May 7, 2026
নিজস্ব প্রতিবেদক: জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ, সমমনা ও কয়েকটি শরিক দলকে নিজ দলে একীভূত করা, ১৫ আগস্ট নিজের জন্মদিন পালন নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনার মধ্যে প্রায় এক বছর পর ২০ দলীয় জোটের বৈঠক আহ্বান করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।

আজ রাত ৮টায় গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে এ বৈঠক হবে। বৈঠকে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিগত আন্দোলনের ব্যর্থতা, পরবর্তী করণীয়, দলে একীভূতসহ সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে নতুন কর্মকৌশল নির্ধারণ করা হবে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে জোট নেত্রী খালেদা জিয়া শিগগির লন্ডন সফরের আগে জোটের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিকনির্দেশনাও দিয়ে যেতে পারেন। সার্বিক পরিস্থিতিতে দীর্ঘ দিনের এ বৈঠকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান সমকালকে বলেন, আগামী দিনের আন্দোলন কর্মসূচি নির্ধারণ করতে জোটের শীর্ষ বৈঠক ডেকেছেন চেয়ারপারসন। এছাড়া ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে লন্ডনে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলোচনা হবে নেত্রীর। তার আগে জোট শরিকদের সঙ্গে এ পরামর্শ বৈঠক খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
আগামী ১৫ বা ১৬ আগস্ট যুক্তরাজ্য সফরে যাচ্ছেন খালেদা জিয়া। দেশটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হতে পারে। একই সঙ্গে দেশটিতে অবস্থানরত ছেলে ও বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গেও দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, দল ও জোটের করণীয় নিয়ে আলোচনা করবেন বিএনপিপ্রধান। এ সফর সামনে রেখেই আজ জোট শরিকদের সঙ্গে বৈঠক করবেন বিএনপি নেত্রী।
সূত্র জানায়, ৬ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া বিএনপি জোটের টানা অবরোধ-হরতাল কোনো কাক্সিক্ষত ফল বয়ে আনেনি বলে মনে করেন জোট নেতারা। তারা বলেছেন, ওই হরতাল-অবরোধের পরবর্তী সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করতে জোটের কোনো বৈঠক ডাকা হয়নি। তিন মাসের এই ‘বড় আন্দোলন’ কার্যত ব্যর্থ হওয়ার পর জোটের বৈঠক না ডাকায় পরবর্তী করণীয় নিয়ে অন্ধকারে রয়েছেন শরিকরা। এ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন শরিক দলের অনেক নেতা।
অন্যদিকে, বিগত আন্দোলনে ২০ দলের শরিকদের কোনো ‘দৃশ্যমান’ ভূমিকা না থাকায় জোট ভাঙার পক্ষে অবস্থান নেন বিএনপি নেতারা। গত ২৮ মে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতেই জোট ভাঙার পক্ষে মত দেন চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শাজাহান ওমর।
তিনি জোট ভেঙে দিয়ে জোটের দলগুলোকে বিএনপির সঙ্গে একীভূত হওয়ার আহ্বান জানাতে খালেদা জিয়ার প্রতি আহ্বান জানান। এ সময় জোটের অন্যতম শরিক দল কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিম এর প্রতিবাদ জানান।
অবশ্য জোটের দ্বিতীয় বৃহৎ শরিক জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিএনপির দীর্ঘ দিনের টানাপড়েন চলে আসছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াত নেতাদের একের পর এক ফাঁসিসহ বিভিন্ন সাজার বিষয়ে জোটের প্রধান দল বিএনপি কোনোই প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
এ নিয়ে জামায়াতের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এ প্রেক্ষাপটে জোটের বিগত দিনের আন্দোলনেজামায়াতের নেতাকর্মীদের সেভাবে রাজপথে পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ বিএনপির। অন্যদিকে জামায়াত নেতাদের মতে, জোটের প্রধান দল বিএনপিকেই যেখানে রাজপথে দেখা যায় না, সেখানে অন্য শরিকরা কেন প্রাণ দিতে যাবে?
জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে আদালতের রায় এবং কর্মসূচি পালনের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখার এই বিষয়গুলো ছাড়াও জামায়াত ত্যাগ করতে বিএনপির ওপর দেশি-বিদেশি চাপের বিষয়টিও সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক গুরুত্ব পায়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিবর্গ এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি খালেদা জিয়ার সঙ্গে পৃথক বৈঠকে জামায়াত ছাড়ার ব্যাপারে পরামর্শ দেন।
অন্যদিকে সিপিবিসহ বাম ধারার কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতারাও বিএনপি নেত্রীর সঙ্গে দেখা করে জোট থেকে জামায়াতকে সরানোর আহ্বান জানান। দেশি-বিদেশিদের এই চাপের প্রেক্ষাপটে খালেদা জিয়া কয়েকটি বিদেশি গণমাধ্যমের সঙ্গে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির আদর্শিক মিল নেই বলে জানান। জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির গাঁটছড়াকে ‘সাময়িক’ বলেও পক্ষগুলোকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন খালেদা জিয়া।
অন্যদিকে জোটে কয়েকটি ধর্মভিত্তিক দল থাকা সত্ত্বেও সম্প্রতি বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনের এক সভায় ধর্মীয় রাজনীতির বিপক্ষে কথা বলেন। তিনি বলেন, শুধু ধর্মকে কেন্দ্র করে কোনো রাজনৈতিক দল হতে পারে না। এ অবস্থায় জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন যৌক্তিক পরিণতি না পাওয়ার পর জোট ভাঙা বা জামায়াতকে সরানো হচ্ছে কি-না তা নিয়ে সব মহলে ব্যাপক গুজব-গুঞ্জরণের মধ্যে হঠাৎ জোটের শীর্ষ বৈঠক ডাকলেন খালেদা জিয়া। দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক মহলে শরিকদের সঙ্গে বিএনপি নেত্রীর আজকের বৈঠক নিয়ে গভীর আগ্রহ তৈরি হয়েছে।