May 25, 2026
দিলরুবা সরমিন
বেশ কয়েকদিন যাবৎ একের পর এক মেয়েদের হত্যা বা আত্মহত্যার সংবাদ সহানুভূতির সাথে পাঠ করে যাচ্ছি। আমরা কেবল এদের জন্য সহমর্মিতাই জানাতে পারি। এছাড়া আমাদের আর কী-ই বা করার আছে? কারণ আমরা তো সাধারণ জনগণ।
সম্প্রতি ঘটেছে ডা. শামারুখ মাহজাবিন কনার হত্যাকা-। ধানমন্ডিতে দিন দুপুরে তার শ্বশুরের বাসায় মেয়েটি মারা গেল। যেখানে তার শ্বশুর এডভোকেট খান টিপু সুলতান ( সাবেক সংসদ সদস্য, যশোর, মনিরামপুর আসন), শাশুড়ী ডা. জেসমিন আরা বেগম ( হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের গাইনি চিকিৎসক) এবং মাহজাবিন তার স্বামীর সাথে বাস করত।
ডা. মাহজাবিনকে আমি চিনি না। কখনো দেখিও নাই। কিন্তু একটি মেধাবী ও সম্ভাবনাময়ী মেয়ের জীবন প্রস্ফুটিত হওয়ার আগেই ঝরে যাবে এটি কোন অবস্থাতেই মেনে নেওয়ার নয়। সেটি যেই ঘটিয়ে থাকুক , যেভাবেই ঘটে থাকুক না কেন।
বরং আমি চিনি এডভোকেট খান টিপু সুলতানকে। একজন আইনজীবী হিসাবে তো বটেই পাশাপাশি আমার এলাকার কাছাকাছি এলাকা থেকে বেশ কয়েকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার জন্য। তার স্ত্রী ডা. জেসমিন আরা বেগমকেও চিনি। চিকিৎসক হিসাবেও চিনি এবং খান টিপু সুলতানের স্ত্রী হিসাবেও। তাদের দুই ছেলেকেও চিনতাম ছেলেবেলাতেই। সেই দুই ছেলের এক ছেলে হুমায়ূনের বিয়ে হল আর তার স্ত্রী খুনও হয়ে গেল?
আমি এখানে খান টিপু সুলতানের বা তার পরিবারের রোজ নামচা খুলতে বসিনি। বসেছি একটি সম্ভাবনাময়ী মেয়ের জীবন অকালেই শেষ হয়ে গেল কেন সেটা জানতে? কেন বার বার মেয়েদের ওপরই নানা ভাবে নানা দিক থেকে আঘাত আসে? কেন?
মাহজাবিন তার মৃত্যুর আগে তার বাবার সাথে ফোনে ৩২ মিনিট কথা বলেছিলেন। বাবাকে বলেছেন, শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে পড়াশুনা করতে দিচ্ছে না, ৩৫ তম বিসিএস পরীক্ষার ফরম পূরণ করতে দেয়নি, এফসিপিএস পরীক্ষাও দিতে দেবে না, তার স্বামী তাকে মেরে ফেলবে- তার এসব কথা শুনে প্রকৌশলী বাবা নূরুল ইসলাম কেবল সান্ত¦না দিয়েছে এবং বলেছে ২/১ দিনের মধ্যই তিনি ঢাকায় এসে মাহজাবিনের শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে কথা বলবেন। ব্যস! এই পর্যন্তই একজন বাবার দায়িত্ব ?
মেয়ের এই আকুতির পরও কেন তার বাবা ছুটে এলেন না? কেন? মেয়েদেরকে কেবল “বোঝানো” “সান্ত¦না” দেওয়ার এই মানসিকতা বাবাদের কবে শেষ হবে? মেয়েকে কেবল বিয়ে দিয়ে পার করে দেওয়ার মানসিকতা এখনো আমরা পরিবর্তন করতে পারলাম না?
খান টিপু সুলতান ও তার স্ত্রী ডা. জেসমিন আরা বেগম দুজনেই শিক্ষিত ও স্ব – স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। তাদের সন্তান (হুমায়ূন সুলতান) যত খারাপই হোক তাকে কেন তারা সুশিক্ষা দিতে পারলেন না? স্ত্রীর মর্যাদা বিষয়ে বোঝাতে পারলেন না? মাহজাবিনকে তার ক্যারিয়ার প্রতিষ্ঠিত করতে দিলেন না? আসলে এ সবই “পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার” সুস্পষ্ট প্রমাণ।
শুনেছি হুমায়ূনের নাকি ব্যারিস্টারি ডিগ্রিটিও সঠিক নয়। এছাড়া ধনী পরিবারের সদস্য হলে চেহারা ছবিতে একটু চকচকে ভাব থাকলে, দামি পোশাক পরলে, দামি গাড়ি থাকলে বা অভিজাত এলাকার বাসিন্দা হলে তো কোন কথাই নাই। শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে কেউ কোন প্রশ্নই তুলবে না বা সাহসই পাবে না।
স্বামী হুমায়ূন সুলতান টেলিভিশন সাংবাদিকদেরকে যেভাবে ধীরস্থির ও শান্তভাবে জানালেন, সামান্য কথা কাটাকটিতে অভিমান করে মাহজাবিন নিজেই আত্মহত্যা করেছে। তবে সেটি কতটুকু বিশ্বাসযোগ্য? যদি হুমায়ূনের কথাই সত্য হয় তবে সে কেন এতটা ধীরস্থির ছিল? কীভাবে সম্ভব? কেন একটি সম্ভাবনাময়ী মেয়ে দিন দুপুরে নিজের বাসায় আত্মহত্যা করবে? তার দু:খের- কষ্টের মাত্রাটা কোন যন্ত্র দিয়ে আমরা পরিমাপ করবো?
আর যদি সেটিও সত্য হয় এর পেছনের কারণ তো খুবই স্পষ্ট। মেয়েটি নিজেকে গড়তে চেয়েছিল সেটি তার স্বামী চায়নি এবং শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে সহযোগিতা করেনি। এখানে কাজ করেছে একটি নি¤œমানের মন মানসিকতা। কেন একজন নারী ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ শিখরে উঠবে?
আমরা সব সময় একটি মেয়েকে কেবল চার দেয়ালের মাঝেই দেখতে অভ্যস্ত। ভুল বললাম, নিজের মেয়েকে নয় ছেলের বউকে। নিজের মেয়েকে আজকাল অনেক বাবা মা লেখা পড়া শেখাচ্ছে। বিয়ের বাজারে আজকাল ছেলেরা শিক্ষিত বউ চায় বলে। তারপর বিয়েটা হয়ে গেলে মেয়েটি তার লেখাপড়া সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারছে কিনা সেই বিষয়ে বাবা- মায়ের অতটা মাথা ব্যাথা থাকে না। আর শ্বশুরবাড়ির লোকজন ছেলের জন্য শিক্ষিত মেয়ে পছন্দ করে। কারণ সমাজে তাকে তো পরিচয় দিতে হবে আমার ছেলের বউ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, লইয়ার, প্রফেসর। আমাদের সমাজ কাঠামোয় ঠিক এই পর্যন্তই মেয়েদের আইডেনটিটি। এর বাইরে আমরা আজো যেতে পারিনি বা চাই না।
তাই একদিকে যেমন সম্ভাবনাময়ী মেয়েগুলোর অকালে জীবনাবসান ঘটছে ঠিক তেমনি যারা বেঁচে থাকছে তারা অনেকেই নামমাত্রই বেঁচে আছেন । কারণ মানসিকতা আমাদের এখনো রান্না ঘরের বাইরে চাতালেও আসেনি। তাই আমরা একটি মেয়ের সাইকেল চালানো, মোটরসাইকেল চালানো, গাড়ি চালানো, প্লেন চালানো স্তম্ভিত হয়ে দেখি! আমরা মেয়েটিকে কোন প্রতিষ্ঠানের প্রধান, সালিশের প্রধান হিসাবে মেনে নিতে পারি না।
তাই অকালেই, অসময়ে, অবেলায় ঝরে যাচ্ছে অসংখ্য মাহজাবিন।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে যে কোন মূল্যে অন্তত এ সব ক্ষেত্রে পক্ষপাতহীন থাকতেই হবে। নইলে আজ যে মাহজাবিনের জীবন গেল কাল যে তার নিজের ঘরে যাবে না এই নিশ্চয়তা কে দেবে ?
একজন বিজ্ঞ আইনজীবী এবং সাবেক আইন প্রণেতা হিসাবে খান টিপু সুলতানও নিশ্চয়ই সেটিই চাইবেন যেমনটি একজন চিকিৎস হিসাবে ডা. জেসমিন আরা বেগমও চাইবেন- আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা পাক। অর্থ বা ক্ষমতার চাইতেও যে আইন সবার উর্ধ্বে” সেটি আবারো প্রমাণিত হোক।
লেখক: দিলরুবা সরমিন, আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী