May 3, 2026
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : প্রথমে ব্যাঙ্গলোর , তারপর কোচি। এভাবেই প্রায় এক বছর ধরে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন গৌতম আর আনশিদা। তাদের অপরাধ তারা ভিন্ন ধর্মের হয়েও পাস্পরকে ভালোবেসেছেন এবং বিয়ে করেছেন। তাদের দুই পরিবারের কেউই তাদের প্রেম ও বিয়ে মেনে নেয়নি। বিশেষ করে আনশিদার পরিবার। তারা এখনোও মেয়েকে ফিরিয়ে নেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন। এই প্রেমিক দম্পতির পিছনে লেলিয়ে দেয়া হয়েছে গুণ্ডা বাহিনী। প্রাণে বাঁচাতে দুই প্রেমিক-প্রেমিকার এই পলায়ন।
২৪ বছরের গৌতম এবং ২১ বছরের আনশিদা ইতিমধ্যে কোজিকোদায় রেজিস্ট্রি করে বিয়ে করেছেন। বিয়ের করা সময় এই প্রেমিক জুটিকে পাহাড়া দিয়েছে ভারতীয় কমুনিস্ট পার্টির সদস্যরা। কেননা বিয়ে ঠেকাতে পুলিশ নিয়ে ছুটে আসছিল গৌতমের বাবা-মা। আনশিদার পরিবারও কম যায় না। মেয়েকে ছাড়িয়ে নিতে তারা ইতিমধ্যে গুণ্ড বাহিনী ভাড়া করেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
মাত্র তিন দিন আগে রাতের বেলায় গৌতমের এক আত্মীয়ের বাড়িতে হামলা চালায় দুবৃত্তরা। তারা সবকটি জানালার কাচ ভেঙে গুড়িয়ে ফেলে। ১১ মাস ধরে পালিয়ে বেড়ানোর পর তিতি বিরক্ত হয়ে গত এক মাস ধরে এখানেই থাকতে শুরু করেছিলেন গৌতম, তার নতুন বৌকে নিয়ে। তার মধ্যেই এই হামলা। পেশায় প্রকৌশলী গৌতম এ সম্পর্কে এক্সপ্রেস ইন্ডিয়াকে বলেন,‘আমরা এক প্রকার গৃহবন্দি হয়ে আছি। ওরা বারবার আনশিদাকে হুমকি দিচ্ছে।’
প্রেমের কারণে ঘর ছাড়া এক বছর….স্কুলে পড়তেই নিচের ক্লাসে পড়া কিশোরী আনশিদাকে ভালো লেগে যায় গৌতমের। গোপনে দীর্ঘ কয়েক বছর গোপনই ছিল তাদের এ প্রেম। জানাজানি হওয়ার পর দুই পরিবারের কেউই তা মেনে নেয়নি। তখন আনশিদার ধর্মের কেউ কেউ সমাধানের চেষ্টা করেছিলেন। সমাধান বলতে তো সেই বিচ্ছেদ। কিন্তু দুজনের একজনও এতে রাজি হননি। হিন্দি ছবির নায়ক নায়িকাদের মত অবিচল তাদের প্রেম। পরিবারের বাধার মুখে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান গৌতম আর আনশিদা। তারা গোপনে ব্যাঙ্গালোর চলে যান এবং সেখানে পালিয়ে থাকতে শুরু করেন। ব্যাঙ্গালোরে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে চাকুরি নেন গৌতম।এর মধ্যেই এ বছর জানুয়ারিতে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন এই যুগল। ভেবেছিলেন বিয়ের পর সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু আনশিদার পরিবার কেরলা হাইকোর্টে মামলা দায়ের করার পর তারা ফের পালিয়ে যান। তখন তার চাকুরিও চলে যায়। ইতিমধ্যে ২০ সদদ্যের এক গুণ্ডবাহিনী ভাড়া করে আনশিদার পরিবার।
ওই গুণ্ডারা ব্যাঙ্গলোরে ওয়াইয়ানাদ এলাকায় গৌতমের এক আত্মীয়ের বাড়িতে হামলা চালায়। এরপর মার্চ মাসে তারা কোচি পালিয়ে যায়। এখানে ভারতীয় কমুনিস্ট পার্টির সদস্যদের প্রহরায় দীর্ঘ আট মাস এখানেই ছিলেন এই যুগল। খাবার দাবার থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় যাবতীয় সবকিছুই তারা যোগান দেন। এখানেই বিশেষ বিবাহ আইনের আওতায় তাদের বিয়ের প্রস্তুতি চলে। ১৭ সেপ্টেম্বর বিয়ের দিন নির্ধারিত হয়। বিয়ের খবর পেয়ে আনশিদার বাবা-মা ফোনে গৌতমের হাত পা ভেঙে দেয়ার হুমকি দেন। কিন্তু সাহস হারাননি এই প্রেমিক দম্পতি। স্থানীয় কমুনিস্ট নেতাদের প্রহরায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এই প্রেমিক যুগল। গত ৮ অক্টোবর তাদের বিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে রেজিস্ট্রি হয়েছে।
কিন্তু এরপরও তাদের সংগ্রাম শেষ হয়নি। আরশিদার বাবা-মা এখন ভার্চুয়াল জগতের আশ্রয় নিয়েছে। সম্প্রতি তারা মেয়েকে লক্ষ্য করে লিখেছেন,‘শোন মেয়ে, তুমি কি বুঝতে পাছো না এটি একটি অবৈধ সম্পর্ক। যেদিন সব শেষ হবে সেদিন ফিরে এসো আমাদের কাছে। যদিও সেদিন আমাদের কাছে ফিরে আসার মুখ তোমার থাকবে না।’
ইতিমধ্যে চাকুরি হারিয়েছেন গৌতম। আনশিদার ভবিষ্যতও এখন হুমকির মুখে। কারণ সে কেরলায় যে ডেন্টাল কলেজে পড়ত সেটি পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন স্থানীয় মুসলমানরা। কাজেই সেখানে আর ফিরে যাওয়ার কোনো উপায় তার নেই। তাই তার দন্ত চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন এখন বারো হাত পানির নিচে।
ব্যাঙ্গলোরের স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন আর কমুনিস্ট দলের লোকজন যদিও তাদের সহায়তা করছে। কিন্তু এভাবে পালিয়ে পালিয়ে আর কতদিন? তারা এখন সত্যিকার অর্থেই অনেক ক্লান্ত। স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্যও মুখিয়ে আছে তারা। কিন্তু কীভাবে- তা জানা নেই, দুজনার একজনেরও।
তবে স্থানীয় সিপিআই নেতারা তাদের সাহস দিচ্ছেন। ওই দলের পার্লোমেন্ট সদস্য নাদাপুরাম বলেন,‘আনশিদা যাতে কোনো রকম হুমকি ছাড়াই ওই ডেন্টাল কলেজে পড়তে পারে আমরা তার ব্যবস্থা করবে। আমাদের দল এই যুগলকে সবধরণের সহায়তা দিয়ে যাবে।
সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস