April 22, 2026
আশিক রহমান: আয়তনের দিক থেকে বাংলাদেশ ছোট হলেও মানবিকতা, মানসিকতা, সাহসিকতায় এ দেশের মানুষ অনেক বড়। ইতিহাস তা-ই বলে। ইতিহাস আরও সাক্ষ্য দেয়, ছোট্ট এই ব-দ্বীপের মানুষ অত্যন্ত গণতন্ত্রমনা। তারা গণতন্ত্র পছন্দ করে। ভালোবাসে। গণতন্ত্রের প্রতি তাদের সীমানাহীন আস্থা। মোটেও সস্তায় নয়, বড় বেশি দামে কেনা এই দেশের গণতন্ত্র। ত্রিশ লাখ শহীদ, নূর হোসেনদের রক্তে প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক রাজনীতি তাদের প্রাত্যহিক জীবনে অন্য আট-দশটা ইস্যুর মতোই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাজনীতি তারা খায়, রাজনীতি খাওয়ায়। রাজনীতি শেখায়, রাজনীতি শিখে। রাজনীতি নিয়েই ঘুমায়। চায়ের টেবিল, অফিস, আদালত, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস, ঘরোয়া আড্ডাÑ সবখানেই রাজনীতি। রাজনীতি নিয়ে তুমুল তর্ক-বিতর্কের ঝড় তুলে ভুলে যায় নিজেদের অনাহার-অর্ধাহারে থাকার কথা। যেকোনো দেশের তুলনায় এই দেশের মানুষ অনেক বেশি রাজনীতি-সচেতন। অচেতন মানুষও যে নেই, তা নয়। আছে। তবে যা কিছু করুক, ভুলত্রুটি, সুদ্ধ রাজনীতি সমস্তই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়, গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে থেকে।
একটি গণতান্ত্রিক সমাজে রাজনীতি নিয়ে যে কেউ, যে কোনো জায়গায় রাজনীতি করবে, তর্ক-বিতর্ক করবে, এতে কারও আপত্তি নেই, কখনো ছিলও না। অনাকাঙ্খিত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনাÑ মারামারি, সংঘাত, সহিংসতাবিহীন বাগ্যুদ্ধ-তর্কযুদ্ধই সকলের প্রত্যাশা থাকে। গণতান্ত্রিক সমাজে রাজনীতি যেকোনো জায়গায় করা যায় বলেই কি রমজানে ইফতারকে কেন্দ্র করেও রাজনীতি করতে হবে? কতটা সমর্থনযোগ্য ইফতার রাজনীতি? ইতিহাস বলে, ইসলামকে নেতিবাচক অর্থে ব্যবহার করে কোনো রাজনীতি সমর্থনযোগ্য নয়, যা ইসলাম সমর্থন করে না, নৈতিকভাবে সমর্থন নেই কারও, সেটিই করেন দেশের রাজনীতিবিদেরা! রাজনৈতিক দলগুলো! প্রতিবছর রমজান এলেই শুরু হয় ইফতার রাজনীতি।
এ দেশের রাজনীতিবিদেরাও এ কথা জানেন। তবে মানেন না। শোনেনও না। রমজানের রাতে সারা দিন সংযমের নিয়ত করে সেহরি খেলেও দিন শেষে ঠিকই ভুলে যান সংযমের কথা। ইবাদত বাদ দিয়ে ইফতারের সময় রসিকতা করেন রোজাদারদের সঙ্গে! এই অভিযোগ সত্য হলেও রাজনীতিবিদদের এই নিয়ে ব্যাখ্যা আছে। তাদের মতে, রাজনীতিবিদেরা রমজানে সংযম পালন করেন বলেই তারা সক্রিয়, মাঠের রাজনীতি ছেড়ে ইফতার রাজনীতি করেন। ইফতারকে কেন্দ্র করে যে আয়োজন হয়, তা মানুষের সঙ্গে মতবিনিময়, একে অপরের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাতেরই অংশ। রাজনৈতিক দলগুলো যেহেতু রমজানে সক্রিয় রাজনীতি থেকে বিরত থাকছে, মানুষের দুর্ভোগ-ভোগান্তি থেকে মুক্তির জন্য রাজপথের বাইরে থাকছে, এটি কি রমজানের সংযম নয়? ইফতার মাহফিলের নামে রাজনৈতিক দল, রাজনীতিবিদেরা যে জ্বালাময়ী অসংযমী বক্তব্য-বিবৃতি দেন, তা নিছক কথা বিনিময় বলে চালিয়ে দিতে চান। তারা বলতে চান, এটি কোনোভাবেই ইফতার রাজনীতি নয়, রাজনীতির ইফতারও নয়। মানুষের সঙ্গে সৌহার্দ্য বিনিময়ের আয়োজন মাত্র। ইফতারকে কেন্দ্র করে যে ইফতার পার্টি দেওয়া হয়, ইফতার মাহফিল করা হয়, তার সমালোচনাকারীদেরও তারা ভালো চোখে দেখছেন না। এই বিষয়ে রাজনীতিবিদদের বক্তব্য, যারা মানুষের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর, রাজনীতিবিদদের সুসম্পর্ক চায় না, তারাই শুধু এ রকম অহেতুক সমালোচনা করেন।
ইফতার রাজনীতির সমালোচনাকারীদের উদ্দেশ্য নিয়েও তাদের অনেক প্রশ্ন।
এ দেশে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত অনেকগুলো বৈধ রাজনৈতিক দল রয়েছে। তার মধ্যে চার-পাঁচটি রাজনৈতিক দল রয়েছে, যাদের জনসমর্থন উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সবচেয়ে বেশি জনসমর্থনপুষ্ট রাজনৈতিক দল। এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থন রয়েছে আওয়ামী লীগের প্রতি, সেটি আওয়ামী লীগের জš§লগ্ন থেকে আজ অবধি। ভোটের এই অনুপাত সত্তরের দশকে সংখ্যায় অনেক বেশি থাকলেও এখন আওয়ামী লীগের ভোটের আনুপাতিক হার ৪০ থেকে ৫০ পার্সেন্টের মধ্যে থাকে। পঁচাত্তরের পর জš§ নেওয়া বিএনপির আনুপাতিক ভোট ৩০ থেকে ৩৫ পার্সেন্ট। স্বৈরশাসকের হাত ধরে এ দেশের রাজনীতিতে জাতীয় পার্টির জš§। এটি অদ্যাবধি এ দেশের রাজনীতিতে টিকে রয়েছে। ভোটের হিসাবে তাদের জনসমর্থন ৪ থেকে ৮ পার্সেন্টের মধ্যে ঘুরেফিরে। একাত্তরে এ দেশের জš§ যন্ত্রণার সময় পাশে না থেকে পাকিস্তানি দোসরদের সহায়তাকারী, চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াতে ইসলামী। এদের আনুপাতিক ভোট ৩ থেকে ৪ পার্সেন্টের মধ্যে ঘোরাফেরা করে। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, জাসদ, সাম্যবাদী দল, এলডিপি, গণফোরামসহ আরও অনেক রাজনৈতিক দল রয়েছে, যাদের ভোটের আনুপাতিক হার উল্লেখযোগ্য নয়।
রমজান এলেই এরা সবাই কমবেশি ইফতার রাজনীতিতে ব্যস্ত থাকেন। বিশেষ করে, ভোটের হিসাবে বড় চারটি দল। এ বছরের রমজানের ইফতার রাজনীতির উদ্বোধন করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াই। রাজনীতিকদের নিয়ে আয়োজন হয় এই ইফতার মাহফিলের। তারপর এই ইফতার মাহফিল আরও আয়োজিত হয়েছে। আরও হচ্ছে। রমজানের শেষ দিন পর্যন্ত এই ইফতার রাজনীতি চলতেই থাকবে। আওয়ামী লীগও পিছিয়ে নেই ইফতার রাজনীতিতে। আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনাও প্রায় প্রতিদিনই ইফতার মাহফিলের আয়োজক হচ্ছেন। রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী সমাজ, সুশীল সমাজÑ সবাই পাচ্ছেন দাওয়াত। জাতীয় পার্টিও এবার ইফতার রাজনীতি নিয়ে বেশ সরব। তার ওপর এবার আবার সংসদের বিরোধী দল! এরশাদ প্রতিদিন ইফতার পার্টিতে জ্বালাময়ী ভাষণ দিয়ে বেড়াচ্ছেন। জাতীয় পার্টি কোনো হেলাফেলার দল নয়, তাদের অবহেলার কোনো সুযোগ নেই ইত্যাদি চমকপদ বক্তব্য তিনি প্রতিদিনই রাখছেন। ইফতারে রমজানের সংযমের কথা বেমালুম ভুলে যান।
যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াত কার্যত কোণঠাসা থাকলেও এরাও ইফতার আয়োজনে পিছিয়ে নেই; বরং রমজান এলে, মানুষকে ধোঁকা দিয়ে, ধর্মকে পুঁজি করে এদের তৎপরত যেকোনো সময়ের চেয়ে বহুগুণে বেড়ে যায়। এ বছর ক‚টনীতিকদের নিয়ে আয়োজিত ইফতার পার্টিতে জামায়াতের এক নেতা বলেছেন, জামায়াতের নিরপরাধ নেতাদের বন্দি রেখে সরকার অন্যায় করছে। নিষ্পাপ নেতাদের ছাড়া ইফতার তাদের কাছে খুব কষ্টের বলেও জানিয়েছেন তিনি!
সংযম, শুদ্ধতার মাস রমজান এলে ইফতারকে কেন্দ্র করে চলে অসংযম, অশুদ্ধ কর্মকাণ্ডের প্রতিযোগিতা। অসংযম, অশুদ্ধ কর্মকাণ্ডের মধ্যে চাঁদাবাজি অন্যতম। চাঁদাবাজি চরম আকারে বাড়ে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে চাঁদাবাজদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ ছোট-বড়-মাঝারি ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ঠিকমতো করতে পারেন না। সব সময় চাঁদাবাজি, চাঁদাবাজদের সামলাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়। এই চাঁদাবাজি অনেকটা নীরব হয়ে থাকে বলে অনেক সময় দৃশ্যমান প্রমাণ দেওয়াও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আরও কঠিন করে তোলে ব্যবসায়ীদের জীবননাশের হুমকি। বাধ্য হয়ে ব্যবসায়ীরাও মুখ খোলেন না।
এই দেশে যে যখন ক্ষমতায় আসে, ক্ষমতাভোগী দলের সহযোগী সংগঠনগুলোই মূলত এই চাঁদাবাজির নেতৃত্ব দেয়। এখন ছাত্রলীগ-যুবলীগ-আওয়ামী লীগ ইফতার-বাণিজ্য নিয়ে সক্রিয়। এর আগে একাধিকবার ক্ষমতায় থাকা বিএনপি ও বিএনপির সহযোগী সংগঠন ছাত্রদল-যুবদলও পিছিয়ে ছিল না। এখনো যে ইফতার-বাণিজ্য নিয়ে বিএনপির সংগঠনগুলো ব্যস্ত নেই, তা কি বলা যাবে? এ কথা তো বলাই যায়, আওয়ামী লীগ-বিএনপি, কেউ কারও চেয়ে পিছিয়ে নেই। সকল মুসলিম ভাই ভাইÑ বাক্যে বিশ্বাস করেন বলেই রাজনৈতিকভাবে কেউ কারও মুখ দেখতে অস্বীকৃতি থাকলেও এখানে দুই দলের মধ্যে বেজায় মিল! এখানে কিল-গুঁতোর কোনো ভয় নেই। যখন যার সময়, ‘পুরোটাই সদ্ব্যবহার করো’ নীতিই উভয় সংগঠনের।
অনেকেই এই দুই সংগঠনের নীতি-বিশ্বাস এক নয় বলে জোরালো প্রতিবাদ করবেন। বলবেন, দুই সংগঠনকে এক করে দেখার অর্থÑ অন্য কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে। রাজনীতিবিদেরা এই ‘উদ্দেশ্য’ রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ভুলেও স্বীকার করেন না তারা মানুষ, তাদের ভুল হতে পারে। কথায় নয়, কাজে প্রমাণ করার কোনো তাগিদ তারা অনুভব করেন না। করার কথাও কি? নৈতিক ভিত্তি মজবুত না থাকলে এই অভিযোগের জবাব দেওয়া একটু শক্তও বটে। রাজনীতিক, রাজনৈতিক সংগঠনগুলো সমাজে চাঁদাবাজি বন্ধের সহযোগিতার বিপরীতে “োর চাঁদাবাজি করে যাচ্ছে, ব্যবসায়ীদের সহযোগিতার পরিবর্তে আর্থিকভাবে মেরূকরণ করে, কখনো তা স্বীকার করেন না। রাজনীতিকেরা ভাবেন, জনগণ বোকা! বোকা না হলে কি কেউ এমন প্রশ্ন তুলে? স্বীকৃত বিষয়ে স্বীকারোক্তির আর কী আছে? জনগণ বোকা নয়তো কি?
ইফতার রাজনীতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। তাদের মতে, রমজানে এই ইফতার রাজনীতি বন্ধ করে সংযম পালন করা উচিত। শুদ্ধতার পথ খোঁজা উচিত। তা না করে রাজনৈতিক দলগুলো ইফতারের নামে যা করছে, তা মোটেও সুখকর নয়। ইফতারের আয়োজনে অহেতুক অসংযমী লম্বা লম্বা বক্তব্য দিয়ে জনগণের মন পাওয়া যায় না। জনগণের কাছেও যাওয়া যায় না। তবে রাজনীতিকে প্রাধান্য না দিয়ে যদি এই ইফতার পার্টিগুলো আয়োজন হয়, তাহলে অসুবিধার কিছু নেই বলেও মনে করেন অনেকে। দেশের সুশীল সমাজের মতে, ইফতার যেহেতু ইবাদতের অংশ, তাই ইফতারকে রাজনীতিমুক্ত রাখা রাজনীতিবিদদের দায়িত্ব।
একসঙ্গে অনেক মানুষ নিয়ে ইফতারের আয়োজন অন্যায় নয়। অশোভন, অপ্রীতিকরও নয়। অস্বস্তি, যত ঝামেলা ইফতারে রাজনীতির সংযুক্তি নিয়েই। মানুষ চায় রাজনৈতিক দলগুলোর ইফতার আয়োজন রাজনীতিমুক্ত থাকুক, রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের এই দাবি অগ্রাহ্য করে ভিন্ন যুক্তি নিয়ে হাজির হয়। এই জন্যই জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মনস্তাত্তি¡ক দ্ব›দ্ব সৃষ্টি হয়। মানুষের মতে, রাজনৈতিক দল কিংবা ব্যক্তির ইফতার আয়োজনটি যদি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত না হয়, অসংযমী, অন্যের চরিত্র হননের উদ্দেশ্য না হয়, অপরাজনৈতিক দিকটি যদি দৃশ্যমান না হয়, তখনই তাকে রাজনীতিমুক্ত, জনমানুষের জন্য, মানবিক ইফতার মাহফিল বলা যাবে, অন্যথায় নয়।