April 29, 2026
অধ্যাপক ডা. এম আলমগীর চৌধুরী : রোজা রাখা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরজ। রোজা পালন করা অবস্থায় অনেক রোগীর ঔষধপত্র সেবন ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে। রোগীকে বিভিন্ন ধরনের ঔষধ সেবন করতে হতে পারে। রোজা রাখা ঔষধপত্র খাওয়া এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা নিয়ে অনেকের মনে সংশয় দেখা দেয়। কোন কোন ক্ষেত্রে রোগী এসব ব্যবস্থাপত্র নিলে রোজার ক্ষতি হয় না বা রোজা নষ্ট হয় না। অসুস্থ অবস্থায় রোজা রেখে ঔষধ গ্রহণের ব্যাপারে সারা বিশ্বের ইসলামী চিন্তাবিদ ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ বিভিন্ন সময় মত দিয়েছেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা ইসলামী আলেম, ওলামা ও চিন্তাবিদদের সঙ্গে কথা বলে কিছু সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, রোজা থাকা অবস্থায় বেশ কয়েকটি পন্থায় ঔষধ সেবন ও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলে রোজা নষ্ট হবে না। মরক্কোতে ১৯৯৭ সালের জুনে ‘ইসলামের দৃষ্টিতে সমসাময়িক চিকিৎসা সমস্যা’ শিরোনামে এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এই সেমিনারে আলোচিত বিষয় পরবর্তীতে নবম ফিকাহ-মেডিক্যাল একাডেমীর সেমিনারেও আলোচিত হয়েছে। এ সেমিনার মিশরের কায়রোতে জেদ্দাস্থ ইসলামিক ফিকাহ একাডেমি, মিশরের বিখ্যাত আল আজহার ইউনিভার্র্সিটি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইসলামিক বিজ্ঞান শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের (আইএসইএসকো) উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে ইসলামিক চিন্তাবিদ ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সর্বসম্মতিক্রমে এমন কয়েকটি সিদ্ধান্ত নেন যাতে অসুস্থ ব্যক্তি রোজা রাখা অবস্থায় এসব ব্যবস্থাপত্র নিলে রোজা ভঙ্গ হবে না। এই সেমিনারের সিদ্ধান্ত বৃটিশ মেডিক্যাল জার্নালে ৩২৯ নং ভলিউমের ৭৭৮-৮২ পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হয়।
সেমিনারে কয়েক পন্থায় ওষুধ গ্রহণ করলে রোজ ভঙ্গ হবে না বলে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। রোজা রাখা অবস্থায় চোখ, কান ও নাকের ড্রপ নেয়া যাবে। রোগীর বুকে ব্যথা হলে নাইট্রোগ্লিসারিন ¯েপ্র জিহ্Ÿার নিচে নিতে পারবেন। মহিলা রোগীর তলপেট পরীক্ষার জন্য যোনিদ্বার দিয়ে হাতের আঙ্গুল অথবা কোন ডিভাইস প্রবেশ করলে রোজা ভাঙ্গবে না। মূত্রথলি পরীক্ষা বা এক্সরে করার জন্য রোগীর প্রসাবের দ্বার দিয়ে ক্যাথেটার অথবা অন্য কোন যন্ত্র প্রবেশ করা হলে রোজা ভঙ্গ হবে না। মেসওয়াক অথবা ব্রাশ দিয়ে কেউ যদি দাঁত পরিষ্কার করার সময় পাকস্থলীতে থুথু অথবা টুথপেষ্ট পাকস্থলীতে প্রবেশ না করলে রোজা ভাঙ্গবে না। রোগীর চামড়া, মাংস ও শিরায় ইনজেকশন দেয়া যাবে। কিন্তু এই ইনজেকশন খাদ্যদ্রব্য (যেমন- স্যালাইন, ডেক্সট্রোজ স্যালাইন) হবে না। যে কেউ রক্ত দিতে পারবেন আবার চিকিৎসা নিতেও পারবেন। কোন রোগী অক্সিজেন অথবা অজ্ঞানকারী গ্যাস (এনেসথেসিয়া) নিলে রোজা ভঙ্গ হবে না। চর্ম জাতীয় রোগ নিরাময়ে চামড়ায় মলম নেয়া যাবে। আবার শরীরের কোন হাড় ভেঙ্গে গেলে সেক্ষেত্রে প্লাষ্টার করলে রোজা ভঙ্গ হবে না। কারো কোন অসুখ হলে পরীক্ষার জন্য তার শরীর থেকে রক্ত নেয়া যাবে। হৃদরোগে আক্রান্ত রোগী হার্টের এনজিওগ্রাম করার জন্য আর্টারিওগ্রাফ করতে পারবে না। রোগীর অপারেশন অথবা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য এন্ডোসকপি করলে রোজা ভাঙ্গবে না। মুখ পরিষ্কারের জন্য মাউথওয়াশ বা কুলি করা যাবে যাতে পাকস্থলীতে কোন কিছু না যায়। জরায়ু পরীক্ষার জন্য শরীরে কোন যন্ত্রপাতি বা অন্যকিছু পরীক্ষার জন্য প্রবেশ করালে রোজায় কোন সমস্যা হবে না। লিভার বায়োপসি অথবা অন্যকোন অঙ্গের বায়োপসি করলে রোজ নষ্ট হবে না। নাকে ¯েপ্র ও ইনহেলার জাতীয় কিছু নিলে কোন সমস্যা নেই। রোগীর পায়ুপথে ইনজেকশন অথবা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য কোন কিছু প্রবেশ করালে অথবা শরীর অবশ করালে রোগী যদি ইচ্ছা করেন তাহলে তিনি রোজা থাকতে পারবেন। রোগীর কিডনী ডায়ালাইসিস করালে রোজা ভাঙ্গবে না। পাকস্থলী পরীক্ষা করার জন্য গ্যাসট্রোস্কপি করা যাবে কিন্তু কোন তরল প্রবেশ করানো যাবে না।
এ মতামতগুলো নিয়ে অনেক চিকিৎসকের মধ্যে বিভ্রান্তি হতে পারে। কিন্তু এই মতামতগুলো বিশ্বের ইসলামী চিন্তাবিদ ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। তাই আমাদের দেশে চিকিৎসকরা এই মতামত রোগীদের দিলে রোগীরা সচেতন হবেন। এতে রোগীরা সঠিক নিয়মে রোজা পালন করতে পারবেন। পবিত্র রমজান মাস আতœসংযমের মাস। পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহর রহমতে অনেক রোগীরা রোগ মুক্তি লাভ করে। রমজান মাসে খাদ্যাভাসের পরিবর্তন হয়ে একটা শৃংখলায় চলে আসে। সেহরীতে ও ইফতারের সময় অনেকে তৈলাক্ত খাবার বেশী খেয়ে থাকে। যার ফলে মানুষের শরীরে বিভিন্ন প্রকার সমস্যা হয়ে থাকে। তাই রমজান মাসে খাদ্যাভাসেও সংযমী হওয়া উচিত।
সাইনুসাইটিস রোগীদের ক্ষেত্রে
সাইনুসাইটিস রোগীদের ক্ষেত্রে নাকে ¯েপ্র বা ড্রপ ব্যবহারের প্রয়োজন হয়। অনেক রোগী জিজ্ঞাসা করে রোজা রেখে দিনের বেলায় নাকে ঔষধ দেয়া যাবে কিনা? সেক্ষেত্রে সেহরীর ও ইফতারের পরে নাকে ড্রপ বা ¯েপ্র ব্যবহার করা ভাল। দিনের বেলায় নাকে ড্রপ বা ¯েপ্র না দেয়া ভাল।
কান পাকা রোগ ও কানের অন্যান্য সমস্যা
কান পাকা রোগ বা কানে অন্যান্য রোগ হলে অনেক সময় কানে ঔষধ ব্যবহার করতে হয়। সেক্ষেত্রে সেহরীর ও ইফতারের পরে কানে ঔষধ ব্যবহার করা ভাল। রোজা রেখে কানে ঔষধ দেয়া যাবে না। কারণ কানের পর্দায় যদি ছিদ্র থাকে, এ ছির্দের মাধ্যমে ঔষধ গলায় চলে যেতে পারে।
গলায় টনসিল প্রদাহে বা গলার অন্যান্য ইনফেকশন
গলায় টনসিল প্রদাহে বা গলার অন্যান্য ইনফেকশনের জন্য এন্টিবায়োটিক খেতে হয়। কিছু এন্টিবায়োটিক দিনে চারবার, কিছু আট ঘন্টা পর পর, এবং অন্যান্য এন্টিবায়োটিক দুইবার বা দিনে একবার খেতে হয়। পবিত্র রমজান মাসে আমরা দিনে এক বার বা দুই বার খেতে হয় এরকম ঔষধ ব্যবস্থাপত্র দিয়ে থাকি। যাতে রোগী ইফতার করে বা সেহ্রী খাওয়ার আগে বা পরে ঔষধ খেতে পারে।
কোন রোগীর চেকআপ লাগলে তা রাত্রে করানো যেতে পারে। পবিত্র রমজান মাসে রোজাদারদের খাদ্যাভাস একটা নিয়ম নীতির মধ্যে চলে আসে। তাই পবিত্র রমজানে রোজাদাররা অনেক রোগ থেকে মুক্তি পায়। এবং শরীর ও মন সুস্থ থাকে। এমনকি পেপটিক আলসার, ডায়াবেটিস ও অন্যান্য রোগ নিয়ন্ত্রনে চলে আসে। তাই রোগী খুবই ভালভাবে দৈনন্দিন জীবনযাপন করতে পারে।
অনেকে ইফতারের সময় অনেক বেশী ইফতারের আয়োজন করে এবং তেলে ভাজা অনেক খাদ্য গ্রহণ করে। তা আবার স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর। রমজান হলো সংযমের মাস, তাই ইফতার এবং সেহরীর সময় সংযমী হওয়া প্রয়োজন।