পৃথিবীকে জেনে নিন আপনার ভাষায়….24 Hrs Online Newspaper

ঈদকে সামনে রেখে অবাধে ঝুঁকিপূর্ণ লঞ্চ চলাচল

Posted on June 30, 2015 | in জাতীয় | by

lunchস্টাফ রিপোর্টার : সারাদেশে শত শত ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রীবাহী লঞ্চল চলাচল করছে। অর্থের বিনিময়ে এসব লঞ্চকে ফিটনেস সনদ ও রুট পারমিটের মাধ্যমে চলাচলের সুযোগ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি ঝুঁকিপুর্ণ ওসব লঞ্চে নেই দক্ষ ও যোগ্য চালকও। ফলে বর্ষাকালে নৌদুর্ঘটনায় ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। মূলত সমুদ্রপরিবহন অধিদফতর ও বিআইডবিøউটিএ-এর এক শ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তাই অর্থের বিনিময়ে ঝুঁকিপূর্ণ নৌযানকে কাগুজে বৈধতা দিয়ে যাত্রীদের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলছে। বিষয়টি ওপেন সিক্রেট হলেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় জনবল সঙ্কটের দোহাই দিয়ে দুর্নীতিবাজ ওসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সারাদেশে বর্তমানে ৫ শতাধিক ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল করছে। তার মধ্যে অধিকাংশই অতি ঝুঁকিপূর্ণ। ১০ হাজার থেকে লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের দুর্নীতিবাজ সার্ভেয়াররা ঝুঁকিপূর্ণ এসব লঞ্চের ফিটনেস সনদ দিচ্ছে। আর ওই সদন অনুযায়ী রুট পারমিট ও সময়সূচি অনুমোদন করছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডবিøউটিএ) ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট বিভাগ। এখানেও বড় অংকের টাকা লেনদেন হচ্ছে। মূলত সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা এবং প্রভাবশালী লঞ্চ মালিকদের অনৈতিক কাজের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ লঞ্চগুলো চলাচলের সুযোগ পাচ্ছে। এতে দুর্ঘটনার ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে।
সূত্র জানায়, সরকারি হিসাবে ১৯৭৬ সাল থেকে চলতি জুন পর্যন্ত গত ৪০ বছরে দেশে ৫৬৭টি বড় নৌ দুর্ঘটনায় মারা গেছে ৪ হাজার ৬৩৫ জন। আর নিখোঁজ হয়েছে আরো প্রায় ৫শ জন। তাছাড়া আহত হয়েছে প্রায় ৪৬২ জন। কিন্তু বেসরকারি হিসাবে দেশে নৌদুর্ঘটনা ও তাতে হতাহতের সংখ্যা সরকারি হিসাব থেকে অনেক বেশি। এসব নৌদুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হচ্ছেই দুর্নীতিবাজ চক্রের অসাধু কর্মকাÐ।
সূত্র জানায়, দেশে সংঘটিত বড় বড় নৌদুর্ঘটনার পর পরই সরকারের তরফ থেকে একাধিক তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। ওসব কমিটির প্রতিবেদনে আনফিট লঞ্চ চলাচল অনুমোদন প্রক্রিয়ায় নানা অনিয়মের তথ্য বেরিয়ে আসে। একই সাথে বেরিয়ে আসে চালকের অদক্ষতা ও অযোগ্যতার তথ্যও। কিন্তু স্বল্পসময়ের মধ্যেই ওসব ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যায়। নামকাওয়াস্তে জেল-জরিমানার সম্মুখীন হন লঞ্চ মালিক ও চালক। আর দায়ী সরকারি কর্মকর্তারা থাকেন বহাল-তবিয়তে। ফলে কিছুদিনের মধ্যে নৌপথে আগের অবস্থায় ফিরে আসে। পুনরায় শুরু হয় ঝুঁকিপূর্ণ লঞ্চ চলাচল। আর এসব নৌদুর্ঘটনায় বলির পাঠা হচ্ছে সাধারণ যাত্রীরা। সরকারি হিসাবে দেশজুড়ে ছোট-বড় যাত্রীবাহী লঞ্চের সংখ্যা সাত শতাধিক। তারমধ্যে পাঁচশতাধিকই লঞ্চই ঝুঁকিপূর্ণ। সমুদ্র পরিবহন অধিদফতর গত ১৫ বছরে লঞ্চ দুর্ঘটনার ধরন ও কারণ পর্যালোচনা করে ঝুঁকিপূর্ণ লঞ্চ চিহ্নিত করেছে। সে হিসাবে ৭০ শতাংশের বেশি লঞ্চই ত্রæটিযুক্ত। তারমধ্যে সানকেন ডেক (লঞ্চের নিচের ডেক নদীর পানির লেভেল বরাবর অথবা নিচে থাকে) বিশিষ্ট আড়াইশ লঞ্চ অতি ঝুঁকিপূর্ণ। আর এক ইঞ্জিনচালিত দুই বা আড়াই তলা বিশিষ্ট লঞ্চ রয়েছে দু’শতাধিক। যা ত্রæটিযুক্ত লঞ্চ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এ ধরনের নৌযানগুলো ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা, রাঙ্গামাটি, সিলেটসহ বিভিন্ন এলাকায় চলাচল করছে।
সূত্র আরো জানায়, দেশে এবার বর্ষা মৌসুমে দেশে ঈদ উদযাপিত হবে। ইতিমধ্যে ঈদকে ঘিরে ঝুঁকিপূর্ণ লঞ্চগুলো অতিরিক্ত যাত্রী বহন এবং বাড়তি ট্রিপের আয়োজন সম্পন্ন করছে। জোড়াতালি দিয়ে মেরামত করা হচ্ছে ভাঙা লঞ্চ। বাইরের দিকে নতুন রংয়ের আঁচড় পড়ছে। সামনের অংশ সাজানো হচ্ছে নতুন ফার্নিচার দিয়ে। একই সাথে গুছিয়ে আনা হচ্ছে সংশ্লিষ্ট দফতর থেকে প্রয়োজনীয় অনুমতিপত্রও সংগ্রহও। গত বছরও একইভাবে ত্রæটিপূর্ণ নৌযানগুলোকে সাজিয়ে পানিতে নামানো হয়েছিল। সেবার ঈদের পর (৪ আগস্ট) মাওয়ার পদ্মায় আনফিট লঞ্চ এমএল পিনাক-৬ ডুবে ১১০ যাত্রীর মৃত্যু ও নিখোঁজ হয়।
এদিকে ঝুঁকিপূর্ণ লঞ্চ চলাচলের বিষয়টি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে স্বীকার করে লঞ্চ মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল (যা-প) সংস্থার প্রেসিডেন্ট মাহাবুব উদ্দীন আহমদ বীর বিক্রম জানান, স্বল্প দূরত্বের পথগুলোতে ছোট লঞ্চগুলো চলাচল করছে। ওসব রুটে যে সংখ্যক যাত্রী ও যে পরিমাণ মাল বহন করা হয়, আর্থিক বিবেচনায় তা লাভজনক নয়। তবুও জনস্বার্থে মালিকদের বড় লঞ্চ তৈরিতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। তাদের বলা হয়েছে ছোট লঞ্চের বিপরীতে বড় লঞ্চ প্রতিস্থাপনের সুযোগ দেয়া হবে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রশাসনের সামনে অবৈধ স্পিড বোট, ট্রলার ও ফিশিংবোটে যাত্রী বহন করা হয়। এতে লঞ্চের যাত্রী কমে যাচ্ছে। মালিকেরা বড় লঞ্চ নামানো লাভজনক মনে করছেন না।
অন্যদিকে বিরূপ আবহাওয়ায় সানকেন ডেক বিশিষ্ট আড়াইশ লঞ্চ অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০-৩০ মিটার দৈর্ঘ্যরে যাত্রীবাহী এসব নৌযানগুলোর বেশিরভাগই ৭০-এর দশকে কাঠের লঞ্চ হিসেবে তৈরি করা হয়। পরে তা স্টিল বডিতে রূপান্তর করা হয়। নৌযানের উপরের অংশের তুলনায় ড্রাফট খুবই কম, দোতলা হওয়ার কারণে পানির ওপরের অংশে ওজন বেশি থাকে। ফলে অল্প ধাক্কা বা উত্তাল ঢেউয়ের আঘাতে মুহূর্তের মধ্যে তা উল্টে যায়। এসব লঞ্চের কেবিন ও নিচের ডেকের যাত্রীরা বের হতে পারেন না। ফলে প্রাণহানির ঘটনা বেশি ঘটে থাকে। পদ্মার শিমুলিয়া-কাওড়াকান্দি ও পাটুরিয়া-দৌলতদিয়ার মতো গুরুত্ব পয়েন্টে চলাচল করছে ছোট ছোট শতাধিক ঝুঁকিপূর্ণ লঞ্চ। এছাড়াও আরিচা-নগরবাড়ি, নরসিংদী-নবীনগর, ঢাকা-মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ-মুন্সীগঞ্জ-চাঁদপুর, বরিশাল-ভোলা ও ঝালকাঠি, খুলনা-পিরোজপুর এবং ভৈরব-সাচনা রুটে এসব লঞ্চ চলাচল করছে। ২০১৪ সালে পদ্মায় এমভি পিনাক ডুবে ১১০ জন যাত্রীর মৃত্যু ও অনেকে নিখোঁজ হন। একই বছর পটুয়াখালীর রামনাবাদ নদীতে এমভি সাথিল-১ লঞ্চ ডুবে ১৬ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এ দুটি সানকেন ডেক বিশিষ্ট ছোট লঞ্চ। তাছাড়া ঝুঁকিপূর্ণের তালিকায় মাঝারি ও বড় আকারের লঞ্চও রয়েছে। এক ইঞ্জিনবিশিষ্ট দুই বা আড়াই তলার দুই শতাধিক লঞ্চ রয়েছে। এগুলোর দৈর্ঘ্য ৩১-৫০ মিটার। এর অধিকাংশ ২০০৬ সালের আগে তৈরি। ওই সময় বিআইডবিøউটিএ জাহাজের ডিজাইন অনুমোদন করেছে। একই ডিজাইনে নাম পরিবর্তন করে একাধিক লঞ্চ তৈরি করা হয়। এসব লঞ্চের ড্রাফটের তুলনায় উপরিভাগের ওজন বেশি এবং এক ইঞ্জিনবিশিষ্ট হওয়ায় ঝড়ো হাওয়ায় অথবা অল্প ধাক্কায় সহজে ডুবে যায়। এগুলো ঢাকা-শরীয়তপুর, ঢাকা-বরিশাল, পাতারহাট এবং ঢাকা-মতলব, ইছলী ও চাঁদপুর রুটে চলাচল করছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, ঢাকা থেকে বরিশাল, পটুয়াখালীসহ অন্য রুটগুলোতে চলাচলকারী অনেক বড় লঞ্চে ডিজাইনবহির্ভূত অবকাঠামো ও কেবিন আছে । এসব অবকাঠামো জাহাজকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে- দেশজুড়ে চলমান লঞ্চগুলোর বেশিরভাগই আনফিট। এগুলোয় কোনো না কোনো ত্রæটি রয়েছেই। বিভিন্ন সার্ভেতে তা ধরাও পড়ছে। তবুও এসব লঞ্চকে ফিটনেস সনদ দেয়া হচ্ছে। প্রতিটি লঞ্চ বছরে একবার ফিটনেস পরীক্ষা করার কথা। বছরব্যাপী ফিটনেস বজায় থাকছে কিনা তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ডিজি শিপিংয়ের পরিদর্শকদের। কিন্তু দেশের ৯ হাজার ৮৫২টি রেজিস্ট্রিকৃত নৌযানের জন্য মাত্র ৪ জন সার্ভেয়ার ও ৪ জন পরিদর্শক রয়েছেন। সর্বনিæ ১০ হাজার থেকে লাখ টাকার বিনিময়ে অফিসে বসেই ফিটনেস সার্টিফিকেট দিয়ে দিচ্ছেন সার্ভেয়াররা। ফলে আনফিট লঞ্চ সহজেই অনুমোদন পেয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি অদক্ষ ও অযোগ্যদের হাতে তুলে দেয়া হয় লঞ্চ পরিচালনার দায়িত্ব। এ কারণে দুর্ঘটনার হারও বাড়ছে। ৩০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকার বিনিময়ে অযোগ্যদের চালক হিসেবে সনদ দেয়া হয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রæয়ারিতে পাটুরিয়ার পদ্মায় ডুবে যাওয়া এমভি মোস্তফা লঞ্চের দুর্ঘটনার জন্য চালকের অদক্ষতাকে দায়ী করা হয়। দিন-দুপুরে এ দুর্ঘটনায় ৮১ জনের প্রাণহানি ঘটে। এর আগে গত বছর মুন্সীগঞ্জের রসুলপুরে মেঘনা নদীতে এমভি মিরাজ-৪ লঞ্চ ডুবে ৫৪ জনের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনার জন্য লঞ্চচালক রফিকুল ইসলামকে দায়ী করা হয়েছে।
সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের মহাপরিচালক কমোডর এম জাকিউর রহমান ভূঁইয়া ঝুঁকিপূর্ণ লঞ্চ চলাচলে অনুমোদন প্রসঙ্গে বলেন, অনেক ছোট ছোট লঞ্চ চলাচল করছে সত্য। এগুলোর কাঠামোও ভালো নয়। হঠাৎ করে এসব লঞ্চ বন্ধ করা সম্ভব নয়। এগুলো স্বল্প দূরত্বের নৌপথে চলাচল করছে। ওই পথে বড় আকারের লঞ্চ নেই। বিকল্প ব্যবস্থা না করা পর্যন্ত এসব লঞ্চ বন্ধ করলে যাত্রী চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে। তবে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ কিছু লঞ্চ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

Comments are closed.

সর্বশেষ খবর

আজকের ছবি

www.facebook.com

Tag Cloud