April 16, 2026
বাংলাদেশ হইতে শেষপর্যন্ত বেসরকারিভাবে বৎসরে ৫ লক্ষ শ্রমিক নেওয়ার আশ্বাস দিল মালয়েশিয়া। বাংলাদেশের প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন বর্তমানে মালয়েশিয়া সফরে রহিয়াছেন। ইতোমধ্যে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তাহার দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হইয়াছে। এই বৈঠক সূত্রেই মালয়েশিয়ার এই আগ্রহের কথা জানা গিয়াছে। ইহাতে মালয়েশিয়ার তিনটি অঞ্চলে আগামী তিন বৎসরে প্রায় ১৫ লক্ষ শ্রমিক যাইতে পারিবে। তাহাদের তিন বৎসরের ভিসা দেওয়া হইবে এবং পরবর্তীতে এক বৎসর ভিসা নবায়ন করা যাইবে। এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত হইলে তাহা মালয়েশিয়ায় শ্রমশক্তি রপ্তানির অগ্রগতিতে হইবে এক মাইলফলক। বিদেশ গমনেচ্ছুকদের মধ্যে বর্তমানে যে অস্থিরতা বিরাজ করিতেছে তাহাও বহুলাংশে দূর হইবে। এই বিষয়ে ঈদের পর সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হইবে বলিয়া জানা যায়।
উল্লেখ্য যে, এই ধরনের আশ্বাসের মাধ্যমে আসলে জিটুজি বা গভর্ণমেন্ট টু গভর্ণমেন্ট কর্মী পাঠাইবার উদ্যোগ মাঠে মারা গেল। ২০০৯ সালে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের গুরুত্বপূর্ণ দেশ মালয়েশিয়ায় নানা অভিযোগে বাংলাদেশি কর্মী নেওয়া বন্ধ হইয়া যায়। দীর্ঘ কূটনৈতিক তৎপরতার পর ২০১২ সালের ২৬ নভেম্বর দুই দেশের মধ্যে এই জিটুজি বা সরকারিভাবে কর্মী নেওয়ার চুক্তি করা হয়। ইহার পর মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য বাংলাদেশের ১৪ লক্ষ ৫০ হাজার লোক নিবন্ধন করেন। কিন্তু দুঃখজনক হইলেও সত্য যে, গত তিন বৎসরে মাত্র সাড়ে সাত হাজার কর্মী নেয় দেশটি। অথচ একই সময়ে ছাত্র ও পর্যটক হিসাবে সেখানে গিয়াছেন অন্তত এক লক্ষ লোক। আর বঙ্গোপসাগর দিয়া সাগরপথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন দেড় লক্ষ লোক। সমপ্রতি থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি নাগরিকদের গণকবর আবিষ্কার হইয়াছে এবং এই নিয়া আন্তর্জাতিক মিডিয়ায়ও কম হইচই হয় নাই। প্রকৃতপক্ষে জিটুজি পদ্ধতিতে মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগে ব্যর্থতার কারণেই এই উদভূত ও অমানবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হইয়াছে বলিয়া বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন। ইহার পরই বাংলাদেশ সরকার আবার বেসরকারিভাবে লোক নেওয়ার জন্য তৎপরতা শুরু করে। এই প্রক্রিয়া আসলে বিজনেস টু বিজনেস বা বিটুবি নামে পরিচিত।
সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের পর বাংলাদেশের জনশক্তির সবচাইতে বড় বাজার হইল মালয়েশিয়া। কিন্তু অভিবাসন ব্যয় কমানো ও নানা রকম প্রতারণা বন্ধ করিতেই জিটুজি বা সরকারিভাবে জনশক্তি রপ্তানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তখন হইতেই বেসরকারি উদ্যোক্তা ও এজেন্সিগুলি প্রমাদ গুনিতে থাকে। কেননা ইহাতে তাহাদের চাকুরী ও কর্মসংস্থানের ওপর আঘাত আসে। তাহাদের অস্তিত্বই পড়ে হুমকির মুখে। অন্যদিকে সরকারিভাবে লোক পাঠানোয় কালক্ষেপণ ও পর্যাপ্ত লোক পাঠানো সম্ভব না হওয়ায় সরকারিভাবে নিবন্ধিত অনেক কর্মীও শেষপর্যন্ত হতাশ হইয়া পড়ে। তাহারা অবৈধভাবে ও জীবনের ঝুঁকি নিয়া বিমান ও সমুদ্র পথে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার চেষ্টা চালায়। কিন্তু তাহাদের অনেকের চেষ্টাই শেষপর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় এবং দুঃখজনকভাবে অনেকেই পতিত হয় মৃত্যুমুখে। এখন বেসরকারিভাবে আবার এই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হইলে মালয়েশিয়ায় শ্রমশক্তি রপ্তানি গতিশীল হইবে। সেই আশায় অনেকে নূতন করিয়া স্বপ্ন দেখিতে শুরু করিয়াছেন। তবে আগের অভিযোগগুলি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করিয়া প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারিলে এবং নিয়োগকর্তা বিমানভাড়াসহ অন্যান্য খরচ বহন করিবার ফলে সার্বিক খরচ কমিয়া গেলে বেসরকারি খাতে শ্রমশক্তি রপ্তানিই লাভ ও সুবিধাজনক হইবে। ইহা অস্বীকার করিলে চলিবে না যে, শ্রমশক্তি রপ্তানিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বেসরকারি উদ্যোগই আমাদের প্রধান ভরসা। এক্ষেত্রে তাহাদের অবদান অপরিসীম। কিন্তু কতিপয় অসাধু এজেন্সির জন্য সকলকে শাস্তি প্রদান কাম্য নহে। যাই হউক, বিটুবি বা বেসরকারিভাবে মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের এই চিন্তাভাবনাকে আমরা স্বাগত জানাই।