ময়নাতদন্ত রিপোর্টে আস্থার সংকট
Posted on December 4, 2014 | in জাতীয় | by ajkerkhabor.com
ঢাকা : প্রিয় মানুষটির অস্বাভাবিক মৃত্যু সবসময় পরিবার ও স্বজনদের সারা জীবনের কান্না হয়ে থাকে। সেই প্রিয় মানুষটির মৃত্যুর সঠিক কারণ না জানতে পারা কান্নার মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয়। আর এই সঠিক মৃত্যুরহস্য না জানতে পারার পেছনে থাকে অর্থের প্রভাব, রাজনৈতিক শক্তি এবং লাশের সঠিক আলাতম সংগ্রহ না করতে পারাসহ বিভিন্ন ব্যর্থতা। স্বজন হারানো পরিবারগুলোর এমনই দাবি। তবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রভাবিত করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ময়নাতদন্তের সঙ্গে জড়িত বিশেষজ্ঞরা। তাদের দাবি এটা কখনো সম্ভব না। এমনটা হবার কোনো প্রকার সুযোগ নেই।
সাম্প্রতিক সময়ে দুইজন স্বজনহারা পরিবারের পক্ষ থেকে ময়নাতদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। পরিবার দুটির আবেদনের প্রেক্ষিতে কবর থেকে নিহতদের লাশ তুলে পুনরায় ময়নাতদন্তের নির্দেশও দিয়েছেন আদালত। এরকম প্রায়ই ঘটছে। স্বজনহারা মানুষ ময়নাতদন্ত রিপোর্টে আস্থা হারিয়ে ফেলছেন। সমাজের ক্রমাগত দুর্নীতির কারণেই মানুষ কোনো কিছুতেই আস্থা রাখতে পারেছে না বলে সমাজবিজ্ঞানীদের অভিমত। তবে খুন-খারাবি নিয়ে রাজনীতি না করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। এতে সমাজে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে বলেও তারা মনে করছেন।
কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ধারাবাহিক নাটক ‘এইসব দিনরাত্রি’র টুনি চরিত্রের অভিনেত্রী নায়ার সুলতানা লোপা। স্বামী সন্তান নিয়ে তার সংসার। একদিন পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করেন। নিহতের মা রাজিয়া সুলতানার দাবি তার মেয়েকে খুন করে আত্মহত্যার নাটক সাজানো হচ্ছে। তিনি থানায় হত্যা মামলা দায়ের করলেন। কিন্তু ময়নাতদন্তে আসলো লোপা আত্মহত্যাই করেছেন। মায়ের বিশ্বাস তার মেয়ে আত্মহত্যা করতে পারে না। তাকে হত্যা করা হয়েছে। প্রথমবারের ময়নাতদন্ত রিপোর্ট চ্যালেঞ্জ করে ফের ময়নাতদন্তের আবেদন জানালেন আদালতে। তার ধারণা প্রভাব খাটিয়ে ময়নাতদন্ত রিপোর্ট আত্মহত্যা করা হয়েছে। তার আবেদনের প্রেক্ষিতে পুনঃময়নাতদন্তের জন্য কবর থেকে লোপার লাশ উত্তোলন করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টার দিকে রাজধানীর বনানী কবরস্থান থেকে লোপার লাশ উত্তোলন করা হয়। এ সময় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে গত ২৬ নভেম্বর ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) বিকাশ কুমার সাহা মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন করে পুনঃময়নাতদন্তের নির্দেশ দেন। আগামী ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে পুনঃময়নাতদন্তের প্রতিবেদন দাখিলেরও নিদের্শ দেন আদালত।
প্রসঙ্গত, গত ১৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় রাজধানীর গুলশানের শ্বশুরবাড়ি থেকে লোপার গলায় ফাঁস দেয়া লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। লোপার শ্বশুরের পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, দাম্পত্য কলহের জের ধরে তিনি আত্মহত্যা করেছেন। লোপার মা রাজিয়া সুলতানা শীর্ষ নিউজকে জানান, তার মেয়ে কখনো আত্মহত্যা করতে পারে না। তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। তিনি এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছেন।
অপরদিকে, সাবেক সংসদ সদস্য খান টিপু সুলতানের পুত্রবধূ ডা. শামারুখ মাহজাবীনের মৃত্যুকে কোনোভাবেই আত্মহত্যা মানতে নারাজ তার বাবা প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম। তিনি এটাকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড উল্লেখ করে ধানমন্ডি থানায় একটি হত্যামামলা দায়ের করেছেন। কিন্তু ময়নাতদন্ত রিপোর্টে মাহজাবীনের মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই রিপোর্ট তিনিও প্রত্যাখান করেছেন। তার দাবি মেয়েকে খুন করা হয়েছে। আদালত তার আবেদনের প্রেক্ষিতে লাশের পুনরায় ময়নাতদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
নির্দেশনানুযায়ী, আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১১ টার দিকে সিআইডি ঢাকা জোনের সহকারী পুলিশ সুপার এএসপি মুন্সি রুহুল হক, মাহজাবীনের বাবা প্রকৌশলী নুরুল ইসলামসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্যান্যদের উপস্থিতিতে মাহজাবীনের লাশ উত্তোলন করা হয়। আবার বিকেল ৩ টার দিকে পুন:ময়নাতদন্ত শেষ করে কারবালা কবরস্থানে লাশ দাফনও করা হয়।
প্রসঙ্গত ১৩ নভেম্বর রাজধানীর ধানমন্ডির ৬ নম্বর রোডের ১৪ নম্বর বাসা থেকে হলি ফ্যামিলি মেডিকেল কলেজের ইন্টার্ন ডা. শামারুখের লাশ উদ্ধার করা হয়। এ বাসায় মাহজাবীন তার শ্বশুর টিপু সুলতান, শাশুড়ি ডা. জেসমিন আরা ও স্বামী হুমায়ুন সুলতান সাদাব বসবাস করতেন। ১৪ নভেম্বর যশোরের কারবালা কবরস্থানে ডা. শামারুখের লাশ দাফন করা হয়।
মাহজাবীনের বাবা নুরুল ইসলাম ঘটনার পর থেকে অভিযোগ করে আসছিলেন, ময়নাতদন্তে হত্যাকা-কে আত্মহত্যা বলা হবে। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে মাহজাবীনের মৃত্যুর কারণও আত্মহত্যা হওয়ায় তার সেই অভিযোগ সত্য বলে প্রতিষ্ঠা পায়।
তবে স্বজনহারা মানুষের এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ডাক্তাররা। তাদের দাবি কারো কোনো প্রভাবেই ময়নাতদন্তের রিপোর্ট কেউ উল্টিয়ে বা ঘুরিয়ে লিখবে না।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সোহেল মাহমুদ শীর্ষ নিউজকে বলেন, ‘ময়নাতদন্ত রিপোর্ট আদৌ প্রভাব খাটিয়ে পরিবর্তন করা সম্ভব না। সবকিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যা পাওয়া যায় তাই আমরা লিখি। প্রতিটি মানুষের বিবেক আছে। একজন নিরাপরাধ মানুষকে ফাঁসানো আমাদের কাজ না। যা সত্য তাই লিখি।’
ডা. মাহজাবীনের মৃত্যুর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা ‘ক্লিন সুইসাইড’ কিন্তু বাস্তবতা তার বাবা মানতে চান না। গলায় ওড়নার বাঁধা গিটের দাগ। সেই ছবি ফেসবুকে দিয়ে মানুষকে প্রভাবিত করা চেষ্টা করছেন। মাহজাবীন প্রথমে হাতের রগ কেটে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাতে কাজ না হওয়ায় তিন গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। সমস্ত রিপোর্টে তাই পাওয়া গেছে। আমার সিনিয়ররাও তাই পেয়েছেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘এসব অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট কখনো প্রভাবিত করা সম্ভব না।’