May 3, 2026
নাশরাত আর্শিয়ানা চৌধুরী : ঢাকা ও চট্টগ্রাম তিন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের জন্য এখনও গ্রীন সিগ্যনাল দেয়নি সরকার। সরকারের ইচ্ছে এই স্থানীয় নির্বাচনে সেনা মোতায়েন না করা। অন্যান্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো যেভাবে করেছে সেইভাবেই করা। এই কারণে বিএনপি, আদর্শ ঢাকা আন্দোলন, বিএনপি চেয়ারপারসন অন্যান্যরা সেনাবাহিনী সিটি নির্বাচনে মোতায়েন করার জন্য দাবি জানিয়ে আসলেও সরকার সেটা চাইছে না। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের ভেতরেও সেনা মোতায়েন নিয়ে সিদ্ধান্ত হীনতা দেখা দিয়েছে কমিশনারদের মধ্যে। সেখানে এই বিষয়ে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হলে কমিশনের পাঁচজন কমিশনারের মধ্যে অন্তত তিনজনকে একমত হয়ে সিদ্ধান্তে স্বাক্ষর করতে হবে। সেটা করার পর তারা সেনা মোতায়েন করার জন্য সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের কাছে প্রয়োজনীয় সেনা সদস্য চেয়ে আবেদন করতে পারবে। রোববার কমিশনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বৈঠকের পর কমিশনারা আরো একটি বৈঠক করেন। সেখানে বেশিরভাগ সদস্য সেনা মোতায়েনের ব্যাপারে ইতিবাচক মত দেন। কিন্তু দুইজন শুরু থেকেই সেনা মোতায়েনের পক্ষে ছিলেন না। এই কারণে বিষয়টি নিয়ে বার বার আলোচনা করতে হয়েছে। সোমবারেও নির্বাচন কমিশনে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্যান্যরা বৈঠক করেন। সেখানে তারা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। কিন্তু সেখানে বেশিরভাগ সেনা মোতায়েনের পক্ষে সিদ্ধান্ত দেননি। সেটি না দেওয়ার কারণে সেনা মোতায়েনের বিষয়টি অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পরেছে।
এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নির্বাচন কমিশনের কমিশনাররা সেনা মোতায়েন নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে মত দিলেও মূল সমস্যা হচ্ছে সিটি নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের ব্যাপারে সরকার আগ্রহী নয়। এই কারণে তারা চাইছেও নির্বাচনে সেনা মোতায়েন হোক। সরকারের সিনিয়র মন্ত্রীদের বেশিরভাগই সেনা মোতায়েনের বিপক্ষে।
এই ব্যাপারে সরকারের নীতি নির্ধারক একজন মন্ত্রী বলেন, নির্বাচন কমিশন সেনা মোতায়েন করবে কি করবে না সেটাতো তারা সিদ্ধান্ত নিবে। কিন্তু আমি সরকারের অংশ হিসাবে এটাই মনে করি যে এই নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের কোন প্রয়োজন নেই। এর আগে অন্যান্য সিটি নির্বাচনেও সেনা মোতায়েন করা হয়নি। তাহলে এখন কেন করতে হবে? এর আগের উপজেলা নির্বাচন হয়েছে। ওই নির্বাচনে সেনা মোতায়েন করা হয়নি। কয়েকটি ধাপে ওই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম দিকে বিএনপির সমর্থিতরা যখন জয়ী হচ্ছিল তখন বিএনপি নির্বাচন সুষ্ঠ হচ্ছিল বলে মত দেয়। এরপর যখন জনগন ও ভোটাররা তাদেরকে ভোট দিচ্ছিল না বলে একের এক প্রার্থী পরাজিত হয় তখন তারা ওই নির্বাচন সুষ্ঠ হচ্ছে না বলে অভিযোগ তুলে। আর সেটা তুলে তারা বলে নির্বাচন সুষ্ঠ হয়নি। বিএনপির এটা স্বভাব। তারা জয়ী হলে বলে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে, আর নির্বাচনে পরাজিত হলে বলে নির্বাচন সুষ্ঠ হয়নি। এই কারণেই সমস্যা হয়। তিনি বলেন, সিটি নির্বাচনেও অবস্থাটা সেই রকম দাঁড়িয়েছে। বিএনপি তিন মাসের বেশি আন্দোলন করেছে। মানুষ মেরেছে, গাড়ি পুড়িয়েছে। সহিংসতা করেছে। সরকারকে উৎখাত করার ষড়যন্ত্র করেছে। বিএনপি নেত্রী যখন আন্দোলন করে ফসল তুলতে পারলেন না তখন তিনি নিজেই সংবাদ সম্মেলন করে তার আন্দোলন থেকে বাইরে আসার চেষ্টা করলেন। যখন দেখলেন জনগণ তার পাশে নেই তখন তিনি নিজে নিজে আদালতে হাজির হয়ে জামিন নিয়ে বাড়িতেও ফিরে গেলেন। তারা প্রথমে মনে করেছিলেন নির্বাচনে অংশ নিবেন না। পরে আবার অংশও নিচ্ছেন। এখন আবার শুনি তারা থাকবেন কিনা সেটাও নাকি অনিশ্চয়তা রয়েছে। আমরা যতখানি জানি তারা নির্বাচনের বাইরে যাওয়ার জন্য নতুন করে আন্দোলনের সুযোগ খুঁজছে। এই কারণেই তারা নানা অজুহাত দেখাচ্ছেন। আর সাত দিন আগে সেনাবাহিনী মাঠে নামানোর দাবি জানিয়ে আসছে। তিনি বলেন, এমন কোন পরিবেশ হয়নি যে সেনা বাহিনীর সদস্যদের নির্বাচনে মোতায়েন করতে হবে। বরং নির্বাচনের পরিবেশ ভালই রয়েছে। ভোটাররা নির্বিঘেœ ভোট দিতে পারবেন এই নিশ্চয়তা সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিশ্চিত করবে। এই জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনে আরো নেওয়া হবে। কিন্তু আমরা সেনা মোতায়েনের পক্ষে নই। বরং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাই সব ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
এই ব্যাপারে আইনমন্ত্রীর কাছে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেন, বিএনপি তিন মাস আন্দোলন করে দেশে নানা ধরনের সহিংসতার ঘটনা ঘটানো ছাড়াও মানুষ হত্যা করেছে। মানুষকে পুড়িয়েছে। অবরোধ ও হরতাল ডেকে দেশের অর্থনীতির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এই সরকারের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করে সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতায় যাওয়ার ষড়যন্ত্র করে ব্যর্থ হয়েছে। জনগণ তাদেরকে সাড়া দেয়নি। তাদের আন্দোলন চলাকালে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সকল জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ব্যবস্থা নিয়েছে। কয়েকটি ঘটনা ছাড়া প্রায় সব ঘটাতেই তারা নিয়ন্ত্রণ আনতে সক্ষম হয়। এখনতো পরিস্থিতি ভাল। কোন আন্দোলন নেই। বিএনপির সমর্থিত প্রার্থীরা নির্বাচনের মাঠে রয়েছেন। তাদের নেতারাও রয়েছে। এই অবস্থায় বলা যায় পরিস্থিতি পুরোপুরি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যেখানে পুরো দেশের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে সেখানে কেবল ঢাকা ও চট্টগ্রামে তিনটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের দাবি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ সেটার প্রয়োজনীয়তা নেই। আমরা মনে করি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নির্বাচনের সময় সকল প্রার্থী, ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছাড়াও ভোটাররা যাতে নিবিঘেœ ভোট দিতে পারেন সেই ব্যবস্থাও নিশ্চিত করবেন। তিনি বলেন, সেনাবাহিনী একটি গুরুত্বপূর্ন বাহিনী। এই বাহিনীকে নিয়ে কেউ বিতর্কের সৃষ্টি করুক সেটা আমরা সহ্য করবো না। আমরা সেনাবাহিনীকে নিয়ে কোন ধরনের বিতর্ক তৈরি করারও সুযোগ দেব না। এই কারণে আপাতত সেনাবাহিনীও মাঠে নামানো হবে না। এরপরও নির্বাচন কমিশনের যেহেতু স্বাধীনতা রয়েছে সেনা মোতায়েন করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সেটা দেখতে হবে তারা কি কারণে সেনা মোতায়েন করার সিদ্ধান্ত নিতে চায়। তাদেরকে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আগের স্থানীয় নির্বাচনের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাতো সব ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নিশ্চয়তাও দিচ্ছে।
সাবেক নির্বাচন কমিশনার বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, এখন চাইলেই কমিশন সেনাবাহিনী মোতায়েন করার সিদ্ধান্ত নিয়ে তার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে সরাসরি সেনাবাহিনীর সদস্যদের চাইতে পারবে না। এই জন্য তাদেরকে সরকারের কাছেই আবেদন করতে হবে। সরকার সিদ্ধান্ত দিলেই তারা সেনা মোতায়েন করতে পারবে। তারা সিদ্ধান্ত নিলো কিন্তু সরকার দিলো না তাহলেতো সিদ্ধান্ত নিলেও কোন লাভ হবে না। নারায়নগঞ্জের বেলায় আমরা সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়ে সেনাবাহিনীর সংশ্লিস্টদের কাছে দুই ব্যাটেলিয়ন সেনা সদস্য চেয়েও শেষ পর্যন্ত পাইনি। সেনার পরিবর্তে র্যাব দিয়েছে। সেই সময় কমিশনের এখতিয়ার ছিল সরাসরি নেওয়ার তারপরও মিলেনি। এই সরকারই ক্ষমতায় ছিল। আর এখন তারা ক্ষমতায় থাকার পর তখনকার মতো এই অবস্থা ঢাকা ও চট্টগ্রামে না থাকার পরও সেনা মোতায়েন করার জন্য সেনা সদস্যদের দিবে কিনা এনিয়ে আমার সংশয় রয়েছে।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন সেনা মোতায়েন করার সিদ্ধান্ত নিলো দেখা গেল সরকার দিলো না। তখন কি হবে। সেনাবাহিনী ছাড়াই নির্বাচন করতে হবে। নির্বাচনতো যথা সময়ে হতে হবে।
এদিকে সূত্র জানায়, সরকার সেনাবাহিনী মাঠে নামতে না দেওয়ার পেছনে অনেক হিসাব নিকাশ রয়েছে। আর সেই সব হিসাব নিকাশ বিবেচনা করেই শেষ পর্যন্ত কমিশন সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিতে পারবে কিনা এটা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এরপর তারা পারলেও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের কাছে সেনা সদস্য চেয়ে চিঠি পাঠালে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রধান হিসাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই ব্যাপারে অনুমোদন দিবেন কিনা সেটা নিশ্চিত নয়। সেনা মোতায়েনের চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে শেষ পর্যন্ত ইসি সশস্ত্র বাহিনীর কাছে চিঠি দেয় কিনা সেটা দেখতে হবে। সূত্র আরো জানায়, সরকার শুরু থেকেই সেনা মোতায়েনেই আগ্রহী নয় বলে শুরু থেকেই দুই কমিশনার সেনা মোতায়েনের বিপক্ষে ছিলেন। সোমবার পর্যন্ত তিনজন পক্ষে থাকলেও দুপরের পর তা তিন জন থেকে দুই জনে দাঁড়ায়। সব মিলিয়ে সরকার যদি না চায় তাহলে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে সেনা মোতায়েন সম্ভব নাও হতে পারে। কমিশন থেকে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও সরকার থেকে সিদ্ধান্ত আসতে পারে একদিন আগে। আর চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত কমিশন নিতে না পারলে বেশিরভাগ কমিশনার পক্ষে মত না দিলে ওই আবেদন সরকার পর্যন্ত যেতেও হবে না।