পৃথিবীকে জেনে নিন আপনার ভাষায়….24 Hrs Online Newspaper

বিমানের ককপিটে যেভাবে যুক্ত হলো ব্ল্যাকবক্স

Posted on April 12, 2015 | in তথ্যপ্রযুক্তি | by

358851_620নিউজ ডেস্ক: ১৯৬২ সালের ২৩শে মার্চ। বিমান নিরাপত্তার জন্য ক্যালেন্ডারের পাতায় একটি উল্লেখযোগ্য দিন। বিমানের ককপিটে সেদিন একটি ফ্লাইট রেকর্ডার পরীক্ষামূলক ভাবে প্রথম চালানো হয় অস্ট্রেলিয়ায় যেটি পরবর্তীতে ব্ল্যাকবক্স নামে বিশ্বের যাত্রীবাহী সব বিমানে অবিচ্ছেদ্য একটি অঙ্গ হয়ে উঠে। কিন্তু কেমন ছিলো এই গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র আবিস্কারের ইতিহাস। এ নিয়ে এক বিশেষ প্রতিবেদন করেছে বিবিসি বাংলা প্রভাতী ।

সেদিন ওই পরীক্ষামূলক যন্ত্রে মাত্র একটি রেকর্ডিংই হয়েছিলো। তাতে ককপিটের সব ধরনের যন্ত্রপাতির রিডিং ছিলো। আর তার উপর দিয়ে ছিলো কণ্ঠস্বরের স্পষ্ট রেকর্ডিং। আজকের ইলেকট্রনিক দুনিয়ায় ব্যাপারটা খুব সহজ বা সাদামাটা মনে হতে পারে কিন্তু তখন কণ্ঠস্বরকে পেছনের শব্দ থেকে আলাদা করার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ছিলো রীতিমতো জটিল। বলছিলেন ব্ল্যাক বক্সের উদ্ভাবক ডেভিড ওরেনের মেয়ে জেনি ওরেন।

জেনি বলেন, ‘আজ বিশ্বের প্রত্যেকটি যাত্রীবাহী বিমানে এ ব্ল্যাক বক্সের আধুনিক সংস্করণ বাধ্যতামূলক হয়ে গেছে। কারণ গবেষকরা বলছেন এই ব্ল্যাকবক্স থেকে সংগৃহীত তথ্য বিমান যাত্রাকে আরও নিরাপদ করে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।’

ব্ল্যাকবক্স আবিষ্কারের কাহিনী শুরু ১৯৫০ এর দশকের গোড়ায়। যখন ডেভিড ওরেন কাজ করতেন অস্ট্রেলিয় সরকারের ইয়ারোনিটিকোল রিসার্চ ল্যাবরোটরিতে।

জেনি বলেন, ‘আমার বাবা ছিলেন একজন জ্বালানী বিজ্ঞানী। ১৯৫৩ সালে বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক জেড বিমান কমেটেড দুর্ঘটনায় বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা নিয়ে তিনি তদন্ত করছিলেন। তখন এ ধরনের দুর্ঘটনা কিভাবে এড়ানো যায় সে বিষয় নিয়ে তাকে একটি সম্মেলনে যোগ দিতে বলা হয়েছিলো। জেনি ওরেন বলেন, তার বাবার মাথায় সব সময় নতুন নতুন আইডিয়া খেলতো। তিনি খুব দ্রুত ভাবতে পারতেন। কমেট বিমান নিয়ে ঐ সম্মেলনে যখন অনেক কথাবার্তা চলছে তখন তার বাবা পৌছে গেছেন অন্য এক জগতে। তিনি তখন ভাবছিলেন বিশ্ব বাণিজ্য মেলায় দেখা একটা টেপ রেকর্ডারের কথা। সেই টেপ রেকর্ডারটি তাকে রীতিমতো মুগ্ধ করেছিলো। তিনি ওটা দেখে এতো মুগ্ধ হযেছিলেন যে তিনি ভেবেছিলেন টমেডরসি ব্যান্ডের একটি কনসার্টে ওই টেপ রেকর্ডারটা তিনি নিয়ে যাবেন এবং অনুষ্ঠানটা রেকর্ড করবেন। ওই সম্মেলনে বসে বাবার তখন হঠাৎ ওই টেপরেকর্ডারের কথা মনে পরলো। তিনি ভাবলেন কোনো বিমান দুর্ঘটনা এড়াতে হলে দুর্ঘটনার সময় কি হয়েছিলো আগে তা জানতে হবে। কিন্তু বিমান দুর্ঘটনা থেকে প্রাণে বাঁচা খুবই ভাগ্যের ব্যাপার। তার হঠাৎ মনে হলো আচ্ছা ওই রকম একটা টেপ রেকর্ডার যদি বিমানে রাখা যায় তাহলে দুর্ঘটনার সময় আসলে কি ঘটেছে তা বিমানের পাইলটই বলতে পারবে। তাহলে আর প্রাণে বেঁচে যাওয়া যাত্রীর উপর নির্ভর করতে হবে না, দরকার হবে শুধু একটা টেপ রেকর্ডার।’

সম্মেলনের পর ডেভিড ওরেন তার গবেষণাগারে ফিরে গেলেন এবং বিমানের ভেতর ফ্ল্যাইট রেকর্ডার বসানোর জন্যে লিখিত প্রস্তাব দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তার ভাবনাকে বাস্তব রূপ দিতে তিনি কাজেও লেগে গেলেন। ডেভিড ওরেনের সহকর্মী বিল্ডস কোফিল্ড বলেন, গবেষণাগারের পরিচালক তার এই উদ্ভাবনীয় উদ্যোগ বন্ধ করার জন্য উঠে পড়ে লাগলেন। কারণ তার বক্তব্য ছিলো ডেভিডের আসল কাজের সাথে এর কোন সম্পর্কই নেই। তার হাতে অন্য কাজ রয়েছে এবং সেটা শেষ করা তার কর্তব্য। কিন্তু ডেভিড বললো, তার এই কাজটা অন্য কাজের থেকে অনেক কম গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই কাজের পেছনে সময় ব্যয় করাটাই বেশি প্রয়োজনীয় বলে মনে করছেন তিনি।

বিল্ডস কোফিল্ড তার সহকর্মী ছাড়াও খুব ঘনিষ্ট বন্ধু ছিলেন এবং তাকে ভালো করে জানতেন। বিল্ডস বলেন, ডেভিড খুবই দৃঢ়চেতা মানুষ ছিলেন। সেই সাথে তার ছিলো প্রচণ্ড উদ্যোম আর উৎসাহ। কোন আইডিয়াকে সফল করার ব্যাপারে তিনি ছিলেন নাছোড়বান্দা। সে জন্য অবশ্য তাকে সমস্যায়ও পড়তে হতো।

১৯৫৭ সালের মধ্যে তিনি একটি নমুনা মডেল তৈরি করে ফেলেন। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার বিমান কর্তৃপক্ষ তার পরীক্ষা নিয়ে মোটেও আগ্রহী ছিলো না। সে সময় এক সাক্ষাৎকারে ডেভিড ওরেন এমনটাই বলেছিলেন। তিনি বলেন, তাদের জবাব ছিলো খুবই হতাশাব্যঞ্জক। তাদের উত্তর ছিলো আমরা তোমার যন্ত্র চাই না। তোমার যন্ত্র নিলে ব্যবহারের থেকে ব্যাখ্যার প্রয়োজন হবে বেশি। আর তাদের দ্বিতীয় জবাব ছিলো বেসামরিক বিমান চলাচল ব্যবস্থায় ডেভিড ওয়ারেনের এই আবিষ্কারের এই মুহূর্ত্বে কোনো গুরুত্ব নেই।

বাবার আশা ভঙ্গের কথা বলেছেন, তার ছেলে পিটার ওরেন। তিনি বলেন, আমার মনে আছে বার বার কিভাবে বাবার আশা ভঙ্গ হয়েছে। কর্তৃপক্ষ কেন তাকে বার বার বাধা দিচ্ছে, কেন তাকে এগুতে দিচ্ছে না সেই প্রশ্নই তিনি ঘুরে-ফিরে করতেন। পিটার আরও বলেন, তার বাবা প্রাতিষ্ঠানিক দিক থেকে কোন সুযোগ-সুবিধা না পেলেও সহকর্মীরা তার সাথেই ছিলেন। ডেভিড ওরেন গোপণন তার কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন আর সহকর্মীরা গোটা প্রকল্পটা গোপন রাখতে যা যা করণীয় সবই করছিলেন। ১৯৫৮ সালে এলো অপ্রত্যাশিত এক সুযোগ। কিভাবে সে সুযোগ এলো তা এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ডেভিড ওরেন।

তিনি বলেন, আমাদের ডিরেক্টরের একজন বন্ধু এসেছিলেন যুক্তরাজ্য থেকে পরে আমি জেনেছিলাম তিনি যুক্তরাজ্যের বিমান চলাচল শিল্পের একজন কর্তা ব্যক্তি রবার্ট হাডিন। যাহোক আমি তাকে আমার যন্ত্রটা দেখিয়ে শুধু বলেছিলাম এটা যদি বিমানে বসানো যায় তাহলে কোন কারণে যদি বিমানটি দুর্ঘটনায় পড়ে তাহলে দুর্ঘটনার আগে পাইলট ঠিক কি কথা বার্তা বলেছিলো তা রেকর্ডিং এবং বিমানের ককপিটের বিভিন্ন যন্ত্রপাতির রেকর্ডিং এতে ধরা থাকবে। আমার মনে আছে, ওই ভদ্রলোকের কণ্ঠস্বর। তিনি বলেন এটাতো একটা দারুন আইডিয়া। ছেলেটাকে শিগগির লন্ডনে পাঠিয়ে দাও তার যন্ত্রপাতিশুদ্ধ। আমি দেখলাম ডিরেক্টরের চোখ দুটো উজ্বল হয়ে উঠেছে।

ডেভিড মনে করলেন শেষ পর্যন্ত মনে হয় একটা সুযোগ পাওয়া গেলো। তখন ওই ডিরেক্টর বলেছিলেন ডেভ তোমার পাসপোর্ট রেডি করো।

ডেবিডের মেয়ে জানায়, যখন তিনি লন্ডনে যেয়ে তার যন্ত্রটি দেখালেন তখন সেখানে আলোড়ন ছড়িয়ে পরেছিলো। নিজের দেশে ফিরে তিনি আরেকটি নমুনা মডেল নিয়ে কাজ চালালেন।

এরপর ১৯৬০ সালের ১০ই জুন কুইন্সল্যান্ডের ম্যাকাইতে এক বেসামরিক বিমান দুর্ঘটনা ঘটলো। বিমানের যাত্রী ও সব ক্রু মারা গেলেন। সেটা ছিলো অস্ট্রেলিয়ার প্রথম সব চেয়ে বড় বিমান দুর্ঘটনা। কেন বিমানটি দুর্ঘটনার শিকার হলো তা তদন্ত করেও বের করা যায়নি। বিচারক সিদ্ধান্ত দিলেন অস্ট্রেলিয়ার সব বিমানে ফ্লাইট রেকর্ডার বসাতে হবে। কিন্তু তখনও ডেভিডের উদ্ভাবিত মডেলটি কিনতে রাজি হননি।

অস্ট্রেলিয়া একটি আমেরিকান যন্ত্র কিনলো যেটি আসলে ওই কাজের জন্য নয়। অবশেষে ডেভিডের যন্ত্রটি কিনলো ব্রিটিশ একটি সংস্থা। এবং তার যন্ত্রটি পরিচিতি পেলো ‘রেড এগ’ নামে । কারণ ফ্লাইট রেকর্ডারের রং ছিলো লাল আর আকৃতি ছিলো ডিমের মতো। শেষ পর্যন্ত তার যন্তটি দিয়ে কাজ চালানো হলো।

আজ ডেভিড লরেনের তৈরি ব্লেকবক্স প্রতিটি বিমানে ব্যবহার করা হচ্ছে।

Comments are closed.

সর্বশেষ খবর

আজকের ছবি

www.facebook.com

Tag Cloud