May 1, 2026
স্টাফ রিপোর্টার : দীর্ঘদিন প্রবাসজীবন কাটিয়ে দেশে ফিরেছিলেন আবু জাফর (৪৫)। উপার্জিত আয়ে রাজধানীতে নির্মাণ করেন বহুতল ভবন। শুরু করেন ব্যবসাও। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে ভালই কাটছিল তার সময়। একদিন খবর ছড়ায়, হালিমা বেগম নামের এক নারীর সঙ্গে পরকিয়া সম্পর্কে জড়িয়েছেন জাফর। শুরু হয় তার সংসারের অশান্তি। এরপর একদিন তাঁর স্ত্রী নূরজাহান আক্তার খবর পান, প্রেমিকাকে গোপনে বিয়েও করেছেন জাফর। এরপর বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন প্রথম স্ত্রী। সম্পত্তি নিজের নামে দলিল করে দিতে চাপ দেন জাফরকে। কৌশলে দ্বিতীয় স্ত্রী হালিমাকে তালাকও দেওয়ান তিনি। তবে জাফর ফের বিয়ে করেন ওই নারীকে। এ নিয়ে চলছিল টানাপোড়ান। এমন অবস্থায় খুন হলেন জাফর। সোমবার ভোরে নিজের বাড়ির সিঁড়িতে পাওয়া যায় জাফরের গলা কাটা দেহ। এ সময় স্ত্রী-সন্তানেরা ঘরেই ছিলেন। তবে প্রাথমিকভাবে এই হত্যাকাÐের ব্যাপারে কিছুই বলতে পারেননি তারা। দিনভর পুলিশের তদন্ত আর জিজ্ঞাসাবাদের পর রাতে খুলছে রহস্যজট। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, প্রথম স্ত্রী নূরজাহানই তাঁর স্বামীকে ঘুমন্ত অবস্থায় বটি দিয়ে গলা কেটে হত্যা করেছেন। এরপর ঘরের বাইরে ফেলে রাখেন লাশ। সোমবারই নূরজাহানকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত বটিও উদ্ধার করা হয়েছে।
রাজধানীর কদমতলী থানার রায়েরবাগের মেরাজনগরে এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকান্ডটি ঘটেছে। সোমবার নিহতের বড় ভাই সিদ্দিকুর রহমান বাদী হয়ে কদমতলী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।
তদন্তকারীরা বলছেন, এই হত্যাকান্ডে নূরজাহানের সঙ্গে আর কেউ জড়িত ছিল কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এই দম্পতির ছেলে সাইফুল ইসলামকেও (১৯) আটক করেছে পুলিশ।
কদমতলী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আরশেদ আলী সোমবার রাতে বলেন, ‘এই হত্যাকাÐের রহস্য উদ্ঘাটিত হয়েছে। স্ত্রীই তার স্বামীকে হত্যা করে লাশ বাইরের সিঁড়িতে ফেলে রেখেছেন। আসামি স্বীকার করেছেন। আশা করছি, আদালতেও স্বীকারোক্তি দিবেন। বাসার রান্নাঘর থেকে হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত বটিও উদ্ধার করা হয়েছে।
এর আগে সোমবার সকালে জাফরের স্বজনরা তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে সাড়ে ৭টার দিকে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। এ সময় তাঁর স্ত্রী নূরজাহান আক্তার বলেন,ছয় তলা বাড়িটির তৃতীয় তলার তারা থাকেন। ভোরে সেহরির পর নামাযের জন্য বের হন জাফর। এ সময় বাসা থেকে বের হওয়ার পরই তিনতলার সিঁড়ির কাছে দুর্বৃত্তরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে চলে যায়। পরে পাঁচতলার এক ভাড়াটিয়া সিঁড়িতে লাশ পড়ে থাকতে দেখে চিৎকার করে ওঠেন। এ সময় সন্তানদের নিয়ে নূরজাহান ঘুমিয়ে ছিলেন বলে দাবি করেন। মায়ের মতো একইভাবে ঘটনার বর্ণনা দেন জাফরের বড় ছেলে ও স্থানীয় একটি কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র সাইফুল ইসলাম। দুপুরে কদমতলী থানা পুলিশ নূরজাহান ও সাইফুলকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়।
এদিকে হত্যামামলার বাদী সিদ্দিকুর রহমান জানান, তার ভাইয়ের প্রথমপক্ষে দুই ছেলে ও এক মেয়ে আছে। জাফর ১৪ বছর সিঙ্গাপুর ছিলেন। ছয় বছর আগে প্রবাসজীবন থেকে ফিরে মেরাজনগরে বি-বøকে ছয়তলা বাড়ি নিমার্ণ করেন জাফর। ওই এলাকায় তার আরও একটি টিনসেট বাড়ি আছে। বিদেশ থেকে ফিরে বাসার কাছে মেয়ের নামে-‘নুসরাত জেনারেল স্টোর’ একটি মুদি দোকান দেন তিনি। এ সময় হালিমা বেগম নামে এক প্রতিবেশী নারীর সঙ্গে জাফরে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এক বছর আগে হালিমাকে গোপনে বিয়ে করেন তিনি। ছয় মাস আগে খবরটি জানাজানি হলে দাম্পত্য কলহ শুরু হয়। হালিমাও আগে বিবাহিতা ছিলেন। তার প্রথম স্বামী আবদুল লতিফ প্রবাসী। প্রথম স্ত্রী নূরজাহান ও সেই স্বামী লতিফের চাপের মুখে এক পর্যায় হালিমাকে তালাক দেন জাফর। এক মাস আগে আবার তারা বিয়ে করেন। দ্বিতীয় স্ত্রী হালিমা মেরাজ নগরের আরেকটি বাসায় থাকেন।
সিদ্দিক আরও জানান, দ্বিতীয় দফায় বিয়ের আগে ও পরে সম্পত্তি নিজের নামে লিখে দিতে চাপ দেয় নূরজাহান। এ কারণে হত্যাকাÐের পর থেকেই তিনি নূরজাহানকে সন্দেহ করেন। তবে মামলার এজাহারে আসামি অজ্ঞাত রাখেন তিনি।
সোমবার সন্ধ্যায় আসামির ব্যাপারে কদমতলী থানার ওসি আবদুস সালাম মিয়া বলেন, ‘ঘটনার পর বিভিন্ন বিষয় তদন্ত করে আমরা মোটিভ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি।
পরিদর্শক আরশেদ আলী বলেন, রোববার দিবাগত রাতে সেহরির আগেও নূরজাহান ও জাফরের ঝগড়া হয়। সেহরির পর জাফর ঘুমিয়ে পড়েন। তখন ঘুমন্ত অবস্থায় বটি দিয়ে তার গলায় আঘাত করা হয়। এরপর নিথর দেহটি বাসার বাইরে সিঁড়িতে ফেলে রাখেন নূরজাহান। তবে হত্যাকাÐের ব্যাপারটি তার দুই ছেলে ও এক মেয়ে টের পায়নি বলেই ধারণা করা হচ্ছে। হত্যাকাÐের সময় নূরজাহানের সঙ্গে আর কেউ ছিল কি না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
স্বজনরা জানান, নিহত জাফর চাঁদপুরের হাজিগঞ্জের হানিফ খলিফার ছেলে। চার ভাই ও দুই বোনের মদ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। নিহত আবু জাফর স্থানীয় যুবদল কর্মী ছিলেন। কদমতলী থানার নাশকতার মামলায় তাকে দু’বার গ্রেপ্তারও করেছিল পুলিশ। স¤প্রতি তিনি জামিনে বের হন।