April 16, 2026
যতুষার আবদুল্লাহ : মোদি যখন উড়াল দিলেন তখন ঢাকার তাপমাত্রা ছিল ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তিনি যখন ঢাকায় পা রেখেছিলেন তখন ঢাকার তাপমাত্রা ছিল ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অর্থাৎ উষ্ণতার মাঝেই আগমন ও বিদায়। প্রশ্ন হচ্ছে এই উষ্ণতার কতটুকু আর্দ্রতা বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে রয়ে গেল।
নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর থেকেই তার সফরের ক্ষণগণনা করতে শুরু করেছিল বাংলাদেশ। মোদি বাংলাদেশকে তৃষ্ণায় রেখেই ১৮টি দেশ ঘুরে এলেন। যাইহোক অবশেষে এলেন তো। কীভাবে এলেন? তিনি আসার আগে জানা গিয়েছিল চার রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সঙ্গী হবেন তার। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও ছিলেন সেই দলে। মমতা আসবেন কি আসবেন না এনিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছিল। জল্পনার অবসান ঘটিয়ে তিনি এলেন একদিন আগেই। অন্য তিন মুখ্যমন্ত্রী এলেন না। কেন এলেন না, স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই।
মমতা উঠলেন পৃথক হোটেলে। চলেও গেলেই মোদিকে ঢাকায় রেখে। মাঝখানে মোদির সঙ্গে একান্ত বৈঠকে বসলেন। একে কি নিরপেক্ষ ভেন্যুতে ‘শীতলতা’ অবসানের বৈঠক বলা যায়? পর্যবেক্ষকরা বিষয়টিকে সেভাবেই দেখছেন। কেউ কেউ বলছেন, মোদি ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যাওয়ার আগে, শেষমুহূর্ত পর্যন্ত হয়তো মমতাকে বশে আনার চেষ্টা করেছেন। মমতা বশ মানেননি। মোদিকে শুধু তিনি আনুষ্ঠানিক সঙ্গ দিয়ে গেছেন। টিভি ক্যামেরায় যতবার তাকে দেখা গেছে, তার কাষ্ঠ হাসিটিই দেখা গেছে কেবল। ফেব্র“য়ারিতে যখন এসেছিলেন, তখন তার যে প্রাণখোলা হাসি উপহার পেয়েছে বাংলাদেশ, তা ছিল অনুপস্থিত।
দুই দেশের মধ্যে ২২টি দ্বি-পক্ষীয় দলিল বিনিময় হয়েছে। এই বিনিময়ের প্রতিপাদ্য ছিল সংযোগ। এই সংযোগটি কার পক্ষে গেল সেটিই বিবেচনার বিষয়।
এবারের বিষণ্নতার কারণ একটাই- ‘তিস্তা’। মোদির দিক থেকে চাপ ছিল তিস্তা চুক্তির বিষয়ে ইতিবাচক হওয়ার। কিন্তু তিনি অটল থাকলেন তার অবস্থানে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভূমিধস বিজয়ী হয়ে আসা মোদি মমতাকে জয় করতে পারলেন না। মমতা বাহ্যিকভাবে মোদিকে চটাতে চাননি বলেই এই সফরে এসেছিলেন। এতে কেন্দ্রের সঙ্গে তার বহিঃসম্পর্কটি হয়তো ফাটলহীন থাকবে। কিন্তু দরকষাকষিতে মমতা জয়ী হওয়ায়, নরেদ্র মোদির সফরটি হয়ে গেল তার খাদ্যাভ্যাসের মতোই নিরামিষ।কেবল স্থল সীমান্ত চুক্তির প্রটোকল বিনিময়ের জন্য তো বাংলাদেশ তৃষ্ণার্ত ছিল না। তারা অপেক্ষায় ছিল তিস্তার জলের। শেষ ভরসা হিসেবে বাংলাদেশের জনগণ ভেবেছিল হয়তো নিজ নের্তৃত্বের কারিশমায় মোদি তার আস্তিন থেকে তিস্তার জল উপহার দেবেন। কিন্তু মোদি তার বক্তব্যে কেবল বললেন- ফেনী ও তিস্তা নদীর পানির অমীমাংসিত বিষয়টি মানবিক। এই বিষয়ে আলোচনার আশ্বাস রাখলেন। ব্যস এইটুকুই। আর কোনও কথা নয়। এর মধ্যে দিয়ে মোদি তার দেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চা, রাজ্য সরকারের ওপর কেন্দ্রীয় সরকারে সশ্রদ্ধ নির্ভরশীলতা ও পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে জাতীয় ঐক্যের নিদর্শন রাখলেন। হয়তো বাংলাদেশের নরেন্দ্র মোদির কাছ থেকে সর্বোচ্চ এই শিক্ষাটুকুই প্রাপ্ত হলো। প্রাপ্তি যোগের একটি তালিকাও তৈরি হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে ২২টি দ্বি-পক্ষীয় দলিল বিনিময় হয়েছে। এই বিনিময়ের প্রতিপাদ্য ছিল সংযোগ। এই সংযোগটি কার পক্ষে গেল সেটিই বিবেচনার বিষয়। চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের সুযোগ, মংলা ও ভেড়ামারায় বিশেষ অর্থনৈতিক জোন তৈরির অনুমোদন, দুই দেশের মধ্যে উপকূলীয় নৌ চলাচল বিষয়ক চুক্তি, ঢাকা-শিলং-গৌহাটি, কলকাতা-ঢাকা-আগরতলা বাস চলাচল চুক্তি এবং দুই বিলিয়ন ডলারের সমাঝোতা চুক্তি। বাকি সমাঝোতার বিষয়গুলো উল্লেখযোগ্য নয়। কেবল গাণিতিক সংখ্যা বাড়ানো বলা যায়।
যে কয়টির উল্লেখ করলাম তাতে প্রাপ্তি যোগ কার? অবশ্যই ভারতের। অর্থনৈতিক জোনে স্থাপিত হবে ভারতের শিল্প। সুন্দরবন ঘেঁষে তৈরি হবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যু কেন্দ্র। বাস চলাচলের সংযোগে উপকৃত হবে ভারতের দুই অঞ্চলের বিচ্ছিন্ন মানুষ। দুই বিলিয়ন ডলার খরচে যে সড়ক তৈরি হবে, তা দিয়ে ভারতের মালবাহী পরিবহন চলবে। ওই সড়ক তৈরির উপকরণও আনা হবে ভারত থেকে।
নরেদ্র মোদি বিদায় নেওয়ার আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্যে বলেছেন, উনি বিস্তারবাদ নয় বিকাশবাদে বিশ্বাসী। তার প্রমাণ এই সফরেই রেখেছেন তিনি। চুক্তি ও সমঝোতা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সঙ্গে না এনে তিনি আদানি ও রিলায়েন্সকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। এই দুই গোষ্ঠীর বিনিয়োগের বিকাশ তিনি ঘটাতে চান বাংলাদেশে। গভীর সমুদ্র বন্দরসহ বড় বড় প্রকল্পে হয়তো এই দুই গ্র“পকে দেওয়ার নির্দেশনা থাকবে মোদির।
মোদির সফরে ৪ হাজার ৬শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের চুক্তি হয়েছে। এই প্রকল্প তো বাংলাদেশের স্থানীয় উদ্যোক্তারাও করতে পারতেন। এককভাবে পারতেন, সিন্ডিকেট করেও পারতেন। উল্টো এখন ক্ষুদ্র বিদ্যুৎকেন্দ্র যে স্থানীয় বিনিয়োগ হয়েছে সেটিও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে গেল। মোদিকে নিয়ে আমোদ তৈরি হয়েছিল ঢাকা বা বাংলাদেশে সেটি তার সুভাষণ কিছুটা অক্ষুণ্ন রাখল বটে। অর্থনৈতিক জোনে স্থাপিত হবে ভারতের শিল্প। সুন্দরবন ঘেঁষে তৈরি হবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। বাস চলাচলের সংযোগে উপকৃত হবে ভারতের দুই অঞ্চলের বিচ্ছিন্ন মানুষ। দুই বিলিয়ন ডলার খরচে যে সড়ক তৈরি হবে, তা দিয়ে ভারতের মালবাহী পরিবহণ চলবে। ওই সড়ক তৈরির উপকরণও আনা হবে ভারত থেকে।
তবে আমোদে আবার কালি লেপন করে দিয়েছে বিএনপি। তারা মোদির দেখা পাওয়ার সুযোগ পেল, সুযোগ পেয়েই নালিশ নিয়ে গেল তার কাছে। ঘরের সমস্যা নিয়ে কেন মোদির কাছে? গণতন্ত্র অনুপস্থিত সেই বিষয়ে আলোচনা ঘরোয়াভাবে হবে। আওয়ামী লীগকে যেকোনও উপায়ে আলোচনায় নিয়ে আসতে হবে নিজেদের সাংগঠনিক দক্ষতা দিয়ে। এই কাজে ব্যর্থ হয়ে কেন মোদির মুখাপেক্ষী হওয়া?
নরেন্দ্র মোদি বিদায় ভাষণের শেষ পর্বে বলেছেন, আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়ি নদীটির তীরে।
তিনি আবার আসুন, এটা বাংলাদেশের মানুষ প্রত্যাশাই করতে পারেন। কিন্তু সেবার তার করতলে তিস্তার জল থাকবে তো? তৃষ্ণা যে রয়েই গেল। বাংলাট্রিবিউন
লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টেলিভিশন