পৃথিবীকে জেনে নিন আপনার ভাষায়….24 Hrs Online Newspaper

বালির ট্রাকে আবদ্ধ খালেদা-বিপন্ন গণতন্ত্র !

Posted on January 8, 2015 | in নির্বাচিত কলাম | by

golam-maula-rony.thumbnailগোলাম মাওলা রনি : আমার কিছুতেই মাথায় ঢুকছেনা-৫ই জানুয়ারী তারিখে বিএনপিকে যদি ঢাকায় সমাবেশ করতে দেয়া হতো তাহলে কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেতো! আমার মন মস্তিস্ক কিছুতেই হিসেব মেলাতে পারছে না-কেনো একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে নাজেহাল করার জন্য তাঁর কার্যালয়ের সামনে বালু-ইট এবং মাটি ভর্তি ১৩টি ট্রাক সাজিয়ে রাখা হলো ব্যারিকেড সৃষ্টির জন্য! সেই লোকগুলি নিশ্চয়ই আমাদের চেয়ে অধিকতর বুদ্ধিমান যারা তাদের লোকজনকে হুকুম দিয়েছিলো বেগম জিয়ার কার্যালয়ের ভেতরে অবস্থানরত অল্প কয়েকজন মহিলা, ব্যক্তিগত কর্মচারী এবং মিডিয়ার লোকজনের ওপর মরিচের ¯েপ্র করার জন্য। গণতন্ত্র রক্ষার নামে দেশের একজন প্রধানতম রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে যে ব্যবহার করা হলো তা নিশ্চয়ই তাঁকে ইতিহাসে মজলুম হিসেবে অমর করে রাখবে। অন্যদিকে সময়ই বলে দেবে-কারা প্রকৃত জুলুমকারী এবং নির্ধারিত হয়ে যাবে ইতিহাসে তাদের স্থান।

একটি মন্দ কাজ মানুষকে যতটা না ক্ষতি করে তার চেয়েও বেশি ক্ষতি করে কোন মন্দ উদাহরণ সৃষ্টিকারীকে। ১৯৭৩ সালের নিবার্চনে খোন্দকার মুশতাককে জেতানোর জন্য ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের ঘটনার মাধ্যমে বাংলাদেশের নির্বাচন পদ্ধতিকে কলুষিত করার যে ঘৃন্য কর্মটি করা হয়েছিলো তা কিন্তু ফুলে ফেঁপে ২০১৪ সালে এসে বটবৃক্ষে রূপান্তরিত হয়েছে। অন্যদিকে ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারীর ঘটনাটি যদি নির্দিষ্ট সময় বহাল তবিয়তে থাকতে পারে তাহলে ধরে নিতে হবে যে- বাংলাদেশে গণতন্ত্রের নামে অদ্ভুত এক নিয়ম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়ে গেলো। আগামী দিন গুলোতে সবাই চাইবে রাষ্ট্রের প্রশাসন যন্ত্রকে ব্যবহার করে নিজেদের খায়েশ পূর্ন করার যা কিনা দীর্ঘমেয়াদে দেশকে নিয়ে যাবে চরম ধ্বংশের দিকে।

ক্ষমতাসীনরা ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারীর ঘটনার পক্ষে বলতে গিয়ে বার বার সংবিধানের দোহাই দিয়ে থাকে এবং বলে থাকে- ঐ সময়ে যত হত্যা, সন্ত্রাস এবং লুটতরাজ হয়েছে তার সকল দায়িত্ব বিএনপি জামাত জোটের। আমার ভয় হচ্ছে-যদি কোন কালে গণেশ উল্টে যায় তবে তখনকার ক্ষমতাসীনরা-বর্তমান ক্ষমতাসীনদেরকে একচুলও ছাড় দেবে না। ফৌজদারী দন্ডবিধিমতে সকল কাজের জন্য আওয়ামীলীগ এবং তাদের জোট নেতাদেরকে দায়ী করে মামলা দায়ের করবে। সেইদিন তারা হয়তো বেগম খালেদা জিয়ার বাড়ীর সামনে মোতায়েনকৃত ১৩টি বালু-ইট ও মাটি ভর্তি ট্রাকের ওজন অনুধাবন করতে পারবে। আর অনুভব করতে পারবে স্পর্শকাতর জায়গাগুলোতে মরিচের ¯েপ্র করলে কেমন লাগে?

আমাদের দেশের রাজনীতির উদারতা, সভ্যতা, ভব্যতা, বিনয় ও ভদ্রতা দিনকে দিন তলানীতে নামতে নামতে এমন হয়েছে যে, রাজনীতিবীদদের নিকট থেকে মানুষজন এখন আর ওসব আশা করে না। রাজনীতি বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে একজন মানুষের ব্যাপক পরিবর্তন বা বিবর্তন। গতকাল যে ছিলো রাস্তার ফকির আজ সে রাজনীতির যাদুর বাক্সের কল্যাণে পরিনত হয়েছে মস্তবড় এক আমিরে। গলি মহল্লা বা অজো পাড়াগাঁয়ের সাধারণ মানুষটি রাজনীতির যাদুর কাঠির ছোঁয়ায় হঠাৎ করেই হয়ে যাচ্ছে মহা কামুক এক লুটেরা-দূর্বৃত্ত। তার চলনে বলনে, পোশাক-পরিচ্ছদে এবং আহারে-বিহারে ফুটে ওঠে মানুষরূপী হায়েনার প্রতিচ্ছবি। যে মানুষের গ্রাস কেড়ে নেবার জন্য হায়েনার মতো দূর্বৃত্তায়ন শুরু করে এবং লম্ফ ঝম্ফ দিয়ে শস্য শ্যামল ভূমিকে মরুময় করে তোলার প্রতিযোগীতায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের জন্য ওঠে পড়ে লাগে। কুকর্মের কারণে তার মুখমন্ডল থেকে মানবীয় দীপ্তি বিলীন হয়ে যায়-দেখে মনে হয়-সে যেনো মানুষ নয়-হয়তো অন্য কিছু !

এবার প্রসঙ্গে আসি। যদি প্রশ্ন করি-বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার বাড়ীর সামনে বালুভর্তি ট্রাকের সমাবেশ ঘটিয়ে দেশবাসীকে কিসের ইঙ্গিত দেয়া হলো? এমন জঘন্য নজীর কোন কালে কোন দেশে ঘটেছে কি না তা আমার জানা নেই। পৃথিবীর নিকৃষ্ট এবং জঘন্য শাসকেরাও সম্মানীত লোককে অসম্মান করতেন না। হিটলারের কয়েকজন জেনারেল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় শিল্পী পাবলো পিকাশোর স্টুডিওতে গিয়ে দেখলো- শিল্পী গভীর মনোযোগ দিয়ে কি যেনো আঁকছেন। তারা অনেক্ষন ধরে অপেক্ষা করার পর যখন দেখলেন শিল্পী তাদের দিকে তাকাচ্ছেন না তখন পিকাশোর স্টুডিও কর্মকর্তার মাধ্যমে তাঁকে সালাম পাঠিয়ে কথা বলার অনুমতি চাইলেন। জার্মানরা তখন সবেমাত্র ফ্রান্স দখল করেছে। ফ্রান্সের সেনা প্রধানসহ অনেকে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। নাগরিকরা হয় শহর ছেড়ে নিভৃত পল্লীতে চলে গেছেন নতুবা দেশ ত্যাগ করেছেন । ঐ অবস্থায় জার্মান বাহিনীর জেরারেল তো দুরের কথা- একজন সাধারণ আর্দালীর হুকুম অমান্য করার দুঃসাহস কেউ দেখাতো না। পাবলো পিকাশো ফ্রান্স ত্যাগ করলেন না । বরং বিভিন্ন রনাঙ্গন ঘুরে যুদ্ধের ভয়াবহতা নিজ চোখে দেখলেন এবং সেগুলোর ওপর ভিত্তি করে ছবি আঁকতে লাগলেন একের পর এক।

পাবলো পিকাশোর নামডাক তখন সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিলো। জার্মান জেনারেলরা তাই তাঁকে দেখার জন্য তার স্টুডিওতে গিয়ে হাজির হলেন। পিকাশো তখন আঁকছিলেন তার বিখ্যাত ছবি গুয়ার্নিকা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা, নির্মমতা এবং নৃশংসতা নিয়ে ছবিটি অংকিত হচ্ছিল। ছবিটি দেখে বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে জার্মান জেনারেলরা বলে উঠেন- ”সত্যিই কি এটা আপনি এঁকেছেন ?” পিকাশো মুচকী হেসে জবাব দেন- না এটা আমি আঁকিনি-তোমরা এঁকেছো। শিল্পীর জবাব শুনে জেনারেলদের মুখ কালো হয়ে গেলো। তারা মাথা নীচু করে পিকাশোর স্টুডিও থেকে ফিরে এলন।

আমি যখন মনে মনে পিকাশোর স্টুডিওর কথা স্মরণ করি আর ২০১৫ সালের ৫ই জানুয়ারীতে এসে বেগম জিয়ার বাড়ীর সামনের বালির ট্রাকের কথা মনে করি তখন নিজেকে বা আমার এই সমাজকে কিংবা রাষ্ট্রটিকে গণতন্ত্রের জন্য উপযুক্ত বলে মনে করি না। ২০১৪ সালের বিশৃক্সখলা ও অরাজকতার সময়ও বেগম জিয়ার বাড়ীর সামনে বালু ভর্তি ট্রাক রাখা হয়েছিলো। সারা দুনিয়া সেই ঘটনার নিন্দা জানালেও ক্ষমতাসীনরা সেটিকে মনে করেছিলো তাদের মহা বিজয়ের মহা মাইল ফলক হিসেবে। আর তাই ২০১৫ সালে এসেও তারা পুরোনো বিজয় স্তম্ভটিকে সামনে এনে নতুন এক ইতিহাস গড়ার মানসে ট্রাকের সংখ্যা ১৩ তে উন্নীত করেছে। ১৩ মানে আনলাকি থার্টিন। এখন দেখার পালা- শেষমেষ ২০১৩ সালের নৈরাজ্য, ১৩টি বালির ট্রাক এবং আনলাকি থার্টিন শেষমেষ কাদের কপাল পোড়ায় !

উদাহরনের জন্য বেশি দুরে যাওয়ার দরকার নেই। এই বাংলাদেশের কথাই বলি না কেনো ? আমরা অনেকে ১৯৫২ সালের ২১শে ফ্রেব্র“য়ারীর জন্য নুরুল আমিনকে দায়ী করি। কিন্তু ১৯৫৪ সালে তার অধীন একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের কথা কয়জন স্মরণ করি। অন্যদিকে ইয়াহিয়া খানের নামে হাজার বার অভিসম্পাত বর্ষন করি। কিন্তু ১৯৭০ সালে তার অধীন যে নির্বাচন হলো সেই নির্বাচন নিয়ে তো আজ অবধি কেউ এক চিলতে কুৎসা রচনার সুযোগ পায়নি। এমনকি আইয়ুব খানের বেসিক ডেমোক্রেসীর অধীন ৮০ হাজার বিডি মেম্বার নির্বাচন এবং পরবর্তীতে তাদের ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে এমন কথাতো কোন খানে শুনিনি। বরং মোহতারেমা ফাতেমা জিন্নার পক্ষে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে যে ঐক্যের সৃষ্টি হয়েছিলো তাতে আইয়ুব খান হস্তক্ষেপ করেছিলেন এমন বদনাম তো কেউ করেনি-তবে স্বাধীন বাংলাদেশে কেনো এত্তোসব নাটক, প্রহসন এবং পর্দার অন্তরালের ক্রীড়া কলাপ ? আমরা এসব শিখলামই বা কোত্থেকে ?

১৯৭৩ সালে ব্যালট বাক্স ছিনতাই করিয়ে যাকে এমপি বানিয়ে আনা হলো সেই খোন্দকার মোশতাক দ্বারা আওয়ামীলীগের কতবড় ক্ষতি হয়েছিলো তা বোঝার জন্য আওয়ামীলীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে খুব বেশী গভীরে যাওয়ার দরকার নেই। একটু চোখ বুজে প্রিয় পিতার শরীরের ঘ্রান, ছোট ভাইটির চুলের স্পর্শ কিংবা মায়ের হাতের স্পর্শ অনুভব করলেই বুঝতে পারবেন- রক্তের দাগ এখনো শুকোয়নি। কাজেই ১৫৪ জনকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতিয়ে আনা এবং বাকীদেরকে নামকা ওয়াস্তে চালাকীর মাধ্যমে বিজয়ী করার দায় তিনি কিভাবে শোধ করবেন তা হয়তো তিনি বা তার বিধাতাই ভালো বলতে পারবেন ।

প্রত্যেকটি ধর্মেই মিথ্যাচারকে মারাতœক গুনাহ বলে আখ্যা দেয়া হয়েছে। তার চেয়েও মারাতœক বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে মানুষের অহংকারকে । মানুষ যখন প্রকাশ্যে কোন ভুল বা মন্দ কাজ করে এবং পরবর্তীতে সে ভুল এবং মন্দ কাজের জন্য বড়াই করে তখন লজ্জা, অপমান আর বিক্ষোভে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের আরশে আজীম পর্যন্ত থর থর করে কাঁপতে আরম্ভ করে। আমি জানিনা- ২০১৫ সালের ৫ই জানুয়ারীতে বাংলাদেশের ঘটনা নিয়ে আল্লাহর আরশে কাঁপন ধরেছিলো কিনা ? আমি এও জানি না- আরশ কি আওয়ামীলীগের জন্য কেঁপেছিলো নাকি বিএনপির জন্য ? তবে একথা নিশ্চিত করে বলতে পারি- ৫ই জানুয়ারীর বালির ট্রাক বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের হৃদয়কে কাঁপিয়ে দিয়েছিলো। কেউ কেঁদেছিলো ! আবার কেউ কেউ হেসেও ছিলো।

খালেদা জিয়ার বাড়ীর সামনে বালির ট্রাকের অবরোধ কেবল মাত্র তাকেই অবরুদ্ধ করেনি-অবরুদ্ধ করেছে পুরো দেশ-জাতি এবং রাষ্ট্রকে। বিএনপিকে যদি ঢাকাতে সমাবেশ করতে দেয়া হতো সে ক্ষেত্রে দেশবাসী হয়তো কিছু হম্বি তম্বি শুনতে পেতো। ঘটনার দিন ঢাকায় মারাত্মক যানজট দেখা যেতো এবং সরকার দলীয় লোকজনের মনে একটু বিখাউজ মার্কা ঈর্ষা দেখা দিতো। এর বাইরে কিছুই হতো না। কিন্তু বালির ট্রাকের কল্যাণে দেশবাসীকে ভোগ করতে হলো অনির্দিষ্ট কালের অবরোধ, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, জান-মালের ক্ষয়ক্ষতি এবং নিত্যকার অশেষ ভোগান্তি। এ দায় কে নিবে ? আমার মনে হয় দায় নেয়ার জন্য শেষ অবধি বালুর ট্রাককেই এগিয়ে আসতে হবে। ট্রাক এগিয়ে আসবে এবং বলবে- আমার দোষ কোথায় ? বেগম জিয়া নিজে ফোন করে আমায় আসতে বললো । আমি গাবতলী পর্যন্ত ঠিকঠাক এসে হারিয়ে গেলাম। কয়েক পুলিশ ভাই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে আমাকে গুলশান পর্যন্ত নিয়ে এলো এর পর জামাই আদরে বেগম জিয়ার বাড়ীর সামনে স্থান করে দিলো। আমার সেই ফেরেশতার মতো পুলিশ ভাইদের নিয়ে কেউ যদি কিছু বলে তাইলে কিন্তু ছাড়-ম না-লুঙ্গি পইরা লাফাইতে লাফাইতে সক্কলেরে ঠ্যাঙ্গাইমু- বানানরীতি লেখকের নিজস্ব

Comments are closed.

সর্বশেষ খবর

আজকের ছবি

www.facebook.com

Tag Cloud