April 22, 2026
নিজস্ব প্রতিবেদক: সারাদেশকে নাড়া দেয়া সাত খুন মামলার প্রধান আসামী সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেনকে হত্যাকাণ্ডের আঠারো মাসেরও বেশি সময় পর অবশেষে নেয়া হয়েছে নারায়ণগঞ্জে। স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে তাকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তা মামনুর রশীদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। শুক্রবার সকাল সাতটার দিকে র্যাব-১ ’র কার্যালয়ে এক সংক্ষিপ্ত সংবাদ ব্রিফিংয়ে শেষে নূর হোসেনকে নারায়ণগঞ্জ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর তাকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশ রওনা হয় পুলিশ। এর আগে সকালের দিকে র্যাব কার্যালয়ে গাড়িতে করে নূর হোসেনকে নিয়ে আসা হয়। আর সকাল আটটার কিছু পরে কেড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাকে বহনকারী গাড়িটি নারায়ণগঞ্জ পুলিশ লাইনে পৌঁছায়। সেখানেই তার স্বাস্থ পরীক্ষা সম্পন্ন হবে। এর আগে বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার কিছু পরে বাংলাদেশি প্রতিনিধিদের কাছে নূর হোসেনকে হস্তান্তর করা হয়।
বাংলাদেশের কারাগারে আটক উলফা নেতা অনুপ চেটিয়াকে দুই সঙ্গীসহ ভারতের কাছে হস্তান্তরের একদিন পর নূর হোসেনকে ফেরত পাঠিয়েছে ভারত। গত বছরের ২৭ এপ্রিল সাত খুনের পরে ভারতে পালিয়ে যান নূর হোসেন। ওই বছরের ১৪ জুন কলকাতার বাগুইআটিতে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে অবৈধভাবে ভারতে অবস্থানের মামলা হয়। গত মাসে ভারত সরকার সেই মামলা প্রত্যাহার করে নিলে নূর হোসেনের দেশে ফেরার পথ সুগম হয়। জানা যায়, ভারতের স্থানীয় সময় বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে কলকাতার দমদম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে নূর হোসেনকে বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। কর্মকর্তারা তাঁর নামে একটি পারমিট ইস্যু করে সেখানকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাহায্যে কঠোর নিরাপত্তায় নূর হোসেনকে নিয়ে যশোরের বেনাপোলের দিকে রওনা দেন।
বেনাপোল থানার ওসি অপূর্ব হাসান সংবাদমাধ্যমকে জানান, রাত সোয়া ১১টার দিকে ডিবি পুলিশের একটি গাড়ি নূর হোসেনকে আনতে ভারতের সীমানায় প্রবেশ করে। কিছুক্ষণ পর ওই গাড়িতে তাকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। এর আগে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার পুলিশ ড. খন্দকার মহিদউদ্দিন বলেন, নূর হোসেনকে ফেরত আনতে একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে একদল পুলিশ বিকেলে বেনাপোলে রওনা হয়েছে। ওই দলে ছিলেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। খন্দকার মহিদউদ্দিন আরো বলেন, সরকারের উচ্চ পর্যায়ে থেকে জানানো হয়েছে একজন আসামি আসছে। তাকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিতে। সে জন্য যত ফোর্স দরকার তা দিয়ে তাকে আনতে হবে।

গত বছরের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জে প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারসহ সাতজনকে অপহরণ করা হয়। তিন দিন পর শীতলক্ষ্যা নদীতে ছয়জনের এবং পরদিন আরেকজনের লাশ পাওয়া যায়। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার পরপরই ভারতে পালিয়ে যান প্রধান আসামি নূর হোসেন। চলতি বছরের ৮ এপ্রিল সাত খুনের মামলায় র্যাব-১১-এর তৎকালীন অধিনায়ক লে. কর্নেল তারেক সাঈদ, মেজর আরিফ ও লে. কমান্ডার এমএম রানা, নূর হোসেনসহ ৩৫ জনকে আসামি করে চার্জশিট দেয় নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ। চার্জশিটভুক্ত আসামিদের মধ্যে নূর হোসেনসহ এখনও ১৩ জন পলাতক।
২০১৪ সালের ১৪ জুন কলকাতা বিমানবন্দর সংলগ্ন কৈখালী এলাকা থেকে নূর হোসেন তার দুই সহযোগী সেলিম, সুমনসহ গ্রেফতার হন। নূর হোসেনের উত্থান ট্রাকচালকের সহকারী হিসেবে জীবন শুরু করা নূর হোসেন ১৯৯২ সালে বিএনপির সাবেক সাংসদ গিয়াসউদ্দিনের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে যোগ দেন বিএনপিতে। সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তিনি শামীম ওসমানের হাত ধরে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। বাংলাদেশ ট্রাকচালক শ্রমিক ইউনিয়ন কাঁচপুর শাখার সভাপতি হন। তাঁর বিরুদ্ধে দাঙ্গা-হাঙ্গামাসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১৩টি মামলা হয়। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তাঁকে ধরিয়ে দিতে ইন্টারপোলে রেড নোটিশও পাঠানো হয়েছিল। ২০০৮ সালে সংসদ নির্বাচনের পর তিনি এলাকায় ফেরেন। পরে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি হন।
গত বছর নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনে তিনি ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। কাঁচপুরে শীতলক্ষ্যা নদী দখল করে বালু-পাথরের ব্যবসা, উচ্ছেদে বাধা, পরিবহনে চাঁদাবাজিসহ নানা কারণে বারবার আলোচনায় এসেছেন তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে সিদ্ধিরগঞ্জ ও ফতুল্লা থানায় ছয়টি হত্যা মামলাসহ ২২টি মামলা রয়েছে।