April 21, 2026
ঢাকা: দেশে দিন দিন মানুষের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে, সেইসাথে আত্নহত্যার সংখ্যা। বাংলাদেশে প্রতিবছর ফাঁসিতে ঝুলে, বিষ খেয়ে ও ট্রেনে কাটা পড়ে গড়ে ১০ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করছেন। যারা আত্মহত্যা করেছেন, তাদের মধ্যে ৬০ ভাগ নারী। এই পরিস্থিতিতে দেশে পালিত হচ্ছে আত্নহত্যা প্রতিরোধ দিবস। মানসিক অবসাদ, পারিবারিক নির্যাতন, ইভ টিজিং, প্রতারণা, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, হতাশা ও অতিরিক্ত আবেগ প্রবণতার কারণেই বেশিরভাগ আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে বলে জানিয়েছে মনোবিজ্ঞানীরা। আত্মহত্যার প্রবণতা রয়েছে এমন মানুষের ঠিক সময়ে দ্রুত চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং করা হলে এদের বাঁচানো সম্ভব। তবে বাংলাদেশে এ ধরনের চিকিৎসাসেবার পর্যাপ্ত সুযোগ কম বলে জানিয়েছে চিকিৎসকরা। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন এবং মনোবিজ্ঞানী ও মনোরোগ চিকিৎসকদের মতে, যারা আত্মহত্যা করেন, তাদের ৯৫ শতাংশই কোনো না কোনো মানসিক রোগে ভোগেন। অথচ সরকারি হিসাবে বাংলাদেশে মানসিক রোগের চিকিৎসকের সংখ্যা মাত্র ২০০। শুধু ২২টি মেডিকেল কলেজ, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও পাবনার হাসপাতালে মানসিক রোগের চিকিৎসা হয়। পুরনো আটটি মেডিকেল কলেজের একটিতেও এ বিষয়ের অধ্যাপক নেই। মফস্বল পর্যায়ে চিকিৎসা ব্যবস্থা শূন্যের কোটায়। এছাড়া মানসিক রোগ সর্ম্পকে সচেতনতার অভাব, মানসিক রোগ মানেই পাগল ইত্যাদি ভ্রান্ত ধারনায় রোগীরা চিকিৎসকের কাছে যেতে চান না।
পুলিশ সদর দপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে ছয় হাজার ৪৯২ জন ফাঁসিতে ঝুলে ও বিষপানে আত্মহত্যা করেছেন। এ ছাড়া ২০১৩ সালে ১০ হাজার ১২৬ জন আত্মহত্যা করেছেন। ২০১২ সালে এ সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ১০৫ জন এবং ২০১১ সালে নয় হাজার ৬৩২ জন। এদিকে ২০১১ সাল থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ৩০ হাজার ১৪৮ জনের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একটি বড় অংশের মৃত্যু হয়েছে ঘুমের ওষুধ খেয়ে, ছাদ থেকে লাফ দিয়ে পড়ে, রেললাইনে ঝাঁপ দিয়ে। পুলিশের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, যারা আত্মহত্যা করেছেন, তাদের চেয়েও অনেক বেশি মানুষ আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। এর নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও দেশের বড় হাসপাতালগুলোর জরুরি বিভাগে যত রোগী ভর্তি হয়, তার সর্বোচ্চ ২০ ভাগ আত্মহত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়া লোকজন। যারা আত্মহত্যা করেছেন বা চেষ্টা করেছেন, তাদের বড় অংশের বয়স ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে বলেও পুলিশের পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে। আত্মহত্যার ওপর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডবি্লউএইচও) গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২০ সাল নাগাদ প্রতিবছর সাড়ে ১৫ লাখ মানুষ আত্মঘাতী হবেন। আত্মহত্যার চেষ্টা চালাবেন এরও ১০ থেকে ২০ গুণ মানুষ।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়াদের মধ্যে বেশিরভাগ নারী। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আত্মহত্যা করছেন ২১-৩০ বছর বয়সীরা। পাশাপাশি উন্নত বিশ্বে প্রধানত নিঃসঙ্গতা থেকে বৃদ্ধরা এবং বিশেষত পুরুষরা আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। এদিকে পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে, যারা আত্মহত্যা করেছেন, তাদের মধ্যে ৬০ ভাগ নারী। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগ ২০০৮-০৯ সালে আত্মহত্যার ওপর একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশে নারীদের ওপর শারীরিক, যৌন ও মানসিক নির্যাতনের কারণেই অধিকাংশ আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইভ টিজিংয়ের মতো ঘটনা ঘটছে ব্যাপকভাবে। অনেকে পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে আত্মহত্যা করছেন। অবিবাহিত নারীদের ক্ষেত্রে বিয়ের আগে যৌন সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য হওয়া, অথবা স্বেচ্ছায় যৌন সম্পর্ক স্থাপনের পর গর্ভধারণের কারণে অনেকে আত্মহত্যা করেন। দেশে প্রতিনিয়ত উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ আত্মহত্যার চেষ্টা করলেও কারও বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নজির নেই বললেই চলে। সচেতনতা, চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নতসহ আইনি সহায়তা নিশ্চিত করলে এ অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।