April 26, 2026
ঢাকা: নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায় সিআইডি শুধু অনুসন্ধান করবে বলে জানিয়েছেন হাইকোর্ট। অনুসন্ধান শেষে তারা প্রতিবেদন হাইকোর্টে জমা দেবে। বৃহস্পতিবার সিআইডি’র তদন্ত বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের শুনানি শেষে এ আদেশ দেন বিচারপতি মো. রেজা-উল হক ও বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ। একই রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন যথাযথ না হওয়ায় রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন খারিজ করে দেওয়া হয়েছে। বুধবার সিআইডি’র তদন্ত বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। বৃহস্পতিবার এ আবেদনের শুনানি শেষে আদেশ দেন হাইকোর্ট। এদিকে তদন্তকারী সকল কমিটির তৃতীয় দফায় দেওয়া তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন নিয়েও একই বেঞ্চে শুনানি হবে বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল। এর আগে মঙ্গলবার আদালতের নির্দেশে গঠিত প্রশাসনিক তদন্ত কমিটির তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়। তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিতে আরো ৪ সপ্তাহের সময়ের আবেদন করা হয়েছে।
তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দেন প্রশাসনিক তদন্ত কমিটির সদস্য আইন মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মিজানুর রহমান খান। তিনি জানান, তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিতে আরো ৪ সপ্তাহ সময় চেয়েছি আমরা। এর আগে গত ২ জুন ও গত ১৪ মে আরও দু’দফা পৃথক পৃথকভাবে তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, র্যাব, পুলিশ এবং সিআইডি’র তদন্ত কমিটি। ৪ জুন ও ১৫ মে এসব অগ্রগতি প্রতিবেদনগুলো হাইকোর্টে উপস্থাপন করেন অ্যাটর্নি জেনারেল। ৪ জুন প্রশাসনিকসহ সব তদন্ত কমিটিকে তদন্তের পরবর্তী অগ্রগতি প্রতিবেদন বুধবার ৯ জুলাইয়ের মধ্যে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন বিচারপতি মো. রেজা-উল হক ও বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ। এর মধ্যে কোনো কমিটির তদন্ত সম্পন্ন হলে সুপারিশসহ চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র-২ নজরুল ইসলাম ও আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারসহ সাতজনকে অপহরণ ও খুনের ঘটনায় র্যাব ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ অন্যদের জড়িত থাকার অভিযোগসহ সার্বিক বিষয়ে তদন্তে হাইকোর্টের নির্দেশে গত ৭ মে উচ্চ পর্যায়ের প্রশাসনিক একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। তদন্ত কমিটির প্রধান জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শাহজাহান আলী মোল্লার নেতৃত্বে ৭ সদস্যের এ কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দুই উপ-সচিব মো. আবদুল কাইয়ুম সরকার ও আবুল কাশেম মো. মহিউদ্দিন, আইন মন্ত্রণালয়ের দুই উপ-সচিব মোস্তাফিজুর রহমান ও মিজানুর রহমান খান এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুই উপ-সচিব শফিকুর রহমান ও সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দার।
এছাড়া আদালতের নির্দেশে পৃথকভাবে তদন্ত করছে র্যাব, পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) ও সিআইডি। র্যাব-১১ এর সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে ৪ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে তদন্ত করছে র্যাব। র্যাব-১১ এর ৩ কর্মকর্তাকে প্রথমে সেনাবাহিনীতে প্রত্যর্পণ করে পরে গত ৬ মে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। বিচারপতি মো. রেজাউল হক ও বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে গত ৫ মে অপহরণ, গুম, হত্যার ঘটনায় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো গাফিলতি আছে কিনা এবং র্যাব ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ অন্যদের জড়িত থাকার অভিযোগসহ সার্বিক বিষয়ে তদন্ত করতে এ তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। র্যাবের সহযোগিতায় সাতজনকে অপহরণের পর হত্যার ঘটনায় ৬ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ ওঠার পর হাইকোর্টের এ নির্দেশ আসে।
সাতজনকে অপহরণ ও হত্যা এবং ৬ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ বিষয়ে র্যাবের সম্পৃক্ততা আছে কি-না তা বিভাগীয়ভাবে তদন্ত করতে র্যাবের মহাপরিচালকের প্রতিও নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। তবে ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলা র্যাব তদন্ত করতে পারবে না বলে নির্দেশ দেওয়া হয়। এছাড়া পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) পাশাপাশি তদন্ত করতে সিআইডি (অপরাধ তদন্ত বিভাগ) প্রধানকে নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ঘটনার সকল সাক্ষীকে নিরাপত্তা দিতে পুলিশের আইজিকে (মহাপরিদর্শক) নির্দেশ দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় চাকরিচ্যুত র্যাব-১১ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মাহমুদ, সাবেক অধিনায়ক মেজর আরিফ হোসেন ও লে. কমান্ডার এম এম রানাকে গ্রেফতার করে পুলিশ কয়েক দফা রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার পর তারা খুনের দায় স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। গ্রেফতার করা হয়েছে আরো বেশ কয়েকজনকে। প্রধান আসামি কাউন্সিলর নূর হোসেন কোলকাতায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আটক রয়েছেন।
গত ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ থেকে একসঙ্গে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র-২ নজরুল ইসলাম, তার বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, লিটন, নজরুলের গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার এবং তার ব্যক্তিগত গাড়িচালক ইব্রাহিম অপহৃত হন। পরদিন ২৮ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন নজরুল ইসলামের স্ত্রী। কাউন্সিলর নূর হোসেনকে প্রধান করে মামলায় আসামি করা হয় মোট ১২ জনকে।
গত ৩০ এপ্রিল বিকেলে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ৬ জন এবং ১ মে সকালে একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহত সবারই হাত-পা বাঁধা ছিল। পেটে ছিল আঘাতের চিহ্ন। প্রতিটি লাশ ইটভর্তি দু’টি করে বস্তা বেঁধে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। গত ৩ মে নূর হোসেনের সিদ্ধিরগঞ্জের বাসায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ ১৬ জনকে গ্রেফতার এবং রক্তমাখা মাইক্রোবাস জব্দ করে। এরপর গ্রেফতার করা হয় আরো ৯ জনকে। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় র্যাব-১১ এর কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করেন নিহত প্যানেল মেয়র নজরুলের পরিবারের সদস্যরা। প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের শ্বশুর অভিযোগ করেন, ৬ কোটি টাকার বিনিময়ে র্যাবকে দিয়ে ওই সাতজনকে হত্যা করিয়েছেন নূর হোসেন।