April 24, 2026
বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক টুর্নামেন্টের খবরাখবর সংগ্রহে অনেকাংশে নির্ভর করতে হয় বার্তা সংস্থাগুলোর ওপর। বিশ্বকাপের আগ মুহূর্তে বার্তা সংস্থাগুলোর পাঠানো খবর-ছবি দেখে সত্যি শঙ্কা জেগেছে মনে—কী হচ্ছে ব্রাজিলে! যে দেশটি কিনা ফুটবল-তীর্থ, তারাই কিনা এবার ছিল বিশ্বকাপের বিরুদ্ধে! বিশ্বকাপ না হওয়ার দাবিতে প্রতিদিন ব্রাজিলের রাজপথ উত্তপ্ত হয়েছে আন্দোলন-বিক্ষোভে! ব্যাপারটা সত্যিই ভাবিয়ে তুলেছিল বিশ্বের তাবত্ সচেতন মানুষকে। বিক্ষোভকারীদের হাতে হাতে ছিল ব্যানার-পোস্টার। তাতে লেখা—‘কোপা প্রা কুয়েম?’ অর্থাত্ ‘এই বিশ্বকাপ কাদের জন্য?’ কিন্তু এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না।
২০০৭ সালের অক্টোবরে যখন ব্রাজিলকে বিশ্বকাপের আয়োজক হিসেবে নির্বাচিত হয়, তখন আনন্দের ঢেউ বয়ে গিয়েছিল ফুটবল-পাগল এই দেশটিতে। সাম্বার ছন্দে, আবেগে-আনন্দে ভেসেছিল ব্রাজিলের দক্ষিণের শহর পোর্তো আলেগ্রে থেকে উত্তরের মানাউস। ব্রাজিলের অর্থনৈতিক অবস্থা তখন এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে সেরা। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিদেশি বিনিয়োগ, ডলারের বিপরীতে ব্রাজিলিয়ান রিয়ালের দাম—সবকিছুই ঊর্ধ্বমুখী। এ অবস্থায় বিশ্বকাপের মতো বিরাট আয়োজন কোনো ব্যাপার?
কিন্তু দিন যত গড়াল, চিত্রটা পাল্টাতে শুরু করল। বিপুল অর্থ ব্যয়ে বিশ্বকাপ আয়োজন করতে গিয়ে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিতে মনোযোগ দিতে যেন ভুলে গেল ব্রাজিলের সরকার। অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের প্রায় সবটাই বিশ্বকাপের পেছনে খরচ করে শুরু করায় ব্রাজিলীয়দের দৈনন্দিন জীবনের মৌলিক কিছু চাহিদা যেমন, সুন্দর গৃহায়ণ, স্বাস্থ্যসেবা, গণপরিবহন ইত্যাদি পড়ে গেল অবহেলার চক্র পাকে। কোটি কোটি ডলার খরচ করে স্টেডিয়াম তৈরি করা শুরু হলো, কিন্তু হাসপাতালে সেবার মান বৃদ্ধি, সাও পাওলো, রিও ডি জেনিরোর মতো বড় শহরগুলোতে মানুষের যাতায়াতের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিতে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হলো না। শিক্ষা খাতও পিছিয়ে থাকল মনোযোগের ক্ষেত্র থেকে। এমন অবস্থায় বিশ্বকাপ নিয়ে গোটা দেশে তৈরি হলো নিদারুণ ক্ষোভ আর বিরোধিতা। কোটি কোটি ডলার খরচ করে যে স্টেডিয়ামগুলো তৈরি হলো, বিশ্বকাপের পর সেগুলোর কয়টি শ্বেত হস্তিতে পরিণত হবে—তা নিয়েও কথা শুরু হলো। এ ক্ষেত্রে আর্জেন্টিনার ফুটবল-গুরু সিজার লুইস মিনোত্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন, ‘আমি অর্থনীতিবিদ নই, তবে আমার মনে হয়েছে, এত বেশি খরচ না করে এবং এতগুলো নতুন স্টেডিয়াম না বানিয়েও ব্রাজিল বিশ্বকাপ আয়োজন করতে পারত। ফিফার চাহিদাকে আমি বাস্তবতা বিবর্জিত মনে করি। আমাদের উচিত বাস্তববাদী হওয়া, ঠিক ১৯৬২-এর চিলি বিশ্বকাপের মতো। আমাদের যা আছে, তাই নিয়েই তো কাজ করা উচিত।’
বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগে যে ইস্যুগুলো ব্রাজিলে ক্ষোভের সঞ্চার করেছিল, রাজপথ কাঁপিয়েছিল বিক্ষোভে, বিশ্বকাপ চলার সময়ও তা যেন আরও বেড়েছে। ব্রাজিলের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক কাফু আশাবাদী ছিলেন, ‘বিশ্বকাপে ব্রাজিল সাফল্য পেলে সব ঠিক হয়ে যাবে। আন্দোলন মিইয়ে আসবে।’ কথা ভুল বলেননি। বিশ্বকাপে নেইমাররা যখন সাফল্য পেতে শুরু করলেন, গোটা ব্রাজিল তখন বিক্ষোভের কালো রং ভুলে মেতে উঠল পুরোনো সেই হলুদ ঢেউয়ে। ব্রাজিলের রাস্তা, তোরণ, স্টেডিয়ামের ফটক, গ্যালারি, টানেল সব খানেই একটা লেখা দৃষ্টি আকর্ষণ করল ফুটবল-বিশ্বকে—‘বেম ভিন্দে’ অর্থাত্ ‘স্বাগতম’।
ব্রাজিলীয়রা তখনো জানত না, কত বড় দুঃখ অপেক্ষা করছে ৮ জুলাই, বেলো হরিজন্তের এস্তাদিও মিনেইরোতে। ফাইনালের আগে মারাকানায় একটি ম্যাচও খেলবে না ব্রাজিল—এটি মাথায় রেখেই ভেন্যু নির্বাচনের পরও ‘মারাকানাজো’ পিছু ছাড়ল না সেলেসাওদের। বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালে জার্মানদের বিপক্ষে ‘ইতিহাসের বড় লজ্জা’ নিয়ে মাঠ ছাড়ল তারা। আক্ষরিক অর্থে ব্রাজিলিয়ানদের কাছে বিশ্বকাপ এখন ‘চোখের বালি’ই!
১৯৫০ এরপর ২০১৪—যাতনাদায়ক গল্পের কেন পুনরাবৃত্তি? মারাকানাজোর পর কেন ‘মিনেইরোজো’? উত্তর কার কাছে পাবে ব্রাজিলীয়রা? যে দলটি খেলতে নেমেছিল বিশ্বকাপ শিরোপার আশায়। তাদের এখন খেলতে হচ্ছে দৃশ্যত ‘মূল্যহীন’ তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ! এমনভাবে শিরোপা-স্বপ্ন খুন হয়েছে ব্রাজিলের, গোটা ফুটবল-বিশ্ব তাতে হতবাক। ব্রাজিলিয়ানদের কাছে আক্ষরিক অর্থেই এখন বিশ্বকাপ ‘কোপা প্রা কুয়েম?’ এই বিশ্বকাপ কাদের জন্য? একদিক উত্তরটাও তৈরি—জার্মানি কিংবা আর্জেন্টিনার, অন্তত ব্রাজিলের নয়!