পৃথিবীকে জেনে নিন আপনার ভাষায়….24 Hrs Online Newspaper

সুদানের কাছে বাংলাদেশের পাওনা ১৬৮ মিলিয়ন ডলার বিক্রির ‘পাঁয়তারা’!

Posted on December 4, 2014 | in জাতীয় | by

sudan-bangladesh-debt-priyoডেস্ক রিপোর্ট : উত্তর আফ্রিকার দেশ সুদানের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন আর্থিক প্রতিষ্ঠান ‘এগ্রিকালচার ব্যাংক অব সুদান (এবিএস)’ ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন (বিজেএমসি) থেকে ২৫ দশমিক ৪৪৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের পাটপণ্য আমদানি করে। এরপর বাংলাদেশ থেকে পণ্য সরবারহ করার তিন থেকে চার বছরের মধ্যে ক্রেতা ১১ মিলিয়ন ডলার প্রদান করলেও দীর্ঘ ২২ বছরেও বাকি ১৪ মিলিয়ন ডলার প্রদান করেনি। ফলে সুদানের কাছে এই খাতের অনাদায়ী পাওনা হিসেবে সুদে-আসলে দাঁড়িয়েছে ১৬৮ দশমিক ৭১ মিলিয়ন ডলার। কিন্তু এই অর্থ আদায় না করে বরং বিজেএমসি এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের কতিপয় কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ২৪ মিলিয়ন ডলারে দেনা বিক্রির ‘পাঁয়তারা’ করছে বলে প্রিয়.কম-এর অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে।

জানা গেছে, বিগত বছরগুলোতে এই পাওনা ফিরে পেতে বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও কোনো ফলপ্রসূ হয়নি। এরই প্রেক্ষিতে গতকাল বুধবারও দশম জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে ‘‘বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত’’ স্থায়ী কমিটির ৬ষ্ঠ বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এতে সংসদীয় কমিটির এই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯২ সালে দেশটিতে এই পাট পণ্য রপ্তানীর জন্য সাক্ষরিত চুক্তির শর্ত মোতাবেক পাটপণ্যের ১০০ ভাগ সিএন্ডএফ মূল্যের এক তৃতীয়াংশ করে মোট ৩টি সমান কিস্তিতে যথক্রমে ১৮০, ২৭০ ও ৩৬০ দিন বিলম্বে পণ্যের মূল্য পরিশোধ করার কথা ছিল। কিন্তু এগ্রিকালচারাল ব্যাংক অব সুদান (এবিএস) চুক্তির শর্তানুসারে সমুদয় পণ্যমূল্য পরিশোধ করেনি। তারা দুই কিস্তিতে এই ১১ দশমিক ২১৫ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করে। অবশিষ্ট পণ্য মূল্য চুক্তির শর্তানুসারে ১২ শতাংশ সুদে বিগত ২০১৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৬৮ দশমিক ৭১ মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

এ বিষয়ে অনুসন্ধানে জানা গেছে, ‘দ্যা গোল্ডেন ফাইবার প্রাইভেট লিমিটেড’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানকে এই দেনা আদায়ের জন্য লবিস্ট হিসেবে নিয়োগ করেছিল বিজেএমসি এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তক্রমে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের এক সভায় বিজেএমসির বর্তমান তারল্য সংকটকালীন বিজেএমসির দীর্ঘদিনের অনাদায়ী এই পাওনা আদায়ের বিষয়টি খুবই আশাব্যঞ্জক বলে তুলে ধরা হয়। এই সভায় লবিস্ট প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজিং ডিরেক্টর মোস্তাক হোসেন বিভিন্ন সময়ে সুদান থেকে এই পাওনা আদায়ের জন্য দেশটিতে তার পরিচিত বিভিন্ন ব্যবসায়ীর সাথে আলোচনা করেছেন বলে মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে জানান। তিনি জানান, ‘প্রাপ্য টাকার সুদ মওকুফ করলে কয়েকজন সুদানী ব্যবসায়ী ২৪ মিলিয়ন ডলার বিজেএমসিকে পরিশোধ করে এই দায় কিনে নিতে চাচ্ছে।’

তবে কেন এই দায় তারা কিনে নিবে, এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সংশ্লিষ্ট মহলে। তারা সন্দেহ করছেন, এতে নিশ্চয়ই লবিস্ট কোম্পানী মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পাঁয়তারা করতেই মন্ত্রণালয়কে এই প্রস্তাব দিয়েছে। আর এই দায় যদি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি কিনে নেয়, তবে বিজেএমসি ২৪ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে পুরো ১৬৮ দশমিক ৭১ মিলিয়ন ডলার হারাবে। আবার ওই প্রতিষ্ঠানটি ঠিকই সমপরিমাণ অর্থ আদায় করবে।

সভায় যুগ্ম সচিব (পাট) এম সামশুল কিবরিয়া দায় বিক্রি করার বিরোধিতা করে বলেন, ‘সুদানের রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাংকের কাছে বকেয়া পাওনা সুদসহ ১০০ ভাগ আদায়ের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশ সরকারের একটি সংস্থার এ দায় তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রয় বা হস্তান্তর করার সুযোগ নেই।’

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এই পাওনা লবিস্টদের হাতে দেওয়ার এখতিয়ার পাট মন্ত্রণালয় বা বিজেএমসি কারো নেই। এটা অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাপার। অর্থ মন্ত্রণালয় এবং কেবিনেট যদি সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলেই লবিস্ট নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে যে লবিস্ট নিয়োগ হয়েছে, তা ঠিক হয়নি।’

এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ প্রিয়.কম-কে বলেন, ‘এত বড় পাওনা মাত্র ২৪ মিলিয়ন ডলারে বিক্রির কোনো যৌক্তিকতাই নেই। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন লবিস্ট কোম্পানি সরকারের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে কাজ সম্পূর্ণ করে থাকে। সুদানের পাওনা আদায়ে সুদান সরকার ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথভাবে পররাষ্ট্র নীতি ও বাণিজ্য নীতির মাধ্যমে উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সুদান এমন কোনো শক্তিশালী দেশ নয় যে, পাওনা আটকে দেবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার আফ্রিকার প্রভাবশালী দেশ কিংবা আফ্রিকান ইউনিয়নের সংস্থার মাধ্যমে সুদান সরকারকে আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগ করে পাওনা আদায় করতে পারে।’

সংসদীয় কমিটির বৈঠক সূত্রে জানা যায়, ক্রেতার কাছে এই পাওনা আদায়ের জন্য বিগত ২২ বছরে ১৩ থেকে ১৪টি বাংলাদেশি প্রতিনিধি দল সুদানে সফর করেছে। এছাড়া বিগত পাঁচ বছরে একজন লবিষ্ট নিয়োগ করে অনাদায়ী এই অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের কোনো প্রচেষ্টাই সফল হয়নি।

বৈঠকে সূত্রে জানা যায়, দিল্লীতে অবস্থানরত বাংলাদেশে নিযুক্ত সুদানি অনাবাসিক রাষ্ট্রদূত রাষ্ট্রদূত ড. হাসান ই এই তালিব (dr. Hasan E EI Talib) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও পাট মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর সাথে সাক্ষাত করে সুদানের উৎপাদিত তুলা বিনিময়ের মাধ্যমে বিজেএমসির অনাদায়ী পাওনা পরিশোধের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব করেছিলেন।

সুদানের রাষ্ট্রদূতের এই প্রস্তাব সুদান সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ সরকারের কাছে প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দিল্লীর বাংলাদেশ মিশনকে অনুরোধ করে চিঠি পাঠানো হয়েছে। সুদানের কাছে বিজেএমসির পাওনা টাকা তুলা বা অন্য কোনো পণ্যের বিনিময়ে আদায় করা সম্ভব কিনা সে ব্যাপারে বানিজ্য মন্ত্রণালয়কে সুদানের দায়িত্বপ্রাপ্ত কমার্শিয়াল কাউন্সিলরের মাধ্যমে পর্যালোচনা করে দেখার জন্যও অনুরোধ করা হয়েছে।

পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের ১৪ সেপ্টেম্বরের সভায় ‘দ্যা গোল্ডেন ফাইবার প্রাইভেট লিমিটেড’-এর এমডি মোস্তাক হোসেন জানান, যেহেতু সুদানের রাষ্ট্রদূত তুলা আমদানির মাধ্যমে বকেয়া অর্থ পরিশোধের জন্য প্রস্তাব দিয়েছেন। সেহেতু সুদান সরকারের সুস্পষ্ট প্রস্তাবনা প্রাপ্তি সাপেক্ষে সরকারি পর্যায়ে আলোচনার পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, তুলা আমদানির মাধ্যমে আসলে কীভাবে বকেয়া অর্থ সমন্বয় করা হবে এটা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

তিনি এই বিষয়ে জানতে চান কী ধরণের এলসির বিপরীতে তা আমদানী করতে হবে? না এটা বকেয়া অর্থের বিপরীতে সুদান থেকে সরবারহ করা হবে, সেই বিষয়টি রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে সুদান সরকারের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব আসা জরুরি।

এই বিষয়ে বিজেএমসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অবঃ) হুমায়ুন খালিদ বৈঠকে বলেন, দিল্লীর হাইকমিশনের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধান করার উদ্যেগ নেয়া প্রয়োজন।

সভায় তিনটি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এর একটি হলো- সুদানের কাছ থেকে বিনিময় মূল্য বাবদ নগদ অর্থের পরিবর্তে তুলা গ্রহণের বিষয়টি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব প্রেরণের জন্য সুদান দূতাবাসকে দিল্লিস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে অনুরোধ করতে হবে। আর দ্বিতীয়টি হলো- আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাওয়া গেলে বিষয়টি নিয়ে তুলা কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারকারীদের বাণিজ্যিক সংগঠনগুলোর সাথে আলোচনাক্রমে যদি সুদানি তুলার ক্রেতা পাওয়া যায়, সে ক্ষেত্রে দায়-দেনা তুলার বিনিময়ে গ্রহণ করা যেতে পারে। তৃতীয়টি হলো- সুদানে প্রতিনিধি দল প্রেরণ করে নগদ অর্থ ও তুলা ব্যতিত আর অন্য কোনো বিনিময় মূল্য সুদানের কাছ থেকে বিজেএমসির দায়-দেনা আদায় করা সম্ভব কিনা, তা যাচাই করে সুদানি কর্তৃপক্ষের কাছে সে ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব প্রদান করা যেতে পারে।

Comments are closed.

সর্বশেষ খবর

আজকের ছবি

www.facebook.com

Tag Cloud