March 14, 2026
বান্দরবান : কর আদায়ের মধ্যে দিয়ে বান্দরবান পার্বত্য জেলায় ঐতিহ্যবাহী ১৩৭তম বোমাং রাজ পুণ্যাহ মেলা শুরু হয়েছে। শুক্রবার সকাল থেকে তিন দিনব্যাপী এ মেলা শুরু হয়। শুক্রবার সকাল দশটায় সৈন্য বেষ্টিত হয়ে বোমাং রাজা উ চ প্রু চৌধুরী হাতে তলোয়ার এবং মাথায় রাজ মুকুট পরে রাজভবন থেকে অতিথিদের নিয়ে পুরাতন রাজবাড়ি মাঠের মঞ্চে আসেন। একদিকে পাহাড়ী বদ্যযন্ত্রের সুর, অন্যদিকে আদিবাসী তরুনীরা ফুল ছিটিয়ে রাজাকে বরণ করে নেয়। পরে তিনি প্রজাদের কাছ থেকে বাৎসরিক কর (রাজস্ব) আদায় করেন। এ সময় উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন গণপূর্তমন্ত্রী মোশারফ হোসেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, জেলা প্রশাসক কে এম তারিকুল ইসলাম প্রমুখ।

মেলাকে ঘিরে জেলার ১১টি আদিবাসী সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যমণ্ডিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এ সময় পাহাড়ী-বাঙ্গালীদের মিলন মেলায় পরিণত হয় অনুষ্ঠানস্থল। এ ছাড়া দেশি- বিদেশী পর্যটকরাও সেখানে ভিড় জমান। মেলায় পুতুল নাচ, সার্কাস, নগরদোলাসহ কয়েকশ স্টল বসানো হয়েছছে।
২০০ বছরের ঐতিহ্য অনুসারে প্রতিবছর রাজা তার প্রজাদের কাছ থেকে কর (রাজস্ব) আদায়ের জন্য এই মেলার আয়োজন করে থাকেন। স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের কাছে রাজপুণ্যাহ উৎসব ‘পইংজারা পোওয়ে’ নামে পরিচিত।
দূর দূরান্ত থেকে আদিবাসী সম্প্রদায়ের হেডম্যান, কারবারীসহ সাধারণ লোকজন রাজার কাছে মেলার প্রথম দিন উপহার হিসেবে মুরগী, মদের হাড়ি, চাল, ধান, বাগানের ফলমূল ইত্যাদিসহ ফুলেল শুভেচ্ছা জানাতে আসে। আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রবীণ নেতা হিসেবে রাজার আশীবার্দ পাওয়ার জন্য সকাল থেকে দুর্গম পাহাড়ী এলাকা থেকে অনুষ্ঠানস্থলে এসে ভিড় জমান আদিবাসীরা। বোমাং সার্কেলের আদিবাসীদের কাছে রাজাকে দেবতুল্য বলে গণ্য করা হয়।
বান্দরবান বোমাং সার্কেলের ৯ হাজার জুমিয়া পরিবার আছে। প্রতি জুমিয়া পরিবার থেকে বাৎসরিক রাজকর ৬ টাকা করে নেওয়া হয়। তা থেকে সরকারের কাছে চলে যায় ২ টাকা ২৫ পয়সা। ১ টাকা ২৫ পয়সা পান মৌজার হেডম্যানরা। বাকি ২ টাকা ৫০ পয়সা পান বোমাং রাজা। ১৯৮৮ সাল থেকে শত শত বছরের ধারাবাহিকতায় ১৭ তম রাজা হিসেবে গত বছরের ২৪ এপ্রিল শপথ গ্রহণ করেন বোমাং রাজা উ চ প্রু চৌধুরী।
রাজ পুণ্যায় বোমাং রাজা উ চ প্রু চৌধুরী বলেন, ‘প্রত্যেক মৌজায় স্কুল, উপজেলায় হাইস্কুল এবং বান্দরবানে বিশ্ব বিদ্যালয় স্থাপন করার জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’
বৃটিশ শাসন আমলে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলাকে তিনটি সার্কেলে বিভক্ত করে খাজনা আদায় করা হতো। ১৮৬৬ সাল পর্যন্ত চাকমা রাজা পার্বত্য এলাকা শাসন করতো। ১৮৬৭ সালে কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ অঞ্চলের মারমা অধ্যুষিত এলাকাকে বোমাং সার্কেল এবং ১৮৭০ সালে রামগড় ও মাইনি উপত্যকার এলাকাকে নিয়ে মং সার্কেল গঠিত হয়।
বর্তমানে রাঙ্গামাটিকে চাকমা সার্কেল, বান্দরবানকে বোমাং সার্কেল এবং খাগড়াছড়িকে মং সার্কেল হিসেবে গণ্য করা হয়। প্রায় ১৭৬৪ বর্গমাইল এলাকার বান্দরবানের ৯৫টি এবং রাঙামাটির রাজস্থলি ও কাপ্তাই উপজেলার ১৪টি মৌজা নিয়ে বান্দরবান বোমাং সার্কেল।
এদিকে রাজ পুণ্যাহ মেলাকে ঘিরে সকাল থেকে বান্দরবানের রাজার মাঠের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।