May 18, 2026
দিনটি ছিল ১৫ আগস্ট শুক্রবার ১৯৭৫। ছোট বোন শুশুমার দরজা ভাঙা করাঘাতে ঘুম ভেঙেছিল। কত আর হবে ঘড়ির কাঁটা সাড়ে পাঁচ পার করতে পারেনি। কথা ছিল একটু দেরিতে উঠব। কিন্তু বাজ পড়ার মতো ছোট বোনের চিৎকারে দরজা খুলে বলি, কী হয়েছে? প্রশ্নের স্বাভাবিক উত্তর দিতে পারেনি। শুধু বলেছিল রহিমা আপা ফোন করেছেন। সেনাবাহিনী ক্যু করেছে। তারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে। ধমকে উঠেছিলাম চুপ কর, এসব কী বলিস্ত একটু আগেই তো তাকে দেখে এসেছি।
ছুটে গিয়ে রেডিও খুলেছিলাম। সত্যি, কে যেন নিজেকে ডালিম বলে বার বার বলছে ‘স্বৈরাচার মুজিব সরকারের পতন হয়েছে। দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে।’ ডালিমকে দূর থেকে দেখেছি বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে খুব যাতায়াত করত। ভীষণ বিরক্ত হতাম। বিরক্ত হতাম এই জন্য যে কেউ রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর বাড়িতে অবাধে যাতায়াত করলে, রাষ্ট্রপতির স্ত্রীকে মা, খালা বলে ডাকলে সে সেনাবাহিনীর সিনিয়রদের কথা শোনে না। কোনো জায়গায় দু-চার দিন কাটিয়ে বাড়ি ফিরলে ছোট ভাই-বোনেরা যেমন ছুটে এসে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত, তেমনি জামাল, রাসেল, রেহানাকে ডালিমের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখেছি। ডালিম যে সেনাবাহিনীর লোক ‘৭৫-এর আগে জানতাম না। গাজী গোলাম মোস্তফার ছেলের সঙ্গে গোলমালের আগে তার সম্পর্কে আমার তেমন কিছুই জানা ছিল না। মনে করতাম কোনো আৎদীয়স্বজন হবে। যদি বুঝতাম সে সেনাবাহিনীর লোক, তাহলে পাছায় দুই ঘা মেরে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি থেকে বের করে দিতাম। এখনকার মতো তখন রাস্তার মানুষ ছিলাম না। অমন কারও পাছায় ঘা লাগালে আসমান ভেঙে পড়ত না।
বার বার ঘোষণা শুনে কিছুটা দিশাহারা হয়েছিলাম। মা পিজি হাসপাতালে। আজাদ, মুরাদ, শাহানা খুবই ছোট, রহিমার অল্প কিছু দিন বিয়ে হয়েছে। জেলা গভর্নরদের মাসব্যাপী ট্রেনিং শেষ। সেদিন আমরা মন্ত্রণালয়ে যাব, মন্ত্রীরা কীভাবে দফতর চালান তা দেখে তাদের সঙ্গেই খাবার খেয়ে রাতে বাড়ি ফিরব। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু সেই কবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন সেদিন সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর হিসেবে যাবেন। কিন্তু এক নিমিষে সব এলোমেলো হয়ে গেল। আর যাওয়া হলো না।
বাড়ি থেকে ঝটপট বেরিয়ে ছিলাম। সারা জীবন বিপদকে বিপদ মনে করিনি, ধীরস্থিরভাবে কাজ করেছি। কত যুদ্ধ, কত বিগ্রহ গেছে কোনো কিছুতে ভয় পাইনি। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর হত্যার সংবাদ কিছুক্ষণের জন্য হলেও এলোমেলো করে দিয়েছিল। বাবর রোড থেকে বেরিয়ে ফোন করেছিলাম সৈয়দ নজরুল ইসলাম, জনাব আবদুল মান্নান, ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে। একমাত্র মনসুর ভাই ছাড়া আর কেউ ভালো উত্তর দেননি। সময়টা স্বাভাবিক ছিল না, তাই তাদের ভেঙে পড়ায় কিছু মনে করিনি। তখনই কয়েকজন সহকর্মী নিয়ে ছোট্ট একটি লিফলেট বের করেছিলাম, ‘খুনিরা কামাল, জামাল, রাসেলকে হত্যা করতে পারলেও বঙ্গবন্ধুকে নির্বংশ করতে পারেনি। আমি কাদের সিদ্দিকী তার চতুর্থ সন্তান। পিতৃহত্যার বদলা আমরা নেবই, নেব।’ ঢাকাসহ বহু জায়গায় লিফলেটটি ছড়িয়ে পড়েছিল। খুনিরা হন্যে হয়ে আমায় খুঁজছিল। তবু যতটুকু সম্ভব যোগাযোগ করছিলাম। কিন্তু যাদের কাছে আশা করেছিলাম তারা বেশিসংখ্যক খেদ ব্যক্ত করছিল। নানা অভিযোগ তুলছিল। কেউ হাত উঁচিয়ে বলেছিলেন, খন্দকার মোশতাকই তাদের আসল নেতা। তবে যাদের কাছে তেমন কিছু আশা করিনি তারা সাড়া দিয়েছিলেন অসাধারণ। পাঁচ দিনের দিন মায়ের দোয়া নিয়ে ধানমন্ডির জনাব আর এ গণির বাড়ি থেকে সীমান্তের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়েছিলাম। প্রায় দেড় দিন না খেয়ে যখন সীমান্তে পৌঁছি তখন চলৎশক্তি ছিল না। মনে হয় আজো আর সেই শক্তি ফিরে পাইনি। তখন থেকে এখন পর্যন্ত গঙ্গার পানি কত গড়িয়েছে কোনো হিসাব নেই। যারা প্রতিবাদ করেছেন, জীবন দিয়েছেন, তারা আজ নিন্দিত। আর যারা তার রক্তের ওপর ক্ষমতার সৌধ নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন তারাই নন্দিত।
১৫ আগস্ট মহান ভারতের স্বাধীনতা দিবস। কত ধুমধাম, কত আনন্দ! কিন্তু সেই ১৫ আগস্টই আমাদের মহাবিপর্যয়ের দিন। বাঙালির হৃদয়ের এক মহা রক্তক্ষরণ। পৃথিবীর কত দেশে কত রক্তারক্তি হয়েছে, কত রাজা-বাদশা-সম্রাট সিংহাসনের জন্য কত খুন করেছেন, কতজন কত রক্ত ঝরিয়েছেন, কত জাতি কত মানুষ কত রক্ত দিয়েছে। কিন্তু বেদনার দাগ কোথাও এত দিন থাকেনি। সেই কবে ‘৭৫-এর ১৫ আগস্ট শুক্রবার সুবহে সাদিকে ঘাতকের হাতে বাংলার রাখাল রাজা জীবন দিলেন সেই বেদনার দাগ আমার হৃদয় থেকে আজো মুছল না। কত বড় সে দাগ যা এখনো গভীর হয়ে আছে। বাবা নেই, মা নেই, ব্যথা পাই কিন্তু তবু তা সইতে পারি। কিন্তু যার সঙ্গে তেমন কোনো রক্তের সম্পর্ক ছিল না, দেনা-পাওনা ছিল না, হয়তো দশ-বিশবার পাশে বসে খেয়েছি, দু-চারবার যতœ করে খাইয়েছি, ওইটুকুই। এখন তো সবই অর্থ আর সম্পদের সম্পর্ক। কিন্তু আমাদের তা ছিল না। বড় হওয়ার আগে তিনি আর কত দিয়েছেনথ এক-দেড় হাজার। স্বাধীনতার পর দু-তিন হাজার। স্বাধীনতার পর আমিও বড় হয়েছিলাম, আমারও সামর্থ্য ছিল। নেতার হুকুমে কত জনকে কত সাহায্য করেছি। আজো মনে আছে ভৈরবে এক দরিদ্র কর্মীকে ঘর-দুয়ার, গরু-বাছুর, কাপড়-চোপড় ও অন্যান্য কত কিছুর ব্যবস্থা করেছিলাম। আমাদের সম্পর্কটা স্বার্থের ছিল না, ছিল হৃদয়ের, ছিল বিশ্বাস ও ভালোবাসার।
বাংলার ছেলে-মেয়েরা সবাই যৌবনে প্রেম করে। আমি এক অভাগা, সেই বয়সে একবারের জন্যও প্রেমের অনুভূতি অনুভব করিনি। হঠাৎ দেশপ্রেমে পুলকিত হয়ে দুর্বার গতিতে দেশ উদ্ধারে ঝাঁপিয়ে পড়ি। আইয়ুববিরোধী মিছিল করে চেপচেপা ঘামে রাস্তার পাশে কোথাও দাঁড়ালে কেউ যখন মাথায় হাত বুলিয়ে বলত বাবা বেঁচে থাক, সব ক্লান্তি মুহূর্তেই দূর হয়ে যেত। সেই প্রত্যন্ত অঞ্চলে ১৫-২০ মাইল হেঁটে গিয়ে তারস্বরে আইয়ুব খানের নির্যাতন-অত্যাচার-অবহেলার বিরুদ্ধে বক্তৃতা করে মঞ্চ থেকে যখন নামতাম, তখন কোনো খুনখুনে বুড়ো বুকে চেপে যদি বলত বাবা আমার মনের কথা বলেছ, বেঁচে থাক, ভালো থাকথ তখন খাওয়া-নাওয়ার কথা সব ভুলে যেতাম। জাগতিক কোনো চাওয়া-পাওয়ার কথা মনে থাকত না। মন-প্রাণ পড়ে থাকত কী করে পাকিস্তানি বঞ্চনার নাগপাশ থেকে দেশকে, দেশের মানুষকে মুক্ত করা যায়। এক ঘোর নেশায় মাতোয়ারা ছিলাম। যে কারণে হয়তো বিড়ি, সিগারেট, গাঁজা, ভাং, ফেনসিডিল আসর করতে পারেনি।
মাঝেমধ্যে শুনি কেউ যখন বলে ‘সাত্তার ভাই এগিয়ে চল/ আমরা আছি তোমার পিছে, সোহেল ভাই এগিয়ে চল/আমরা আছি তোমার পিছে’থ তখন তাদের নাকি হুঁশ থাকে না। মাথা খারাপ হয়ে যায়। অথচ সারা জীবনে একবারও মনে হলো না কেউ কোথাও বলেছে কাদের ভাই এগিয়ে চল/আমরা আছি তোমার পিছে। নাকি অনেক অনেকবার বলেছে, কান বধির হওয়ায় শুনতে পাইনি। তাই কোনো দিন মাতোয়ারা হইনি। যখন যৌবন তখন যার শক্তি-সাহস আকর্ষণ করেছিল, তিনি ছিলেন শেখ মুজিব। তিনি আমায় বলে-কয়ে তার ভক্ত-অনুরক্ত করেননি। তাকে বার বার পাকিস্তানিদের নির্যাতনই আমাকে ভক্ত করেছিল। আমি সাধকদের গুরুভক্তির বিধিবিধান জানি। সেই অর্থে বঙ্গবন্ধুর কাছে সরাসরি তেমন কিছুই পাইনি বরং হুজুর মওলানা ভাসানী অনেক দিয়েছেন। কিন্তু অনেক সময় মনে হয় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার একটা রুহানি যোগাযোগ আছে। সেই যোগাযোগের কারণেই হয়তো এত দিন পরও তার অভাবের ব্যথা হৃদয় থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারি না। জানি না আর কত দিন এপারে থাকব, ওপারে গেলেই তো দেখা হবে। যত অপরাধই করে থাকি আমার পরম প্রভু এইটুকু দয়া করবেন না? নিশ্চয়ই করবেন।
১৭৫৭ সালের ২৩ জুন ভাগীরথীর কূলে পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে পরাজিত করে ইংরেজ বেনিয়ারা বাংলা তথা বাঙালির স্বাধীনতা হরণ করেছিল। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে সেই স্বাধীনতার লাল সূর্য আমরা ছিনিয়ে এনেছি ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। সেই ‘৭১-এর রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক নির্বল ঘুমন্ত বাঙালির শৌর্য-বীর্যের মূর্তপ্রতীক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেখা পেয়েছিলাম ১৯৫৭ সালের ৬-৭ ফেব্র“য়ারি কাগমারীতে হুজুর মওলানা ভাসানীর মহাসম্মেলনে। আমি সেদিন থেকেই তাকে চিনেছিলাম। কিন্তু তিনি আমায় চিনেছেন তারও অনেক পরে। ‘৫৮ সালে আইয়ুব খান মার্শাল ল জারি করে আমাদের গোলাম করে রেখেছিলেন। ‘বুনিয়াদি গণতন্ত্র’ নামে এক আজব পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন। সেই পদ্ধতির এক নির্বাচনে ‘৬২ অথবা ‘৬৩ সালের দিকে বাসাইল যাওয়ার অথবা ফেরার পথে শেখ মুজিব আমাদের বাড়ি গিয়েছিলেন। সেদিন থেকেই চেনা। আমার চোখে কবে পড়েছেন তা তো হলফ করে বলতে পারি। কিন্তু তার চোখে আমি কবে পড়েছিলাম তা বলা মুশকিল। ‘৬৯-এর পরের দিনগুলো ছিল কর্মচাঞ্চল্যে ভরা। আন্দোলনের চাপে কোনো অবসর ছিল না। তখনকার দিনে ঘড়িতে তবু দিনে একবার চাবি দিতে হতো। আমাদের তাও দিতে হতো না। পাকিস্তানের বঞ্চনার হাত থেকে মুক্তির জন্য আমরা চলছি তো চলছিই। যেখানে জনতার ভিড় সেখানেই আমরা। এখনকার মতো তখন কোনো স্বার্থ নিয়ে মারামারি, কাটাকাটি ছিল না। কোনো দলীয় পদের জন্য ঘুষ দিতে হতো না। কাকে কে ঘুষ দেবে, দলের নেতা বানাতেন দলের কর্মীরা। বড় বড় নেতাদেরও সেখানে কোনো প্রভাব থাকত না। তাই ছোট-বড় সব নেতাই যোগ্য ছিলেন, সাংগঠনিক ক্ষমতা ছিল। কোনো জাতীয় প্রোগ্রামে দলে দলে নেতা-কর্মীরা সমবেত হতেন। কিন্তু এখন আর তেমন হয় না।
১৫ আগস্ট এলেই কেমন যেন এলোমেলো করে দেয়। ‘৭১-এর ১৬ আগস্ট সম্মুখযুদ্ধে হানাদারদের গুলিতে ক্ষতবিক্ষত হয়েছিলাম। সে আঘাতও সয়ে নিয়েছিলাম। কিন্তু ‘৭৫-এর ১৫ আগস্টের আঘাত আর কাটিয়ে উঠতে পারলাম না। সময় বড়ই নিয়ামক শক্তি। লালন সাঁইজি বলেছেন, ‘সময় গেলে সাধন হবে না’। আমাদের ক্ষেত্রেও তাই। যখন বলার ছিল তখন বলিনি, এখন বললে আর কী হবে? একসময় মনে হতো মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমাদের নাম কেউ মুছতে পারবে না। কিন্তু এ বছরই আমাদের রাজাকার আখ্যা দিল, কেউ কোনো প্রতিবাদ-প্রতিকার করল না। বঙ্গবন্ধুর জন্য জীবন-যৌবন খোয়ালাম।
তার পিঠের চামড়া তোলারা সরকারে বড় বড় কুতুব হয়ে গেল, আমরা শত্রু হিসেবে চিহ্নিত হলাম। এমনই বোধহয় হয়। তা না হলে ‘৭৫-এর ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের পর যারা নীরব ছিলেন, এমনকি হত্যাকারীদের সাহায্য করেছিলেন আজ তারাই সব। এটা যদি বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীরা করত মেনে নেওয়া যেত। কিন্তু তা তো নয়, বঙ্গবন্ধুর নাম করে তারই শত্রুরা বন্ধু সেজে নানা টালবাহানায় গদি আঁকড়ে আছে। ১৫ আগস্ট ‘৭৫ সেনাপ্রধান ছিলেন কে এম সফিউলøাহ। তার বাহিনীর সৈন্যরা রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করল কেউ কোনো দিন তাকে জিজ্ঞাসা করল না। যেহেতু পরে জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক সুবিধা পেয়েছেন সেহেতু তাকে খুনি বলা হলো। সব রাজনৈতিক বিবেচনা। এ কে খন্দকার বীরউত্তম বিমানবাহিনীর প্রধান ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিবাদে একটা যুদ্ধবিমান দূরের কথা, একটা ভাঙা হেলিকপ্টারও আকাশে ওড়াননি। জিয়াউর রহমান, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের চাকরি করে তিনি এখনো মহাজোটের মন্ত্রী।
রক্ষীবাহিনীর আনোয়ারুল আলম শহীদ বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের সর্বপ্রথম সমর্থন জানিয়েছিলেন। বহাল তবিয়তে জিয়া, এরশাদ এবং বেগম জিয়ার সময় চাকরি করে অবসর নিয়ে এখন আওয়ামী গবেষক সাজার চেষ্টা করছেন। জনাব হাসানুল হক ইনু যাওয়ার কালে মন্ত্রী হয়েছেন। জিয়া খারাপ কিন্তু জিয়াকে মুক্ত করতে ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার ট্যাঙ্কে লাফালাফি করেছেন, তিনি এখন মহাজোটের মুখপাত্র। ‘৭৫-এর প্রতিরোধ সংগ্রামে যারা জীবন দিয়েছেন তাদের কথা চিন্তা করলে আজ বড় কষ্ট হয়। আরও কষ্ট হয় একজন চরম ব্যর্থ লোকের ছবি বঙ্গবন্ধুর নিহত পরিবার-পরিজনদের মধ্যে যখন দেখি। বহু পণ্ডিত তাকে বঙ্গবন্ধুর শ্রেষ্ঠ প্রেমিক বলতেও কুণ্ঠা করেননি।
অথচ ওই ভদ্রলোক মুক্তিযুদ্ধের সময় ছিলেন হানাদার পাকিস্তানের পক্ষে। ‘৭৫-এর আগস্টে তাকে ব্রিগেডিয়ার পদে উন্নীত করে ডিজিএফআইর ডিজি করা হয়। তখন তার অধীনে এক ব্রিগেড সৈন্য, দুটি হেলিকপ্টারসহ সবরকম লজিস্টিক সাপোর্ট দেওয়া হয়। তার দায়িত্ব ছিল রাষ্ট্রপতিকে হেফাজত করা। রাষ্ট্রপতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন। সবাই জেগে রইলেন, তিনি ঘুমালেন কেন? ওভাবে ষড়যন্ত্র হচ্ছে তিনি খবর রাখলেন না বা পেলেন না কেন? তিনিই ছিলেন রাষ্ট্রের সব থেকে শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান। যার ওপর রাষ্ট্রের ও রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তার দায়িত্ব ছিল। এখন পর্যন্ত তাকে কেন কোনো জবাব দিতে হলো না? প্রশ্নগুলো কি কখনো মনে জাগতে পারে না? অমন দায়িত্ব যদি আমার ওপর থাকত আর আমি যদি অমন নিদারুণভাবে ব্যর্থ হতাম তাহলে আমায় কি ক্ষমা করা হতো? ৩ হাজার সৈন্য, দুটি হেলিকপ্টারের একটি গণভবনেই ছিল। তার পরও কেন কর্নেল জামিল একা লাল হাফশার্ট গায়ে দুই দরজার প্রাইভেট কারে গিয়ে জীবন দিলেন? তিনি যদি কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত না হতেন তারপর ওভাবে জীবন দিতেন, আমি তাকে মাথায় তুলে রাখতাম। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তো তা পারি না।
বরং ব্যর্থতার জন্য শাস্তি কামনা ছাড়া আমার বিবেচনায় অন্য কিছু বলে না। হ্যাঁ, তিনি যদি একটা ব্যাটালিয়ন নিয়ে ষড়যন্ত্রকারীদের বাধা দিতেন, বন্দী করতেন তাহলে কৃতিত্ব পেতেন। পুরো ব্যাটালিয়ন নিয়ে না হোক এক কোম্পানি সৈন্য নিয়ে বাধা দিয়ে লড়াই করতে করতে যদি জীবন দিতেন, আমি তাকে মাথায় রাখতাম। কিন্তু এমন ব্যর্থ কোনো কাপুরুষকে আর যাই হোক সম্মান দেখাতে পারি না। আসলে সবই আজ ইচ্ছামাফিক। যারা বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিশোধ-প্রতিরোধে সর্বস্ব ত্যাগ করেছেন তারা অনাদৃত, যারা ব্যর্থ হয়েছেন তারা সমাদৃত।
সেদিন শেখ রেহানা বর্তমানের ওপর দাঁড়িয়ে অতীত নিয়ে একটি দারুণ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। বেশ ভালোই বলেছেন। কিন্তু প্রচ্ছন্নভাবে সুবিধামতো সাজিয়ে-গুছিয়ে উপন্যাসের মতো করে কথাগুলো বলেছেন। জননেত্রী শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানার এখন বয়স হয়েছে। অভিজ্ঞতাও হয়েছে অনেক। তাই সাজিয়ে-গুছিয়ে নিজের মতো করে বলতে কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। তবে সেই নিদারুণ ভয়াবহ সময় যারা অতিক্রম করেছেন গরমিল হলে তাদের কাছে অবশ্যই খারাপ লাগবে। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীকে ফেরেশতার সঙ্গে তুলনা করেছেন। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী সত্যি একজন ভালো মানুষ। দু-তিন বছর একসঙ্গে কাজ করে দেখেছি একজন অসাধারণ মানুষ ছিলেন তিনি।
শেখ রেহানার কণ্ঠে কত কথা এলো, এলো না শুধু প্রতিরোধ সংগ্রামের কথা। সোনার মানুষ হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী তাতে সন্দেহ কি? কিন্তু আরও যে অনেক রুপার মানুষ ছিল, সোনার জীবন-যৌবন ঝরাল, বুকের তপ্ত রক্ত ঢালল, তাদের বেমালুম ভুলে যাওয়া কি কোনো মনুষ্যত্বের কাজ হলো? সুদর্শন মারাক, তপন সাংমা, সাখাওয়াত হোসেন মান্নান, মৌলভী সৈয়দ, সৈয়দ নুরুলের মতো শতাধিক তরুণ প্রাণ দিয়ে যে প্রতিরোধ সংগ্রাম করল।
আনোয়ার হোসেন, শামসুদ্দিন মোলøা, আবু সাঈদ, সুলতান মোহাম্মদ মনসুর, শাহ আজিজ, বিয়ানীবাজারের জলিল, খালেদ খুররম, বৈদ্য, গৌর, গিয়াস, নারায়ণগঞ্জের নাসিম, মঞ্জু, জিন্নাহ, বিশ্বজিৎ, হায়দার, ধামরাইয়ের শরিফ, ডা. শরিফুল, বাবুল হক, ফারুক আহমেদ, সাভারের মাহবুব, ফিরোজ কবির, জগলুল পাশা, জসিম এদের নাম কি শেখ রেহানার একবারও মনে হলো না? বিপদ কেটে গেলে ভালো অবস্থানে থেকে কত কথাই তো বলা যায়। পশ্চিমবঙ্গ সরকার তার দায়িত্ব নিতে চায়নি এটা কোনো কাজের কথা নয়। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার যখন কারও দায়িত্ব নেয় তখন রাজ্য সরকারের কিছুই করার থাকে না। কাউকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া-না দেওয়া রাজ্য সরকারের নয়, কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে।
আমার বোন সেলিনা সিদ্দিকী শুশু শান্তিনিকেতনে পড়তে পারল, বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ রেহানা পারল নাথ এটা কেমন কথা! এতে দুই দেশের মধ্যে একটা ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হবে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ব্যক্তিগতভাবে শেষ দিন পর্যন্ত শ্রী জ্যোতিবসু বিরোধিতা করেছিলেন। তার পরও তাকে মুক্তিযুদ্ধের সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। অথচ দলগতভাবে সিপিএম চীনের বিরোধিতা সত্তে¡ও বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন জুগিয়েছে, সাহায্য করেছে। সিপিএমকে সম্মাননা দেওয়া হয়নি। ‘৭৫-এ বঙ্গবন্ধুর হত্যার হাজার হাজার প্রতিরোধ সংগ্রামীকে পশ্চিমবঙ্গের সিপিএম সরকার নানাভাবে সহায়তা করেছে। কেন্দ্রের কংগ্রেস তো করেছেই। ‘৭৭-এর শ্রী মোরারজি দেশাইর জনতা পার্টি সরকার হওয়ার পরও পশ্চিমবঙ্গের সরকার বাংলাদেশের কোনো প্রতিরোধ সংগ্রামীকে বিপদে ফেলেনি, ধরে দেশে পাঠায়নি। দিলিø রেলস্টেশনে কার কাছ থেকে রেহানা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তির কথা শুনেছিলথ ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়নি। আর শান্তিনিকেতন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অধীনে নয়, অনুদানেও নয়। কবিগুরুর এ প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণই কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত।
অন্যদিকে রেহানার লন্ডন যাওয়ার টিকিটের যে কিচ্ছা-কাহিনী বলা হয়েছে তা খুব একটা ঠিক নয়। আর্থিক কষ্ট তাদের ছিল যেটা এখন নেই। তখন রেহানা খুব বড়ও ছিল না। শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তার কোনো ঘনিষ্ঠতাও ছিল না। এখন রাষ্ট্রীয় অবস্থানে থেকে ওসব বলা খুব সহজ। যেসব কর্মকাণ্ডের কথা তার সাক্ষাৎকারে বলা হয়েছে তা অনেকটাই অতিরঞ্জিত। অন্যরা করলেও পরে কেউ বড় হলে সে নিজেই করেছে বলে চালিয়ে দেওয়ার প্রবণতা আমাদের অনেকেরই আছে।
’৭৫-এর পর কত কষ্ট করে অন্যের দোকানে কাজ করে যে জীবন চালিয়েছে সে যদি এখন হাজার কোটি টাকার বাড়িতে বাস করে, রাস্তায় অন্যদের দেখে মুখ ঘুরিয়ে নেয় তাহলে তার অভিজ্ঞতারই তার দ্বারা প্রতিফলন ঘটে। হাইকমিশনার সানাউলøাহর সকাল-বিকাল রূপ বদল আমাদের সম্পর্কে রেহানার কোনো উচ্চবাচ্য না করা তো সানাউলøাহর কর্মকাণ্ডকেই মনে করিয়ে দেয়। আমরা যে এত রক্ত দিলাম তার কোনো মূল্য হলো না। আমাদের কারও কথা একবারও উচ্চারিত হলো না! অথচ তার বিয়ের খবর, সন্তান হওয়ার খবর ভাই হিসেবে একসময় সবার আগে পেতাম। কেন এমন হলো? আমরা তো তাদের কাছে গদি চাই না, ক্ষমতা-বিত্ত চাই নাথ সামান্য কৃতজ্ঞতা চাই। সেখানেও এত কৃতঘœতা কেন? লেখক : রাজনীতিক