May 6, 2026
লালমনিরহাট: ভারতের পশ্চিমবঙ্গের গজলডোবা ব্যারাজ দিয়ে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করে নেওয়ায় বাংলাদেশ অংশের খরস্রোতা তিস্তায় পানিপ্রবাহ আর নেই। তিস্তা পানিশূন্য হয়ে পড়ার ইতিহাস এটাই প্রথম নয়, এর আগে ২০০৬ সালে এমন ঘটনার অবতারণা হয়েছিল। সেবার টানা ১০ দিন তিস্তার বাংলাদেশ অংশ পানিশূন্য ছিল। আর এবার টানা দুমাসে গড়াল। কিন্তু পানিশূন্যতা কবে কাটবে, তাও অনিশ্চিত। গত ১ ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত তিস্তা ব্যারাজে ৩ হাজার ৩০০ কিউসেক পানি কমে গেছে। তিস্তার পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় ব্যারাজের সেচকার্যক্রম বন্ধপ্রায়। সেচসংকটে পড়েছে ৬৫ হাজার হেক্টর জমি।
মূল ক্যানেলে পানি কিছুটা থাকলেও শাখা ক্যানেলগুলোতে পানি সরবরাহ করা যাচ্ছে না। ফলে তিস্তা সেচ প্রকল্পের কমান্ড এলাকার সেচনির্ভর বোরো আবাদে ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হয়েছে কৃষকদের। নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার খালিশা চাপানী ইউনিয়নের কৃষক আলতাফ হোসেন চৌধুরী ও মোজাম্মেল হক জানান, তারা এবার ১২ হেক্টরের মধ্যে ৪ হেক্টর জমিতে বোরোর চারা রোপণ করেছেন। পানিসংকটে বাদবাকি জমিতে রোপণ করতে পারছেন না। পানি আদৌ পাওয়া যাবে কি না, সেই শঙ্কায় আছেন তারা। একই অবস্থায় পড়েছেন অন্যান্য ক্যানেলের চাষিরাও। তিস্তা ব্যারাজে পানির প্রবাহ না থাকায় ব্যারাজের প্রায় ১৫০ গজের মধ্যেই চাষ হয়েছে কুমড়া। ব্যারাজের ভাটি ও উজানে চাষ হয়েছে ভুট্টাও।
তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্প সূত্র জানায়, নীলফামারী সদর, কিশোরগঞ্জ, সৈয়দপুর, জলঢাকা, ডিমলা, দিনাজপুরের দশমাইল, চিরিরবন্দর, পার্বতীপুর, খানসামা, রংপুরের তারাগঞ্জ, বদরগঞ্জ ও গঙ্গাচড়া উপজেলার প্রকল্প এলাকায় সুবিধাভোগীর সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। প্রথম ধাপে ১৯৯৫ সালে তিস্তা সেচ কার্যক্রম প্রকল্পের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়। ২০০৩ সালে ৩০ হাজার হেক্টর জমিকে সেচসুবিধার আওতায় আনা হয়।
পর্যায়ক্রমে নীলফামারী, রংপুর ও দিনাজপুরের ১২টি উপজেলায় ৬৫ হাজার হেক্টর জমি সেচসুবিধার আওতায় আনা হয়। দ্বিতীয় ধাপে উত্তরাঞ্চলের বগুড়া-জয়পুরহাট জেলা পর্যন্ত সেচ কার্যক্রম সম্প্রসারণ প্রজেক্টের কাজ আপাতত স্থগিত রয়েছে। ডালিয়া ডিভিশনাল সম্প্রসারণ কর্মকর্তা রাফিউল বারী বলেন, ‘চলতি বছর তিস্তায় পানির প্রবাহ না থাকায় রংপুরের ২৬টি ক্যানেলের মধ্যে ২টি, নীলফামারীর ১৬টির মধ্যে ৪টি, সৈয়দপুরের ১৮টির মধ্যে ৩টি ক্যানেলে অনিয়মিতভাবে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে।
তিস্তায় প্রবাহ না থাকায় বর্তমানে ভূগর্ভস্থ ২০০ থেকে ৩০০ কিউসেক পানি রয়েছে। এই পানি সরবরাহ করার উপায় নেই। শিগগিরই পানি না পেলে সেচসুবিধা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।’ তিনি জানান, বিগত জোট সরকারের আমলে ২০০৬ সালে ১০ দিন তিস্তা ব্যারাজ পানিশূন্য ছিল। এবারও একই অবস্থা। চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত তিস্তা ব্যারাজ পানিশূন্য রয়েছে। পানিশূন্যতার কারণে ইতিমধ্যে তিস্তার বিভিন্ন প্রজাতির মাছ বিলীন হয়ে গেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে তিস্তাপারের জীববৈচিত্র্যও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।
ডিমলা উপজেলার খালিশা চাপানী টারশিয়ারী এ-১ নম্বর ক্যানেল সমিতির সভাপতি জগদীশ চন্দ্র রায় জানান, তিস্তায় প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ১ নম্বর ক্যানেলের আওতাভুক্ত ১২টি সমিতির ৩০০ হেক্টরের মাত্র ৬৫ হেক্টর জমি চাষ হয়েছে। এগুলোতেও ঠিকমতো পানি পাওয়া যাচ্ছে না। খেত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মাইনুদ্দিন মণ্ডল জানান, গত জানুয়ারি থেকে তিস্তা সেচ প্রকল্পের কমান্ড এলাকার ৬৫ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদে সেচ কার্যক্রম শুরু হয়। শুরুতে প্রায় ২২ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া হয়েছিল। পানি না পাওয়ায় ৪৩ হাজার হেক্টর জমি অনাবাদি পড়ে আছে। এবার বাদবাকি জমিতে বোরো চাষ সম্ভব হবে কি না, কেউ বলতে পারছে না।