পৃথিবীকে জেনে নিন আপনার ভাষায়….24 Hrs Online Newspaper

কোনো আন্তর্জাতিক চাপই ইসরায়েলকে ঠেকাতে পারবে না: নেতানিয়াহু (ভিডিও)

Posted on July 12, 2014 | in আন্তর্জাতিক | by

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বলেছেন, কোনো আন্তর্জাতিক চাপই ইসরায়েলকে এই অভিযান থেকে রুখতে পারবে না। [নেতানিয়াহু ছবি: ফাইল ছবি] রাজধানী তেল আবিবে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে শুক্রবার তিনি একথা বলেন। তিনি বলেন, গাজায় আমরা এখন পর্যন্ত হামাস এবং ইসলামিক জিহাদের ১ হাজারের ওপর আস্তানায় আঘাত হেনেছি। এবং এই অভিযানে যত মানুষ মারা যাচ্ছে ক্ষয়-ক্ষতি হচ্ছে, সব কিছুর জন্য হামাস দায়ী।

তিনি বলেন, হামাস এখন সাধারণ মানুষের মাঝে নিজেকে লুকাচ্ছে। এর ফলে এই হতাহতের ঘটনা ঘটছে। যতক্ষণ সন্ত্রাস নির্মূল না হবে ততক্ষণ এই অভিযান চলবে জানিয়ে নেতানিয়াহু বলেন, কোনো আন্তর্জাতিক চাপই ইসরায়েলকে এই অভিযান থেকে রুখতে পারবে না।

ফিলিস্তিনি এক মা, যার সন্তানের মালামাল পুড়ে গেছে ইসরায়েলি হামলায়

এদিকে চতুর্থ দিন শেষে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত অন্তত শতাধিক মারা গেছে, মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে আরো অন্তত ৬৭০ জন।

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রাফাহ এলাকায় একটি বাড়িতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় আরো আটজন মারা যাওয়ায় মৃতের সংখ্যা একশ ছাড়াল।

এদিকে আক্রান্ত অঞ্চলে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও অন্যান্য উপাদানের সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে চিকিৎসা সেবা মারাত্মকভাবে ব্যহত হচ্ছে। নিউইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে জানায়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গাজা, পশ্চিম তীর এবং জেরুজালেমে জ্বালানী ও ওষুধ সরবরাহ ব্যহত হচ্ছে বলে সেখানে চিকিৎসা সেবা ভেঙ্গে পড়বে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

এদিকে গাজা থেকে রকেট হামলা অব্যাহত আছে। শুক্রবার সকালে লেবানন থেকেও উত্তর ইসরায়েলে রকেট হামলার ঘটনা ঘটেছে। দেশটির আশদুদ শহরে একটি পেট্রোল পাম্পে এ রকেট হামলার ঘটনা ঘটে।

ইসরায়েলি হামলায় নিহত ফিলিস্তিনিকে নিয়ে স্বজনদের উর্ধ্বশ্বাস

এই সংকটজনক অবস্থা থেকে উত্তরণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সাথে টেলিফোনে কথা বলেছেন। যদিও প্রথম থেকেই প্রধানমন্ত্রী সকলকে আশ্বাস দিচ্ছেন- তিনি সমস্যা সমাধানে বদ্ধপরিকর। অপরদিকে গতকালই প্রায় ৪০ হাজার সেনাসহ স্থল পথে ট্যাংকসহ আক্রমণে প্রস্তুত হতে সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছে ইসরায়েল সরকার।

‘অপারেশন প্রোটেক্টিভ’ নামের এই অভিযানে এখন পর্যন্ত শতাধিক মারা গেছে এবং গুরুতর আহত হয়েছে আরো অন্তত ৬৭০ জন মানুষ বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এক বিবৃতিতে তারা জানায়, নিহত এবং আহতদের বেশিরভাগই নিরীহ সাধারন মানুষ।

ইসরায়েলি হামলায় গুরুতর আহত এক শিশু

এদিকে ইসরায়েল দাবি করেছে, তাদের এই অভিযানে কয়েক ডজন ‘সন্ত্রাসী’ নিহত হয়েছে। এক বিবৃতিতে দেশটির কর্তৃপক্ষ জানায়, মঙ্গলবার থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৫শ’ রকেট হামলা হয়েছে তাদের ওপর। তবে এর বেশিরভাগ রকেটই ইসরায়েলের ‘আয়রন ডোম অ্যান্টি-মিসাইল’ সিস্টেমের কারণে নিষ্ক্রিয় বা আকাশেই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। অপরদিকে এই রকেট হামলার জবাবে গাজায় তারা অন্তত সাড়ে ৭শ’ স্থাপনায় বিমান হামলা চালিয়েছে বলে স্বীকার করেছে দেশটির সরকার।

অপরদিকে শুক্রবার প্রথমার্ধে আশদুদ শহরে এক পেট্রোল পাম্পে রকেট হামলা হলে তিনজন গুরুতর আহত হয়েছে বলে দাবি করেছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ। তারা আরো জানায়, তেল আবিবে তিনটা রকেটকে আয়রন ডোম সিস্টেম দিয়ে ঠেকানো হয়েছে।

এদিকে লেবাননের সেনাবহিনী নিশ্চিত করেছে, শুক্রবার রাতে জঙ্গীরা দেশটির দক্ষিণাঞ্চল থেকে অন্তত তিনটি মিসাইল ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলকে লক্ষ্য করে ছুড়েছে। তবে এঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

সন্তানহারা এক বাবার আহাজারী

ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শুক্রবার গাজা উপত্যকার রাফাহ এলাকায় এক বাড়িতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় পাঁচজন মারা গেছে, যাদের মাঝে তিনজন পুরুষ এবং দু’জন নারী আছেন। তারা আরো জানায়, দ্বিতীয় আরেক দফা হামলায় রাফাহ এলাকায় এক কিশোরী নিহত হয়েছে। এছাড়া এদিন জাবালিয়ায় এক হামলায় সাহের আবু নামোস নামে এক চার বছরের শিশুও নিহত হয়েছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ‘হামাস’-এর সমালোচনা করে বলেছেন, তারা এমন আচরণ করলে গাজায় কিছুতেই সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না।

অপরদিকে ইসরায়েল তার সেনাবহিনীকে গাজায় ২০ হাজার সেনা পাঠানর অনুমতি দিয়েছে। এছাড়া আরো ২০ হাজার সৈন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশও দিয়ে রেখেছে, যদিও ইসরায়েল বলছে- তাদের লক্ষ্য শুধুই সন্ত্রাস দমন। কিন্তু ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইসরায়েলি হামলায় নিহতদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু।

শুক্রবার ইসায়েলের আশদুদ শহরে এক পেট্রোল পাম্পে রকেট হামলার পর

এদিকে এ হামলাকে নিন্দা জানিয়ে মিশরীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শুক্রবার এক বিবৃতিতে জানায়, ইসরায়েলের অতিরিক্ত এবং অপ্রয়োজনীয় সেনাবহিনী ব্যবহার গাজায় সাধারণ মানুষের মৃত্যুর সংখ্যাই বাড়াবে।

উল্লেখ্য, ২০১২ সালে ইসরায়েল এবং হামাসের মধ্যে সংঘাত নিরসনে সে সময় মিশর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিল।

তুর্কি প্রধানমন্ত্রী রিকেপ তাঈপ এরদোগানও ইরায়েলের এই বর্বরোচিত হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ইসরায়েল যদি এই নিপীড়ন বন্ধ না করে তাহলে তুর্কি-ইসরায়েল সম্পর্কে কোনো বন্ধুতা থাকবে না।

গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলা

তবে ইসরায়েলের তরফ থেকে এঘটনার জন্য সম্পূর্ণরূপে দায়ী করা হচ্ছে ফিলিস্তিনি সংগঠন ‘হামাস’কে। তাদের বর্ণনা অনুযায়ী, হামাসের রকেট হামলার জবাব এই হত্যাকাণ্ড।

তবে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনির এই সংঘাত এখন আর সরকারী পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই। তা সাধারণ মানুষকে ভোগাচ্ছে বলেই বিশ্বনেতাদের অধিকাংশের কপালে ভাঁজ সৃষ্টি করেছে।

এদিকে সামাজিক মাধ্যমেও ইসরায়েলি এই হামলার নিন্দা জানিয়ে প্রতি মুহূর্তে বিশ্ববাসীর প্রতি মানবিক আবেদন জানানো হচ্ছে। অনেক দেশেই ইতোমধ্যে ফেসবুক এবং টুইটারের মাধ্যমে এ হামলার নিন্দা ও প্রতিবাদ করা হচ্ছে। প্রতি মুহূর্তে নিন্দা আরো বাড়ছে কারণ ফেসবুক-টুইটারের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি থেকে ইসরায়েলি নিষ্ঠুর হামলার নমুনা স্বরূপ ছড়িয়ে পড়ছে ছবি।

টুইটারে ছড়িয়ে পড়া আহত এক শিশুর ছবি

ওপরের ছবিটিতে দেখা যাচ্ছে, হামলার শিকার এক শিশুকে। ছবিটিতে মানবিক আবেদন জানিয়ে এ হামলার প্রতিবাদ করা হয়েছে। সেই সাথে বিশ্ববাসীকে জানানো হয়েছে, ইসরায়েল এ পর্যন্ত যত মানুষ মেরেছে, সকল বিশ্বকাপ মিলে ততটা গোলও হয়নি।

উল্লেখ্য, জেরুজালেমে ফিলিস্তিনি কিশোর মোহাম্মদ আবু খেদাইরকে প্রথমে অপহরণ এবং পরে হত্যা করার পরপরই ফিলিস্তিনি অধিবাসী এবং ইসরায়েলি নিরাপত্তা সংস্থার মাঝে সংঘর্ষের শুরু হয়। খেদাইরের ময়নাতদন্ত রিপোর্টে জানা যায়, তার মাথায় প্রথমে শক্ত কিছু দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল এবং তারপরই তাকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়। পোস্টমর্টেম রিপোর্টে তার ফুসফুসে ধোঁয়া পাওয়া যায়, যা প্রমাণ করে দগ্ধ হওয়ার সময়ও সে নিঃশ্বাস নিচ্ছিল। এরপরই আবু খেদাইরের চাচাত ভাই তারিক খেদাইরকে ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর পোশাকধারী দু’জন অজ্ঞাত পরিচয়ধারী অপহরণ করার চেষ্টা করে এবং পরে মারধর করে। তারিক খেদাইরের এই আক্রান্ত হওয়ার দৃশ্য এক প্রতিবেশী ধারণ করে এবং পরে সে ওই ভিডিও খেদাইর পরিবার ও স্থানীয় গণমাধ্যমকে সরবরাহ করে। এরপর থেকেই সংকট প্রকট হতে থাকে। শুক্রবার আবু খেদাইরের দাফনের পর তা মারাত্মক আকার ধারণ করে।

প্রথমে ইসরায়েল সরকার এ হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত করে কঠোর বিচারের ঘোষণা দিলেও আচমকা এর দু’দিন পর থেকে গাজায় ইসরায়েলি হামলা শুরু হয়। ইসরায়েল সরকার সেসময় দাবি করে, সন্ত্রাসী সংগঠন হামাস তেল আবিবসহ কয়েকটি শহরে রকেট হামলা চালিয়েছে। তার জবাবেই সন্ত্রাস নির্মূলে ইসরায়েলের এ পদক্ষেপ।

ইসরায়েলের অ্যান্টি-মিসাইল ব্যবস্থা

তবে ইসায়েলের এ হামলায় তথাকথিত সন্ত্রাস যত না নির্মূল হয়েছে, তার চেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে সাধারণ মানুষ। গত বুধবার গাজার এক ক্যাফেতে আর্জেন্টিনা বনাম নেদারল্যান্ডস এর মধ্যকার সেমিফাইনাল খেলা দেখছিল কিছু সাধারণ মানুষ। সেই ক্যাফেতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হয়েছে নয়জন।

এবার জেনে নেওয়া যাক, ইসরায়েল ঘোষিত ফিলিস্তিনি ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হামাস সম্পর্কে। হামাস হচ্ছে ফিলিস্তিনি সুন্নি মুসলিম নিয়ন্ত্রিত একটি সংগঠন, যার একটি সেনা ইউনিট আছে। ২০০৬ সালে ফিলিস্তিনি সংসদ নির্বাচনে জয় লাভের পর এবং ‘ফাতাহ’ নামক রাজনৈতিক সংগঠনকে সংঘাতে পরাজিত করার পর ২০০৭ সাল থেকে গাজা উপত্যকা হামাসের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউরোপিয় ইউনিয়ন, জর্দান, মিশর এবং জাপান ‘হামাস’কে ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠন হিসেবে আখ্যায়িত করলেও ইরান, রাশিয়া, তুরস্ক, চীন এবং আরো বেশ কিছু আরবীয় জাতি তা সমর্থন করে না।

হামাস সদস্যরা

ইসলামিক শাসন প্রতিষ্ঠায় উজ্জীবিত হয়ে ১৯৮৭ সালে মিশরীয় মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রশাখা হিসেবে জন্ম নেয় ‘হামাস’। ১৯৮৮ সালে সহকারী প্রতিষ্ঠাতা শেইখ আহমেদ ইয়াসীনের নেতৃত্বে সংগঠনটি ফিলিস্তিনকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে সংগ্রাম শুরু করে। তারা একটি মুসলিম শাসিত দেশ প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যা বর্তমানে ইসরায়েল, পশ্চিম তীর এবং গাজা উপত্যকায় বিভক্ত। ২০০৯ সালের জুলাইতে হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরো চিফ খালেদ মেশাল জানান, ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর সীমানা চুক্তি অনুযায়ী ফিলিস্তিন নামে একটি স্বাধীন দেশ গঠিত হওয়ার কথা, যার রাজধানী হবে জেরুজালেম।

২০১৪ সালে হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর সহসভাপতি মূসা মোহাম্মদ আবু মারযুক জানান, হামাস ইসরায়েলকে চেনে না।

এদিকে ২০০৬ সালের জানুয়ারিতে ফিলিস্তিনি সংসদ নির্বাচনে হামাস পিএলও সমর্থিত ফাতাহকে পরাজিত করে। ২০০৭ সালে গাজা যুদ্ধের পর থেকে এ অঞ্চলটি হামাসের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ২০০৮ সালের জুন মাসে হামাস ইসরায়েলে রকেট হামলা চালায় মিশর-ইসরায়েল সংকটকে কেন্দ্র করে। একই বছর ডিসেম্বরের শেষ দিকে ইসরায়েল আবার গাজা আত্রমণ করে। ২০০৯ সালের মাঝামাঝিতে দেশটি গাজা উপত্যকা থেকে তার বাহিনী সরিয়ে নেয়, তবে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখে। ২০১১ সালের ৪ মে হামাস এবং ফাতাহ একীভূত হয়ে কাজ করার ঘোষণা দেয়। সে ঘোষণা অনুযায়ী, ফাতাহ নেতা মাহমুদ আব্বাস ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্বগ্রহণ করেন এবং হামাস নেতা খালেদ মেশাল অস্ত্র ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন।

সূত্র: বিবিসি, সিএনএন, ফক্স নিউজ, নিউইয়র্ক টাইমস, আল জাজিরা, উইকিপিডিয়া

সর্বশেষ খবর

আজকের ছবি

www.facebook.com

Tag Cloud