April 20, 2026
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: দীর্ঘ সময় পার হয়ে যাওয়ায় ধ্বংসস্তূপে আর কাউকে জীবিত উদ্ধারের আশা অনেকটাই ছেড়ে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তারপরও থেমে নেই মানবতা। মানুষের জন্য মানুষ। আর সেকারণেই বোধহয় টানা বর্ষণের মধ্যেও নেপালের বিভিন্ন বিধ্বস্ত ভবনে উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা। অবশ্য এরইমধ্যে নিজেদের সে প্রাণান্ত চেষ্টার ফলও পেয়েছেন উদ্ধারকারীরা। ভূমিকম্পের ৫ দিন পেরিয়ে যাওয়ার পর বৃহস্পতিবার নেপালের কাঠমুন্ডু আর বকতপুরের দুটি বিধ্বস্ত ভবন থেকে এক কিশোর আর এক বালিকাকে অলৌকিকভাবে উদ্ধার করেছেন তারা। নেপালের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রের প্রধান রামেশ্বর দান্দাল বলেন, “ধ্বংসস্তূপে আর কোন প্রাণের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা খুবই কম। তার মধ্যে বৃষ্টির কারণে উদ্ধার কাজ চালানো আরও জটিল হয়ে পড়েছে। মনে হচ্ছে প্রকৃতি আমাদের প্রতিকূলে।” শনিবারের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর দেশটির সরকারি হিসেবে এ পর্যন্ত নিশ্চিত প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৫শ’ ৮৯ জনে। আর আহত হয়েছে ১১ হাজার মানুষ।
যেভাবে উদ্ধার হলো দুটো জীবন
কাঠমুন্ডুর বিধ্বস্ত হিলটন হোটেল থেকে উদ্ধার হয় ১৫ বছর বয়সী কিশোর পেমা লামা। পেমা বেঁচে আছে এমনটা টের পাওয়ার পর খুশিতে আত্মহারা হয়ে ওঠেন উদ্ধারকারীরা। উদ্ধার সরঞ্জামাদি নিয়ে ৬ ঘন্টার চেষ্টায় তাকে বের করে আনা হয়। উদ্ধারের পর পেমা জানায়, ধ্বংসস্তূপে আরও দুজন এখনও বেঁচে আছে। বুধবার পর্যন্ত তাদের চিৎকার শুনেছে পেমা। এর পর পরই ভবনটিতে নেপালী ও মার্কিন উদ্ধারকারী দল সমন্বিতভাবে আবারও অভিযান শুরু করে।
এদিকে বক্তপুর এলাকা থেকে ১১ বছর বয়সী এক বালিকাকে ধ্বংস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। নেপাল টাইমসের সম্পাদক কুন্ড দিক্ষীত টুইটারে খবরটি জানিয়েছেন।
প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে বেশ ক’জন বিদেশি পর্বতারোহী উদ্ধার
নেপালের গোর্খা উপত্যকা থেকে দুর্গতদের উদ্ধারের জন্য টহল দিচ্ছিল একটি হেলিকপ্টার। হঠাৎ করে পাইলটের নজর পড়ে একটি সহায়তার আবেদনে। হেলিকপ্টারটি জরুরিভাবে সেখাওন অবতরণের পর খুঁজে পায় বেশ ক’জন বিদেশি পর্বতারোহীকে। চারদিন ধরে কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছিলেন না তারা। শেষে দশ ফুট ধরে একটি একটি রেখা এঁকে সেখানে বড় করে হেলপ লিখে রেখেছিলেন তারা। উদ্ধারের পর তাদের পোখারায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
দুর্বল চিকিৎসা অবকাঠামো; হাসপাতালে পচছে মরদেহ
নেপালের চিকিৎসা অবকাঠামো বেশ দুর্বল উল্লেখ করে স্থানীয় এক চিকিৎসক জানান, কোন ধরনের বিপর্যয় ছাড়াই রোগীদের সামলাতে হিমশিম খেতে হয় তাদের। ২০১১ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেব অনুযায়ী, নেপালে প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য চিকিৎসক আছেন মাত্র দুজন। রয়েছে হাসপাতাল আর শয্যা সঙ্কটও। কাঠুমুন্ডু শহরের হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে অশনাক্তকৃত মরদেহের সংখ্যা। পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় মরদেহ নিয়েও হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা। কেবল ত্রিভূবন ইউনিভার্সিটি টিচিং হসপিটালেই আছে ২২৭টি মরদেহ। কাঠমুন্ডু ভিত্তিক এক চিকিৎসকের বরাতে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া জানায়, কেবল তাঁর হাসপাতালেই ২০টি অশনাক্তকৃত মরদেহ পঁচতে শুরু করেছে।
একদিকে মানবিক সহায়তার সঙ্কট আর আরেকদিকে রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা
ভয়াবহ ৭ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্পের পর যারা প্রাণে বেঁচে গেছেন এখন জীবনের ঝুঁকিতে রয়েছেন তারাও। জাতিসংঘের হিসেব অনুযায়ী, ভূমিকম্পে নেপালের প্রায় ৬০ হাজার ঘর-বাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৮০ লাখ মানুষ। ঘর-বাড়ি হারিয়ে অনেক মানুষই গেল কয়েক দিন ধরে অস্থায়ী আশ্রয় শিবিরে রাত কাটাচ্ছেন। ইউনিসেফ জানায়, এসব শিবিরে গাদাগাদি করে মানুষ দিন কাটাচ্ছে। সেখানকার পরিবেশ যথেষ্ট স্বাস্ত্যকর নয়। নিরাপদ পানি ও টয়লেটের ব্যবস্থাও সেখানে নেই। ইউনিসেফের মতে, যারা আশ্রয় নিয়েছেন তাদের যদি এখানে দীর্ঘ দিন থাকতে হয়, তবে কলেরা, ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ প্রাদুর্ভাব আকারে ছড়িয়ে পড়বে।
ত্রাণের অভাবে ক্ষুব্ধ মানুষ
৫ দিন পেরিয়ে গেছে। কিন্তু হাতে নেই জীবন ধারণের ন্যুনতম সম্বলটুকু। নেই বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য, পানির সংকুলান। আর তাই ত্রাণ ব্যবস্থাপনার জন্য সরকারের দুর্বলতাকে দায়ী কওে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন মানুষ। এরইমধ্যে বিভিন্ন জায়গায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভও করেছেন তারা।