April 21, 2026
ঢাকা: দেশে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকারকে আবারো সমঝোতায় আসার ডাক দিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। বিএনপি আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনের জন্য প্রস্তুত আছে জানিয়ে সংলাপের পরিবেশ সৃষ্টির আহ্বান জানান তিনি। এজন্য আটক নেতাকর্মীদের মুক্তি, দলের কার্যালয় খুলে দেয়া, সভা-সমাবেশ থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার দাবি করেন বিএনপি প্রধান। সরকারকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, ‘এ সরকার দীর্ঘায়িত হওয়া খুবই বিপদজনক। এজন্য জনগনের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়ে একটি গনতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে পূনরায় সমঝোতা ও সংলাপ হওয়া উচিত।’
বুধবার বিকেলে রাজধানীর হোটেল ওয়েষ্টিনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ আহ্বান জানান। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের সমালোচনা করে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, ‘এ নির্বাচনে নির্দলীয় সরকারের প্রয়োজনীয়তা যে কতটা যৌক্তিক তা প্রমানিত হয়েছে। প্রমান হয়েছে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।’
গণতন্ত্র মৃত
৫ জানুয়ারি নির্বাচনে গনতন্ত্রকে হত্যা করা হয়েছে মন্তব্য করে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, দেশের গনতন্ত্র এখন মৃত। এদেশে বারবার গনতন্ত্র হোচট খেলেও আবার পূন:প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এবারও হবে। কারসাজি, সন্ত্রাস, অন্তর্ঘাত ও অপপ্রচার-এই চার অস্ত্রে গনতন্ত্রকে হত্যা করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রলম্বিত করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। ‘কারো কাছে মাথা নত করবেন না’ প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্যকে ‘হঠকারী স্বৈরশাসকে’র উক্তি বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, এ নির্বাচন শুধু দেশে নয় আন্তর্জাতিকভাবেও সমালোচিত হয়েছে। কোনো রাজনৈতিক দলই আওয়ামী এই প্রহসনে শরিক হয়নি। এ সময় নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা করেন তিনি বলেন, সরকার রাজনীতিকে কলুষিত করেছে।
শান্তির পথে বিএনপি
বিএনপি শান্তিপূর্ন ও গনতান্ত্রিক পন্থায় আন্দোলন অব্যাহত রাখতে বদ্ধ পরিকর মন্তব্য করে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, ‘আমরা সংহিংসতা, হানাহানিতে বিশ্বাস করি না। শান্তিপূর্ন পথ বন্ধ হলে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় তার দায় সরকারের।’ তিনি বলেন, ‘বিএনপি ক্ষমতার জন্য নয়, গনতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করে। জনগনের গনতান্ত্রিক আন্দোলন বিজয়ের প্রথম ধাপ অতিক্রম করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।’
সরকার অবৈধ
খালেদা জিয়া বলেন, ‘বর্তমান সংসদ জনপ্রতিনিধিত্বহীন এবং দেশ পরিচালনার ব্যাপারে সরকারের পেছনে জনগণের কোনো অনুমোদন নেই। যে সংবিধানের দোহাই দিয়ে এবং ক্ষমতার স্বার্থে সংবিধানের অপব্যাখ্যা ও অপব্যবহার করে এই নির্বাচনী প্রহসন আওয়ামী লীগ করেছে, তারা নিজেরাই প্রতি পদক্ষেপে সেই সংবিধান লঙ্ঘন করে চলেছে।’
‘কাজেই এ সরকার বৈধ সরকার নয়। একটি অবৈধ সরকারের কোনো দায়িত্ববোধ থাকে না জনগণের প্রতি। এমন একটি সরকার দীর্ঘায়িত হওয়া খুবই বিপজ্জনক।’
অভিযোগ
নির্বাচনের নামে তামাশার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে ৫ জানুয়ারিতে অন্তত ২২ নেতাকর্মীকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, ‘তফসিল ঘোষণার পর থেকে প্রায় ২’শ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া পাঁচ বছরে প্রায় ২২ হাজার মানুষকে খুন করা হয়েছে। কয়েক’শ নেতাকর্মীকে গুম করা হয়েছে। হাজার হাজার নেতাকর্মীর নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে তাদের আটক করা হয়েছে। সভা-সমাবেশ করতে গেলে গুলি চালানো হচ্ছে। সারাদেশের বিএনপির নেতাকর্মীদের বাড়িঘর আত্মীয়স্বজনদের ওপর সরকার নির্যাতন করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠাতা মজলুম জননেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে পর্যন্ত গৃহবন্দি করতে কুন্ঠিত হয়নি আওয়ামী লীগ। আওয়ামীলীগ এবারোএকই অপরাধ ও অপকর্ম করে যাচ্ছে, তবে একটু ভিন্ন পন্থায়। এবার তারা মুখে গনতন্ত্রের কথা বলে বিরোধী দলীয় নেতাকে কারন দর্শানো ছাড়াই গৃহবন্দি করেছে।’
দলের ভবিষ্যত চিন্তা
বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, সবকিছুর পরেও বিএনপি কখনো আওয়ামীলীগের অপকর্মের পূনরাবৃত্তি করবে না। জনগন তাদের ভোটাধিকার ফিরে পাবে। দেশে গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। এ সময় তিনি ভবিষ্যত করনীয় বিষয়ে একটি রুপরেখা উপাস্থাপন করেন।
অখণ্ড জাতীয় ঐক্য, ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য একটি স্থায়ী রুপরেখা, সাম্প্রদায়িকতা দমন, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সহযোগিতা ও বন্ধুত্ব আরো জোরদারসহ বেশ কিছু বিষয় তুলে ধরেন।
সংখ্যালঘু প্রসঙ্গ
খালেদা জিয়া বলেন, ‘প্রহসনের নির্বাচন থেকে জনগন ও বিশ্ববাসীর দৃষ্টি ফেরাতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ধর্মীয় সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সন্ত্রাসী হামলা শুরু করা হয়েছে। তিনি এর নিন্দা জানান।
তিনি বলেন, ‘সরকারের ইঙ্গিতে প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নির্বিকার ভূমিকায় ইতিমধ্যে অনেক জায়গায় নির্মম ও ন্যক্কারজনক হামলার ঘটনা ঘটে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে বিরোধী দলকে দায়ী করে অপপ্রচার শুরু এবং নিরাপরাধ নেতা-কর্মীদের ওপর অত্যাচারের মাত্রা বাড়ানো হয়েছে।’
বিএনপির নেতা-কর্মী ও নাগরিকদের এই ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িক হামলার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
খালেদা জিয়া বলেন, ‘এই সব জঘণ্য ও সুপরিকল্পিত হামলার ঘটনাকে পুঁজি করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের অপচেষ্টা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাচ্ছি। এ ধরণের ন্যক্কারজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি ও বিস্তার রোধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি করছি।’
তিনি বলেন, ‘এসব পদক্ষেপ নেয়া না হয়, তাহলে আগামীতে বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং প্রয়োজনবোধে জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থাকে সম্পৃক্ত করে উপযুক্ত তদন্তের মাধ্যমে সকল অপরাধীকে চিহ্নিতকরণ ও শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা করা হবে।’
বক্তব্যের শেষে একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে পূনরায় সমঝোতা ও সংলাপের আহ্বান জানান তিনি।