April 23, 2026
স্পোর্টস ডেস্ক : আর্জেন্টিনা বলতে কেবলই একজন মেসি নন- গতকাল মুলারের এই মন্তব্য সত্ত্বেও বাস্তবতা কিংবা ফুটবল ফ্যান ও বোদ্ধাদের ভাবনা অনুযায়ী আজ মধ্যরাতের পরে বিশ্ব একদিকে কাত হবে। একদিকে লিওনেল মেসি, অন্যদিকে দুই দেশ একত্রিত হওয়া ঐক্যবদ্ধ জার্মানি। ছেলে অবসন্ন বলে মেসির পিতা যদিও একটা নিরানন্দ বোমা ফাটিয়েছেন, কিন্তু তাতে কেউ হতাশ হওয়া দূর থাক, ওটা পিতার কথা। ছেলের প্রতি অপত্য স্নেহ আর যুক্তিহীন অনুরাগ থাকে। এটা শুনে কেউই আজ হতোদ্যম হতে চাইবেন না। অবশ্য মিরাকাল মিরাকলই। ঘটলে তা ঘটবে। গ্যারি লিনেকার, যিনি ১৯৮০ সালে ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ জিতেছেন, তিনিও অবশ্য বলেছেন, ম্যারাডোনার পরে আর্জেন্টিনার শ্রেষ্ঠ হচ্ছেন মেসি। কিন্তু মেসি ক্লান্ত। লিনেকারের কথায়, মেসি ‘জেডেড।’ এর মানে পরিশ্রান্ত ঘোড়া। তদুপরি লিনেকারের শ্রদ্ধা উপচে পড়ে: আমি আমার জীবনে ম্যারাডোনার পরে মেসির মতো ওয়ান্ডারফুলি গিফটেড খেলোয়াড় আর দেখিনি। মেসি স্কোর করেই চলেছেন। তার রেকর্ড অবিশ্বাস্য। দেখাই যাক ফাইনালে মেসি কি করেন। কিন্তু কেন জানি না, আমার কাছে ওকে একটি পরিশ্রান্ত ঘোড়া মনে হয়। এখন মেসির পিতাকেও এমনই ইঙ্গিত করতে দেখলাম। আমি মেসিকে ভালোবাসি। কিন্তু একথা বলতে আমার বাধে যে, মেসিকে ম্যারাডোনা হতে হলে তাকে একটি বিশ্বকাপ জিততে হবে। বিশ্বকাপ পেলে ভালই। কিন্তু তার ম্যারাডোনা হওয়ার জন্য এটা নিরঙ্কুশ নয়। লিনেকার এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক মিথে বিশ্বাসী নন। তিনি বলেন, এটাও ঠিক নয়, ম্যারাডোনা একা খেলেই বিশ্বকাপ জিতেছিলেন। তবে তার টিমে বেশ কয়েকজন ভাল খোলোয়াড় ছিলেন।
জর্জ বুরুচাগা, ভালদানো, অস্কার, হেক্টর, লুইস ব্রাউন ছিলেন। সত্যি বলতে কি একজনে খেলে বিশ্বকাপ জেতা যায় না। তবে টেলিগ্রাফের হেনরি উইন্টারে মন্তব্যই ঠাসা। তার কথায়, ‘মেসি ইতিহাসের সঙ্গে লড়ছেন। মেসি ইতিহাস বিনির্মাণের জন্য লড়ছেন। কোন সন্দেহ নেই যে মেসি বিশ্বকাপ নিতে পারলে ম্যারাডোনা ও পেলের সঙ্গে তার নামটিও ইতিহাসের পাতায় সোনার হরফে লেখা হবে। তবে এ বিস্ময়কর বিশ্বকাপ এখনও দেখার জন্য একটি সম্পূর্ণ মেসিকে উপহার দেয়নি।’ আসলে আজই হলো সেই দিন একটি সম্পূর্ণ মেসিকে। যাকে বহু উপলক্ষে বিশ্ব দেখেছে, তাকে আজ দেখতে হবে- দেখাতে হবে। মেসি তেমন মাপেরই খেলোয়াড় যিনি ইতিহাসের প্রত্যেকটি পৃষ্ঠায় তার নামটি সোনার হরফে লেখানোর যোগ্যতা ও মেধা রাখেন। জার্মান ও আর্জেন্টইন মিলিয়ে বিশ্বের সব ক’টি পত্রিকার প্রধান ও বর্ণাঢ্য শিরোনাম হওয়ার যোগ্যতা মেসির আছে। ডাচ সাম্রাজ্যের পতনের পরে রোবেনের সঙ্গে মেসির দেখা হয়েছিল। ‘মেসিই নাম্বার ওয়ান। ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ। বিশ্বকাপ জেতার যোগ্যতা তার আছে।’ আজ মেসিকে নিয়ে কোন হাপিত্যেশ নেই। নেইমারের দুর্ঘটনার পরে মেসি ভক্তরা মানছেন, মেসিকে আজ মাঠে দেখা যাবে, এটাই অনেক বড় ব্যাপার। মুলার বলেছেন, মেসির বিরুদ্ধে আমি বহুবার খেলেছি। আমার স্মৃতিতে তার সবটাই ইতিবাচক। আমি স্মরণ করতে পারি না যে, মেসির বিরুদ্ধে কোন অফিসিয়াল ম্যাচে খেলতে নেমে আমি কখনও হেরেছি। গতকাল তিনি এক নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে আরও বলেন, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমরা একটি টিম হিসেবে খেলছি। এবং আপনাকে গোটা আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে খেলতে হবে। মেসির পিতার কথায়, মেসির যদি তার পা দু’টোকে কখনও ১০০ কেজি ওজনেরই মনে হয়, তবু তো মেসি সেই পা দু’টো দিয়েই গ্রুপ লীগে হয় নিজে গোল করেছে কিংবা অন্যদের দিয়ে করিয়েছে। আজও তার নিজের গোল না হোক, ডি মারিয়াকে দিয়ে যেমনটা হয়েছিল তেমন একটি হলেও তার ভক্তরা বর্তে যাবে।
মেসি কখন কি করবেন সেটা তো আর কারও জানা থাকে না। যদিও জার্মানরা বলেছে তারা নাকি কি একটা টোটকা বের করেছে। সেটা দিয়ে তারা আটকে দেবে মেসি এক্সপ্রেস। অবশ্য একথাও সত্য তার প্রতিপক্ষ টমাস মুলার। জোয়াকিম দলের সবচেয়ে নিখুঁত শিল্পী। দুরন্ত গতি, অনবদ্য টেকনিক এবং গোল করতে হলে কোথায় ঘুঁটি গাড়তে হয় সেটা ওর নখদর্পণে। ইতিমধ্যে পাঁচ গোলে (বিপক্ষ পর্তুগাল ৩, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিল একটি করে) মেসির চেয়ে এগিয়ে একটি গোলে। এমনকি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর্তুগালের বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিক করাও সারা। বিশ্বকাপের সোনার বুটের দাবিদার যে তিনজন তার মধ্যে মেসি ও মুলার উভয়েই আছেন। সুতরাং, বিশ্বকাপের বিশ্বযুদ্ধটা একেবারে সোনায় সোনায় মোড়া। কিন্তু সমস্ত বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাস জানান দিচ্ছে জম্পেশ লড়াই একটা হবেই। গোলের ফুলকি কেউ আশা করে না। আশা করে একটি অবিস্মরণীয় নান্দনিক বিজয়। টাইব্রেকারে গড়ালেও কারও আফসোস থাকবে না। ফিফার পরিসংখ্যান মতে মেসি-মুলার উভয়ে এ কাপে ছয়টি ম্যাচ খেলেছেন। এ পরিসংখ্যান তুলনামূলক দেখলে মুলারকে তার শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীই মনে হবে। কিন্তু মেসির পূর্ব বৃত্তান্তের ঝাঁপি খুলতেই হবে না। সেখানে মুলারের সঙ্গে মেসিকে কেউ তুলনা করবেন না। একজন মেসি বনাম সমগ্র জার্মানি। এবারের কাপে মেসি খেলেছেন ৫৭৩ মিনিটি। মুলার ৫৬২ মিনিট। তারা শট করেছেন যথাক্রমে ১৮ ও ১৬টি। সম্পূর্ণ পাস করতে সাফল্য দেখিয়েছেন মেসি ২১৪ বার। মুলার সেখানে মাত্র ১৭০। বল পুনরুদ্ধারে মুলার একবার এগিয়ে। মেসি ৭। মুলার ৮। উভয়ে ট্যাকল করেছেন ৭ বার করে। সর্বোচ্চ গতি তোলার ক্ষেত্রে মেসির রেকর্ড ২৯.৬। মুলার ৩০.৫।
যদিও এটাই সত্য যে, মেসি এবারের কাপে পুরোপুরি জ্বলে ওঠেননি। তিনি কঠোর পরিশ্রমী। তদুপরি এবারের ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে অন্তত দূরত্ব কভার করার ক্ষেত্রে মেসিই বড় পিছিয়ে। তার অবস্থান এখন ৩০। ৬ ম্যাচে তিনি ৩২ মাইল দৌড়েছেন। ডাচদের স্নাইডার ৫৮৫ মিনিটে ৪৩ মাইল কভার করেছেন। তবে গতকাল আর্জেন্টিনাকে যখন অনিয়মের দায়ে ফিফা তাদের দু’লাখ পাউন্ড জরিমানা করলো, তখন অনেকরই হুঁশ হলো, গত চারটি ম্যাচে খেলা-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে মেসিদের একজনও উপস্থিত ছিলেন না। অথচ অন্তত একজনের থাকাটাই নিয়ম। সেটা কি তাহলে আর্জেন্টিানার জন্য জয় পেলেও টিমের মনের মতো জয় আনতে না পারার কারণেই? সেটা একটা প্রশ্ন হয়ে থাকবে। টমাস মুলারের আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি নেই। ব্রাজিলকে ৭-১ গোলে হারানোর দৃশ্য জার্মানির ৩৩ মিলিয়ন মানুষ টিভিতে দেখেছেন। সেটা ছিল জার্মানদের কাছে গেম অব দ্য সেঞ্চুরি। তবে আজকের খেলার রেফারি নির্বাচন নিয়ে জার্মান শিবিরে যাতে ঈষৎ ভ্রুকুঞ্চনের ঘটনা ঘটে সেই চেষ্টা আছে। কারণ ইতালির নিকোলা রিজোলিকে একটু নাকি মেসি-মাখা মনে করা হয়। এটা অবশ্য এখনও বেলিজিয়ামের ম্যানেজার মার্ক উইলমটসের উদ্ভাবন। তিনি বলেন, আর্জেন্টিনার সঙ্গে বেলজিয়ামের খেলায় রেফারি মেসিকে সুবিধা দিয়েছিলেন। জার্মানরা কেউ কিছু বলেনি। তবে মুলার বলেছেন, আমি জার্মানিতে সবাইকে ফোনে বলে দিয়েছি, তারা যেন বড়সড় বারবিকিউ পার্টির আয়োজনে মশগুল হয়। কারণ আমরা আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিচ্ছি। কারণ দেশের শ্রেষ্ঠ সময়কে উদযাপনের জন্য উত্তম প্রস্তুতির দরকার! মুলারের মতো মেসি গতকাল বা আগেও কখনও এমন প্রগলভ হননি।
মুলার বেশ অকপট। তিনি বলেছেন, ‘আমি অবশ্য ব্রাজিলের ম্যাচরে মতো অর্ধবিরতির আগেই ৫টি গোল আশা করি না। তবে তার চেয়ে কম হলেও অসুবিধা নেই। তার প্রত্যয় ও রসবোধ প্রখর। বলেন, দুর্ভাগ্যবশত আমি অবশ্য রিও শহরটি ঘুরে দেখতে এখন একটি গাইডেড টুর আয়োজন করতে পারি না। তাই এই শহরের ম্যাজিকটা ধরতে পরবো না। তাই কি আর করা। কেবল একটি কারণেই সেখানে তো যেতেই হবে। আর সেটা হল রোববারে টুর্নামেন্টের ট্রফি আনতে। আমরা জানি আমাদের কি করতে হবে। মুলার আরও বলেন, তারা (মেসিরা) সম্ভবত অনেক বেশি ফ্রি কিক পাবে না, যদি বেলজিয়াম ম্যানেজার রেফারি সম্পর্কে যা বলেছেন তার কিছুটাও ঠিক হয়। উইলমটস বলেন, মেসির ক্ষেত্রে কিছু একটা ঘটলেই হলো। রেফারি তাকে ফ্রি কিক দিয়েছেন। আমি নিশ্চয় শিশুর মতো কাঁদবো না। তবে রেফারি আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে কোন ফাউলের বাঁশি বাজাননি। আমি মেসিকে তিনটি ফাউল করতে দেখলাম। কিন্তু তাকে একটি হলুদ কার্ড দেয়া হলো না। উল্লেখ্য, এই বিশ্বকাপে রেফারি তিনটি খেলার সঙ্গে যুক্ত হলেন যেখানে আর্জেন্টিনা আছে। তবে আজ মেসি কিংবা মুলারের দিন। তবে সব কিছু ছাপিয়ে এই সত্যই উদ্ভাসিত টেলিগ্রাফের হেনরি উইন্টারের কথায়, ‘মেজিক্যাল মেসি ফেসেস ডে অব ডেস্টিনি।’ আজ মেসির নিয়তি জয়ের দিন।