বহুযুগ আগে উদ্ভাবিত এই ‘এনার্কিয়া’ নিয়ে এখন কেন লিখছি? আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ জীবনে কি এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে বা হচ্ছে?
শিক্ষা, রাজনীতি-রাজনীতিবিদ, আইনশৃঙ্খলা একটি দেশের সামগ্রিক চিত্রের মানদণ্ড। বাংলাদেশে এই মানদণ্ডের বাস্তবতা কী, কেমন এবং এর সঙ্গে ‘এনার্কিয়া’ বা অরাজকতার সম্পর্ক আছে কি না- সেসব নিয়ে কিছু কথা।
১. শিক্ষার উন্নয়নের সঙ্গে একটি জাতির উন্নয়ন বড়ভাবে সম্পৃক্ত। শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নয়ন ঘটাতে পারলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে একটি দেশ ও দেশের সরকার কৃতিত্ব পায়, প্রশংসিত হয়। অতীতের সরকারগুলো এই দিকটি নিয়ে তেমন একটা ভাবেনি। বর্তমান সরকার ভেবেছে। যেমন ২০০৯ সালে ৩৭,২২৫টি প্রতিষ্ঠান থেকে শতভাগ উত্তীর্ণ হয়েছিল। ২০১৩ সালে শতভাগ উত্তীর্ণ প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৭৩,৬০০।
এই তথ্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। ২০০৯ সালের ৮৮.৮৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০১৩ সালে হয়েছে ৯৮.৫৮ শতাংশ।
২০১৫ সালের মধ্যে ‘সবার জন্য শিক্ষা’ এমডিজি’র এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারলে আন্তর্জাতিকভাবে বিশাল সাফল্যের অধিকারী হবে সরকার। অর্জন করবে বেশ কিছু পুরস্কার।
এই লক্ষ্য অর্জন থেকে সরকার মাত্র ১.৪২ ভাগ দূরে অবস্থান করছে! বর্তমান সময়ে শিক্ষা নিয়ে আলোচনা, তার নেপথ্যে লুকিয়ে আছে এই লক্ষ্য অর্জনের এই হিসেব।
২. শিক্ষা ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব না। শিক্ষার জন্য শর্টকার্ট কোনো পদ্ধতি আজ পর্যন্ত আবিষ্কার হয়নি। সেটা সম্ভব হলে সবার আগে আবিষ্কার করত চীন, আমরা নই। কিন্তু আবিষ্কার না হলেও প্রয়োগ করছি আমরা, চীন বা অন্য কেউ নয়।
গত পাঁচ বছরে (২০০৯-২০১৩) বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায় এমন কোনো উন্নয়ন হয়নি যে, শতভাগ উত্তীর্ণ স্কুলের সংখ্যা ৮৮.৮৪% থেকে বেড়ে ৯৮.৫৮% হবে।
এই পাঁচ বছরে প্রাথমিক শিক্ষার অবনতি হয়েছে। অবনতি হয়েছে তার আগের সময়েও।
বর্তমান সময়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও পাস করানোর যে মহামারি দেখা দিয়েছে, তার সূচনা হয় পাঁচ বছর আগে থেকেই। মিডিয়ায় বিষয়টি তেমনভাবে আসেনি, আলোচনাও হয়নি।
পাসের হার বাড়ানোর জন্য শুরুতে সরকার কাজটি করেছে কিছুটা গোপনে, একটা রাখঢাক ব্যাপার ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এখন আর রাখঢাক নেই। প্রশ্নপত্রফাঁস হচ্ছে প্রকাশ্যে, ছড়িয়ে পড়ছে ফেসবুকে, অনলাইনে। তারপরও যেসব শিশু উত্তর লিখতে পারছে না, শিক্ষকরা তাদের বলে দিচ্ছেন। সবই চলছে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী।
সুপারসনিক গতিতে বাড়ছে পাসের হার। অধপতিত হচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থা।
৩. এতদিন প্রশ্নপত্র ফাঁস ও পাস করিয়ে দেয়া বিষয়ক আলোচনা ছিল এসএসসি এবং এইচএসসি’র ক্ষেত্রে। এখন তা ছড়িয়ে পড়ছে না, ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে প্রাথমিক পর্যায়ে। আজকের একজন শিশু পরীক্ষার আগের দিনে বা রাতে প্রশ্ন পেয়ে যাচ্ছে। সেই উত্তর মুখস্থ করে পরের দিন সকালে সে পরীক্ষা দিচ্ছে। তারপরও যে উত্তরটি লিখতে পারছে না, শিক্ষক সেটা বলে দিচ্ছেন।
এই ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র শিশুকে জোগাড় করে দিচ্ছেন বাবা-মা, অভিভাবক, কোনো কোনো ক্ষেত্রে গৃহশিক্ষক। সবই হচ্ছে অর্থের বিনিময়ে।
সুতরাং এই শিশুরা কোন মানসিকতা নিয়ে বেড়ে উঠছে, তা কি আর লিখে বোঝানো দরকার আছে?
বড় হয়ে আর একটু ভালো মতো সে যখন বুঝতে শিখবে, যখন সে দেখবে পাস করেছে কিন্তু কিছু শেখেনি, তখন বাবা-মা-অভিভাবক-শিক্ষক সবাই তার কাছে অপরাধী হিসেবে পরিচিতি পাবে। অথবা শিশু নিজেই হয়ে যাবে অপরাধী।
‘শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ’- কোন ভবিষ্যৎ তৈরি করছি আমরা?
৪. আমাদের শিক্ষায় অসংখ্য বৈষম্য। কমপক্ষে ৯৫% মানুষের সন্তান পড়াশোনা করে বাংলা মাধ্যমে। যে মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁস, উত্তর বলে পাস করানো হচ্ছে। ৫% বিত্তবানের সন্তানরা পড়ছে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে। যেখানে প্রশ্নপত্র ফাঁস বা না পড়ে পাস করার কোনো বিষয় নেই। অর্থাৎ ক্ষতি যা হওয়ার চাষা-ভুষার সন্তানদেরই হচ্ছে। বিত্তবান বা রাজনীতিকদের সন্তানরা সম্পূর্ণরূপে এর বাইরে।
৫. সামগ্রিকভাবে এই ভবিষ্যৎ তৈরির কারিগর বর্তমান সরকার। নেতৃত্বে রয়েছেন দুইজন- নুরুল ইসলাম নাহিদ ও মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার। নাহিদ শিক্ষামন্ত্রী, ফিজার প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী।
শিক্ষামন্ত্রী হওয়ার আগে পর্যন্ত নুরুল ইসলাম নাহিদের পরিচিতি ছিল সজ্জন, সৎ এবং শিক্ষা নিবেদিত মানুষ হিসেবে। সারা জীবনে যে আদর্শভিত্তিক বাম রাজনীতি করেছেন, সেই রাজনীতি তাকে এই পরিচিতি দিয়েছিল। বাস্তবায়ন না হলেও তুলনামূলক বিচারে একটি ভালো শিক্ষানীতি করেছেন। বই পৌঁছানোর ক্ষেত্রে কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। সফল মন্ত্রী হিসেবে ‘সাপ্তাহিক’-এর প্রচ্ছদ করে সেই স্বীকৃতিও দিয়েছি।
কিন্তু পরবর্তীতে সেই ধারা আর অব্যাহত থাকল না। এক ধরনের বিচ্যুতি দৃশ্যমান হতে থাকল। তার এপিএসের অসততার বিষয়টি প্রকাশ্যে আলোচনায় এলো, উঠে এলো পত্রিকার পাতায়। কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা গেল না নুরুল ইসলাম নাহিদকে। তার একান্ত কাছের মানুষের বিরুদ্ধে উঠতে থাকল নানা অভিযোগ। এক্ষেত্রেও তাকে নির্বিকারই দেখা গেল। একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁস হতে থাকল, আর তিনি অস্বীকার করতে থাকলেন। এই অস্বীকারের বাচনভঙ্গি একপর্যায়ে চিৎকারে পরিণত হলো। বলতে থাকলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে ‘মিথ্যা, অসত্য, বিভ্রান্তিকর’ প্রচারণা চালানো হচ্ছে। পাস করিয়ে দেয়ার নির্দেশনার বিষয়টিও চিৎকার করে অস্বীকার করতে থাকলেন। পাসের সাফল্য প্রচার করতে থাকলেন আরও জোরে চিৎকার করে।
প্রশ্নফাঁস অব্যাহত থাকায় এবং বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় ন্যক্কারজনক ফলাফল তাকে আরও বেশি বিপদে ফেলে দিল। ফলে তার চিৎকার পরিণত হলো ক্ষিপ্ততায়। এখন তিনি চিৎকার করে সবাইকে ধমকাচ্ছেন, যারা সত্য বলছেন। তার ক্ষিপ্ততা দেখে মনে হচ্ছে না কোনো স্বাভাবিক মানুষ কথা বলছেন। মনে হচ্ছে না যে এই মানুষটির এক সময় পরিচিতি ছিল সৎ-সজ্জন হিসেবে।
৬. মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার সম্পর্কে খুব বেশি কিছু বলার নেই। কুখ্যাত এশিয়া এনার্জির স্বার্থ রক্ষাকারী হিসেবে ইতোমধ্যে তিনি পরিচিতি পেয়েছেন। দুর্ভাগ্য যে, এই মানুষটির হাতে প্রাথমিক শিক্ষার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকানো তো দূরের কথা, প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বলছেন, এসব প্রচারণা ‘মিথ্যা-ভিত্তিহীন- উদ্দেশ্যমূলক…..’।
অথচ ফাঁস হওয়া প্রশ্নের যাবতীয় প্রমাণ টেলিভিশনে দেখানো হচ্ছে, পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে। প্রতিরোধে কোনো ব্যবস্থা নেই। সবকিছু সীমাবদ্ধ ‘অস্বীকার’ এর মধ্যে।
৭. সত্যকে আড়াল করার বা লুকিয়ে রাখার ‘ক্যামোফ্লাজ’ নীতি সাধারণত প্রয়োগ হতে দেখা যায় সামরিক ক্ষেত্রে। কিন্তু এই ‘ক্যামোফ্লাজ’ নীতি আমাদের এই দুই মন্ত্রী প্রয়োগ করছেন শিক্ষাক্ষেত্রে। নিশ্চিত করেই বলা যায় প্রধানমন্ত্রীর সমর্থন আছে এর পক্ষে।
৮. এ তো গেল শিক্ষার দুই মন্ত্রীর কথা। এবার আসি স্থানীয় সরকার ও সমবায়মন্ত্রী, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের বক্তব্য প্রসঙ্গে।
তিনি তুলনামূলক বিচারে শিক্ষিত, সজ্জন রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত। তিনি মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলছেন, ‘দুই আনার মন্ত্রী’। মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজীনাকে বলছেন ‘কাজের মেয়ে মর্জিনা বেগম’।
এমন অকূটনৈতিক তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য বক্তব্য কি একজন শিক্ষিত সজ্জন রাজনীতিকের থেকে আশা করা যায়?
নিশা দেশাই বা ড্যান মজীনারা বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে যেভাবে তৎপরতা দেখান, কথা বলেন, তাতে তাদের সমালোচনা করা যেতেই পারে। তাই বলে এই ভাষায়?
আর সমালোচনা করার আগে কি ভেবে দেখা দরকার না যে, তাদের এই তৎপরতার সুযোগ আমরাই করে দিয়েছি, রাজনীতিবিদরাই করে দিয়েছেন!
সবচেয়ে ভদ্র রাজনীতিবিদের একজন সৈয়দ আশরাফ। তার শালীনতারই এই অবস্থা?
৯. আইনশৃঙ্খলার সামগ্রিক চিত্র নিয়ে কথা বলছি না। শুধু একটি দিক নিয়ে বলছি। বাংলামোটর-ফার্মগেট-কারওয়ানবাজার এলাকায় পুলিশ জনমানুষকে আইন শেখাচ্ছে। কলার-কোমর ধরে সাধারণ মানুষকে জেল-জরিমানা করছে। তার পাশ দিয়েই বড় বড় গাড়িতে বড় বড় মানুষ চলে যাচ্ছে। যে পুলিশ দিনে সাধারণ মানুষকে আইন শেখাচ্ছে, সেই পুলিশ রাতে কারওয়ানবাজারে ট্রাক থেকে চাঁদাবাজি করছে।
আইনের প্রয়োগ নয়, সাধারণ মানুষকে জরিমানা-অসম্মান করে মাস্তানি করছে পুলিশ।
যা দেখার কেউ নেই। যার যা ইচ্ছে যেভাবে ইচ্ছে করছে।
১০. শিক্ষা-শিক্ষার মন্ত্রী, রাজনীতি-রাজনীতিবিদ, আইনশৃঙ্খলা-আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী পুলিশ, অরাজকতা এবং আইনের শাসনহীনতা সর্বত্র প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে।
১১. সাম্যবাদী দিলীপ বড়ুয়া মন্ত্রী হয়েই ভোগবাদিতাকে জীবনের ব্রত করে নিয়েছিলেন। বোঝা গিয়েছিল সুযোগের অভাবে সৎ এবং সাম্যবাদী ইমেজ নিয়ে ছিলেন দিলীপ বড়–য়া। একজন নুরুল ইসলাম নাহিদ বা সৈয়দ আশরাফের সাধারণভাবে যে পরিচিতি, বাস্তবে তারা আসলে তা নন। ক্রমেই তারা মানুষের ভুল ধারণা ভেঙে দিচ্ছেন। মানুষের আর বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে না যে, তাদের পূর্বের পরিচিতিটা ছিল মূলত সুযোগের অভাবে!
-গোলাম মোর্তজা









