May 7, 2026
নিউজ ডেস্ক: মাত্র ছয় ঘণ্টার ব্যবধানে রাজধানী ও মাগুরায় ছাত্রলীগের বর্তমান এবং সাবেক দুই নেতা পুলিশ ও র্যা বের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। দুজনেরই স্বজনেরা বলেছেন, তাঁদের ধরে নিয়ে হত্যা করে ‘বন্দুকযুদ্ধে’র নাটক সাজানো হয়েছে। এরপর আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতারা বলছেন, তাঁরা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড মেনে নেবেন না। তবে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। অ্যাকশন শুরু হয়ে গেছে।

রাজধানীর হাজারীবাগে মঙ্গলবার ভোর সাড়ে চারটার দিকে র্যা বের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে মারা যান হাজারীবাগ থানা ছাত্রলীগের সভাপতি আরজু মিয়া (২৮)। রাজা মিয়া (১৬) নামে এক কিশোরকে চুরির অভিযোগে পিটিয়ে হত্যার প্রধান আসামি ছিলেন আরজু মিয়া। আরজুর মাথার ডানে-বাঁয়ে তিনটি ও বুকের বাঁ থেকে ডান পর্যন্ত সারি ধরে আরও তিনটি গুলির ছিদ্র পাওয়া গেছে। স্বজনদের দাবি, সন্ধ্যায় তাঁকে ধরে নিয়ে ভোরে হত্যা করেছে র্যা ব।
আর মাগুরায় ছাত্রলীগের গোলাগুলিতে মায়ের জঠরে শিশু গুলিবিদ্ধ ও একজন বৃদ্ধ নিহত হওয়ার মামলার তিন নম্বর আসামি মেহেদী হাসান ওরফে আজিবর শেখ (৩৪) সোমবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে মাগুরার পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন। আজিবর মাগুরা পৌর ছাত্রলীগের আগের কমিটির নেতা ছিলেন, এরপরে আর কোনো পদ পাননি। নিহতের স্বজন ও প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, সোমবার বিকেলে আজিবরকে শালিখা থানা এলাকা থেকে ধরে এনে সদর থানা এলাকায় হত্যা করা হয়েছে।
কিছুদিন ধরে সরকারি দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টায় একাধিক খুনোখুনির ঘটনা ঘটেছে। বাড্ডায় ঝুট ব্যবসা নিয়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে আওয়ামী লীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের তিন নেতা হত্যা, জাতীয় শোক দিবসের দিন কুষ্টিয়ায় এক যুবলীগ নেতা হত্যা, চাঁদপুরের কচুয়ায় চাঁদার দাবিতে স্কুলের শিক্ষক ও ছাত্রীদের ওপর যুবলীগের হামলা, হাজারীবাগে ছাত্রলীগ নেতার এক কিশোরকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। এর আগে মাগুরায় ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে মায়ের পেটে শিশু গুলিবিদ্ধ হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটে।
দলীয় নেতা-কর্মীদের এ ধরনের অপরাধ প্রবণতায় ভাবমূর্তির সংকটে পড়েছে দলের শীর্ষ পর্যায়। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। গত সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকের পরে এক অনির্ধারিত আলোচনায়ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অপরাধী দলের হলেও ন্যূনতম কোনো সহানুভূতি দেখানো হবে না বলে জানিয়ে দেন।
এরপরেই দুটি বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটল। এর আগে এই সরকারের আমলে অনেকগুলো বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটলেও দলের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া প াওয়া যায়নি। কিন্তু নিজ দলের দুই নেতা-কর্মী নিহত হওয়ার ঘটনায় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। তারা প্রকাশ্যে এর বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়েছে।
হাজারীবাগ থানা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বিবৃতি দিয়ে এই ঘটনায় নিন্দা ও ক্ষোভ জানানো হয়েছে। এর সভাপতি ইলিয়াসুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক সাদেক হামিদ গতকাল এক বিবৃতিতে বলেছেন, আরজু মিয়াকে সামান্য অজুহাতে র্যা বের কথিত বন্দুকযুদ্ধে হত্যা করা হয়েছে। তাঁরা আরও বলেছেন, মেধাবী ছাত্রলীগ নেতা আরজু মিয়ার নামে কোনো থানায় কোনো মামলা ছিল না। ফলে এ ঘটনায় এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। তাঁরা এই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের তদন্ত চেয়েছেন।
জানতে চাইলে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুর রহমান বলেন, ‘অকালমৃত্যু কারও কাম্য নয়। শিশুহত্যার ঘটনায় আমরা শোকাহত। কিন্তু আগে-পরে আমরা যেটা দেখেছি, সে গণপিটুনির শিকার। চুরির অপরাধে সাধারণ আমজনতা তাকে গণপিটুনি দিয়েছে। দোষ পড়েছে ছাত্রলীগ নেতার ওপর। তারপরও সে যদি দোষী হয়ে থাকে, তবে তদন্তের মাধ্যমে যথাযোগ্য শাস্তি হওয়া উচিত। আমরাও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতাম। কিন্তু বিচারবহির্ভূত এই হত্যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।’
তবে ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান বলেন, ‘এটা র্যা বের অতি বাড়াবাড়ি। রাজা গণধোলাইতে নিহত হয়েছে। এর বাইরে কিছু বলব না।’
আর ছাত্রলীগসহ দলীয় নেতা-কর্মীদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও অপরাধে জড়িয়ে পড়াসহ সামগ্রিক বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। অ্যাকশন শুরু হয়ে গেছে। খুব দ্রুত এই প্রবণতা কমে যাবে। ইতিমধ্যেই তারা বার্তা পেয়ে গেছে।’ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এই সদস্য আরও বলেন, ‘ছাত্রলীগকে নেতা নয়, কর্মী উৎপাদনের কারখানা হতে হবে। কেউ খারাপ কাজ করলে দল তাকে ছাড় দেবে না।’
এদিকে, আরজু মিয়ার নিহত হওয়ার খবর শুনে গতকাল বেলা ১১টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে নিহতের বড় ভাই মাসুদ রানাসহ এক থেকে দেড় শ নেতা-কর্মী মর্গে আসেন। এ সময় গণমাধ্যমকর্মীরা তথ্য সংগ্রহে গেলে কয়েকজন খেপে ওঠেন। তাঁরা সংবাদকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, ‘তোদের কারণেই আমাদের ভাইকে মরতে হলো।’
নিহতের সুরতহাল প্রতিবেদনে পুলিশ উল্লেখ করেছে, মঙ্গলবার ভোর সাড়ে চারটার সময় সিকদার মেডিকেল কলেজের পেছনে বড়াইখালী এলাকায় র্যা ব-২ সাতমসজিদ ক্যাম্পের একটি দলের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মারা যান আরজু। তাঁর মাথায়, বুকে-পিঠে সাতটি গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। সৌজন্য….প্রথম অালাে