April 19, 2026
ড্রিম টেলিপ্যাথি বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে ঘুমন্ত অবস্থায় স্বপ্ন দেখার সময় মানুষ আরেকজন মানুষের সাথে টেলিপ্যাথির সাহায্যে যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম। এটি কোনো নতুন ধারণা নয়। বহু বছর আগেই মনঃসমীক্ষণের জনক যারা ছিলেন তাঁদের আগ্রহ ছিল ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে অন্যের মনের সাথে যোগাযোগ করার প্রতি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ফ্রয়েড টেলিপ্যাথি এবং এর প্রভাবকে মনোবিশ্লেষণের ভাবনারূপে বিবেচনা করতেন। তিনি এটাও বিবেচনা করতেন যে, স্বপ্নের টেলিপ্যাথি অথবা বিভিন্ন ঘটনায় স্বপ্নের উপর টেলিপ্যাথিক প্রভাবের চিন্তা সম্পর্কযুক্ত। কার্ল জং টেলিপ্যাথিক হাইপোথিসিসে প্রশ্নাতীতভাবেই বিশ্বাস করতেন, এমনকি তিনি এধরনের “অপ্রাকৃত” ঘটনাসমূহের ব্যাখ্যার জন্যে একটি তত্ত্বীয় পদ্ধতি নির্মাণ করেন।
সব মহৎমনা ব্যক্তিই নানাধরনের অবস্তুগত বাস্তবতার গবেষণার ব্যপারে উৎসাহ দিয়েছেন।
“যখন থেকে বিজ্ঞান অবস্তুগত বাস্তবতা নিয়ে গবেষণা শুরু করবে, তখন এক দশকেই বিজ্ঞানের তেমন উন্নতি ঘটবে, যেটা এর আগের এক শতাব্দীতেও ঘটেনি।” – নিকোলা টেলসা
“বিশ্লেষণবহির্ভূত ব্যক্তিগত ব্যপার এবং চিকিৎসাসংক্রান্ত উভয় প্রকার ঘটনারই এক বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে, যেগুলো স্বপ্ন দেখার উপর টেলিপ্যাথির প্রভাবকে সমর্থন করে” (ক্রিপনার, ১৯৭৪)। যাই হোক, মনোদৈহিক গবেষণার প্রযুক্তি সহজলভ্য হবার আগপর্যন্ত এই বিষয়টি পরীক্ষা করার সুযোগ আসেনি। এটা আবিষ্কৃত হয়েছিল যে গবেষণায় অংশ নেয়া ঘুমন্ত ব্যক্তিরা “দ্রুত চক্ষু সঞ্চালন” (র্যা পিড আই মুভমেন্ট বা আর.ই.এম.) পর্যায়গুলো থেকে জাগ্রত হয়ে স্বপ্নের ঘটনা মনে করতে পারছিল। এর ফলস্বরূপ, একজন “টেলিপ্যাথিক গ্রহণকারী”কে দূরবর্তী কোনো “টেলিপ্যাথিক প্রদানকারী” হতে আগত চিহ্নিত কোনো উদ্দীপকের ব্যাপারে স্বপ্ন দেখার ব্যাপারে মনোনিবেশ করার অনুরোধ করা সম্ভব হয়েছিল।”
গবেষণা ও ফলাফল
১৯৬০-এর মাঝামাঝি সময়ে মন্টেগু উলম্যান, এমডি. নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে অবস্থিত মায়মনাইড মেডিকেল সেন্টারে বেশ কিছু গবেষণা করেন যার মাধ্যমে এটা পরীক্ষা করা গিয়েছিল যে ঘুমন্ত মানুষ দৈবচয়নে নির্বাচিত কিছু ব্যপারে পূর্বনির্ধারিত স্বপ্ন দেখতে পারে। অন্যভাবে বলা যায়, তারা বেছে নিতে পারতো কী নিয়ে তারা স্বপ্ন দেখতে চায়, কিছু উদাহরণ হলো, চিত্রকর্ম, সিনেমা, ছবি ইত্যাদি নানাকিছু। এই গবেষণা শুরু করার অল্পকিছুদিনের মাঝেই তাঁর সাথে স্ট্যানলী ক্রীপনার যোগ দেন, যিনি একজন পিএইচডি এবং সায়ব্রুক বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিদ্যার একজন অধ্যাপক ছিলেন। স্বপ্ন, মনোবিদ্যা এবং অতিপ্রাকৃত-মনোবিদ্যার ব্যাপারে ক্রিপনারের অসামান্য সুনাম ছিলো।
তাঁরা এই গবেষণাগুলো প্রায় দশ বছরের অধিক সময় জুড়ে পরিচালনা করেছিলেন, এবং সেগুলো “পরিসংখ্যানগতভাবে উল্লেখযোগ্য ফলাফল বয়ে এনেছিল”।
এই গবেষণাগুলোর সময় সাধারণত একজন “টেলিপ্যাথিক প্রেরক” এবং একজন “টেলিপ্যাথিক গ্রাহক” থাকত। তাদের মাঝে গবেষণাগারে খুবই স্বল্প সময়ের জন্যে দেখা হতো এবং তার পরপরই তাদেরকে পৃথক দুটি কক্ষে ঘুমাতে পাঠানো হতো। “টেলিপ্যাথিক” প্রেরকের জন্যে ঘুমানোর রুমে একটি খাম থাকতো, যেটার ভেতর কোনো ছবি অথবা আঁকাআঁকি করা থাকতো। তারপর “টেলিপ্যাথিক” গ্রাহককে আর.ই.এম. পর্যায়ের ঘুমের ঠিক পরেই ইচ্ছাকৃতভাবে ডেকে তোলা হতো এবং গবেষকগণ স্বপ্ন বৃত্তান্ত নিতেন।
একটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ অধিবেশন
একটি স্মরণীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ অধিবেশন ছিল, যখন নির্বাচিত চিত্রছাপটি ছিল দেগা অঙ্কিত “নাচের স্কুল”, যেখানে বেশকিছু বাচ্চামেয়ের নাচের ক্লাস চিত্রিত ছিল। ক্রিপনারের ভাষ্যমতে “গ্রাহক”-এর স্বপ্নবৃত্তান্তে এমন ধরনের কথা ছিলো- “আমি এমন একটি ক্লাসে ছিলাম, যেখানে হয়ত আধা ডজনের মতো মানুষ ছিলো, যেটাকে একটা স্কুলের মতো মনে হচ্ছিল” এবং “সেখানে একটি বাচ্চা মেয়ে আমার সাথে নাচার চেষ্টা করছিল”। এই ফলাফলগুলো খুবই চমৎকার ছিল, একজনের ধারণা অন্যের স্বপ্নকে প্রভাবিত করতে পারে- এটা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। যদিও আমরা এই স্থানান্তরের পেছনকার পদ্ধতি সম্পর্কে জানিনা, এবং আমরা মন থেকে মনে এই স্থানান্তর হওয়া দেখতে পাইনা, তবুও এই ঘটনা ভালোভাবেই লিপিবদ্ধ এবং বাস্তব ছিল, আবার, যেকোনো বৈজ্ঞানিক বোধগম্যতা কিংবা ব্যাখ্যার বাইরেও ছিল। অতিপ্রাকৃত-মনোবিদ্যার অস্তিত্ব নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্রে এটা বেশ স্বাভাবিক ব্যপার। এটা বাস্তব, পর্যবেক্ষণকৃত, তবুও আমরা জানি না ঠিক “কীভাবে।”
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন ক্রিপনার এবং উলম্যান পরিচালনা করেন ১৯৭০ সালের ১৫ই মার্চ। এই অধিবেশনে “হলি মোডাল রাউন্ডার্স” রক কনসার্টে বড় একদল মানুষ নির্বাচন করা হয়েছিল “টেলিপ্যাথিক” প্রেরক হিসেবে। জ্যঁ মিলে নামের স্থানীয় একজন মিডিয়া শিল্পী “টেলিপ্যাথিক প্রেরক”দের “লক্ষ্য হিসেবে প্রস্তুতি” গ্রহণ করানোর দায়িত্ব পালন করেন। তিনি এ ব্যাপারে লিড লাইট কোম্পানি নামের একদল শিল্পীর সাহায্য গ্রহণ করেন, যারা এই কনসার্টের আলোক-উৎসবের দায়িত্বে ছিল। “টেলিপ্যাথিক” প্রেরকগণ যে পর্দা দেখছিল, সেটায় ছবি প্রদর্শিত হবার পূর্বে মিলে দর্শকদের সংক্ষিপ্ত কিছু মৌখিক নির্দেশনা দেন। ছয়টি স্লাইড প্রোজেক্টরের সাহায্যে একটি রঙিন ছবি প্রক্ষেপণ করা হয়েছিল, যেটার বিষয়বস্তু ছিল ঈগল এবং ঈগলের বাসস্থানের অভ্যাস এবং একইসাথে পৃথিবীর নানা ধরনের পাখিসহ পৌরাণিক ফিনিক্স পাখির ব্যপারেও তথ্য দেয়া হয়েছিল। এসবকিছুই তখন ঘটছিলো যখন “হলি মোডাল রাউন্ডার্স” তাদের “তুমি যদি পাখি হতে চাও” গানটি পরিবেশন করছিল।
এই পরীক্ষার জন্য পাঁচজন স্বেচ্ছাসেবক “টেলিপ্যাথিক গ্রাহক” ছিল, যারা এখানকার “টেলিপ্যাথিক প্রেরক”দের আশেপাশের একশো মাইল দূরত্বের মাঝে ছিল। সব গ্রাহকই কনসার্টের অবস্থান সম্পর্কে অবহিত ছিল এবং সবাইকে বলা হয়েছিল তাদের স্বপ্নের দৃশ্যগুলো মাঝরাতে সংরক্ষণ করে রাখতে, কারণ ঠিক তখনই ঐ উপাদানগুলো পাঠানো হচ্ছিল প্রেরকদের মাধ্যমে। একজন “টেলিপ্যাথিক গ্রাহক” হেলেন এন্ড্রুস-এর মনে হয়েছিল “কিছু পৌরাণিক, অনেকটা ফিনিক্স কিংবা গ্রিফিনের মত”। দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং চতুর্থ জন “একট সাপ”, “আঙ্গুর”, এবং “আগুনে জ্বলন্ত ভ্রূণ” বর্ণনা করে। পঞ্চম অংশগ্রহণকারী ছিলেন নন্দিত আমেরিকান গায়ক রিচি হ্যাভেনস, যিনি বর্ণনা করেন মাঝরাতে চোখ বন্ধ করে তিনি দেখতে পান “কিছুসংখ্যক গাঙচিল পানির ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে।” মিঃ হ্যাভেনস এবং মিস এন্ড্রুস, উভয়েই লক্ষ্য বিষয়ের সাথে সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ বর্ণনা দিয়েছেন।
আরো উল্লেখযোগ্য ফলাফল দেখা যায় যখন “গ্রেটফুল ডেড” নামের রক দলও একটি স্বপ্ন টেলিপ্যাথিক অধিবেশনে স্বেচ্ছাসেবক হয় ছয় রাত্রিব্যাপী।
সাধারণত নিম্নোক্ত নির্দেশনাগুলো গবেষণায় অংশ নেয়া ব্যক্তিদেরকে দেয়া হতোঃ
১। আপনি একটি ইএসপি গবেষণায় অংশ নিতে যাচ্ছেন।
২। কয়েক সেকেন্ডের মাঝে আপনি একটি ছবি দেখবেন।
৩। আপনার ইএসপি ব্যবহার করে এই ছবি গ্রাহকের কাছে “পাঠাতে” চেষ্টা করুন।
৪। গ্রাহক এই ছবিকে স্বপ্নে দেখার চেষ্টা করবে। তাদের প্রতি এটা “পাঠাতে” চেষ্টা করুন।
৫। তারপর, গ্রাহককে প্রেরকের অবস্থান সম্পর্কে জানানো হবে।
সম্ভাব্য ব্যাখ্যা
এই মহাবিশ্বের সমস্তকিছুর মাঝে বিশাল আন্তঃযোগাযোগের উপর আলোকপাত করেছে কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা। একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হচ্ছে কোয়ান্টাম আবদ্ধতা। উদাহরণস্বরূপ, একইসাথে উৎপন্ন দুটি ইলেকট্রনের মাঝে একটিকে যদি মহাবিশ্বের একপ্রান্তে পাঠানো হয়, তাহলে অপরটিও তৎক্ষণাৎ প্রতিক্রিয়া দেখাবে, তাদের মাঝের দূরত্ব যতই হোক। এটা একটি ব্যাখ্যা যাতে বোঝা যায় সবকিছুই কীভাবে একে অন্যের সাথে কোনো না কোনোভাবে জড়িত। আইনস্টাইন একে বলতেন “দূর হতে ভৌতিক কাণ্ড”।
আসলে প্রকৃত বাস্তবতা এই যে এখানে কোনো ব্যখ্যা নেই এবং বিজ্ঞানীরা কোনো ব্যাখ্যা দিতে অপারগ। তাঁরা কেবল কী ঘটছে সেটা পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছেন, তাও আবার খুবই সাধারণ কিছু অপ্রাকৃত মনোদৈহিক ঘটনার ক্ষেত্রে। একইসাথে, এই পরীক্ষাগুলো স্বপ্নের মতো এমন একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বিপরিতধর্মী “বাস্তবতা”র সাথে জড়িত, যেটা সম্পর্কে আমরা তেমন কিছুই জানি না। এটা “জাগ্রত” অবস্থা হতে পৃথক একটি জগত। যদিও হতে পারে আমরা যে জগতে বসবাস করি, সেটাই একটা স্বপ্ন। আমরা এ ব্যাপারে প্রশ্নের পর প্রশ্ন এবং পর্যবেক্ষণ করে যেতে পারি আজীবন।
অপ্রাকৃত মনোবিদ্যাজনিত বাস্তবতা পুরো পৃথিবীজুড়েই প্রমাণিত ও নথিবদ্ধ হয়েছে
অনেক বিখ্যাত বৈজ্ঞানিকদের মাধ্যমে অপ্রাকৃতমনোবিদ্যাজনিত (প্যারা সাইকোলজিক্যাল ইন্সিডেন্ট বা পিএসআই) বাস্তবতা এবং সচেতনতাবোধের ভূমিকা নিয়ে গবেষণা এবং এর প্রভাব আমাদের বস্তুগত জগতে কেমন হয়, সেসব নিয়ে বিশ্বজুড়েই চর্চা, নথিভুক্তকরণ, পর্যবেক্ষণ এবং (বারংবার) প্রমাণ করা হয়েছে বিভিন্ন গবেষণাগারে। মার্কিন যুক্ররাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের এ সংক্রান্ত বিষয়ে বিপুল আগ্রহ ছিল (এবং এতদসংক্রান্ত গবেষণাও হয়েছে) অনেক বছর যাবত, তবুও এসব বৈজ্ঞানিক গবেষণা জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়নি এব বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ ও বিজ্ঞানের মূলধারা হতে সরিয়ে রাখা হয়েছে, যা কিনা মোটেই উচিত কিংবা সঠিক নয়।
তথ্যসূত্রঃ কালেক্টিভ এভোল্যুশন.কম