April 29, 2026
চট্টগ্রাম: বছরখানেক আগেও নগর পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা তাদের গোয়েন্দা ইউনিটকে দিয়ে চাঞ্চল্যকর মামলার তদন্ত দূরে থাক, সাধারণ অভিযান পরিচালনারও ভরসা পেতেন না। নগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) কার্যত নিস্ক্রিয়, অদক্ষ একটি ইউনিটে পরিণত হয়েছে বলে হতাশা ছিল শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে। গত পাঁচ মাসে সেই নগর গোয়েন্দা পুলিশ নিয়ে শীর্ষ কর্মকর্তাদের ধারণা আমূল পাল্টে গেছে। এর মধ্যে নগর পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ এই ইউনিটে এসেছে দৃশ্যমান পরিবর্তন। এখন নগরীতে চাঞ্চল্যকর কোন অপরাধ সংঘটিত হলেই সিএমপি কমিশনারের নির্দেশে মুহুর্তের মধ্যে হাজির হয়ে যাচ্ছে ডিবি’র টিম। ক্লুবিহীন ঘটনার রহস্য উদঘাটন করে গ্রেপ্তার করে আনছে আসামিদের। ছিনতাই হওয়া মোবাইল উদ্ধার থেকে অপহরণ, জোড়া খুন থেকে ব্যাংক ডাকাতি সবখানেই ডাক পড়ছে নগর গোয়েন্দা পুলিশের।
নগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ কমিশনার (ডিসি-ডিবি) কুসুম দেওয়ান বলেন, আমাদের টিম ওয়ার্কটা ভাল হচ্ছে। কমিশনার স্যারকে বলেছি এডিসি তানভিরকে আমার লাগবে, তিনি দিয়েছেন। বাছাই করে ভাল ভাল অফিসারদের ডিবিতে এনেছি। এখন ভালভাবে কাজ চলছে।
২০১৪ সালের জুলাই মাসে নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার পদ থেকে শান্তিরক্ষী মিশনে যোগ দিয়ে সুদান যান আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তার। নগর গোয়েন্দা পুলিশে বাবুল আক্তারের যোগদানের আগে-পরে সেটি দীর্ঘসময় একটি ‘নিস্ক্রিয়’ ইউনিট হিসেবেই পরিচিত ছিল।
তবে এর মধ্যে সহকারি কমিশনার (তথ্যপ্রযুক্তি) পদে জাহাঙ্গীর আলম এবং বেশ কয়েকজন চৌকস পরিদর্শক ও উপ-পরিদর্শক ডিবিতে যোগ দিলে আস্তে আস্তে সচল হতে শুরু করে ডিবি। এরপর অতিরিক্ত উপ কমিশনার (এডিসি) এস এম তানভির আরাফাত গত ২৭ ফেব্রুয়ারি বদলি হয়ে এলে পুরোপুরি পাল্টে যায় নগর গোয়েন্দা পুলিশ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে অপরাধীর অবস্থান শনাক্ত করে চাঞ্চল্যক
র ক্লুবিহীন ঘটনার নেপথ্যের রহস্য বের করতে শুরু থেকেই দক্ষতা দেখাতে থাকেন তানভির আরাফাত। তার সঙ্গে যোগ দেন সহকারি কমিশনার জাহাঙ্গীর আলম।
গত বৃহস্পতিবার (৭ মে) গভীর রাতে নগরীর মুরাদপুর এলাকায় ইসলাম টাওয়ারের দ্বিতীয় তলায় আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকে ডাকাতির চেষ্টা করে দুর্বৃত্তরা। এ সময় তারা ব্যাংকের নিজস্ব নিরাপত্তা রক্ষী মো.ইব্রাহিমকে (৩৪) খুন করে। প্রায় ৪৪ ঘণ্টা পর শুক্রবার (৮ মে) রাত সাড়ে ৯টার দিকে বিষয়টি জানাজানি হয়।
সঙ্গে সঙ্গে এ ঘটনা তদন্ত ও আসামিদের গ্রেফতারের দায়িত্ব পায় নগর গোয়েন্দা পুলিশ। কাজে নেমে পড়েন এস এম তানভির আরাফাতের নেতৃত্বে পরিদর্শক জাহিদুল ইসলাম ও আজিজ আহমেদ এবং উপরিদর্শক (এসআই) সন্তোষ কুমার চাকমা ও রাসেল মিয়া।
হত্যাকান্ডের সাতদিনের মধ্যে ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী, খুনিসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুরো রহস্য উন্মোচন করে নগর গোয়েন্দা পুলিশ।
৭ মে নগরীর সদরঘাট থানার দক্ষিণ নালাপাড়ায় আল ইসলাম ভবনের চতুর্থ তলার একটি ফ্ল্যাটে নাসিমা বেগম নামে এক গৃহবধূ ও তার মেয়ে রিয়া আক্তারকে (৯) জবাই করে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। পুলিশ যখন এ হত্যাকান্ডের কোন ক্লু খুঁজে পাচ্ছিল না তখন সেটির তদন্তভার এসে পড়ে নগর গোয়েন্দা পুলিশের উপর। একইভাবে এস এম তানভির আরাফাতের নেতৃত্বে তদন্তে নেমে পড়েন পরিদর্শক আব্দুর রউফ ও বশির এবং উপ-পরিদর্শক (এস আই) আফতাব ও শিবেন।
ঘটনার ২০ দিনের মাথায় সেই ঘটনার নেপথ্যের রহস্য উদঘাটন করে নাসিমার খালাত দেবর বেলালকে গ্রেপ্তার করে নগর গোয়েন্দা পুলিশ।
এর আগে এস এম তানভির আরাফাত নগর গোয়েন্দা পুলিশে যোগদানের পর সোর্স মারফত তথ্য পান, চট্টগ্রাম কলেজ ও মহসিন কলেজের হোস্টেলে শিবিরের সন্ত্রাসীরা অত্যাধুনিক মরণাস্ত্রের সমাবেশ ঘটাচ্ছে।
এ খবর পেয়ে টানা ৩০ঘণ্টা দুই কলেজে অভিযান চালিয়ে নগর গোয়েন্দা পুলিশ উদ্ধার করে একে ২২, পেট্রলবোমাসহ বেশকিছু অস্ত্রশস্ত্র। গ্রেপ্তার করা হয় ৭২ শিবির কর্মীকে। নগরীর লালখানবাজারে ৩০ মে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে এক যুবক খুনের ছয়দিনের মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয় চার খুনীকে।
এছাড়া গত পাঁচ মাসে কমপক্ষে আটজন অপহৃতকে উদ্ধার করেছে ডিবি। নগরী এবং জেলায় যেসব মানবপাচারকারী গ্রেপ্তার হচ্ছে কিংবা যেসব ভিকটিম উদ্ধার হচ্ছে তার অধিকাংশ তথ্যই নগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছ থেকে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
প্রযুক্তির উন্নয়নের কারণেই অপরাধীদের ধরা সহজ হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে এডিসি-ডিবি এস এম তানভির আরাফাত বলেন, প্রযুক্তি তো আগেও ছিল। প্রযুক্তির কারণেই সব হচ্ছে তেমনটা নয়। আসলে সদিচ্ছা থাকতে হয়। অপরাধ আর অপরাধীকে দৌঁড়ানোর মানসিকতা থাকতে হয়। সর্বোপরি মানুষকে সেবার মনোভাব থাকতে হবে।
সহকারি পুলিশ কমিশনার (এসি-ডিবি) জাহাঙ্গীর আলম বলেন, পুলিশ হেডকোয়ার্টার এবং সাইবার সিকিউরিটি সেলের সঙ্গে আমরা নেটওয়ার্ক করেছি। তাদের কাছ থেকে দ্রুত সার্ভিস পাচ্ছি। এর ফলে আসামির অবস্থান শনাক্ত করে তাদের গ্রেপ্তারের কাজটা অনেকটাই সহজ হয়েছে। সিএমপিতে আরও নতুন নতুন উন্নত প্রযুক্তির সমাবেশ ঘটানোর কাজ চল
ছে বলেও জানান এসি জাহাঙ্গীর। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নগর গোয়েন্দা পুলিশে একজন উপ কমিশনার, একজন অতিরিক্ত উপ কমিশনার, তিনজন সহকারি কমিশনারের নেতৃত্বে আছেন ১৭ জন পরিদর্শক, ১৮ জন উপ-পরিদর্শক এবং ১৪ জন সহকারি উপ-পরিদর্শক। কনস্টেবল কর্মরত আছেন ৪২ জন।
গত পাঁচ মাসে বেশ কয়েকটি অপরাধের নেপথ্যের রহস্য উদঘাটনে সাফল্য পেলেও সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর হিসেবে পরিচিত অঞ্জলী রাণী হত্যাকান্ডে এখনও কোন সফলতা দেখাতে পারেনি নগর গোয়েন্দা পুলিশ। মাসের পর মাস ধরে শুধু তদন্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে চট্টগ্রাস নার্সিং কলেজের শিক্ষিতা অঞ্জলী হত্যাকান্ড। ১১ জানুয়ারি কলেজে যাবার পথে তাকে কুপিয়ে হত্যা করার ঘটনায় ডিবি এখনও কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। তদন্তের দায়িত্বে ডিবি থাকলেও এখনও ঘটনার ক্লুও উদ্ধার করতে পারছেনা।
অঞ্জলী হত্যা মামলার তদন্তে আছেন সহকারি কমিশনার জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে তিন সদস্যের টিম। বাকি দু’জন হচ্ছেন পরিদর্শক কেশব চন্দ্র দে এবং এস আই রাজেশ বড়ুয়া। জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘অঞ্জলী হত্যা মামলার তদন্ত চলছে। পুরো ঘটনাটা একটা ফ্রেমের ভেতরে আনতে পেরেছি। খুব শীঘ্রই আশা করি হত্যাকারীকে আমরা গ্রেপ্তার করতে পারব।’ নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার এস এম তানভির আরাফাত বলেন, আমরা মামলার তদন্ত ও অপরাধী গ্রেপ্তারকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছি। বেশ কয়েকটি ঘটনা কাছাকাছি সময়ে ঘটে যাওয়াতে অঞ্জলী হত্যাকান্ড তদন্তে আমাদের একটু সময় লাগছে। তবে দ্রুত এটার সমাধান আমরা করতে পারব।
নগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ কমিশনার কুসুম দেওয়ান বলেন, থানা এবং ফাঁড়ি থেকে আরও ভাল ভাল চৌকস অফিসারদের আমাদের ইউনিটে আনার চেষ্টা করছি। চাঞ্চল্যকর মামলার মধ্যে যেগুলোর তদন্তের দায়িত্ব আমাদের হাতে আছে, একটি মামলাও পড়ে থাকবেনা। কাজ এখন আগের চেয়ে বেশি হচ্ছে, আরও হবে।