February 1, 2026
ঢাকা: দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এলে দুর্নীতিও অনেকাংশে কমে যাবে বলে মনে করেন সমাজের বিশিষ্টজনরা।দুর্নীতি কঠোর হাতে প্রতিরোধ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) শক্তিশালী করতে প্রতিষ্ঠানটিকে সাংবিধানিক রূপ দেওয়ারও দাবি জানান দেশের বিশিষ্টজনরা। একই সাথে দলীয় প্রভাবমুক্ত প্রশাসন না হলে দুর্নীতি প্রতিরোধ সম্ভব নয় বলে মত প্রকাশ করেছেন তারা।
মঙ্গলবার রাজধানীর সেগুন বাগিচায় দুদকের সম্মেলন কক্ষে দুর্নীতি প্রতিরোধ সপ্তাহ উপলক্ষে আয়োজিত রাজনৈতিক ঐক্য ও জবাবদিহিতামূলক প্রশাসন দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধের প্রধান নিয়ামক শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তারা।
দুদক চেয়ারম্যান মো. বদিউজ্জামানের সভাপতিত্বে ও বৈশাখী টেলিভিশনের প্রধান সম্পাদক মঞ্জুরুল আহসান বুলবুলের সঞ্চালনায় সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবু হেনা। বিশেষ অতিথি হিসেবে দুদক কমিশনার মো.সাহাবুদ্দিন চুপ্পু, ড. নাসিরউদ্দীন আহমেদ, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ও বিএনপি নেতা ড. ওসমান ফারুক, সচিব মো. ফয়জুর রহমান চৌধুরী, নাট্যকার মামুনুর রশীদ, এমপি মমতাজ বেগম, এফবিসিসিআইর সাবেক দুই সভাপতি বক্তব্য রাখেন। এছাড়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা সংগঠনের গবেষক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান অতিথির বক্তৃতায় সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবু হেনা বলেন, দলীয় শৃঙ্খলে থাকার কারণে কোন প্রতিষ্ঠানই ন্যায়ের উপর থেকে কাজ করতে পারে না। রাজনীতির ক্ষমতার কাছে সব কিছু জিম্মি হয়ে আছে। ক্ষমতায় টিকে থাকার লড়াইয়ের কারণে সুষ্ঠু নির্বাচন ও ন্যায় ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, রাজনীতিবিদরা আমাদের দেশের সকল প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণ করে। রাজনীতিবিদরা সঠিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী না হলে দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধ সম্ভব নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।তিনি বলেন, দুদক আসলে আইন দিয়ে তৈরি একটি প্রতিষ্ঠান। দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধ এবং দুদককে শক্তিশালী করতে প্রতিষ্ঠানটির সাংবিধানিক রূপ দিতে হবে। সেই সাথে কোনো প্রভাব ছাড়াই যেন কাজ করতে পারে সেই স্বাধীনতা দিতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম. হাফিজউদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রশাসন সম্পূণবূপে দলীয়করণ হয়ে গেছে। নিয়োগ-বদলি-পদোন্নতি-পদাবনতি এ সব প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও নিয়ম অনুসারে না হলে প্রশাসন কখনো দলীয়করণমুক্ত হতে পারবে না।সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম বলেন, সমাজে ন্যায়বিচার বলে কিছু নেই। কমিশনের শক্তিও সীমিত।
এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি এ. কে. আজাদ বলেন, পত্রিকাতে ভুল সংবাদ ছাপা হলে অনেক সময় দেখা যায়, সরকার তার প্রতিবাদ জানায়। তবে বাকি সত্য সংবাদগুলোর জন্য সরকার তেমন কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করে না। যারা রাজনীতি করেন, তারা না চাইলে কিছুই হবে না।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার বলেন, সমাজে অনুসরণ করার মতো সৎ মানুষ কমে গেছে। দুর্নীতি প্রতিরোধে বর্তমান সরকারকে কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে। দুদককে শক্তিশালী করতে পারলে দুর্নীতি অনেকাংশে কমবে বলেও তিনি দাবি করেন।পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান ইকরাম আহমেদ বলেন, দুর্নীতি প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। প্রতিটি মানুষের জন্য সু-শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।
সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে হলফনামা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। কিন্তু এখন তা চরিত্র হনননামায় পরিণত হয়েছে। বদিউল আলম মজুমদার বলেন, এই হলফনামা যে সকল তথ্য দিয়েছে, এই তথ্যগুলো যদি যাচাই বাছাই করা হয়, আমার মনে হয় তাহলে আমাদের নির্বাচন অঙ্গনকে আমরা কলুষমুক্ত করতে পারব বহুলাংশে। নির্বাচন কমিশন যদি এটা করে তাহলে এই বসন্তের কোকিলদেরকে বহুলাংশে আমাদের নির্বাচনী অঙ্গন থেকে বাইরে রাখা যাবে।
সিপিবি’র সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, বর্তমানে দুর্নীতি এমনভাবে ছড়িয়ে গেছে যে, সর্বাঙ্গে ব্যথা ওষুধ দেবো কোথায় ?- এমন অবস্থা হয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের দেশের প্রধান দুই দলের মধ্যে আর কোনো ঐক্য না থাকলেও একটি বিষয়ে ঐক্য আছে, তা হলো লুটপাটের ঐক্য। এর কারণ হলো, তারা দুর্নীতিবাজদের কাছে জিম্মি।
ইনাম আহমেদ চৌধুরী বলেন, যেখানে ক্ষমতার উৎস, সেখানে দুর্নীতির সম্ভাবনা রয়েছে এবং আমরা দেখছি গোষ্ঠী স্বার্থ উদ্ধারের জন্য ‘integrity of people in authority’ এটা যখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে আসে তখনই দুর্নীতির জন্ম হতে পারে। বস্তুতপক্ষে রাজনৈতিক ঐক্য যদি না থাকে তাহলে সেটা অনুকূল একটা পরিবেশ হতে পারে না। যার জন্যে আমাদের দেশে বলা হচ্ছে, আমাদের সমাজ জর্জরিত হয়েছে, আমাদের সমাজ দেহ বিষাক্ত হয়ে পড়েছে এবং আমরা দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছি।