পৃথিবীকে জেনে নিন আপনার ভাষায়….24 Hrs Online Newspaper

‘আমার সবচেয়ে ভালো ছেলেটাকে মেরে ফেলেছে পুলিশ’

Posted on June 20, 2014 | in সারা দেশ | by

47804_2-1সাতক্ষীরা থেকে ফিরে: বয়সের ভারে ন্যূব্জ মফিজ উদ্দিন সরদার। কারো সাহায্য নিয়ে হাঁটতে হয় তাকে। ভালোভাবে কথাও বলতে পারেন না। মুখে আটকে যায়। এই বয়সে আবার পুত্রহারার শোক। দুই গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল পানি। ভেতর থেকে বারবার বুকফাটা আর্তনাদ বেরিয়ে আসছিল তার। অন্য সন্তান-নাতি-নাতনীরা সারা দিনই আগলে রাখে তাকে। তারপরও খানিকের জন্যও ভুলতে পারেন না আমিনুরকে। কালিগঞ্জের রহমতপুরের গ্রামের বাড়িতে দেখা হয় মফিজ উদ্দিনের সাথে। সাংবাদিক শুনে তাদের বুকের যন্ত্রণাটা যেন আরো বেড়ে যায়। হাউমাউ করে কেঁদে কেঁদে কী যেন বলতে থাকেন। তার সব কথা বোঝা না গেলেও তিনি যা বলেছেন তার সারমর্ম হচ্ছে, ‘পুলিশ আমার সবচেয়ে ভালো ছেলেটাকে মেরে ফেলেছে। আমি আল্লাহর কাছে বিচার চাইছি। যারা আমার ছেলেকে মেরেছে আল্লাহ যেন তাদের বিচার করেন।’
গত ২৭ এপ্রিল সাতক্ষীরায় নিহত শিবির নেতা আমিনুর রহমানের বাবা হলেন এই বৃদ্ধ মফিজ উদ্দিন। শহরের কামালনগর কবরস্থানের উত্তর পাশে মুকুলের বাড়ির ছাত্রাবাসে থাকতেন আমিনুর। খুলনা বিএল কলেজ থেকে বাংলায় অনার্স-মাস্টারস শেষ করে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করছিলেন আমিনুর। থাকতেন কামালনগরের ওই মেসে। তিনি সাতক্ষীরা শহর ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি ছিলেন। আমিনুরের সাথে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন আরো ছয়জন। তাদের মধ্যে দু’জন এখন পঙ্গু। ওই ছাত্রাবাসেরই এক ছাত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ২৭ এপ্রিল বেলা ৩টার দিকে দুপুরের খাওয়া খাচ্ছিলেন আমিনুরসহ অন্যরা। হঠাৎ তাদের ছাত্রাবাস ঘিরে ফেলে পুলিশ। কাশেম নামে এক চা বিক্রেতা বলেন, তিনি পুলিশকে বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়তে দেখেছেন। ৬০-৭০ রাউন্ডের মতো গুলি করেছে পুলিশ। এ সময় পুরো এলাকা স্তব্ধ হয়ে যায়। মানুষ ভয়ে ঘরবাড়ি, দোকানপাট বন্ধ করে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। ওই বাড়িরই এক মহিলা জানান, ঘটনার সময় অনেকেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তার বাচ্চাও পুলিশের এই তাণ্ডবে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। ওই মহিলা বলেন, একপর্যায়ে গুলি থেমে গেলে পুলিশ ধরাধরি করে কয়েকজনকে নিয়ে যায়। আহতদের শরীর দিয়ে তখন রক্ত ঝরছিল। আহতদের একজন বলেছেন, তারা আমিনুরকে খুব কাছ থেকে গুলি করে। প্রথমে তার পায়ে গুলি করলে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এরপর পেছন থেকে এসআই বিধান তার পিঠে গুলি করেন বলে ঘটনার সময় আহত ওই যুবক জানান।
ঘটনার কিছু সময় আগে আমিনুরের সাথে কথা হয় তার সেজ বোন মনোয়ারার। তখন আমিনুর বাড়ির খোঁজখবর নিয়েছেন। এরপর বিকেল ৫টার দিকে আমিনুর নিহতের খবর জানতে পারেন তার পরিবার। আমিনুরের ভাই রেজাউল করিম বলেন, বিকেলে খবর পেলেও তারা সাতক্ষীরা সদরে যেতে পারেননি। পরদিন রাত ৩টার দিকে তারা বাড়ি থেকে বের হন। সাথে স্থানীয় এক ইউপি সদস্যও ছিলেন। তারা হাসপাতালে গিয়ে লাশ শনাক্ত করেন এবং পুলিশ ওই ইউপি সদস্যের কাছে লাশ হস্তান্তর করে। বাড়িতে নিয়ে পুলিশ দ্রুত লাশ দাফনের নির্দেশ দেয়। লাশ বাড়িতে আনার পর আশপাশ এলাকায় পাহারা বসায় পুলিশ। মাত্র ১৫ মিনিট সময় দেয় লাশ দাফনের। নামাজে জানাজার সময় কাউকে কথা বলতে দেয়া হয়নি। জানাজায় আত্মীয়-প্রতিবেশীরাও সবাই অংশ নিতে পারেননি। আমিনুরের অপর এক ভাই আজিজুর রহমান জানান, পুলিশ বাধা দিয়েছে জানাজায় লোক আসতে। তারপরও তিন হাজারের ওপরে মানুষ এসেছিল জানাজায়।
আট ভাই এবং চার বোনের মধ্যে আমিনুর ছিলেন ১১ নম্বর। পড়াশোনার তাগিদেই তিনি সাতক্ষীরা শহরে বসবাস করতেন। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান আমিনুরের জেলা শহরে কোনো বাসা না থাকায় তিনি মেস এবং ছাত্রাবাসে থেকেই লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছিলেন। স্থানীয় সূত্র জানায়, ঘটনার দিন ওই এলাকা খুবই শান্ত ছিল। সেখানে রাজনৈতিক কোনো মিছিল-সমাবেশ ছিল না। অথচ পুলিশ বিনা কারণে ওই ছাত্রাবাসে হানা দেয়। খাবাররত ছাত্রদের ওপর গুলি চালায় পুলিশ। ওই বাসারই এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চারি দিক থেকে ঘিরে পুলিশ গুলি করতে করতে ওই ছাত্রাবাসে প্রবেশ করে। ছাত্ররা বের হয়ে পালিয়ে যাবেন তারও কোনো সুযোগ ছিল না। সেখানে আরো যারা আহত হয়েছেন তারা হলেনÑ আশাশুনি উপজেলার কল্যাণপুর গ্রামের আবু বকর গাজীর ছেলে আবু তালেব, খুলনার খানজাহান আলী থানার পাতিয়ারডাঙ্গা গ্রামের আব্দুস সাত্তারের ছেলে আজিজুল ইসলাম, তালা উপজেলার মঙ্গলান্দকাঠি গ্রামের আব্দুল হকের ছেলে শেখ আব্দুস গফুর, সাতক্ষীরা সদরের ঝাউডাঙ্গা গ্রামের সোহরাব হোসেনের ছেলে নূর মোহাম্মদ, শ্যামনগরের ইমরান হোসেন, খুলনার আক্তার হোসেন এবং আব্দুস সবুর। আহতদের মধ্যে কয়েকজন এখনো জেলে রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দায়ের করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
আমিনুরের পরিবার জানান, ছেলের মৃত্যু সংবাদ শোনার পর থেকেই একেবারে ভেঙে পড়েছেন বাবা মফিজ উদ্দিন এবং মা সফুরুন্নেছা। মফিজ উদ্দিন বলেন, তার আটটি ছেলের মধ্যে সবচেয়ে ভালো ছিলেন আমিনুর। পুলিশ তাকেই মেরে ফেলেছে। তিনি বলেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে বিচার চাইছি।’ পরিবারের সদস্যরা বলেন, দিন নেই রাত নেই ৮৩ বছর বয়স্ক এই মফিজ উদ্দিন সারাক্ষণই ছেলের জন্য কাঁদেন। কাঁদেন সফুরুন্নেছাও। তিনি বলেন, যে বয়সে আমাদের মারা যাওয়ার কথা, আমাদের লাশ কবরে রাখার কথা ছেলের, সেই বয়সে দেখতে হলো চোখের সামনে কবরে শুইয়ে রাখা হচ্ছে সন্তানকে। তিনি বলেন, আমার ছেলের কী অপরাধ। কেন তাকে হত্যা করা হলো তা জানতে পারলাম না। তিনিও বিচারের ভার ছেড়ে দিয়েছেন আল্লাহর ওপর। তিনি বলেন, কার কাছে অভিযোগ করব। যাদের কাছে অভিযোগ করব তারাই তো আমার ছেলেকে মেরেছে। কারো কাছে আর অভিযোগ করতে চাই না।

সর্বশেষ খবর

আজকের ছবি

www.facebook.com

Tag Cloud