পৃথিবীকে জেনে নিন আপনার ভাষায়….24 Hrs Online Newspaper

‘ভাত দে’

Posted on June 19, 2017 | in নির্বাচিত কলাম | by

কথায় বলে, মাছে ভাতে বাঙালি। আমরা বাঙালি জাতি দুবেলা পেট পুরে খেতে পারলেই হলো। এর বেশি কিছু সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো চায় না। সরকার সেই প্রতিশ্রুতিই দিয়েছিল আমাদের। দাম বেশি হলেও এতদিন সেই মতই চলছিল। মানুষের খুব একটা অভাবে পড়তে হয়নি। কিন্তু সম্প্রতি চিত্রটা একটু ভিন্ন মনে হচ্ছে বৈকি!
গণমাধ্যম থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে চালের দাম। ফলে নিম্ন আয়ের মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। সহসাই যে কমছে না সেই বিষয়টাও অনেকটা নিশ্চিত। সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর ২০০৭ ও ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মোটা চালের কেজি ৪০ টাকা এবং সরু চালের কেজি ৫৬ টাকায় উঠেছিল। নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জসহ দেশের ছয় জেলায় বন্যা ও অতিবৃষ্টিতে হাওরের ধান নষ্ট হয়ে যাওয়ার ইস্যুকে পুঁজি করে বাড়তে থাকে চালের দাম। এরপর থেকে আর স্থিতিশীল হয়নি চালের বাজার। এখন বাজারে ৫০ টাকার নিচে কোনও মোটা চাল নেই। ৬৫ টাকার নিচে পাওয়া যায় না ভালো মানের চিকন চাল। আমি বেশ কয়েকবার মুদি দোকানে গিয়ে ফিরে এসেছি। আশা দাম একটু কমলে কিনবো। কিন্তু দিনদিন সেটা বাড়তির দিকে। চালের দাম বেশি বেড়েছে গত পাঁচ মাসে। প্রতিমাসেই সব ধরনের চালের দাম কেজিপ্রতি বেড়েছে ২ থেকে ৩ টাকা করে। তবে সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো চালের দাম বাড়ার কারণ জানেন না কেউ। সরকার স্বীকারই করতে চায় না যে চালের দাম ক্রেতার নাগালের বাইরে চলে গেছে। চালের দামকে কেন্দ্র করে অন্য সব নিত্যপণ্যের দামও বেড়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়তে হচ্ছে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষকে। তারা হিমশিম খাচ্ছেন সংসার চালাতে। বিপাকে পড়েছে আমার মতো মধ্যবিত্ত শ্রেণিও। তবে লোকলজ্জার ভয়ে এ বিষয়ে কিছু বলাও যাচ্ছে না।

চালের দাম বাড়া নিয়ে কোনও স্পষ্ট বক্তব্যও পাওয়া যাচ্ছে না। জাতীয় সংসদে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেছেন, ‘মোটা চাল উৎপাদনের কৃষক আগ্রহ হারাচ্ছেন। চালের দাম রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর বিষয় তাই এ বিষয়ে ঝুঁকি নিয়ে এগুতে হচ্ছে।’ আমাদের দেশে সমস্য গভীর হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ধরা হয়, জনগণকে সঠিক তথ্য না দেওয়া এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সবকিছুতে সরকারের সমালোচক বা বিরোধী পক্ষকে দোষারোপ করা। খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বারবার তার বক্তব্যে বলছেন, ‘চালের দাম বাড়ানোর বিষয়ে বিএনপিপন্থী ব্যবসায়ীদের ষড়যন্ত্র রয়েছে।’ অন্যদিকে, বিশ্বে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি চালের দাম উল্লেখ করে বিএনপি নেতা রুহুল কবীর রিজভী বলেছেন, ‘ক্ষমতাসীনদের বাণিজ্যিক সিন্ডিকেটের কারণে চালের দাম বেড়েছে।’ কোনটা যে সত্য আমজনতা জানে না।

রাজধানীর বাজারে নতুন বোরো চাল আসতে শুরু করলেও দাম পুরনো চালের মতো চড়া। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ‘এ বছর ধানের দাম বেশি, তাই চালের দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমার সম্ভাবনা কম।’ বেসরকারি খাতে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে মিয়ানমার থেকে চাল আমদানি শুরু হয়েছে। স্থলবন্দর দিয়েও ভারত থেকে চাল আমদানি হচ্ছে। তবে নানা কারণে চাল আমদানির পরিমাণ খুবই কম। কয়েকমাস ধরে সরকারি ভাবে বিভিন্ন দেশ থেকে চাল আমদানির কথা শোনা গেলেও এখনও এক কেজিও চালও দেশে এসে পৌঁছেনি। কবে নাগাদ ওই চাল দেশে আসবে দায়িত্বশীল কারো কাছে সেই প্রশ্নের জবাব নেই। অনেকে উল্টো কথাও বলছেন, সরকারের পক্ষ থেকে ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডে যোগাযোগ করেও নাকি চাল পাওয়া যায়নি। বিষয় যাই হোক না কেন সেটা জনগণের জানার অধিকার রয়েছে। কতদিন তাদের এই বাড়তি টাকার বোঝা বইতে হবে সেটাও জানা দরকার। এছাড়া কেউ সিন্ডিকেট করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চাইলেও সেটার সমাধান হওয়া জরুরি। সমস্যা নিয়ে বসে থাকলে হবে না, সেটা যতো দ্রুত সমাধান করা যায় ততোই জনগণের মঙ্গল। কারণ নিত্যপণ্যের দাম যে হারে বাড়ছে সে হারে বাড়ছে না আয়। অনেকে ভাত খাওয়া কমিয়ে দিয়েছেন। চাল এখনও আমাদের খাদ্যতালিকার প্রধান খাদ্য। এর দাম বাড়লে নিম্ন আয়ের মানুষেরা দৈনিক খাদ্যের পরিমাণ ঠিক রাখতে গিয়ে অন্যান্য খরচ কমিয়ে ফেলেন। অথবা অনেক সময় দেনাও করতে হয়। ফলে চালের দাম বাড়লে অবধারিতভাবে যে প্রভাব পড়ে তাতে বেঁচে থাকাটাই কঠিন সংগ্রামের। আর্থিক অনটনের কারণে নিজের সন্তানকে হত্যার পর নিজেও আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে তুরাগে। যদিও এটা পুলিশের ধারণা। এদিকে, দেশীয় বাজারে চালের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে গেলেও শুল্ক আগের মতোই রয়েছে। যেহেতু বাজারে কিছু সঙ্কট, পাশাপাশি কিছু প্যানিক রয়েছে, চাল আমদানিতে বর্তমান ট্যারিফ তুলে দিলে আর ভারত থেকে পর্যাপ্ত চাল এলে দাম আবার কমতে শুরু করবে। সরকারি দল আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক হাছান মাহমুদও সেই অনুরোধ জানিয়েছেন।

খাদ্যমন্ত্রী সবশেষ আবারো বলেছেন, দাম বাড়বে না, কমে আসবে। খাবারের অভাব হবে না। আমরা এই কথায় আস্থা রাখতে চাই। তাহলে দাম বাড়ার পেছনে নিশ্চয় কোনো অদৃশ্য শক্তি কাজ করছে। সেটা খুঁজে বের করা জরুরি। পরস্পরকে দোষারোপ না করে সমস্যা সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া উচিত। নইলে হয়তো সরকারকে নিয়ে বিরোধীরা ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করতে ছাড়বে না। যেমনটি করেছিল ২০০৭-০৮ সালে।

লেখক: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক

Comments are closed.

সর্বশেষ খবর

আজকের ছবি

www.facebook.com

Tag Cloud