April 21, 2026
ঢাকা: মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত নেতা ও জামায়াতের সাবেক রোকন মোবারক হোসেনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আখাউড়া থানার এই রাজাকার কমান্ডারের মামলার রায়ে হত্যা, অপহরণ, জোরপূর্বক আটকে রাখা, নির্যাতন ও লুটপাটের ৫টির মধ্যে হত্যা-গণহত্যার দু’টি অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে সর্বোচ্চ এ দণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (২৪ নভেম্বর) এ রায় ঘোষণা করেন চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম, বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি আনোয়ারুল হকের সমন্বয়ে ৩ সদস্যের ট্রাইব্যুনাল।
৩৫ জনকে হত্যা, ৩ জনকে অপহরণ করে জোরপূর্বক আটকে রেখে নির্যাতন ও লুটপাটের মতো পাঁচটি মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত হয়েছিলেন মোবারক হোসেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন’১৯৭৩ এর ৩(২)(এ), ৩(২)(জি), ২০ (২) এবং ৪(১) ধারা অনুসারে এসব অভিযোগ আনা হয়।
এসব অভিযোগের মধ্যে ১ নম্বর অভিযোগ আখাউড়া থানার টানমান্দাইল ও জাঙ্গাইল গ্রামে ৩৩ জনকে হত্যা এবং ৩ নম্বর অভিযোগ ছাতিয়ান গ্রামের আব্দুল খালেককে হত্যার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। ১ নম্বর অভিযোগে মোবারককে ফাঁসি ও ৩ নম্বর অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে মোবারককে।
বাকি তিন অভিযোগ আনন্দময়ী কালীবাড়ী রাজাকার ক্যাম্পে আশুরঞ্জন দেবকে নির্যাতন (২ নম্বর), শ্যামপুর গ্রামের দু’জনকে অপহরণ করে একজনকে হত্যা (৪ নম্বর) এবং খরমপুর গ্রামের একজনকে আটক রেখে নির্যাতনের (৫ নম্বর) প্রমাণিত না হওয়ায় এসব অভিযোগ থেকে খালাস পেয়েছেন মোবারক।
এক অভিযোগে ফাঁসি
প্রমাণিত প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরের ২২ আগস্ট মোবারক হোসেনসহ অন্য রাজাকাররা আখাউড়ার টানমান্দাইল গ্রামে হাজি নূর বকশের বাড়িতে সভা ডাকেন। বেলা দুইটা-আড়াইটার দিকে ১৩০-১৩২ জন গ্রামবাসীকে ওই বাড়িতে নিয়ে জড়ো করা হয়। তখন মোবারক ও তার সহযোগীরা পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সেখানে অভিযান চালিয়ে ওই গ্রামবাসীদের আটক করে গঙ্গাসাগর দীঘির কাছে পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পে নিয়ে আটকে রাখেন। আটক ব্যক্তিদের মোবারক ও তার সহযোগীরা জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতন করেন। তিনি টানমান্দাইল গ্রামের ২৬ জন ও জাঙ্গাইল গ্রামের সাতজনসহ ৩৩ জনকে বাছাই করে তেরোঝুড়ি হাজতখানায় নিয়ে যান। ২৩ আগস্ট পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকাররা ওই ৩৩ জনকে দিয়ে গঙ্গাসাগর দীঘির পশ্চিম পাড়ে একটি গর্ত খোঁড়ায়। পরে তাদের গুলি করে হত্যা করে এবং ওই গর্তে মাটি চাপা দেয়।
এ অপরাধের দায়ে ফাঁসির দণ্ডাদেশ পেয়েছেন মোবারক হোসেন।
এক অভিযোগে যাবজ্জীবন
প্রমাণিত তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছাতিয়ান গ্রামের আবদুল খালেক মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহযোগিতা করতেন। একাত্তরের ১১ নভেম্বর রাত আটটা-নয়টার দিকে মোবারক সশস্ত্র রাজাকার সহযোগীদের নিয়ে খালেককে অপহরণ করে সুহিলপুর ইউনিয়ন পরিষদের রাজাকার ক্যাম্পে নিয়ে নির্যাতন করেন। খালেকের ছেলে রফিকুল ইসলামসহ অন্যরা এর প্রত্যক্ষদর্শী। ওই রাতে খালেককে তিতাস নদীর পশ্চিম পাড়ে বাকাইল ঘাটে নিয়ে গুলি করে ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়। পরদিন স্বজনেরা তার মরদেহ উদ্ধার করে কোলামুড়ি কবরস্থানে দাফন করেন।
এ অপরাধের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে মোবারক হোসেনকে।
প্রমাণিত হয়নি যে তিন অভিযোগ
প্রমাণিত না হওয়া দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধকালে মোবারক ও অন্য স্বাধীনতাবিরোধীরা ‘আনন্দময়ী কালীবাড়ি’ নামের হিন্দু মন্দিরের প্রতিমা ভাঙচুর ও মালামাল লুটের পর দখল করে এর নাম রাখেন ‘রাজাকার মঞ্জিল’। ২৪ অক্টোবর মোবারক শিমরাইল গ্রামের আশুরঞ্জনকে অপহরণ করে আহত অবস্থায় চার দিন রাজাকার মঞ্জিলে আটকে রাখেন। পরে মোবারক ২৮ অক্টোবর তাকে কুড়ুলিয়া খালের পাড়ে নিয়ে গুলি করে হত্যা করেন।
প্রমাণিত না হওয়া চতুর্থ অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরের ২৪-২৫ নভেম্বর বেলা দুইটা-আড়াইটার দিকে মোবারকের নেতৃত্বে রাজাকাররা খড়মপুর গ্রামের খাদেম হোসেন খানকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানার স্টেশন রোড থেকে অপহরণ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজে স্থাপিত সেনাক্যাম্পে আটকে রাখেন। পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকাররা খাদেমকে উল্টো করে ঝুলিয়ে অমানবিক নির্যাতন করে। পরে তাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কারাগারে পাঠানো হয়। ৬ ডিসেম্বর অন্য কয়েকজন বন্দির সঙ্গে খাদেমকে কুড়ুলিয়া খালের পাড়ে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়।
প্রমাণিত না হওয়া পঞ্চম অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরের ২৮-২৯ নভেম্বর রাত ১১টার দিকে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের সঙ্গে নিয়ে মোবারক খড়মপুর গ্রামের আবদুল মালেক ও আমিরপাড়া গ্রামের মো. সিরাজকে অপহরণ করেন। তাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজের সেনাক্যাম্পে নিয়ে অমানবিক নির্যাতনের পর কারাগারে পাঠানো হয়। ৬ ডিসেম্বর পূর্বপরিকল্পনার অংশ হিসেবে মোবারক ও তার রাজাকার সঙ্গীরা কারাগারে আটক আরও কয়েকজনের সঙ্গে সিরাজকে কুড়ুলিয়া খালের পাড়ে নিয়ে গুলি করে হত্যা করেন।
বেলা বারটা থেকে শুরু করে ৫ মিনিটে মূল রায় অর্থাৎ অপরাধ প্রমাণিত হওয়া-না হওয়া ও শাস্তির অংশ ঘোষণা করেন ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম। তিনি এ অংশে জানান, মোবারকের বিরুদ্ধে ১ ও ৩ নম্বরে আনা হত্যা-গণহত্যার দু’টি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। অন্য তিন অভিযোগ প্রসিকিউশন সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পারেননি উল্লেখ করেন। সবশেষে মোবারককে দুই অভিযোগে শাস্তি ও তিন অভিযোগে খালাস দেন চেয়ারম্যান।
এর আগে বেলা এগারটা ৪০ মিনিট থেকে মোবারকের মামলার রায়ের দ্বিতীয় ও পর্যবেক্ষণ অংশ পড়েন বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন। তিনি এ অংশে মোবারক যে রাজাকার কমান্ডার ছিলেন তা প্রমাণিত হয়েছে বলে জানান। বেলা এগারোটা ২২ মিনিট থেকে রায়ের প্রথম অংশ আসামির পরিচিতি ও তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগসহ রায়ের সূচনা বক্তব্য পাঠ করেন বিচারক প্যানেলের অপর সদস্য বিচারপতি আনোয়ারুল হক।
মোট ৯২ পৃষ্ঠার রায়ের সারসংক্ষেপ পাঠ করেন বিচারকরা। এর আগে সকাল দশটার দিকে ট্রাইব্যুনালে এসে বেলা সোয়া এগারটার দিকে ট্রাইব্যুনালের এজলাসকক্ষে আসন নেন বিচারপতিরা। শুরুতে সংক্ষিপ্ত ভূমিকা বক্তব্য দেন চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম।
এর আগে বেলা এগারটা দশ মিনিটে ট্রাইব্যুনালের আসামির কাঠগড়ায় তোলা হয় মোবারককে। সকাল সোয়া নয়টার দিকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে একটি প্রিজন ভ্যানে করে ট্রাইব্যুনালে এনে হাজতখানায় রাখা হয় তাকে। তার পরনে ছিল সাদা রঙের পাঞ্জাবি। সকাল নয়টার দিকে মোবারককে কারাগার থেকে বের করে তাকে নিয়ে ট্রাইব্যুনালের উদ্দেশ্যে রওনা হয় প্রিজন ভ্যানটি। পুরোটা সময় তাকে চিন্তাযুক্ত দেখালেও তিনি হাত উঁচিয়ে ‘ভি’ চিহ্ন দেখান।