April 18, 2026
নিউজ ডেস্ক: সেই ১৮৭৭ সালে মেলবোর্নে অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ড দ্বৈরথের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল টেস্ট ক্রিকেটের যাত্রা। এরপর গত ১৩৮ বছরে টেস্ট ক্রিকেট বারবার নিজেকে পরিবর্তন করেছে, বা বলা ভালো এই সময়ে অনেক বিবর্তনের মধ্য দিয়েই টেস্ট ক্রিকেট আজকের এই অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রশ্ন আসতে পারে, কি কি পরিবর্তন এসেছে?

সেক্ষেত্রে পাল্টা প্রশ্ন করা যায়, কি কি পরিবর্তন আসেনি? টেস্ট ক্রিকেট পরিবর্তিত হয়েছে প্রায় প্রতি যুগেই; সময়ের দাবিতে, সময়ের হাত ধরেই নতুন অনেক কিছুই দেখেছে টেস্ট ক্রিকেট। একসময় টেস্ট ম্যাচ হতো কোন নির্দিষ্ট সময়সীমা ছাড়াই, চার বলে হতো এক ওভার। এমনকি পিচ ঢেকে রাখার ব্যাপারটাও ১৩৮ বছরের তুলনায় ‘এইতো সেদিন’ এসেছেই বলা যায়। পুরোনো অনেক কিছুকে ঝেড়ে ফেলে ক্রিকেট স্বাগত জানিয়েছে অনেক নতুনকে।
তবে সব নতুনত্বকে টেস্ট ক্রিকেট স্বাগত জানায়নি। অনেক নতুনত্ব স্থায়ী হয়েছে, অনেকগুলো আবার বাতিলও হয়ে গেছে। কিন্তু স্থায়ী হওয়া সেই নতুনত্বগুলোর ফলে টেস্ট ক্রিকেট নিজের জৌলুস হারায়নি এতটুকুও। বরং এখনো ক্রিকেট ভক্তদেরকে সবচেয়ে রোমাঞ্চ দেয় এই টেস্ট ক্রিকেটই। আর এবার, সম্ভবত রোমাঞ্চে একটু বাড়তি অনুষঙ্গ যোগ করতেই টেস্ট ক্রিকেটে আসতে চলেছে আরো একটু নতুনত্ব।
এখন থেকে প্রায় সাত বছর আগে ভাবনাটা প্রথম এসেছিল ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার সিও জেমস্ সাদারল্যান্ডের মাথায়, কৃত্রিম আলোতে টেস্ট ক্রিকেট খেলার ভাবনা। আর আনুষ্ঠানিকভাবে এই ভাবনাটা নিয়ে কথাবার্তা শুরু হয়েছিল ২০০৯ সালে। সে বছরের জুলাইতে লর্ডসে অনুষ্ঠিত এমসিসি ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট কমিটির সভায় দিবা-রাত্রির টেস্ট আয়োজনের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ কিছু আলোচনা হয়। টি-টুয়েন্টি আর ওয়ানডে’র জনপ্রিয়তার যুগে টেস্ট ক্রিকেটে আরো দর্শক টানতেই কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এরকম কিছু একটা করার। এবং প্রথম দিবা-রাত্রি’র টেস্টের জন্য ইংল্যান্ডের প্রতিপক্ষ হিসেবে কমিটি’র প্রথম পছন্দ ছিল বাংলাদেশ।
সেই সভা শেষে এমসিসি’র হেড অফ ক্রিকেট জন স্টিফেনসন বলেছিলেন, ‘আমরা আগামী বছর বাংলাদেশের বিপক্ষে এখানে একটা (দিবা-রাত্রি) ম্যাচ আয়োজন করার আশা করছি।’
ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস্ ক্রিকেট বোর্ড (ইসিবি)-এর পক্ষ থেকে সে বছরের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) কাছে প্রস্তাব আসে ২০১০-এর মে-জুনে বাংলাদেশের ইংল্যান্ড সফরের সময় একটা দিবা-রাত্রির টেস্ট খেলার। বিসিবি সেই প্রস্তাবে রাজিও হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই ম্যাচ আর দিবা-রাত্রির টেস্ট হিসেবে মাঠে গড়ায়নি। কেন গড়ায় নি, সেই প্রশ্নের উত্তরটা অজানা!
এরপর গত বছর চারেক সময়ে দিবা-রাত্রির টেস্টের চেয়েও অনেক বেশি তর্ক-বিতর্ক হয়েছে সেই ম্যাচের জন্য প্রস্তাবিত গোলাপী বল নিয়ে। এমনকি খোদ ক্রিকেটারদের মধ্যেও গোলাপী বল নিয়ে অনেক দ্বিমত ছিল সবসময়ই। অনেকেই স্বাগত জানিয়েছেন, কিন্তু অনেকে আবার শংকা প্রকাশ করেছেন। কৃত্রিম আলোতে গোলাপী বল কতটুকু দৃশ্যমান হবে, ব্যাটসম্যান বা ফিল্ডারদের এই বল কোনরকম সমস্যায় ফেলবে কিনা এইসব নিয়ে সংশয় ছিল বরাবরই।
কিন্তু, ক্রিকেট সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান কোকাবুরা’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্রেট এলিয়ট সেই শুরু থেকেই বলে আসছেন, গোলাপী বল নিয়ে তারা নানারকম পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন। তিনি এও বলেছেন, সাদা বা লাল বলের মতোই গোলাপী বলও ধীরে ধীরে ক্রিকেটের উপযোগী হয়ে উঠবে।
তবু বিতর্ক চলছেই। নিউজিল্যান্ডের সাথে গত মাসেই অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী একাদশের খেলায় ব্যবহৃত হয়েছিল গোলাপী বল। আর সেই ম্যাচ খেলা দুই অজি খেলোয়াড় অ্যাডাম ভোজেস আর জশ হ্যাজলউড দু’জনই গোলাপী বল নিয়ে দিয়েছিলেন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া। আর তৃতীয় টেস্টের আগের প্রস্তুতি ম্যাচে ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অপরাজিত সেঞ্চুরি করা নিউজিল্যান্ড ওপেনার মার্টিন গাপটিল গোলাপী বলকে বলেছেন ‘গুড এনাফ’। গাপটিলের দাবি, ব্যাটিং করার সময় এই গোলাপী বলে কোন সমস্যা হচ্ছে না। তবে ফিল্ডিংয়ের সময় এই বল কিছুটা সমস্যা করছে বলেও জানান গাপটিল। যদিও অস্ট্রেলিয়ান ঘরোয়া ক্রিকেটে বেশ কয়েকবারই ব্যবহৃত হয়েছে গোলাপী বল।
সাবেক অনেক ক্রিকেটারও গোলাপী বল এবং ডে-নাইট টেস্টের ব্যাপারে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। সাবেক অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক রিকি পন্টিং, সাবেক শ্রীলঙ্কান ব্যাটসম্যান মাহেলা জয়াবর্ধনে, ইংল্যান্ড ব্যাটসম্যান কেভিন পিটারসেনরা এই দিবা-রাত্রি টেস্টের ঘোর বিরোধী। তবে অস্ট্রেলিয়ান কোচ এবং সাবেক অস্ট্রেলিয়ান খেলোয়াড় ড্যারেন লেহম্যান, সাবেক অজি অধিনায়ক মার্ক টেলর, স্টিভ ওয়াহ্ এই নতুন ধরণের টেস্ট ক্রিকেটকে স্বাগতই জানাচ্ছেন।
তবু এইসব কিছুর পরেও আগামী ২৭ তারিখ অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড টেস্ট সিরিজের তৃতীয় ম্যাচের মাধ্যমেই মাঠে গড়াচ্ছে ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম দিবা-রাত্রির টেস্ট। শংকা বা তর্ক-বিতর্ক যাই থাকুক, দুই দলের খেলোয়াড়েরাই দিবা-রাত্রির টেস্ট নিয়ে বেশ রোমাঞ্চিত।
আর দিবা-রাত্রির এই টেস্ট নিয়ে খোদ আইসিসি সভাপতি, সাবেক পাকিস্তানী ব্যাটসম্যান জহির আব্বাসের উচ্ছ্বাসও দেখার মতো। ক্যারি প্যাকারের বিখ্যাত ওয়ার্ল্ড সিরিজে প্রথমবারের মতো কৃত্রিম আলোয় খেলা হয়েছিল একদিনের ক্রিকেট ম্যাচ। সেই সিরিজে খেলা জহির আব্বাসের দাবি, ৩৮ বছর ধরে চলে আসা দিবা-রাত্রির ওয়ানডে ক্রিকেটের মতো দিবা-রাত্রির টেস্ট ক্রিকেটের আয়োজনও একটি ভালো সিদ্ধান্ত। আইসিসি ওয়েবসাইটে নিজের লেখা কলামে তিনি এটাকে খুবই সময়োপোযোগী সিদ্ধান্ত দাবি করে বলেছেন, এর মাধ্যমে কর্মজীবী মানুষ বা স্কুল পড়ুয়ারা নিজেদের সুবিধাজনক সময়ে ক্রিকেট দেখার সুযোগ পাবে।
তার এই কথার সত্যতাও অবশ্য মিলছে ইতিমধ্যেই। ইতিহাসের প্রথম দিবা-রাত্রির ম্যাচের টিকেট বিক্রি হচ্ছে দেদারসে। টিকেট বিক্রির হার দেখে কর্তৃপক্ষ বলছে, দিবা-রাত্রির এই টেস্ট নিয়ে প্রতিবেশী দুই দেশ অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড-এর মানুষ যে আগ্রহ দেখাচ্ছেন, তার সাথে তুলনা চলতে পারে অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডের ঐতিহাসিক দ্বৈরথ অ্যাশেজের সাথে।
সাউথ অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট এসোসিয়েশনের প্রধান কিথ ব্র্যাডশ’ বলেছেন, তারা এডিলেড টেস্টে রেকর্ড পরিমাণ দর্শকের ব্যাপারে আশাবাদী এবং প্রথম দিনেই প্রায় ৪০,০০০ দর্শক আসবে বলেও ধারণা করছেন তারা। যদি সেটাই হয়, তাহলে তা ছাড়িয়ে যাবে ২০১৩ এশেজের এডিলেড টেস্টের প্রথম দিনের দর্শকসংখ্যাকেও। সিরিজের আগের দুই টেস্টে দর্শক হয়েছিল প্রায় একলাখের মতো, এরচেয়ে অনেক বেশি মানুষই যে ইতিহাসের প্রথম ডে-নাইট টেস্টের সাক্ষী হতে চাইবে তাতে আর আশ্চর্য কি?
শুরুর আগেই খেলোয়াড়, দর্শক সবাইকেই ইতিমধ্যে রোমাঞ্চিত করছে এই ‘নতুন’ টেস্ট ক্রিকেট। অন্য অনেক নতুনের মতো কৃত্রিম আলোয় টেস্ট খেলার এই নতুন ধারণাটা স্থায়ী হয় কিনা সেটা সময়ই বলে দেবে। তবে ফ্লাডলাইটের উজ্জ্বল আলোকছটায় টেস্ট ক্রিকেট যদি আরো সুন্দর রুপে ক্রিকেটপ্রেমীদের চোখে ধরা দেয়, তবে সেটাই হবে এই নতুনত্বের সবচেয়ে বড় পাওয়া। প্রিয়