May 4, 2026

১৯৯৭ সালের ১৩ নভেম্বর। ডক্টর হুমায়ূন আহমেদ স্যারের ৪৯ তম জন্মবার্ষিকী। হুমায়ূন স্যার কামরুল নামের একটি ছেলেকে ডেকে পাঠালেন আমাকে ঢাকা নেওয়ার জন্য। কামরুল হুমায়ূন স্যারের পৈতৃক নিবাস নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুর গ্রামে ১২ তারিখ আসে। তার সঙ্গে আলাপ করে জানতে পারি, স্যারের জন্মদিনে আমাকে গান গাইতে হবে। এমন একজন গুনী মানুষের জন্মদিনে আমি গান গাইব শুনে আমার আর আনন্দের সীমা রইল না। কথা শুনার সঙ্গে সঙ্গেই আমার মনে কৌতুহল জাগে, স্যারের কাছে কখন যাব, জন্মদিনে কি গান গাইব, এই রকম নানা প্রশ্ন। ১৩ তারিখ আমি আমার ঢুলি কালাচাঁন, হারমোনিয়াম বাদক রন্জু মিয়া, মন্দিরা বাদক মোন্নাফ মিয়া ও বংশী বাদক কাঞ্চন মিয়াকে সঙ্গে নিয়ে কামরুলের সঙ্গে ঢাকা রওনা হই। বিকাল ৩টার মধ্যে আমরা ঢাকা পৌঁছে যাই। কামরুলকে নিয়ে আমরা চলে যাই আমার পূর্ব পরিচিত হুমায়ূন স্যারের ধানমন্ডির বাড়িতে। আমাদেরকে পৌঁছে দিয়েই কামরুল কাট মারল। আমরা ঝিম ধরে নীচ তলার ড্রয়িং রুমে বসে রইলাম। পাাঁচ- সাত মিনিট পরেই বাড়ির পরিচারিকা এসে আমাদেরকে এক নজর দেখে কিছু না বলেই চলে গেল। স্যার অন্য একটি রুমে লেখালেখি করছেন। কিছুক্ষণ পর আমাদেরকে ডাকা হল স্যারের রুমে যাওয়ার জন্য। আমরা সবাই সেখানে গিয়ে স্যার ও তার সহধর্মিনী (গুলতেকিন আহমেদ) কে পায়ে ছুঁয়ে সালাম করে পাশে দাঁড়ালাম। স্যার পাশের একটি সোফায় বসার ইঙ্গিত দিলেন। আমাকে বললেন, চা নাস্তা খেয়ে ‘কুতুবপুরের ভাইসাব আইছুন ভাবীরে লইয়া’ এই গানটি শুনাও। আমরা চা নাস্তা খেয়ে এই গানটি শুনাই। গানের কথা-
কুতুবপুরের ভাইসাব আইছইন ভাবীরে লইয়া
কই গেলেরে মিনা আর হেনা তাড়াতাড়ি দেখ আইয়া !! ঐ
খবর কও গেয়া দাদুর কাছে
সাথে আরও মেহমান আছে
তাড়াতাড়ি পূবের ঘরে
বিছ্নাডা দেও বিছাইয়া !!ঐ
h-ahamed ১৯৯৭ সালে হুমায়ূন স্যারের জন্মদিনে
এটি আমার রচিত একটি গান। বাহুল্য ভয়ে গানের সব কথা এখানে আর দেওয়া হল না। এই গানটি ১৯৯৩ সালে স্যারের পৈতৃক নিবাস নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুর গ্রামে স্বস্ত্রীক যখন আসেন তখন স্যার ও ভাবী (স্যারের সহধর্মিনী) কে নিয়ে তাৎক্ষণিক রচনা করে গেয়েছিলাম। স্যারের জীবদ্দশায় এই গানটি শতাধিকবার আমার কণ্ঠ শুনেছেন। গানটি শুনায়ে আমরা পাঁচ তলায় চলে যাই বিশ্রামের জন্য। স্যার বাহিরে কোথায় চলে গেলেন, কি যেন একটা বাঁশির সুর রেকর্ডিং করবেন। মূল গানের অনুষ্ঠান সন্ধ্যায়। দিন মনি অস্ত যাওয়ার পূর্বেই অনেক গেস্ট ফুলের তোড়া হাতে নিয়ে আসতে লাগলেন। ফুলের স্তবক ছাড়াও অনেক উপহার নিয়ে আসছেন অনেকেই। ইতিমধ্যেই ঘরের এককোন ভরে গেছে পুষ্পস্তবকে। পলাশ, গাদা, হাসনাহেনা, রজনীগন্ধা আর লাল গোলাপের স্তবক যেন পুষ্প স্তুপে পরিণত হয়েছে। বসার ঘরে ডাইনিং টেবিলে বিশাল বড় আকারের কেক। সাদা ও বেগুনী রংয়ের কেকের উপর গোলাপী বর্ণের লেখা শুভ জন্মদিন। সন্ধ্যা সমাগত। কিছুক্ষণ পরেই শুরু হবে গান। হঠাৎ চেয়ে দেখি পাশেই বসে আছেন আমার অত্যান্ত প্রিয় মানুষ বেলাল বেগ (শিক্ষক, সাবেক টিভি প্রযোজক ও গনসংযোগ কর্মী) তার সঙ্গে আছেন আরও তিনজন সাংবাদিক। এমন একজন গুণী মানুষের জন্মদিনে বেলাল বেগ সাহেবকে পেয়ে আমার আনন্দটা আরও দ্বিগুন বেড়ে গেল। তিনি গান খুব পছন্দ করেন। সন্ধ্যা ৭টার কাছাকাছি। অনেক লোকজন এসেছেন সেখানে। একটু পরেই শুরু হবে গান। অনুষ্ঠানের শুরুতেই স্যারের তনয় নূহাশ চলে এলেন স্যারের কাছে। নুহাশ আসার সঙ্গে সঙ্গেই স্যার, সবার উদ্দেশ্যে বলেন, প্রিয় সুধী মন্ডলী, এখন আপনাদের সম্মুখে প্রদর্শিত হবে নূহাশের একক চিত্র প্রদর্শনী। নূহাশ তখন ছোট্ট এক বালক। তার কল্পনায় তিমি, সাপ, ক্যাকটাস, হরিন, অক্টোপাস ইত্যাদি চিত্রকর্ম দিয়ে সত্যিই অবাক করে দিলেন সবাইকে। সেদিন সেই অনুষ্ঠানে এসেছিলেন স্যারের অনুগত ছাত্র শিল্পী সেলিম চৌধুরী, তুহিন প্রমুখ। শুরু হল গান। আমাকে বলা হল জন্মদিনের গান গাওয়ার জন্য। কেক কাটার সঙ্গে সঙ্গেই আমি আমার বেহালা কাধে নিয়ে গান শুরু করি।
স্যারের শুভ জন্মদিন (২)
তুমিত কলম যাদুকর তুলনাবিহীন !!ঐ
১৯৪৮ সনে
এসেছিলেন এই ভূবনে
শুভদিনে শুভক্ষনে ১৩ নভেম্বর এই দিন !!ঐ
তোমার সৃষ্টি কর্ম কাজে
তোমার তুলনা তুমিই নিজে
কোটি ভক্ত হৃদয় মাঝে
বেঁচে থাকবে চিরদিন !!ঐ
আজকে তোমার জন্মদিনে
কি দেব তাই ভাবছি মনে
বসাইলাম হৃদয় আসনে
কয় বাউল ইসলাম উদ্দিন !!ঐ
তারপর তোমরা শুনে যাও খবর, একজন কলম যাদুকর
নেত্রকোনায় জন্ম গেল হইয়া।
১৯৯৭ সালে হুমায়ূন স্যারের জন্মদিনেএই গানটি পরিবেশন করি। একে একে আমি গাছের নাম, মাছের নাম, সখি গো আমার মন ভালানা, কালার সাথে পিড়িত কইরা সুখ পাইলাম না এই সমস্ত গান পরিবেশন করি। শেষ গানটি গাওয়ার সময় স্যার আমাকে বললেন, আজ এই অনুষ্ঠানে আমার একজন বন্ধু এসেছেন তার দেশ নেদারল্যান্ড নাম মিঃ ফাকার। তুমি গানের মধ্যে তার নামটি এড করে দিও। আমি তাৎক্ষণিক গাইতে থাকি।
নেদারল্যান্ডের মিঃ ফাকার সভায় আছেন বইয়া
তাহার কাছে ইসলাম উদ্দিন সালাম দেই পাঠাইয়া !!
বিদেশী বন্ধুর পাশেই বসেছিলেন অভিনেতা আব্দুল কাদের। তিনি বাংলা জানেন কি না জানি না। তবে নাম উচ্চারনের সঙ্গে সঙ্গেই আমার দিকে তাকিয়ে হাসি দিয়ে কাদের ভাইয়ের সঙ্গে কি জানি কি বলছেন ও দুজনেই হাসছেন। তারপর সেলিম চৌধুরী গাইলেন বাউলা কে বানাইলরে, নিশা লাগিলরে ইত্যাদি হাছন রাজার গান। শিল্পী তুহিন গাইলেন সত্তরটা হুর চাইনা আমি। রজনী দ্বিপ্রহর অনুষ্ঠান শেষ পর্যায়ে। এবার খাওয়ার পালা। কিছু লোক ছাড়া অনেকেই চলে গেছেন। মুরগীর বিরিয়ানী খেয়ে আমি আমার দল নিয়ে চলে যাই রাত্রীযাপনের জন্য পাঁচ তলায়। পনের বিশ মিনিট পর টেলিফোনে ক্রিং ক্রিং শব্দ। আমি ফোনটা রিসিভ করলে কে জানি বলছেন বয়াতি ভাই, স্যার আপনাকে ডাকছেন নীচ তলায় আসতে। আমি ত্বরা করে নীচে নেমে আসি। এসে দেখি একজন বাঁশিওয়ালা আমি তাঁকে চিনিনা। স্যার আমাকে বললেন ও এখন বাঁশি বাজাবে । উপমহাদেশের খ্যাতনামা বংশি বাদক। তার বাড়িও নেত্রকোনা, নাম বারী সিদ্দিকী। বারী সিদ্দিকী তাঁর এক বুন্দা বাঁশি থেকে একটি মোটা বাঁশি হাতে নিয়ে বাজাতে শুরু করেন। সঙ্গে একজন তবলাওয়ালা। কি অসাধারন সুরের লহরী তাঁর বাঁশিতে। সবাই যেন ডুবে গেলাম সেই অসাধারন বাঁশির সুরের গভীর ভাব সাগরে। স্যারও খুব গভীর মনোযোগ দিয়ে বাঁশি শুনছেন। এক সময়ে থেমে তাঁর যাদুর বাঁশী। স্যার বারী ভাইকে বললেন গান শুনাতে। বারী ভাই উকিল মুন্সির দুটি গান গাইলেন। গান শুনে সবাই অবাক। স্যার ও দর্শকগন মনেহয় সেদিন একজন অসাধারন গায়ক ও উকিল মুন্সির মত একজন অসাধারন বাউল সাধকের সন্ধ্যান পেল। সবাই বায়না ধরে আরও গান শুনার জন্য। বারী সাহেব নেত্রকোনা অঞ্চলের বাউল সাধক জালাল উদ্দিন খাঁন, সাধক রশিদ উদ্দিন ও উকিল মুন্সির বেশ কয়েকটি গান শুনালেন। রজনী শেষাংশে মুয়াজ্জিন এর মধ্যে নিদ্রা থেকে উপাসনা উত্তম বলিয়া আরবী ভাষায় সকল মুসলমানকে আহবান করিলেন। বন্ধ হল বারী সিদ্দিকীর হৃদয় কাটা বিচ্ছেদ গানের সুর সঙ্গীত। সবাই চলে গেল স্ব-স্ব গন্তব্য স্থলে। এমন ভাবেই আমরা ৯৭ সালে স্যারের জন্ম বার্ষিকী পালন করেছিলাম। আজ ২০১৪ সালের ১৩ ই নভেম্বর স্যারের ৬৬ তম জন্মবার্ষিকী। অনেক সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা আয়োজনের মাধ্যমে যথাযোগ্য মর্যাদায় জন্মদিন পালন করবে। স্যারের স্বপ্নের হিমুদেরকে নিয়ে চ্যানেল আই বিশাল আয়োজনের মাধ্যমে স্যারের জন্ম দিবসটি পালন করে আসছে। আমিও আমার দলকে নিয়ে ১৯৯৩ থেকে আজ অবধি স্যারের জন্মদিনটি পালন করে আসছি। সেদিনের সেই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন স্যার নিজেই। তিনি আর কোন অনুষ্ঠানের আয়োজন করবেন না। পাওয়া যাবেনা কোন অনুষ্ঠানের আয়োজন অথবা প্রয়োজনে। আমাকেও আর ডাকবেন না কোন নাটক, সিনেমায় গান গাওয়ার জন্য। জন্মদিন, নববর্ষ, হিমু দিবস বা পারিবারিক কোন অনুষ্ঠানে আমার গান শুনবেন না কোনদিন। আমার জীবনের প্রায় বিশটি বছর স্যারের সান্যিধ্যে থাকার সৌভগ্য হয়েছিল। সবাই জানি তিনি চলে গেছেন অজানা গন্তব্যে। তবু শ্রদ্ধা আর ভালবাসায় কোটি ভক্তের হৃদয় মাঝে বেঁচে থাকবেন চিরদিন। আজ স্যারের ৬৬ তম জন্ম বার্ষিকীতে স্যারের প্রতি রইল আমার অশ্রু সিক্ত ও বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলী।
লেখক: বাউল ও লোক গবেষক