি এবং সংগঠন দুইয়ের বিচার করা যাবে। তবে সংগঠনের ক্ষেত্রে শাস্তির বিষয়টি বিচারকের ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। তাই প্রচলিত ট্রাইব্যুনাল আইনেই জামায়াতের বিচার সম্ভব। কিন্তু সরকার চাইলে সাজার পরিমাণ নির্দিষ্ট করে দিতে আইন সংশোধন করতে পারে।
জামায়াতকে নির্বাহী আদেশেও নিষিদ্ধ করা যেতে পারে বলে মনে করেন যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে আন্দোলনকারীরা। তবে সরকার এ বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছুই বলছে না।
দলীয় কর্মসূচি পালনে কর্মীদের অনীহা!
ক্যাডারভিত্তিক সংগঠন হিসেবে কেন্দ্রঘোষিত সব কর্মসূচি পালনে জামায়াতকর্মীদের আপ্রাণ চেষ্টাই এত দিন দেখে এসেছে দেশবাসী। সে জন্য জামায়াতের দলীয় শৃঙ্খলা আর কর্মীদের কর্তব্যনিষ্ঠা উদাহরণ হয়েছে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর কাছেও। সীমিত সমর্থন আর কর্মী বাহিনী নিয়ে সর্বোচ্চ প্রভাব বিস্তারের কাজ বছরের পর বছর ধরে করে এসেছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বানচালের চেষ্টায় বিএনপি-জামায়াত জোটের আন্দোলনের সময় বিএনপিকর্মীরা তেমন সক্রিয় না থাকলেও জান-প্রাণ দিয়ে খাটে জামায়াতের কর্মীরা। জামায়াত অধ্যুষিত সাতক্ষীরা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নীলফামারী, ঝিনাইদহ আর তাদের প্রভাব আছে এমন এলাকা যেমন রংপুর, জয়পুরহাট, বগুড়া, নওগাঁ, রাজশাহী, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, চট্টগ্রামে জামায়াতকর্মীদের সক্রিয়তা স্বপ্ন দেখাচ্ছিল ২০ দলের নেতাদের। ৫ জানুয়ারি ভোট ঠেকাতে যেসব এলাকায় সহিংসতা হয়েছে তার প্রায় সবগুলোই জামায়াত প্রভাবিত হিসেবে পরিচিত।
কিন্তু নির্বাচন ঠেকাতে ব্যর্থতার পর এই জামায়াতের কর্মীদের নিষ্ক্রিয়তা রীতিমতো বিস্ময় জাগাচ্ছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে। আপিল বিভাগ জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির দন্ড কমিয়ে আমৃত্যু কারাদন্ড দেওয়ার পর জামায়াত হরতাল ডাকলেও কর্মীরা মাঠে নামেনি বললেই চলে। কর্মীদের এমন আচরণে সরকারের সঙ্গে জামায়াতের আঁতাতের গুজবও ছড়ায়। এর মধ্যে এক সপ্তাহের মধ্যে গোলাম আযমের মৃত্যু, ট্রাইব্যুনালে মতিউর রহমান নিজামী ও মীর কাসেম আলীর ফাঁসি আর আপিল বিভাগে কামারুজ্জামানের ফাঁসির দন্ড বহাল রাখার পর সেই সরকার-জামায়াতের গুজব আর ডালপালা মেলতে পারেনি। কিন্তু আগের মতোই নিষ্ক্রিয় থাকে কর্মীরা।
জামায়াত ও শিবিরের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিভিন্ন কর্মসূচি পালনে মূলত শিবিরকর্মীদের ওপর নির্ভর করে মূল দল। পরীক্ষার মৌসুমে এই কর্মীরা মাঠে নামতে চাইছে না। কারণ পুলিশের হাতে ধরা পড়লে পরীক্ষা দেওয়া হবে না আর এতে করে এক বছর নষ্ট হবে। তা ছাড়া এখন আন্দোলন করেও সরকার পতন ঘটানো সম্ভব নয়- সে চিন্তাও কর্মীদের মধ্যে ঢুকেছে বলেও মনে করছেন নেতারা। আর নিজেরা আত্মগোপনে থেকে কর্মীদের চাপ দিতেও পারছেন না নেতারা।
বিদেশি যোগাযোগ প্রকাশ
নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবি এবং একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াত নেতাদের মুক্তির দাবিতে যে নজিরবিহীন সন্ত্রাস ও সহিংসতা করেছে জামায়াত তার অর্থের উৎস নিয়ে অনেক আগে থেকেই প্রশ্ন উঠেছে। দেরিতে হলেও মিলেছে সেই উত্তর। কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকায় ফাঁস করে দেওয়া খবরে বলা হয়েছে, সহিংসতার জন্য হাজার হাজার ককটেল, বিস্ফোরক, গানপাউডার, অস্ত্রশস্ত্র কেনার জন্য অর্থ দিয়েছে ভারতের বিতর্কিত বিনিয়োগকারী গোষ্ঠী সারদা গ্রুপ।
সারদা কেলেঙ্কারি নিয়ে বিপাকে আছে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস। দলটির সংসদ সদস্য আহমেদ হাসান ইমরানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তার সঙ্গে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর গোপন আঁতাত ছিল। তার মাধ্যমেই সরদা বাংলাদেশ হয়ে পশ্চিমের দেশগুলোতে টাকা পাচার করেছে। এসব অর্থের বড় একটি অংশ জামায়াতকে দিয়েছে সহিংসতার রসদ হিসেবে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক যতটাই ভালো, পশ্চিমবঙ্গে সঙ্গে দূরত্ব যেন ততটাই বেশি। তিস্তাচুক্তি, স্থলসীমান্ত চুক্তির নিয়ে বরাবরই বাংলাদেশের বিপক্ষে অবস্থান পশ্চিমবঙ্গ সরকারপ্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। মূলত তার বিরোধিতার কারণেই কেন্দ্রে সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও দুই দেশের অমীমাংসিত এসব বিষয়ের কোনো কূল-কিনারা হচ্ছে না। এর আগে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহের আলাদা সফরে এসব বিষয়ে মীমাংসা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মমতার বিরোধিতার কারণেই পালে হাওয়া পায়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেছেন, এসব কারণে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে মমতার সম্পর্কের একটা অলিখিত দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে বহু আগে। তৃণমূল কংগ্রেস তাই বাংলাদেশের ক্ষমতা পালাবদলের দিকে তাকিয়ে ছিল। নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারে এমন দলকে ক্ষমতায় আনতেই জামায়াতকে কোটি কোটি টাকা দিয়ে সহিংসতায় উস্কে দেওয়া হয়েছে বলেও মন্তব্য করেছেন অনেকে।
এই মন্তব্যের যথেষ্ট কারণও আছে। কারণ জামায়াতে ইসলামী হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচিতে সহিংসতার জন্য সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোকেই চিহ্নিত করেছিল। ওই এলাকায় সহিংসতা সৃষ্টির জন্য পর্যাপ্ত রসদও হয়তো মজুদ ছিল তাদের কাছে। অন্যদিকে ছিল পশ্চিমবঙ্গের একটি অংশের পৃষ্ঠপোষকতা।
সরদার কোটি কোটি টাকা জামায়াতের পেছনের ঢালার বিষয়টি এড়িয়ে যায়নি গোয়েন্দাদের চোখ। দেশের গোয়েন্দারা অনেক আগেই সরকারকে জানিয়েছেন বিষয়টি। সে অনুযায়ী এ নিয়ে ভারত সরকারের কাছে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ। আর জামায়াতকে অর্থ দেওয়ার অভিযোগে ভারতের সারদা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তদন্তে নেমেছে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার।
ব্যাপক সহিংসতায় দুর্নাম
৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে ও পরে দেশের উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় ব্যাপক সহিংসতা চালিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। এতে ঘটেছে ব্যাপক প্রাণহানি। আহত হয়েছে অনেকে। যুদ্ধাপরাধের দায়ে গত ১২ ডিসেম্বর ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয় জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার। ওই ঘটনার প্রতিবাদে ১৫ ডিসেম্বর সারা দেশে হরতালের ডাক দেয় জামায়াতে ইসলামী। বরাবরের মতো হরতাল কর্মসূচিকে ঘিরে ব্যাপক সহিংসতা চালায় যুদ্ধাপরাধের অভিযুক্ত দলটি। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী লালমনিরহাট ও জয়পুরহাটে প্রাণ হারায় ছয়জন। এ ছাড়া বিভিন্ন জেলায় ৪০ হাজারের বেশি গাছ কাটে জামায়াতকর্মীরা।
গত ২৮ ও ২৯ ফেব্রুয়ারি মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে মৃত্যুদন্ডাদেশ দিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী ফাঁসির আদেশের আগে ও পরে সারা দেশে জামায়াত-শিবিরের সহিংসতায় নিহত হয়েছে ৪৬ জন। এর মধ্যে আছেন পুলিশ, যুবলীগকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। সহিংসতার ঘটনা বেশি ঘটেছে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে। সহিংস হামলায় সাতক্ষীরায় ৯ জন, রংপুরের মিঠাপুকুরে ছয়জন, গাইবান্ধায় চার পুলিশ সদস্যসহ সাতজন, ঠাকুরগাঁওয়ে পাঁচজন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে এক প্রকৌশলীসহ দুজন, সিরাজগঞ্জে দুজন, বগুড়া, দিনাজপুর, নাটোর, মৌলভীবাজারে একজন করে চারজন, চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় এক পুলিশ সদস্যসহ দুজন, নোয়াখালীতে পাঁচজন, কক্সবাজারে দুজন প্রাণ হারান। এর বাইরে রাজধানীতে প্রাণ হারান দুজন।
এত ব্যাপক সহিংসতার কোনো বিচার হয়েছে, এমন নজির নেই। ভুক্তভোগীরা বলছেন, জামায়াতের সহিংসতায় প্রাণ হারানো মানুষের পরিবার বিচারের দাবি কার কাছে করবে? আদৌ কি এসবের বিচার হবে? যদি এ ধরনের একটি ঘটনার বিচার হলে পরবর্তী সময়ে কেউ আর দ্বিতীয়বার এমনটি করার সাহস দেখাত না।
বিএনপি-জামায়াত সম্পর্কের টানাপড়েন
জোটবন্ধু বিএনপির সঙ্গে দিন দিন সম্পর্কের দূরত্ব বাড়ছে জামায়াতে ইসলামীর। বলতে গেলে জামায়াতের কোনো কর্মসূচিতেই নেই বিএনপির প্রকাশ্য সমর্থন। একই অবস্থা জামায়াতের ক্ষেত্রেও। বিএনপির ডাকা আন্দোলনে আগে জামায়াতই থাকত রাজপথে। কিন্তু এখন জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীদের ওই অর্থে সক্রিয় হতে দেখা যায় না। কয়েক দিন আগে জামায়াতের সাবেক প্রধান গোলাম আযম মারা যাওয়ার পর কোনো শোকবার্তাও দেয়নি বিএনপি। আলোচনা আছে, বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশেই গোলাম আযমের মৃত্যুতে শোকবার্তা দেওয়া ও তার জানাজায় অংশ নেওয়া থেকে দূরে থেকেছে বিএনপি। এ নিয়ে গোলাম আযমের ছেলে আমান আযমী ফেসবুকে বিএনপিকে ‘অকৃতজ্ঞ’ উল্লেখ করে স্ট্যাটাসও দিয়েছেন। চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন, জামায়াতকে ছাড়া বিএনপি কোনো নির্বাচনে জয়ী হতে পারবে না। যদিও জামায়াত বলছে, এটি তাদের দলীয় বক্তব্য নয়। বিএনপিও এটিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে বলে মনে হয়নি। কারণ ওই ঘটনার পর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘গোলাম আযমের ছেলে ফেসবুকে যা লিখেছেন এটি তার নিজস্ব মতামত।’ পরে অবশ্য এই মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন গোলাম আযমপুত্র।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রকাশ্যে দুই দলের শীর্ষ নেতৃত্ব যাই বলুক না কেন, জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কের যে দূরত্ব দিন দিন বাড়ছে তা সহজেই অনুমেয়। কারণ যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার ফাঁসির পরও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি বিএনপি। এমনকি ট্রাইব্যুনালের কোনো রায়ের ব্যাপারেও কথা বলেনি দলটি। অথচ মিত্র হিসেবে জামায়াত আশা করছিল তাদের এই দুর্দিনে বিএনপি পাশে থাকবে। তাই আগামী দিনে বিএনপির আন্দোলন কর্মসূচিতে জামায়াতের কতটুকু সমর্থন থাকবে, তা এখন প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় একজন নেতা বলেন, ‘বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের জোট শুধু নির্বাচনের জন্য নয়। সুখে-দুঃখে আমরা একে অপরের পাশে থাকব, এটা ছিল উদ্দেশ্য। কিন্তু এখন অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, বিএনপি গা বাঁচিয়ে চলতে চাচ্ছে। তৃণমূল জামায়াতের নেতা-কর্মীদের মনেও এ নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। ঢাকার বাইরে গেলেই এসব প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। রাজনীতিতে বিএনপি ও জামায়াত দুই দলই ঝুঁকির মধ্যে আছে। এই পরিস্থিতি থেকে উঠে আসতে হলে সুবিধাবাদী আচরণ পরিহার করতে হবে। তা না হলে আগামী দিনে বিএনপি আন্দোলনে জামায়াতকে পাশে না পেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।’
কেন্দ্রে নেতৃত্বের সংকট
একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ২০১০ সালে একে একে গ্রেপ্তার হন দলের কেন্দ্রীয় নেতারা। গোলাম আযম ছাড়া বাকিরা সবাই জামায়াতের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম নির্বাহী পরিষদের সদস্য। আগে নির্বাহী পরিষদের সদস্য ১৫ জন থাকলেও শীর্ষ ৯ জন নেতা মানবতাবিরোধী অপরাধে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়ালে নেতৃত্ব সংকটে পড়ে জামায়াত। সেই সংকট তাৎক্ষণিকভাবে কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করলেও এখনো সফল হয়নি।
জামায়াতের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী আমির নির্বাচিত হন তিন বছরের জন্য। সে অনুযায়ী আমির মতিউর রহমান নিজামীর মেয়াদ শেষ হয়েছে অনেক আগেই। তিনি যুদ্ধাপরাধের দায়ে হাজতে আছেন তিন বছরের বেশি সময়। সেই থেকে ভারপ্রাপ্ত আমিরে চলছে জামায়াতে ইসলামী।
নির্বাহী পরিষদের বাকি সদস্যদের অনেকেই সংগঠনে সক্রিয় নন। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান আ ন ম আব্দুজ্জাহের নিষ্ক্রিয়। সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুর রাজ্জাক ট্রাইব্যুনালের মামলা নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকেন। তবে বেশ কয়েক মাস ধরে তিনি নিজেও দেশের বাইরে। রাজ্জাক কবে ফিরবেন, তা বলতে পারছেন না কেউ। শুধু ভারপ্রাপ্ত আমির মকবুল আহমদ (নায়েবে আমির), নায়েবে আমির মুজিবুর রহমান, ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল শফিকুর রহমান ও ঢাকা মহানগর আমির রফিকুল ইসলাম খান সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাচ্ছেন। তবে তারা কেউই প্রকাশ্যে নেই, কেবল জোটের সমাবেশে আত্মগোপন থেকে এসে বক্তব্য দেন। নানা হুমকি-ধমকি দিলেও তাদের কর্মীদের কর্মকান্ডে আগের মতো সেই জোস নেই আর।
জেলা ও মহানগর কমিটি নভেম্বরে ঘোষণা
আমির, কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ থাকছে আগের মতোই। এসব পদে বহাল থাকছেন একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দ-প্রাপ্ত নেতারাও। তবে জেলা ও মহানগর কমিটিগুলোতে পরিবর্তন আসছে। জামায়াতের দলীয় সূত্র জানায়, জেলায় জেলায় গোপন ব্যালটের মাধ্যমে রুকনরা নেতা নির্বাচন করেছেন। প্রায় ৩৭ হাজার রুকন এতে অংশ নেন। কেন্দ্র থেকে নির্বাচন কমিশনের সদস্যরা জেলা ও মহানগর পর্যায়ে ঘুরে ঘুরে এসব ভোট সংগ্রহ করেছেন। ভোটাভুটি শেষ। এখন নভেম্বরের যেকোনো সময় তা প্রকাশ করা হবে।
জামায়াত নেতা মতিউর রহমান আকন্দ বলেন, ‘আমির নির্বাচন রুকন সম্মেলন ছাড়াও হতে পারে। নিজ নিজ জায়গা থেকে ভোট দেবে, নির্বাচন কমিশন সেটি ফলাফল আকারে প্রকাশ করবে। কিন্তু আমির নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংবিধানের যে বাধ্যবাধকতা ছিল, সেটি সংশোধন করার কারণে নির্দিষ্ট সময়ে আমির নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা নেই।’
দলীয় সূত্র জানায়, কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার পর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দলীয় কাঠামো। এই পরিষদের বর্তমান মোট সদস্য ৪০। এই পরিষদের ওপরেই জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ভার। এই পরিষদ কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সদস্যদের মাধ্যমে মনোনীত। দীর্ঘদিন কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার নির্বাচন না হওয়ায় এই পরিষদ মনোনয়নও বন্ধ আছে। তবে যেকোনো সময় কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সর্বসম্মতিক্রমে এই পরিষদের সদস্য বাড়তে পারে। এ ক্ষেত্রে মনোনীত সদস্যকে অবশ্যই কেন্দ্রীয় শুরা সদস্য হতে হয়। এই কেন্দ্রীয় শুরা ও কর্মপরিষদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে থাকে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ। এই পরিষদও কেন্দ্রীয় শুরার মাধ্যমে মনোনীত হয়। ২০১১ সালে এর সদস্য সংখ্যা ২১ হলেও বর্তমানে সদস্য সংখ্যা ২৬। এই পরিষদের নির্বাচনও এখন হবে না। কারান্তরীণ আমির মতিউর রহমান নিজামীকে রেখে কেন্দ্রীয় কোনো নির্বাচনে যাবে না জামায়াত। নিজামীর সর্বশেষ অবস্থার ওপর নির্ভর করছে সব কিছু।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জামায়াত নেতা ও সাবেক একজন সংসদ সদস্য জানান, ১/১১-এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় জামায়াতের রুকন সম্মেলন হয়। এরপর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে বিরূপ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রকাশ্যে আর রুকন সম্মেলন হয়নি। কিন্তু গোপনে বিশেষ রুকন সম্মেলন করে সংশোধন আনা হয় গঠনতন্ত্রে। ওই সংশোধনীর পর নিজামীকে আমির রাখা হয়।
জামায়াতের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, ‘জামায়াতের সর্বোচ্চ ফোরাম হচ্ছে রুকন সম্মেলন। সিদ্ধান্তের ব্যাপারে চূড়ান্ত ক্ষমতা এই সম্মেলনের। এরপরই কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার ক্ষমতা। সদস্য সম্মেলনের সিদ্ধান্তের বিপরীতে না হলে সব বিষয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার হাতে রয়েছে।’ তবে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, বছরে দুবার মজলিসে শুরার অধিবেশন করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা হচ্ছে না। বর্তমানে জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সদস্য ১৫৯।
জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের মুক্ত করতে আইনি চেষ্টা চলছে। তাদের মুক্ত করতে ব্যর্থ হলেও নেতৃত্বের সংকট হবে না। কারণ সংগঠনে তরুণ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে চিন্তা চলছে। আমির নির্বাচন রুকন সম্মেলন ছাড়াও হতে পারে। নিজ নিজ জায়গা থেকে ভোট দেবে, নির্বাচন কমিশন সেটি ফলাফল আকারে প্রকাশ করবে। কিন্তু আমির নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংবিধানের যে বাধ্যবাধকতা ছিল, সেটি সংশোধন করার কারণে নির্দিষ্ট সময়ে আমির নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা নেই।
তুহিন মালিক: মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস লেখার সৎ সাহসী লোকগুলো আজ কোথায় হারিয়ে গেল নির্মোহ ইতিহাস লেখার সাহস হয়তো কোনো দিনই পাবেন না জেনারেল সফিউল্লাহ বীরউত্তমদের মতো ব্যক্তিরা। পঁচাত্তর-পরবর্তী তার ভূমিকা যে বড়ই বিতর্কিত। আওয়ামী লীগের মধ্যেই তাকে নিয়ে রয়েছে বিশ্বাসহীনতা আর অস্বস্তিবোধ। এই বয়সে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে একচুল পরিমাণ সত্য লেখার সৎ সাহস অর্জন করা তার পক্ষে কঠিনতম। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাদের মধ্যেও এমন কেউ নেই, যে কি না সত্য লেখার জন্য কলম ধরবেন। কী করে ইতিহাস লিখবেন একজন উপদেষ্টা খন্দকার মোশতাকের মন্ত্রিসভার শপথের গল্পে ঘিরে আছে তার নাম। মওদুদের ভায়রা আরেক উপদেষ্টা ছিলেন দক্ষ আমলা। তিনি ঠিকই জানেন কলম ধরার বিপদের কথা।
সাবেক ছাত্রলীগ নেতারা এভাবে আজ পর্দার আড়ালে চলে গেছেন। নূরে আলম সিদ্দিকী রীতিমতো আওয়ামী ঘরানায় একজন অবাঞ্ছিত ব্যক্তি। কেবল আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর সমালোচনা করায় মাহমুদুর রহমান মান্না, অধ্যাপক আবু সাঈদ বা সুলতান মনসুররা আজ আওয়ামী ডিকশনারিতে রীতিমতো ‘মীরজাফর’তুল্য। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী তো অনেক আগেই নব্য রাজাকারের উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন। শেখ হাসিনার ঐকমত্যের সরকারের এক সময়ের মন্ত্রী আসম আবদুর রব অনেকটাই শাসক দলের শত্রুতে পরিণত হয়েছেন। অসুস্থ শাজাহান সিরাজ সুস্থ থাকলেও বোধহয় কোনো লাভ হতো না। ইমেজ-সংকট আর জনগণের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ মুক্তিযুদ্ধের অন্য নেতারা অনেক আগেই হারিয়ে গেছেন।
মুক্তিযুদ্ধের কিংবদন্তি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ আজ আওয়ামী রাজনীতির চক্ষুশূল। তার গৌরবময় অবদান ও কীর্তি একেবারেই মানতে নারাজ তারা। তাজউদ্দীনকে হত্যা করতে চেয়েছিল মুজিব বাহিনীÑ এ কথা প্রকাশ্যেই বলে বেড়াচ্ছেন তাজউদ্দীন আহমদের বড় মেয়ে শারমিন আহমেদ। তার লেখা ‘তাজউদ্দীন আহমদ নেতা ও পিতা’ বইটির প্রতিটি পাতার ভাঁজে ভাঁজে লুকানো আছে ইতিহাসের অনেক নির্মম সত্য আর ভয়ঙ্কর সব তথ্য।
বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর আওয়ামী লীগের ১৯ জন মন্ত্রী যখন আনন্দচিত্তে মন্ত্রিত্বের শপথ গ্রহণ করে, তখন দলের অকুতোভয় যারা ছিলেন আজ তারাই দলের সবচেয়ে বড় শত্রু। গর্তে লুকানো রক্ষীবাহিনীর নেতারা আজকে বড় বড় পদে। অথচ দল বা সরকারে কোনো জায়গা নেই ইতিহাসের সাক্ষী ড. কামাল হোসেন আর ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামদের মতো ত্যাগী মানুষদের। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র, মুজিবনগর সরকার গঠন এবং সংবিধান প্রণয়নের ইতিহাস সবচেয়ে বেশি তারাই জানেন। মুক্তিযুদ্ধের কিংবদন্তি সব চরিত্রকে আওয়ামী লীগই বিতর্কিত করেছে বলে অনেকেই মনে করেন।
এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) একে খন্দকার সম্প্রতি তার লেখা বইয়ে নতুন কিছু কী লিখেছেন ৭ মার্চের ভাষণে ‘জিয়ে পাকিস্তান’ শব্দ দুটির কথা এর আগে নির্মল সেন ‘আমার জীবনে ৭১-এর যুদ্ধ’ বইতে লিখেছেন। আরেক সেক্টর কমান্ডার কাজী নুরুজ্জামান ‘রিমেমবারস বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার ১৯৭১’ বইতে লিখেছেন। আহমেদ ছফার প্রবন্ধ সংকলন থেকে সলিমুল্লাহ খানের সম্পাদনায় ‘বেহাত বিপ্লব ১৯৭১’ বইতেও এ কথা বলা আছে। অলি আহাদের ‘জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫-৭৫’ বইতে এ কথা আছে। ২০১১ সালের ৭ মার্চ তারিখের এক পত্রিকায় আতাউস সামাদের ‘যেভাবে আমরা পেলাম দিনটি’ শীর্ষক কলামেও একই কথা আছে। বদরুদ্দীন উমরের লেখা ‘আমার জীবন (তৃতীয় খ-)’ বইতে। সাবেক প্রধান বিচারপতি এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের ‘বাংলাদেশের তারিখ’ নামের বইয়ের প্রথম সংস্করণে তিনিও তাই লিখেছেন। কবি শামসুর রাহমান নিজেও তার স্মৃতিচারণমূলক বই ‘কালের ধুলোয় লেখা’ বইতে লিখেছেন যে বঙ্গবন্ধু ‘জয় বাংলা, জিয়ে পাকিস্তান’ বলে তার বক্তব্য শেষ করেছিলেন।
এই বিতর্ক নতুন কিছু নয়। ‘৯৬-এর আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাবস্থায়ই এ নিয়ে বহু বিতর্ক হয়েছে। হুমায়ূন আহমেদ ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ এবং ‘দেয়াল’ গ্রšে’ এই তথ্য সন্নিবেসিত করলে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি হয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে, একে খন্দকার আওয়ামী সরকারের পরিকল্পনামন্ত্রী থাকাকালীন প্রকাশিত ‘মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর’ গ্রšে’ও একই তথ্য প্রকাশ করলে তখন কেউ তাকে রাজাকার বা পাকিস্তানের এজেন্ট বলেনি!
আমাদের রাজনৈতিক চরিত্রগুলো সুপারম্যান বা সুপার ভিলেনের। এখানে রক্ত-মাংসের কোনো মানুষের চরিত্র যেন থাকতে নেই। বঙ্গবন্ধু রক্ত-মাংসের একজন মানুষ ছিলেন। তিনি কোনো সুপারম্যান নন। তিনি ছিলেন একজন রাজনৈতিক নেতা। রাজনৈতিক কলাকৌশল মেনেই তাকে রাজনীতি করতে হয়েছিল।
এ দেশের মুক্তি সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা অনস্বীকার্য। নেতৃত্বের ফলেই তিনি মহানায়ক হয়েছিলেন। যারা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বাণিজ্য করে, বঙ্গবন্ধুর নাম বিক্রি করে সংসার চালায়, তারা বঙ্গবন্ধুর সমালোচনাকে সহ্য করতে পারে না নিজেদের বাণিজ্য ঘাটতির ভয়ে। এই অবিবেচকরাই বঙ্গবন্ধুকে ৭ মার্চের ভাষণে আর মুজিব কোটে সীমাবদ্ধ করে রাখতে চায়। মনে রাখতে হবে, বঙ্গবন্ধু তার সব সীমাবদ্ধতা নিয়েই ইতিহাসের মহানায়ক হয়েছিলেন। স্বাধীনতা নিয়ে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণে কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থতা নিয়ে সমালোচনা কোনোক্রমেই তার অবমাননা হতে পারে না।
সমালোচনার অধিকার আমাদের প্রত্যেকের নাগরিক ও সাংবিধানিক অধিকার। সমালোচনা করলে বঙ্গবন্ধু কখনো খাটো হওয়ার নন। আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুর পরিবার কেন সমালোচকদের ঘোর শত্রু মনে করে বঙ্গবন্ধু চরিত্রের মূল উপাদানও তো শাসকদের সমালোচনায় মহিমান্বিত।
মুক্তিযুদ্ধের উপ-প্রধান সেনাপতি এবং যার সম্মুখে হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করে সেই বীর সেনানী এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) একে খন্দকারকে রাজাকার, কুলাঙ্গার বা আইএসআইর এজেন্ট বলা চরম দুঃখজনক ও লজ্জাকর। দেউলিয়া রাজনীতির এ কোন হিংস্র শিকারে পরিণত হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু কর্তৃক বীরউত্তম খেতাবপ্রাপ্ত একজন মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে তাদের এহেন কাজে মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নবিদ্ধ ও হাস্যকর হয়ে ওঠে। এ দায় কাদের ওপর বর্তাবে এমন প্রশ্ন সবার।
এগুলো নিয়ে সংসদ উত্তপ্ত করে জ্বালাময়ী ভাষণ আর কুলাঙ্গার-রাজাকার আখ্যা দিয়ে মাঠ গরম করা যায় সত্যি। কিন্তু মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবকে মানুষের মনে প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগও পাকাপোক্ত করা হয়। জাতীয় জীবনে এটি একটি ভয়ঙ্কর খেলা। কারণ ৭ মার্চের ভাষণ যারা রেডিওতে শুনেছেন বা যারা সরাসরি রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত ছিলেন তাদের অনেকেই এখনো জীবিত আছেন। আরও ভয়ঙ্কর হচ্ছে, এখনো হয়তো সেই ভাষণের টেপ ভারত কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের মতো বন্ধুপ্রতিম দেশের হাতে রয়েছে। অনর্থক এগুলো নিয়ে বাড়াবাড়ি করা ঠিক নয়।
এ কেমন নীতি সত্য বললে দেশদ্রোহী রাজাকার! আর মিথ্যা বললে পদ-পদক পুরস্কার! সারা জাতি আজ পদ পুরস্কারের মোহে আবদ্ধ। ক্ষমতা আর অর্থের লোভে সত্য আজ নির্বাসিত। আসলে আমাদের জ্ঞান প্রবেশ করে দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তি দিয়ে। আর লোভও কিন্তু সে রকমই চোখ আর কান দিয়েই প্রবেশ করে। কিন্তু আমাদের মন একসঙ্গে দুটোকে মনের মাঝে জায়গা দিতে পারে না। তাই মনের মাঝে লোভ জায়গা দখল করে বসলে তাতে মানুষের হিতাহিত জ্ঞান লোপ পায় অনায়াসে। এই লোভী রাজনীতির কবল থেকে মুক্ত করতে হবে আমাদের মহান অর্জনগুলোকে। ইতিহাস নিয়ে বাণিজ্যিক চর্চা না করে আমাদের আগামীর গৌরবময় ইতিহাস রচনার কাজ শুরু করতে হবে। এটিই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। (আমাদের সময়)
লেখক : আইনজ্ঞ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ
গোলাম মোর্তোজা: জীবিত অবস্থায় যা-ই হোক না কেন, মৃত মানুষকে সম্মান-শ্রদ্ধা করার একটা প্রচলন আমাদের সমাজে, ধর্মে দেখতে পাই। এ রকম একটি প্রচারণাও নানা সময়ে কিছু মহল থেকে চালানো হয়। সম্প্রতি গোলাম আযমের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে আর একবার বিষয়টি আলোচনায় এলো। এই গোলাম আযম কে? ১৯৭১ সালে সে কী করেছিলÑ কোনো কিছুই অজানা নয়। কিছু নিজে মুখে স্বীকারও করে গেছে বিভিন্ন সময়। তার কর্মকা-ের যাবতীয় তথ্যপ্রমাণ ইতিহাসে রয়ে গেছে।
যুদ্ধাপরাধের বিচার, গোলাম আযমের মৃত্যু, তার জানাজায় লোক সমাগম, সরকার ও সরকার সংশ্লিষ্টদের ভূমিকাৃ প্রভৃতি বিষয় নিয়ে কিছু কথা।
১. জীবিত বা মৃত যা-ই হোক, চাইলেই কি সবাইকে শ্রদ্ধা করা যায়? সম্মান দেখানো যায়? শ্রদ্ধা বা সম্মান দেখানোর বিষয়টি তো মানুষের ভেতর থেকে আসে। একজন কুখ্যাত ডাকাত বা সন্ত্রাসীর মৃত্যুর পর কি আমরা সম্মান দেখাতে পারি? সম্মান দেখানো হয়? উত্তর নিশ্চয়ই ‘না’। তাহলে গোলাম আযমকে কী করে দেশের মানুষ সম্মান দেখাবে? একজন সন্ত্রাসী কিছু মানুষ হত্যা করে, চাঁদাবাজি করে, সন্ত্রাস করে। আর গোলাম আযম জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্মের বিরোধিতা করেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যার জন্য রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী গঠন করেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যার আহ্বান জানিয়েছে। ধর্মের কথা বলে মানুষ হত্যা করেছে। নারীদের অসম্মান-অশ্রদ্ধা করেছে। তার গঠিত বাহিনীকে দিয়ে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করিয়েছে। সেই মানুষটিকে বাংলাদেশের মানুষ সম্মান জানাতে পারে না।
২. গোলাম আযমের অপরাধ আদালত দ্বারা স্বীকৃত। সে আদালত দ্বারা দ-প্রাপ্ত প্রমাণিত যুদ্ধাপরাধী। দেশের মানুষের প্রত্যাশা ছিল সর্বোচ্চ শাস্তি, তা হয়নি। মানুষের ভেতরে ক্ষুব্ধতা ছিল, আছে। এ কারণে সরকার যথেষ্ট সমালোচনার মুখে পড়েছে। দ-প্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযম বিষয়ে সরকারের যে আচরণ তাতে সমালোচনা হওয়া খুবই স্বাভাবিক। বিচারের আগেও গোলাম আযমের প্রতি সরকারের একটা সহানুভূতিশীল আচরণ দৃশ্যমান ছিল। বিচার এবং মৃত্যুর পরও তা অব্যাহত। এ প্রেক্ষিতে সরকারের সমালোচনা করছি। আরও সমালোচনা করা যায়। সেই সমালোচনা হবেও।
তবে এ বিষয়টিও আমাদের মনে রাখতে হবে যে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল বলেই যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হতে পেরেছে। তদন্ত, তথ্যপ্রমাণে দুর্বলতা, কাক্সিক্ষত গতি পায়নি বিচার, ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বৃদ্ধি না করাÑ স্বয়ংসম্পূর্ণ না করা, নিম্নমানের প্রশ্নবিদ্ধ আইনবিদ নিয়োগ দেয়াৃ ইত্যাদি কারণে শেখ হাসিনা সরকার সমালোচিত। এই সমালোচনা অসত্য নয়। তারচেয়েও বড় সত্য এই যে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, কয়েকটি রায় হয়েছে, একজন অপরাধীর ফাঁসি হয়েছে, অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধীদের বেশ কয়েকজনকে গত কয়েক বছর জেলে রাখা গেছে। এটা খুব ছোট বিষয় নয়। শেখ হাসিনা সরকারকে বড়ভাবে ধন্যবাদ দিতে হবে এ কারণে, বেশকিছু দুর্বলতা, টালবাহানা সত্ত্বেও এই কাজটি আওয়ামী লীগ সরকার ছাড়া আর কেউ করত না, করবে না।
সরকারকে, শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানানোর পাশাপাশি এই কথাটিও মনে রাখতে অনুরোধ করব, এটা কিন্তু জনগণের প্রতি দয়া বা করুণা নয়। বিচার করতে চেয়েছিলেন বলেই দেশের মানুষ আপনাদের ভোট দিয়েছিল, একথা ভুলে যাবেন না।
৩. জামায়াতের পক্ষ থেকে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রচারণা চালানো হয়েছে, হচ্ছে যে, মিথ্যা অভিযোগে তাদের নেতাদের বিচার চলছে। ট্রাইব্যুনাল আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নয়।
বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। সেই রাষ্ট্রের যাবতীয় আইন মেনে, দেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে নাগরিকরা বসবাস করেন। তাদের অনেক অভিযোগ থাকে। অভিযোগ থাকে আইন-আদালত, বিচার ব্যবস্থা, আইন শৃক্সখলাৃ ইত্যাদি নিয়ে। একটি দেশের সামগ্রিক যে অবস্থা, তার সব প্রতিষ্ঠানের চিত্র এর চেয়ে খুব আলাদা হওয়ার সুযোগ থাকে না। উন্নয়ন চাই, তবে উন্নয়ন যতদিন হবে না, ততদিন আইন মানব নাÑ সেটা করার কোনো সুযোগ নেই।
আদালত গোলাম আযমের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দিয়েছিল। দেশের নাগরিক হিসেবে আমি খুশি নই। কিন্তু সেটা মানতে আমি বাধ্য, মেনে নিয়েছি। গোলাম আযমের সর্বোচ্চ শাস্তি না হওয়ায় খুশি না হলেও তা মেনে নিতে হয়েছে। আপনাকে নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দিলে, রায় আপনার পক্ষে গেলে মেনে নেবেন, আর দ-প্রাপ্ত হলে মানবেন না- এই দ্বিমুখিতা কেন?এটা জামায়াতের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য। সারাজীবন জামায়াত এমন স্ববিরোধী, বিভ্রান্তিকর, দ্বিমুখী রাজনীতি করেছে, এখনও করছে।
৪. লেখার শুরুতে উল্লেখ করেছি সম্মান ও শ্রদ্ধার প্রসঙ্গ। সমাজ ধর্মে আর একটি বিষয় প্রচলিত আছে, মৃত্যুর আগে বা মৃত্যুর পরে তার আত্মীয় পরিজন মৃত ব্যক্তির জানা-অজানা যাবতীয় অন্যায়-অপরাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। গোলাম আযম মৃত্যুর আগে স্বীকার করেনি যে, সে ১৯৭১ সালে মানুষ হত্যা করে, করিয়ে, বাংলাদেশের জন্মের বিরোধিতা করে, ভুল-অন্যায় করেছিল। পরিবারের পক্ষ থেকেও জানাজায় ১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা বা এমন কিছু করা হয়নি।
সুতরাং এই মানুষটিকে শ্রদ্ধা-সম্মান দেখানোর প্রসঙ্গটিও অবান্তর।
৫. বিতর্ক তৈরি হয়েছে তার দাফন-জানাজার প্রসঙ্গ নিয়েও। জাতীয় মসজিদে একজন যুদ্ধাপরাধীর জানাজা করতে দেয়া হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছিল কয়েকটি সংগঠন। জানাজায় লোক সমাগম হয়েছে উল্লেখ করার মতো, প্রচুরসংখ্যক। প্রতিরোধের ডাক দেওয়াওয়ালাদের অস্তিত্ব ছিল না কোথাও। একটি জুতা নিক্ষেপ প্রতীকী প্রতিবাদ বলা যায়। অবিবেচকের মতো কর্মসূচি দিয়ে ব্যর্থ হওয়াটা লজ্জার। এমনটা কেন ঘটল? প্রতিরোধের ডাক যারা দিল, তারা কারা, তারা কী করল?
ক. জামায়াত-শিবির প্রতিরোধের ডাককে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিল। তাদের মত ও পথের সব মানুষকে তারা জানাজায় অংশগ্রহণ করিয়েছে।
খ. জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের জানাজা যাতে নির্বিঘেœ হয়, সরকার তার সব রকমের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে।
গ. যারা মনে করেছেন জাতীয় মসজিদে যুদ্ধাপরাধীর জানাজা হওয়া উচিত নয়, সরকার তাদের মতের সঙ্গে মোটেই একমত নয়- তা প্রমাণ হয়েছে। ফলে নির্বিঘেœ বিপুলসংখ্যক জামায়াত-শিবিরের অংশগ্রহণে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জে জয়ী হয়েছে জামায়াত-শিবির। পরাজয় ঘটেছে প্রতিরোধের ডাক দেয়াওয়ালাদের।
ঘ. সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে প্রতিরোধের নামে আস্ফালন করানো হয়েছে কয়েকজন নির্বোধকে দিয়ে। কিন্তু ব্যর্থতার গ্লানি বহন করতে হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব মানুষকে।
৬. এই প্রতিরোধের ডাক দেয়াওয়ালারা কারা? আইয়ুব খান এক সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের দমন করার জন্য তার অনুগত ছাত্র নামধারী মাস্তান-ক্যাডার ‘পাচ পাত্তুর’দের হাতে সাপ তুলে দিয়েছিল। সেই সাপ নিয়ে তারা ক্যাম্পাসে ঘোরাফেরা করত। ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, কর্মচারীদের ভয় দেখাত। তাদেরকে কেউ ভয় বা সমীহ করেনি। পতন হয়েছে তাদেরই। তারই ধারাবাহিকতায় এখন দেশের মানুষ একদল নির্বোধের আস্ফালন দেখছেন। তারা মুখে বলছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা। আর যত রকমের অপকর্ম করা সম্ভব, তার সবই করছে। এরা সরকারের পোষ্য, সরকারের তোষামোদকারী-চাটুকার। সরকার বা পুলিশ কোনো কাজ করে দিলে তারা নিজেদের নামে চালাতে পারে, বাধা না দিলেও নিজেদের যোগ্যতায় কিছু করতে পারে না। সেই নীতি-নৈতিকতা, যোগ্যতা তাদের নেই। স্থূল নোংরা মানসিকতার ‘হঠাৎ নেতাদের’ পরিচালনায় এদের এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং শহীদ মিনার এলাকায় মাঝেমধ্যে আস্ফালন করতে দেখা যায়। যেহেতু গোলাম আযমের জানাজা প্রতিরোধের কাজটি সরকার করে দেয়নি। সুতরাং তারাও কিছুই করতে পারেনি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মুখে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের কাছে পরাজয় মেনে নিয়েছে।
সরকার এবং আওয়ামী লীগ নীতি-নৈতিকতাহীন, বোধবুদ্ধিশূন্য, অবিবেচক, ইতিহাস না জানা একদল নির্বোধের হাতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তুলে দিয়ে, তাদেরকে দিয়ে ‘পুতুল নাচ’ দেখাচ্ছে দেশের মানুষকে। মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে তাদেরকে দিয়ে সমাজের গুণী মানুষদের অসম্মান, অশ্রদ্ধা করানো হচ্ছে প্রতিনিয়ত। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে, যুদ্ধাপরাধের বিচারের পক্ষের সবচেয়ে সক্রিয় মানুষদেরও অসম্মান করানো হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে।
সরকারের অনিয়ম-দুর্নীতির সমালোচনাকে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধের বিচারবিরোধী প্রচারণা হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে অত্যন্ত স্থূল ও অরুচিকরভাবে। স্বাধীন বাংলাদেশে এদেরকে আইয়ুব খানের সেই সাপ ওয়ালা’দের ভূমিকায় অবতীর্ণ করা হয়েছে।
৭. এরা ইতিহাসের সত্য জানে না, জানার যোগ্যতাও নেই। এই সমাজে যারা জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাস নিয়ে সবচেয়ে বেশি লিখেছেন, যারা যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে সবচেয়ে বেশি তৎপর, তাদেরই চরিত্র হনন করা হচ্ছে নির্বোধদের দিয়ে। এরা এতই কম জানা এবং অপরিণত মানসিকতার যে, মুক্তিযুদ্ধের সনদ জালিয়াতি করা আমলাদের নিয়ে তারা কথা বলতে পারে না। বিদেশি বন্ধুদের দেয়া ‘পদক কেলেঙ্কারি’ নিয়েও তারা নড়েচড়ে না। ১৯৭১ সালে যাদের বয়স ১৫ বছর ছিল না, তারা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন না- সরকারের করতে যাওয়া উদ্ভট নীতিও তারা চোখে দেখে না, কানে শোনে না। এই আইন কার্যকর হলে বীরপ্রতীক তারামন বিবি আর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন না। কারণ তার বয়স ১৯৭১ সালে ছিল ১৪ বছর। এমন যোদ্ধা আছেন হাজার হাজার। এসব নিয়ে সরকার পুতুল নাচায় না, পুতুল নাচায় তার অপকর্মের সমালোচনাকারীদের বিরুদ্ধে। ব্যবহার করে মুক্তিযুদ্ধকে।
৮. কথা বলছিলাম মৃত গোলাম আযম প্রসঙ্গে। বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান যুদ্ধবিমান নিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে আসার সময় নিহত হয়েছিলেন। পাকিস্তানের মাটিতে তাকে কবর দেয়া হয়েছিল। পাকিস্তানিরা বীরশ্রেষ্ঠ মতিউরের কবরে লিখে রেখেছিল ‘গাদ্দার’। পাকিস্তানিদের কাছে তিনি ছিলেন ‘গাদ্দার’, আমাদের কাছে তিনি বীর, বীরশ্রেষ্ঠ। বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর বাংলাদেশের পক্ষে যুদ্ধে অংশ নিয়ে পাকিস্তানিদের হত্যা করতে পারেননি। তার আগেই তিনি নিহত হয়েছেন। তার কবরস্থান পাকিস্তান থেকে দেশে আনা হয়েছে। সম্মান দেখানো হয়েছে।
গোলাম আযমরা পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে থেকে, পাকিস্তানি বাহিনীকে সহায়তা করেছে, বাহিনী তৈরি করে সাধারণ মানুষ, মুক্তিযোদ্ধা, বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করিয়েছে। স্বাধীন দেশের বিচারে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। সেই গোলাম আযম, সেই গোলাম আযমদের জানাজা বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা ধর্ম বিরোধিতা নয়, কোনো অপরাধও নয়। এখন কি গোলাম আযমের কবরে আমরা ‘গাদ্দার’ লিখে রাখব?
প্রশ্ন আসবে পাকিস্তানিরা যা করেছিল, আমরাও তা-ই করব কি না? না, আমরা তো পাকিস্তানিদের মতো বর্বর নই। পাকিস্তানিরা যা করেছিল আমরা তা করতে পারি না। কিন্তু মানুষের ঘৃণা প্রকাশে বাধা দেয়া যাবে না। যুদ্ধাপরাধীর জানাজায় এভাবে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া যাবে না।
৯. আবার অন্যভাবে বলি, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় যুদ্ধাপরাধীদের দাফন সম্পন্ন হওয়া উচিত। কোনো হইচই, লোক সমাগমের আয়োজন করার রাজনৈতিক সুযোগ না দিয়ে, আত্মীয় পরিজনদের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় দাফনের ব্যবস্থা করতে হবে। আজিমপুর কবরস্থানের একটি অংশে বিশেষভাবে আলাদা করে সব যুদ্ধাপরাধীর দাফনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তাহলে ইতিহাসে থেকে যাবে না যে, এখানে যুদ্ধাপরাধীদের দাফন হয়েছিল। মানুষ তার মনের ভাব সেখানে প্রকাশ করতে পারবে।
১০. বাস্তবে এমন কিছু না করে, একদল নির্বোধ পুতুলকে দিয়ে সরকার পুরো বিষয়টিকে বিতর্কিত করে দিচ্ছে। যাদেরকে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের মানুষদের অসম্মান করানো হচ্ছে, তাদেরকে দিয়েই আবার যুদ্ধাপরাধীদের প্রতিরোধের নামে নিস্ফল আন্দোলন করানো হচ্ছে। জনমানুষের কাছে এসব ‘জড় পদার্থতুল্য’ পুতুলদের কথা কোনো গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে না। প্রকারান্তরে সুচতুরভাবে ক্ষতি করা হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তির। উপকার করা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তির। সরকার একাজ জেনে বুঝে করছে না, এমনটা বলার সুযোগ থাকছে না।
১১. এটা করে সরকার বা আওয়ামী লীগের কী লাভ? সরকার, আওয়ামী লীগ চায় নির্বাচন ছাড়া আজীবন ক্ষমতায় থাকতে। যারা এর সমালোচক, সরকার তার পুতুলদের দিয়ে এদেরকে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করতে চায়। বিএনপি নামক রাজনৈতিক দলটির ধ্বংস চায়। রাজনৈতিক দল হিসেবে থাকবে আওয়ামী লীগ এবং প্রতিপক্ষ হিসেবে থাকবে নিয়ন্ত্রিত জামায়াতÑজঙ্গি।
বিশ্বকে দেখানো যাবে জামায়াত এবং জঙ্গিদের বিপক্ষে একমাত্র প্রগতিশীল শক্তি আওয়ামী লীগ। সুতরাং নির্বাচন মুখ্য নয়, মুখ্য নয় গণতন্ত্র। মুখ্য জামায়াত-জঙ্গি ঠেকাতে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থাকা। এমন পরিকল্পনা নিয়েই চলছে দেশ। কিন্তু সব পরিকল্পনা কি বাস্তবায়ন হয়? জামায়াত-জঙ্গিরা কি সব সময় নিয়ন্ত্রণে থাকবে? আজ যাদের পৃষ্ঠপোষকতায় ক্ষমতায়, তারা কি সব সময় পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েই যাবে? নিজেদের দলীয় শক্তি ধ্বংস করে অন্যের করুণায় ক্ষমতায় থাকা আর ভয়ঙ্কর বিপদ ডেকে আনা একই কথা।
বিষয়গুলো ভাবতে হবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে। নির্বোধ পুতুলদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক-বাহক বানানোর অপরাজনীতি বুমেরাং হচ্ছে, হবে। এর দায় বহন করার শক্তি শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের থাকবে না। এই দায় বড় রকমের বিপদ ডেকে আনবে। শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ আরও কিছু বছর হয়ত ক্ষমতায় থাকতে পারবেন। তবে বড় বিপদেও পড়তে হবে। সেই বিপদে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশ, দেশের মানুষ।
গালাম মাওলা রনি: আমরা সবাই হাঁটছিলাম হুমায়ুন আহম্মেদের নুহাশ পল্লীর সবুজ চত্বরে। দিনটি ছিলো শুক্রবার আর তারিখ ছিলো ১৭ই অক্টোবর ২০১৪। সময় তখন সকাল ১১টা। নুহাশ পল্লীর ম্যানেজার এবং কর্মচারীরা হয়তো আগে থেকেই জানতেন যে, তিনি এবং আমি আসছি। আর তাই সেখানে পৌঁছা মাত্র তাদের উষ্ণ অর্ভ্যথনা আমাকে আপ্লুত করে। হুমায়ুন আহম্মেদ বেঁচে থাকতে বহুবার চেষ্টা করেছি সেখানে যেতে- কিন্তু হয়ে ওঠেনি। তার শ্বাশুড়ী তহুরা আলী আমার ঘনিষ্টজন হবার কারনে পারিবারিক পরিবেশে তার সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ ছিলো। সময় যখন পেলাম-তখন সবকিছু ছিলো কেবল হুমায়ুন আহম্মেদ ছাড়া।
ঘটনার দিন আমাদের মুল পরিকল্পনা ছিলো গাজীপুরের হোতা পাড়ায় গিভেন্সী গ্র“প পরিচালিত বয়স্ক পূর্নবাসন কেন্দ্র পরিদর্শনের। আমি তো হোমরা চোমরা গোছের কেউ নয়-৩/৪টি পত্রিকায় রাজনৈতিক কলাম লিখি – আর একটি পত্রিকায় লিখি দুইটি ধারাবাহিক ঐতিহাসিক উপন্যাস। একটির নাম মোঘল হেরেমের দুনিয়া কাঁপানো প্রেম এবং অন্যটি হলো; আরব্য রজনীর মহানায়ক। এর বাইরে টেলিভিশন টক শো, সভা সমিতি সেমিনার এবং ওয়াজ মাহফিলে বক্তা হিসেবে টুকটাক অংশ গ্রহন। এই সুবাদে দেশের কিছু লোকজন হয়তো আমাকে চিনেন। কিন্তু তারা যে আসলে আমাকে কিভাবে চিনেন সে ব্যাপারে আমার নিজেরই বহুৎ সংশয় আছে। কারন আমার লেখা এবং বক্তৃতার সংগে যেমন সহমত পোষন করেন এমন লোকজন আছেন তেমনি অপছন্দকারীর সংখ্যাও নেহায়েৎ কম নয়। ফলে নিজেকে নিয়ে আমার আত্মতৃপ্তি বা গর্ব অনুভব করার কোন সুযোগ আমি পাইনি। এমন অবস্থায় রিনা পারভীন নামের এক আইনজীবি আমাকে একদিন ফোন দিলেন-
রিনার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিলো বিগত গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের নিবার্চনের সময়। সে তখন গাজীপুর সদর উপজেলার নির্বাচিত মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান। পেশায় জেলা বারের একজন আইনজীবি। এক সময় ব্যারিস্টার রফিকুল হকের সহকারী ছিলো। বর্তমানে সে গিভেন্সী গ্র“পের লিগ্যাল এডভাইজার। ফোন করে রিনা জানালো যে, গিভেন্সী গ্র“পের মালিক খতিব মুকুল সাহেব আমাকে একটু দাওয়াত দিতে চান তার বয়স্ক পূর্নবাসন কেন্দ্রটি পরিদর্শন করার জন্য। আমি মুকুল সাহেব, গিভেন্সী গ্র“পকে যতটা না চিনতাম-তার চেয়েও বেশী চিনতাম তার বয়স্ক পূর্নবাসন কেন্দ্রটি। কারন এটি বাংলাদেশের একটি অনন্য সাধারন দাতব্য প্রতিষ্ঠান যা কিনা স্বয়ং মাদার তেরেসা এসে উদ্বোধন করে গেছেন। প্রায় ৪০০ বিঘা জায়গার ওপর গড়ে ওঠা বিশাল একটি মহতী প্রতিষ্ঠানে ৩০০ শত বয়স্ক নারী পুরুষ সম্পূর্ন বিনা মূল্যে থাকা-খাওয়া, চিকিৎসা, পোশাকাদিসহ সবকিছু পাচ্ছেন সেই ১৯৮৭ সাল থেকে। মুকুল সাহেব ফোন করে দাওয়াত দিলেন । তিনি জানালেন যে, ব্যারিস্টার রফিকুল হক এবং আমি নাকি তার পছন্দের অতীব পছন্দের লোক। তার ইচ্ছা আমরা যেনো তার প্রতিষ্ঠানটি একটু ঘুরে যাই এবং তার সঙ্গে দুপুরে দুটো ডাল ভাত খাই। আমি বিনা বাক্যে রাজি হয়ে গেলাম।
একটি ভালো কর্ম দেখার জন্য যাচ্ছি বিধায় স্ত্রীকেও সঙ্গে নিয়ে গেলাম। উত্তরা পৌঁছে ব্যারিস্টার রফিক এবং রিনার সঙ্গে একত্র হলাম। জনাব হকের সঙ্গে আমার পরিচয় বহু দিনের কিন্তু আন্তরিকতা ও সহমর্মিতা সৃষ্টি হয়েছে আমার কারাবাসের পর। তিনি যে আমায় এতো ভালোবাসেন তা আমি ইতিপূর্বে জানতাম না। তিনি দেশের একজন সিনিয়র আইনজীবি। গত ১/১১র সময়ে তাঁর সাহস, ব্যক্তিত্ব এবং সফলতা তাঁকে দেশবাসীর নিকট কিংবদন্তীতে পরিনত করেছে। তাঁর সঙ্গে ইতিপূর্বে কয়েকটি টকশো, সেমিনার, টেলিভিশনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এবং দূতাবাসের অনুষ্ঠানে দেখা হয়েছিলো। সেখানে কথা হতো এবং প্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে তিনি মতামত রাখতেন এবং শুভেচ্ছা বিনিময় করতেন। জেল থেকে বেরুনোর পর একটি দূতাবাসের জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠানে গিয়ে ব্যরিস্টার হকের কথা শুনে আমার চোখ অশ্র“সজল হয়ে গেলো। আমি দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে- আর তিনি গল্প করছিলেন অদুরে বসে তার মানের কয়েকজন সিনিয়র সিটিজেনের সঙ্গে। আমি ভাবছিলাম একটু এগিয়ে গিয়ে তাঁকে সালাম দিয়ে আসব কিনা! আমার ভাবনার মাঝে তাঁর সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হতেই তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে আমার নিকট চলে এলেন। আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন – ”বাবা কেমন আছ! তুমি যখন জেলে গিয়েছিলে তখন আমি দেশের বাইরে ছিলাম। ফিরে আসার পর সব কিছু শুনে খুব খারাপ লাগলো। একদিন জেল খানাতেও গিয়েছিলাম। তোমার সঙ্গে দেখা না করেই চলে এসেছি। কারাগারের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে ভেবেছি- কিভাবে এবং কোন আইনে রনিকে ভেতরে ঢোকানো হলো। তোমার জন্য মনে হয় নতুন করে আইন পড়তে হবে. . . .. . ।” ঐ দিনের পর থেকে তিনি আমার হৃদয়ে আসন নিলেন একজন সম্মানীত পিতা হিসেবে।
উত্তরাতে রিনাদের বাসার নীচতলায় আমাদের দেখা হলো। তিনি বললেন – যদি সময় থাকে তবে চলো একটু নুহাশ পল্লী দেখে আসি। আমরা সানন্দে রাজি হয়ে গেলাম । উত্তরা থেকে যাত্রা করার দেড় ঘন্টা পর আমরা প্রয়াত হুমায়ুন আহম্মেদের নুহাশ পল্লীতে গিয়ে পৌঁছালাম। প্রায় ৪০ বিঘা জায়গা নিয়ে অতীব যতন সহকারে লেখক তাঁর নির্জন এবং নিভৃত পল্লীটি গড়ে তুলেছেন। সেখানকার সব কিছুতেই হুমায়ুন আহম্মেদের ব্যক্তিগত রুচি, আভিজাত্য, পছন্দ, মেধাও মনশীলতার ছাপ রয়েছে। হুমায়ুন কি করতেন-কখন করতেন, কিভাবে করতেন তা যেনো সব নুহাশ পল্লীর সবুজ চত্বর, বৃক্ষরাজি এবং পাক-পাখালী- আগ বাড়িয়ে দর্শনার্থীদের কানে কানে বলে দিচ্ছিলো। এখানকার প্রতি ইঞ্চি ভূমি, প্রতিটি উদ্ভিদ, পুকুর, ঘরবাড়ি, স্থাপত্য এবং পায়ে হাঁটা সরু পথের গতি প্রকৃতির মধ্যে মানুষ হুমায়ুনকে খুঁজে বেড়ায়- আর সবচেয়ে বেশী খুঁজে তার প্রেয়সী মেহের আফরোজ শাওনকে।
আমরা যখন নুহাশ পল্লীর ভেতর দিয়ে হাঁটছিলাম তখন আরো ১০/১২টি পরিবারকে দেখলাম ঘোরা ফেরা করতে। স্থানীয় কিছু যুবক যুবতী, ছাত্র-ছাত্রী মিলিয়ে প্রায় শ’ খানেক লোক তো হবেই। তাদের অনেকে আবার বাড়ী থেকে খাবার নিয়ে এসেছিলো। ঘোরা ঘুরির পর কোন এক গাছের নীচে বসে সেই খাবার খেতে খেতে উৎসুক নয়নে আশে পাশে তাকাচ্ছিলো আর ভাবছিলো- হুমায়ুন তো মারা গেছেন। কিন্তু তার প্রেয়সী কই! তিনি কেনো সব সময় নুহাশ পল্লীতে থেকে হুমায়ুন ভক্তদের দেখা দেন না! ব্যারিস্টার রফিকুল হক নুহাশ পল্লীতে এসে ভারী মজা পেলেন। তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সেখানকার ম্যানেজারকে নানা কথা জিজ্ঞাসা করতে করতে পুকুর পাড়ে এসে উপস্থিত হলেন । ম্যানেজার বললেন- ঐ যে ঘরটি দেখছেন! ওখানে বসে স্যার গভীর রাতে ভূত দেখতেন । ম্যানেজারের কথা শুনে তিনি তো ভারী অবাক হয়ে গেলেন। আমি হুমায়ুন আহম্মেদ, তার পারিবারিক জীবন, চিন্তা চেতনা এবং ভূত সম্পর্কে আমার জানা নানা কল্প কাহিনী বলে তাকে আনন্দ দেবার চেষ্টা করলাম।
নুহাশ পল্লীর যে ঘরে বসে হুমায়ুন আহম্মেদ লিখতেন আমাদেরকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হলো। আমরা মেঝেতে বিছানো কার্পেটের ওপর আয়েশী ঢংয়ে বসে এমন একটি আড্ডা জমানোর চেষ্টা করলাম ঠিক যেমেনটি হয়তো হুমায়ুন আহম্মেদ জীবৎকালে করতেন। নানা রং রসের কথা হলো। হাসি তামসা, খুনসুটির পর দেশী পেঁপে, সবজী, মাংশ, লুচি এবং চা পর্বের মাধ্যমে নাস্তার কাজটি সেরে রওয়ানা হলাম গিভেন্সী গ্র“পের বয়স্ক পূর্নবাসন কেন্দ্রের দিকে। যেতে যেতে রিনা বলতে আরম্ভ করলো নুহাশ পল্লীর প্রথম দিককার কাহিনী। সে ঐ গ্রামের মেয়ে বিধায় সব কিছু ছিলো তার নখদর্পনে। হুমায়ুন আহম্মেদের মাধ্যমেই বলতে এলাকাটির আবাদ হয়। তিনি যখন প্রথম জমি কিনেছিলেন তখন হয়তো প্রতি বিঘার দাম ছিলো ১০/১২ হাজার টাকা ।
সর্বশেষে লাখ টাকা দরে কিনেছিলেন। আর এখন সেই জমির মূল্য প্রতি বিঘা কমপক্ষে ৫০ লাখ। নুহাশ পল্লীর কাজ শুরু হলে ঢাকার অতিথিদেরকে অনেকখানি পথ গরুর গাড়ীতে করে আসতে হতো। গ্রামে রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ এবং গরুর গাড়ি ভিন্ন অন্যকোন যানবাহনই ছিলো না। ফলে ঐ এলাকার আপামর জনগন তাদের সার্বিক উন্নয়নের জন্য হুমায়ুন আহম্মেদকে সব সময় স্মরন করে থাকে। রিনার কথা শুনতে শুনতে আমরা গিভেন্সী গ্র“পের বয়স্ক পূর্নবাসন কেন্দ্রের মূল ফটকে উপস্থিত হলাম। সুবিশাল গেইট, অনেক নিরাপত্তা রক্ষী এবং নিয়ম কানুনের বেশ কড়াকড়ি লক্ষ করলাম । আমাদের পরিচয় জানার পর আমাদেরকে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হলো। গাড়ী চালিয়ে অনেকখানি পথ চলার পর আমরা পূর্নবাসন কেন্দ্রের অফিসের সামনে পৌঁছালাম। জনাব মুকুল তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন আমাদেরকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য। আমরা গাড়ী থেকে নামলাম এবং মুকুল সাহেবের অফিসে গিয়ে বসলাম।
পূর্বেই বলেছি বিরাট ব্যাপার- এলাহী কান্ড। প্রায় ৪০০ বিঘা জায়গার ওপর গড়ে তোলা পূর্নবাসন কেন্দ্রটিতে ৩০০ জন বয়স্ক নারী পুরুষের বাস। কোন দেশী বিদেশী সাহায্য নেই। চলছে একক দানে। আশ্রয় প্রাপ্ত নারী পুরুষের জীবনের সকল চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি তাদের মৃত্যুর পর তাদের ওছিয়ত অনুযায়ী দাফন কাফনের ব্যবস্থা করা হয়। প্রকল্পের ভেতরেই রয়েছে নিজস্ব কবরস্থান। পুকুরে মাছ চাষ হচ্ছে- খামারে হাঁস-মুরগীসহ গবাদি পশু। উৎপাদিত হচ্ছে ধান, গম, তরি তরকারী এবং ফলমূল। আশ্রয় প্রাপ্তদের অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা, বিনোদন, শিক্ষা-দীক্ষা, শরীর চর্চা, ধর্ম-কর্ম-সকল কিছুরই ব্যবস্থা করা হচ্ছে সুচারুভাবে। আমরা পুরো প্রকল্প ঘুরে দেখতে দেখতে এসব বিষয় অবগত হলাম এবং একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত ঔদার্য দেখে যারপর নাই মুগ্ধ হলাম। আমরা লক্ষ করলাম যে, সকল বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা গভীর আবেগ সহকারে মুকুল সাহেবকে বাবা বলে সম্বোধন করেন।
আমাদের মতো আরেক দল মধ্য বয়সী ভদ্র মহিলারাও সেদিন পূর্নবাসন কেন্দ্রটি দেখতে গিয়েছিলেন। তারা সবাই রাজধানীর অভিজাত এলাকা বারিধারার বাসিন্দা এবং একটি সামাজিক সংস্থার সদস্য। তাদের সংখ্যাও ছিলো প্রায় ২০/২২ জন। পরিদর্শন শেষে আমরা সবাই একরুমে বসে প্রকল্পটির আদি অন্ত নিয়ে আলোচনা শুরু করলাম। মুকুল সাহেব জানালেন – কিভাবে তিনি কত কষ্ট করে শুরুটা করেছিলেন সেই ১৯৮৭ সালে যখন তিনি সবে ধনবান হয়েছেন কিন্তু তখনো পর্যন্ত বিয়ে থা করেননি। বহু সম্মানজনক মধুর স্মৃতির পাশাপাশি গুটি কয়েক বিব্রতকর পরিস্থিতির কথাও অকপটে বললেন। বললেন ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা । নানা জনের নানা প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন তিনি। একজন বললেন আচ্ছা এখানে আশ্রয়প্রাপ্তদের বেশির ভাগ মহিলা কেনো। তিনি যেইনা বলতে আরম্ভ করলেন যে, আমাদের সমাজটা পুরুষ নিয়ন্ত্রিত ওমনি তার রসিক এবং বিদুষী স্ত্রী দাঁড়িয়ে অবজেকশন দিয়ে বসলেন। মিসেস মুকুল বললেন- আমাদের সমাজ কোন মতেই পুরুষ নিয়ন্ত্রিত নয়- গত ২৪টি বছর আমাদের রাষ্ট্র নারী কর্তৃক শাসিত হচ্ছে । আমাদের নারী শাসকদের সামনে কোন পুরুষই মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়ানোর ক্ষমতা রাখে না। এ কথা বলেই তিনি অভিনয় করে দেখিয়ে দিলেন বেগম খালেদা জিয়া কিংবা শেখ হাসিনার রুমে ঢোকার পূর্বে একজন পুরুষ কিভাবে হাঁটে এবং রুমে ঢোকার পর তার সামনে যেতে স্বল্পতম দুরত্বটুকু অতিক্রম করতে গিয়ে কিভাবে হাঁটে। আমরা সবাই হো হো করে হেসে উঠলাম। আলোচনা চলে গেলো রাজনীতির ময়দানে । জনাব মুকুল বেকার হয়ে পড়লেন আর আমি হলাম নানা জনের নানা প্রশ্নের উত্তর দাতা।
ঘটনার দিন একটি গুরুত্বপূর্ন ইস্যু ছিলো প্রয়াত অধ্যাপক ডঃ পিয়াস করিমের লাশ ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্য নেয়া এবং প্রতিপক্ষ কর্তৃক বাধা দেয়া প্রসঙ্গে। পিয়াস করিমের পরিচিতি মুলত টেলিভিশনের টকশোর কল্যানে। আর ঐ ক্ষেত্রে অল্প কয়েকজন আলোচিত জনের মধ্যে তারা আমাকেও মনোনীত করলেন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আমার মন্তব্য জানতে চাইলেন। আমি কোন উত্তর না দিয়ে ব্যারিস্টার রফিকুল হকের দিকে তাকালাম। তিনি তার স্বভাব সুলভ হাস্যরসে নিম্নের জবাবটি দিলেনÑ
এখানে উপস্থিত সকলের মধ্যে আমিই বয়োবৃদ্ধ। ফলে মৃত ব্যক্তির লাশ নিয়ে কথা বলার অধিকার আমারই সবচেয়ে বেশি। যারা পিয়াস করিমের লাশ শহিদ মিনারে নিয়ে সম্মান দেখানোর জন্য জিদ করেছেন এবং যারা বাধা দিয়েছেন তাদের উভয় পক্ষের নিকট একটি প্রশ্ন করা যেতে পারে- কেনো তারা ওখানে লাশ নিতে চাচ্ছেন এবং কেনই বা বাধা দেয়া হচ্ছে। পিয়াস করিম কি ওছিয়ত করে গিয়েছিলেন যে, আমার লাশটি শহীদ মিনারে নিয়ে যেও! আবার যারা বাধা দিচ্ছেন তারা কি বলতে পারবেন যে, শহীদ মিনার তাদের পৈত্রিক সম্পত্তি বা পারিবারিক সম্পত্তি! এসব বিতর্ক এবং গন্ডগোলের পর কোন ভদ্র লোকের লাশ হয়তো আগামী দিনে শহীদ মিনারে নেয়া হবে না। অনেকে মৃত্যুর পূর্বে পরিবার পরিজনকে বলে যাবে – আমার লাশ যেনো ওখানে নেয়া না হয়।
একজন ভদ্র মহিলা প্রশ্ন করলেন- স্যার আপনি তো সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি! আপনার ক্ষেত্রে কি হবে। তিনি বললেন -আমার লাশ শহীদ মিনারে যাবেনা। বায়তুল মোকারত্মমে জানাজার পর সোজা আমার গ্রামের বাড়ীতে । আমার প্রয়াত স্ত্রীর পাশে অনেক আগেই কবর খুঁড়ে রেখেছি। সব কিছু ঠিকঠাক। মৃত ব্যক্তির নাম, পিতার নাম, জন্ম তারিখ সব কিছুই লিখা রয়েছে । কেবল মারা যাবার তারিখটি শূন্য রয়েছে। ঐ শূন্য স্থান পুরুনের জন্য প্রতি দিন একটু একটু করে মরনের দিকে এগুচ্ছি। তাঁর এই বক্তব্যের পর পুরো ঘরে কেমন যেনো এক অদ্ভূত নিরবতা নেমে এলো। আমি আমার সম্মানীত পিতৃবৎ অভিভাবকের মুখের দিকে তাকালাম। তিনি কিছুটা উদাস! মনে হলো- তার প্রয়াত স্ত্রী এবং কবরের স্থানটি হয়তো বা মানষপটে ক্ষনিকের তরে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে।
পীর হাবিবুর রহমান: ঘুম থেকে উঠে মোবাইল অন করতেই ধাক্কা খেলাম। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মধ্যরাতের টেলিভিশনের টকশোর জনপ্রিয় আলোচক ড. পিয়াস করিম আর নেই। যাচ্ছিলাম ব্রেইনের সিটি এনজিওগ্রাফি করাতে। সঙ্গে অনুজপ্রতিম সৈয়দ তারেক হোসেন দাউদ। পথেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম- ফেসবুকে খবরটি ভাসতেই মনটাজুড়ে বিষাদের ছায়া নেমে এলো। যে কোনো মৃত্যু সংবাদ সইতে পারি না। যে কোনো নিকটজনের মৃত্যুতে জানাজায় গেলেও ঘুমন্ত মুখখানি দেখি না। সেই জীবন্ত মুখখানি আমার মানসপটে তুলে রাখি। ছেলেবেলায় চাচাত খালাত ভাই জুবের আহমেদ পীরের অকাল মৃত্যুতে তার কপালে হাত রেখে প্রথম লাশের শীতলতা উপলব্ধি করি। মৃত্যুর পর মানুষের দেহ কতটা হিমশীতল হয় আর কখনো জানতে হয়নি। শুধু জীবনেরই স্বপ্ন থাকে না। মৃত্যুরও স্বপ্ন থাকে। অকালে চলে যাওয়া ড. পিয়াস করিম স্বপ্ন দেখেছিলেন কিনা জানা নেই। তবে মত প্রকাশে নিজের অবস্থান দ্বিধাহীন রেখে আলোচিত হয়ে গেছেন। নানা বিতর্কের মুখেও দমেননি তার মত প্রকাশে। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। একমত থাকলে সেটি হয় কমিউনিস্ট শাসন অথবা স্বৈরতন্ত্র।
আমার মেঝভাই ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকে এমনভাবে মারা গেলেন যে চিকিৎসারও সুযোগ পাননি। দীর্ঘদেহী মেঝভাই ৪৭ বছর বয়সে অকালে চলে যান। নিয়মিত হাঁটাহাঁটি করতেন। কিন্তু তিনি চিকিৎসার সুযোগই পাননি। জীবন-মৃত্যু রহস্যে ঘেরা। আমার ছোটভাই ৩৪ বছর বয়সে এবং আমি নিজে দু-দুবার হার্ট অ্যাটাকের মুখোমুখি হয়ে আল্লাহর রহমতে জীবন ফিরে পাই। অনিয়মে আমরা দুই ভাই ছিলাম মহাআড্ডাবাজ ও ডিসিপ্লিন লাইফে থাকা মানুষের কাছে বাউন্ডুলে। যে কোনো স্বজনের মৃত্যুতে আমি ছুটে যেতে পারি না। এমনকি আত্মীয়-অনাত্মীয় হৃদয়ের কাছাকাছি হলেই মৃত্যু সংবাদে অস্বস্তি বোধ করি। সিটি এনজিওগ্রাফ করাতে যেতে যেতে পিয়াস করিমের জন্য আমার মনটা ডুকরে কেঁদে উঠছিল। তার সঙ্গে আমার কোনো আত্মীয়তা নেই, তার সব মতের সঙ্গে আমি একমতও ছিলাম না। কিন্তু আমি তার মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিলাম। তার সঙ্গে তর্কযুদ্ধে পরাজিত দলকানারা তার পিতা কোথায় শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন সেই তীর ছুড়ত। পিয়াস করিম একজন মার্জিত ভদ্রলোক ছিলেন। টেলিভিশন টকশোতে এসে অনেক চাঁছাছোলা কথা বলার কারণে সরকার পক্ষের দলদাসদের অনেক সমালোচনা, অপপ্রচার সইতে হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে তিনি বিএনপি জোটের দিকে হয়তো ঝুঁকেছিলেন। গোটা জাতি কী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কী লেখক-সাংবাদিক, শিল্পী-সাহিত্যিক নানা পেশার মানুষেরাই রাজনীতি দ্বারা বিভক্ত দুটি শিবিরে সরাসরি অবস্থান নিয়েছেন। এই অবস্থান নেওয়ার মধ্য দিয়ে যারা সক্রিয় দলবাজ তারা তলে তলে আঁতাত করে চলেন। যারা মধ্যপন্থা নীতি অবলম্বন করেন তাদের একটা খরা কবলিত সময় অতিক্রম করতে হচ্ছে। বিএনপি-জামায়াত জমানায় শাসকের কঠোর সমালোচনায় মুখর হলে বাকশালী বলে সেই পক্ষ গাল দিতেন। এখন এই সরকারের জমানায় কেউ সমালোচনা করলে আক্রমণ করতে করতে বলা হয় জামায়াতের টাকা খায়। চরিত্র হননের মাধ্যমে আত্মসম্মানহীন দলকানারা সাহসী মানুষদের কণ্ঠ রোধ করার প্রয়াস নেয়। কারওয়ান বাজারের একটি টেলিভিশনে মধ্যরাতের টকশো উপস্থাপনা কিছু দিন করেছি। অনেক আলোচকের মধ্যে ড. পিয়াস করিমও এসেছেন। তার বক্তব্যের সঙ্গে একমত হই বা না হই যুক্তিতর্কে তাকে কাবু করার চেয়ে প্রতিপক্ষরা নানা ব্যক্তিগত সমালোচনায় কাবু করতে চাইতেন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই পন্থি কিছু অন্ধ মোসাহেব বা চাটুকার দালালদের অন্ধের ভাষায় কথা বলতে যখন শোনা যায় তখন তাদের জন্য করুণা জাগে। এদেরকে রাজভিখেরি মনে হয়। কোনো অগ্রসর চিন্তাশীল বিবেকবোধসম্পন্ন আত্মমর্যাদাশীল মানুষ মনে হয় না। মানুষের গোনায় তারা দলকানা, দলদাস। নেতা-নেত্রীদের সংবাদ সম্মেলনে গিয়ে তারা প্রশ্ন হারিয়ে তেলে নহর বইয়ে দেন। আয়নায় নিজের চেহারা দেখেন না।
পিয়াস করিম আর আসবেন না। অকালেই চলে গেলেন। চলে যাওয়ার মতো বয়স তার হয়নি। আগের দিন সন্ধ্যায় হার্ট অ্যাটাকে না প্রেমিক, না বিপ্লবী আমাদের প্রিয় কবি নির্মলেন্দু গুণ ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতালে ভর্তি হন। সেই সংবাদেই মনটা খারাপ হয়ে যায়। গতকাল তার বাইপাস সার্জারি হয়েছে। আপাদমস্তক কবি ও বোহেমিয়ান নির্মলেন্দু গুণ নিশ্চয়ই শতায়ু হবেন। কিন্তু তার তারুণ্যের বন্ধু কবি আবুল হাসান অমর কাব্য রচনা করেও অকালেই চলে গেছেন। আবুল হাসানের পর যে কবির মৃত্যু বড় ধরনের ঝাঁকুনি দিয়েছিল তার নাম রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ। আমাদের প্রজন্মের এমন আপাদমস্তক বোহেমিয়ান কবি আর আসেনি দেশে। সৃষ্টিশীল, মানুষদের হৃদয়টা অন্তহীন বেদনা, দ্রোহ, অভিমানে ক্ষয়ে যায়। পৃথিবীতে অনুভূতিশীল মানুষেরাই জগৎ সংসারে অনেক কষ্ট সহ্য করে যান।
বাহির থেকে তার ভেতরের কান্না কখনো শোনা যায় না। কাছের লোকেরা যতটুকু আঁচ করেন তা খুবই সামান্য। পিয়াস করিমকে আমি যতবার দেখেছি ততবার মনে হয়েছে সব অসুন্দর এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার মনটা জ্বলছে। পুড়ছে। আমরা কজনের খবর রাখি। ওয়ান-ইলেভেনকালে আমার লেখা নিয়ে যত আলোচনা-বিতর্ক হোক না কেন যারা বেশি বাহবা দিয়েছেন তাদেরকে দেখেছি পটপরিবর্তনের পর কথা বলতেও ভয় পাচ্ছেন। কাছে ভিড়তেও সংশয়। ওয়ান-ইলেভেনে কতজন কত কথা বলেছেন, পরে দেখি যার যার মতো ছাতা ধরেন। মানুষ তাদের চিনে। শাসক তাদের চিনেনি। মৃত্যুর দুয়ার থেকে মাঝে-মধ্যে ফিরে এলে নিজের চেয়ে মানুষকে বেশি চেনা যায়। সেই চেনাটা আমার ওয়ান-ইলেভেন উত্তরকালে হয়ে গেছে। ওয়ান-ইলেভেনকালীন লেখা নিয়ে অনেকেই অনেক কথা বলেছেন। কেউ সামনে বলেছেন, কেউ পেছনে বলেছেন। ওয়ান-ইলেভেনের আগেও যখন যে সরকারের সমালোচনা করেছি, যে কোনো রিপোর্ট প্রকাশ করেছি তাতে গা জ্বালা স্তাবকরা ভাব-ভঙ্গিতে রহস্যের ইঙ্গিত দিয়ে বামুনের কাতারে দাঁড়িয়ে নিন্দুকদের সুরে বলেছেন, নানা মিশনের হয়ে কাজ করি। অনেক বুড়ো শালিকদেরও দেখেছি এক চোখে লেখেন। এক চোখে দেখেন। দুই হাত ভরে যখন যারা ক্ষমতায় থাকে তাদের কাছ থেকে ভিক্ষে করেন। রাজভিখেরিদের আমোদ-আহ্লাদ দেখে বায়তুল মোকাররমের সামনেও ফকিরের সংখ্যা কমে যায়। সেসব অন্ধ বুড়ো শালিকের কেউ কেউ মেকাপে কেতাদুরস্ত স্মার্ট, নামের বাহারে প্রাজ্ঞ হলেও অনেক ফরমায়েশি লেখা লেখেন। আমাকে অনেক বন্ধুরা বলেন, ওয়ান-ইলেভেনের লেখা নিয়ে যত প্রশ্ন তার একটি জবাব দিতে। আমি যে ভাবি না তা নয়। আমারও একখানি চিন্তা, অনুভূতি ও আবেগ মাখানো রক্ত-মাংসের শরীর আছে। নিজের কাছে এটুকু পরিষ্কার জীবনে যা লিখেছি কখনো কারও ফরমায়েশে বা ব্যক্তিগত লাভের কারণে লিখিনি। ছেলেবেলা থেকেই মনের ওপরে আস্থা নিয়েই বেড়ে উঠেছি। মন বলেনি, মন মানেনি তা যেমন করিনি, তেমনি মন না বললে লিখিওনি। লেখা ও বলায় ভুল থাকতে পারে। কারণ আমার কথাই শেষ নয়। সময় হলেই সেসব লেখার দু-একটির ব্যাখ্যা নিশ্চয় দেব।
গণতান্ত্রিক সমাজে সবার মতামতের উন্মুক্ত বিতর্কের মধ্যেই সেই চরম সত্য বেরিয়ে আসে যে সত্য কঠিন। যে কঠিনকে রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে নিয়ে খুব ভালোবেসেছিলাম। পিয়াস করিম অকালে চলে গেলেও নির্জীব বোধহীন হয়ে শত বছর না বাঁচলেও যতদিন বেঁচেছিলেন স্থবির যৌবনা হয়ে বাঁচেননি। ক্রিয়াশীল ছিলেন। মানুষকে মৃত্যুর স্বাদ যে নিতে হবে। মৃত্যুই নিশ্চিত। বাকি সব অনিশ্চিত। একজীবনে মানুষ অনেক কিছুই করতে পারে না। কিন্তু যারা করে তারাই সফল।
এলাম, খেলাম, ঘুরলাম, চলে গেলাম- রুটিনে বাঁধা এই জীবন কোনো জীবন নয়। শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চে যখন এককালের কট্টর বঙ্গবন্ধুবিরোধী চীনাপন্থিরা ভর করেছিল তখন কারও কারও নাম নিয়ে আঙ্গুল তুলেছিলাম। কিছু কথা বলেছিলাম। যাদের গাত্রদাহ হয়েছে তারা যুক্তির ওপর কথা বলেননি। চরিত্র হননের চেষ্টা করেছেন। সেই সময়ে আমার অতি প্রিয় রাজনীতিবিদ ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের নায়ক তোফায়েল আহমেদ একদিন একান্তে বলেছিলেন, পীর হাবিব, ‘তোমাকে নিয়ে এত কথা হয়, আমার শুনতে খারাপ লাগে। আমি অবশ্য বলি পীরকে আর যাই হোক টাকা দিয়ে কেনা যায় না।’ উত্তরে বলেছিলাম, নিন্দুক ও মূর্খরা আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে জামায়াতের কাছ থেকে অর্থনৈতিক ফায়দা নেওয়ার অপপ্রচার চালিয়েছে। পারলে তাকে জামায়াতের পাল্লায় তুলে দিয়েছে। হয়তো আমাকেও দিচ্ছে। এসব বিতর্ক বহু আগেই জয় করে আমি লিখে যাই বিবেকের দায়বদ্ধতায়। যা বলছি, যা লিখছি নিজের বিশ্বাসবোধ থেকেই করছি। কে কোথায় কি বলল তাতে সাময়িক উত্তেজনায় বিচলিত হলে কাপুরুষের মতো গর্তে ঢুকে যেতে হয়। বোবার কোনো শত্রু নেই। সত্যকে সাময়িক আড়াল করা যায়, সত্যকে কখনো লুকানো যায় না। সেদিন সরকারের সঙ্গে আঁতাতের রায় সংশয়ে তারুণ্যের জ্বলে ওঠাকে সমর্থন করলেও বাতিল সব চীনা আর হঠকারীদের ইন্ধনে ফাঁসির দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রাখাসহ কিছু কর্মসূচির বিরোধিতা করেছিলাম। সেই শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চের পরিণতি আজকের সরকার আওয়ামী লীগ ও তোফায়েল আহমেদরা কীভাবে দেখছেন তা মানুষ জানেন। ওয়ান-ইলেভেন উত্তরকালে একদিকে দু-দুবার হার্ট অ্যাটাকের শারীরিক ঝুঁকি মোকাবিলা, অন্যদিকে পেশাগত জীবনের পথ রুদ্ধ করে রাখার যন্ত্রণা সইতে হয়েছে। ব্যক্তিগত জীবনের সেই দুঃসময়ে মোজাম্মেল বাবুর ঢাকা ক্লাবের শনির আড্ডায় আমাদের অতি আপনজন ’৯০-এর ছাত্রআন্দোলনের নেতা ডা. জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকু পরামর্শ দিয়েছিলেন- যে গর্তে তোমাকে ফেলা হয়েছে সেখান থেকে লেখার শক্তি দিয়েই উঠে আসতে হবে। কথাটা আমার টনিকের মতো কাজ করে। একজন কবিকে হৃদয় ক্ষয়ে কবি হতে হয়। একজন প্রেমিক ও লেখককেও তাই। সেই অসুস্থকালীন সময়ে যখন আমার লেখার পথ রুদ্ধ করে রাখা হয় নানা কূটকৌশলে সেসব কুশিলবের দিকে তাকিয়ে আমার তখনও করুণা বর্ষিত হয়েছে। একদিন লিখতে না পারার অস্থিরতার যে বেদনা ও ক্রন্দন আমার ভেতরটাকে নিঃশেষ করে দিচ্ছিল, মনের দহনে ক্ষয়ে যাচ্ছিল আমার শরীর তখন একদিন ইউনাইটেড হাসপাতালের চিফ কার্ডিওলজিস্ট ডা. মুমিনুজ্জামানের সঙ্গে খোলামেলা কথা হয়। অন্তহীন বেদনা ও দহন উপলব্ধি করে আমার হৃদয় মেরামতকারী মুমিনুজ্জামান বলেছিলেন, আপনি তো অনেক ভালো লেখেন। আপনার লেখার আমি ভক্ত। আপনি ব্লগে লিখেন। ব্লগে অনেকেই লেখে। কিন্তু তার পরামর্শ সেদিন আমি রোগী হিসেবে ধারণ করতে পারিনি। ধারণ করেছি একজন সত্যসন্ধানী বিবেকের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী মানুষের অহম থেকে। তাই ব্লগে লেখা হয়নি আমার।
টিংকুর সেই প্রেসক্রিপশনে আমি রুখে দাঁড়াই এবং লিখতে লিখতে ঘুরে দাঁড়াই। ব্রেইন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে হৃদয়বান বন্ধুবৎসল জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকু অকালে চলে গেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি যে কজনের জানাজায় অংশ নিয়েছি তার মধ্যে কবি শামসুর রাহমান ও জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকু অন্যতম। শামসুর রাহমানের ঘুমন্ত মুখ দেখলেও টিংকুর মুখ দেখা হয়নি আমার। শেষ অসুস্থকালীন সময়গুলোতেও আমি যাইনি। তার হাসিমাখা প্রাণবন্ত চেহারাই আমার মানসপটে থাক। জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকুর প্রিয়তমা পত্নী খুজিস্তা নূরে নাহরীন মুন্নি একজন উচ্চশিক্ষিতা সৃজনশীল নারীই নন, আত্মপ্রত্যয়ী ব্যক্তিত্বের দ্যুতিতে দৃঢ়চেতা মনোভাব নিয়ে সব দুঃখকে আড়াল করে সংগ্রামের পথ হেঁটে আত্মমর্যাদার সঙ্গে দুটো সন্তানকে মানুষ করছেন। এই পরিবারটির জন্য আমাদের শুভকামনা সারা জীবন থাকবে। আমাদের শহরের প্রাণবন্ত দুই পুরুষের একজন দেওয়ান মোসাদ্দেক রেজার ফুসফুস ক্যানসার ধরা পড়লে ভারতীয় হাইকমিশনে গিয়ে তার ভিসা সংগ্রহের মধ্য দিয়ে যে হাসিমুখ দেখেছিলাম তারপর আর দেখিনি।
হুমায়ুন কবির জাহানুরের বেলায়ও একই অবস্থা। আমার বন্ধুপত্নী মান্না রহমানসহ অনেক মৃত্যু পথযাত্রী থেকে আমি দূরে রাখি নিজেকে। জীবনের আনন্দ মৃত্যুতে আমি পাই না। জীবন যদি হয় শুরু মৃত্যু হয় তার ইতি। আমাদের সহকর্মী আহমেদ ফারুক হাসানের হার্ট অ্যাটাকে অকাল মৃত্যু আমাকে কাঁদিয়েছে অন্তত পক্ষকাল। অকালেই চলে গেছেন ব্যান্ড সংগীতের প্রাণ সঞ্জিব চৌধুরী। সুনামগঞ্জ শহরের নন্দিত নেতা মমিনুল মউজদিন স্ত্রী-সন্তানসহ সড়ক দুর্ঘটনায় অকালে চলে গেলে একটি শহরে অন্ধকার নেমে এসেছিল। মিশুক মুনির ও তারেক মাসুদের মৃত্যু গোটা দেশকে ঝাঁকুনি দিয়েছিল। বাংলাদেশ প্রতিদিনের পথিক সাহা, সর্বশেষ বণিক বার্তার ফারুক, সেই মোটাসোটা বগুড়ার আরিফ সবার অকাল মৃত্যুই আমাদের ব্যথিত করেছে। একটি দেশ পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় হাঁটছে। অথচ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পথ শাসকেরা বারবার নিয়ন্ত্রণ করে ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে চায়। এটি সব আমলে সব শাসকরাই করেছে। যারা তাদের আজ্ঞাবহ হতে পারেনি তারাই অন্তহীন দহনে দগ্ধ হয়েছে। কবি, লেখক, সাংবাদিকসহ চিন্তাশীল মানুষদের জন্য মুক্তপ্রাণের মুক্ত পরিবেশ বেশি প্রয়োজন। যেখানে অবাধ গণতান্ত্রিক চেতনায় সবাই সংবিধান প্রদত্ত বাকস্বাধীনতা ভোগ করবে। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে নেপথ্য কুশীলবরা টেলিভিশন টকশোর আলোচক যখন নির্ধারণ করে দেন, মাহমুদুর রহমান মান্নার মতো উপস্থাপকদের সরে দাঁড়াতে হয় তখন আর যাই হোক এ কথা বলা যায় না যে, আমরা বুকভরে গণতন্ত্রের বাতাস নিচ্ছি। হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা আমাদের পরামর্শ দেন ভোরের স্নিগ্ধ বাতাসে দাঁড়িয়ে একবুক নিঃশ্বাস নিতে। কিন্তু মানুষ হিসেবে চিন্তা, ভাবনা ও মত প্রকাশের ক্ষেত্রে কতটা বুকভরে শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছি সেই প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। একজন রাজনৈতিক কর্মীর যেমন তার রাজনীতিটা মনমতো করতে চায় তেমনি একজন শিল্পী গলা ছেড়ে গাইতে চায়। একজন চিন্তাশীল মানুষ মন খুলে বলতে চায়। একজন লেখক হাত খুলে লিখতে চায়। যখনই সে হোঁচট খায় বা বাধা পায় তখন অসুখ মনে ছড়ায়। মন থেকে শরীরে বাসা বাঁধে।
কাদম্বরী বউঠানের মৃত্যুর পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন- ‘জীবন আর মরণ তো একই সত্তার দুই দিক- চৈতন্যে ঘুম আর জাগরণ যেমন।’ সন্তানের মৃত্যুর পর রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন- আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে। আবার রবীন্দ্রনাথই একদিকে বলেছেন- মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে মানুষের মাঝে আমি বাঁচিবার চাই। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, মরণরে তুহুঁ মম শ্যাম সমান। কবি শামসুর রাহমান মৃত্যুর আগে বলেছিলেন- ইচ্ছে করে পাঁচশ বছর বাঁচি। সমরেশ মজুমদারের সঙ্গে সুর মিলিয়ে হুমায়ূন আহমেদও আক্ষেপ করেছিলেন- কচ্ছপ যদি সাড়ে তিনশ বছর বাঁচে, মানুষ কেন ষাট-সত্তুরে মরে? বিদ্রোহের কবি নজরুলও মৃত্যুর ভয় করেছেন। তাই লিখেছেন- রোজ হাসরে আল্লাহ আমার করো না বিচার… বিচার চাহি না, তোমার দয়া চাহে এ গুনাগার। মৃত্যুরও একটা স্বপ্ন থাকে মানুষের। কেউ মৃত্যুর আগে নিজের শেষ ঘুমের জায়গাটাও ঠিক করে যান। কেউ বা শেষ নিঃশ্বাসটুকু ছাড়তে চান জায়নামাজে। কেউ হজে গিয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে চান। হুমায়ূন আহমেদের আকুতি ছিল চাদনি পশর রাইতে মরণের জন্য। কিন্তু তার মৃত্যুর রজনী ছিল অমাবস্যার রজনী। মমিনুল মউজদীনকে জোছনার কবি বললেও তার মৃত্যুর রজনীটি আইলার আঘাতে অন্ধকার ছিল বিদ্যুৎহীন ঝড়-বৃষ্টির। আমার জীবনের অনিয়মে স্বজনরা উদ্বিগ্ন। স্নেহ-ভালোবাসায় প্রিয়জনরা কখনো সখনো বলেন, এই লাইফস্টাইল নাকি আত্মহত্যার শামিল। প্রিয়জনের ভাষায় মৃতপ্রায় মানুষ। ক্যানসারে যারা মারা যান নিজেরা যেমন দুঃসহ বেদনা সয়ে মৃত্যুকে জয় করেন, তেমনি তার পরিবার-পরিজনকেও মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত করে যান। ক্যানসার রোগীরা যখন মারা যান তার স্বজনদের কান্না তার আগেই কাঁদতে কাঁদতে শুকিয়ে যায়। ব্রেইন স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকে যারা আকস্মিক মারা যান তারা স্বজনদের প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে যান। ডাকসু ভিপি থাকাকালে আখতারুজ্জামান বলেছিলেন, চান রাজপথে গুলি খেয়ে মরতে। অনেক অনুসারী তার মিছিল থেকে চলে গেলেও তিনি আল্লাহর রহমতে আছেন। চিত্রনায়িকা ববিতা বলেছিলেন, মৃত্যুচান ঘুমের মধ্যে হঠাৎ। আল্লাহ জানেন কার কী। তবে সবারই শতায়ু চাই আল্লাহর কাছে।
মৃত্যুর শোক এক সময় সবাই সয়ে যায়। পিতারটা সন্তান, সন্তানেরটা পিতা। মাঝে-মধ্যে তাদের অনুপস্থিতি হয়তো দুঃখ ভারাক্রান্ত করে। কোনো কোনো মানুষ আছেন শতাধিক বছর জীবনযাপন করে যান। দেশ, মানুষ বা সমাজের জন্য কিছুই রেখে যান না। রুটিনমাফিক জীবনযাপন করে শুধু বেঁচে থাকার জন্য সেঞ্চুরি অতিক্রম করা মানুষদের জীবন আমার কাছে অর্থহীন। যে জীবনে আবেগ নাই, দহন নাই, প্রেম নাই, দ্রোহ নাই সেই জীবন অর্থবোধক হয় না। একজন প্রেমিক স্বপ্ন দেখতেই পারে তার প্রিয়জনের কোলে মাথা রেখে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার। মাঝে মাঝে আমিও কি ভাবি, ভরা পূর্ণিমার রাতে আমার জলজোছনার হাওরে কিংবা লেখার টেবিলে মৃত্যুর স্বাদ নিতে। ড. পিয়াস করিমের মৃত্যু অনেককেই ব্যথিত করেছে। কারণ মানুষের অকাল মৃত্যু কোনো মানুষের কাছেই কাম্য নয়। এভাবে অকালে একজন স্পষ্টবাদী মানুষ না গেলেই পারতেন। ভিন্নমতের মানুষের মৃত্যুতেও কারও আনন্দ করার কিছু নেই। মৃত্যু সবার দরজায় কড়া নাড়বেই।
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম: ঈদ মোবারক। আশা করেছিলাম এবার কোরবানির ঈদ বেশ আনন্দে কাটবে। প্রতি বছর দু-এক মাস আগে কোরবানির গরু কিনে লালনপালন করি। মুক্তিযুদ্ধের সহকর্মী আব্দুল্লাহ বীর প্রতীক এবার কোরবানিতে তার পালের গরু আমাকে দিয়েছে। গরুটা আমার বাড়িতেই বড় হয়েছে। বেশ শক্তিশালী হৃষ্টপুষ্ট ছিল। ভীষণ ফোঁস ফোঁস করত। খুব সহজে তার কাছে কেউ ঘেঁষতে পারত না। সেটাই এবার আমরা আল্লাহর নামে বাবা-মা, দীপ-কুঁড়ি-কুশি, ওদের মা এবং আমার পক্ষে কোরবানি দিয়েছি। ঈদের আগের রাতে প্রচণ্ড জ্বর এসে শরীর খারাপ করেছিল। তবু মোটামুটি ঈদ পালন করেছি। কোরবানি দিয়েছি, বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত করেছি।
বহু দিন পর এবার শুক্রবার আকবরি হজ হয়েছে। হজ আর পূজা একেবারে কাছাকাছি ছিল। আমার মনে হয়, পূর্ণিমা, অমাবস্যা, তিথি, নত্র বিচার করলে ঈদ কোনোক্রমেই সোমবারে হয় না। রোববারের পরে যাওয়ার কোনো সুযোগই ছিল না; কিন্তু ডিজিটাল কর্মকাণ্ডে ধর্মকর্মের শুদ্ধতা নেই। যার যখন যা মর্জি, তাই তারা করছে। বিশেষ করে সরকারের মর্জি মানুষের বোঝা অসাধ্য। মানুষ বাড়ি পৌঁছতে পারছিল না, সে কারণে কি সময় দেয়ার জন্য ঈদ এক দিন পিছিয়ে দেয়া হয়েছিল? বুঝব কী করে? ইসলাম তো কোনো রাজনৈতিক দল নয়, ইসলাম একটি ধর্ম। তার সব অনুশাসন আগে থেকে স্থির করা। কারো মর্জিমাফিক সেসব অদল-বদল হওয়ার সুযোগ কোথায়? যে যা-ই বলুন, ৫ তারিখের স্থলে ৬ অক্টোবর ঈদুল আজহার দিন নির্ধারণ কোনো মতেই যুক্তিযুক্ত মনে করি না। ওটা একটা মারাত্মক অধার্মিক কাজ হয়েছে।
সরকার তারস্বরে চিৎকার করছে, দেশে শান্তির হিমেল হাওয়া বইছে। কিন্তু মানুষের মধ্যে কোনো মনুষ্যত্ব, মানবতা, প্রেমপ্রীতি-ভালোবাসার লেশমাত্র নেই। মানুষ আল্লাহর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। পরম দয়াময় প্রভু আমাদের সাপ, ব্যাঙ, কুকুর, বিড়াল হিসেবেও সৃষ্টি করতে পারতেন; কিন্তু দয়া করে তিনি আমাদের শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ বানিয়েছেন। আজ আমাদের মনুষ্যত্ব কোথায়? পবিত্র ঈদুল আজহার গভীর রাতে টাঙ্গাইলের গোড়াই সোহাগপুরে একটি পাকা ঘরে পেট্রল ঢেলে আগুন দিয়ে এক নরপশু পাষণ্ড মাসহ তিন মেয়েকে পুড়িয়ে মেরেছে। সব থেকে ছোটটির বয়স ছিল পাঁচ বছর। মুসলমান ঘরের নারী আগুনে পুড়ে অঙ্গার এটাকে আল্লাহর রহমত-বরকত মনে করব, নাকি গজবের আলামত? কুরআন-হাদিসে দেখেছি, আল্লাহ প্রেমের কারণে জগৎ সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ পবিত্র প্রেমকে ভালোবাসেন। সেখানে রহমত-বরকত দান করেন। জাহাঙ্গীর নামে এক বখাটে তরুণ ১৩ বছরের একটি মেয়েকে বিয়ে করার জন্য লালায়িত হলে সে এবং তার পরিবার রাজি না হওয়ায় গোষ্ঠীসুদ্ধ পুড়িয়ে মারার মাঝে আমি তো কোনো প্রেম খুঁজে পাই না। শুধু জিঘাংসাই দেখতে পাই। প্রেম করেছেন লাইলী-মজনু, শিরি-ফরহাদ, রজকিনী-চণ্ডিদাস এখানে তার লেশ কোথায়? কাউকে কেউ ভালোবাসলে যার জন্য হৃদয়ের বোঁটা ছিঁড়তে চায়, তাকে পুড়িয়ে মারার কথা কল্পনা করা যায় কি? খবরটি শুনে স্থির থাকতে পারিনি। ছুটে গিয়েছিলাম সোহাগপুর মজিবরের বাড়িতে। পরিবারে সচ্ছলতা আনতে গাধার খাটুনি খাটতে সে মালয়েশিয়া গিয়েছিল। পরিবারের অবস্থাও অনেকটা ফিরিয়েছিল। ছোট্ট সুন্দর পাকা বাড়ি, ঘরে প্রয়োজনীয় আসবাবপত্রÑ সবই ছিল; কিন্তু বুকের ধন কেউ নেই। ও রকম পাকা ঘর না হয়ে কাঁচা ঘর হলে মা-মেয়ে চারজনই হয়তো আগুনে পুড়ে ছারখার হতো না। জানি না দোজখের আগুন কেমন হবে, তবে ৬০ লিটার পেট্রল ঢেলে অমন একটি ১৪-১৫ ফুট আশপাশের ঘরে আগুন দিলে তা যে কেমন হতে পারে, সেটা একমাত্র স্রষ্টাই জানেন।
ধরপাকড় চলছে, দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কী হয়। রাজনৈতিক প্রভাব না পড়লে, টানাটানি না হলে হয়তো ঘাতকদের সাজা হবে। সেদিন দেখলাম, প্রধান আসামি জাহাঙ্গীরকে ধরিয়ে দিতে পুলিশ এক লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছে। অনেকে মনে করেন, আসামির জন্য সরকারি পুরস্কার ঘোষণা একটি কঠিন পদপে; কিন্তু কেন যেন আমার কাছে মনে হয়, কোনো আসামিকে ধরতে না পারায় পুলিশের পুরস্কার ঘোষণা তাদের দুর্বলতারই স্বাক্ষর। তবু পুলিশ কিছুটা তৎপর বলে তাদের সাধুবাদ জানাই।
সত্যিই মনটা ভালো নেই। তুমি হয়তো জানো না, তোমার এক অত্যন্ত প্রিয় কর্মী, আমার বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকী ঈদের ক’দিন আগে ওয়াশিংটনে পবিত্র হজসহ কিছু বিষয় সম্পর্কে মারাত্মক আপত্তিকর বক্তব্য দিয়েছেন। আসলে আওয়ামী লীগ নিজেকে ধর্মনিরপক্ষ বোঝাতে গিয়ে কী সব যে করে, অনেক কিছু হয়তো তারা নিজেরাই খেয়াল করে না। ধর্মনিরপক্ষতা আর ধর্মহীনতা যে এক নয়, তাও বুঝতে চায় না। সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। তোমার কন্যা বড় দক্ষতার সাথে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলে দিয়েছেন, সরকারের এবং আওয়ামী লীগের কোনো বিপদ বা অসুবিধা নয়, যে মন্তব্য করেছে এ অসুবিধা তার। পিতা, এখন তুমিই বলো, আমার বাবা মৌলভী মুহাম্মদ আব্দুল আলী সিদ্দিকীর অনুযোগ-অভিযোগ ছিল, আমরা তার কথা শুনিনি, মানিনি; বরং তোমার কথা শুনেছি।’ জনাব লতিফ সিদ্দিকী বামপন্থী আওয়ামী লীগার নন, আওয়ামী লীগেই তার জন্ম। তারপরও নাকি যে বক্তব্য দিয়েছেন সব দায়দায়িত্ব তার, তার দলের নয়। যে পাঠশালায় তিনি সারা জীবন পড়লেন, শিখলেন, এখন তিকর কিছু বলায় সে পাঠশালার বিদ্যাবুদ্ধি সব লোপ পেয়ে গেল এ কেমন কথা? সারা জীবন যা বললেন সব ছিল আওয়ামী লীগের, আজ যখন বেকায়দা তখন সেটা আওয়ামী লীগের না, সরকারের না! মনে হয়, দেশের মানুষও অনেকটা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কথা মেনে নিয়েছে। ২৮-২৯ সেপ্টেম্বরের ঘটনা, এখনো তিনি সরকারের মন্ত্রী। তারপরও আওয়ামী লীগে তার বিরোধীরা গালাগাল করছে। তুমি তো ভালো করেই জানো, গোলামি করতে পারি না, জি হুজুর বলতে পারি না, বিবেকের সাথে প্রতারণা করতে পারি না যে কারণে আওয়ামী লীগ করতে পারিনি। আজ ১৬ বছর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ নিয়ে পড়ে আছি। ছোট মানুষ ছোট দল, কেউ বাধা দেয়ার নেই, তাই বিবেকের নির্দেশে কথা বলি। আওয়ামী লীগের লোকজনেরা প্রায় সবাই পণ্ডিত। আমি আওয়ামী লীগ করি না, কিন্তু তোমাকে ছাড়তে পারিনি। তুমি আমার অস্তিত্ব, তুমি আমার ঠিকানা। তোমাকে ছেড়ে যাবো কোথায়? এতকাল লতিফ সিদ্দিকী ছিলেন আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ‘মাননীয় মন্ত্রী’। যেই মাত্র অসুবিধায় পড়েছেন, বেজুত কথা বলেছেন, তখনই কাদের সিদ্দিকীর ভাই। তখন আর আওয়ামী লীগের নেতা নন। কী যে এক মারাত্মক জ্বালায় আছি, তোমাকে বোঝাই কী করে?
দল ও পরিবারের অবস্থা স্পষ্ট করতে ১১ অক্টোবর জাতীয় প্রেস কাবে গিয়েছিলাম। বিপুল সাংবাদিকে হল ভরে গিয়েছিল। তারা যে সৌজন্যের পরিচয় দিয়েছেন তার জন্য তাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়েছি। সত্যি কথা বলতে কি, আমার কিছু বলার ছিল না। আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য ও মাননীয় মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকী আমার কেউ না, কিছু না; কিন্তু আল্লাহপ্রদত্ত সম্পর্কে তিনি আমার ভাই, আমরা একই মা-বাবার সন্তান। একই রক্ত আমাদের ধমনিতে প্রবাহিত সে সম্পর্ক অস্বীকার করি কী করে? রক্তের সম্পর্ক তো পুঁটি মাছের মতো বাজার থেকে কেনা যায় না। তাই দয়াময় আল্লাহ তায়ালার কাছে প্রার্থনা করেছি, হে প্রভু, আপনি আমার ভাইকে মা চাইবার শক্তি দান করুন। সত্যিকার অর্থে আল্লাহ শক্তি না দিলে কারো মা চাইবার সামর্থ্য নেই। মুসলিম জাহান, বিশেষ করে দেশের মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগায় পরিবারের পক্ষ থেকে তাদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছি। তাকেও আল্লাহর কাছে এবং দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাইতে বিনীত অনুরোধ করেছি। তিনি চাইবেন কি চাইবেন না, সেটা তার ব্যাপার। মুসলমানের ঘরে জন্মেছি, প্রকৃত মুসলমান হিসেবে মরতে চাই এটাই আমার প্রার্থনা।
আমার সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য বেশ গুরুত্বের সাথে প্রায় সব সংবাদমাধ্যমে প্রচার করার জন্য আমি ও আমার দল তাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়েছি; কিন্তু তারপরও কিছু কিছু সংবাদপত্র তাদের মনের মাধুরী মিশিয়ে তাদের মতো করেই খবর প্রচারের চেষ্টা করেছে। কেউ কেউ আমার উদ্ধৃতি দিয়ে বলার চেষ্টা করেছেন লতিফ সিদ্দিকী আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্রের শিকার। আমি করি কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ। আওয়ামী লীগের কেউ ষড়যন্ত্রের শিকার হলে আমার মাথাব্যথা হবে কেন? সংবাদ সম্মেলনের সব বক্তব্য রেকর্ড করা আছে। আমি একবারো আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্রের কথা মুখেও আনিনি। শুধু দলীয়ভাবে বলা হয়েছে, যাই বলুন, হজ সম্পর্কে লতিফ সিদ্দিকীর বিতর্কিত বক্তব্য তার একার হতে পারে না। সেটা সম্পূর্ণই আওয়ামী লীগ এবং বর্তমান অনির্বাচিত অবৈধ সরকারের। কোনো কোনো পত্রিকা এমন লেখার চেষ্টা করেছে, লতিফ সিদ্দিকীর ইসলামবিরোধী বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছি। সেদিনের সম্মেলনে ইসলাম শব্দটিও আমরা উচ্চারণ করিনি। হজ, মুসলমান এসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছি। কারো কারো রিপোর্ট দেখে মনে হবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও আমার সাথে কথাবার্তা বলেই যেন তিনি তার রিপোর্ট তৈরি করেছেন, ‘লতিফ সিদ্দিকী আউট, কাদের সিদ্দিকী ইন’। লিখতে কোনো বাধা নেই; কিন্তু এমন লিখতে লিখতে লেখার গুরুত্ব হারিয়ে ফেললে একসময় সংবাদমাধ্যমেরই অসুবিধা হবে। মানুষ তখন সত্যকেও বিশ্বাস করতে চাইবে না। তাই যতটা সম্ভব, সত্যের অন্বেষণ করা উচিত।
(এই পোষ্টটি দৈনিক নয়া দিগন্তে প্রথম প্রকাশিত হয়েছে)
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামতের জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী নহে )
বাংলাদেশের বিতর্কিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী ১৮৫ জন সফরসঙ্গী নিয়ে সম্প্রতি জাতিসঙ্ঘ ও যুক্তরাজ্য ঘুরে এসেছেন। এই সফরসঙ্গীদের মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী এবং তথ্য ও প্রযুক্তিমন্ত্রী, বিতর্কিত লতিফ সিদ্দিকীসহ তার পরিবারের লোকজনেরা ও জেলাপর্যায়ের নেতাকর্মীরাও ছিলেন। ছিলেন ব্যবসায়ীরাও। প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী এই বিশাল বহরে অংশগ্রহণকারীদের সুনির্দিষ্ট কাজ কী ছিল, সেটি জানা যায়নি। নিউ ইয়র্কের স্থানীয় সংবাদপত্রগুলো বলেছে, সফরসঙ্গীদের অনেকেই ব্যস্ত ছিলেন শুধু শপিংয়ে। ৭৫ জন ব্যবসায়ী অবশ্য নিজ খরচেই প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হয়েছিলেন। বাকি ১১০ জনের ব্যয়ভার রাষ্ট্র বহন করেছে। অথচ বিরাট দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরসঙ্গী ছিলেন মাত্র ৭৫ জন। তাদের মধ্যে ব্যবসায়ীরাও ছিলেন। সরকারি খরচে গিয়েছিলেন অল্প কয়েকজন। বাকি সবাই যার যার খরচে।
শেখ হাসিনার এই সফরকে অত্যন্ত ‘তাৎপর্যপূর্ণ’ ও ‘সফল’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। এসব ফোরামে হাজির হওয়ার সুযোগ পেলে পারতপক্ষে তার কোনোটাই হাতছাড়া করা হয় না। কখনো কখনো তা কোনো দেশের প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদার চেয়ে ছোট হলেও। সে দিক থেকে অবশ্য জাতিসঙ্ঘ সফর মর্যাদার দিক থেকে কোনোমতেই ছোট ছিল না। এসব জায়গায় প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, ঝটপট জবাব দেয়া, মন্তব্য করতে বিচার বিবেচনা না করা, এগুলোও কাজ করে। এখন এই জনপ্রতিনিধিত্বহীন সরকারের জন্য সবচেয়ে জরুরি হয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি আদায় করে নেয়া কিংবা অন্তত তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। সে প্রচেষ্টা যে একেবারে বিফলে যায়, এমন কথা বলা যাবে না। সে দিক থেকে এই সফরকে ‘তাৎপর্যপূর্ণ’ ও ‘সফল’ বলে কেউ কেউ দাবি করতেই পারেন; কিন্তু দেশে বা আন্তর্জাতিক ফোরামে, বরাবরের মতোই জাতিসঙ্ঘের ভাষণেও সরকারের এক-দেশদর্শী নীতির প্রতিফলন অস্পষ্ট থাকেনি। কোনো ফোরামেই বাংলাদেশকে এ সরকার একটি অভিন্ন দেশ হিসেবে দাঁড় করাতে পারেনি। দেশেও তারা পারেন না। জাতিসঙ্ঘে গিয়েও পারলেন না।
জাতিসঙ্ঘে গিয়ে মোদি ভারত তথা বিশ্বের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্নের কথা তুলে ধরেছেন; কিন্তু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী কেবল নিজ সরকারেরই সাফল্যগাথা তুলে ধরে এমন ধারণার সৃষ্টি করলেন তাতে মনে হতে পারে যে, তার সরকার ও দল ছাড়া দেশের উন্নয়নের আর কোনো পথ নেই। তিনি যেন থাকলেন অনেকটা আত্মপ্রশংসায় বিভোর হয়ে। মোদি যেখানে ঐক্যবদ্ধ ভারতের আওয়াজ তুললেন, সেখানে এ রকম একটি বিশ্ব ফোরামে শেখ হাসিনা দেশের বিরোধী দলকে একহাত নিয়ে ছেড়েছেন।
নিউ ইয়র্কে আয়োজিত ভারতের সর্বস্তরের প্রবাসীদের উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। আর বাংলাদেশের শেখ হাসিনা ভাষণ দিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশীদের উদ্দেশে নয়, নিউ ইয়র্কে বসবাসরত আওয়ামী লীগারদের উদ্দেশে। কেউ কেউ বলতে পারেন, শেখ হাসিনা ঠিক কাজটিই করেছেন। কেননা, নিউ ইয়র্কে বিরোধীরা শেখ হাসিনাকে স্বাগত তো জানানইনি, বরং জাতিসঙ্ঘের সামনে তার বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভের আয়োজন করেছিলেন। রাষ্ট্রনায়কোচিত ভূমিকা রাখতে চাইলে শেখ হাসিনা তাদের উদ্দেশেই ভাষণ দিতে পারতেন। তাদের কথা শোনার চেষ্টা করতে পারতেন; কিন্তু তা তিনি করেননি। কারণ দেশে বিরোধী দলের ওপর যে সীমাহীন নির্যাতন পেটোয়া বাহিনী চালাচ্ছে, তাতে ওইসব লোকের সামনে কথা বলার নৈতিক শক্তি সরকারের শীর্ষব্যক্তিদের আর অবশিষ্ট নেই। জানা যায়, জাতিসঙ্ঘের মূল গেট দিয়ে তিনি সম্মেলন কেন্দ্রে পৌঁছতে পারেননি। পেছনের দরজা দিয়ে তাকে সম্মেলন কেন্দ্রে ঢুকতে হয়েছিল। যারা তাকে মূল দরজা দিয়ে জাতিসঙ্ঘে প্রবেশ করতে দিলো না, তার বিরুদ্ধে স্লেøাগান দিলো, তাদের উদ্দেশে তিনি কথা বলতে যাবেন কোন দুঃখে? কথা বলতে গেলে প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে। শেখ হাসিনা জানেন, সে প্রশ্নের জবাব দেয়ার সামর্থ্য তার নেই। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী বাংলাদেশীদের উদ্দেশে নয়, আওয়ামী লীগারদের উদ্দেশে তাকে ভাষণ দিতে হলো।
মোদি তার ভাষণে দেশের বিরোধী দল সম্পর্কে কোনো কটূক্তিই করেননি; কিন্তু শেখ হাসিনার ভাষণের বেশির ভাগই ছিল বিরোধী দলের নিন্দা। ফলে মোদির ভাষণটি হয়ে উঠেছিল প্রেরণাদায়ী। অপর দিকে শেখ হাসিনার ভাষণ ছিল বিরক্তিকর। মোদি এই বলে অবনত ছিলেন যে, তিনি তার দেশের জনগণের সেবক। আর আমরা নিজেদের এই বলে চিত্রিত করার চেষ্টা করেছি যে, আমরাই হলাম দেশের অবিসংবাদিত নেতা। মোদির ভাষণে প্রবাসী ভারতীয় তরুণেরা উজ্জীবিত হয়েছে। আমরা আমাদের প্রবাসীদের ম্র্রিয়মাণ করেছি। জনপ্রতিনিধিত্বহীন এই সরকারের বিরাট সফরসঙ্গী বহর নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্র সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্ভবত ছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে তার ১৫ মিনিটের একটি বৈঠক এবং জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব বান কি মুনের সাথে দেখা হওয়া।
তা নিয়ে দেশে একেবারে হৈ হৈ রৈ রৈ কাণ্ড ঘটিয়ে দেয়া হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী ঢাকায় ফিরে এসে ৩০ সেপ্টেম্বর বলেছেন যে, জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব বান কি মুনের সাথে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সৌজন্য বৈঠকে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে কোনো কথা হয়নি। তিনি জানান, জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের সাথে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক অত্যন্ত আন্তরিক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নিউ ইয়র্ক যাওয়ার আগে মহাসচিব এক বাণীতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপের আহ্বান জানিয়েছিলেন। রাজনৈতিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে বৃহত্তর আঙ্গিকে সমঝোতার তাগিদ দিয়েছিলেন। হাসিনার মূল বৈঠকে রাজনৈতিক সংলাপ বা সমঝোতা নিয়ে কোনো কথা হয়েছে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ওই বার্তায় তিনি যা বলেছেন, যেভাবে সংলাপ ও সমঝোতার তাগিদ দিয়েছেন, বৈঠকে তার বিন্দুমাত্রও বলেননি। বরং জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব নির্বাচন-পরবর্তীকালে দেশে যে স্থিতিশীলতা এসেছে, শেখ হাসিনা এটি যেভাবে ধরে রেখেছেন, তার প্রশংসা করেছেন। ওই বৈঠকের বিষয়ে একাধিক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্ষেপে গিয়ে বলেন, ‘আমি বলছি, নির্বাচন নিয়ে তিনি কোনো কথা বলেননি। বিশ্বাস না হলে বান কি মুন সাহেবকে জিজ্ঞেস করে নিতে পারেন।’
নরেন্দ্র মোদির সাথে শেখ হাসিনার আলোচনার বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তিস্তা ও সীমান্ত সমস্যা এবং অন্যান্য অমীমাংসিত ইস্যু সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন মোদি। বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নেপাল ও ভুটানকে নিয়ে ট্রানজিটের বিষয়ে ভারতের সহযোগিতা চান। তবে ভারতের তরফ থেকে এর কী জবাব মিলেছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী তা জানাতে পারেননি। নিউ ইয়র্কে প্রধানমন্ত্রীর রেকর্ড সংখ্যক সফরসঙ্গী নিয়ে যাওয়া, জাতিসঙ্ঘ কার্যক্রমের তাদের সম্পৃক্ততা এবং বিশাল ওই বহরের ব্যয় নিয়ে একাধিক প্রশ্ন করেন সাংবাদিকেরা; কিন্তু মন্ত্রী এগুলোর জবাব এড়িয়ে গিয়ে বিরক্তিসহকারে পররাষ্ট্র সচিবের দিকে মাইক্রোফোন ঠেলে দেন। পররাষ্ট্র সচিব বলেন, অধিবেশনের সাইড লাইনে প্রায় ৫০টি ইভেন্ট হয়েছে। এসব ইভেন্টে সফরসঙ্গীরা অংশ নিয়েছেন। সফরসঙ্গীদের মধ্যে সরকারি দল ও জোটের জেলাপর্যায়ের নেতা সুনির্দিষ্টভাবে কোন ইভেন্টে অংশ নিয়েছেন, দেশের জন্য কী বয়ে এনেছেন, অব্যাহতভাবে এমন প্রশ্ন আসায় ফের মাইক্রোফোন টেনে নেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, এখানে কে গেছেন, কত খরচ হয়েছে, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন সার্বিকভাবে আমরা কী অর্জন করতে পেরেছি। সেই অর্জন নিয়ে বেশি বেশি প্রশ্ন করার পরামর্শ দেন মন্ত্রী। এ অবস্থায় মনে হয়, কেবল প্রমোদ ভ্রমণের জন্যই এই বিশাল বহরকে নিউ ইয়র্ক নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। জাতির জন্য কী অর্জিত হয়েছে সেটি বড় কথা নয়। সফরের মূল উদ্দেশ্য সফল হয়েছে।
এর বাইরেও এই সফরের সাফল্য যে নিতান্তই অতিরঞ্জিত কিংবা ভিত্তিহীন সেটি প্রমাণিত হয়ে গেছে। পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টে দেখা গেছে, নিউ ইয়র্কে অবস্থানকালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাথে জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব বান কি মুনের দ্বিপক্ষীয় কোনো বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি। শেখ হাসিনার সাথে তার বৈঠক বলে যে স্টিল ছবি ও ভিডিও ফুটেজ বাংলাদেশের প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়েছে, তা ছিল মূলত জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের সাথে প্রধানমন্ত্রীর একটি ফটোসেশন। কূটনৈতিক ভাষায় এটাকে বলা হয়, ‘ফটো অপরচুনিটি’। গত ৩০ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্ট পত্রিকার প্রশ্নের জবাবে লিখিত বার্তায় জাতিসঙ্ঘ এ তথ্য জানিয়েছে।
মহাসচিবের দিনের কর্মসূচি অনুযায়ী গত ২৭ সেপ্টেম্বর শনিবার জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদে জেনারেল ডিবেট (মূল ভাষণ) শুরুর আগে সকাল ৯টায় জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের সাথে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতে কী কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছে এবং এ বিষয়ে কোনো রিড আউট (মিডিয়ার জন্য রেকর্ড) রয়েছে কি নাÑ এমন প্রশ্নের জবাবে জাতিসঙ্ঘের এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলবিষয়ক মুখপাত্র ম্যাথিয়াস লিন্ডারম্যান ৩০ সেপ্টেম্বর পত্রিকাকে লিখিত বার্তায় জানান, উল্লিখিত শিডিউল মোতাবেক জাতিসঙ্ঘ অধিবেশনের সাইডলাইনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাথে জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের যে সাক্ষাৎটি হয়েছে, তা এত অল্প সময়ের জন্য যে, এই সাক্ষাতের কোনো রিড আউট রেকর্ড আমাদের কাছে নেই। তিনি বলেন, সাধারণ অফিসিয়াল বা দ্বিপক্ষীয় বৈঠক না হলে ওই বৈঠকের কোনো রিড আউট থাকে না। লিন্ডারম্যানের ওই লিখিত বার্তা পাওয়ার পর এ বিষয়ে আরো জানতে তাকে ফোন করা হলে তিনি পত্রিকার প্রতিনিধিকে জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের ডেপুটি স্পোক্সপার্সন ফারহান হকের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন। ফারহান হকের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি লিখিত বার্তায় বলেন, ‘দিস ওয়াজ এ ফটো অপরচুনিটি। দেয়ার ওয়াজ নো রিড আউট।’ অর্থাৎ সাক্ষাৎটি ছিল প্রধানমন্ত্রী ও তার সিনিয়র ডেলিগেটদের সাথে জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের একটি ফটোসেশন। এটা কোনো অফিসিয়াল বা দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ছিল না। জাতিসঙ্ঘের প্রচলিত প্রথা মোতাবেক অধিবেশনে যোগদানকারী রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের সাথে ফটোসেশনের জন্য অনুরোধ জানাতে পারেন।
কিন্তু এ নিয়ে বিভ্রান্তি প্রচার শুরু হয়েছে নিউ ইয়র্ক থেকেই। ২৭ সেপ্টেম্বর বিকেলেই প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব বান কি মুনের সাথে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছে বলে শেখ হাসিনার সাথে সফরকারী মিডিয়া টিমকে ব্রিফ করেন। ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, ‘বান কি মুনের সাথে প্রধানমন্ত্রীর মিটিং অত্যন্ত আন্তরিক পরিবেশে হয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশের স্থিতিশীল পরিস্থিতির জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূমিকার প্রশংসা করেছেন বান কি মুন। এভাবেই বাংলাদেশ সামনে এগিয়ে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব।’
ওই দিন বিকেলে নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচি তুলে ধরা হয়। তাতেও বলা হয় যে, শেখ হাসিনার সাথে বান কি মুনের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ ছাড়া ২৬ সেপ্টেম্বরও জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের কার্যালয়, জাতিসঙ্ঘের মুখপাত্র অফিস, জাতিসঙ্ঘের রাজনৈতিকবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারির কার্যালয় এবং তার স্ট্র্যাটেজিক বিষয়ক কর্মকর্তা হোসে লুইস দিয়াজের সাথে কথা বলে পত্রিকাটি নিশ্চিত হয় যে, জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের সাথে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কোনো দ্বিপক্ষীয় বৈঠক নেই। তারপরও সম্ভবত কেবল মুখ রক্ষার জন্যই নিছক একটি ফটোসেশনকেই ‘দ্বিপক্ষীয় বৈঠক’ বলে গল্প ফাঁদলো সরকার।
কিন্তু তথ্য ও প্রযুক্তির এই যুগে এ ধরনের প্রচারণা চালিয়ে পার পাওয়া কঠিন। আরো একবার প্রমাণিত হলো, সরকার যেমন জনগণনির্ভর নয়, তেমনি জনগণকে বিভ্রান্ত করতেই ব্যস্ত।
লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক
[email protected]
নঈম নিজাম: মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শুধু একজন লতিফ সিদ্দিকী নন, বিতর্কিত সবাইকে বাদ দিন। মন্ত্রিসভায় বিতর্কিত কাউকে রাখবেন না। দল ও সরকারে আরও কঠোর হোন। কঠিনভাবে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করুন। বাচালদের বের করে দিন। সন্ত্রাস, দুর্নীতি, অনিয়মে অভিযুক্তদের এখনই সরিয়ে দিন। আপনি প্রশংসিত হবেন। দেশের মানুষের কাছে আপনার গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়বে। চাটুকারদের কোনো কথা শুনবেন না। তাদের বিতাড়িত করুন। দেশের মানুষ তাকিয়ে আছে আপনার দিকে। আপনার সাহসী সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে অনেক কিছু।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমরা জানি আপনি একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান। আমার মনে আছে, ’৯২ সালে ভোলা থেকে লঞ্চে ফিরছি আপনার সঙ্গে। খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেল কোরআন তিলাওয়াতের শব্দে। রুম থেকে বের হয়ে মনোযোগ দিয়ে শুনছি আপনার সুরেলা কণ্ঠে কোরআন তিলাওয়াত। ফজরের নামাজ শেষে আপনি কোরআন তিলাওয়াত করছিলেন। আপনার সঙ্গে আজমির শরিফও আমি গিয়েছিলাম। আপনি একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিম নারী। নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত সবকিছু আপনি আদায় করেন। আমরা জানি প্রতিদিন রুটিন কাজ শুরু করেন আপনি তাহাজ্জুদের নামাজ দিয়ে। তারপর ফজরের নামাজ পড়েন। কোরআন তিলাওয়াত শেষে পত্রপত্রিকা পড়েন। তারপর ব্রেকফাস্ট সেরে শুরু করেন রাষ্ট্রের কাজ। মধ্যরাত পর্যন্ত তা-ই করেন। আপনি বার বার হজ পালন করেছেন। প্রতি বছর অনেক ধর্মপ্রাণ মুসলমানকে পবিত্র হজ পালন করতে পাঠান। এমনকি কমিউনিস্ট চিন্তার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও বাম মন্ত্রীদেরও ধর্মপথে আনতে আপনি হজে পাঠিয়েছিলেন, এবারও পাঠিয়েছেন। ধর্মীয় রীতিনীতির প্রতি আপনার এত শ্রদ্ধার কারণে আমার বিশ্বাস ছিল লতিফ সিদ্দিকীর লাগামহীন বক্তব্যের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবেন। শেষ পর্যন্ত আপনি করেছেনও তাই। মন্ত্রিসভা থেকে তাকে অপসারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ সিদ্ধান্ত সাহসী, ইতিবাচক এবং বাস্তবসম্মত। আপনাকে অভিনন্দন। তবে আমার আরেকটি দাবি, বিতর্কিত অন্য মন্ত্রীদেরও এখনই দল থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিন। আপনি আরও প্রশংসিত হবেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনার পিতা বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও ধর্মপ্রাণ মুসলমান ছিলেন। তিনি নিয়মিত নামাজ পড়তেন, রাখতেন রোজা। বায়তুল মোকাররম মসজিদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা এবং তাবলিগ জামাতের জন্য স্থায়ী জমি বরাদ্দ ছিল তার অবদান। তিনি তাবলিগ জামাতের কার্যক্রমকে ইতিবাচকভাবে দেখতেন। সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল, অনেক আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জের পরও তিনি ওআইসি সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন পাকিস্তানে। পিএলও নেতা ইয়াসির আরাফাত নিজে ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গিয়েছিলেন মুসলিম বিশ্বের নেতাদের সম্মেলনে। বঙ্গবন্ধু মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের পক্ষে জোরালো ভূমিকা রাখেন। আপনি নিজে মুসলিম বিশ্বের ঐক্য ও সংহতি আরও জোরদারের পক্ষে। বঙ্গবন্ধু ও আপনার সেই আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়ামে লতিফ সিদ্দিকীকে এক দিনও রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই। সরকারের পাশাপাশি দল থেকেও সরিয়ে দিন। তাতে অন্য বাচাল মন্ত্রী ও নেতারা সতর্ক হবেন। কারণে, অকারণে ফালতু কথা বলা বন্ধ হবে। টাঙ্গাইলে সিদ্দিকী পরিবারের কাউকে টানতে হলে, কাদের সিদ্দিকীকে ফিরিয়ে নিন। মুরাদ সিদ্দিকীকে নিয়ে আসুন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি জানেন, আবদুল লতিফ সিদ্দিকী পাট মন্ত্রণালয়ে থাকাকালেও স্বেচ্ছাচারিতার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন। অনিয়মের জালে জড়িয়েছিলেন তিনি। কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা করতেন না। যা খুশি তা-ই করেছেন। পাটমন্ত্রী ফাইলে লিখেছিলেন, ‘নীতিমালা বঙ্গোপসাগরে নিক্ষেপ’ করতে, ‘চট্টগ্রামের মেয়ের পাণি গ্রহণ’ করেছেন বিধায় মতিঝিলের দামি জমি পানির দরে চট্টগ্রাম সমিতিকে বরাদ্দ দিতে। অতীত, বর্তমানে কোনো মন্ত্রীর এভাবে নোট লেখার কোনো নজির নেই। শুধু তাই নয়, সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকার কারখানার জমি তিনি নামমাত্র মূল্যে ছেড়ে দিয়েছেন। মন্ত্রণালয় চালানোর সময় তার স্টাইল ছিল আগের দিনের রাজা-বাদশাহদের মতো। এ যুগের মন্ত্রীদের মতো নয়। তাই নিউইয়র্কে প্রকাশ্যে এভাবে কথা বলতে তার মন কাঁপেনি। নিজেকে তিনি ধরাছোঁয়ার বাইরে মনে করতেন। কিন্তু কেউ জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে নন। জবাবদিহিতা সবাইকে করতে হয়। আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর পাট মন্ত্রণালয়ে থাকাকালের সব অনিয়মের তদন্ত করুন। কঠোর ব্যবস্থা নিন। অন্যথায় সরকার প্রশ্নবিদ্ধ হবে। একজন মানুষের ব্যক্তিগত বিতর্কের দায়ভার একটি সরকার নিতে পারে না।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনার কঠোর সিদ্ধান্ত দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা ইতিবাচকভাবে নেবেন। তারা আপনার তারিফ করবেন। ব্যক্তির চেয়ে দল বড়। দলের চেয়ে দেশ। তাই আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর পাশপাাশি মন্ত্রিসভার বিতর্কিত সবাইকে সরিয়ে দিন। সমাজকল্যাণমন্ত্রী সৈয়দ মহসীন আলীর অনেক বক্তব্য-বিবৃতিও প্রায়ই সরকারকে বিব্রত করে। তাকে মন্ত্রিসভায় রাখতে হবে কেন? তিনি লতিফ সিদ্দিকীর মতো কাণ্ড যে কোনো সময় ঘটিয়ে বসতে পারেন। এ ছাড়া আরও কয়েকজন মন্ত্রী-এমপির কর্মকাণ্ড প্রশ্নবিদ্ধ। হাতে গোনা কয়েকজন এমপি গডফাদার সেজে বসেছেন। তাদের কাছে আপনার দলও নিরাপদ নয়। মুহূর্তে তারা খুনোখুনি করে বসেন। অপরাধ সাম্রাজ্যের এই নায়কদের চিহ্নিত করুন। এখনই মন্ত্রিসভায় রদবদল করুন। অদক্ষ, অযোগ্য ও অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর হোন। দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর বেসামালদের লাগাম টানুন। তাতে আপনার ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হবে। মন্ত্রী-এমপিরা সতর্ক হবেন। অঙ্গ, সহযোগী সংগঠনগুলো বিতর্কিত কর্মকাণ্ড থেকে বিরত হবে। উন্নয়ন সাফল্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে রাষ্ট্র পরিচালনা আপনার জন্য আরও সহজতর হবে। বন্ধ হবে সমালোচকদের মুখ।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চাটুকারদের কথায় কান দেবেন না। লন্ডন থেকে ফিরেই কঠোর হোন। দলের সর্বশেষ যৌথসভার বৈঠকে লতিফ সিদ্দিকীর বক্তব্য ছিল পুরোপুরি চাটুকারিতা। দলের প্রবীণ নেতারা সে বৈঠকে সঠিকভাবে বলেছিলেন দলকে সংগঠিত করতে। সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড আরও বাড়াতে। প্রবীণ নেতাদের সেই মতামতের বিরোধিতা করে লতিফ সিদ্দিকীর বক্তব্য ছিল চাটুকারিতাপূর্ণ। সর্বনাশের ইঙ্গিত। সে ইঙ্গিতই নিউইয়র্কে আমরা দেখলাম। দেশে কোনো ইস্যু ছিল না। একটি ইস্যু তিনি তৈরি করে দিলেন। এমন ইস্যু তৈরি করার মতো আরও অনেকে বহাল আছেন সরকারে, দলে। তাদের ব্যাপারে কঠোর হোন। আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী করুন। বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ আপনার পাশে থাকবে। পাঁচ, দশ জনের বিদায়ে আওয়ামী লীগের কিছু যাবে আসবে না।