March 13, 2026
ঢাকা নগরীতে সাধারণত তিন ধরনের ভাড়াটে দেখা যায়। প্রথম ধরনের ভাড়াটেরা ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্টে থাকেন। প্রত্যেক ফ্ল্যাটে আলাদা মিটার থাকে। তারা মিটার অনুযায়ী বিদ্যুৎ বিল মেটান। বাড়ি ভাড়ার সঙ্গে তাদের বিদ্যুৎ বিল যুক্ত থাকে না।
দ্বিতীয় ধরনের ভাড়াটেদের পুরো বাড়িতেই একটি বিদ্যুৎ মিটার থাকে। বাড়িওয়ালারা আলাদাভাবে প্রত্যেক ভাড়াটের বিল হিসাব করতে পারেন না। সেক্ষেত্রে ভাড়ার সঙ্গে বিদ্যুতের জন্য একটা নির্দিষ্ট মূল্য ধরে দিতে হয় ভাড়াটেকে। সেটা সাধারণত বাড়িওয়ালাই ঠিক করে দেন।
তৃতীয় ধরনের ভাড়াটেরা থাকেন মেস বাড়িতে। এ ধরনের বাড়িতে সাধারণত ছাত্র বা বিবাহিত/অবিবাহিত পুরুষ চাকরিজীবীরা থাকেন যাদের ঢাকায় পরিবার নিয়ে আসার আর্থিক সঙ্গতি বা সুযোগ নেই।
শেষ দুই ধরনের ভাড়াটেরা মূলত নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে বর্ধিত বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্যের চাপ সবচেয়ে বেশি পড়বে এই শ্রেণির মানুষের ওপর।
এই মূল্য বৃদ্ধির ফলে সিঙ্গেল ও ডাবল বারনার চুলার জন্য ২০০ টাকা বেশি এবং প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য ১৮ পয়সা বেশি বিল দিতে হবে। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আনুষ্ঠানিকভাবে এই মূল্য বৃদ্ধির ঘোষণা করে।
বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য গড়ে ৬ টাকা ১৫ পয়সা বিল দিতে হয়। আগামী মাস থেকে এই বিল দাঁড়াবে ৬ টাকা ৩৩ পয়সা। বিদ্যুৎ ব্যবহারের ১০টি ধাপ বা পর্যায় রয়েছে। প্রথম ধাপে ৭৫ ইউনিট ব্যবহারে খরচ পড়ে মাসে ২৬৫ টাকা এবং দশম ধাপ যা ১০০০ ইউনিট পর্যন্ত হয়, তাতে খরচ পড়ে ৭ হাজার ৬২৬ টাকা।
আগামী মাস থেকে প্রথম পর্যায়ের ব্যবহারকারীদের ২০ টাকা বেশি এবং দশম পর্যায়ের ব্যবহারকারী, যারা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রসহ নানা বৈদ্যুতিক গ্যাজেট ব্যবহার করেন, তাদের ১৩৩ টাকা বেশি বিল গুণতে হবে।
মোটা দাগে শতকরা ৪০ ভাগ ব্যবহারকারী প্রথম তিনটি পর্যায়ের মধ্যে পড়েন যারা ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন।
আজিমপুরের বাসিন্দা নাফিসা আক্তার যে বাড়িতে থাকেন তাতে একটিই বিদ্যুৎ মিটার রয়েছে। তিনি জানান, বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই তার বাড়িওয়ালা বাড়িভাড়া ১ হাজার টাকা বাড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি কত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন তা জানার কোনও উপায় নেই। তবে তিনি এসি বা অন্য কোনও উচ্চ মাত্রার বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহার করেন না। তা করলেও তার বিদ্যুৎ বিল ১৩৩ টাকার চেয়ে বেশি বাড়বে না। তার সঙ্গে গ্যাস বিল ২০০ টাকা যোগ করলে তার বর্ধিত ব্যয় দাঁড়ায় ৩৩৩ টাকা। অথচ তার বাড়ি ভাড়া ১৩ হাজার টাকা থেকে এক লাফে ১৪ হাজার টাকা হয়ে গেছে।
শুক্রাবাদে একটি মেসবাড়িতে দেখা গেছে, বাড়িওয়ালা প্রত্যেক বোর্ডারের কাছ থেকে ৫০০ টাকা বাড়তি ভাড়া নেবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। এর ফলে আগামী মাস থেকে বাড়ির মালিক ৩ হাজার টাকা বেশি ভাড়া পাবেন। অথচ গ্যাস বিদ্যুৎ মিলিয়ে তার বাড়তি খরচ ৩৩৩ টাকার বেশি বাড়ছে না।
ওই মেসের বাসিন্দা সেলিম ভুইয়া বলেন, ‘আমরা যখন ম্যানেজারের কাছে জানতে চাইলাম, ভাড়া এত বাড়ছে কেন, সে জানালো এটা বাড়ির মালিকের সিদ্ধান্ত।’ তিনি এও জানায়, ‘এ বাড়িতে থাকতে হলে বেশি ভাড়া দিয়েই থাকতে হবে। অন্যথায় বাসা ছেড়ে দিতে হবে।’
বাড়ির মালিক শাফায়াত হোসেনকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি ভাড়া বাড়ানোর কথা অস্বীকার করে বলেন, ‘বাড়ি ভাড়ার সঙ্গে বিল যুক্ত। সরকার যদি গ্যাস আর বিদ্যুতের দাম বাড়ায়, তাহলে আমার জন্য ভাড়া বাড়ানোই কি স্বাভাবিক না?’
এদিকে, আলাদা মিটার আছে এমন অনেক ভাড়াটে নিশ্চিত করেছেন, তারা এখনও ভাড়া বাড়ানোর কোনও নোটিশ পাননি।
প্রসঙ্গত, বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ বা পর্যবেক্ষণের জন্য সরকারি কোনও সংস্থা বা বিভাগ নেই। তবে এ বছর ১ জুলাই হাইকোর্ট থেকে সরকারের প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন এলেকায় সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন ভাড়া নির্ধারণ করে দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে।
এর আগে ২০১০ সালে বিভিন্ন মানবাধিকার গোষ্ঠী বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৯১ বাস্তবায়নের জন্য হাইকোর্টে আবেদন (পিটিশন) জানায়, যেন বাড়ির মালিকরা তাদের খেয়ালখুশি মত ভাড়া বাড়াতে না পারে।
এই আইন অনুযায়ী, বাড়ির মালিকরা মাসিক ভাড়ার বাইরে সালামি বা সিকিউরিটি মানি হিসেবেও কোন টাকা নিতে পারবেন না।
কনস্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ জানায়, ২০১৪ সালে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় আগের বছর থেকে বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধির শতকরা হাড় ছিল ৯ দশমিক ৭৬ ভাগ।