April 20, 2026
ঢাকা: চিনি ও ভোজ্যতেলসহ ভোগ্যপণ্যের ব্যবসায় ঋণ দিতে অনীহা প্রকাশ করছে ব্যাংকগুলো। বড় প্রতিষ্ঠানের হাতে ভোগ্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ হয় বলে মাঝারি ব্যবসায়ীদের ঋণ দেয়া ধীরে ধীরে কমিয়ে আনছে তারা। এছাড়া ঋণ পরিশোধ না করে বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ীর আত্মগোপনে চলে যাওয়া, ভুয়া ক্রয়াদেশ দেখানো ইত্যাদি কারণে ব্যাংকগুলোর এ অনাগ্রহ তৈরি হয়েছে বলে জানা যায়। পাশাপাশি শিল্প-কারখানার কাঁচামালে ঋণ দিতেই বেশির ভাগ ব্যাংক আগ্রহ দেখাচ্ছে। এতে দুরবস্থার মধ্যে পড়েছেন মৌলভীবাজার ও চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের ভোগ্যপণ্যের ব্যবসায়ীরা। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, গত তিন-চার বছরে চিনি ও ভোজ্যতেলসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের দাম কমে আসে। এতে পণ্য কেনার পর ব্যবসায়ীরা আশানুরূপ লাভ করতে পারেননি। ফলে খাতুনগঞ্জের কয়েকটি বৃহৎ শিল্প গ্রুপ ব্যাংকঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়। ২০১১ সালে পরিবেশক আইন পাস করার পর দাম নিয়ন্ত্রণেও মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমতে শুরু করে। সারা দেশে ডিলার নিয়োগের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি শুরু হলে মৌলভীবাজার ও খাতুনগঞ্জে তাদের ব্যবসা সংকুচিত হয়ে পড়ে। তখন ভোগ্যপণ্য আমদানি নিয়ে ব্যাংক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে অস্থিরতাও দেখা দেয়। অনেক ব্যবসায়ী ব্যাংকঋণ পরিশোধ না করে আত্মগোপনে চলে যান। অনেক ব্যবসায়ীর ভুয়া বিক্রয় আদেশ জমা দেয়ার বিষয়টিও ধরা পড়ে। ফলে ব্যাংকের সঙ্গে তাদের দূরত্ব সৃষ্টি হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে পণ্য আমদানিতে ঋণ দেয়ার বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নেয় ব্যাংকগুলো। শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি ব্যাংক ভোগ্যপণ্যের এলসি খোলা কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের চট্টগ্রাম কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিভাগে ৭৯৫টি এলসির বিপরীতে ভোগ্যপণ্য আমদানি হয়েছিল ১০ লাখ ৪৮ হাজার ৪৪৮ টন। চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন পর্যন্ত ৭৫০টি এলসিতে ভোগ্যপণ্য আমদানি হয়েছে ১০ লাখ ৭২ হাজার ৫২৪ টন। দুই বছরে ভোগ্যপণ্যের চাহিদা বাড়লেও খাদ্যপণ্য আমদানি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বাড়েনি। খাতুনগঞ্জের আইএফআইসি ব্যাংকের কয়েক বছরের ভোগ্যপণ্যে এলসির পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৭৭৪ কোটি টাকার ভোগ্যপণ্য আমদানির এলসি খোলে। ২০১৩ সালে খোলে ৩৪৬ কোটি টাকার এলসি। আর ২০১৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ব্যাংকটিতে মাত্র ২৯৪ কোটি টাকার এলসি খোলা হয়েছে। ইসলামী ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. জামাল উদ্দিন বলেন, ইসলামী ব্যাংক কয়েক বছর আগে ভোগ্যপণ্য আমদানিতে বিনিয়োগ করলেও বর্তমানে তা বন্ধ রয়েছে। মূলত দেশের শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শিল্প কাঁচামাল আমদানি কার্যক্রমে কাজ করছে এ শাখা। খাতুনগঞ্জের আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভোগ্যপণ্য আমদানি বাণিজ্যে লোকসানের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো এ খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ হারিয়েছে। বিপরীতে শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে ঋণ দিতে বেশি আগ্রহী তারা।
মৌলভীবাজারের ব্যবসায়ী ও ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, গত কয়েক বছরে কয়েকজন ব্যবসায়ীর বিপুল অঙ্কের টাকা নিয়ে আত্মগোপন করা এবং পণ্যের দাম ক্রমাগত কমতে থাকায় আগের রমরমা ব্যবসা আর নেই। ঋণের টাকা সময়মতো পরিশোধ না করায় দুই পক্ষের সম্পর্কে ফাটল ধরেছে। অনেক ব্যাংক এখন পুরনো ঋণ তুলতে ব্যস্ত।
এ বিষয়ে মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা বলেন, আগে বিক্রয় আদেশের (এসও) বিপরীতে ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া যেত। কিন্তু নকল বিক্রয় আদেশের মাধ্যমে ঋণ নেয়ার বিষয়টি ধরা পড়ায় ব্যাংকগুলো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তারা আগের মতো আর ঋণ দিচ্ছে না।
ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের মৌলভীবাজার শাখা ব্যবস্থাপক হাবিবুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, মৌলভীবাজারে এখন আর আগের মতো মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ নেই। তাদের হাতে লেনদেনও বহুলাংশে কমে গেছে। চিনি ও ভোজ্যতেল ব্যবসায়ীদের এখন ঋণ দেয়াও কমিয়ে আনা হয়েছে। যাদের কাছে ঋণের টাকা পাওনা রয়েছে, তা পরিশোধে চাপ দেয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, একসময় চিনি ও ভোজ্যতেলসহ ভোগ্যপণ্য ঢাকার মৌলভীবাজার ও চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ থেকে সারা দেশে বিতরণ করা হতো। মিলাররা পণ্য আমদানি করলেও তা দুই বাজারের ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে বিক্রি করতেন। এতে ভোগ্যপণ্যের বাজারে দাম ওঠানামা মূলত তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। পরিবেশক আইন পাস হলে পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করে।
সম্প্রতি মৌলভীবাজারে গিয়ে দেখা যায়, এখানে ভোগ্যপণ্যের মাঝারি ব্যবসায়ীদের আগের মতো আনাগোনা নেই। অনেকে আবার ব্যবসা পরিবর্তনের কথাও ভাবছেন। ক্রমাগত লোকসানের কারণে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসাও বন্ধ হওয়ার পথে।