May 7, 2026
শাহজাহান আকন্দ শুভ/ হাসান জাভেদ : তদবির, টেন্ডারবাজি আর আধিপত্য বিস্তারে শাহজালাল বিমানবন্দরের পরিবেশ ভয়াবহ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চোরাচালানের পণ্য আটক করতে যেয়ে মার খেতে হচ্ছে কাস্টমস কর্মকর্তাদের। প্রশাসন তা জেনেও কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

এক যুবলীগ নেতার কাছে অসহায় হয়ে পড়েছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কর্মরত শুল্ক বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ পুরো প্রশাসন। বহুল আলোচিত এই যুবলীগ নেতার নাম বদরুল আলম শ্যামল। সোমবার দুপুরে তার নেতৃত্বে ৫০ জনের মতো সশস্ত্র ক্যাডার বিমানবন্দরের দুই কাস্টমস কর্মকর্তাকে বেদম মারধর করে বিমানের কুরিয়ার গোডাউন থেকে প্রায় ৫০ কোটি টাকার পণ্য লুটপাট করে নিয়ে যায়। ঘটনাটি ঘটেছে র্যাব সদর দপ্তর ও বিমানবন্দর থানার ১০০ গজের মধ্যে।
এর আগেও একাধিকবার যুবলীগ নেতা বদরুল আলম শ্যামল কাস্টমস কর্মকর্তাদের মারধর করে কোটি কোটি টাকার পণ্য জবরদস্তি কুরিয়ার গোডাউন থেকে বের করে নিয়ে গেছেন। কিন্তু যুবলীগ নেতা বলে তার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। প্রশাসনের এই অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে ফের আরেকবার লুটপাটের ঘটনা ঘটান তিনি। এ ঘটনার পর কুরিয়ার গোডাউনে পণ্য আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
শ্যামল যেসব পণ্য পেশীশক্তির বলে ধারাবাহিকভাবে কুরিয়ার গোডাউন থেকে বের করে নিয়েছেন, সেগুলোর বেশিরভাগই চোরাচালানির পণ্য। তার নেতৃত্বে যে ক্যাডার বাহিনী পণ্য চালান ছিনতাইয়ে অংশ নিয়ে থাকে, তাদের বেশিরভাগের কাছেই থাকে আগ্নেয়াস্ত্র। একাধিক মামলার দাগি আসামিও আছে এই গ্রুপে। রাষ্ট্রের প্রথমসারির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার তালিকাভুক্ত শাহজালাল বিমানবন্দরে যুবলীগ নেতার এই ধারাবাহিক অপরাধমূলক কর্মকা-ে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
বিমানবন্দরের একাধিক কাস্টমস কর্মকর্তা বলেন, যুবলীগ নেতা শ্যামল পুরো বিমানবন্দরকে একরকম ‘মগের মুল্লুক’ বানিয়েছেন। শুধু কাস্টমস নয়, পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট অন্য প্রশাসনও তার কাছে জিম্মি। তবে এসব অভিযোগ খ-ন করে যুবলীগ নেতা শ্যামল বলেন, দলীয় পরিচয়ে আমি ব্যবসা করি না। এমনকি কারও ওপর হামলা-লুটপাটও পছন্দ করি না। ১৫-২০ বছর ধরে সৎভাবে ব্যবসা করছি। সোমবারের ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এয়ারপোর্ট এলাকার ছাত্রলীগ নেতা সুজন গোডাউনে গিয়ে গ-গোল পাকালে আমি থামাতে যাই। তখন সুজনের ক্যাডাররা আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করলে আমার কুরিয়ার সার্ভিসের লোকজন প্রতিবাদ করে।
সোমবার দুপুরে যুবলীগ নেতা বদরুল আলম শ্যামল প্রায় ৫০ জন ক্যাডার নিয়ে বীরদর্পে শাহজালাল বিমানবন্দরের এয়ার ফ্রেইড আমদানি শাখার কুরিয়ার শুল্কায়ন গোডাউনে প্রবেশ করেন। তার নেতৃত্বে ‘স্ট্রংরুম’ থেকে প্রায় ৫০ কোটি টাকার পণ্য ১০-১৫টি ট্রলিতে করে বাইরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। এ সময় কাস্টমসের সহকারী কমিশনার সহিদুজ্জামান সরকার ও সহকারি রাজস্ব কর্মকর্তা মোজাম্মেল হোসেন তাদের বাধা দেন। সঙ্গে সঙ্গে পণ্য পাচারকারীরা লাঠিসোটা নিয়ে ওই দুই কাস্টমস কর্মকর্তার ওপর হামলে পড়েন। তাদের বেদম মারধর করে ট্রলিভর্তি মালামাল নিয়ে চলে যান তারা। পরে আহত সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মোজাম্মেল হোসেন একটি ক্লিনিকে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন।
ঘটনার পর পুুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলেও পাচারকারীদের কাউকে আটক করতে পারেনি। এ ঘটনায় বিমানবন্দরে কর্মরত কাস্টমস কর্মকর্তাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
আহত মোজাম্মেল হোসেন বলেন, যা ঘটেছে তা আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জেনেছে। তারা এখন পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন। ঢাকা কাস্টম হাউসের কমিশনার মোহাম্মদ লুৎফর রহমান জানান, কিছু ব্যক্তি রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন অপকর্ম করে থাকে। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। দুই কাস্টমস কর্মকর্তাকে মারধর করে পণ্য লুটে নেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সোমবারের ঘটনা সম্পর্কে যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, বদরুল আলম শ্যামল নামে যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে কোনো সদস্য নেই। পরে শ্যামল সম্পর্কে তিনি যুবলীগ ঢাকা মহানগর উত্তরের সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেনের কাছে জানতে চান। এ সময় ইসমাইল হোসেন বলেন, বদরুল আলম শ্যামল ভালো ছেলে। তবুও যুবলীগের নামে বিমানবন্দরে অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমরা কঠোর ব্যবস্থা নেব। এ ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
জানা গেছে, গত ২৮ জুলাইও ঢাকা কাস্টম হাউসে ঢুকে সহকারী কমিশনার কামরুল হাসানের হাত কেটে ফেলার হুমকি দেন যুবলীগ নেতা বদরুল আলম শ্যামল। শুল্ক ফাঁকি দিয়ে পণ্য খালাস করাতে না পেরে যুবলীগ নেতা শ্যামল ও তার ভাই প্রিন্স ১০-১২ ক্যাডার নিয়ে কামরুল হাসানের কক্ষে ঢুকে তাকে জীবন্ত পুঁতে ফেলাসহ হাত কেটে ফেলার হুমকি দেন। একপর্যায়ে বিমানবন্দরের নিরাপত্তারক্ষী ও পুলিশ এগিয়ে এলে তারা পালিয়ে যায়। এ ঘটনার পর আতঙ্কে ও ক্ষোভে বিমানবন্দরের আমদানি শাখার পণ্য ডেলিভারিসহ সব কার্যক্রম এক ঘণ্টারও বেশি সময় বন্ধ ছিল। এর আগেও একবার কাস্টমস কর্মকর্তা শহীদুজ্জামান সরকারকে লাঞ্ছিত করে একই পাচারকারী চক্র। চোরাচালান আটকাতে গিয়ে শুল্ক পরিদর্শক (এটিও) জয়দেব চন্দ্র মজুমদার লাঞ্ছিত হন।
সূত্র জানায়, চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর বদরুল আলম শ্যামল যোগ দেন বিএনপিতে। সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে না থেকেও লবিং-গ্রুপিং করে হয়ে যান বিমানবন্দর থানা জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক দলের (জাসাস) সহ-সভাপতি। ক্ষমতার দাপটে ওই সময় বিমানবন্দরের সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ীর খাতায় নাম লেখান তিনি। এরপর বিমানের অসাধু চক্রের হাত ধরে শুরু হয় তার অবৈধ কর্মকা-। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ছোট ভাই প্রিন্সকে স্থানীয় যুবলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় করে তিনি জড়িয়ে পড়েন চোরাচালানে। নিজের ‘এসএমআই ওয়ার্ল্ডওয়াইড এক্সপ্রেস কুরিয়ার’ সার্ভিসের আড়ালে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে স্বর্ণ, আমদানি নিষিদ্ধ ওষুধ, মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি করেন। আর শ্যামল নিজে বিএনপির সঙ্গে থেকে ২০১১ সালের ২৪ জুন বিমানবন্দর থানা জাসাসের সহ-সভাপতি হন।
ভাই প্রিন্সসহ অন্যতম সহযোগী বিমানবন্দর থানা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি ইয়াসিন, জসিম উদ্দিন তফাদার, মঞ্জুর হোসেন পাটোয়ারীকে সামনে রেখে চলে আসছিল তার এ অবৈধ ব্যবসা। এ সময় চোরাচালানের পণ্য বিমানবন্দরে আটকে গেলে কাস্টমস কর্মকর্তাদের ওপর হামলা করে তা ছিনিয়ে নেওয়ার কাজ করত ইয়াসিন, জসিমউদ্দিন ও মঞ্জুর। জসিমউদ্দিন তফাদার ২০১২ সালের ৩ মে বিমানবন্দর শাখা যুবদলের সহ-সভাপতি হন। এর আগে ইয়াসিন জাসাসের ক্রীড়া সম্পাদক ছিলেন। এই তিনজনও দলবদল করে এখন ক্ষমতাসীন। আর তাদের ব্যবহার করে রাতারাতি কোটিপতি বনে গেছেন শ্যামল।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ফের আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে বদরুল আলম শ্যামল নিজের পূর্বপরিচয় গোপন করে যুবলীগের নেতা বনে যান। একসময়ের বিএনপি নেতা এখন যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হয়ে বিমানবন্দরে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। রাজধানীর অনেক এলাকায় পোস্টার-ফেস্টুনও সাঁটিয়েছেন। সরকারি দলের পদবি পেয়ে সহযোগীদের পেছনে রেখে এখন নিজেই চোরাচালান সিন্ডিকেটের গডফাদার।
এ সময় ক্ষমতার একাধিপত্য দেখানোর কারণে তার সঙ্গে বিমানবন্দরের অপর চোরাচালান নিয়ন্ত্রক সিন্ডিকেট জসিম গ্রুপের মধ্যে একাধিকবার সংঘর্ষও হয়েছে।
সর্বশেষ ২০১৪ সালের ৯ আগস্ট কার্গো গোডাউন থেকে লুটের মালামাল বণ্টন নিয়ে এই দুগ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। ওই ঘটনায় উভয়পক্ষ থানায় মামলাও করে। তবে বর্তমানে উভয়পক্ষ একজোট হয়ে একচেটিয়া শাহজালাল বিমানবন্দরে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে।
গত বছর ১৭ আগস্ট শ্যামলের সিদ্ধেশ্বরীর বাসা থেকে দুটি বিলাসবহুল চোরাই প্রাইভেটকার আটক করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। কিন্তু সেখানেও ডিবির উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যান বদরুল আলম শ্যামল। তখন ডিবি পুলিশের এসআই আবদুল আজিজ সাংবাদিকদের বলেন, বদরুল আলম শ্যামল বলেছেন তিনি দীপু নামে আরেকজনের কাছ থেকে গাড়িটি কিনেছেন। কিন্তু গাড়ির কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। আমাদের সময়